Category Archives: মতামত

জাতীয় ঐক্য ও জোট থাকা না থাকা

আবদুল্লাহ আল মেহেদী

ডিসেম্বরে একাদশ জাতীয় নির্বাচন। নির্বাচন নিয়ে সারা দেশে চলছে নানান গুঞ্জণ, বিশেষ করে চায়ের দোকানগুলো মজে উঠে নির্বাচন এলে। বিএনপি ও আ’ লীগের উভয়ের জনসমর্থন রয়েছে প্রায় সমানে সমান। তবে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার আর লাগামহীন অত্যাচারে বিপর্যয়ে ক্ষমতাসীন আ’ লীগ।

নির্বাচন নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলেও বেশ প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আ’ লীগের উঁচু পর্যায়ের নেতাদের সুর ভিন্ন রকম। মিডিয়ার সামনে ওদের কথার ধরণ বেশ ভিন্নই মনে হয়। জামায়াত নিয়ে একটা সংশয় দেখা দিচ্ছে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে! জোট নিয়ে প্রশ্ন! থাকবে কী থাকবে না। আবার নতুন জাতীয় ঐক্য হলে জামায়াত কী পদক্ষেপ নিবে তাও স্পষ্ট নয়। জামায়াত এখন পর্যন্ত নিরবেই আছে।

একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিকল্পধারা সভাপতি অধ্যাপক একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে যে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে তাতে বিএনপির যুক্ত হওয়ার পথে প্রধান ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে জামায়াত। বি. চৌধুরী, ড. কামাল ও নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নার সাফ কথা- এই ঐক্যে জামায়াত থাকতে পারবে না। তবে বিএনপি এ ব্যাপারে ‘হাঁ’ ‘না’ কোনটিই বলতে পারছে না।

তিউনেশিয়া, তুরষ্ক বা মিসরের মতো জামায়াত আসবে এমনও নয়। আসতেও পারে তবে সময়ের কথা এখন বলা যাবে না। মানবতাবিরোধী বা যুদ্ধাপরাধী যে নামেই হোক না কেনো ওদের শরীরের গন্ধ এখন নেই। অভিযুক্তদের বিচার হয়ে গেছে। নতুন প্রযন্মও বেশ আকৃষ্ট এ দলটির ওপর। পরিছন্ন রাজনীতিতে দশে দশ এরা।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনের বাকি এখনো প্রায় ১৬ মাস। সংবিধানের আলোকে যদি সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে যদি নির্বাচন হয়। আর যদি কোনো কারণে ডিসেম্বরে সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে ভেঙে দেওয়ার পরবর্তী ৯০ দিন, অর্থাৎ ২০১৯ সালের মার্চের মধ্যেও ভোট হতে পারে।

ভোট যখনই হোক, সেটি দেশের দুটি বড় দলের অন্যতম বিএনপিকে ছাড়াই, অর্থাৎ ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির আদলে হবে নাকি বিএনপির অংশগ্রহণে, সেটিই এখন আগ্রহের বিষয়।

বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট শরিক জামায়াতের সঙ্গ ছাড়ার কথা বলার পাশাপাশি আরও দুটি ইস্যুকে গুরুত্ব দিচ্ছেন ঐক্যের অন্য উদ্যোক্তারা। বি. চৌধুরীর বিকল্পধারা, আ.স.ম আবদুর রবের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি ও মাহমুদুর রহমান মান্নার নেতৃত্বাধীন নাগরিক ঐক্যের সমন্বয়ে গঠিত যুক্তফ্রন্ট আগামী নির্বাচনে বিএনপির কাছে ১৫০টি আসনে ছাড় চায়। তারা বলছেন, রাজনীতিতে ভারসাম্য আনতে এবং আগামীতে সরকার গঠন করতে পারলে ক্ষমতার ভারসাম্য সৃষ্টির লক্ষ্যেই তারা আসনের এই সমতা চান।

বি. চৌধুরীর বাসায় বৈঠককে প্রধান দুই দলের শীর্ষ নেতারা বেশ ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, গণতন্ত্রের শত ফুল ফুটছে, এটা ভালো। তবে এই জোট কতদূর যায়, তা দেখতে হলে নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। আর বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, অনৈতিক এবং অবৈধ সরকারের বিরুদ্ধে কেউ উদ্যোগ গ্রহণ করলে বিএনপি তাতে সমর্থন জানাবে।

বর্তমান সরকার বিদায় নিলে নতুন সরকার এসেও যেন স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, বিএনপির কাছে সেই প্রতিশ্রুতি চান অন্যরা। উদাহরণ হিসেবে সামনে আনছেন মালয়েশিয়ায় ড. মাহাথির মোহাম্মদ ও আনোয়ার ইব্রাহিমের মধ্যে সম্পাদিত চুক্তির কথা।
নির্বাচনে জামায়াত কিন্তু বড় ইস্যু! এটা অস্বীকার করার মতো নয়। জামায়াতের একটি বিশাল ভোট ব্যাংক আছে ওদের তরুন সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবিরে। জোট থাকুক আর নাই থাকুক এই ভোটগুলো কখনোই নৌকার প্রতীকে পড়বে না, এটা শতভাগ নিশ্চিত।

বিএনপির চেয়ারপারসন বিচারিক রায়ে প্রায় ছয়মাস কারাবন্দি। আরেক নেতা তারেক রহমানও দেশের বাইরে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন! সংবিধানের মান বাঁচাতেও সংসদ ভেঙ্গে দিতে হবে। কেয়ারটেকার সরকার বিলুপ্ত! কোন দিকে যাবে দেশ?

একএগারোর গন্ধকে অনেকে পরিবেশ পাল্টানো বা দৃষ্টি ফিরানোর পয়গাম মনে করছে। বোকা বানানোর এক নয়া কৌশল! সহায়ক সরকারের পদ্ধতিও নিরেপেক্ষ নয়। একেবারেই পুরো সরকারের মতোই।

আ’ লীগ চিন্তিত নয় নির্বাচন নিয়ে এমন কিন্তু নয়। বাহিরের চাপও কিন্তু আছে। প্রতিবেশী দেশ ভারত যদিও সরকারের পক্ষে কাজ করবে কিন্তু সফল হবে এমনটাও বলা যায় না। অা’লীগে দীর্ঘ প্রার্থীতার তালিকা রয়েছে আসন্ন নির্বাচন নিয়ে। দীর্ঘ মেয়াদী ক্ষমতা বেশ বেকায়দায় নিয়ে গেছে দলটিকে। মনোনয়ন নিয়েও বেশ চিন্তিত ওরা! কাকে দিয়ে কাকে দিবে।

ব্যপক দুর্নীতি আর দুঃশাসন আর কায়েমী স্বার্থে দলটির প্রতি অনাস্থা মানুষের দিন দিন বাড়ছে। বিশেষ করে ছাত্রলীগের অপকর্ম দলটির পতনে যথেষ্ট। মানুষকে মন ভুলানোর কথা অার কানে ঢুকানো যাবে না। মানুষ সচেতন। কথায় আছে না মিঠে কথায় চিড়া নাকি ভিজে না।
আ’ লীগে তরুণদের তেমন টানতে পারছে না যেমনটা পারছে জামায়াত। তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র শিবির তরুণদের বেশ আকৃষ্ট করতে সমর্থ হয়েছে। ওদের কাজ থেমে যায়নি দমন না পীড়নেও। নির্বাচনে এবার জামায়াতের ভোট ব্যংক বেড়েছে গতবারের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলের মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে নতুন কৌশল বেছে নিয়েছে আওয়ামী লীগ। সম্ভাব্য প্রার্থীদের কাছে কেন্দ্র থেকে গোপনে গ্রিন সিগন্যাল পাঠানো হবে বলে জানিয়েছে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারণী সূত্রগুলো। এমন ভাবেই খবরগুলো এসেছে প্রিন্ট মিডিয়াতে।

দলের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ের নেতারা জানান, প্রত্যেক নির্বাচনি আসনে একাধিক প্রার্থী মনোনয়ন-প্রত্যাশী। তারা সবাই নিজ নিজে এলাকায় নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন। কে মনোনয়ন পাবেন, তা প্রকাশ্যে জানিয়ে দিলেও যারা মনোনয়ণ পাবেন না, তারা মাঠে থাকবেন না। চূড়ান্ত প্রার্থীদের নানাভাবে হয়রানি করতে শুরু করবেন। এর ফলে মারামারিতেও গড়াতে পারে। তাই গোপনীয়তা রক্ষার স্বার্থে এই কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামী লীগ।

দৈনিক ভোরের পাতা ২৯ অাগস্ট এমন খবর ছাপে। তারমানে হলো মনোনয়ণ নিয়েও বেশ উৎকণ্ঠায় আছে তারা। সূত্রগুলো বলছে, মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া, যাচাই-বাছাইয়ের আগমুহূর্তে চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম প্রকাশ্যে জানানো হবে। এর ফলে বিশৃঙ্খলার মাত্রা অনেকাংশে কমবে বলে মনে করে আওয়ামী লীগের নীতি-নির্ধারকরা।

এবার আওয়ামী লীগের চূড়ান্ত মনোনয়ন যিনি পাবেন, তার নাম শেষ সময়ে প্রকাশ্যে আসবে। কারণ চূড়ান্ত প্রার্থীর নাম আগে থেকে জানা গেলে নির্বাচনি আসনগুলোয় বিশৃঙ্খলা বেড়ে যেতে পারে। তাই এই কৌশল নেওয়া হয়েছে। কৌশলী হলেও কী কাজে আসবে তা প্রশ্নবিদ্ধ?

দেশের প্রতিটি সংসদ আসনে একাধিক প্রার্থী রয়েছে। এমনকী বিদ্রোহী প্রার্থীও সংখ্যা একাধিক! এবার আসি জামায়াত প্রসঙ্গ নিয়ে। জামায়াত রাজনৈতিকভাবে দেওলিয়া এমন কথা মানতে নারাজ খোদ আওয়ামী লীগ ও রাজনৈতিক বিশ্লষকরা। হাইকোর্টের আদেশে নিবন্ধন ও প্রতীক হারিয়ে দলটি এখন নিরবেই আছে আগের মতো মাঠে ময়দানে আর দেখা যায় না। আন্দোলনে গিয়ে আর শক্তি খোয়াতে চায় না। এমনি দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের হারিয়ে অভিবাবক শূণ্য হয়ে পড়েছে।

ভোট ব্যাংক নিয়ে বলতে গেলে বলতে হয়, দাঁড়ি পাল্লার ভোট কখনো নৌকায় যাবে না। আর আ’ লীগের সাথেও জোট বাঁধবে না জামায়াত। কোনো কারণে ঐক্যজোট ভাঙ্গন ধরলে জামায়াতের প্রায় আড়াই কোটি ভোট কোথায় যাবে?

যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় পেয়েছেন সুরেন্দ্র কুমার সিনহা

মাহমুদুর রহমান ও ‘বাঙালি মুসলমান’

মাহমুদুর রহমানকে ভালবাসেন এমন মানুষের অভাব নাই। তেমনি, তাঁকে ঘোরতর অপছন্দ করেন এমন লোকও আছেন। এর মধ্য দিয়ে একটি বিভক্ত ও বিভাজিত সমাজের ছবি আমাদের সামনে হাজির  হয় যারা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিশাবে নিজেদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গা থেকে কোন রাজনৈতিক প্রশ্নে বাস্তবোচিত অবস্থান নিতে অক্ষম। সমাজ ও রাজনীতিতে সক্রিয় যে কোন ব্যক্তি সম্পর্কে সমাজে নানান মূল্যায়ন থাকতেই পারে। কিন্তু মাহমুদুর রহমান যেভাবে গুণ্ডামি, হামলা, মামলা এবং অবিশ্বাস্য অবিচারের মুখোমুখি হয়েছেন তার তুলনা নাই। কুষ্টিয়ার আদালতে তিনি প্রকাশ্যে ক্যামেরার সামনেই পুলিশের উপস্থিতিতে গুণ্ডামির শিকার হয়েছেন, মারাত্মক জখম নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এই ঘটনা, বলা বাহুল্য, ক্ষমতাসীনদের জন্য খুব আনন্দের বিষয় নয়, কিন্তু তারা ঘটনাটি ঘটতে দিয়েছে। ক্ষমতাসীন্দের দ্বারা গুণ্ডামি প্রশ্রয়ের আওয়াজ ফেইসবুকে মাহমুদুর রহমান বিরোধীদের সরব প্রপাগান্ডার মধ্যে শোনা গেলেও এটা পরাজিতের বিকৃত চিৎকার মাত্র। যার মধ্যে নীতি, যুক্তি বা আদর্শ নাই। বোঝা যাচ্ছে গণ জাগরণ মঞ্চ ও শাহবাগের করুণ পতন কিছু ব্যক্তির মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তারা তাদের ব্যর্থতার প্রতিশোধ বিকৃত কায়দায় চরিতার্থ করতে চায়। এদেরকে চেনা দরকার আছে। রাষ্ট্র দিতে অক্ষম হোক, কিন্তু যে কোন নাগরিকের কিছু ন্যূনতম নাগরিক ও মানবিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু ফেইসবুকে অনেকের মন্তব্য পড়ে দেখছি সেই অধিকার রাজনৈতিক আদর্শ হিশাবেও মাহমুদুর রহমানকে দিতে তারা রাজি না।

নানা কারনেই মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক তর্কবিতর্কের ক্ষেত্র। সেটা হতেই পারে। কিন্তু তথ্যভিত্তিক তর্কের চেয়েও তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও প্রপাগাণ্ডাই বেশি। ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থের পক্ষে তাঁর একটা দৃঢ় অবস্থান আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের কালপর্বে বাংলাদেশে ইসলাম প্রশ্ন এবং মুসলমানদের স্বার্থ রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের কেন্দ্রে বাস্তব পরিস্থিতির কারনেই হাজির রয়েছে। হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ঐতিহাসিক কারণেই অনিবার্য। এর অন্যথা হবার কোন সুযোগই নাই। মাহমুদুর রহমান সেই অনিবার্যতারই অভিপ্রকাশ। তাঁর রাজনৈতিক পক্ষপাত, বিশেষত ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থের প্রশ্নে অকুতোভয় অবস্থান, তাকে একাই এক রাজনৈতিক আইকনে পরিণত করেছে। ফলে তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিষোদ্গারের পাত্র হবেন এতে আর অবাক হবার কী আছে! সমস্যা হচ্ছে কুৎসা, নিন্দা ও প্রপাগান্ডা ছাড়া তার চিন্তা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে কোন ফলপ্রসূ তর্ক বা বিরোধিতা দেখি নি। অন্তত আমার চোখে পড়ে নি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোটা দাগে দুটি মতাদর্শিক ধারা প্রকট। একদিকে রয়েছে ঘোরতর ইসলাম বিদ্বেষী জাতিবাদী ধারা, যারা নিজেদের সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ বলে দাবি করে। অন্যদিকে রয়েছে ইসলামপন্থি ধারা। জাতিবাদী সেকুলার ধারা মুলত পাশ্চাত্যপন্থী এবং উনিশ শতকে উচ্চবর্ণের হিন্দু কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিওয়ালাদের তৈয়ারি বাঙালিত্বকে ইসলামের বিপরীতে প্রতিস্থাপন করে। এটা মূলত দিল্লির প্রকল্প। সাতচল্লিশে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছিল। একদিকে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল, বিপরীতে গঠিত হয়েছিল হিন্দুদের জন্য ভারত রাষ্ট্র। ভারতে যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল তার ওপর সেকুলারিজমের জোব্বা পরানো হলেও আদতে তৈরি হয়েছিল একটি হিন্দু রাষ্ট্র। গবেষকদের ভাষায় Soft Hindu State। নরেন্দ্র মোদীর আমলে তা পরিপূর্ণ হিন্দুত্ববাদে রূপ লাভ করে চলেছে। অর্থাৎ পরিণত হচ্ছে Hard Hindu State-এ। এই পরিপ্রক্ষিতে বিচার করলে বাঙালিত্ব, বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিম্বা নানান কিসিমের প্রগতি ও প্রগতিশীলতার ভড়ং মূলত হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের বাংলাদেশী ধরণ মাত্র। বাংলাদেশের জনগণকে সাংস্কৃতিক-মতাদর্শিক ভাবে ‘ইসলামের অভিশাপ’ থেকে মুক্ত করবার ফন্দি বা আরও সহজ ভাষায় দিল্লির ইসলাম নির্মূল পরিকল্পনারই অংশ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশেষ ভাবে বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট ভাবে বুঝতে না পারার এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা অদৃশ্য থেকে যায়। ইতিহাস পাঠ ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে চরম অনাগ্রহের কারণে ইসলামপন্থি  ধারা এই ক্ষেত্রে সবিশেষ দুর্বল; তার আত্মপ্রকাশের ভঙ্গীও প্রায়শই সাম্প্রদায়িক ও পশ্চাতমুখি রূপ পরিগ্রহণ করে। ধর্মতত্ত্বে নিজেদের স্বেচ্ছাবন্দি রাখার কারণে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালপর্বে দর্শন, সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইসলামের সম্ভাব্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবার ক্ষেত্র তৈরির কাজে এতে কোন অগ্রগতি নাই। পরকালকন্দ্রিক চিন্তা ইহলৌকিক সমস্যার সমাধানেও অনাগ্রহী। ফলে রাজনীতির মোট দাগের দুই ধারার একটিও বাংলাদেশের  জনগণকে কোন বাস্তবোচিত পথ দেখাতে পারছে না।

সেকুলারিজম পাশ্চাত্যে নাগরিকতার ধারণা এবং আইনী সংজ্ঞা নির্মাণে যে ভূমিকা রাখে সে সম্পর্কে ইসলাম বিদ্বেষী জাতিবাদী এবং বাম প্রগতিশীল(?) ধারা যারপরনাই অজ্ঞ। রাষ্ট্রের চোখে সকলেই নাগরিক, সমাজে কে কী ধর্ম পালন করে, কে নাস্তিক কিম্বা কে আস্তিক সেইসব দেখা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ নয়। ধর্ম বিশ্বাস কিম্বা আস্তিক/নাস্তিক নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কাজ প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সমুন্নত রাখা এবং নিশ্চিত করা। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম প্রাইভেট ব্যাপার বটে, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পরিসরে ধর্ম বা ব্যাক্তির বিশ্বাস বিচার্য না। কিন্তু বিচার্য না হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ সমাজ থেকে ধর্মের উচ্ছেদ নয়, বরং নিশ্চিন্তে ধর্ম পালন এবং ধর্ম প্রচারের অধিকার নিশ্চিত করা। ধর্ম প্রচারের অধিকার চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষতা কায়েমের একমাত্র এবং প্রধান কাজ ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবার জন্য একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং গণতান্ত্রিক ‘রাষ্ট্র’ গঠন। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাসম্পন্ন ‘রাষ্ট্র’ নিয়ে, অবশ্য একালে গুরুত্বপূর্ণ তর্ক জারি রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি দরকার গণতান্ত্রিক ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি ও যথোপযুক্ত সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এমন এক বাস্তব পরিস্থিতি ও শর্ত তৈরি যাতে ইসলাম ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সেই ভূমিকার বিচার করেই যেন বিভিন্ন ইসলামপন্থি ধারা পর্যালোচনার সামর্থ জনগণ অর্জন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু দুটি ধারার একটিও প্রদর্শন করতে পারে নি।

বলাবাহুল্য, ধর্ম বিদ্বেষী বাংলাদেশের সেকুলারিজম বরং উল্টাটা করেছে। তারা সেকুলারিজমের সঙ্গে জাতিবাদ ও হিটলার-মুসোলিনির সমাজতন্ত্রের মিশেল ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করেছে। আধুনিক গণতন্ত্রের লিবারেল বা উদারনৈতিক বৈশিষ্ট্য বলি, কিম্বা বলি প্রগতিশীল রাজনীতির দিক থেকে গণতন্ত্রর ইতিবাচক ভূমিকার কথা — কোন কিছুই এই ইসলাম বিদ্বেষী ধারার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই দিকটি না বুঝলে কেন মাহমুদুর রহমানকে প্রকট ইসলামপন্থী হতে হয় সেই বাস্তবতা আমরা বুঝব না। ইসলাম ও মুসলমানদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থের কথা বলা ছাড়া দিল্লি ও পরাশক্তির সমর্থনপুষ্ট ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা মোকাবিলা যারপরনাই কঠিন এই কঠিন বাস্তবতার কিছুই আমরা অনুধাবন করতে পারব না।

মাহমুদুর রহমান হঠাৎ বাংলাদেশে হাওয়া থেকে গজান নি। তিনি জাতিবাদী, ইসলাম বিদ্বেষী ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধেরই অনিবার্য ফল। ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক দিক থেকে বিচার করলে তিনি সবচেয়ে নির্ভীক এবং দৃঢ় প্রতিরোধের সম্মুখ ফ্রন্টের সৈনিক। তাঁর বিরোধীরা যাই বলুক, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির কাছে তিনি তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার আইকন। তাঁর কাছে তাদের প্রত্যাশা বেড়েছে বৈ কমে নি। কুষ্টিয়ার গুণ্ডামি তাঁর এই ভাবমূর্তিকে আরও প্রতিষ্ঠিত করলো।

আমি বরাবরই এর আগে আমার বহু লেখায় বলেছি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানেই সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সেই ক্ষেত্রে আলাদা করে সেকুলারিজমকে রাষ্ট্রের নীতি হিশাবে গ্রহণ করবার প্রয়োজন পড়ে না। গণতন্ত্র কায়েমের লড়াই বাদ দিয়ে বাড়তি সেকুলারিজম বা ধর্ম নিরপেক্ষতার দাবি বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্রেফ ইসলাম নির্মূলের দাবি ছাড়া অন্য কিছুই না। জনগন একে প্রতিহত করবেই। সেটা মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে হোক, কিম্বা হোক অন্য কারো ঝাণ্ডার নীচে। এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

নাস্তিক্যবাদীরা মাহমুদুর রহমানকে অপছন্দ করে। শেখ হাসিনার পিটুনি খেয়ে এদের অঙ্কের দেশ হকে পালানোর দুঃখ বুঝি। যার জন্য চুরি করি সে বলে চোর! – অনেকটা সেই পুরানা গীত আর কী! কিন্তু একে তামাশা হিশাবে নেওয়া ঠিক হবে না। চিন্তার ইতিহাসে নাস্তিকতার ইতিবাচক ভূমিকা আছে। নাস্তিক্যবাদের ইতিবাচক দার্শনিক মর্ম হচ্ছে অতীন্দ্রিয় ঈশ্বরের বিপরীতে রক্তমাংসের মানুষের মহিমা প্রতিষ্ঠা। তরুণ মার্কস বলেছিলেন মানুষের মহিমা কায়েম করবার জন্য ঘোরাপথে হেঁটে আসার দরকার পড়ে না। অর্থাৎ খামাখা আল্লার অস্তিত্বের বিরোধিতা করা অনাবশ্যক একটি কাজ। বরং বালখিল্য নাস্তিকতা এবং ফালতু পরাবিদ্যার চর্চা ত্যাগ করে যে ইহলৌকিক জীবনের সমস্যা মানুষকে অতিন্দ্রিয় আশ্রয়ে বাধ্য করে, সেই ইহলৌকিক সমস্যার সমাধান করাই কমিউনিস্টদের কাজ। অথচ এটা জানা থাকার পরেও বাংলাদেশে কমিউনিস্ট নামধারী নাস্তিক – অর্থাৎ ধর্ম বিদ্বেষি চরম প্রতিক্রিয়াশীল ধারার মোকাবিলা জনগণকে করতে হচ্ছে। জনগণের বন্ধু না হয়ে তারা জনগণের দুষমণের ভূমিকা পালন করে। এই প্রকার বালখিল্য নাস্তিক ও ধর্ম বিদ্বেষীরা নিজেদের আবার ‘মুক্তমনা’ বলে দাবিও করে। বদ্ধ বুদ্ধি ও প্রতিবন্ধিতা হাস্যরসের সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সত্যকার অর্থে নাস্তিক্যবাদের দার্শনিক তর্কবিতর্কের ধারে কাছেও তারা পৌঁছাতে পারে না। বলে রাখছি, কারণ নাস্তিকতা গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারা; বাংলাদেশের বদ্ধ উন্মাদ ও চরম উস্কানিমূলক অশ্লীল ও গণবিরোধী লেখালিখির সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নাই। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা চরম বিকৃত, উস্কানিমূলক এবং দাঙ্গাবাজ নাস্তিক ও নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হবার এটাই প্রধান কারণ। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের নাস্তিক্যবাদ বিরোধিতাকে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই বুঝতে হবে। মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক আমার দেশ-এর ভূমিকা বুঝতে হলে এই বাস্তবতাকেও পরিষ্কার মনে রাখতে হবে।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় মাহমুদ রহমান বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বেগম খালেদা জিয়ার জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন। আওয়ামি ঘরানার লোকজন তাঁকে নিছক দলীয় কারনেই অপছন্দ করে। পরাশক্তির প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা সুশীল সমাজের যে রাজনৈতিক ধারা তিনি তার বিরোধী। ফলে সুশীল সমাজের কাছেও তিনি গ্রহণযোগ্য নন। তিনি সাংবাদিকতায় প্রবেশের পর সংবাদপত্রের জগতে দৈনিক আমার দেশ ভিন্ন কন্ঠস্বর ও সাহসী বক্তব্য নিয়ে খুবই দ্রুত জনগণের ইচ্ছা, আকাংক্ষা ও আশার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছিল। দৈনিক আমার দেশ প্রথাগত সাংবাদিকতার নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। পত্রিকাটির জনপ্রিয়তাও প্রথাগত সাংবাদিকতার ভীতির কারণ হয়ে উঠেছিল। তাই সংবাদপত্র জগতের প্রভাবশালী অংশের কাছে মাহমুদুর রহমান অপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। প্রভাবশালী অংশ বাংলাদেশ অপরিচিত কেউ নয়। বিশেষত ভূমি দস্যু, কালো টাকার মালিক ও বহুজাতিক কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা খুবই প্রকাশ্য এবং পরিচিত। সাংবাদিকতার মানদণ্ড নিয়ে তারা অনেকে মাহমুদুর রহমানের সমালোচনা করে থাকেন, কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তাদের যে খ্যাতি ও প্রতিভা সেই দিকগুলো মনে রাখলে তাদের আপত্তি পাগলের প্রলাপ মনে হয়।

