Category Archives: গোপন তথ্য

“জিয়া অরফানেজ মামলার ভেতরের কথা”

আমার কৈফিয়ত!
=========
রাজনীতি রাজনীতির যায়গায় থাকা ভালো, এটা সব যায়গায় টানাটানি করা অনুচিত। সত্য এবং মিথ্যা এক জিনিষ নয়। সত্যকে কখনই মিথ্যা বানানো যায় না। মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢাকা যায় না। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট সংক্রান্ত একটি বানোয়াট মামলার রায়ে তিন বারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখন কারান্তরীণ। বর্তমান ক্ষমতাসীন অবৈধ সরকারের প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যান্য পদাধিকারীরা জোরছে আওয়াজ করে বেড়াচ্ছেন- “খালেদা জিয়া এতিমের টাকা চুরি করে খেয়েছেন, তাই তার জেল হয়েছে।” বিনা ভোটের (অবৈধ) সংসদের সদস্যরা সংসদ অধিবেশনে এমন কথাও বলছেন- “তাঁর রাজনীতি শেষ করে দেয়া হয়েছে, তিনি আর কখনও নির্বাচন করতে পারবেন না, ক্ষমতায় আসতে পারবেন না”! ৭৩ বছর বয়স্ক একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ২’শ বছরের পুরাতন এক নির্জন এলাকার পরিত্যাক্ত বাড়িতে সলিডারি কনফাইনমেন্টে রাখার পরেও কত প্রতিহিংসা জিঘাংসার উৎকট রূপ দেখল জাতি! এরা নাকি রাজনীতিবিদ! খালেদা জিয়া দুর্নীতি করেছেন, কি করেননি সে প্রশ্নের উত্তরে পরে আসছি। তবে বিনাভোটের সংসদে যে কথা বলা হয়েছে “খালেদা জিয়ার রাজনীতি শেষ করে দেয়া হয়েছে”- এটাই বোধ হয় বর্তমান ক্যাচালের আসল টার্গেট। সত্য উদঘাটন বা ন্যায় বিচার করা নয়, বরং রাজনীতি খাওয়াই এদের মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু এভাবে মিথ্যা চাপিয়ে দিয়েই কি কারও রাজনীতি খাওয়া যায়?
 
প্রথমেই নিজের পরিচয় দিয়ে নিই। যে সময়কার ঘটনা ১৯৯১ সালে ৯ জুন, আমি তখন প্রধানমন্ত্রীর অফিসে সহকারী সচিব পদে কর্মরত। ঐ অফিসের তখন মাত্র ৮ জন সরকারী কর্মকর্তা ছিলাম আমরা। ভারপ্রাপ্ত সচিব কামাল সিদ্দিকী, সাবিহউদ্দিন আহমদ প্রধানমন্ত্রীর পিএস-১, উপসচিব ম. সাফায়েত আলী (মরহুম), এম এ মোমেন প্রধানমন্ত্রীর এপিএস, তাজুল ইসলাম তথ্য অফিসার, তিনজন সহকারী সচিব আবদুজ জাহের (৮২ ব্যাচ, বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত যুগ্মসচিব), আমি নিজে শামসুল আলম, এবং আলী আহমেদ। আমাদের অফিস ছিল বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১ নম্বর বিল্ডিংয়ে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বসতেন চার তলার অফিস কক্ষে (সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্টের অফিস), আমরা বসতাম দোতলায়।
 
তখনকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান (মরহুম) বিদেশ সফর ঘুরে কুয়েতের আমিরের নিকট থেকে একটি ফান্ড আনেন শহীদ জিয়ার নামে এতিমখানা বানানোর উদ্দেশ্যে। কুয়েতের আমিরের সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের হিসাব হতে প্রেরিত ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলারের ডিডিতে “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” লেখা ছিল বটে, কিন্তু বাস্তবে বাংলাদেশ সরকারের ঐরূপ কোনো ফান্ড ছিল না। ওটা একটা বেসরকারী অনুদান হওয়ার পরেও প্রেরকের ভুলের কারণে ঐরূপ হয়। ভারপ্রাপ্ত সচিব কামাল সিদ্দিকীকে ঐ ডিডি দেয়া হলে তিনি তা ভাঙানোর নিমিত্ত সোনালী ব্যাংক রমনা শাখায় একটি চলতি হিসাব খুলেন। পরে ঐ টাকা (৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা) তুলে সেভিংস/এসটিডি/এফডিআর হিসাব খোলা হয়। ১৯৯৩ সালে সুদসহ সমুদয় তুলে পুরো টাকাটা ২ কোটি ৩৩ লাখ করে সমান দু’ভাগ করে এতিমখানা নির্মানের নিমিত্ত বাগেরহাট এবং বগুড়ায় দুটি ট্রাস্টকে প্রদান করা হয়। এই চেক দু’টিতে সই করেন একাউন্ট হোল্ডার কামাল সিদ্দিকী। এর আগে দু’টি ট্রাস্ট গঠন ও রেজিষ্ট্রি সম্পন্ন হয়। বাগেরহাটের জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টের সেটেলার হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজুর রহমান, এবং বগুড়ার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সেটেলার হন তারেক রহমান। বাগেরহাটে মোস্তাফিজুর রহমান সাহেব জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে এতিমখানা নির্মান করে যথারীতি পরিচালনা করেন। দুদকের অনুসন্ধান কর্মকর্তা নূর আহমেদ ১১/৬/২০০৮ তারিখে জমা দেয়া প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন, ট্রাস্টটি বেসরকারী ট্রাস্ট, এবং “বর্ণিত ট্রাস্টের নামে একটি এতিমখানা স্থাপন করা হয়েছে, যা চলমান রয়েছে বিধায় প্রাথমিক অনুসন্ধানে উক্ত ট্রাস্টের কোনো অর্থ আত্মসাতের কোনো প্রমান পাওয়া যায়নি। পরবর্তীতে দুদকের মামলার অভিযোগকারী এবং তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদও তা মেনে নেন। ফলে বাগেরহাটের এই খন্ড নিয়ে কোনো অভিযোগ উত্থাপন করা হয়নি বা মামলাও হয়নি (এটা মাথায় রাখবেন)।
 
এবারে বগুড়ার জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট নিয়ে আলোচনা। বগুড়ার জন্য বরাদ্দ করা ২.৩৩ কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ট্রাস্টের নামে বগুড়াতে ২.৭৯ একর ধানি জমি ক্রয় করা হয়। বাদ বাকি সব টাকা ট্রাস্টের একাউন্টে আছে, তা স্বীকার করেছেন মামলার বাদী ও তদন্তকারী কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ। ট্রাস্টির সদস্যদের কর্মব্যস্ততার কারনে এই টাকা ব্যবহার করে এতিমখানা নির্মান করা হয়নি সত্য, তবে তারেক রহমান এতিমখানার ঐ টাকাকে উচ্চ মুনাফাধারী বিভিন্ন ব্যাংকে রেখে তা তিন গুণ বর্ধিত করেন। ট্রাস্টের সিদ্ধান্ত মোতাবেক তাদের পরিচিত সলিমুল হক কামালকে দায়িত্ব দেন ঐ টাকা ব্যাংকে রাখার জন্য। কামাল সাহেব তার নিজের নামে এবং তার পরিচিতি গিয়াসউদ্দিন ও সৈয়দ আহাম্মদ নামে এফডিআর করে পরে লাভ সহ ভাঙ্গিয়ে সম্পূর্ন টাকা ট্রাস্টের একাউন্টে জমা করা হয়।
 
