Category Archives: অপরাধ

নিউ ইয়র্কে ১৬ মিলিয়ন ডলারে মার্কেট কিনলেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল!

সময় শেষ। বাক্স পেটরা গোছাচ্ছে লীগ মন্ত্রী নেতারা। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত চিন্তা করে লুটেরা মন্ত্রী এমপিরা অনেকেই বিদেশে টাকা ইনভেস্ট করছে। শেখ হাসিনার খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলামের পালানোর প্রস্তুতি চুড়ান্ত প্রায়। সম্প্রতি আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ১৬ মিলিয়ন ডলারে ৭টি দোকান কিনে ফেলেছেন কামরুল। এতে নিজের নামে সামান্য অংশ রেখেছেন, মূল ক্রেতার নাম হিসাবে আছে ভাতিজি শাহানারা খান ও ফজলুর রহমান খান। তাদের ঠিকানা ২২৪৩, ২৮ স্টৃট, এস্টোরিয়া, নিউইয়র্ক ১১১০৫। এই বাড়িটিও বছর দুয়েক আগে ২.৭ মিলিয়ন ডলারে কিনেন এডভোকেট কামরুল।

বাঙালি অধ্যুসিত জ্যাকসন হাইটসের ৩৭ এভিনিউর ওপরে ৭৪ থেকে ৭৫ নম্বর সড়কের মধ্যবর্তী এই ৭টি দোকানের মালিক ছিলেন Chui Yee. এখানে রয়েছে মেঘনা গ্রোসারি, মেজবান রেস্টুরেন্ট, আফগান রেস্টুরেন্ট, কবির বেকারীর মত লাভজনক ব্যবসা। দোকানগুলির মালিক ১৩ মিলিয়ন ডলারে তার প্রোপার্টি অন্যত্র বিক্রি চুড়ান্ত করে ফেলেছিলেন। হঠাৎ এডভোকেট কামরুল তার এজেন্ট দিয়ে ৩ মিলিয়ন ডলার বেশি হাকিয়ে কিনে নেন ঐ প্রোপার্টি, তাও নগদে। অবাক হয়ে চুই মন্তব্য করেন- বাঙালি এত ধনী!

সেনাবাহিনীর প্রভাব ব্যবহার করে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ-হারিসকে মুক্ত করেন জেনারেল আজিজ!

২০০২ সালের জানুয়ারি মাসের এক বিকেল। ফারুক ভাই তার জুনিয়র সহকর্মীকে ডেকে কফি খেতে খেতে গল্প শুরু করলেন। এরা পূর্ব পরিচিতি হওয়ায় প্রায়ই সুখ দুঃখের আলাপ সালাপ করেন, যা সার্ভিসের নর্মসের বাইরে চলে যায়। ফারুক ভাই বললেন- দেখো, তুমি তো আমার সম্পর্কে জানো, এই দলটার জন্য কত কিছু করলাম, কিন্তু দুঃখের কথা কি বলবো- নিজের কাজটাই করতে পারছি না। ইলেকশনের আগে ইনারা কত কথা বললেন, এখন আর আমাকে চিনতেই চায় না!

কেনো, কি হয়েছে, ফারুক ভাই?

তুমি তো জানোই, আমরা চাইলে আইনের মধ্যে থেকেই অনেকের জন্য অনেক কিছু করতে পারি। এবারের ইলেকশনে আমার ডিউটি ছিল বিএনপি মহাসচিব মান্নান ভুইয়ার এলাকায়। ট্রুপস নিয়ে ঘাটি গাড়লাম নরসিংদিতে। প্রথমেই সাক্ষাৎ করি আওয়ামীলীগ ক্যান্ডিডেটের সাথে, এতে সবাই ধারণা করে- খুব প্রফেশনাল অফিসার, এবং আ’লীগের অনুগত! তাকে আশ্বস্ত করলাম- শান্তিপূর্ন ভোট হবে, কোনো কারচুপি কাটাকাটি সন্ত্রাসীকান্ড হবে না।

এরপরে দেখা করলাম বিএনপির হাইপাওয়ার ক্যান্ডিডেট আব্দুল মান্নান ভুইয়ার সাথে। তাকে বললাম, স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আমি একদম ভালো ইলেকশন করে দেব। আপনার জন্য সাধ্যমত সবই করবো। আমি তো আপনাদেরই লোক, স্টুডেন্ট লাইফে আপনাদের ছাত্র সংগঠন করেছি। আপনি নিশ্চিত বিজয়ী হবেন। এলাকায় কোনো সন্ত্রাসীর যায়গা হবে না, আওয়ামীলীগের নাম গন্ধও থাকবে না। তিনি বললেন, কর্নেল সাহেব ধন্যবাদ, সেনাবাহিনী তো আমাদের প্রাইড, আপনারা আইনমত কাজ করলেই হবে।

পরে আরও দেখা হয়েছে, ইলেকশন নিকটবর্তী হলে একদিন সুবিধামত সময়ে ভুঁইয়া সাহেবকে বললাম, ‘স্যার, ইলেকশনে আপনার বিজয় সুনিশ্চিত, এবং আপনারা সরকারও গঠন করবেন। তবে আমার একটা বিষয় আছে- আপনাকে একটু দেখতে হবে। ছোট ভাই জোসেফ জেলে আছে, আমার মায়ের খুব আশা ওকে বাইরে আনার। আর হারিস পলাতক আছে, ও একটু ফ্রি চলাফেরা করতে চায়। আমি আশ্বাস দিচ্ছি, স্যার, ওরা আর কোনো উল্টা পাল্টা কিছু করবে না। আসলে এমপি মকবুলের উৎপাতে আমার ভাইগুলার জীবন ধংস হয়ে গেছে, লীগের গত আমলে আমার একভাই টিপুকে গুলি করে হত্যা করেছে হাজী মকবুলের ছেলে। আর এমপি মকবুল আমার বাকী দু’ভাইকে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সব শুনে মান্না ভুইয়া বললেন, ‘দেখেন কর্নেল সাহেব, এখন আমি এর কোনো খোঁজ খবর নিতে পারব না। তাছাড়া এখন ইলেকশন নিয়ে ব্যস্ত। আগে সরকারে আসি, তারপরে খোঁজ নিয়ে করে দেয়ার চেষ্টা করবো। আপনি টেনশন করবেন না।’

ইলেকশন হয়ে গেলো, সরকার গঠন করলেন মান্নান ভুইয়া সাহেবরা, কিন্তু আমি আর উনার সাথে দেখা করতে পারিনা। প্রটোকল, নরমসের বাধা! অনেক কষ্টে সৃষ্টে হেয়ার রোডের বাসায় উনার সাথে দেখা করলাম, তিনি অবশ্য চিনলেন। কেমন আছেন, খোশ খবর করে চা বিস্কুট খাইয়ে বিদায় করে দেয় আর কি। আমি মোটামুটি জোর করেই ভাইদের কথা তুললাম। তিনি বললেন, ‘দেখুন আমি তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নই, তাও আপনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমি বলে দিব। আপনি ওখানে যোগাযোগ করবেন।’ কিন্তু উনার কথায় তেমন কোনো আন্তরিকতা ছিল না।

‘চলো তোমাকে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাসায় যাই, সহকর্মীকে বললেন ফারুক ভাই। দু’দিন পরে দু’জনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে গেলেন। কথা হলো। কিন্তু মান্নান ভুইয়া কিছু বলে দিয়েছেন, এমন কোনো আভাস ইঙ্গিত পাওয়া গেলো না। উল্টো শীর্ষ সন্ত্রাসী হারিস জোসেফের জন্য কিছু করার সুযোগ এই সরকারের নাই, বলে বিদায় করে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারের দুই মন্ত্রী থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফারুক তার কোর্সমেটদের সাথেও বিষয়টা শেয়ার করেন। তাদের থেকে ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে জানাজানি হয়।

এই ‘ফারুক ভাই’ হলেন লেঃ কর্নেল আজিজ আহমেদ, বর্তমানে লেফটেনেন্ট জেনারেল, সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) পদে কর্মরত। ২০০৯ সালে পিলখানা ম্যাসাকারের পরে মেজর জেনারেল আজিজকে নবগঠিত বিজিবির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেন শেখ হাসিনা। পদের ব্যবহার করে আজিজ আহমেদ পুরোনো ভোল পাল্টে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সাংঘাতিক আস্থাভাজন হতে আত্মনিয়োগ করেন। বিশেষ করে, ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের সময় জেনারেল আজিজ ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহী হয়ে নিজ ফোর্স বিজিবিকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেন, এবং ব্যাপক ধরপাকড় এবং খুনখারাবি করান। মেজর জেনারেল আজিজের কাজে খুশি হয়ে শেখ হাসিনা তাকে আস্থায় নেন, একাধিক সেশনে একান্ত আলাপ করেন। শেখ হাসিনা তার দুর্বল সরকারের জন্য আজিজকে অপরিহার্য মনে করেন। পলে লেফটেনেন্ট জেনারেল পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে এনে কোয়ার্কটার মাস্টার জেনারেল পদে বসান। সার্ভিস ছাড়াও ফারুক ভাইকে নিরাশ করেননি শেখ হাসিনা। তার অনুরোধমত, ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে জোসেফের মৃত্যুদন্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড করে দেন। নামে কারাগার হলেও জোসেফ গত দু’বছর পিজি এবং ঢাকা মেডিকেলে ভিআইপি কেবিনে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দিয়ে প্রায় ফ্রি করে রাখার ব্যবস্থা করেন। অবশেষে গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় বের জোসেফকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেন। আর হারিসকে বহু আগেই বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। নিজের পদ এবং সেনাবাহিনীর প্রভাব ব্যবহার করে জেনারেল আজিজ তার ভাই শীর্ষসন্ত্রাসী জোসেফকে কারামুক্ত করবেন এমন আশংকা প্রকাশ করে আগে থেকেই লেখালেখি চলছিল দেশের বিভিন্ন  মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে। সেই আশংকার বাস্তবায়ন হলো অবশেষে!

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ওয়াদুদ আহমেদের পাঁচ পুত্রের মধ্যে সবার ছোট তোফায়েল আহমেদ জোসেফ তার বড় ভাই হারিস আহমেদের হাত ধরে রাজনীতির মাঠে পদার্পণ করেন। বড় ভাই জেনারেল আজিজ আহমদ ফারুক। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় পার্টি ছেড়ে হারিস যোগ দিয়েছিলেন যুবলীগে। তৎকালীন ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও হয়েছিলেন তিনি। জোসেফ তার বড় ভাইয়ের ক্যাডার বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বপালন করেন। এরপর থেকে মোহাম্মদপুর-হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন জোসেফ। যোগ দেন সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপে। পুরো রাজধানী তখন সেভেন স্টার গ্রুপ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ নামে দু’টি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত। টক্কর লাগে এমপি হাজী মকবুলের সাথে। গোলাগুলিতে নিহত হয়  হারিসের বড়ভাই টিপু। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মিজানের বড়ভাই মোস্তফাকে হত্যা করে ১৯৯৭ সালে গ্রেফতার হয় জোসেফ। ২০০৪ সালে জোসেফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ঢাকার জজ আদালত।  হাই কোর্ট ওই রায় বহাল রাখে। জোসেফ ২০ বছর আগে যখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তার নামে তখন ঢাকার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, খুন, অবৈধ অস্ত্র বহনের অভিযোগে অন্তত ১১টি মামলা ছিল। এভাবেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম উঠে আসে জোসেফের।

চলতি মাসে সেনাপ্রধান নিয়োগের সিস্টেমে জেনারেল আজিজ শেখ হাসিনার অন্যতম ক্যান্ডিডেট হলেও শুভাকাঙ্খিরা পরামর্শ দিয়েছেন, আজিজকে সেনাপ্রধান করে সুবিধা হবে না, কেননা জেনারেল আজিজ সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে আনপপুলার লোক। বিশেষ করে, জোড়া শীর্ষসন্ত্রাসীর জেষ্ঠ্য সহোদরকে সেনাবাহিনী প্রধান করা হলে জনমনে দারুণ বিরুপ মনোভাব হবে, তাছাড়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনেকেই এই নিয়োগ মানতেও চাইবে না। আজিজ ইতোমধ্যে তার চাহিদা সব আদায় করে নিয়েছে। এরপরে তিনি যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারেন নিশ্চিন্তে, তাঁর সেই অভ্যাস আছে।

 

আমারে মারবেন ক্যান, স্যার?