সাংবাদিকতার মানদণ্ড নিয়ে জাতীয় ক্ষেত্রে তর্কবিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু খেয়াল করলেই আমরা বুঝব তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তির জায়গা দুইটা। একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের স্কাইপ কেলেংকারি ফাঁস করে দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারকে দৈনিক আমার দেশ প্রশ্নাত্মক করে তুলেছিল। কিন্তু সেটা নতুন কিছু ছিল না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারের স্টান্ডার্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেই তর্ক জারি ছিল, এখনও জারি রয়েছে। আন্তর্জাতিক আশংকা যে সত্য মাহমুদুর রহমান সেটাই শুধু দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া সামগ্রিক ভাবে বিচার ব্যবস্থার গভীর অসুখ তিনি দৈনিক আমার দেশের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ধরিয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা অনুপস্থিত কারন রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গের হস্তক্ষেপ থেকে বিচার বিভাগ মুক্ত নয়।

তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে থাবা বাবার লেখা প্রকাশ করে দিয়ে তিনি গণজাগরণ মঞ্চ এবং শাহবাগের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মর্ম উদাম করে ছেড়েছিলেন। যাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশের জনগণ তাদের বিচার চেয়েছে। অথচ গণজাগরণ মঞ্চ ও শাহবাগ যে কোন মূল্যে অভিযুক্তদের ফাঁসি দেবার যে রাজনীতি সামনে এনেছে তা তারুণ্যের সজ্ঞান, সচেতন ও গণসংহতিমূলক রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপরায়ন নয়। যে বিচার অতীতের ভার থেকে আমামদের মুক্ত করতে পারত তা আদৌ করেছে কিনা তা শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিতর্কিত। বাংলাদেশ অতীতের ভার থেকে মুক্ত হয় নি। বরং আগামি দিনে নতুন জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরির অনিবার্যতাই তৈরি করে রেখেছে। হিংসা ও প্রতিহিংসার বিষাক্ত বীজই মূলত রোপন করে দিয়ে গিয়েছে। তার পরিণতি কী দাঁড়াবে আমরা এখনও জানি না।

শাহবাগ মূলত প্রকট ফ্যাসিজমের উত্থানপর্ব একথা দৈনিক আমার দেশ স্পষ্ট করেই বলেছিল। এর পেছনে দিল্লির প্রকাশ্য সমর্থন ছিল। দিল্লির হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প – বিশেষত উপমহাদেশ থেকে ইসলাম নির্মূলের হিন্দুত্ববাদী অভিযানের অংশ হিশাবেই শাহবাগ হাজির হয়েছিল। ঠিক, দৈনিক আমার দেশ শাহবাগকে ধসিয়ে দিয়েছে। এই একটি অসম্ভব ঘটনার জন্য দৈনিক আমার দেশ বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বল জ্বল করতে থাকবে। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কারা ক্ষিপ্ত  তাদের জনগণ খুব ভাল ভাবেই চেনে এবং জানে। এই কথা বলার অর্থ এই নয় যে যারা গণজাগরণ মঞ্চে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার চেয়ে কোন ভুল করেছিলেন, কিম্বা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার যে আহ্বানে তাঁরা ছুটে গিয়েছিলেন তাদের আবেগে ও আকাঙ্ক্ষায় কোন দোষ বা খাদ ছিল। কিন্তু আবেগ যখন আমাদের অন্ধ করে ফেলে তখন আমরা অন্যের হাতে জিম্মি হয়ে যাই। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইতিহাসের বড় পরিসরে বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে না পারার অক্ষমতা শাহবাগের উদ্যমকে করুণ পরিণতির গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। এই নির্মম সত্য অনেকে এখনও মানতে রাজি না থাকতে পারেন, কিন্তু ইতিহাসের চাকা কারো জন্য অপেক্ষা করে না। এখন দেখছি, যত দোষ নন্দ ঘোষ হিশাবে মাহমুদুর রহমানের ঘাড়ে চাপিয়ে অনেকে নিজেদের বীরত্ব জাহির করতে চাইছেন। যাদের মাহমুদুর রহমান একাই তাসের ঘরের মতো উড়িয়ে দিলেন তাদের কথাবার্তা হাসির খোরাক হতে পারে; এখন তারা গুণ্ডামি করে তাদের মনের ঝাল মেটাতে চাইছেন বটে, সেটা আর যাই হোক গুণ্ডামিই বটে। বরং গণ জাগরণ মঞ্চ ও শাহবাগের উদ্যমের নির্মোহ পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এখন মাহমুদুর রহমানকে গালি দিয়ে অর্বাচিন জোকার হবার কোন অর্থ হয় না।

আমি বারবার আমার বিভিন্ন লেখায় বলেছি একাত্তর হচ্ছে বিশ্বে নতুন এক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির আবির্ভাব মুহূর্ত। আমরা রক্ত দিয়ে তা অর্জন করেছি। এই মুহূর্ত ও তার অর্জনের সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, বুঝতে হবে। বর্তমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সেটাও যথেষ্ট নয়। বুঝতে হবে তার ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যের জায়গা থেকে। কারণ রাষ্ট্র ও সীমান্ত আজ আছে কাল নাও থাকতে পারে। বোঝাবুঝির এই ক্ষেত্রটিতে আম্মদের ঘাটতি আছে অনেক। এই সকল বাস্তবতা মনে রাখলে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ প্রতিপক্ষরা তোলে ও প্রপাগান্ডা চালায় তাতে অবাক হবার কিছু নাই। ইসলাম ও মুসলমান প্রশ্নে তিনি দৃঢ় ও অবিচল, এটা অবশ্যই সত্য। তিনি ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী ও নাস্তিক্যবাদীদের দুষমণ। সেটা তো দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। এই ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার তিনি উৎখাত চান, এ ব্যাপারে বিন্দু মাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু প্রত্যকটির জন্য তার প্রতিপক্ষরা যতোই তার বিরোধিতা করছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দমন নিপীড়ন জেল জুলুম ও অব্যাহত গুণ্ডামি দিয়ে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে, ততোই তিনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন। কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গনে যে ঘটনা ক্ষমতাসীনরা ঘটালো তাদের তাদের পরাজয়ের ঘন্টাই বেজে উঠেছে। শেষাবধি মাহমুদুর রহমানই জিতে যাচ্ছেন।

সকল লিবারেল ও বৈচারিক নীতি লংঘন করে তাঁকে আদালত অবমাননার জন্য যখন কারাদণ্ড দেওয়া হোল, তখন মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধ্বজাধারীদের ব্যর্থতা আমরা দেখেছি। বিক্ষুব্ধ হবার কোন আইনগত অবস্থান মামলাকারির না থাকা সত্ত্বেও (Status Operandi) তার বিরুদ্ধে বহু মামলা হয়েছে। অথচ আদালতের এই মামলা নেবারই কথা না। কিন্তু শুধু মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিক ভাবে অবিশ্বাস্য বৈচারিক স্বেচ্ছাচার জনগণ দেখছে। মানবাধিকার আর লিবারেল আদর্শের বস্তাপচা বুলি আওড়ানো পরাশক্তির প্রশ্রয়েই এইসব ঘটেছে। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণের আত্মানুসন্ধানের লড়াই ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেই ক্ষেত্রে মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক আমার দেশ-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আগামি দিনে সেটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

দুই

তাহলে এটা আমাদের স্বীকার করতে হচ্ছে ডান বলি বা বাম বলি মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশের প্রচলিত ও প্রথাগত লিবারেল, সেকুলার বা বাম রাজনীতির জন্য খুবই বড় সড় একটি সমস্যা। দিল্লির জন্য তো বটেই। এটা আরও বুঝব যদি মনে রাখি, শুধু লিবারেল, সেকুলার বা বামেরা নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় সকল পরাশক্তি ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক অতি গুরুত্বপূর্ণ পলিটিকাল ক্যাটাগরিটিকে আজও বুঝে উঠতে পারে নি। এই সেই ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠি যারা ভারতের সঙ্গে থাকে নি, আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে লড়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে বিশ্বে নিজের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। এমনকি আহমদ ছফাও এর তাৎপর্য বোঝেন নি। উনিশ শতকী বাঙালি হিন্দুর ‘নবজাগরণ’ বা আধুনিক হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে তিনি তুলনা করে বাঙালি মুসলমানকে হিন্দুর বিপরীতে স্রেফ একটি চেতনা বা আত্মপরিচয় গণ্য করেছেন। দুর্ভাগ্য যে এই চেতনাকে ছফা হীনমন্য গণ্য করেছেন। এর কারন কি?

এর কারণ ‘বাঙালি মুসলমান’ শব্দবন্ধটিকে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বর্গ বা ক্যাটাগরি হিশাবে বিচার ও বিবেচনা করার অক্ষমতা। ছফা ‘বাঙালি মুসলমান’-এর বিরোধী ছিলেন তা নয়। তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণে্র কথাই ভেবেছেন। কিন্তু ‘হিন্দু’, ‘মুসলমান’ ইত্যাদি যে স্রেফ শাশ্বত বা চিরায়ত আত্মপরিচয় নয়, বরং ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া ব্যাপারও বটে এই দিকটি বুঝতেন না। ধরে নেওয়া হয় যে বাঙালি, হিন্দু, মুসলমান ইত্যাদি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রকার সাম্প্রদায়িক কিম্বা জাতিবাদি চেতনা মাত্র; এমনই যে যেন এই চেতনা বা পরিচয় গড়ে ওঠার কোন নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস নাই। যেন, ব্যাপারটা স্রেফ নিজেকে হিন্দু, মুসলমান বা বাঙালি মনে করা বা না করার ব্যাপার। নিতান্তই মানসিক বা আচরণগত সমস্যা। সাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে তৈয়ারি জিনিস। ভুলটা এখানে।

‘বাঙালি মুসলমান’ ধারণাটি তুলনামূলক ভাবে আরও জটিল। সাম্প্রদায়িক বা জাতিবাদী চেতনার উৎস ভাষা ও সংস্কৃতি হোক, কিম্বা হোক ধর্ম তাতে কিছুই আসে যায় না। দুইটাই নিজের পরিচয় ও উপলব্ধি প্রকাশ করবার চিহ্ন। সম্প্রদায় ও পরিচয়বোধ নিজেদের একটি বিশেষ সমাজে অন্তর্ভুক্ত গণ্য করাও বটে। সেই সমাজ অন্য অনেককে বাদ দেয়। আত্মপরিচয়ের রাজনীতির এটাই হোল বিপদের জায়গা। হতে পারে একটি জনগোষ্ঠি ধর্মের মধ্যে নিজের আত্মপরিচয় উপলব্ধি করে, ভাষা ও সংস্কৃতি সেই ক্ষেত্রে গৌণ। তেমনি এমন জনগোষ্ঠিও রয়েছে যাদের কাছে ভাষা ও সংস্কৃতি আগে, তার পর ধর্ম। কিন্তু সাম্প্রদায়িক কিম্বা ভাষিক আত্মপরিচয়কে এই তর্কগুলো ঐতিহাসিক ভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে না।