২০০৬ সালে এতিমখানার জন্য ঢাকার কাছে আশুলিয়ায় জমি কেনার উদ্দেশ্যে জনৈক শরফুদ্দিনের সাথে বায়না করে ২টি এফডিআর মূলে অর্থ দেয়া হয়, যাতে মেয়াদান্তে ২.৫০ কোটি পাওয়ার কথা। কিন্তু ১/১১র পরে দেশে ধরপাকড় ও আতঙ্কজনক পরিস্থিতিতে এবং পরে তারেক রহমান গ্রেফতার হলে ঐ জমির রেজিস্ট্রি করা সম্ভব হয় নাই। ফলে শরফুদ্দিন উক্ত এফডিআর ভেঙে ২.১০ কোটি টাকা ট্রাস্টকে ফেরৎদান করে। মূলত এটাই হলো মামলার ২.১০ কোটি টাকার উৎস। বাস্তবে ট্রাস্টের কাছে এখনও ৬ কোটির বেশি টাকা আছে ব্যাংকে। এখানে দু্নীতির মামলা হলে ৬ কোটির জন্যই হওয়ার কথা। আর কুয়েতি অনুদান সংক্রান্তে মামলা হলে ১২.৫৫ লাখ ডলার বা ৪ কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকার উপরে হওয়ার কথা। এর একটিও হয়নি। অর্থাৎ মামলাটি বস্তুনিষ্ট হয়নি, বরং বিশেষ উদ্দেশ্য সাধনের উদ্দেশ্যে দায়ের করা!
 
মামলার শুরুতে অভিযোগ আনা হয় যে, অরফানেজ ট্রাস্টের টাকা আত্মসাত করা হয়েছে, যা শেখ হাসিনার ভাষায় ‘এতিমের টাকা চুরি করা’। পরে আদালতে সাক্ষ্য প্রমানাদিতে যখন প্রমান হয় যে, কোনো টাকা কেউ আত্মসাৎ করেনি, তারপরে সরকারী পক্ষ সেটি ঘুরিয়ে দেয় অন্য দিকে- সরকারী তহবিলের অর্থ ক্ষমতার অপব্যবহার করে প্রাইভেট টাস্টকে দেয়ার অভিযোগ আনে, এবং সেই কারন দেখিয়ে বানোয়াট কাগজপত্র ও সাক্ষী দিয়ে ধারণার বশবর্তী হয়ে বেগম জিয়াকে সাজা দেয়া হয়। অবশ্য এর বহু আগে থেকে দেশের ম্যান্ডেটহীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন স্থানে বলতে থাকেন, “এতিমের টাকা চুরি করেছে” (যা পরে কখনই প্রমান হয়নি যে, টাকা চুরি হয়েছে)! বুঝতে কষ্ট হয় না যে, শেখ হাসিনার মুখ রক্ষা করার জন্যই এই রায় ঘোষণা। তাছাড়া বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ হয়ে পড়েছে- এই রায় কিভাবে শেখ হাসিনার নির্দেশে দেয়া হয়। রায়ের দু’সপ্তাহ আগে আইনমন্ত্রীর অফিসের বরাতে খবর ছাপা হয় খালেদা জিয়ার কয় বছর জেল দিতে চান মন্ত্রী আনিসুল এবং নৌমন্ত্রী শাজাহান খান ২/৩ দিন আগেই মিডিয়াকে বলে- খালেদা জিয়ার কয় বছর জেল হবে! এর আগে সুপ্রিম কোর্টের দু’জন প্রধান বিচারপতিকে অত্যন্ত নোংরা পদ্ধতিতে সরিয়ে বর্তমান সরকার অধঃস্তন আদালতের নিয়ন্ত্রন হাসিল করে, যার মুল শক্তি হলো আইন সচিব জহিরুল ওরফে ‘পিস্তল দুলাল’! সেই অনুগত অধঃস্তন আজ্ঞাবহ এক বিচারক হলেন ডঃ আখতারুজ্জামান, যিনি শেখ হাসিনার হুকুম তামিল করে খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠিয়েছেন। দেশের সাধারন মানুষ থেকে শুরু করে সরকারী কর্মকর্তা, রাজনীতিক, সকলেই একবাক্যে বলছেন- এই রায় শেখ হাসিনার নির্দেশিত।
 
প্রকৃতপক্ষে, ১৯৯১ সালে ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম ফান্ড’ নামে সরকারী কোনো তহবিল তখনও ছিল না, এখনও নাই। ১৯৯১ সালের জুন মাসে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রীর কোনো নির্বাহী ক্ষমতা ছিল না। তাই “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” থাকার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। বরং এমন কোনো তহবিল সৃজন করতে হলে অর্থ মন্ত্রনালয় ও সমাজকল্যান মন্ত্রনালয়ের (এতিমখানা এই মন্ত্রণালয়াধীন) অনাপত্তি সাপেক্ষে রাষ্ট্রপতির অনুমোদন দেয়ার আবশ্যকতা ছিল। ঐভাবে কোনো তহবিল সৃষ্টি করা হয়েছিল কি? আদতে তেমন কিছু ঘটেনি। ফলে “প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল” নামে কোনো সরকারী তহবিল ছিল না, ফলে ঐরূপ কোনো ফান্ডের টাকা আত্মসাত বা ক্ষমতার অপব্যবহার করে টাকা সরানো স্রেফ কল্পনাপ্রসুত অভিযোগ ছাড়া আর কিছু নয়।
 
কেউ যদি অভিযোগ করে, আমার পকেট থেকে কেউ টাকা চুরি করেছে। পরে খুঁজে দেখা গেলো তার কোনো পকেটই নেই। তাহলে চুরির প্রশ্ন আসবে কি করে? এখানেও তেমন ঘটনা ঘটেছিল। প্রধানমন্ত্রীর এতিম ফান্ড ছিলই না, তাহলে টাকা তছরুপ হবে কি করে। ঐ ফান্ড কে সৃষ্টি করলো? এরকম কিছু গঠন হয়ে থাকলে সরকারী গেজেট কোথায়? অর্থ মন্ত্রণালয়ের সম্মতি কোথায়? রাষ্ট্রপতির অনুমোদন কোথায়? সরকারী ফান্ড হলে প্রতিবছর তার অডিট হওয়ার কথা। এমন কিছু হয়েছিল কি? কোনো নীরিক্ষা হয়েছিল কি? হয়ে থাকলে সেই অডিট রিপোর্ট কই? আছে কি এমন কিছু? কিছুই নেই। তদন্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ নিজেও তা স্বীকার করেছেন।
 
কুয়েত থেকে আসা এই ফান্ড কি বেগম জিয়া চেয়ে এনেছিলেন? না। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোস্তাফিজ সাহেবের ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ফান্ড আসে। পরে হয়ত প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মৌখিক নির্দেশে প্রধানমন্ত্রীর সচিব কামাল সিদ্দিকী ঐ বেসরকারী ফান্ডের দেখভাল করতেন। রাষ্ট্রীয় টাকা না হওয়া স্বত্ত্বেও তিনি সেটা হিসাব রাখতেন। আর কামাল সিদ্দিকীর কাজ সহজ করার জন্য তার পিএস জগলুল পাশা (১২/০৯/১৯৯২ থেকে) বা তা পূর্বসুরি ডঃ সিদ্দিকীকে সহায়তা করতেন।
 
এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯১ সালের আগস্ট মাসে বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সর্বদলীয় সম্মতিক্রমে দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা পরিবর্তন করে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা চালু হয়। নতুন সরকার ব্যবস্থায় বেগম খালেদা জিয়া সরকারের নির্বাহী প্রধান হিসাবে প্রধানমন্ত্রীর পুনঃশপথ নেন ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৯১। প্রধানমন্ত্রীর অফিসের নতুন অর্গানোগ্রাম হয়, তাতে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সানুগ্রহ হয়ে আমাকে তাঁর প্রটোকল অফিসার হিসাবে নিয়োগ করেন। বাংলাদেশ সচিবালয় ছেড়ে আমরা পুরাতন সংসদ ভবনস্থ (সাবেক রাষ্ট্রপতির সচিবালয়ে) অফিস শুরু করি। সেখানে রাষ্ট্রপতির অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারী সমেত বিশাল জনবল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের নতুন অর্গানোগ্রামে অন্তর্ভুক্ত হয়। সরকারের নির্বাহী প্রধান হিসাবে নভেম্বর মাসে প্রধানমন্ত্রীর কাছে দু’টি তহবিল আসে- এর একটি ‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যান তহবিল’, অন্যটি ‘প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন তহবিল’। প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে হিসাব দু’টি সচিব ডঃ কামাল সিদ্দিকী মেনটেইন করতেন। এবং তার পিএস হিসাবপত্র রাখতেন। উক্ত দু’টি তহবিলই সরকারী নিয়ম মোতাবেক গঠন করা হয়। প্রতিবছর রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে এ দু’টি তহবিলে বরাদ্দ আসে। এখনও বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর এ দু’টি তহবিল আছে। অন্যদিকে তথাকথিত ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ নামে কোনো সরকারী ফান্ডের অস্তিত্ব তখনও ছিল না, এখনও নাই। মাঝখানে ৯৬ সালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন, তখনও এতিম তহবিলের কিছু দেখা যায়নি। এ বিষয়টা হঠাৎ উদয় হয় ২০০৮ সালে ১/১১র পরে!
 
মূলত, কামাল সিদ্দিকীর হাতেই এই বিতর্কের জন্ম। ১৯৯১ সালে যখন ফান্ডটি আসে ভুল নামে, এটা সংশোধনের পরামর্শ দেয়ার দায়িত্ব ছিল কামাল সিদ্দিকীর। তিনি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর সচিব। প্রধানমন্ত্রী বা মন্ত্রি পর্যায়ের পদাধিকারীর সাথে সচিব/একান্ত সচিব নামে কিছু সরকারী কর্মকর্তাদের নিয়োগ দেয়ার বিধান রয়েছে এই কারনে যে, তারা সরকারী আইন ও বিধি সম্পর্কে পারদর্শী। তারা পেশাদারী লোক। রাজনৈতিক ব্যক্তিরা প্রধানমন্ত্রী/ মন্ত্রী পদে বসলেও তারা সরকারী আইন কানুন সম্পর্কে জানা থাকার কথা নয়। সরকারী কর্মকর্তারা মন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী রাষ্ট্রপতিকে আইনী সেফগার্ড দিয়ে থাকেন। সচিবরা সাচিবিক সহায়তা দিয়ে তাদেরকে আইনানুযায়ী চলতে সাহায্য করবেন, এটাই তাদের কাজ। প্রধানমন্ত্রী/মন্ত্রিরা যদি কোনো বেআইনী কাজ বা ভুল কাজ করে, তবে তার দায় সচিবের ওপরও বর্তায়। আলোচ্য কুয়েতি ফান্ডের ক্ষেত্রে কামাল সিদ্দিকীর পরামর্শ হতে পারত- “ডিডি ফেরত পাঠিয়ে অরফানেজ ট্রাস্টের নামে সংশোধন করে আনুন”, ‘প্রধানমন্ত্রীর’ শব্দটি থাকলে এটা নিয়ে ভবিষ্যতে প্রশ্ন উঠতে পারে। কিন্তু সেটা তিনি করেননি। হয় তিনি আইন জানতেন না, অথবা ‘অতিভক্তি’র কারনে তা করতে পানেননি। সঠিক পরমর্শ না দিয়ে তিনি নিজেই ব্যাংক একাউন্ট খুলে ডিডি ভাঙান। এটি একটি ভুল বা প্রমাদ ছিল বটে, তবে কোনো অবস্থাতেই ঐ ফান্ড সরকারী ছিল না। সেটা হলে অবশ্যই বছর বছর অডিট হতো এবং হিসাব থাকত মহাহিসাব নিরিক্ষকের দপ্তরে। কামাল সিদ্দিকীর এই ভুলের দায়ে বেগম খালেদা জিয়ার শাস্তি হতে পারে না। এটা অন্যায়।
 
কামাল সিদ্দিকী পরবর্তীতে তার কৃত ভুলের দায় থেকে বাঁচার জন্য নাকি দুদকে লিখিত চিঠি পাঠিয়েছে। তাতে দাবী করেছেন, যা কিছু করেছেন সব প্রধানমন্ত্রী জানতেন! আর তার পিএস জগলুল পাশাও লিখেছেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন এবং ত্রান তহবিল মেনটেইন করতেন। পাশাপাশি কথিত “এতিম ফান্ডে” টাকার হিসাবও রাখতেন আলাদাভাবে। কিন্তু তিনি কোনো নথি দেখাতে পারেননি, বা কোনো নোটশীটে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন খুঁজে পাননি। আসলে সরকারী ফান্ডের পাশাপাশি বেসরকারী ঐ হিসাব তিনি দেখভাল করতেই পারেন। এটা পিএসরা হরহামেশা করে থাকে। কামাল সিদ্দিকীর ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব, তার লেখা বইপত্রের বেচা বিক্রি, আয় ব্যয়, ট্যুর থেকে আয়, বিদেশী গ্রান্ট এগুলার হিসাবও পাশা সাহেব রাখতেন। তবে কি ঐ গুলাও সরকারী হিসাব ছিল? ডঃ সিদ্দিকী এবং তাঁর পিএসের স্টেটমেন্ট-এর খবর মিডিয়াতে পড়ে একজন শিক্ষক আমাকে প্রশ্ন করেছেন- “কোথায় সেই বেইমান সিদ্দিকি এবং তার পিএস পাশা? ম্যাডাম কি পান এদের মধ্যে যে, খুঁজে খুঁজে এদেরকেই তাঁর অফিসে বার বার বসান।” এর মধ্যে ’৮২ ব্যাচের এক অফিসার আমাকে বলেন, “পাশা যে সময় এই সাক্ষ্য দেয় তখন তার খুব দুর্দিন, সামনে রিটায়ামেন্ট অথচ প্রমোশন মিলছে না, হয়ত সেটা হাসিল করতেই পাশা এমন মতলবি সাক্ষ্য দিয়েছিল! কিন্ত শেষ অবধি সেটাও হয়নি।”
 
একটি উদাহরন দেই- প্রধানমন্ত্রীর অফিসে কর্মকালে নিজেদের বেতন ভাতার হিসাব রাখার জন্য আমি নিজেই একটি প্রোফর্মা বানিয়ে রেজিষ্ট্রার তৈরী করি এবং ১০০ বই মুদ্রণ করে অফিসারদেরকে দেই। এখন যদি কোনো অফিসারের কাছে ঐ হিসাবের বই পাওয়া যায়, তবে দুদক কি বলতে পারবে – এটা সরকারী ফান্ড- হিসাব দাও? এভাবে সব কিছুই রাষ্ট্রীয় হিসাব নয়, কিছু বেসরকারী বা ব্যক্তিগত বিষয়ও থাকে।
 