রবিউল রক্তশূন্য মুখে কাঁপতে কাঁপতে বলল, স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন? রবিউল যখন প্রশ্নটা করল তখন আমি সিগারেটে সর্বশেষ টান দিচ্ছি। প্রশ্ন শুনে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য থামলাম। তারপর আবার লম্বা করে টান দিয়ে ঠোঁট গোল করে উপর দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেট মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে ঘষে আগুন নেভালাম। রবিউলের জবাব না দিয়েই বললাম, ফারুক! ওর চোখ বাঁধো।

রবিউল নামের মধ্যবয়সী লোকটা এবার চূড়ান্ত ভয় পেয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে তার চোখে মুখে যে সামান্য আশা ছিল সেটা মুহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেছে। তার কপাল থেকে নিয়ে থুতনি পর্যন্ত পুরো মুখমন্ডল একটা নির্দিষ্ট ছন্দে কাঁপছে। ফারুক চোখ বাঁধার কাপড় খুঁজতে গাড়িতে চলে গেল। আমি বিরক্ত হলাম। গাড়ি থেকে নামার সময়েই জিনিষটা পকেটে করে নিয়ে আসা উচিত ছিল। ভালো ছিল গাড়িতেই চোখ বেঁধে রেখে দিতে পারলে। এসব কাজে দেরি করার কোনো মানে নেই। ঝামেলা যত দ্রুত সরানো যায় ততই মঙ্গল।

“স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন?”- রবিউল দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রশ্ন করলে আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, এত কথা কেন রে বাপ? উত্তর কিছুক্ষণের মধ্যে এমনিতেই পেয়ে যাবা। এখন আল্লাহ খোদার নাম নাও।

রবিউল এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেল সে মারা যাচ্ছে। এক মুহুর্ত নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে তারপর অদ্ভূত এক কাজ করে ফেলল লোকটা। হাতে হ্যান্ডকাফ বাঁধা অবস্থায় ঝপ করে কাঁটা ফলের মতো আমার পায়ের নিচে পড়ে হাউমাউ করে বলল, স্যার আমারে মাইরেন না। আমি নির্দোষ স্যার! ও স্যার গো! আপনার দোহাই গো!

কে দোষী আর কে নির্দোষ সেটা ঈশ্বরের পরে যদি কেউ জানে তবে সেটা র‍্যাব-পুলিশ। এই লোকটা যে আপাতমস্তক ভালো মানুষ, সেই খবর তার স্ত্রীর অজানা থাকলেও আমাদের অজানা নয়। ভালো মানুষদের নাকি আয়ু কম থাকে, সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। যুগে যুগে ভালো মানুষদের এই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। কে পরাঘাতে মরে নি? সক্রেটিস? কোপার্নিকাস? বান্না? এমনকি যিশু খ্রিষ্টকেও এভাবেই মরতে হয়েছে। যুগের নিয়মই এমন। সভ্যতার রীতি এটাই। আমি নিয়ম পাল্টানোর কেউ নই!
রবিউলকে টেনে হিঁচড়ে মাটি থেকে তোলা হলো। তার গায়ে এই বিস্তীর্ণ মাঠের কিছু ধুলো লেগে গেল। লোকটার কাঁপুনি ক্রমশই বাড়ছে। আমার জানামতে আগামীকাল জোছনা। এই পরিষ্কার আকাশে আজকের রাতটাকেই জোছনা রাত বলে মনে হচ্ছে। চাঁদের আলোয় রবিউলের চোখের কিনার ঘেষে নেমে পড়া অশ্রুর ধারা চিকচিক করছে। বিরাট আকাশের নিচে রাতের এই নির্জনতায় রবিউলকে মনে হচ্ছে সামান্য কীট পতঙ্গ, যার জন্ম হচ্ছে কেবলই মৃত্যুর জন্য!

রবিউল আরেকবার ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলো। এবার পেছন থেকে দুইজন তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। পড়তে না পারলেও সে খানিকটা চিৎকার করে সেই একই কথা বলল, ‘স্যার আমারে মাইরেন না স্যার। আমি নির্দোষ স্যার। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। তাদের দেখার কেউ নাই স্যার। আমার বউ খুব অসুস্থ স্যার।’

আমি উল্টো ঘুরে পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। চারপাশে বাতাস, লাইটারে আগুন ধরাতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কাজটাতে নতুন না আমি, তারপরও প্রতিবারই একটু হলে অস্বস্তি লাগে। সিগারেট তখন খুব কাজে দেয়। নিকোটিন রক্ত থেকে অনেকটাই উদ্বেগ কমিয়ে দেয়। যদিও এখানে উদ্বেগের মতো কিছুই নেই। লোকটা আহামরি কেউ না। ছোটখাটো ব্যবসায়ী। সরকারদলীয় এক নেতার টেন্ডারবাজীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এলাকায় হিরো হয়ে গেছে। স্থানীয় জনতার সহায়তায় নেতার ছেলেকে ধর্ষণ চেষ্টারত অবস্থায় ধরে গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করিয়েছে। তারপর নেতার পুত্রকে গ্রেফতারের জন্য করেছে থানা অবরোধ। লোকটার ভালো পজিশনে বেশ কিছু জমি আছে। নেতা ভদ্রলোক সেই জমি হজম করতে চাইছেন। বাংলাদেশের বাস্তব আইনে মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দায় রবিউল জমা করে রেখেছে!

দুই মিনিট হয়ে গেছে। ফারুক আসতে এত দেরি করছে কেন? গুলি করেই কাজ শেষ না। আরো যন্ত্রযোগাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। হাত না চালিয়ে কাজ করলে কীভাবে হয়?

রবিউল ঘুরে ফিরে একই আর্তনাদ করেই যাচ্ছে। মুখ বেঁধে রাখলে ভালো হতো। সেটার অবশ্য খুব বেশি দরকার নেই। এই চিৎকার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো কানে পৌঁছাবে না, অবশ্য সৃষ্টিকর্তা যদি শুনতে ইচ্ছুক হোন তবেই। রবিউলের ভেতরেও বোধহয় একই বোধ জাগল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো!

ডাকুক, বেশি করে ডাকুক। এসব বোকা মানুষগুলো ভাবে জগতে ঈশ্বরের একটাই সত্ত্বা। অথচ জগত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঈশ্বরে বিভক্ত। এই যে রবিউল নামের এই লোকটাকে আমি একটু পরে মারতে যাচ্ছি সেটা নিজের ইচ্ছায় নয়, আমাকে একজন ঈশ্বর আদেশ করেছেন। সেই ঈশ্বরকে আদেশ করেছেন হয়তো আরেকজন, আরেকজনকে আরেকজন, সেই আরেকজনকে অন্য আরেকজন। রবিউল নামের এই সামান্য কাপড় ব্যবসায়ীর ধারণাই নেই তাকে মারার জন্য কত নীরব আয়োজন ঘটে গেছে–কত বছর, কত যুগ আর শতাব্দি ধরে এই আয়োজন চলে আসছে। অথচ সে কেবল আমার দিকেই ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে যেখানে আমার অপরাধটাই সর্বনিম্ন।

ফারুক কাপড় নিয়ে এসেছে। গাড়ির কাছে গিয়েই তার পেচ্ছাব চেপেছিল। সেই কাজ করতে গিয়ে একটু দেরি হয়েছে। এই পেচ্ছাব স্বাভাবিক না, শরীরে এঙজাইটি বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন হয়েছে। ফারুকের মতো কালো কাপড়ের মানুষও যদি এঙজাইটিক হয়ে যায়, রবিউল নামের মানুষটার ভেতরে এখন কি হচ্ছে কে জানে!

ফারুক চোখ বেঁধে নিল। সর্বশেষ বারের মতো রবিউলের চোখের দিকে তাকালাম আমি। জোছনার আলোয় রবিউলের চোখ গড়িয়ে এখনো পানি পড়ছে। তার সাথে সমস্ত জগতের রাগ, ক্ষোভ, বিস্ময় এবং ঘৃণা।

রবিউলের সময় শেষ হয়ে এসেছে। শেষবারের মতোও সে চিৎকার করে বলল, ‘স্যার আমার দুইটা বাচ্চা মেয়ে আছে স্যার। ওরা আজকে কাঁঠাল খাইতে চাইছিল। বছরের প্রথম কাঁঠাল বাজারে উঠছে। ওরা কাঁঠালের আশায় সারা রাত বসে থাকবে স্যার। স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। আমার বউ অসুস্থ স্যার। তার ডায়বেটিস, প্রেশার। তারে ডাক্তারের কাছে নেয়ার কেউ নাই।’

আমি এসব কানে দিলাম না। অভ্যস্ত হাতে হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করলাম। যেহেতু ব্যাপারটাকে ‘বন্দুক যুদ্ধ’ হিসেবে চালানো হবে সুতরাং বন্দুক দিয়ে গুলি করলে ভালো হতো। এতসব যন্ত্রণায় যাওয়ার দরকার নেই। এটা ইউরোপ আমেরিকা না যে গুলি ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করা হবে। এটা বাংলাদেশ। এখানে একটা লাশের পেছনে এত সময় দেয়ার কিছু নেই। কেউ খুঁজতেই আসবে না।

আমি ট্রিগার টানলাম। “খট” করে একটা শব্দ হলো। এই শব্দ শুনেই রবিউল একেবারে চুপ হয়ে গেল। মানুষের বিশ্বাসের অনেক দেয়াল থাকে। সম্ভবত তার সর্বশেষ দেয়াল এখন ভাঙল। একটু আগেও হয়তো সে ভেবেছে কোনো না কোনো ভাবে সে বেঁচে যাবে। তার দুই বাচ্চাকে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়াবে। পিস্তল টানার শব্দে সে বিশ্বাস টুঁটে গেছে। তাকে কালিমা পড়তে বলা উচিত। আমি বললাম না। একবার একজনকে বলেছিলাম। অর্ধ উন্মাদ লোকটা আমার মুখে থু থু দিয়ে বলেছিল “তোর কালিমা তুই পড়। তুইও মরবি একদিন!”

আসলেই কথাটা চমৎকার। সবারই তো মরতে হবে। হত্যা খুব বড় কোনো অপরাধ না। এটা পূর্বনির্ধারিত একটা বস্তু। আজকে আমি এই ক্রসফায়ার না করলে অন্য কেউ করত। আমাদের চারপাশের যে সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঈশ্বর, তাদের কাজ কখনো আটকায় না। বরং যারা আটকায়, তাদেরকেই আটকিয়ে দেয়া হয়।

রবিউল বিড়বিড় করে বলল, স্যার আমারে ক্যান মারবেন?—এই প্রথমবারের মতো আমি কোনো প্রশ্নের উত্তরে বললাম, জন্মের অপরাধে। জন্মের অপরাধে সকলকেই মরতে হয়। তাছাড়া তুমি ঈশ্বরের দেশে বাস করো- ঈশ্বরবিরোধী কর্মকান্ড করেছো। ঈশ্বরের বিচারে তোমার শাস্তি হচ্ছে। এবার আসমানের ঈশ্বরের কাছে যাও। পরের বিচারটুকু তাঁর কাছে গিয়েই দিয়ো। তিনি যদি সত্যিই থেকে থাকেন তবে হয়তো এতদিন সব বিচার করবেন।

আমার এত জটিল কথা নেয়ার মতো অবস্থায় রবিউল যে নেই, সেটা আমিও জানি। তার ঠোঁট কাঁপছে। আমি স্থির হাতে পিস্তল উঁচিয়ে ধরলাম। চোখ বাঁধার কারণে রবিউল এই দৃশ্য দেখছে না, দেখলে গা মোচড়ামুচড়ি করত। মৃত্যুর প্রতি মানুষের সীমাহীন ভয়, জীবনের প্রতি সীমাহীন আশা। শেষ মুহুর্তেও মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। কেনো করে- কে জানে!