‘বাঙালি মুসলমান’ ধারণাটিকে সম্প্রদায় বা ভাষিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বোঝার জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ পলিটিকাল ক্যাটাগরি হিশাবে আমাদের ভাবতে শিখতে হবে। বাঙালি মুসলমানের ‘বাঙালিত্ব’ হিন্দু জাতিবাদী বাঙালির ‘বাঙালিত্ব’ না, অতএব বাঙালি জাতিবাদ দিয়ে একে বোঝা সম্ভব না। জার্মানরা নিজেদের একই জাতির অন্তর্হূক্ত গণ্য করে, তাই তারা বিভক্ত হবার পরেও আবাব্র একত্রিত হয়েছে। কোরিয়ানরা এক হতে চায়, কারন ত্র নিজেদ্র এক জাতি মনে করে। কিন্তু ভারতীয় বাঙালি বাঞালি মুসলমানের সঙ্গে এক রাষ্ট্র গঠন করতে চায় না। তারা নিজেদের বাঙালি নয়, ভারতীয় মনে করে।

অন্যদিকে এই জনগোষ্ঠির ‘মুসলমানিত্ব’কে আবার ইরান তুরান আরবের মুসলমানিত্ব দিয়েও বোঝা যাবে না। এই অঞ্চলের জনগণের জাতপাত বিরোধী সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের লড়াইয়ের ইতিহাস বাদ দিয়ে ‘বাঙালি মুসলমান’কে চেনা অসম্ভব। না চেনার আরও কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানের ইতিহাস চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে কৃষকের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। এমন কৃষক যারা কখনই খণ্ডিত বাংলা চায় নি, দেশ বিভাগ চায় নি। কেন চাইবে? তাদের নেতা দুই দুইবার অখণ্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিভাবে অখণ্ড বাংলা ভাঙলো এবং কারা ভাঙলো সেই ইতিহাসের হদিস না নিলে বাঙ্গালি মুসলমান কী জিনিস, বোঝা যাবে না। হদিস নেওয়া তাহলে জরুরি হয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে শুধু চেতনা দিয়ে কিম্বা বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমরা এর মর্মোদ্ধার করতে পারবো না। এটি একটি রাজনৈতিক বর্গ। যার ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর ও সুদূর প্রাসারী। বাঙলি মুসলমানের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য সাম্প্রদায়িকতা কিম্বা সেকুলারদের ভূয়া ও মিথ্যা ইতিহাস দিয়েও বোঝা যাবে না।

ছোট ছোট কিছু তথ্যই নাহয় আপাতত মনে করা যাক। ‘শেরে বাংলা’ বা বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক, সারা বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানের খণ্ডিত বাংলার না। সারা জীবন কৃষক আর শ্রমিকের জন্য লড়েছেন। তিনি সারা বাংলার শিক্ষা মন্ত্রীও ছিলেন, ১৯৩৫ সালে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল এ. কে. ফজলুক হকের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রী পরিষদ গভর্ণর এন্ডারসনের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেরে বাংলা প্রথম বার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর আমলেই দরিদ্র কৃষকের উপরে কর ধার্য না করে সারা বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। “বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ”-এর পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর আবুল কাশেম ফজলুল হক দ্বিতীয় বারের মত মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। বাঙালি মুসলমানের এই ইতিহাস বাঙালি হিন্দুর ইতিহাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে হিন্দু এখন খণ্ডিত বাংলায় হিন্দির আগ্রাসনে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে যেতে বসেছে সে যেমন এই ইতিহাস ভুলেছে, বাংলাদেশের বাঙালিও এই ইতিহাস মনে রাখে নি।

বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সেকুলার ভার্সান হিশাবে যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ দিল্লির আশ্রয়ে, প্রশ্রয়ে ও সমর্থনে পুষ্ট করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ‘বাঙালি মুসলমান’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্যাটাগরি হিশাবে হাজির হতে শুরু করেছে। তার আবির্ভাব ঘটছে আমাদের চোখের সামনে। এটাও ইতিহাসেরই অনিবার্য পরিণতি। বাঙালি মুসলমান বাঙালি, অতএব বাঙালি ও বাংলাভাষীদের ইতিহাস বাদ দিয়ে একে স্রেফ ‘মুসলমান’দের লড়াই হিশাবে বোঝা যাবে না। কিন্তু বাঙালি মুসলমানকে স্রেফ এই রূপেই সাজাতে ও দেখাতে দিল্লি বিশেষ ভাবে আগ্রহী। একই ভাবে আগ্রহী অন্যান্য পরাশক্তিও। উপমহাদেশে এবং সারা বিশ্বে বাঙালি ও বাংলাভাষীদের স্বার্থের প্রশ্ন বাদ দিয়ে স্রেফ অনৈতিহসিক ধর্মতত্ত্ব কিম্বা নির্বিচার মুসলমান পরিচিতি বাঙালি মুসলমানের স্বার্থের অনুকুল নয়।

সব সময় মনে রাখা দরকার বাংলাভাষীদের বিভক্ত রাখার ওপর উপমহাদেশে – বিশেষত এর পূর্বাঞ্চলে সকল পরাশক্তির আধিপত্য বহাল রাখতে পারা নির্ভর করে। দিল্লির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আধিপত্য বহাল রাখার জন্য বৃহৎ বাংলার সকল নিপীড়িত জনগণের লড়াইকে স্রেফ মুসলমান কিম্বা হিন্দুর লড়াইয়ে পর্যবসিত করতে পারা যেমন জরুরি, একই ভাবে এই সাম্প্রদায়িক বিভক্তি মার্কিন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং চিনের আধিপত্য বজায় রাখার জন্যও সমান জরুরি। ইতিহাসের নির্মম প্রহসন যে একটি মফস্বলী রাজ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার ফলে পশ্চিম বাংলার হিন্দু এখনও তাদের খণ্ডিত ভূগোলকে বিশ্ব গণ্য করে। বাঙালি মুসলমানকে ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভাবে বুঝতে না শিখলে বাঙালি হিন্দুর চিন্তা আরও সংকীর্ণতায় আকীর্ণ হবে এবং নিজেরা হিন্দুত্ববাদের অতিশয় প্রান্তসীমায় পর্যবসিত হয়ে ভাষা ও সংস্কৃতিহারা হয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতে বিলীন হবে। ‘বাঙালি মুসলমান’ শব্দটিকে ইতিহাস ও রাজনীতি বিশ্লেষণের বর্গ এবং গোলকায়িত বিশ্বে বাংলাভাষীদের ভূ-রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ধারণের ক্যাটাগরি হিশাবে ভাবতে পারার ওপর সকল বাংলাভাষীর ভবিষ্যৎ নিহিত। একই সঙ্গে সকল নিপীড়িত ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতি সত্তার ভবিষ্যতও এর সঙ্গে ক্রমশ জড়িত হয়ে পড়ছে।

মাহমুদুর রহমান এবং তার রাজনীতির মূল্যায়ন ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক ভূ-রাজনৈতিক ক্যটাগরির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিচারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে যে রাজনীতি তিনি বহন করেন তাকে পর্যালোচনা, মূল্যায়ন ও অগ্রসর করে নেবার পথও কারো বিশেষ জানা নাই। ইতিহাস আমাদের দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়, কিন্তু ইতিহাসকে আমাদের অধীনস্থ করবার নীতি ও কৌশল চর্চার পদ্ধতি ও পথ আলাদা। বাংলাদেশের জনগণকে নতুন ভাবে সেটা আবিষ্কার করতে হবে। ‘বাঙালি মুসলমান’ দক্ষিণ এশিয়ায় জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সে কারণে সকল পরাশক্তির জন্য ‘বাঙালি মুসলমান’ ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিশাবেই হাজির হতে বাধ্য। কারণ প্রায় সতেরো কোটি বাঙালি মুসলমান হোসেনশাহের বাংলার স্মৃতি ধারণ করে, মার্কিন-ব্রিটিশ ও ভারতের সাজানো খণ্ডিত বাংলা না। কিম্বা ‘ভারত’ নামক কলোনিয়াল ইংরেজের টানা সীমানা ও মিথ দিয়ে তৈয়ারি মানচিত্রের মিথ্যা তাদের একাত্তর সালেই জানা হয়ে গিয়েছে। বাঙালি মুসলমান একাত্তরে পাকিস্তানবাদের কবর দিয়েছে, পাকিস্তানের মানচিত্রকে হাস্যকর প্রমাণ করে ছেড়েছে, ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের পতন ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের নতুন ঐক্য ও সংহতির শর্ত তৈরির জন্যই বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটেছে। সেটা বাংলাদেশের ষোল কোটি জনগণের নেতৃত্বেই ঘটবে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আর ফেলানিদের হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে কোন লাভ হবে না। এটা মাহমুদুর রহমানকেও বুঝতে হবে।

ইতিহাসের এই উপলব্ধির জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি মাহমুদুর রহমানকে সবসময় সমর্থন করেছি। রাজনৈতিক ক্যাটাগরি হিশাবে ‘বাঙালি মুসলমান’-এর পর্যালোচনা এবং সঠিক রাজনীতির দিক নির্দেশনা চিহ্নিত করবার দিক থেকে মাহমুদের রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা আছে এবং থাকবে। আমরা কেউ আদৌ বাঁচব কিনা জানি না। আমাদের মেরে ফেলাও হতে পারে। কিন্তু সেটা হবে খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু শুধু ষোল কোটি বাংলাদেশের জনগণ নয়, পুরা উপমহাদেশের নিপীড়িত ও মজলুম জনগণের আত্মোপলব্ধি, ঐক্য ও সংহতির জন্য বাংলাদেশের জনগণকে লড়ে যেতে হবে।

২৪ জুলাই ২০১৮। ৯ শ্রাবণ ১৪২৫। শ্যামলী।

/চিন্তা ডট কম

 

 

১৫০ সিট চায় মাহী, ২০ দলের শরীকরাও চায় ১৫০ সিট! বিএনপির আর নির্বাচন করার দরকার আছে কি?

বি চৌধুরীর বেটা মাহী যখন গত সপ্তাহে বিএনপির কাছে চাইল ১৫০ সিট, এটা নিয়ে চরম সমালোচনা হৈ চৈ চলছিল অনলাইনে। লিখতে চেয়েও সংযত ছিলাম। অপেক্ষা করলাম জোট কি বলে দেখি। আজকে জোট থেকেও ১৫০ সিট চাওয়ার সংবাদ! বেশ! এইবার লেখা যায়।

সেদিনকার দেড়’শর পরে আজকে দেড়’শ চাওয়ার পরে বিএনপি মহাসচিবের কাজ এখন সহজ হয়ে গেলো! তাইলে ১৫০ দিয়ে দেন ঐকজোটকে, ১৫০ দেন ২০ জোটের শরীককে। সেক্ষেত্রে বিএনপির আর নির্বাচন কো লাগবে না! হাত পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাক, উনারা ইলেকশন করে জিতে আসুন! সরকার গঠন করুক!

হায়রে মাহী। তোমাকে তো বাপু নতুন প্রজন্মের প্রতিনিধি ভাবছিলো সবাই, এখন দেখা যাচ্ছে তুমিও চিকনা বুদ্ধিতে কম যাও না। তুমি বিএনপিকে মাইনরিটি বানাইতে চেষ্টা করতেছ! কিন্তু কেনো? তোমার বাপকে প্রেসিডেন্ট থেকে বাদ দিছিলো বিএনপি, তাই বিএনপির কাছে যেনো আর ক্ষমতা না থাকে। এই তো? বেশ! তাইলে একটা কাজ করো ১৫০ সিট দরকার নাই, বিএনপির সাহায্য ছাড়া বাপ বেপা দুইজনে মাত্র দুইটা সিট জিতে আসো দেখি। নৌকা ধানেরশীষ, কুলা তিন প্রতীকের ভোট হবে। কত পারো। যদি জিততে পারো- তোমার বাপরে প্রেসিডেন্ট, আর তোমারে প্রধানমন্ত্রী বানানো যাবে!