আলোচ্য অরফানেজ ঘটনায় কোনো দুর্নীতির ঘটনা তো ঘটেইনি, উপরন্তু সরকারী তহবিলকে বেসরকারী ট্রাস্টকে প্রদান করে কোনো ক্ষমতার অপব্যবহার করার ঘটনাও ঘটেনি। লক্ষ করুন, কুয়েতি ফান্ডের অর্ধেক ২.৩৩ কোটি টাকা যায় বাগেরহাটে। এই অংশ নিয়ে দুদক বা সরকারের কোনো আপত্তি অভিযোগ নাই। সরকারি ফান্ড বেসকারী ট্রাস্টে দেয়ার অপরাধ ঘটলে সেটা বাগেরহাটের ২.৩৩ কোটি টাকার জন্যও মামলা হতো। তা হয়নি। কেবল বেগম জিয়া এবং তাঁর পুত্রকে রাজনৈতিকভাবে হয়রানির অসৎ উদ্দেশ্যে বগুড়ার অংশের ২.১০ কোটি টাকা নিয়ে দুদকের এই মামলা। একটি ফান্ডের অর্ধেক সরকারী, আর অর্ধেক বেসরকারী, তা তো হতে পারে না। তাছাড়া, যদি তর্কের খাতিরে বলা হয় যে এটা প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন তহবিলের টাকা (যদিও আসলে তা নয়), তবুও প্রধানমন্ত্রী যেকোনো প্রতিষ্ঠানকে যত ইচ্ছা ফান্ড দিতে পারেন (মপবি-৩/৬/৯১/বিধি-১১২, তারিখ ৮/৬/৯২)। কাজেই, কুয়েতের আমির থেকে পাওয়া বেসরকারী ফান্ড দু’টি এতিমখানাকে ভাগ করে দিয়ে কোনো বিশ্বাসভঙ্গ, ক্ষমতার অপব্যবহার, বা আইনের ব্যত্যয় বা সরকারী তহবিল তছরুপের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ওখানে নাম সংক্রান্ত যা কিছু ব্যত্যয় হয়েছে, তা ছিল অর্থ প্রেরকের একটি ভুল মাত্র। কুয়েতের আমিরের ফান্ড যে শহীদ জিয়ার নামে এতিমখানা নির্মানের জন্য দেয়া হয়েছিল, তা পরবর্তীতে কুয়েতের দূতাবাস চিঠি দিয়ে (কপি ছেপে দিলাম) জানিয়েছে, তবুও এসব বিষয় আখতারুজ্জানের কোর্ট উপেক্ষা করে রায়টি দিয়েছে। আমার কাছে মামলার ৭’শ পাতা ডকুমেন্ট আছে। কাজেই তথ্যভিত্তিক ছাড়া কোনো কথা এখানে বলি নাই।
 
মুলত, দুর্নীতি হয়নি জেনেও শেখ হাসিনা চেয়েছেন খালেদা জিয়ার নামে একটা দুর্নীতির রায় দিতে, যাতে করে উনি ভোট চাওয়ার সময় খালেদা জিয়ার নামে বাজে বাজে কথা বলতে পারেন। দেশ বিদেশের কোনো জরিপেই আওয়ামীলীগের জন্য ৩০ থেকে ৪০ সিটের বেশি আসন পাওয়ার কোনো খবর নাই। তাই খালেদা জিয়ার ভোট কমাতে এই তাগুদি রায় হচ্ছে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিকে হেনস্তা করার অসৎ প্রচেষ্টা ছাড়া আর কিছু নয়। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উচ্চ আদালত থেকে খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাবেন।
 
আসলে বিদেশী অনুদানে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার নামে এতিমখানা বানাতে গিয়ে একজন সৎ প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া রাজনৈতিক আগ্রাসনের শিকার হয়েছেন, কেবল ভোটে এগিয়ে থাকাই হচ্ছে তাঁর মূল অপরাধ!
(লেখক: শামসুল আলম,  প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে বেগম খালেদা জিয়ার সহাকারী একান্ত সচিব)

খালেদা জিয়াকে দ্রুত সাজা দিতে ১০ দিনে ৬৩২ পৃষ্ঠার রায় লিখে দিয়েছে কে?

বিশেষ প্রতিবেদক ।।
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট  মামলায় ৬৩২ পৃষ্ঠার রায় গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ করেছে বিচারক ড.আখতারুজ্জামান। একজন মানুষ কিভাবে মাত্র ১০ দিনে ৬৩২ পৃষ্টার রায় লিখলো তা নিয়ে সারাদেশে সচেতন মহলে চলছে রীতিমত তোলপাড়। ড. আখতারুজ্জামান কি জ্বিন ভুত নাকি মানুষ? মানুষের পক্ষে এটা কোনভাবেই সম্ভব নয়। এ নিয়ে সাংবাদিক সম্মেলন করে প্রশ্ন তুলেছেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) চেয়ারম্যান ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীর বিক্রম। মাত্র ১০ দিনে ৬৩২ পৃষ্ঠার রায় লেখা নিয়ে শেখ হাসিনা, জজ আখতারুজ্জামান এবং আইনমন্ত্রি আনিসুল হক পড়েছেন মহাবিপাকে। আইনমন্ত্রী এই প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্ন এড়িয়ে চলছেন।

নামে না প্রকাশ করার শর্তে জজ কোর্টের একজন বিচারক জানান, সাধারনত একজন পেশাদার কম্পোজার স্পস্ট ড্রাফট লিখা থাকলে প্রতি পেইজ বাংলা টাইপ করতে সময় লাগে কমপক্ষে ১০-১১ মিনিট, আর ইংরেজি হলে ৭-৮ মিনিট। প্রতি পৃষ্ঠা ড্রাফট করতে হাতে লিখলে সময় লাগে ২০-২৫ মিনিট (দুই হতে তিন পৃষ্ঠা হাতে লিখা ড্রাফট কম্পিউটার কম্পোজে এক পৃষ্ঠা হয়)। ৬৩২ পৃষ্ঠার রায়ের হাতে লিখা ড্রাফট করে থাকলে তার জন্য হাতে লিখা পৃষ্ঠা হলো ৬৩২x২.৫ ( গডে ২.৫ পৃষ্ঠা হাতে লিখা কম্পোজে ১ পৃষ্ঠা হবে) = ১৫৮০ পৃষ্ঠা। প্রতি পৃষ্ঠা হাতে লিখতে গড়ে ১০ মিনিট লাগবে, কারন রায়টা পরীক্ষার হলে মুখস্ত রচনা নয়। সেই হিসাবে ১৫৮০ পৃষ্ঠা হাতে লিখা ড্রাফট করতে সময় লাগবে ১৫৮০০ মিনিট বা ২৬৪ ঘন্টা বা ৩২ কার্য দিন ( প্রতিদিন ৮ ঘন্টা করে)। আর ১৫৮০ পৃষ্ঠা কম্পোজ করতে ( ৬৩২ হবে) সময় লাগবে বাংলা হলে ৬৩২০ মিনিট বা ১০৫ ঘন্টা বা ১৩ কার্যদিবস। আখতারুজ্জামান হাতে নিয়েছিল ১০ দিন। প্রতিদিন ৮ ঘন্টা কোন লেবারও কাজ করে না। তারও ৫+৩০+৫ মিনিট ব্রেক থাকে ৮ ঘন্টা কাজে এবং ধর্ম কর্ম ও প্রাকৃতিক কাজেও চলে যায় ৩০/৩৫ মি। সেমতে এ রায় লিখার সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৫-৬ ঘন্টা ব্যয় করা সম্ভব। রায় লিখতে সময় লাগবে ইংরেজী ড্রাফট না করে সরাসরি কম্পোজ করলে ১৭/১৮ দিন আর বাংলায় সরাসরি কম্পোজ করলে ২৫/২৬ দিন। আর যদি কম্পোজ এর পুর্বে ড্রাফট করা হয়ে থাকে তবে আরও চল্লিশ দিন যোগ করতে হবে। খোঁজ নিয়ে জানাগেছে, সাবেক বিতর্কিত বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ওরফে কালা মানিক , আইনমন্ত্রী আনিসুল হক এবং ভারপ্রাপ্ত আইন সচিব আওয়ামীলীগ নেতা পিস্তল দুলাল ও তাদের লোকজন শেখ হাসিনার নির্দেশনা অনুসরন করে এই রায় লিখে দিয়েছে। পুরো বিষয়টি তদারকি করেছেন হাসিনার অতি বিশ্বস্ত আইনজীবি আজমালুল হক কিউসি। রায়ের বিস্তারিত বিবরন আখতারুজ্জান নিজেও জানে না। সে শুধু ফরমায়েশী রায়ের সারাংশটুকু পড়েছে। পুরো রায় তার হাতে লেখা নয়।