তিন ফুট দূর থেকে আমি রবিউলের বাম বুক তাক করলাম। আমার দলের বাকি তিন সদস্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আমি ট্রিগার চাপতে যাচ্ছি ঠিক এই মুহুর্তে রবিউল বলল, স্যার গো…..

আমি থেমে গেলাম।

রবিউল বলল, স্যারগো! আপনারও মেয়ে আছে গো স্যার!

আমার পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে এটা এই লোকের জানার কথা না। লোকটা নিশ্চয়ই আন্দাজে বলে ফেলেছে। তবে আন্দাজ কিছুটা কাজ করেছে বলেই সে বাড়তি তিন সেকেন্ড সময় পেয়ে গেল। জীবনের শেষ সময়ে তিন সেকেন্ড সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। কতটা দামী সেটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ।

আমি রবিউলের বুকে পরপর তিনটি গুলি করলাম।

:

মানুষের মধ্যে হাজার রকম তফাৎ। ধর্মে, বর্ণে, নামে, চেহারায়, কর্মে সব মানুষই আলাদা। মৃত্যু সব মানুষকেই এক করে ফেলে। গুলি করার পর সবার শরীর থেকে রক্ত বের হয়, কাঁটা ফলের মতো পড়ে যায়। সবাই শেষের দিকে এসে অপার্থিব গোঙানি দেয়। এখানে কোনো তফাৎ সৃষ্টি হয়না।

রবিউল মিনিট দুয়েক “মা গো” “পানি পানি” এবং “নাসিমা-ফাহিমা” বলে গোঙাচ্ছিল। একটু আগে সেটা স্থির হয়ে গেছে। নাসিমা-ফাহিমা বোধহয় তার দুই মেয়ের নাম। দুই মেয়ের জন্য আগামীকাল দিনটা ভীষণ যন্ত্রণায় যাবে। ৮ বছর আর ৬ বছরের দুই বাচ্চা হুট করেই আবিষ্কার করবে তাদের বাবা নেই। তাদের বাবা ছিল মাদক ব্যবসায়ী। তাদের বাড়ি পুলিশে আর মানুষে ভরে যাবে। দুইটা বাচ্চা হতবিহ্বল হয়ে তাদের মায়ের মুর্ছা যাওয়া দেখবে। আগামীকাল কবর খোড়া থেকে নিয়ে অশান্তি আর অনিশ্চিত প্রস্তুতির যে জীবন শুরু হবে সেটা আর কোনো দিন থামবে না।

প্রস্তুতি আমাদেরও নিতে হবে। লাশের পাশে কয়েকটা গুলির খোসা, কয়েশ পিস ইয়াবা রেখে দিতে হবে। একটা ভাঙাচোরা বন্দুক আছে, সেটা সেট করতে হবে জায়গামতো। লাশের পকেটে মোবাইল ফোনে কিছু রেকর্ড হলো কিনা দেখা দরকার। দূর থেকে কেউ ভিডিও টিডিও করে ফেললে সাময়িক সমস্যায় পড়ে যাব। একটু ঘুরে সেটাও নিশ্চিত করা উচিত। এদেশের মানুষের কল্পনাশক্তি নিম্নশ্রেণীর জীবের চেয়েও কম। এদের চোখের আড়ালে এক লাখ ক্রসফায়ার করলেও মস্তিষ্ক সেসব দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে না। অথচ কোনো ভিডিওতে কারো চড় মারা দেখলেই মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যাবে। আলোড়ন সৃষ্টি হলেও তেমন কিছু হবে না। কিছুদিন আলোচনা হবে। এক সময় দলে দলে ভাগ হবে আলোচনাকারীরা। সামনে আসবে নতুন কোনো আলোড়ন। সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। তারপরও খুব যদি কিছু হয় তবে দেশে ঈশ্বরেরা আছেন। বাকিটুকু তারাই দেখবেন। তারপরও অডিও, ভিডিও থেকে সাবধান থাকা ভালো। সবকিছু শেষ হলে একটা মুখস্ত প্রেস ব্রিফিং দিতে হবে। সেখানে সবকিছু আগে থেকেই টাইপ করা আছে, শুধু এডিট করে রবিউলের নাম আর বয়স বসিয়ে দিলেই হয়।

আর দুই ঘন্টার মামলা। তারপর আমি নিশ্চিন্ত। শুধু আজকের জন্য না, আগামী অনেক দিনের জন্য। আসমানের ঈশ্বরই যে তার কাজে পুরষ্কৃত করেন তা না, মাটির ঈশ্বরেরাও তাদের কাজ করে দিলে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে দেন। আমার পুরষ্কার আছে। আসমানের ঈশ্বরের মতো এখানে সময়ক্ষেপণ নেই। এই পুরষ্কার হাতে আসবে খুব দ্রুত।

:
:

আমার স্ত্রী মিলি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, চা খাবে?

আমি পত্রিকা পড়ছিলাম। মুখ না তুলেই বললাম, দিতে পারো।

মিলি কিচেনের দিকে চলে গেল। আমি পত্রিকা ঘাটাঘাটি করছি। পঞ্চম পৃষ্ঠার সপ্তম কলামে গিয়ে কাঙ্খিত খবরটা খুঁজে গেলাম। “র‍্যাবের ক্রসফায়ারে মাদক ব্যবসায়ী নিহত!”

“গতকাল রাতে রাজধানীর কেরানীগঞ্জে র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে রবিউল ইসলাম (৩৮) নামের এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। নিহত রবিউল ডেমরা এলাকার আব্দুল মালিকের পুত্র। র‍্যাব জানায় গোপন খবরের ভিত্তিতে রবিউলকে নিয়ে মাদক উদ্ধারে বের হয় র‍্যাব। পথিমধ্যে রবিউলের সহযোগীরা র‍্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। র‍্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে পালানোর সময় রবিউল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। র‍্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুক, দুই রাউন্ড গুলি এবং চার’শ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে!”

খবর পড়ে বরাবরের মতোই আমার হাসি পেল। রবিউলকে ধরা থেকে নিয়ে গুলি করা এবং লাশ মর্গে পাঠানো পর্যন্ত আমাদের ব্যয় হয়েছে সর্বমোট ১১ ঘন্টা। সাংবাদিকরা এত আয়োজন করে করা একটা ঘটনাকে পঞ্চম পাতার সাত নাম্বার কলামে দেড় ইঞ্চির মধ্যেই শেষ করে ফেলেছে। তিলটা গুলি করতে আমার যতটা সময় লেগেছে এই খবর পড়তে লেগেছে তারচেয়েও কম। জীবনের দাম এখন কারো কাছেই বেশি না। না খুনীর কাছে, না সাংবাদিকের কাছে, না রাজার কাছে, না জনগণের কাছে। এককভাবে এই হত্যার দায় আমি কীভাবে নিই?

মিলি চা নিয়ে এসেছে। তার হাঁটার ভঙ্গি কেমন যেন সাপের মতো। আমাদের বিয়ের ৮ বছর হয়ে গেছে। মিলির শরীরে এই আট বছরে কয়েক কেজি মেদ জমেছে। কিন্তু শরীরটা এখনো সেই আগের মতোই আবেদনময়ী। শাড়ির ফাঁক গলে পেটের মধ্যে যে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে সেটা এতটুকু দৃষ্টিকটু নয়।

– মিলি পাশে এসে বসতেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
– মিলি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, এত আহ্লাদ করার দরকার নাই।
– আমি মিলির শরীরে চাপ দিয়ে বললাম, তাহলে কি করতে হবে?
– সংসারের খবর রাখতে হবে। বউয়ের খবর রাখতে হবে। প্রতিদিন দেরি করে বাসায় ফিরলে বউ অন্য পুরুষ ঘরে ঢোকাবে কিনা, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।

– আর?

– আর বাচ্চাটার খবর রাখা দরকার। ৫ বছরের একটা বাচ্চা, বাবা বাবা বলে ঘুমিয়ে পড়ে। তার জন্য না একটা খেলনা এরোপ্লেন আনার কথা, সেটা কই?

শান্তা দুইদিন আগে এরোপ্লেনের আবদার করেছিল। রবিউলের ব্যস্ততায় সেটা মনেই করতে পারিনি। আহারে, আমার মেয়েটা হয়তো এরোপ্লেনের কথা ভেবে ঘুমাতে পারেনি। এক মুহুর্তের জন্য রবিউলের দুইটা মেয়ের কথা মাথায় আসল। কি যেন নাম? নাসিমা- ফাহিমা। ওরা বাবার কাছে কাঁঠাল খাওয়ার জন্য আবদার করেছিল। বাচ্চা দুইটা কী এ জীবনে আর কোনোদিন কাঁঠাল মুখে দিতে পারবে? অবশ্য তাদের জীবনে ঘোর অন্ধকারের এখনো অনেক বাকি। তাদের জমি দখল হবে, ব্যবসা হাতছাড়া হবে। এক সময় বানের পানির কচুরিপানার মতোই তাদেরকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো লাগবে। জীবন কতটা নিষ্ঠুর কতটা অন্ধকার তার পূর্ণ শিক্ষা এরা খুব দ্রুত পেয়ে যাবে।

মিলি বলল, কি ভাবছ?

আমি বললাম, কিছু না।

– কিছু তো অবশ্যই। আজকাল তুমি আমাকে অনেক কিছুই বলো না। কোথায় যে কি করে বেড়াচ্ছ কে জানে! মেয়ে টেয়ে নিয়ে হোটেলে উঠলে কিন্তু খবর আছে। স্রেফ খুন করব। খুন করে বিধবা হয়ে যাব।

আমি আরেকবারের জন্য রবিউলের বিধবা স্ত্রীর কথা ভাবলাম। মেয়েটার বয়স কত হবে? হয়তো মিলির বয়সীই হবে, কিংবা আরো কম। এই মেয়েটা আজীবন একা থাকবে, কত দীর্ঘ রজনী পার করতে হবে একা একা। মেয়েটার শরীর থেকে মিলির মতোই গন্ধ বেরুবে, সেই গন্ধে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসবে পতঙ্গ। দুইটা বাচ্চা মেয়েকে সামলাতে গিয়ে সে নিজে দিশেহারা হয়ে যাবে। এক সময় হয়তো ভুলেই যাবে শরীর কী, মন কী, জীবন কী? রবিউল মাত্র তিনটা গুলিতে উদ্ধার পেয়ে গেছে। এই মেয়ে সারা জীবন বুলেটবিদ্ধ হবে। রবিউলের মতো আর্তনাদ করার অধিকারটুকু সে পাবে না।

মিলি ভীষণ আদুরে গলায় বলল, এ্যাই…

– আমি বললাম, বলো।

– চলো না, একবার ঘুরে আসি।

– কোথায়?

– অজানাতে…

– সেটা কী?

– যেখানে নদী এসে মিশে গেছে। হাহাহা।

– হেয়ালী করছ?

– হ্যাঁ করছি। সত্যিই ঘুরে আসি। কতদিন ঘুরি না।

– কোথায় যাবে বলবে তো।

– গ্রান্ড সুলতানে যাব। শ্রীমঙ্গল। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। মাঝখানে তুমি আর আমি। সুন্দর হবে না?