শোনো, এটা জাতীয় নির্বাচন। মেডিকেল হাসপাতালে রোগী দেখা না, বা শোবিজ জগতের মেয়েদের নিয়ে নাচানাচিও না। নির্বাচন ক্ষমতা সাংঘাতিক সিরিয়াস বিষয়। যদি মনে করো দেশে গণতন্ত্র দরকার, ভারতীয় আধিপত্যবাদের হাত থেকে দেশ বাঁচাইতে হবে, অবৈধ দখলদার সরকার হাসিনাকে বিদায় করতে হবে – তবে এইসব দেড়শ/দু’শ সিটের বাহানা বাদ দিয়ে খোলা মন নিয়ে সামনে আগায়া আসো। নইলে তোমাদের সামনে তো পুরানা রাস্তা খোলা আছেই- কিস্তিতে উঠে পড়তে পারবা- সমস্যা নাই। দেশ গোল্লারে যাক, জাহান্নামে যাক, নিজেরা কিছু পাইবা তো! মনে করিও না, খালেদা জিয়া জেলে, তাই চামচিকার মত হাতিকে ঝামটা দেয়ার চিন্তা করিও না। মনে রাখিও, নির্বাচন এবং রাজপথ দখল দুটাই বিএনপি কর্মীরা করবে। তোমাদের কার কি সামর্থ আছে, কার পিছে কয়জন আছে, সে হিসাব মোটামুটি জানা।

২০ দলের শরীক জোট ভাইরা। দীর্ঘদিন ধরে জোটে আছেন, তো থাকেন। ইলেকশন হবে কি হবেনা ঠিক নাই! বিএনপি অংশ নিবে কি না, এখনও শিওর না। তারপরও আপনার ১৫০ সিট চাইয়া গন্ধ করে ফেলছেন চারদিক! এভাবে করলে হবে? নাকি রিজনেবল সংখ্যায় সিট দাবী করবেন? ১৫০ সিটে আপনারা কি প্রার্থী দিতে পারবেন? নাকি জামানত ফেরত আনতে পারবেন? খামাখা হুজুগে লাফান কেনো? যে কয়টায় জিততে পারবেন, সম্ভাবনা থাকবে, সে কয়টার জন্য চেষ্টা করুন। বেশি লোভ করা ভালো নয়।

আরও কথা আছে। ৩০০ সিটের সংসদ নির্বাচনই শেষ কথা নয়। আগে নির্বাচনে জিতে সরকার গঠন করতে হবে। দেশের জঞ্জাল সাফ করতে হবে। তারপরে সংসদের আরেকটা উচ্চ কক্ষ (সিনেট) বানানোর কথা, যাতে ১০০ জনকে একমোডেট করা যাবে। সংসদের ৩০০ আসনকে ৫০০ করা হতেও পারে। আপনাদের যারা ভোটে আসতে পারেন না, তাদের জন্য সেখানেও যায়গা হতে পারে। তাই এখনি অধৈয্য না হয়ে সবার আগে সংসদ নির্বাচন কেমন করে টু-থার্ড মেজরিট পাওয়া যায়, সে চেষ্টা ফিকির করুন। নইলে দেড়শ- দেড়শ যতই তিন’শ গুনে রাতকে সকাল করেন না কেনো- ক্ষমতা কেবল স্বপ্নই থেকে যাবে।

/ফেসবুক

হাতুড়ি দিয়ে পেটালেন কেন? দায় কার?

আসিফ নজরুল

বাংলাদেশে রাজনৈতিক সংকট অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে গভীর

আলী রীয়াজ

বাংলাদেশে এবারের সংকট অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে ভিন্ন এবং আরো গভীর মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের অধ্যাপক আলী রীয়াজ। অতীতে বাংলাদেশ যত ধরনের রাজনৈতিক সংকট বা অনিশ্চয়তার মোকাবিলা করেছে এখনকার রাজনৈতিক পরিস্থিতির আপাতত মিল থাকলেও এবারের সংকট আরও গভীর। গতকাল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিরাজুল ইসলাম লেকচার হলে অনুষ্ঠিত ‘বাংলাদেশের রাজনীতির ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি’- শীর্ষক গণবক্তৃতায় এসব কথা বলেন তিনি। রিডিং ক্লাব ট্রাস্ট ও জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন যৌথভাবে এ বক্তৃতার আয়োজন করে। অনুষ্ঠানের সভাপতিত্ব করেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন যে অবস্থা দেখা যাচ্ছে তা আসলে হাইব্রিড রেজিম বা দো-আঁশলা ব্যবস্থা।

এ ব্যবস্থায় দৃশ্যত গণতন্ত্রের কিছু কিছু উপাদান থাকলেও সেগুলো প্রধানত শক্তি প্রয়োগের ওপরে নির্ভর করে। ফলে রাষ্ট্রের নিপীড়ক যন্ত্রগুলো আগের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি ক্ষমতাশালী হয়ে ওঠে এবং তাঁদেরকে একধরনের দায়মুক্তি দেয়া হয়। তিনি বলেন, বর্তমানে পৃথিবীর ১৬৭টি দেশের মধ্যে ৩৭টি দেশের অবস্থাই এই রকম। ১৯৯০-এর দশকে গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে কিছু দেশ এই ধরনের ব্যবস্থায় উপনীত হলে অনেকেই মনে করেছিলেন যে এই ধরনের দেশগুলো সম্ভবত আস্তে আস্তে গণতন্ত্রের দিকেই অগ্রসর হবে। কিন্তু গত দুই দশকের অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, হাইব্রিড রেজিমের পরিবর্তনের পথরেখা গণতন্ত্র অভিমুখী নয়, বরঞ্চ কর্তৃত্ববাদের দিকেই। তিনি আরো বলেন, যে কোনো হাইব্রিড রেজিমকে টিকে থাকার জন্যে নির্বাচন, নির্বাহী ও আইন সভা এবং বিচার ব্যবস্থার ওপরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার দরকার হয়। শেষ তিনটি প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র তৈরি হয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দুই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের উপস্থিতি এবং ক্ষমতার হাত বদলের মধ্য দিয়ে নির্বাচন একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এই কারণে যে ক্ষমতাসীনদের কাজের বৈধতা তৈরি হয় একমাত্র নির্বাচনে বিজয়ের মধ্য দিয়েই, সেই নির্বাচন অবাধ এবং নিরপেক্ষ হলো কিনা সেটা আর বিবেচ্য থাকে না। অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, যেহেতু নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর ক্ষমতাসীনদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেহেতু আর সব ধরনের জবাবদিহির ব্যবস্থা চূর্ণ করে ফেলাই হচ্ছে ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ করার উপায়। বাংলাদেশের সমাজে অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি, সহিংসতার ব্যাপক বিস্তারের যে সব ঘটনা আমরা প্রত্যক্ষ করেছি তা আগামীতে আরো বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি এখানেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক সংকটের কারণ এবং রাজনীতির ভবিষ্যৎ পথরেখা চিহ্নিত করতে গিয়ে বক্তা বিরাজমান শাসনের ধরন নিরূপণের পাশাপাশি সমাজ-রাজনীতিতে নতুন শ্রেণিবিন্যাসের প্রতিক্রিয়া, ইসলামপন্থিদের প্রভাব এবং ভারতের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেছেন। তিনি বলেন, গত কয়েক দশকে যে সব দেশে এই ধরণের হাইব্রিড রেজিম তৈরি হয়েছে সেখানে এক ধরনের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে। বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। এই ‘উন্নয়নে’র ফলে নতুন এক মধ্যবিত্ত শ্রেণির সৃষ্টি হয়েছে যাদের মধ্যে অতীতের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মতো গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষা এবং অংশগ্রহণমূলক সমাজের স্বপ্ন অনুপস্থিত। এই শ্রেণিী যে বিরাজমান হাইব্রিড রেজিমের রাজনৈতিক এজেন্ডার পক্ষে থাকবেন সেটাই স্বাভাবিক, কারণ তাঁদের অস্তিত্ব কার্যত নির্ভর করছে এই ব্যবস্থা অব্যাহত থাকার সঙ্গে। এ নতুন শ্রেণি দেশের অর্থনীতিতে বিরাজমান দুর্নীতি এবং লুণ্ঠনের প্রক্রিয়াকে ভবিষ্যতে বৈধতা প্রদানের হাতিয়ার হবে। অনুষ্ঠানের সভাপতি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রওনক জাহান। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান সমস্যা শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের অভাব। রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়নি এবং তা ব্যক্তিনির্ভর। ফলে এসব প্রতিষ্ঠান আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সহায়ক না হয়ে প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণে দেশের মানুষ নিরাপত্তাহীনতা, অধিকারহীনতায় ভুগছেন। এ সমস্যার প্রতিকারের উপায় অনুসন্ধান করা জরুরি এবং তা করতে হবে তরুণদের।

/মানবজমিন

“ম্যায় রাজা বনুঙা!”

শামসুল আলম
______________
নো! মিস্টার জেনারেল, আপনি এখন সত্য বলছেন না। আপনি একটা মিথ্যুক। রাজনীতিকদের দোষ দিয়ে আপনি এখন নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করতেছেন? কেনো? কিসের ভয় আপনার? আপনি সত্যি যদি কোনো মিলিটারী জেনারেল হয়ে থাকেন, তাহলে বাপের ব্যাটার মত সত্যটি বলতে পারতেন- “হ্যা, আমি রাজা হতে চেয়েছিলাম!”–“কিংস পার্টি গঠন করে করে বেসিক ডেমোক্রেসির মত ইনডাইরেক্ট নির্বাচন করে আমি প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি।” তখন আপনার শিষ্য বারীর পরামর্শে আজহার আলী সরকার ‘দৈনিক আমাদের সময়’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি হতে চান জেনারেল মইন!” একই কথা ব্রিগেডিয়ার বারীও বলেছিলেন বিএনপির কয়েকজন এমপিকে! দেশের তৎকালীন মিডিয়াতে এ সংক্রান্ত বহু প্রমান রয়ে গেছে।
 
বিষয়টি নিয়ে মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর এবারের ঈদ বিশেষ সংখ্যায় ১/১১ শিরোনামে ২২ পৃষ্ঠার এক বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন, যার মধ্যে ঐ ঘটনার কুশীলবদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। যার প্রেক্ষিতে এ লেখাটি লিখতে হলো।
 
জেনারেল সাহেব। এখন ইনিয়ে বিনিয়ে আপনি যতই বলুন না কেনো- তখন দেশের পরিস্থিতি খারাপ ছিল, হরতাল ধর্মঘট ছিল, রাস্তায় মারামারি ছিল, মানুষ কষ্টে ছিল, তাই আপনি দেশ উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু আপনি ঐ অঘটনের অন্তর্নিহিত সত্যটি প্রকাশ করছেন না। দেশের পরিস্থিতি খারাপ ছিল এটা সত্য, কিন্তু তাই বলে আপনি সেনাপ্রধান বা ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান ব্রিগেডিয়ার বারী রাষ্ট্রপতিকে চাপ দিয়ে জরুরী অবস্থা জারী করতে পারেন না! ওই কাজ করার কোনো ম্যান্ডেট বা উপযুক্ত ক্ষমতা আপনাদের ছিলনা। তদুপরি আপনারা তা করেছেন। ইলেকশন একপেশে হলেই তাতে ইন্টারফেয়ার করা সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নয়। যদি তাই হতো, তবে ২০১৪ সালের ভুয়া নির্বাচন নিয়ে কেনো কথা বলছেন না, এই ভোটারবিহীন বয়কটের নির্বাচনের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া তো জরুরী অবস্খা জারী করেননি। তার মানে দাড়ায়, আপনি এবং আপনার সাথীরা তখনকার রাজনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে ক্ষমতা দখল করতে গিয়েছিলেন। আপনি এবং বারী দু’জনেই জানিয়েছেন, আপনারা অনেকদিন থেকে সলাপরামর্শ করছেন- জরুরী অবস্থা জারী করতে চান। জেনারেল মাসুদের সাথেও এ বিষয় নিয়ে পরামর্শ করেছেন। কিন্তু বারী ১১ জানুয়ারির আগেই ঘটনা ঘটাতে চাওয়ায় আপনি তাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন- অর্থাৎ উপযুক্ত সময়ে ইন্টারফেয়ার করবেন! তার মানে, আপনারা ১/১১র জন্য পরিস্থিতি তৈরী করেছিলেন, অথবা সুযোগের অপব্যবহার করেছেন! উল্লেখ্য ওয়ান ইলেভেনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে ১০ জানুয়ারী সকাল পৌনে দশটায় হঠাৎ তেজগাঁও, রোকেয়া স্মরণী এবং সাভারে বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায় একযোগে আগুন দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। ভস্মীভূত হয়ে যায় তেজগাঁওয়ের নাসসা গ্রুপ, পদ্মা ফ্যাক্টরী সহ অনেক গার্মেন্টেস। সেই আগুণ লাগানো অর্গানাইজ করা হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার বারীর পরিকল্পনায়। পুরোটাই ছিলো আপনাকে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট সহিংস করা, শিল্পে আগুণ দেয়া ও মানুষ মারার কৌশল!
 