রায়ের প্রিন্ট নেয়া হয়েছে গণভবন থেকে। রায় ঘোষণা করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে কারন্তরীণ করার পরে এখন সার্টিফাইট কপি সরবরাহ নিয়ে টালবাহানা করছে সরকার। জানা গেছে, দ্রুত রায় ঘোষনা করার জন্য হাসিনার কড়া নির্দেশ পেয়েই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালা মানিক, পিস্তল দুলাল এবং আওয়ালীগের কয়েকজন জজকে কাজের দায়িত্ব দিয়ে তদারকী শুরু করে। আনিসুল হকের ব্রিফিং পেয়ে ফরমায়েশী লেখা শুরু করে তারা। এই কুখ্যাত রায়ে ছত্রে ছত্রে মিথ্যা দিয়ে ভরা।

রায় ঘোষণা দেওয়ার আগেই সংক্ষুব্ধদের হামলার আংশংকায় জজ আখতারুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে বিশেষ নিরাপত্তা বিসিয়েছে সরকার। রংপুর জেলার কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ইউনিয়নের নিজপাড়ায়  আখতারুজ্জামানের গ্রামের বাড়িতে পুলিশের একজন এসআইসহ চার সদস্য বুধবার থেকে সার্বক্ষণিক পাহারা দিচ্ছেন। এ ছাড়া একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে এক প্লাটুন বিজিবি এবং বিপুলসংখ্যক পুলিশ প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ওই বাড়িতে বিচারকের মা মোছা. মরিয়ম খাতুন, এক ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা বসবাস করেন।

আততায়ী আতংকে সেই বিচারক

শেখ হাসিনাকে খুশি করতে বিচারের নামে অবিচার করতে গিয়ে এখন আততায়ী আতঙ্কে প্রায় গৃহবন্দী অবস্থায় দিন কাটছে বকশীবাজারের আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৫-এর উচ্চাভিলাষী বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামানের। শেখ হাসিনার নিয়োজিত আততায়ীর পিস্তলের নিশানা তাকে প্রাণ সংহার ভীতির অস্থিরতায় ডুবিয়ে রেখেছে। বিচারের রায় কি হবে সেটি এখনো অজানা। যদিও এটর্নী জেনারেল, মন্ত্রী শাহজাহান খানসহ কয়েকজন মন্ত্রী এমপি ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছেন যে, বেগম জিয়াকে জেলে যেতে হবে। জাল জালিয়াতির মাধ্যমে বানোয়াট কাগজ দিয়ে দায়ের করা বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়া এবং বিএনপির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমানের বিরুদ্ধে কথিত ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা’র শুনানির সময় খালেদা জিয়ার আদালতে উপস্থিতি নিয়ে তার সঙ্গে নিম্ন আদালতের জজ আখতারুজ্জামানের যে ধরণের অমানবিক ও দুর্বৃত্তায়িত আচরণ করেছেন, তাতে এরই মধ্যে তার সম্পর্কে দেশের জনগণের মধ্যে একটি নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে,কোনো এক রহস্যজনক কারণে এই মামলা নিয়ে খুবই তাড়াহুড়া করছেন জজ আখতারুজ্জামান। এ মামলা নিয়ে একদিকে শেখ হাসিনার নির্দেশনা অপরদিকে ব্যাংক ডাকাত সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের খবরদারি এবং পাশাপাশি আইন সচিব পিস্তল দুলালের নজরদারি সব মিলিয়ে এখন মহাআতঙ্কে বিচারক আখতারুজ্জামান। এখন কার্যতঃ তাকে গৃহঅন্তরালে পুলিশী প্রহরায় রাখা হয়েছে।

জজ আখতারুজ্জামান ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের ছাত্র।বেগম খালেদা জিয়ার শাসনামলে ১৯৯৪ সালে জুডিশিয়াল সার্ভিসের চাকরিতে যোগদান করেন। সহপাঠি এক ঘনিষ্ট বন্ধুর সঙ্গে সম্প্রতি নিজের উদ্বেগ এবং জীবনহানির আশংকার কথা জানিয়েছেন আখতারুজ্জামান। আততায়ী কিংবা বর্তমান ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকেই নিজের চরম ক্ষতির আশংকা করছেন আখতারুজ্জামান।

আখতারুজ্জামান তার বন্ধুর সঙ্গে আলাপকালে বলেছেন, এই মামলাটির তেমন কোনো আইনগত ভিত্তি নেই। এই মামলার প্রথম বিচারক বাসুদেব রায় আইন সচিব পিস্তল দুলালের নির্দেশে চার্জ গঠন করেছেন যুক্তিহীনভাবে। কিন্তু এই মামলাটি নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে তার উপর মারাত্মক প্রেশার সৃষ্টি করা হচ্ছে। উচ্চাভিলাশি আখতারুজ্জামানের পরিবারও তার কার্যক্রম নিয়ে উদ্বিগ্ন। তারাও তাকে নানাভাবে বুঝিয়েছে, সরকারের কথায় উল্টাসিধা রায় দেয়া থেকে নিরস্ত থাকতে। পারিবারিক একটি সূত্র জানিয়েছে, তারা উদ্বিগ্ন এ কারনে যে, শেখ হাসিনা অত্যন্ত প্রতিহিংসাপরায়ণ এবং আত্মকেন্দ্রিক। নিজের প্রয়োজনে ইমরান সরকারকে ব্যবহার করেছিল শেখ হাসিনা। কাজ উদ্ধার শেষে ছুড়ে ফেলে দিয়েছে। এখন সরকারের হামলা মামলার শিকার ইমরান। এখন ছাত্রলীগের চড় থাপ্পড়ের ভয় ইমরান সরকারকে সারাক্ষণ তাড়িয়ে বেড়াচ্ছে। শেখ হাসিনার স্বার্থ রক্ষায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহা নিজের মতো আইনের ব্যাখ্যা করে অনেকের জেল ফাঁসি দিয়েছেন। সিনহাকে ব্যবহার করে কার্য উদ্ধার শেষে ‘পাগল ছাগল এবং রাজাকার’ আখ্যা দিয়ে অতিউৎসাহী সিনহাকে দেশ ছাড়া করেছেন শেখ হাসিনা।

এসব কারণে এখন আখতারুজ্জামান বুঝে গেছেন সে এখন আওয়ামী লীগের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছেন। তাকে দিয়ে কার্য উদ্ধার শেষে যে কোনো সময় আওয়ামীলীগের ভাড়াটে খুনী তাকে হত্যা করবে। তারপর বিএনপির ওপর দোষ চাপিয়ে ঘোলা পানিতে স্বার্থসিদ্ধি করবে। কারণ কাজ উদ্ধার হয়ে যাওয়ার পর শেখ হাসিনা কাউকেই রেহাই দেননা। আখতারুজ্জামানকে সরিয়ে না দিলে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারবে না।