– হ্যাঁ হবে।

– কবে যাবে?

– আগামী সপ্তাহে।

মিলি চিৎকার করে বলল, ও মা সত্যিই?

আমি বললাম, হ্যাঁ সত্যিই। রেডি হও।

মিলি আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে বলল, আমার দাবী মানার জন্য তুমি আমার কাছে পাওনাদার হয়ে গেলে। আজকে তোমার যাবতীয় ঋণ শোধ করা হবে।
তার ঠোঁটের কোণে বাকা হাসি। এই হাসির অর্থ আমি জানি। এটা তার বিখ্যাত নিষিদ্ধ হাসি, এটা তার বিখ্যাত বিশুদ্ধ হাসি। আমি তাকে তরল গলায় কিছু বলতে যাব তখনি শান্তা ঘরে ঢুকে বলল, আব্বু!

আমি বললাম, জ্বী মা!

– আমার হেলিকপ্টার কই?

– আছে। কালকেই পেয়ে যাবা।

– তুমি আজকে আননি কেন? আজকে যদি হেলিকপ্টারওয়ালা মারা যায়?

– মারা যাবে না। আর মারা গেলেও আমি ঠিকই নিয়ে আসব কালকে।

– মারা গেলে তখন কীভাবে পাবে? লোকটার তো কবর হয়ে যাবে।

আমি ঘড়ির দিতে তাকালাম। সন্ধ্যে সাতটা বাজে। হিসেব মতে আজকে রবিউলের লাশ তার বাড়িতে যাওয়ার কথা। দীর্ঘ আয়োজনের পর এতক্ষণে সম্ভবত তার কবর হয়ে গেছে। সে এখন আসল ঈশ্বরের মুখোমুখি। আসল ঈশ্বর কী তাকে তার প্রাপ্য পুরষ্কারটুকু দেবেন?

আমার ঈশ্বর অবশ্য আমার প্রাপ্যটা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংক একাউন্ট আরেকটু ভারী হয়ে গেছে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র একটা অংশ দিয়ে হবে গ্রান্ড সুলতান ট্রিপ। সেখান থেকে ফিরব, ঈশ্বর থেকে চলে আসবে নতুন কোনো নির্দেশনা।

আসল আর স্থানীয় ঈশ্বরদের মধ্যে পার্থক্যটা চমৎকার। আসল ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেন, আর স্থানীয় ঈশ্বরদেরকে সৃষ্টি করি আমরাই। আসল ঈশ্বরের মতোই স্থানীয় ঈশ্বরদের নিজস্ব ভক্ত থাকে, ধর্ম থাকে। পার্থক্য হচ্ছে আসল ঈশ্বর আজন্ম আরাধনা করেও ভক্ত ঈশ্বর হতে পারে না, ঈশ্বরকে বদলাতে পারে না। তবে এখানে ঈশ্বর বদল আছে, চরম ভক্ত থেকে ছোটখাটো ঈশ্বরে পদোন্নতির সম্ভাবনা আছে। দুই ক্ষেত্রেই ঈশ্বর বড় বেশি একরোখা। নিজেদের তৈরি আইনে তারা “বিরোধ” পছন্দ করেন না।

আমি এত কঠিন চিন্তা করছি কেন? ইদানিং কি মাথায় বেশি চাপ পড়ছে? চাপ কমানোর জন্য তাড়াতাড়ি ট্যুরটা করে ফেলতে হবে।

শান্তা দৌঁড়ে এসে আমার কোলে চড়ে বসল। আমি তার কপালে লম্বা করে চুমু দিলাম। বাচ্চাটা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

আমি অনুভব করলাম সেই চিরন্তন বাণী “পৃথিবীতে খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই।”

ঠিক তখুনি আমার কানে রবিউলের চিৎকার চলে আসল। “স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা বাচ্চা আছে।”

রবিউল বড় বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে তো! এভাবে আগে কেউ দেয়নি।

:

:

আমরা শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি।

মিলি বাইরে দূরে কোথাও ঘুরতে বের হলে ড্রাইভার নেয়া পছন্দ করে না। তার মতে এতে প্রাইভেসী নষ্ট হয়। সময়টুকু নিজেদের থাকে না। মিলির কারণেই তখন আমাকে ড্রাইভার হয়ে যেতে হয়।

আমি ড্রাইভার হিসেবে যথেষ্ট সাবধানী। এখন পর্যন্ত ছোটখোটো কোনো দুর্ঘটনাও ঘটাইনি। তারপরও স্ত্রী সন্তান সাথে থাকলে সামান্য চাপ অনুভব করি। এত দূরের পথে ড্রাইভারকে আনলেই বোধহয় ভালো ছিল।

আমরা ভৈরব ব্রীজ পার হয়ে গেলাম। ব্রীজের পাশ ঘেষে রেলসেতু। শান্তা মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছে। মেয়েটাকে নিয়ে বাইরে বের হওয়া হয় খুবই কম। এখন থেকে একটু অভ্যেস করিয়ে নিতে হবে। মেয়ের বয়সের তুলনায় ততটা বুদ্ধি হচ্ছে না। এই বয়সের বাবা মায়ের সঙ্গ তার অনেক বেশি দরকার।

গাড়িতে রবীন্দ্র সংগীত বেজে চলেছে, “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে গান।” মিলি গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে তার আনন্দ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। গাড়ি ছুটে চলেছে একই গতিতে। বহুদিন পর ড্রাইভ করে আমিও আরাম পাচ্ছি।

আমরা হবিগঞ্জে ঢুকে পড়লাম। আর কিছুদূর গেলেই প্রকৃতির অপরূপ রূপ চোখে পড়বে। তারপাশে ঘন সবুজ বন, চা বাগান। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। মিলি আর শান্তা আগে কখনো এদিকে আসেনি। তারা ঠিক কতটা যে খুশি হবে ভেবেই আমি আনন্দ পাচ্ছি। তবে আমার আনন্দে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে গেল।

সামনে বড় রকমের জ্যাম। এই রাস্তায় জ্যাম হওয়ার কথা না। আমি গাড়ি থেকে মাথা বের করে একজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম সামনে একটা ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়েছে। ট্রাক আটকে সাময়িক একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। একটু পরেই সেটা খুলে যাবে।

গাড়ি থেকে চাইলে বের হওয়া যায়। এই মুহুর্তে বের হতে ইচ্ছে করল না। আশেপাশে দাঁড়ানোর মতো ভালো জায়গা নেই। বরং গাড়ি থামিয়ে স্ত্রী কন্যার সাথে একটু গল্প করা যায়।

আমাদের গাড়ির দুইপাশে আরো দুইটা গাড়ি এসে থেমে গেল। সবার চোখে মুখে বিরক্তি। ট্রাক এক্সিডেন্টে কেউ মারা গেছে কিনা এ খবর কেউ নিচ্ছে না। সবারই মনোযোগ কখন জ্যাম ছাড়বে তার প্রতি। আমি পেছন ঘুরে শান্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা মণি কেমন আছো?

শান্তা বলল, ভালো আছি আব্বু। আর কতদূর?

আমি বললাম, এই তো চলে এসেছি। আর সামান্য দূর। তারপরেই পৌঁছে যাব।

শান্তা বলল, আমরা সেখানে গিয়ে অনেক মজা করব তাই না?

আমি বললাম, হ্যাঁ। অনেক মজা হবে।

মিলি আমাকে বলল, তুমি একটু হেঁটে গিয়ে দেখো না কি সমস্যা। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকা যায়।

– একটু সময় বসলে খুব বেশি ক্ষতি নেই। অপেক্ষা করা ভালো। অপেক্ষা এক ধরণের পরীক্ষা।

মিলি চুপ হয়ে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে বসে পড়লাম। রবিউলকে ক্রসফায়ার দেয়ার সপ্তাহখানেক হয়ে গেছে। সবকিছু পুরোপুরি শান্ত। আমার ক্রসফায়ার নিয়ে এখনো কোনো সমস্যা হয়নি অবশ্য। কারোরই সমস্যা হয়না। সমস্যা করে বসে কিছু অতি উৎসাহীরা। এরা ফটো তুলে, ভিক্টিমের আর্তনাদ ভিডিও করে মজা নেয়ার জন্য। কোনো না কোনো ভাবে এরা এক সময় ফেঁসে যায়। আমি এসব করিনা, আমার সমস্যাও নেই। তারপরও প্রতিবারই সামান্য খচখচানি কাজ করে কিছুদিন। আমার মনে রবিউল ইস্যু চিরতরে ভুলে যাবার সময় চলে এসেছে।

বেলা দুইটা বিশ বাজে।

জ্যাম লাগার বিশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে। এখনো খোলার নাম নেই। একবার গাড়ি থেকে বের হয়ে খবর নেয়া উচিত। এই ভাবনা যখন এসেছে তখুনি একটা বিদঘুটে “ঝন ঝন ঝন” শব্দ আমার কানে আসল। ট্রেনের সিগন্যালের শব্দ! এর মানে ট্রেন আসছে। আমি এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম আমাদের গাড়ি ট্রেন লাইনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই জিনিষটা আগে কেনো লক্ষ্য করিনি?

আমি গাড়ির দরজা খুলতে গেলাম। পাশের গাড়ির আমার গাড়ির সাথে চেপে আছে। দরজা খোলা সম্ভব না। দুইপাশের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে বাইরে চলে গেছে। আমি দরজা খুলতে পারছি না। মুখ বের করে চিৎকার করলাম। আশেপাশে কেউ নেই। একটু দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদের চোখে মুখে ভীতি।

গাড়ি সরানোর কোনো উপায় নাই। সামনে পেছনে গাড়ি। আমার গাড়ি সরাসরি লাইনের উপর। পাশের দুই গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি রেখে উধাও। কানের মধ্যে অনবরত “ঝনঝনঝন” আওয়াজ বেজেই চলেছে। আমি রক্তশূন্য মুখে মিলির দিকে তাকালাম। মিলি সমান আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খুব সহজ একটা ফাঁদে আমরা আটকা পড়ে গেছি।

সবকিছু কেমন জানি অপার্থিব মনে হলো আমার কাছে। প্রকৃতি এত অস্বাভাবিক আয়োজন করে রেখেছিল আমার জন্য? দুইপাশে দুইটা গাড়ি কখন এসে থামল ব্যাপারটা মাথাতেই নিইনি। এভাবে গাড়ি ট্রেনের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেও মনে কোনো ভয় জাগেনি। অথচ এক মুহুর্তের ব্যবধানে প্রতিটা পশমে মৃত্যু ভয় চলে এসেছে।

আমি পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগলাম। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সজোরে সামনের গাড়িকে ধাক্কা দিলাম। কিছুই হলো না।

ট্রেন খুব কাছ থেকে হুইসেল দিল। মিলি শান্তাকে জড়িয়ে ধরে “ও আল্লাহ, ও আল্লাহ” করছে। এক পর্যায়ে সেও পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগল এবং চিৎকার করে বলল “আমাদের বাঁচান। কে আছেন, বাঁচান প্লিজ।”

ট্রেনের শব্দ সরাসরি কানে আসছে। আমার হাতে আর কয়েক মুহুর্ত। আমি গ্লাসে সজোরে ঘুষি বসালাম। কোন কাজ হলো না। একটা পর্যায়ে আমার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিল আমি নিজেই আজকে রবিউল। মৃত্যুকে সামনে রেখে অযথাই আর্তনাদ করে যাচ্ছি। আমার ভীত আত্মা কল্পনা করল আমার সামনে রবিউল দাঁড়িয়ে আছে আর আমি তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছি। এক সময় সত্যি সত্যিই আমি চিৎকার করে বললাম, আমারে ক্ষমা করে দেন ভাই। আমার স্ত্রী কন্যা মারা যাবে। তারা দোষ করেনি। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ…..