৫ থেকে ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশের ঘটনাবলীর খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ৫ জানুয়ারী মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন করে সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করেন। পরে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরী সেনানিবাসে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করে ১/১১র বিষয়াদি চুড়ান্ত করেন। হাবিব ভিলাতে বিউটেনিসের সাথে আপনার বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারন করেন- আপনি সামরিক শাসন জারী করে রাষ্ট্রপতি হতে চাইলেও বিউটেনিস রাজী না থাকায় জরুরী অবস্থা নিয়েই খুশী থাকতে হয় আপনাকে!
 
চৌধুরী ফজলুল বারীর মত সেনা অফিসার, যাকে মেজর থেকে তুলে বিএনপি অকালে ব্রিগেডিয়ার বানায়, ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত ডিজির দায়িত্ব পালন করেও বারী যখন প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে মন্তব্যে “দেশের মানুষরে পাছায় লাত্থি দিয়া” জাতীয় শব্দ প্রয়োগ করেন, তখন ভাবনা হয়, এ কি কোনো সেনা অফিসার, নাকি রাস্তার মস্তান? জনগন ও রাজনীতিকদের নিয়ে এ জাতীয় অবমাননাকর শব্দ প্রয়োগ বড়ই আনপ্রফেশনাল এবং অসভ্যতা! ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবে গোয়েন্দা বিষয়সমুহ নিয়ে বারী অবহিত করবেন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান ড. ইয়াজউদ্দিনকে। ওটাই তার কাজ। অথচ তিনি সেটা না করে ডাইনে বামে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন, রাষ্ট্রের গোপন তথ্যাদি শেয়ার করেছেন আপনার ভাই টিপু সহ আরও বহু জনের কাছে। এমন কিছু ঘটনা আমারও জানা আছে। আপনার কাছে বার বার ছুটে গিয়ে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছিলেন বারী! বারীর ভাষায়- “আমি বারে বারে ইনসিস্ট করলাম”, “মেকানিজম যা করার করা হইল”–তিনি নিজেই বলে দিচ্ছেন সবকিছু করা হয়েছে মোকানিজম করে! Who he was to insist? এসব কাজ মারাত্মক আনপ্রফেশনাল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল।
 
ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হয়ে বারী ঘনঘন আপনার কাছে গিয়ে ফুসুর ফাসুর করতো কেনো? ওটা ছিল ষড়যন্ত্র! কোনো অবস্খাতেই তিনি ঐসব করতে পারেন না। প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেশের অবস্থা রিপোর্ট করার বদলে তিনি আপনার কাছে কেনো ফন্দি আঁটতে যেতেন কেনো? সেনাপ্রধান তো তার বস ছিল না। ১১ জানুয়ারি দুপুরে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের সভাপতিত্বে বঙ্গভবনে আইন শৃঙ্খলার মিটিংয়ে বারী যোগ দিতে গেলেন, অথচ তার পকেটে ছিল জরুরী অবস্থার কাগজ! এরপরে কি আর বলার কোনো দরকার আছে যে- “আমরা করি নাই, যা করার ইয়াজউদ্দিন করছে”? কত বড় বেইমান ও মোনাফিক হলে এসব করা সম্ভব- কল্পনা করা যায়! ঐসময় আপনার অফিস থেকে আপনি ফোন করে বারীকে বলেন- “আমি আসতেছি, তুমি থাইকো!”
 
সেদিন বঙ্গভবনে আপনার কোনো এপয়েন্টমেন্ট ছিল না, অথচ এমএসপি মেজর জেনারেল আমিনুল করিমের সঙ্গে লাইন করে বঙ্গভবনের গেট থেকে পিজিআর সরিয়ে দিয়ে আপনি এবং আপনার বাহিনী অনুপ্রবেশ (invade) করিয়েছিলেন। পিজিআর প্রধান ব্রিগেডিয়ার আবু সোয়াহেল যখন আপনাকে বঙ্গভবনের গেটে আটকে দেয়, তখনই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে আপনি কর্নেল এমদাদকে নির্দেশ দিয়ে পিজিআর সরিয়ে ভেতরে ঢোকেন, সেই এমদাদকেও পরে বিডিআরে পাঠিয়ে পিলখানায় হত্যা করা হয়!
 
যাই হোক, বঙ্গভবন নিয়ে ষড়যন্ত্রটা ছিল খুব পরিস্কার। আপনারা যখন রাষ্ট্রপতিকে আটকে ফেললেন, তখন আপনিসহ তিনজন সশস্ত্র অবস্থায় ছিলেন। তারপরে রাষ্ট্রপতিকে চাপ দিয়ে জরুরী অবস্খার কাগজে সই করালেন আপনি! রাষ্ট্রপতির কক্ষে সশস্ত্র অবস্থায় যাওয়ার এখতিয়ার কি ছিল আপনাদের? মোটকথা, আপনারা রাষ্ট্রপতিকে ভয় দেখিয়েছিলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার বারী পকেট থেকে বের করেছিল প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগপত্র, জরুরী অবস্খা জারীর আদেশ, রুলস, ও রাষ্ট্রপতির ভাষণের ড্রাফট। এর মানে যা দাড়ায়, ক্ষমতা দখলের সকল প্রস্তুতি নিয়েই বঙ্গভবনে অনুপ্রবেশ করেছিলেন আপনারা! আপনার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা দখল করা, এবং সেজন্য মার্শাল জারী করতে না পেরে জরুরী অবস্থা দিয়েই ধরপাকড়, নির্যাতন, সহায় সম্পদ ভাঙচুর করে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি আপনি ডি-ফ্যাক্টো সামরিক রুলার হয়ে বসলেন। প্রথমেই আপনার বাহিনী দুর্নীতি উচ্ছেদের নামে রাজনীতিবিদদের ধরপাকড় শুরু করে। সারাদেশে চলে অবৈধ হাট-বাজার আর বস্তি উচ্ছেদ অভিযান। অন্যদিকে তাদের টার্গেট ছিল দেশের সকল অঞ্চলের সব শ্রেণীর ব্যবসায়ী। তাদের শিকার হন রাজধানী ও মফস্বলের উঁচু ও নিচু পর্যায়ের সব রাজনৈতিক নেতাকর্মী। আর ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী- ভেঙে ফেলা হয় যুগ যুগ ধরে চলে আসা গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার। উচ্ছেদ করা হয় শহরের ফুটপাতের হকারদের। উপড়ে ফেলা হয় বহু বস্তি ও উপশহর। কর্মহীন, গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। অসহায় হয়ে যায় অসংখ্য পরিবার। দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে হু হু করে। সাধারণমানের চালের কেজি ৪০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। মনে কি পড়ে সেসব?
 
জেনারেল মইন। আপনি এখন বাটে পড়ে দাবী করছেন, জাতিসংঘ মহাসচিব নাকি আপনাকে ‘ড্রাফট চিঠি’ পঠিয়ে শান্তিরক্ষী বাহিনী থেকে বাংলাদেশের সৈনিকদের বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন? কিন্তু জেনারেল সাহেব, ওই ড্রাফট পত্রের গল্পটি যে স্রেফ আপনার বানোয়াট, তা স্বীকার করতে দ্বিধা কেনো? জাতিসংঘ আপনাকে ‘ড্রাফট পত্র’ পাঠাতে যাবে কেনো? চাইলে তারা ফরমাল চিঠিই পাঠাতে পারতেন। আর ইউ টকিং লাইক এন ইডিয়েট? জাতিসংঘের তৎকালীন ঢাকাস্থ প্রতিনিধি রেনাটা ২০১০ সালে সাক্ষাৎকার দিয়ে পরিষ্কার বলেছেন, ঐরূপ কোনো চিঠি জাতিসংঘ থেকে পাঠায়নি। তাছাড়া সাবেক আইজিপি খোদাবক্স জাতিসংঘের কর্মকর্তার সাথে পরে কনফার্ম হয়েছেন, জাতিসংঘ ঐরূপ কোনো চিঠি পাঠায়নি। অর্থাৎ আপনি জাতিসংঘের নামে বানোয়াট চিঠির গল্প বলে রাষ্ট্রপতি ইয়াউদ্দিনকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, মিষ্টার মইন। স্বীকার করুন।
 
জেনারেল সাহেব, এখন আপনি যতই বলছেন- আমরা কিছু করিনি, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সব করেছেন, আসলে তা সত্যি নয়। এসএসএফের সহায়তায় রাষ্ট্রপতিকে তখন প্রায় বন্দী করে রেখেছিলেন আপনারা, এটা রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্টজনরা আমাকে বলেছেন। ঐ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির উপর জোর প্রয়োগ করে জরুরী অবস্থার কাগজে সই নিয়ে সকল দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসেছিলেন আপনি! সেদিন বিনা রক্তপাতে বঙ্গভবন দখল করতে আপনার নেতৃত্বে কয়েক’শ সেনাকর্মকর্তা ভিতরে এবং বাইরে অবস্থান নিয়েছিল। বঙ্গভবনের ভেতরে ও বাইরে এ সময় যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতির বেডরুমের বাইরেও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে সেনা কর্মকর্তা দন্ডায়মান ছিল। আপনার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ সাভার সেনানিবাস হতে শত শত সৈন্য নিয়ে ট্যাংক সহ ভারী অস্ত্র সহ হাজির হন বঙ্গভবনে। ট্যাংকবাহিনীর উপস্থিতির আগ পর্যন্ত আপনার কথামত সাক্ষর করতে রাজী হননি রাষ্ট্রপতি। তিনি যখন দেখলেন- জেনারেল মাসুদও আপনার সাথে হাত মিলিয়েছে, তখন বয়োবৃদ্ধ রাষ্ট্রপতি নিরুপায় হয়ে আপনার নির্দেশমত কাগজপত্রে সাক্ষর করেন! এ প্রসঙ্গে আপনার লেখা নিজের উক্তি, “আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো না, আমি যা করতে যাচ্ছি তাতে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি বিদ্যমান। কিন্তু দেশ ও সেনাবাহিনীর প্রশ্নে আমি সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হয়ে উঠলাম।”—-“কিন্তু আমি তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, পরিস্থিতি যাই হোক, যতো ঝুঁকিপূর্ণ হোক, আমি আমার চেষ্টা করবো।” এ সময় রাষ্ট্রপতি তাঁর স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চাইলেও আপনি সে অনুমতি দেননি। কেননা আপনি জানতেন বার বার ব্যর্থ হবার পরে এবারে ব্যর্থ হলে নির্ঘাত মৃত্যু। মনে কি পড়ে- ২০০৭ সালের ২ এপ্রিল হোটেল শেরাটনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে কে যেনো ঘোষণা করেছিল- ‘অউন ব্রান্ড ডেমোক্রেসি’ চালু করব? সেটাই কি আপনি? দেশে কেমন গণতন্ত্র থাকবে- সেটা ঠিক করার আপনি কে ছিলেন?
 
ড. ইউনুসকে চীফ এডভাইজার বানাতে চেয়েছিলেন আপনি এবং আপনার জেনারেলরা, তিনি রাজী নয় হওয়ায়ে পরে ফখরুদ্দিনকে বানিয়েছিলেন কোন্ সাংবিধানিক ক্ষমতায়? আপনাদের সে ক্ষমতা দিয়েছিল কে? সংবিধান, নাকি জনগন? কেউ দেয়নি, অথচ ঐ অপকর্ম করে আপনারা সংবিধান লংঘন করেছিলেন। কারন সংবিধান অনুসারে- কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে চীফ এডভাইজার করতে হলে রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সেটা কি করা হয়েছিল? না। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল বলতে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল অর্থাৎ বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জামায়াত, জাপা ইত্যাদি। তাদের সাথে রাষ্ট্রপতি অফিসিয়াল পরামর্শ ছাড়া কেবল আপনাদের কথায় ফখরুদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারেন না। অথচ সে কান্ডটাই হয়েছে! আপনি এবং বারী বলছেন, আপনারা এডভাইজার ঠিক করেছেন, কারও কারও নাম উঠেছে, আবার বাদও দিয়েছিলেন আপনারাই! কি ক্ষমতা!!! আপনাদিগকে এসব করার ক্ষমতা কে দিয়েছিল? মোটকথা ফখরুদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন আপনারা কয়েকজন জেনারেল। আপনাদের সেই অধিকার ও ক্ষমতা সংবিধান দেয়নি। তাই ফখরুদ্দিনের নিয়োগ এবং তার সকল কর্মকান্ড অসাংবিধানিক। একদিন না একদিন এটা অবৈধ ঘোষণা করবে উচ্চ আদালত। সময় আসলে এনিয়ে আমিই রীট করতে চাই। দেখা গেছে, জরুরী সরকারের সময়ে বিদেশ থেকে আগত মন্ত্রী এবং বিশিষ্টজনরা প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি আপনার সাথেও সাক্ষাৎ করতে বাধ্য হতো! মিস্টার জেনারেল, বলুন তো- এদেরকে আপনার কাছে কেনো পাঠাতো ফরেন অফিস? কারন, আপনি তখন ডিফ্যাক্টো রাষ্ট্রপতি হয়ে দেশ চালাচ্ছিলেন, এটাই সত্য। ফখরুদ্দিন এবং তার উপদেষ্টারা আপনার হুকুমে চলত। উপদেষ্টা পরিষদের মিটিংয়ে হঠাৎ ঢুকে আপনি এটা সেটা নির্দেশও দিতেন। এসব কি সেনাপ্রধানের কাজের মধ্যে পড়ে? জরুরী অবস্থা হলেও সেনাপ্রধান তা করতে পারেন না। অথচ আপনি ঐসব কান্ড করেছিলেন!!
 