জানা যায়, লোভে পড়ে আওয়ামী ফাঁদে পা দিয়েছিলেন রংপুর জেলার মঙ্গাপীড়িত কাউনিয়া উপজেলার ৫ নং বালাপাড়া ইউনিয়নের নাম হরিশ্বর গ্রামের হতদরিদ্র রইছ উদ্দিনের পুত্র আখতারুজ্জামান। কাউনিয়াতেই স্কুলের পাঠ চুকিয়ে কারমাইকেল কলেজ থেকে ভর্তি হন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিলেন ছাত্রলীগের ক্যাডার। তবে সেই সময় ক্যাম্পাসে তার গভীর সম্পর্ক গড়ে উঠে জাসদ ছাত্রলীগের দুধর্ষ সন্ত্রাসী রুহুল কুদ্দুস বাবু ওরফে কিলার বাবুর সঙ্গে। উলেখ্য, রুহুল কুদ্দুস বাবু বর্তমানে হাইকোর্টের বিচারপতি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স শেষ করে আখতারুজ্জামান মাস্টার্স করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। পড়াশুনা শেষ করেই বিসিএস দিয়ে সরকারি চাকুরীতে ঢুকেন আখতারুজ্জামান। এরপরই ছাত্র রাজনীতির সময়কার সম্পর্ক কাজে লাগিয়ে নানা ফাঁক ফোকর দিয়ে ভাগ্য বদলাতে থাকেন আখতারুজ্জামান। এখন তার টাকার অভাব নেই। ঢাকায় চারটি বাড়ী-ফ্লাট, উত্তরা ও পুর্বাচলে একাধিক প্লট , একটি অভিজাত মার্কেটে দুইটি দোকান স্পেস এর মালিক তিনি। তার বন্ধুটি জানান, বেগম জিয়ার মামলা দ্রুত শেষ করে তার বিরুদ্ধে রায় দেয়ার বিনিময়ে আখতার প্রমোশনের লোঝে পড়েছেন- হাইকোর্টের জজ হবে! নগদ কয়েক কোটি টাকা পেয়েছেন ইতিমধ্যে। কানাডা ও মালয়েশিয়ায় বাড়ীও কিনেছেন আখতারুজ্জামান। ঢাকার প্রতিবন্ধী স্কুলে অধ্যয়নরত আখতারুজ্জামানের এক মাত্র সন্তানকে উন্নত চিকিৎসা করানোর জন্য রায়ের পর বিদেশে যেতে চায় সে।

আখতারুজ্জামান এই মামলা দিয়ে শেখ হাসিনাকে খুশি করে মঞ্জিলে মকসুদে পৌছে যেতে চান। তার শ্বশুর বাড়ি কুষ্টিয়ার খোকসায়ও জজ সাহেবের উচ্চাকাংখার কথা জানাজানি হয়ে গেছে। আখতারুজ্জমান এখন নিশ্চিত আভাস পাচ্ছেন তার ঘাড়ে বন্দুক রেখে কাজ হাসিল করে শেষ পর্যন্ত এই আওয়ামী লীগই তাঁর জীবনের হুমকি হয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে।

রাজশাহীর বন্ধুকে আখতারুজ্জামান আরো বলেছেন, অতি উৎসাহী পুলিশ কর্মকর্তা বাবুল আক্তারকে যেভাবে আওয়ামী লীগ ফাঁসিয়ে দিয়েছে তাঁকেও একইভাবে ফাঁসিয়ে দেয়া হতে পারে অথবা তাকে হত্যা করতে পারে সরকারের কিলাররা। তার রেহাই পাওয়ার পথ নেই। তবে আখতারুজ্জামানের বন্ধুটি তাকে পরামর্শ দিয়ে বলেছেন, “আখতার, তুমি যদি শেখ হাসিনার এই মৃত্যুচক্র বুহ্য থেকে পরিত্রাণ চাও তবে সাহসী হয়ে ন্যায্য বিচার করো। সঠিক রায় দাও। খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও জালজালিয়াতির মামলার সঠিক রায় ঘোষণা করো। জনগনকে সত্যটা নিজের মুখে জানিয়ে দাও। তোমার ব্যক্তি স্বার্থকে প্রাধান্য না দিয়ে দেশ ও জাতির কল্যাণে কিছু করো। তোমার সামনে ইতিহাস অপেক্ষা করছে। হাসিনার নির্দেশিত রায় ছিড়ে ফেলো। তুমি পিস্তল দুলালের লেখা রায় ঘোষণা করলে দেশে গৃহযুদ্ধ লেগে যেতে পারে। সঠিক রায় দিলে শান্তি ফিরে আসতে পারে। ন্যায় বিচার করলে হয়ত হাসিনা তোমার বিরুদ্ধে রুষ্ট হবে বটে, তবে তোমার খুব বেশি ক্ষতি করতে পারবে না। দেশের সব জনগনের সেন্টিমেন্ট তোমার পক্ষে থাকবে তখন।”
বন্ধুটি আখতারুজ্জামানকে বলেছেন, আখতার, তুমি সিদ্ধান্তে নাও, তুমি হিরো হতে চাও? না এদেশের নিকৃষ্ট ভিলেন? তুমি নরকের কীট হতে চাও? না মানুষের অভিনন্দন ধন্য?

তুমি কি শেখ হাসিনার উচ্ছিষ্ট হয়ে প্রাণ-সংহারে নিজেকে সঁপে দিবে? নাকি বীর হয়ে বাঁচতে চাও। সিদ্ধান্ত নাও।

সব কিছু ভেঙে পড়ে : এমনকি প্রিয় সেনাবাহিনীও

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চলেছে শুদ্ধি অভিযান। এর ফলে বাড়ি গেছে শত শত অফিসার, কারাগারেও আছে অনেকে, এমনকি নিহতও হয়েছে কেউ কেউ। এদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে কল্পিত অভিযোগ- বিএনপি, জামায়াত, পাকি সংযোগ, যুদ্ধাপরাধী, সর্বশেষে ইসলামী জঙ্গি। বছর দুয়েক আগে অপ্রমানিত জঙ্গি অভিযোগে পুলিশের হাতে হাতকড়া অবস্থায় নিহত হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদ। আসলে সেটা ছিল আটকের পরে ঠান্ডা মাথায় খুন। রাজনৈতিকভাবে বিরোধী শিবিরের ট্যাগ দিয়ে বহু অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার গ্রেফতার করা হয়েছে, বাড়ি ঘর জমি হারিয়েছেন। জামায়াত পরিবারের সদস্য হওয়ার কারনে ব্রিগেডিয়ার আমান আযমীকে দেড় বছর আগে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সেনা গোয়েন্দা হেফাজতে গুম করে রাখা হয়েছে। সর্বশেষে তাদেরই হাতে গুম হয়েছেন সাবেক সেনা অফিসার কূটনীতিক ও দুটি দেশে রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মারুফ জামান। জানা গেছে এসব ধরপাকড় গুম, হত্যা ও আটকের পিছনে কাজ করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এরা রাওয়া ক্লাব, গলফ ক্লাব, সেনা অফিসারদের যাওয়া আসা আছে এমন স্থানগুলোতে ওৎ পেতেনানা তথ্য পাচার করে অফিসারদের জীবন বিপদাপন্ন করে তুলেছে। এরকম একজন ইনফরমার হলো অবসরপ্রাপ্ত মেজর ইউসুফ।