মৃত্যু মুহুর্তে যে মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে সেটা আমি বুঝতে পারছি। আমার মস্তিষ্ক বলছে রবিউলের স্ত্রী কন্যাও দোষ করেনি। তারাও শাস্তি পাচ্ছে। একই নিয়মে হয়তো আমার স্ত্রী কন্যাও মারা যাবে। এতদিন পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে সেগুলোকে ক্রসফায়ার বলেছি। এবার জীবনে সত্যিকারের ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হচ্ছি আমি। ঐ যে বিশাল ট্রেন এটাই হচ্ছে বুলেট। কোনো অদৃশ্য বিরাট শক্তি সমস্ত আয়োজন করে বুলেট ছুড়েছে। আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে জান্তব গুলি।

মিলি পাগলের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। শান্তা মিলিকে জড়িয়ে ধরে আছে। দৃশ্যটা দেখে আমার চোখ ফেটে গেল। সেই ফেটে যাওয়া চোখে ট্রেনটা চোখে পড়ল।

আর কয়েক সেকেন্ড!

আমি চোখ বন্ধ করলাম। কল্পনায় ধরে নিলাম ফারুক আমার চোখে কাপড় পরিয়ে দিচ্ছে। ট্রেন আরেকবার “পোওও” করল। সেটাকে আমার কাছে ট্রিগার টানার শব্দ মনে হলো। শান্তা শেষ সময়ে “আব্বু” বলে চিৎকার করছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা শান্তা না। এটা শান্তা-নাসিমা-ফাহিমার সমন্বিত কণ্ঠ। আমি বুঝতে পারছি প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো সময়ের রবিউল। শুধু সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

ট্রেন একেবারে কাছে চলে এসেছে। প্রথমে আমার সামনের গাড়িকে ধাক্কা মারবে, তারপর আমাদেরকে। আগামীকালকে বনানীতে খোঁড়া হবে পাশাপাশি তিনটি কবর। রবিউলের কবরের পাশে কান্নার মতো মানুষ আছে, আমার কেউ থাকবে না।!

আমার খুব বেশি জানতে ইচ্ছে করছে, ক্রসফায়ারের শাস্তিটা কি কেবল আমার হবে? আমার ঈশ্বরেরা কি শাস্তি পাবে না???
ট্রেনের শব্দ এবার আমার কানের মধ্যে ঢুকে গেল।

/ফেসবুক/জয়নাল আবেদীন

১০ আওয়ামী দলকানা বুদ্ধিজীবির চোখে মাদক বিরোধী অভিযানে হত্যা ‘প্রত্যাশিত’ এবং ‘যৌক্তিক’!

১০ ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ বিবৃতি দিয়ে জানাচ্ছে-

১/ “সারা দেশে যে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে (বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা), তার ‘যৌক্তিকতা’ তারা অনুধাবন করে!”

২/ “সংগত কারণে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও এই অভিযানে (বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা) প্রত্যাশিত ছিল।”

৩/ “টেকনাফে নিহত পৌর কমিশনার একরামের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পূর্ব অভিযোগের কথা জানা যায়নি।” (যেন পূর্ব অভিযোগ জানা থাকলে এই হত্যার ‘যৌক্তিকতা’ থাকতো! তাছাড়া, অন্ততপক্ষে দুইটি টিভি চ্যানেল কয়েক বছর আগেই নিহত একরামকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।)

৪/ “তাঁর (একরামের) পরিবার সংবাদ সম্মেলন করে হত্যা-পূর্ব ফোনালাপ সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেছেন, যা কোনো ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ ও সমাজে অকল্পনীয়। এ রকম ‘একটি ঘটনাই’ সমগ্র ‘অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ’ ও জনগণকে আতঙ্কিত করতে যথেষ্ট।” (তার মানে, এই ফোনালাপ প্রকাশ না পেলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বিনা বিচারে হত্যা করা ‘যৌক্তিক’ এবং ‘প্রত্যাশিত’ই থাকতো!)

গত ১৪ মে থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০/১২জন করে মানুষকে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে; একরামের আগেই খুন হয়েছে আরো ১২৩জন। তখন পর্যন্ত এই ‘বিশিষ্ট নাগরিক’দের কাছে বাংলাদেশ ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ’ ছিল! এদের সমর্থিত সরকারের গত দশ বছরের শাসনামলে ৫’শতাধিক গুম আর ১৫ শতাধিক বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও এদের কাছে ‘যৌক্তিক’ এবং ‘প্রত্যাশিত’ই ছিলো!

অপ্রত্যাশিত ঘটনা হয়ে গেছে- একরাম হত্যার অডিও প্রকাশিত হয়ে যাওয়ায়!

এই বুড়ো শকুনগুলো এই কথা স্পষ্ট করে বলতে পারেনা যে, একরাম মাদক ব্যবসায়ী হলেও তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিনা বিচারে হত্যা করতে পারে না; কাউকেই পারে না।

এই বুড়ো শকুনদের বিবেকের দেখা মেলে তাদের দৃষ্টিতে কোন ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত’ হলে। তখন এরা মুরিদদের সাথে নিয়ে নিজেদের কানে ধরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। এদের মুরিদরা ‘এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না’ লিখে চেতনামাখা স্ট্যাটাস দেয়। তারপর আরো হত্যা-গুমের ধারাবাহিক ঘটনা ঘটে, ছাত্রলীগের হাতে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে, তখন আর এদের দেখা পাওয়া যায় না!

কাজেই এইসব সিজনাল এবং সিলেক্টিভ ঘটনার প্রতিবাদী ধান্দাবাজদের থেকে সতর্ক থাকুন। এরা-
যেভাবে এরা এক রেশমাকে উদ্ধারের নাটক দেখিয়ে রানা প্লাজায় ১২’শ নিহতের ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়েছে আর রেশমাকে ফাইভস্টার হোটেলে চাকরি দিয়ে দেড় হাজার পঙ্গুকে পূনর্বাসিত না করার ও রানা প্লাজার ভিক্টিমদের জন্য আশা ১০৯ কোটি টাকা চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে সাহায্য করেছে, যেভাবে এরা শ্যামল কান্তি ভক্তের ঘটনায় ‘কানে ধরা প্রতিবাদ’ করে ছাত্রলীগের হাতে দেশের শত শত শিক্ষক লঞ্ছনার ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই এরা এক একরামের ঘটনার প্রতিবাদ করে দেড় হাজার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং একরামের পরিবারতে গণভবনে নিয়ে ফটোসেশন করিয়ে সকল বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভিক্টিমের পরিবারের বঞ্চনাকে ধামাচাপা দিতে চাইছে।

কুমিরের চোখে পানি দেখলে আবেগ প্রবণ হওয়া বোকামি।

/ফেসবুক/ একেএম ওয়াহিদুজ্জামান

অবশেষে বদিকে খেয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত আসছে!

নিজের জনপ্রিয়তা বাড়াতে অবশেষে নিজ দলীয় সাংসদ আবদুর রহমান বদি (বদি বাবা)কে খেয়ে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে শেখ হাসিনা। খুব দ্রুতই ঘটনাটি ঘটবে বলে জানা গেছে।

মাদক বিরোধী অপারেশনের নামে র‌্যাব পুলিশের হাতে ইতোমধ্যে ৭০ জনের মত মানুষ নিহত হয়েছে। এর মধ্যে ২ জন নির্বাচিত কাউন্সিলরও রয়েছেন। এর মধ্যে অন্তত ১ জনকে রাজনৈতিক কারনে, এক জনকে ভুল তথ্যের ওপর, এবং দু’জনেকে আটকের পরে পুলিশকে টাকা না দেয়ার কারনে নিহত হয়েছেন বলে স্বজনদের অভিযোগ।

মাদক বিরোধী অভিযানের পর থেকে দেশজুড়ে একটি নাম ঘুরে ফিরে আসছে- বদি। বাংলাদেশে ইয়াবা ব্যবসার মূল গডফাদার আবদুর রহমান বদি, যিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগ দলীয় সংসদ সদস্য। সরকারের সবগুলি তালিকায় মাদক চোরচালানের প্রধান হোতা হিসাবে বদির নাম আছে। মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত ১৪১ গড ফাদারের মাধ্যে বদি, তার ভাই, ভাতিজা, বিয়াই, পিএস সহ  নিকটস্থদের নাম রয়েছে। বদির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সরকারের উপরে ঘরে বাইরে প্রবল চাপ। অনলাইন ও টকশো’তে সর্বত্র আলোচনা- বদিকে ধরা হচ্ছে না কেনো? ইত্যোমধ্যে বদির এক বিয়াই ওয়ার্ড কাউন্সিলর আকতার কামাল নিহত হয়েছে। ‘বদিকে কবে ধরা হবে’- স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সহ সরকারের দায়িত্বশীলরা বার বার এমন প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছেন। শেষে বলতে বাধ্য হয়েছেন, বদির বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে সত্য, কিন্তু সরকারের  হাতে প্রমান নেই। তাই প্রমান জোগাড় হলেই ব্যবস্খা।

এ প্রসঙ্গে টেকনাফ উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নুরুল বশর বলেন, “আমরা কী বলব, আপনি টেকনাফ থানার ওসি আর বিজিবির এই ব্যাটেলিয়নের কমান্ডারের সঙ্গে কথা বলেন, তারাই বলে দেবে- বাংলাদেশে ইয়াবা কে এনেছে। ২০০৮ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত এমপি আছেন বদি সাহেব। আমরা দেখি যারা ইয়াবা আমদানির মূল কারিগর, তারা সবাই এমপি সাহেবের আশেপাশে থাকে। আশ্রয়-প্রশ্রয়ে থাকে। এমপি তাদের শেল্টার দেন। তাহলে মানুষ কী বুঝবে? আপনি টেকনাফে এসে মানুষের সঙ্গে কথা বলেন। শতকরা ৯৫ জনই বলবেন, এমপি বদির মাধ্যমেই ইয়াবা এসেছে বাংলাদেশে। মূল হোতাদের এখন এলাকায় দেখছিই না।”

মাদকবিরোধী অভিযানের আগে পাঁচটি রাষ্ট্রীয় সংস্থার সমন্বয়ে মাদক ব্যবসায়ী ও পৃষ্ঠপোষকদের একটি তালিকা তৈরি করে সরকার। সেই তালিকায় মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আছে আব্দুর রহমান বদির নাম। এছাড়া মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকায় এক নম্বরে আছে বদির নাম। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের করা টেকনাফের শীর্ষ মানব পাচারকারীর তালিকাতেও তার নাম ছিল। দেশে মাদক ইয়াবার গডফাদার ও ব্যবসায়ীর তালিকায় টানা ১০ বছর ধরে ছিল বদির নাম।

এরই মধ্যে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ও সড়ক পরিবহনমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গতকাল বিষয়টি পরিস্কার করে বলেন, ‘এমপি বদির বেয়াই যেমন ছাড় পায়নি। তেমনি অভিযোগ প্রমাণিত হলে বদিসহ আওয়ামী লীগ-বিএনপির কেউই ছাড় পাবে না’।

সব মিলিয়ে কোনো এক সকালে বদির লাশ পাওয়া গেলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না এবং এটা করা হবে কেবল জনগনকে সামলানোর জন্য এবং নিজ দলের হারিয়ে যাওয়া ভাবমূর্তি কিছুটা পুনুরুদ্ধারের জন্য।

দুর্নীতির কত রূপ: গ্যাস নাই জেনেও উত্তোলনের নামে ২৩০ কোটি টাকা লুটপাট!