২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আপনি ভারতে গেলেন পূর্নভাবে ক্ষমতায় বসার এজাজত আনতে- অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হতে। তাদের সমর্থন পেলেন না। উল্টো, তারা আপনাকে বললো- তাদের সমর্থনপুষ্ঠ দলের হাতে (অর্থাৎ আ’লীগের কাছে) ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। ( এর ঠিক এক বছর পরে সেই ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটানো হয় পিলখানা ম্যাসাকার- এটা কি কাকতালীয়, নাকি সুপরিকল্পিত, তা ভেবে দেখা উচিত) এর বিনিময়ে আপনি লাভ করলেন সেইফ এক্সিটের নিশ্চয়তা। তারপরে যা হওয়ার তাই হলো- শেখ হাসিনার সাথে বসুন্ধকার সেইফ হাউজে বসে সবকিছু চুড়ান্ত হলো আপনার। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল আগেই তৈরী করা ছিল। হাসিনাকে দেয়া হলো এমন সংখ্যক সিট, যাতে প্রয়োজনমত সংবিধান সংশোধন করেও প্রতিবেশীর সকল চাহিদা পুরণ করতে পারেন। বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন দেয়া হবেনা- সেটা গোয়েন্দাসূত্র আমাকে জানিয়েছিল ঠিক চার দিন আগে। এভাবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধংস করে দিয়ে হাসিনার কাছে আপনি ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন, আর ভারতের রাডারের মধ্যে বাংলাদেশটাকে ঢুকিয়ে দিলেন আপনি–যেটি পাওয়ার জন্য তারা তিন যুগ ধরে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এভাবে আপনি মস্তবড় রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ সংঘটন করলেন।
 
এতদিন চুপ ছিলাম, এখন কিছু সত্য প্রকাশ করি_____________
আমি সেই শামসুল আলম, যার ফোন পেয়ে ২০০৫ সালের মধ্য জুনের এক বিকেলে আপনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ছুটে এসেছিলেন, অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করার পরে আপনাকে চীফ বানানো হলো, সেকথা আপনার বইতে উল্লেখ করেছেন। আমি বেসামরিক অফিসার হলেও আপনাদের ফৌজি খবরাদি যেভাবেই হোক আমার কানে চলে আসত। আমি হলফ করে বলতে পারি- ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে জামায়াতের কর্মী হত্যার ঘটনার সাথে আপনাদের আগে থেকেই যোগসাজস ছিল। ওই রকম ঘটনা ঘটবে, তা আপনারা আগেই জানতেন, নইলে পরে কি করবেন তার পুর্বপ্রস্তুতি নিয়েছিলেন কেনো? তারও কয়েকমাস আগে থেকে বিএনপির মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের নাম ঠিকানা ছবি সহ তালিকা তৈরী করছিল গোয়েন্দা অফিসাররা- পরে জানা গেলো কাকে কাকে ধরা হবে সেই লিস্ট তৈরী করছিলেন। এমনকি বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের ফোনে আড়ি পেতে তাদের অনিয়ম ও দুর্বল পয়েন্ট ধরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রোফাইল তৈরী করা হয়, যা দিয়ে পরবর্তীতে তাদেরকে হেনস্তা করা হয়, জেল দেয়া হয়! ঐ লিস্ট তৈরীর উপাদান (মন্ত্রি-এমপিদের হালনাগাদ ঠায় ঠিকানা ছবি) সংগ্রহ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমার কাছে দু’দফা সেনা কর্মকর্তা পাঠানো হয়েছিল, যদিও সেটা তারা পায়নি।
 
পল্টন হত্যার পরের দিন ২৯ অক্টোবরেই আপনারা জরুরী অবস্থা জারী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যেকোনো ভাবেই হোক, এ সংক্রান্ত সকল অর্ডারের ড্রাফট ডকুমেন্টগুলি কেবল আমার হাতে জমা করা ছিল। আমাকে বলা হলেও আমি সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হ্যান্ডওভার করিনি, বরং কায়দা করে জরুরী অবস্থা ঘোষণা বন্ধ করতে সক্ষম হই। তদুপরি আপনাদের ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। দ্বিতীয় দফায় চিটাগাঙ পোর্টকে কেন্দ্র করে নভেম্বরের ১৭ তারিখে জরুরী অবস্থা জারীর চেষ্টা করা হয়। সে চেষ্টাও আমি একাই বন্ধ করেছিলাম। তৃতীয় দফায়, ডিসেম্বরের ১০ তারিখে আপনার নির্দেশে সারাদেশে সেনা মোতায়েন করা হয়, যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্রপতির অজ্ঞাতেই তা করা হয়। সেটি ছিল আপনার ফিল্ড প্রস্তুতি! তখন একজন জেনারেল মারফত খবর পেলাম- ২২ জানুয়ারির ইলেকশন বানচাল করা হবে, এবং ১২ জানুয়ারির মধ্যে মার্শাল’ল দিয়ে ক্ষমতা দখল করবেন আপনি; ম্যাডাম জিয়া সহ তাঁর ছেলেদের কারাগারে আটকে বিএনপির কন্ট্রোল নিবেন আপনি। এসব বিষয় ম্যাডামকে জানালেও তিনি ওভারলুক করেন, কারন বারী এবং তাঁর এক আত্মীয় উল্টা বুঝিয়েছিলেন।
 
১/১১ পরে ডিজিএফআই থেকে আমাকে বলা হয়েছিল মান্নান ভু্ঁইয়ার বাসায় যেতে, কিন্তু আমি তাতে রাজী হইনি। অতঃপর কিছুদিন পরে আপনাকে উৎখাতের একটি পরিকল্পনা একজন জেনারেল আমাকে অবহিত করেছিলেন, সে খবরটা আমি যথাস্থানে পৌছে দিয়েছিলাম। পরে সম্ভবত বিএনপির এক সিনিয়র নেতার বেইমানীর কারণে সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ঐ ঘটনার পর থেকেই আমাকে খোঁজা শুরু করে আপনার মেজর সাহেবরা, বাসা রেইড দেয় তিন বার। আগেই টের পেয়ে আমি বাসা ছাড়লাম। কিন্তু আপনারা আর খুঁজে পেলেন না। পরে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, আমাকে ফিনিশ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু রাখে আল্লাহ, মারে কে! আলহামদুলিল্লাহ।
 
জেনারেল সাহেব। ১/১১ দ্বারা বাংলাদেশকে পরাধীন করে, পিলখানা ম্যাসাকার করে আর্মি শেষ করে দিয়ে আপনি বিদেশে পালিয়ে বেঁচে আছেন নির্জনে। তবে মিথ্যার ওপরে বেঁচে আছেন। এভাবে আর কদ্দিন? এই জীবনে তো আর দেশের মাটিতে পা রাখতে পারবেন না। আপনি বাংলাদেশের যে চুড়ান্ত ক্ষতি করেছেন, তার বিচারে আপনার সর্বোচ্চ শাস্তি পাওনা, ভাগ্যে থাকলে সে শাস্তি ভোগ করাও লাগতে পারে। আর যদি তা না হয়, তবে মৃত্যু হবে পাপিষ্ঠের মতন, তখন জনগন আপনার কবরে থু থু দিবে। যদি মানুষ হয়ে থাকেন, তবে সত্য কথা বলুন, কৃত অপরাধ স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চান।

/ফেসবুক

মাথানষ্টের পুত্র যখন উন্মাদ- তখন বিভিন্ন সংজ্ঞা যেমন হয়?

– একেএম ওয়াহিদুজ্জামান

পরীক্ষায় আসতে পারে- নীচের কথাটি কোন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ বলেছে?
“যখন কোন অপরাধী সাধারণত মাদকের প্রভাবে নিজেকে নিজে গুলি করে আত্মহত্যা করে (কখনো কখনো আত্মহত্যার আগে নিজের হাতগুলোতে নিজেই হ্যান্ডকাফ বেঁধে নেয়) তাকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে”।

Which Bangladesh politician said this: “An Extra-judicial Killing is when a criminal, often under the influence of drugs, shoots himself, (sometimes having handcuffed himself first)”?

সজিব ওয়াজেদ জয়ের অভিধান অনুসারে- বাংলাদেশে ‘গুম’ এর ঘটনাগুলো হচ্ছে, “বিচার ও দায়িত্ব এড়ানোর জন্য অপরাধীদের তৈরী করা কল্প-কাহিনী!”

According to Sajeeb Wazed Joy, “enforced disappearances” in Bangladesh are “fictitious attempts by accused criminals to avoid prosecution and accountability.”

বাংলাদেশের বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের অভিধানে থাকা এমন সব আরো অভিনব সব সংজ্ঞা উপভোগ করুন:
————————————————————————————–

Sajeeb Wazed Joy’s dictionary of new political terms
–  

Sajeeb Wazed Joy, the son of Bangladesh’s prime minister has recently published not onebut two extraordinary articles which not only denies that the country’s law enforcement authorities are involved in enforced disappearances – the picking up, secretly detaining and often killing of men in Bangladesh – but also that the police investigate every single one of these disappearances and found no evidence of state involvement.

In fact, not only is there overwhelming eye-witness evidence that law enforcement and intelligence agencies including Rapid Action Battallion, the Detective Branch of the Police and DGFI are involved in picking these men up (over 400 since the government came to power) and that in some of these cases, but also new evidence that the prime minister herself – Sajeeb’s mother – has personally authorised some disappearances including that of one person whose whereabouts, 20 months after his pick-up, remains unknown. Moreover, far from the investigating disappearances, the Bangladesh police don’t even allow most families to report them. To read a response to Joy’s articles see here.

In his articles, Joy defines “enforced disappearances” as

“fictitious attempts by accused criminals to avoid prosecution and accountability.”

Bangladesh Politico has now got its hands on a few pages from Joy’s new dictionary of Bangladesh political terminology – and we can for the first time publish some more definitions.

  • Awami League – the only legitimate political party in Bangladesh;
  • Caretaker government – a mechanism of ensuring more fair elections in Bangladesh which had to be stopped as it risked allowing the election of a party other than the Awami League;
  • Corruption – thievery, larceny and kleptocracy solely conducted by the opposition Bangladesh Nationalist Party and other parties that support it;
  • Democracy – When elections results in the victory of a party led by Sheikh Hasina;
  • Election Commission – a group of trustworthy and incorruptible administrators who say and do exactly what the Awami League asks it to say and do;
  • Extra-judicial killing – when a criminal, often under the influence of drugs, shoots himself, (sometimes having handcuffed himself first);
  • Freedom of Speech – freedom to speak about the greatness of the Awami League, its current leader and her family members;
  • Freedom of Assembly – a freedom that prevents members of the opposition parties from congregating and speaking against the Awami League;
  • International Crimes Tribunal – a process which complies with all standards of a fair trial, other than the ones that could allow the accused to properly defend themselves;
  • ISIS – a group that exists in every country other than Bangladesh;
  • Police investigation – an inquiry which results in a finding that a crime was committed by a leader, activist, member or supporter of the Bangladesh Nationalist Party and other opposition parties and concludes that no member of the governing party was involved;
  • Terrorism – any activity conducted primarily by the opposition political parties.

১০ আওয়ামী দলকানা বুদ্ধিজীবির চোখে মাদক বিরোধী অভিযানে হত্যা ‘প্রত্যাশিত’ এবং ‘যৌক্তিক’!