সেনাবাহিনীর ২৮ লং কোর্সের অফিসার ইউসুফ রাজনীতি করার অভিপ্রায়ে সেনা চাকরি ছাড়ে। ১৯৯৩ সালে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া এই ইউসুফ প্রধানমন্ত্রীর অফিস এবং ডিজিএফআইর খুব ঘনিষ্ট লোক। এত কনিষ্ট একজন অবসরপাপ্ত কর্মকর্তা হয়েও মেজর ইউসুফ যখন তখন যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অবঃ) তারিক সিদ্দিকের কাছে। তার আরও দুই ওস্তাদ হচ্ছে নবম পদাতিক ডিভিশিনের জিওসি মেজর জেনারেল আকবর হোসাইন, এবং র‌্যাবে খুন করতে করতে কুখ্যাত হয়ে ওঠা ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল আহসান। মেজর ইউসুফ নিজেকে আওয়ামী লীগের গোড়া সমর্থক হিসাবে পরিচয় দেয়। তার লেখা লেখিতে প্রচন্ড উগ্রবাদী। নিজেকে প্রগতিশীল হিসাবে উপস্থাপন করার জন্য শাহাবাগীদের সাথে দহরম মহরম গড়ে তোলে সে। নিজে তার ফেসবুক পেইজে নাস্তিক্যবাদী পোস্ট দিতে থাকে। ইসলাম ধর্ম, রসুল (সাঃ), কোরআন, আল্লাহ নিয়ে সারাক্ষণ যাচ্ছে তাই বানোয়াট সমালোচনা এবং নোংরা কথাবার্তা লিখে প্রচার করতে থাকে ইউসুফ। যদিও বাপ মা তার একটি ইসলামী নাম রেখেছে মোহাম্মদ ইউসুফ হোসেন। কিন্তু সে প্রগতিশীল সাজতে গিয়ে নাস্তিক গ্রুপের সংগে মিশে পুরোপুরি উগ্রবাদী নাস্তিকে পরিণত হয়েছে।

মেজর ইউসুফের ফেসবুক পোস্ট ও কমেন্ট নিয়ে রাওয়া ক্লাবের টেবিলে আলোচনা হয়। সিনিয়র সদস্যরা ইউসুফকে এসব করতে নিষেধ করে। কিন্তু এর ফল হয় বিপরীত। ইউসুফ ঐসব সিনিয়রকে ডিজিএফআই দিয়ে নানাভাবে হুমকি দেয়- শাসায়। তাকে বোঝাতে গেলে সিনিয়রদেরকে সে গালিগালাজ করে, বাপের বয়সী অফিসারদেরকেও অপমান অপদস্ত করতে দ্বিধা করে না। অনেক সিনিয়ররা মনে করেন, সে অল্প বয়সে অনেক ক্ষমতাধরদের সাথে চলাফেরা করতে গিয়ে হয়ত নিজেকে সামাল দিতে পারছে না, তাই বাড়াবাড়ি করে ফেরছে। অতএব তাকে আরও বোঝানো হোক। কিন্তু তাকে কেউ বোঝাতে গেলেই ঐ সব সিনিয়রদেরকে সে রাজাকার যুদ্ধপরাধী ও সরকারের শত্রু ট্যাগ দিয়ে নিজে পোস্ট দেয়, এবং ডিজিএফআইর কাছে গোপনে কমপ্লেন করতে থাকে। নিকট অতীতে দেখা গেছে, আগেরদিন সন্ধ্যায় রাওয়া ক্লাবে যেসব অফিসাররা ইউসুফকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, পরের দিন ডিজি ডিজিএফআই মেজর জেনালের আকবর এবং এনএসআইর জিয়াউল আহসান তাদেরকে চা খাওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে যেত। নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়। রাওয়া ক্লাবে গল্ফ ক্লাবে বিভিন্ন সামাজিক গেট টুগেদারে পারিবারিক বা একান্ত আলাপে দেশ নিয়ে যে সব কথাবার্তা বলে থাকে, তার অনেকটাই রংচং মেখে ইউসুফ পাচার করে দেয় ডিজি ডিজিএফআইর কাছে। তার তৎপরতার কারনে বহু সিনিয়র অফিসারকে জামাত যুদ্ধাপরাধী ট্যাগ দিয়ে ধমক ও ওয়ার্নিং খেতে হয়েছে। রাওয়া ক্লাবের সকলেই এখন বুঝে গেছে- এসব ইউসুফের কাজ। সিনিয়র অফিসারদের অনেকের প্রশ্ন- মিলিটারি একাডেমীতে ইউসুফকে OLQ (Officers Like Quality) সাবজেক্টটি পড়ানো হয়েছিল কি না। বিশ্বজুড়ে সামরিক অফিসারদের জন্য OLQ একটি অবশ্য পাঠ্য বিষয়, যাতে পড়ানো হয় একজন সেনা অফিসারের ম্যানারস এন্ড এটিকেট, একজন সেনা অফিসার কি কি কাজ করতে পারে, আর কি করতে পারে না।

ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের ডিফেন্স এটাশে ব্রিগেডিয়ার জে. এস. নন্দার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ট মেজর ইউসুফ। বিভিন্ন নৈশ পার্টিতে একসাথে খানা পিনাও করে থাকে। তাছাড়া সাংবাদিক শ্যামল দত্ত ও মুন্নী সাহাও ইউসুফের বেশ ঘনিষ্ট। তবে রাওয়া ক্লাবের আলোচনা থেকে যাদের ভারত বিরোধী মনে হয় তার, সে সব অফিসারদের সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার নন্দাকে সে রিপোর্ট করে। বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে অফিসারদের কোনো একাডেমিক আলোচনাকেও রংচং দিয়ে ভারত বিরোধী ট্যাগ দিয়ে সে জানিয়ে দেয়।

জানা গেছে, এইরূপ কোনো আলোচনার সূত্রে ইউসুফের রিপোর্টের প্রেক্ষিতে ডিজিএফআই গুম করে বিএনপির নির্বাহী কমিাটির সদস্য সৈয়দ সাদাত আহমেদকে। সাদাতের পিতা বেশ প্রবীণ সেনা অফিসার- রিটায়ার্ড কর্নেল সাহাবুদ্দিন, যিনি পাকিস্তানের সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কোর্সমেট। সে কারনে বাংলাদেশ আমলের অফিসাররা কর্নেল সাহাবুদ্দিনকে খুব সমীহ করে, পিতার মত চোখে দেখে। তবে পিতা কর্নেল সাহাবুদ্দিনের কারনেই সৈয়দ সাদাত আহমেদকে গুম করে ডিজিএফআই। ইউসুফ রিপোর্ট করে কর্নেল সাহাবুদ্দিন পাকিস্তানের কানেকশন – জামাত – যুদ্ধাপরাধী ইত্যাদি। অধিকাংশ সামরিক অফিসাররা জানেন, এসব কল্পিত অভিযোগ। মুলত কর্নেল সাহাবুদ্দিন একটু আউট স্পোকেন, মুরব্বী, আর এর জন্য খেসারত দিতে হয় তাকে। মেজর ইউসুফ তার নামে রিপোর্ট করায় এবং ছেলে সাদাতকে গুম করায়। অনেক উপরে কাকতি মিনতি করে ৪ মাস চেষ্টার পরে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে পারেন কর্নেল সাহাবুদ্দিন।

রাওয়া ক্লাবের সুত্র জানায়, কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানকেও গুম করা হয় মেজর ইউসুফের রিপোর্টের ভিত্তিতে।