• গ্যাস পাওয়া যাবে না জেনেও উত্তোলনে সান্তোসকে অনুমতি দেয়া হয়
• ১৩ দিনের মাথায় সান্তোস জানায় গ্যাস নেই
• এর আগেই ১২৯ কোটি টাকা উত্তোলন
• আরও ১০১ কোটি টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে সান্তোস

অস্ট্রেলিয়ার তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি সান্তোসকে ২৩০ কোটি টাকা লুটে নেওয়ার অভিনব এক সুযোগ করে দিয়েছে সরকারের জ্বালানি বিভাগ। এর মধ্যে ১২৯ কোটি টাকা নিয়ে গেছে সান্তোস। বাকি ১০১ কোটি টাকার জন্য চাপ দিচ্ছে প্রতিষ্ঠানটি।

প্রথম আলোর অনুসন্ধানে জানা গেছে, দেশের সাগরবক্ষের ১৬ নম্বর ব্লকের মগনামা-২-এ গ্যাস পাওয়া যাবে না জেনেও সান্তোসের সঙ্গে যৌথভাবে বাপেক্সকে গ্যাস উত্তোলনের অনুমতি দিয়েছিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগ। অথচ কথিত কূপ খননের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় সান্তোস জানিয়ে দেয়, সেখানে কোনো গ্যাসই নেই। কিন্তু এর আগেই তারা ১২৯ কোটি টাকা ‘লুটে’ নেয়।

সন্তোসের সঙ্গে ১৬ নম্বর ব্লকের উৎপাদন অংশীদারত্ব চুক্তির (পিএসসি) মেয়াদ ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার পরও ফের মেয়াদ বাড়ায় জ্বালানি বিভাগ। এরপর ২০১৬ সালে বাপেক্সের সঙ্গে যৌথভাবে সান্তোস মগনামা-২ গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের প্রস্তাব দেয়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কোনো বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে একবার পিএসসি সম্পন্ন হলে সেই পিএসসি সংশোধন করার সুযোগ নেই। কিন্তু সান্তোসের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

জ্বালানি খাতে নজিরবিহীন এ অনিয়মের কারণেই বাপেক্স এখন দেনার দায়ে ডুবতে বসেছে। কেননা সান্তোসকে এই অর্থ দেওয়ার জন্য ২ শতাংশ সুদে ১২ বছর মেয়াদি ঋণ নেয় বাপেক্স। সুদে-আসলে দেনার পরিমাণ এখন ২৬২ কোটি টাকা। আর এসব বেআইনি তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের তৎকালীন সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী। তিনি তখন বাপেক্সেরও চেয়ারম্যান ছিলেন। তিনি এখন অবসর জীবন যাপন করছেন।

আবার ওই ঋণ নেওয়ার ক্ষেত্রেও করা হয় অনিয়ম। পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস, কর্ণফুলী গ্যাস, বাখরাবাদ গ্যাস ও বাপেক্স নিজস্ব তহবিল থেকে অর্থ নিয়মবহির্ভূতভাবে কূপ খননের জন্য বাপেক্সকে ঋণ আকারে দেওয়ায় এসব প্রতিষ্ঠানপ্রধানদেরও এ অনিয়মের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রয়েছে।

এ বিষয়ে বাপেক্সের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও বর্তমানে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের এমডি মো. আতিকুজ্জামান প্রথম আলোকে মুঠোফোনে বলেন, ‘আমরা অত্যন্ত নেতিবাচকভাবে সান্তোসের প্রস্তাবটি বোর্ডে তুলেছিলাম, যাতে প্রস্তাবটি পাস না হয়। আমরা নিশ্চিত ছিলাম যে মগনামাতে গ্যাস নেই। বোর্ডের চেয়ারম্যান জ্বালানিসচিব, সেখানে অন্যদের কিছু করার নেই।’

তৎকালীন জ্বালানি সচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা অনেক আগের বিষয়। এ বিষয়ে এখন আমার কিছু মনে পড়ছে না।’

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, কানাডীয় কোম্পানি নাইকো টেংরাটিলার একটি নতুন গ্যাসক্ষেত্রকে পরিত্যক্ত দেখিয়ে ইজারা নিয়েছিল। এরপর সেখানে বিস্ফোরণ ঘটার পর নাইকোকে অনুমোদন দেওয়ার পেছনে দুর্নীতি রয়েছে এমন তথ্য বেরিয়ে আসে। মগনামা-২-এ কোনো গ্যাস নেই জেনেও সেখানে কূপ খননের অনুমোদন দিয়ে নাইকোর মতোই কেলেঙ্কারি ঘটিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।

বিষয়টি নিয়ে ভোক্তা অধিকার সংগঠন বাংলাদেশ কনজ্যুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) ‘বিদ্যুৎ জ্বালানি খাতের অনিয়ম উদ্ঘাটন’ নামে গঠিত একটি কমিশনের খসড়া প্রতিবেদনেও এসব তথ্য রয়েছে। ছয় সদস্যের এই কমিশনের সভাপতি লেখক ও গবেষক সৈয়দ আবুল মকসুদ, সদস্য অধ্যাপক এম শামসুল আলম, পদার্থবিদ অধ্যাপক সুশান্ত কুমার দাস, অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশ, স্থপতি মোবাশ্বের হোসেন ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম।

কমিশনের খসড়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নাইকো চুক্তির মতো সান্তোস চুক্তিতে দুর্নীতি হয়েছে। নাইকো চুক্তিতে সাবেক জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী বিএনপির নেতা এ কে এম মোশাররফ হোসেনের মুখ্য ভূমিকা ছিল। সান্তোস চুক্তিতে সাবেক জ্বালানিসচিব নাজিমউদ্দিন চৌধুরী মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন।

কমিশনের সদস্য, জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক এম শামসুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, মগনামা-২-এ গ্যাস পাওয়া যাবে না, এ বিষয়ে বাপেক্স নিশ্চিত ছিল। সে কারণে বাপেক্স কূপ খননে রাজি ছিল না। কিন্তু সান্তোসের সঙ্গে যৌথভাবে বাপেক্সকে কূপ খনন করতে বাধ্য করেছেন নাজিমউদ্দিন চৌধুরী। আর কূপ খননের মাত্র ১৩ দিনের মাথায় সান্তোস জানায়, সেখানে কোনো গ্যাস পাওয়া যায়নি। অভিনব কায়দায় এতগুলো টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। এটিকে দুর্নীতি বললে কম বলা হবে।

আগেই জানা ছিল গ্যাস নেই
জানা যায়, ২০১৬ সালের জানুয়ারিতে সান্তোসের দেওয়া প্রস্তাবে বলা হয়, ১৬ নম্বর ব্লকের মগনামা-২-এ মোট ১০টি স্তরে সম্ভাব্য গ্যাস রয়েছে ১ হাজার ৬০ দশমিক ৮ বিলিয়ন ঘনফুট (বিসিএফ)। এ পরিমাণ মজুত থেকে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস রয়েছে ৭৩৬ দশমিক ২ বিসিএফ গ্যাস। প্রস্তাবে আরও বলা হয়, এর আগে সান্তোস মগনামা-১ কূপ খনন করে গ্যাস পায়নি। সেই কূপ খননের অর্থও বাপেক্সকে দিতে হবে। এর পরিমাণ ১২৯ কোটি টাকা।

সান্তোসের প্রস্তাবের বিষয়ে সাত সদস্যের উচ্চপর্যায়ের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে বাপেক্স। ২০১৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, সান্তোস মগনামা-২ গ্যাসের মজুতের যে হিসাব দিয়েছে, তা ঠিক নয়। সেখানে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নেই। এর আগে সান্তোস যেখানে কূপ খনন করে গ্যাস পায়নি, সেখান থেকে মাত্র ২ হাজার ২০০ মিটার উত্তর-পশ্চিমে মগনামা-২ কূপের অবস্থান। এখানে গ্যাস থাকার বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত নেই। বাপেক্স যদি সেখানে কূপ খনন করতে যায়, তাহলে সুদে-আসলে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ক্ষতি হবে ২৬২ কোটি টাকা।

 ‘মগনামা-২-এ বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য গ্যাস নেই’—বাপেক্সের কারিগরি কমিটির দেওয়া এ প্রতিবেদনসহ ২০১৬ সালের ২৪ মার্চ বাপেক্সের পরিচালনা পর্ষদের ৩৭১তম বোর্ড সভায় সান্তোসের প্রস্তাবটি তোলা হয়। কিন্তু কমিটির সুপারিশ উপেক্ষা করে বাপেক্সের পর্ষদ সান্তোসের সঙ্গে যৌথভাবে মগনামা-২ কূপ খননের সিদ্ধান্ত নেয়।

বাপেক্সের বোর্ড সভায় নাজিমউদ্দিন চৌধুরী ছাড়াও পরিচালকদের মধ্যে ছিলেন পেট্রোবাংলার তৎকালীন চেয়ারম্যান ইশতিয়াক আহমেদ, জ্বালানি বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মোহাম্মদ আহসানুল জব্বার, পেট্রোবাংলার একজন ও দুজন স্বতন্ত্র পরিচালক ছাড়া বাপেক্সের পক্ষে একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন বাপেক্সের এমডি।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বাপেক্সের এক কর্মকর্তা প্রথম আলোকে বলেন, বাপেক্স বোর্ডে সাত সদস্যের মধ্যে দুজন বাদে অন্য পাঁচজন সদস্যই জ্বালানি বিভাগের অনুশাসন মেনে চাকরি করেন। আর জ্বালানি বিভাগের প্রধান সরকারি কর্মকর্তা জ্বালানিসচিব। সে কারণে জ্বালানিসচিবের চাওয়াকে বোর্ডে দ্বিমত করার সুযোগ থাকে না।

জানা যায়, গত বছরের ১৮ জানুয়ারি পেট্রোবাংলার সঙ্গে সান্তোসের গ্যাস ক্রয়-বিক্রয় চুক্তি সই হয়। চুক্তিতে সান্তোস এর আগে ১৬ নম্বর ব্লকে যে অর্থ ব্যয় করেছিল, সেই ব্যয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ (১২৯ কোটি টাকা) বাপেক্সকে পরিশোধ করার শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। এর মাত্র ১৩ দিনের মাথায় অর্থাৎ ৩১ জানুয়ারি সান্তোস সরকারকে জানায় মগনামা-২-এ কোনো গ্যাস নেই। এর আগেই সান্তোস ১২৯ কোটি টাকা নিয়ে নেয় বাপেক্সের কাছ থেকে।

জানা যায়, এর আগের সব পিএসসিতে বিদেশি কোম্পানির শতভাগ নিজস্ব খরচে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের শর্ত ছিল। নিয়ম হচ্ছে, গ্যাস পেলে খরচের উশুল হিসেবে গ্যাসের একটি নির্দিষ্ট অংশ তারা নিয়ে বাকি গ্যাস সমানভাবে ভাগ করা হবে। আর গ্যাস না পাওয়া গেলে তা কোম্পানিকে দিতে হয়। অথচ সান্তোসের ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি।

অনিয়ম করে সান্তোসকে নানা সুযোগ দিয়ে একদিকে যেমন সরকারের বিপুল পরিমাণ অর্থ পানিতে গেছে, তেমনি বাপেক্সের কাঁধে চেপেছে বিশাল এক দেনার বোঝা। এ কারণে জ্বালানি খাতের দেশের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সংস্থাটি বড় ধরনের বিপাকে পড়ে গেল বলেই মনে করছেন জ্বালানি খাত-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ঢামেক কেবিনে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফের আয়েশি জীবন