১০ ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ বিবৃতি দিয়ে জানাচ্ছে-

১/ “সারা দেশে যে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে (বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা), তার ‘যৌক্তিকতা’ তারা অনুধাবন করে!”

২/ “সংগত কারণে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও এই অভিযানে (বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা) প্রত্যাশিত ছিল।”

৩/ “টেকনাফে নিহত পৌর কমিশনার একরামের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পূর্ব অভিযোগের কথা জানা যায়নি।” (যেন পূর্ব অভিযোগ জানা থাকলে এই হত্যার ‘যৌক্তিকতা’ থাকতো! তাছাড়া, অন্ততপক্ষে দুইটি টিভি চ্যানেল কয়েক বছর আগেই নিহত একরামকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।)

৪/ “তাঁর (একরামের) পরিবার সংবাদ সম্মেলন করে হত্যা-পূর্ব ফোনালাপ সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেছেন, যা কোনো ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ ও সমাজে অকল্পনীয়। এ রকম ‘একটি ঘটনাই’ সমগ্র ‘অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ’ ও জনগণকে আতঙ্কিত করতে যথেষ্ট।” (তার মানে, এই ফোনালাপ প্রকাশ না পেলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বিনা বিচারে হত্যা করা ‘যৌক্তিক’ এবং ‘প্রত্যাশিত’ই থাকতো!)

গত ১৪ মে থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০/১২জন করে মানুষকে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে; একরামের আগেই খুন হয়েছে আরো ১২৩জন। তখন পর্যন্ত এই ‘বিশিষ্ট নাগরিক’দের কাছে বাংলাদেশ ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ’ ছিল! এদের সমর্থিত সরকারের গত দশ বছরের শাসনামলে ৫’শতাধিক গুম আর ১৫ শতাধিক বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও এদের কাছে ‘যৌক্তিক’ এবং ‘প্রত্যাশিত’ই ছিলো!

অপ্রত্যাশিত ঘটনা হয়ে গেছে- একরাম হত্যার অডিও প্রকাশিত হয়ে যাওয়ায়!

এই বুড়ো শকুনগুলো এই কথা স্পষ্ট করে বলতে পারেনা যে, একরাম মাদক ব্যবসায়ী হলেও তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিনা বিচারে হত্যা করতে পারে না; কাউকেই পারে না।

এই বুড়ো শকুনদের বিবেকের দেখা মেলে তাদের দৃষ্টিতে কোন ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত’ হলে। তখন এরা মুরিদদের সাথে নিয়ে নিজেদের কানে ধরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। এদের মুরিদরা ‘এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না’ লিখে চেতনামাখা স্ট্যাটাস দেয়। তারপর আরো হত্যা-গুমের ধারাবাহিক ঘটনা ঘটে, ছাত্রলীগের হাতে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে, তখন আর এদের দেখা পাওয়া যায় না!

কাজেই এইসব সিজনাল এবং সিলেক্টিভ ঘটনার প্রতিবাদী ধান্দাবাজদের থেকে সতর্ক থাকুন। এরা-
যেভাবে এরা এক রেশমাকে উদ্ধারের নাটক দেখিয়ে রানা প্লাজায় ১২’শ নিহতের ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়েছে আর রেশমাকে ফাইভস্টার হোটেলে চাকরি দিয়ে দেড় হাজার পঙ্গুকে পূনর্বাসিত না করার ও রানা প্লাজার ভিক্টিমদের জন্য আশা ১০৯ কোটি টাকা চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে সাহায্য করেছে, যেভাবে এরা শ্যামল কান্তি ভক্তের ঘটনায় ‘কানে ধরা প্রতিবাদ’ করে ছাত্রলীগের হাতে দেশের শত শত শিক্ষক লঞ্ছনার ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই এরা এক একরামের ঘটনার প্রতিবাদ করে দেড় হাজার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং একরামের পরিবারতে গণভবনে নিয়ে ফটোসেশন করিয়ে সকল বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভিক্টিমের পরিবারের বঞ্চনাকে ধামাচাপা দিতে চাইছে।

কুমিরের চোখে পানি দেখলে আবেগ প্রবণ হওয়া বোকামি।

/ফেসবুক/ একেএম ওয়াহিদুজ্জামান

পাসপোর্ট-নাগরিকত্ব সমাচার~

।। শামসুল আলম।।
 
এই মুহুর্তে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ব্যক্তির নাম তারেক রহমান। তিনি বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন। লন্ডনপ্রবাসী। বাংলাদেশের বর্তমান বিনাভোটের সরকারের প্রধান থেকে শুরু করে তাদের প্রায় সব মন্ত্রী নেতা খেতাদের মুখে একটিই শব্দ- তারেক রহমান! তারেক রহমানকে দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তি হিসাবে প্রচার করছে সরকারের মিডিয়া এবং প্রচার যন্ত্র!
 
সরকারের লোকেরা বলছে- তারেক রহমানকে যেকোনো মূল্যে লন্ডন থেকে ফিরিয়ে আনবেন শেখ হাসিনা। এনে দন্ড কার্যকর করবেন! বেশ তো আনতে পারলে আনুন….সেটা না করে খামাখা বক বক করেছেন কেনো? উনার রেটিং বাড়িয়ে দিচ্ছেন কেনো? এর কারণ হিসাবে অনলাইন সূত্র জানা গেছে, সপ্তাহখানেক আগে কমনওয়েলথ সম্মেলনে যোগ দিতে লন্ডন গিয়ে বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেখানকার বাংলাদেশীদের হাতে এমন নাকানি চুবানি খেয়েছেন, সর্বত্র এমন প্রতিবাদ প্রতিরোধের সম্মুখীণ হয়েছেন যা আগেকার সকল রেকর্ড ভেঙ্গেছে! এরফলে কোনো ভেনুতে তিনি সামনের দরজা দিয়ে যেতে পারেননি, সব যায়গায় পেছনের দরজা ব্যবহার করতে হয়েছে! লন্ডন শহরে ভ্রাম্যমান (মোবাইল) বিলবোর্ডের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে খুনি, গণতন্ত্র হত্যাকারী, স্বৈরাচার হিসাবে তুলে ধরে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবী করা হয়েছে। নতুন ধরনের এই প্রতিবাদ দেখে সবাই চমকিত হয়েছে! সম্মেলনে আগত বিদেশীরা এবং লন্ডনবাসীরা বাংলাদেশ এবং হাসিনা সম্পর্কে ধারণা লাভ করেছে, আগ্রহী হয়েছেন। এসব কারনে শেখ হাসিনা বিএনপি এবং তারেক রহমানের উপর যারপরনাই বিরক্ত ও রাগান্বিত হয়ে বৃটেন সরকারের দ্বারস্থ হন- তারেক রহমানকে ফিরিয়ে দিন। কিন্তু তারেক রহমান সেখানে আইনানুগভাবে ভালোভাবেই আছেন, হাসিনার কথায় তাকে ফিরিয়ে দেয়ার কোনো সুযোগ নাই জেনে শেখ হাসিনা আরও বিরক্ত হয়ে অন্তত দু’টি পাবলিক অনুষ্ঠানে তারেক রহমানকে বাপ মা তুলে গালিগালাজ, হুঙ্কার এবং ধরে নিয়ে দন্ড কার্যকর করা হবে এমন খিস্তিখেউড় করলেন। এমনকি লন্ডনে বিএনপির লোকদের উপর আক্রমন করতে তার দলের লোকদের নির্দেশ দিয়ে তিনি আন্তর্জাতি সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে গেলেন। তবে প্রতিবাদের মাত্রা আরও বাড়ে যখন গতকাল লন্ডন ছাড়ার সময় হোটল থেকে বের হওয়ার মুখে বাংলাদেশীদের ব্যাপকভাবে ডিমবৃষ্টির কবলে পড়তে হয় হাসিনা ও তার দলবলকে। এমনকি লন্ডন পুলিশের বাধা ভেদ করে ডিম ছোড়ার দৃশ্য দেখা যায়!
 
অন্যদিকে তখন বিনাভোটের সরকারের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার প্রকাশ করেন, তারেক রহমানের বাংলাদেশে নাগরিকত্ব নাই! সেই সাথে টিভি স্ক্রলে আসতে থাকে, ‘আওয়ামীলীগ বলছে, পারলে তারেক রহমান পাসপোর্ট দেখাক’, আবার বলা হচ্ছে- ‘তারেক রহমান নাকি তাঁর স্ত্রী ও কন্যার পাসপোর্ট জমা দিয়েছেন ডাকযোগ! তাই উনারা আর বাংলাদেশের নাগরিক নন!’ এদের কে বুঝাবে যে- পাসপোর্ট থাকা না থাকার সাথে নাগরিকত্বের কোন সম্পর্ক নাই। পাসপোর্ট হলো ট্রাভেল ডকুমেন্ট- বিদেশে যেতে এটা লাগে। এয়ারপোর্টে দেখাতে হয়। বাংলাদেশের ৯০ ভাগ লোকের পাসপোর্ট নাই- বানায়নি। তাই বলে কি তাদের নাগরিকত্ব চলে গিয়েছে? যতটুকু জানা গেছে, তারেক রহমানের বাংলাদেশী পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় জমা দিয়েছিলেন পাসপোর্স নবায়ন করতে। কিন্তু হাসিনার অবৈধ সরকার তা নবায়ন না করে এখন ধাপ্পাবাজি করছে! গাধাদের জন্য জ্ঞান হচ্ছে, পাসপোর্টের মেয়াদ থাকে, নাগরিকত্বের কোনো মেয়াদ থাকেনা। এটা আমৃত্যু।
 
পাসপোর্ট নিয়ে যখন কথা উঠলো, তখন জাতি জানতে চায় বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে কোন্ পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এ সম্পর্কে আওয়ামীলীগের কোনো বক্তব্য আছে কি? দেশের মানুষ অনেকেই জানে (এটা প্রথম আমিই প্রকাশ করেছিলাম)- ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি শেখ মুজিব এবং ড. কামাল হোসেন পাকিস্তানের পাসপোর্ট নিয়ে ঢাকায় ফিরেন। কামাল হোসেন এক সাক্ষাৎকারে জানান যে, ৬ জানুয়ারি ১৯৭২ শেখ মুজিব এবং ড. কামাল দু’জনে ছবি তোলেন, পাকিস্তানের পাসপোর্ট ফরম পূরণ করে সই করে নতুন পাসপোর্ট তৈরীর জন্য। অতঃপর নতুন বানানো সেই পাসপোর্ট শেখ মুজিবের নাগরিকত্ব লেখা হয়- Pakistani. ২৫ দিন আগে স্বাধীন বাংলাদেশ মুক্ত হয়, এবং সেটা ঐদিনই জানতে পারেন শেখ মুজিব, তারপরও স্বাধীন বাংলাদেশের মনোনীত রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিব নতুন করে হলেন পাকিস্তানের নাগরিক! এমন চরম দুর্ভাগ্য বোধ হয় বাংলাদেশের ললাটে লেখা ছিল! শেখ সাহেব বাংলাদেশে ফিরেই সাথে সাথে রাষ্ট্রপতির শপথ নিলেন। প্রশ্ন হলো- তার আগে কি তিনি পাকিস্তানের নাগরিকত্ব ত্যাগ করেছিলেন? বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্য পোষণ করেছিলেন? করে থাকলে কবে, কখন? এটি দরকার ছিল এই কারনে যে, শেখ মুজিব এবং ড.কামাল হোসেন বাংলাদেশ জন্মের পরেও পাকিস্তানের (তখনকার শত্রু রাষ্ট্রের) নাগরিকত্ব গ্রহণ/ নবায়ন করেছিলেন (শেখ সাহেবের আত্মীয় জামায়াত নেতা গোলাম আযমও পাকিস্তানের নাগরিত্ব নিয়েছিলেন, পরে সেটা ত্যাগ করে বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের ঘোষণা দিয়েছিলেন)। তাই শেখ মুজিব বা ড. কামাল হোসেন পাকিস্তানের নাগরিকত্ব ত্যাগ না করে এবং বাংলাদেশের প্রতি অনুগত্যের ঘোষণা না দিলে তাঁহারা বাংলাদেশের নাগরিক হইবেন না। তবে কি শেখ মুজিব পাকিস্তানের নাগরিক হিসাবেই বাংলাদেশের রাজত্ব করবেন আমৃত্যু? আওয়ামলীগের সাধারন সম্পাদক বা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী পারলে এর জবাব দিক!
/ ফেসবুক
« Older Entries