২৬ লং কোর্সের মেজর হাফিজের মালিকানাধীন বনানীতে সি ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ৯৮ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত আওয়ামী মিলিটারি অফিসারদের গুপ্ত সভার নিয়মিত সদস্য মেজর ইউসুফ। এখানেই নিয়মিতভাবে মিলিত হয় মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিক, মেজর জেনারেল আকবর, মেজর জেনারেল ওয়াকার, ব্রিগেডিয়ার শায়েখ, ব্রিগেডিয়ার জিয়া, অবসরপ্রাপ্ত মেজর খন্দকার হাফিজ, মেজর ইউসুফ সহ আওয়ামীপন্থী সার্ভিং এবং রিটায়ার্ড অফিসাররা। এখান থেকে ঠিক হয় কোন কোন রাজনীতিক, সিভিল, মিলিটারীকে তুলে আনতে হবে, গুম করতে হবে। দেশের রাজনীতি কোনে দিকে যাবে ও আগামী নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরে বিভিন্ন খুটিনাটি ও নানা ফন্দি তৈরী করা হয়। এখানকার মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- বর্তমান সরকারের প্রতি বৈরি ১৩৩ জন সামরিক অফিসারকে সাইজ করতে হবে। গত অক্টোবরের মিটিংয়ে রিটায়ার্ড মেজর খন্দকার আবদুল হাফিজ বিএনপি প্রধান বেগম জিয়াকে বেনজির ভুট্টোর মত বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।

রিটায়ার্ড মেজর ইউসুফ কথায় কথায় প্রধানমন্ত্রীর দফতরের রেফারেন্স দেয়। শেখ হাসিনাও নাকি তার কথা শোনে, এমন কথা সে প্রায়শই বলে থাকে। ইউসুফ তার পোস্টে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধদের খেতাব কেড়ে নেয়ার দুঃসাহস দেখায়। অথচ পিলখানায় ৫৭ সেনা অফিসার হত্যার বিষয় নিয়ে কথা উঠলে সে নিশ্চুপ হয়ে যায়। বরং এই নিয়ে যারা দুঃখ বা হতাশা প্রকাশ করে, তাদেরকে ভিন্নমতাবলম্বী হিসাবে রিপোর্ট করে। এই হচ্ছে তার সেনাবাহিনীর প্রতি তার দরদের নমুনা। একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘a soldier is a soldier, even after death’. কিন্তু ইউসুফের কর্মকান্ড দেখে তা মনে হয় না, সে সেনা অফিসার ছিল বা তার কোনো ফেলো ফিলিংস আছে। ইউসুফের রোল মডেল হলো- ১৮ ঘন্টা মাতাল জেনারেল আকবর, সিরিয়াল কিলার ব্রিগেডিয়ার জিয়া, সাথী হলো মেজর হাফিজ। হাফিজ-ইউসুফ সন্ধ্যার পরে প্রায়ই মাতাল অবস্খায় থাকে, কখনও উন্মত্ত হয়ে অনেকের সাথে খারাপ ব্যবহার করে থাকে।

রিটায়ার্ড মেজর ইউসুফ উল্টাসিধা গোয়েন্দা রিপোর্ট করে কেবল অফিসারদের ক্ষতি করছে না, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকেও ভুলপথে চালিত করছে। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যাদি পাচার করছে পরদেশের কাছে। শ্যামল দত্ত এবং মুন্নী সাহার কাছে সেনাবাহিনীর ক্লাসিফাইড ইনফরমেশন শেয়ার করে সেনাবাহিনীকে অরক্ষিত করে দিচ্ছে। এসকল কাজ পরিস্কার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ। এত জুনিয়ার এক অফিসার প্রতিনিয়ত এভাবে বেআদবী করছে, সবাইকে টেররাইজ করে যাচ্ছে তাকে নিয়ে সেনা অফিসাররা সদস্যরা ভীষন অতিষ্ট। রীতিমত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

২২ ডিসেম্বর আতঙ্কে ভুগছে আওয়ামী লীগ

আগামী ২২ ডিসেম্বর সরকারের পতন হচ্ছে- বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম জুড়ে খবরটি চাউর হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগের মন্ত্রী নেতা পাতিনেতারা এ নিয়ে অস্থির। কেনো ওবায়দুল কাদের এবং শেখ হাসিনার কাছ থেকে গোপন খবর আসতেছে- মার্চ/এপ্রিলে ইলেকশনের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে? সরকারের প্রোপাগান্ডা মেশিন বোরহান কবিরের ‘বাংলা ইনসাইডারও খবর লিখেছে- জানুয়ারীর এক তারিখের ভাষণে নির্বাচনের রোডম্যাপ ঘোষণা করবেন শেখ হাসিনা! সব মিলিয়ে ক্ষমতাসীনদের কাছেও খুব গুরুত্বপূর্ন হয়ে দেখা দিয়েছে ২২ ডিসেম্বর ২০১৭।

এই তারিখটি তারকা চিহ্নিত হয়ে আছে বর্তমান সংসদের ১৫৪ বিনাভোটের এমপিকে অবৈধ ঘোষণার রায় প্রকাশের উপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা (গ্যাগ অর্ডার) প্রত্যাহৃত হওয়ার সময় হিসাবে। রায়টি প্রকাশ হওয়ার পরে বর্তমান সংসদ এবং সরকার উভয়ই অবৈধ হয়ে যাবে। এরপরে গোটা দেশজুড়ে শুরু হবে বিশৃঙ্খলা। অবৈধ সরকার হঠাতে দেশজুড়ে লোকজন নেমে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হলে বিক্ষুব্ধ জনতার হাতে অক্কা পেতে পারে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা।

২২ ডিসেম্বরকে কেন্দ্র করে আওয়ামীলীগের ভেতরে ভেতরে সাজ সাজ রব। যদিও অবৈধ প্রধানমন্ত্রী ও তার কিছু চেলাচামুন্ডা নাকশতা ঘটিয়ে সেনা নামানোর পায়তারা করছেন, আবার পেছনে ভয়- যদি আর্মি কথা না শোনে!

অন্যদিকে ঢাকায় ডলারের দাম বেড়ে গেছে, এয়ারলাইন্স গুলোর কাউন্টারে ২২ তারিখের আগের টিকেট পাওয়া খুব কঠিন। সব বুকড অথবা সৌল্ড। লন্ডন আমেরিকা মালয়েশিয়া, কানাডায় হুন্ডির পরিমান বেড়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক কেনেডি বিমান বন্দর, ওয়াশিংটন, হিথ্রো, টরোন্টোতে ঘোষণা দিয়ে হাজার হাজার ক্যাশ ডলার নিয়ে যাচ্ছে আওয়ামীলীগের নেতাদের পরিবার সদস্যরা। প্রায় সকল আওয়ামী বিনাভোটের এমপি মন্ত্রি এবং অনেক জেলার নেতারা ইতোমধ্যে তাদের পরিবার সরিয়ে ফেলেছে। কানাডার বেগমপাড়া, মালয়েশিয়া বা বিভিন্ন রেসিডেন্সি টাউনগুলি দারুন ব্যস্ত। আওয়ামীলীগ নেতা শেখ সেলিম তার পরিবার পাঠিয়ে দিয়েছেন আমেরিকার হিউস্টনে, মাহবুবুল আলম হানিফ পরিবার সরিয়েছেন কানাডার বেগম পাড়ায়।

ইতোমধ্যে বিদেশে পালিয়ে গেছে র‌্যাবে থাকাকালীন হাজারো খুন গুমের জন্য দায়ী কর্নেল (পরে ব্রিগেডিয়ার) জিয়াউল আহসান। তাকে অনুসরণ করতে আরও শ’খানেক পুলিশ র‌্যাবের খুনি অফিসাররা প্রস্তুতি শেষ করে ফেলেছে। আগামী দু’ সপ্তাহে তারা সব পার হয়ে যাবে। অন্যদিকে দীর্ঘদিন যাবৎ বঞ্ছিত অবহেলিত হাজারো পুলিশ কর্মকর্তারা তৈরী হয়ে আছে, সুযোগ পাওয়া মাত্র সদ্ব্যবহারের। সবচেয়ে বড় খুনোখুনি হতে পারে পুলিশে।