তোফায়েল আহমদ জোসেফ। দেশের শীর্ষসন্ত্রাসীদের একজন। একটি হত্যা মামলায় মৃত্যুদন্ডপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে অাছেন। তার বড় ভাই বিজিবি-র সাবেক ডিজি, বর্তমানে সেনাবাহিনীতে কর্মরত লে. জেনারেল আজিজ আহমেদ। তিনি শেখ হাসিনার আস্থাভাজন হওয়ায় জোসেফের মৃত্যুদন্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ডে পরিণত করতে সক্ষম হন। কিন্তু কারাদন্ড ভোগের নামে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে জোসেফের রাজকীয় জীবন যাপন নিয়ে রিপোর্ট করেছে দৈনিক মানবজমিন। শোনা যায়, জেনারেল আজিজ শীঘ্রই সেনাপ্রধান হতে যাচ্ছেন, আর তখন কারামুক্ত হবে জোসেফ।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিআইপি কেবিন নং ১১১। কেবিনকে ঘিরে সার্বক্ষণিক প্রহরায় তিনজন কারারক্ষী ও একজন পুলিশ সদস্য। ভেতরে সুসজ্জিত শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষ। রোগীর আরাম-আয়েশে থাকার সব ধরনের ব্যবস্থাই আছে। এই কেবিনে বসেই আয়েশী জীবনযাপন করছেন দণ্ডপ্রাপ্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী তোফায়েল আহমদ জোসেফ। ১৯৯৯ সালে একটি হত্যাকাণ্ডের মামলার রায়ে তাকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন।

পরে আপিল বিভাগ থেকে সাজা কমিয়ে যাবৎ জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। দণ্ডপ্রাপ্ত এ আসামি কেবিনে বসেই নিজ অনুসারীদের সঙ্গে নিয়মিত বৈঠক করেন। নির্দেশনা দেন বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের। কারাবন্দি থেকেও আধিপত্য বিস্তার করে যাচ্ছেন সর্বত্র। অভিযোগ আছে তার কেবিনে নিয়মিত যাতায়াত করেন বিভিন্ন নেতাকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে আসামি হয়ে দিব্যি ব্যবহার করছেন মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তিনি তার সব আত্মীয়স্বজন ও পরিচিত মহলে নিয়মিত যোগাযোগ অব্যাহত রাখছেন। এমনকি দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক নানা কর্মকাণ্ডের খোঁজখবর রাখেন। নিজের প্রয়োজনে ডেকে নেন যে কাউকে। আসামি হিসাবে হাতকড়া ডান্ডা-বেড়ি পরার কথা থাকলেও তাকে সেটা পরানো হয় না। মেডিকেল থেকে রোগীদের দেয়া খাবার না খেয়ে বাইরে থেকে আসা খাবার খান। শুধু মেডিকেলের দেয়া সকালের নাস্তাটাই তিনি খান। গত কয়েকদিন ঢামেকের নতুন ভবনের ১০ তলার কেবিন ব্লকের ১১১ নম্বর কেবিন নিয়ে প্রতিবেদকের অনুসন্ধানে এমনটাই জানা গেছে।

ঢামেকের বিভিন্ন স্টাফ ও চিকিৎসারত রোগীর স্বজনরা জানান, জোসেফের অনুসারীরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করেই কেবিনে যাতায়াত করছেন। অভিযোগ আছে, খোদ জোসেফের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা কারারক্ষীরাই তাকে মোবাইল ফোন ব্যবহারসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করছেন। ডিউটিরত অবস্থায় কোনো কারারক্ষী মোবাইল ফোন ব্যবহার করার নিয়ম নেই। কিন্তু গত ২৯ শে এপ্রিল জোসেফের দেখাশোনার দায়িত্বে থাকা শাওন হাওলাদার নামে এক কারারক্ষী মোবাইল ফোন ব্যবহারের দায়ে বরখাস্ত হয়েছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে কারা কর্মকর্তা বলেন, আমরা ছোট চাকরি করি। চোখের সামনে অনেক কিছুই ঘটে। কিন্তু আমরা কিছু বলতে পারি না। জোসেফ দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হয়েও কোনো কিছু হলেই ওপর থেকে আমাদের ফোন করায়। তখন আমাদের আর কিছু করার থাকে না। এ ধরনের বন্দি নিয়ে আমাদের অনেক আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হয়।

অভিযোগ আছে পিঠের ব্যথার কথা বলে তিনি বিভিন্ন হাসপাতালেই কাটিয়ে দিচ্ছেন বছরের পর বছর। সর্বশেষ তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই বছরের বেশি সময় ছিলেন। সেখান থেকে কারাগারে ফিরে আবার কিছুদিন থাকার পর আবার ভর্তি হোন সেখানেই। পরে চিকিৎসকরা তাকে ঢামেকে ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দেন। ৩১শে মার্চ তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ভিআইপি কেবিনে ভর্তি হোন। এমনও অভিযোগ আছে দণ্ডপ্রাপ্ত বড় বড় আসামিদের আরাম-আয়েশের এক আস্তানা হয়ে গেছে ১১১ নম্বর কেবিন। কারণ জোসেফের আগে আরেক দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ইয়াবা সম্রাট আমিন হুদা সামান্য অসুখের অজুহাতে এখানে ছিলেন। একটি জাতীয় দৈনিকে এ নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশিত হলে কর্তৃপক্ষ তাকে পুনরায় কারাগারে নিয়ে যায়। ৩১শে মার্চ আমিন হুদা ১১১ নম্বর কেবিন থেকে আউট হওয়ার পরেই সেখানে ইন হয়েছেন তোফায়েল আহমদ জোসেফ।

কেন্দ্রীয় কারাগারের চিকিৎসক বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস মানবজমিনকে বলেন, জোসেফ পিঠের ব্যথা ও ইউরিনের সমস্যার কথা বললে আমরা তাকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাই। সেখান থেকেই পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে হস্তান্তর করে। বর্তমানে ঢামেকেই তার চিকিৎসা চলছে। এর আগেও জোসেফ একই সমস্যায় হাসপাতালে ছিলেন দীর্ঘদিন। এখনও আবার একই সমস্যা কেন এমন প্রশ্নে কারা চিকিৎসক বলেন, কেউ যদি বলে আমার শরীরে ব্যথা করছে। সেটা তো আর পরীক্ষা করার উপায় নেই। তাই আমরা চিকিৎসার জন্য বাইরে পাঠাই। আর এ ধরনের শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নিয়ে আমরাও বাড়তি ঝামেলায় থাকি। কারণ, হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য গিয়ে যদি কোনো ধরনের অঘটন ঘটায়। তার অনুসারীরাও উল্টাপাল্টা কিছু করে ফেলতে পারে। সেজন্য এ ধরনের বন্দি নিয়ে আমাদের বাড়তি নিরাপত্তার কথা চিন্তা করতে হয়।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিউরো সার্জারি বিভাগের প্রধান ডা. অসিত চন্দ্র সরকার বলেন, জোসেফ পিঠে ব্যথা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হলেও তিনি উচ্চ রক্ত চাপ, কিডনি সমস্যাসহ আরো কিছু রোগে ভুগছেন। তাই স্নায়ুরোগ ও কিডনি রোগ বিশেষজ্ঞের অধীনে জোসেফকে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে তার চিকিৎসার জন্য আমরা চার সদস্য বিশিষ্ট একটি টিম করেছি। তারাই জোসেফের বিষয়ে করণীয় সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

তোফায়েল আহমদ জোসেফ দেশের শীর্ষ পাঁচ জন সন্ত্রাসীদের একজন ছিলেন। বড় ভাই হারিছ আহমেদের হাত ধরে ছাত্রলীগে নাম লেখে রাজনৈতিক জীবন শুরু করেছিলেন। এরপর থেকেই শুরু করেন ভয়ঙ্কর সব কর্ম। জোসেফ অপরাধের ষোলকলা পূর্ণ করেছিলেন। এমন কোনো অপরাধ ছিল না যা তিনি করেননি। ভাইয়ের হাত ধরে রাজনীতিতে এলেও পরে তিনি পুরোদমে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন। যোগ দেন তখনকার আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের গড়া সেভেন স্টার গ্রুপে। ওই সময় সেভেন স্টার ও ফাইভ স্টার গ্রুপ দাপিয়ে বেড়াত। এই দুই গ্রুপের আতঙ্কে তটস্থ থাকত রাজধানীবাসী। তখনকার আইন শৃঙ্খলাবাহিনীর নাকের ডগায় বসে তারা করত সব অপকর্ম। তার বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস কেউ পেত না। রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়াই ছিল তাদের শক্তির প্রধান উৎস। জোসেফ ১৯৯৬ সালের ৭ই মে মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমানকে হত্যা করে। ২০০৪ সালের ২৫শে এপ্রিল ঢাকার দ্রুত বিচার টাইব্যুনাল এই হত্যাকাণ্ডের জন্য তাকে মৃত্যুদণ্ড দেন। এর বাইরে আরেকটি অস্ত্র মামলায় তার ১২ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়। একই বছর তৎকালীন সরকার জোসেফসহ আরো কিছু সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করেন। পরে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা সংস্থার একটি টিম তাকে নারায়ণগঞ্জ থেকে গ্রেপ্তার করে। তারপর থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

ইসলামী ব্যাংক হত্যা!

এক সময় বাংলাদেশের ১ নম্বর বেসরকারী ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক প্রাচীন ফোর্বস ম্যাগাজিন তাদের জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় বলে, ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের বৃহত্তম এবং সবচেয়ে লাভজনক প্রতিষ্ঠান। ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতি পাঁচ বছরে এর আমানত তিনগুণ হারে বৃদ্ধি পায়, ২০১৬ সালে ব্যাংকটির গ্রাহক সংখ্যা ১ কোটি ৭ লাখের অধিক। বৈদেশিক রেমিটেন্সের ২৭ শতাংশ এবং দেশের এসএমই খাতের ২৩ শতাংশ এককভাবে পরিচালনা করত ইসলামী ব্যাংক। আইডিবি সহ বিদেশী বিনিয়োগ ছিল ৬৩.০৯%। তখন ব্যাংকটির সম্পদের পরিমান ছিল ৯.৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
ব্যাংকটির উপর চোখ পড়ে অবৈধ আ’লীগ সরকারের। জামাত-শিবির অযুহাত দেখিয়ে সেই ব্যাংক দখল করে হাসিনার নির্দেশে মাল মুহিত সালমান রহমান গং।
ব্যাংকের চেয়ারম্যান এমডি ও পরিচালকদের ডিজিএফআইতে ডেকে নিয়ে হুমকি দিয়ে রিজাইন করানো হলো।
এক রিটায়ার্ড অতিরিক্ত সচিব আরাস্তু খানকে বসানো হলো চেয়ারম্যান, পরিচালক করা হলো মেয়েদের বলডান্স খ্যাত ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ডিজি সামীম আফজালকে!
তন্ন তন্ন করে ব্যাংকটি খুঁকে জামায়াত শিবিরে অর্থায়ন খুঁজে পেলো না।
ব্যাংকটির মালিকানা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হলো আইডিবিকে। ঐসব শেয়ার দখল করে এস আলম গ্রুপ সহ আরও অনেকে।
ব্যাংকটিতে শর্টকাট ঢুকানো হলো কয়েক’শ নিজেদের লোক।
আরাস্তু ঘোষণা করলো, ইসলামিক ব্যাংকে মহিলা এবং হিন্দুদের ঢোকানো হবে।
এরপর বছর না ঘুরতেই আরাস্তু আউট। লুটপাট শেষ করা হয়েছে।
প্রায় ৮০ হাজার কোটি টাকার ব্যাংকটির এখন নগদ টাকা নাই।
জনপ্রিয় সেবা এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের আউটলেট দেওয়ার কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ব্যাংকটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের মধ্যে এখনো ‘ছাঁটাই’ আতঙ্ক কাজ করছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক গতকাল রবিবার ইনলামী ব্যাংকের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সুইচ বন্ধ করে দিয়ে বিনিয়োগ বন্ধ করা হয়েছে। ফলে দেশের কোনো শাখা থেকে ঋণ দিতে পারেনি। এ ঘটনা দেশে নজিরবিহীন।
ব্যাংকটির বিনিয়োগ বন্ধ। আমানতকারীরা আমানক তুলে নিয়ে যাবে খুব দ্রুতই। ফলে ব্যাংকটির মৃত্যু এখন খুব নিকটবর্তী।
 
এভাবেই দেশের ১ নম্বর ব্যাংকটি ধংস করলো শেখ হাসিনা এবং আওয়ামীলীগ। এর কারন হলো- দেশে এত প্রভাবশালী ইসলামী ব্যাংক, সুদমুক্ত ব্যাংক থাকতে দিবে না তারা। বলা যায়, এটি ইহুদীবাদী ও হিন্দুবাদীদের চক্রান্ত- হাসিনার হাতে বাস্তবায়ন। একদিকে যখন লীগের মালিকানাধীন দেউলিয়া ব্যাংকগুলিতে সরকারী তহবিল দিয়ে টিকানোর চেষ্টা করছে সরকার, তখনই ইসলামী ব্যাংক হত্যা করছে তারাই।
 

বৃটেনে অাইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটাতে নিজ দলীয় কর্মীদের উস্কে দেয়ায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের হচ্ছে

ব্রিটেনে সন্ত্রাসবাদ উস্কে দেয়ার অভিযোগে ব্রিটেন সরকার এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কাছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে। নিজের দলীয় লোকজনকে আইন হাতে তুলে নিতে এবং সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত হতে উস্কানি দিয়ে ব্রিটেনের প্রচলিত আইন ভঙ্গ করার অপরাধে এই অভিযোগ দায়ের করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী কয়েকজন আইনজীবী।

শনিবার (২১ এপ্রিল) ওয়েস্ট লন্ডনে ইউকে আওয়ামী লীগ শেখ হাসিনাকে দেয়া দলীয় সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে শেখ হাসিনা তার দলের নেতাকর্মীদের আইন হাতে তুলে নিতে উস্কানিমূলক বক্তব্য দেন। তার এই উস্কানিমূলক বক্তব্য দেশে বিদেশে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ব্যাংক ডাকাত সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সফরসঙ্গী ছিলেন বাংলানিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম এর সিনিয়র করেসপন্ডেন্ট মহিউদ্দিন মাহমুদ। শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে লন্ডন থেকে তাঁর পাঠানো রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে আওয়ামী ঘরানার অনলাইন নিউজ পোর্টাল বাংলানিউজ২৪ এ। প্রকাশিত সংবাদে দেখা যায় শেখ হাসিনা প্রতিপক্ষের উপর দলীয় নেতাকর্মীদের হামলার উস্কানি দিচ্ছেন।

……দূতাবাসে হামলা বিষয়ে প্রবাসী বাঙালিদের উদ্দেশ্য করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এই ঘটনাগুলো যারা ঘটিয়েছে, তারা কোথাও চলাফেরা করে না? তাদের দেখেন না? যে হাত দিয়ে জাতির পিতার ছবি ভেঙেছে, তাদের যা করার তা করতে হবে। তাদের চেহারা চেনেন না?’…..

উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মানবাধিকার লঙ্ঘন, গুম খুন অপহরণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে স্মারকলিপি দিতে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারী মাসে পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী ইউকে বিএনপি এবং একদল প্রবাসী বাংলাদেশী লন্ডনে বাংলাদেশ হাই-কমিশনে যায়। কিন্তু সেখানে হাই-কমিশনের কতিপয় কর্মকর্তা কর্মচারী প্রবাসী বাংলাদেশীদের সঙ্গে উস্কানিমূলক আচরণ করে। এ সময় কয়েকজন বিক্ষুব্ধ প্রবাসী বাংলাদেশী হাই কমিশনের দেয়ালে টাঙানো শেখ হাসিনার পিতা শেখ মুজিবের ছবি ভাংচুর করে। পরে এ বিষয়ে হাই-কমিশন একটি মামলা দায়ের করে। মামলাটি ব্রিটিশ আইনে যথানিয়মে তদন্ত করছে বৃটেনের পুলিশ। কিন্ত শেখ হাসিনা ব্রিটিশ পুলিশের তদন্ত রিপোর্টের অপেক্ষা না করেই হাই-কমিশনে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের উপর যেখানে পাওয়া যায় সেখানেই হামলার নির্দেশ দেন।

এদিকে শেখ হাসিনার এই সন্ত্রাসী তৎপরতা নিয়ে যারা ব্রিটেন সরকার এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কাছে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তাদের মধ্যে একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশী আইনজীবী বলেন, শেখ হাসিনার বক্তব্য সুস্পষ্টভাবে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর হামলার নির্দেশ। তিনি স্পষ্টত:ই যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে লিপ্ত হতে এবং আইন নিজের হাতে তুলে নিতে ব্রিটেনে তার দলের নেতাকর্মীদের উস্কানি দিয়েছেন। এটি ব্রিটেনের আইনের সরাসরি লঙ্ঘন। এই অভিযোগেই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। একইসঙ্গে বাংলাদেশেও শেখ হাসিনা কিভাবে আইনের শাসনের পরিবর্তে নিজের দলীয় নেতাকর্মীদের দ্বারা সন্ত্রাসের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করছেন সেই সব তথ্যও ব্রিটেন সরকার এবং স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের কাছে দেয়া হবে বলেও ওই আইনজীবী জানান। ওই আইনজীবী মন্তব্য করে বলেন, বিভিন্ন সময়ে দেশে বিদেশে দলীয় নেতাকর্মীদের আইন নিজের হাতে তুলে নিতে উস্কানি দিয়ে শেখ হাসিনা প্রমান করেছেন তিনি একজন স্বভাবজাত সন্ত্রাসী। তিনি আরো জানান, তারা এরইমধ্যে শেখ হাসিনার বক্তব্যের কপি সংগ্রহ করেছেন। আপাততঃ নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই আইনজীবী জানান, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়েরের আগে ব্রিটেনের আইনজীবীদের সঙ্গেও তারা আলোচনা করছেন।

নিজের টাকা ঘরে তোলার এই তো সময়

শামসুল আলম
গত তিন মাস ধরে প্রায় সকল মিডিয়ার খবর – দেশের ব্যাংকগুলোতে টাকা নাই। তারল্য সংকট! নগদ টাকার অভাবে বেশ কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংক গ্রাহকদের চেক ফিরিয়ে দিচ্ছে। গ্রাহকদের ভয়ে ফারমারস ব্যাংক সহ কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংকের কর্মকর্তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ অবস্থায় বেসরকারী বাংক যখন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম, অনেক সমালোচনা উঠলে বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে অর্থমন্ত্রীর সাথে ম্যারাথন মিটিং করে প্রাইভেট ব্যাংকের মালিকরা। অতঃপর তারা সরকারকে রাজী করিয়ে ফেলে- তারল্য সংকট কমাতে সরকারী ফান্ডের অর্ধেক বেসরকারী ব্যাংকে দেয়া হবে, সিআরআর কমানো হয়েছে ১ পারসেন্ট। এরপর থেকে অনলাইনে ঝড় উঠলো- তবে কি জনগনের সম্পদ লুঠ করার পরে এবার রাষ্ট্রীয় বাজেট লুঠ করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে বেসরকারী ব্যাংকগুলোকে? এরপর দেখা গেলো, বেসরকারী ব্যাংকের মালিকদেরকে সপরিবারে গণভবনে ডেকে ডিনার করছেন বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রী! অবশ্য ব্যাংক মালিকরা লিখিতভাবে আবদার করেছে, অনিয়ম লুটপাটের খবর লেখালেখির বাইরে রাখতে হবে- যেনো ছড়াকার আবু সালেহর ‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না’র দেশ!
 
জানা গেছে, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে প্রাইভেট ব্যাংকে। এই টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের তারল্য বাড়াবে, সিআরআর কমানোর ফলে আইন কানুন না মেনে আরও বিপুল উৎসাহে নতুন করে ঋণ দিবে। তবে বুদ্ধিমান গ্রাহকরা নিশ্চয় এই সুযোগটি হাতছাড়া করবে না। ব্যাংকে টাকা আসার সাথে আগে আগে যারা পারেন নিজেদের আমানতের টাকা, এফডিআর ইত্যাদি সব তুলে নিবেন। হয়ত পরে আর এই সুযোগ হয়ত থাকবে না। এই একটি সংবাদের জন্য ভবিষ্যতে এই রিপোর্টকে হয়ত মনে রাখতে হবে।
 
আর প্রবাসী যারা বিদেশে কষ্টার্জিত টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন, যারা একটু বেশি রেটের লোভে পড়ে প্রাইভেট ব্যাংকে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন- তারা কি বুঝতে পারছে কত বড় রিস্ক নিচ্ছেন? এদের কষ্টের টাকা যেকোনো সময় আটকে যেতে পারে ঐ সব হায় হায় কোম্পানীর ব্যাংকে। কোরামিন দিয়ে চালানো হচ্ছে এ ব্যাংকগুলো। নিজের টাকার নিরাপত্তা চাইলে প্রাইভেট ব্যাংকে নিজের রেমিটেন্স না পাঠিয়ে সরকারী ব্যাংক বা আর্মির ব্যাংক ব্যবহার করা উচিত।
 
ব্যাংকগুলির অবস্খা এরকম কি করে হলো?
সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ সংক্ষেপে বলেছেন, কোনো ব্যাংকের কাছে ১০০ টাকার আমানত থাকলে তা থেকে ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি করে ১২৫ টাকা পর্যন্ত লোন দিয়ে বসে আছে। ব্যাংকের এই মালিকরা এখন যত কান্নাকাটি করুক না কেনো, আসলে জনগনের টাকা লুট করেছে, তাদেরকে জেলে পাঠানো উচিত। আর এসব ঋণ যে রাজনৈতিক চাপ ও উচ্চমাত্রার দুর্নীতির ফলে দেয়া হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এগুলো কোনোদিন আদায় হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যংকের দুর্বল নিয়ন্ত্রন ও অকার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিপরায়ন শাসন ব্যবস্থার কুফলে রাজনৈতিক চাপে ব্যাংকগুলোর সর্বনাশ করা হয়েছে।
 
সরকারী ব্যাংক বানিয়ে প্রথমেই হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ তুলে নেয় উদ্যোক্তরা। লুটপাটে সুবিধা দেয়ার জন্য বর্তমান সরকার একই পরিবার থেকে ২ জনের স্থলে চার জনকে পরিচালক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যার ফলে সবাই মিলেমিশে বড় বড় অংকের লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এদের নেয়া টাকা আর ফেরত আসছে না। ফলে বাড়ছে মন্দ ঋণের পরিমাণ। কেবল নিজ ব্যাংক থেকেই নয়, বেসরকারি খাতের প্রায় সব ক’টি ব্যাংকের পরিচালকরা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ঋণ দেয়া-নেয়া করেন। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংক ৩ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, যমুনা ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ২ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক ২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংক ২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা,এনসিসি ব্যাংক ২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংক ১ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য। হিসাবে দেখা গেছে, গত জুন পর্যন্ত প্রায় ৯৩,৪৫০ কোটি টাকাই নিয়েছেন ব্যাংক পরিচালকরা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৫ শতাংশ।
 
কয়েকটি বড় লুটপাটের নজির-
১। ব্যাংকিং খাতের প্রথম ডাকাতি আবিস্কৃত হয় হলমার্ক কেলেঙ্কারীতে-এটা ছিল সরকারী ব্যাংকে সোনালী ব্যাংকে। এতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডাঃ মোদাচ্ছের আলী সশরীরে উপস্থিত হয়ে ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন, যেটা অর্থমন্ত্রী মাল মুহিতের কাছে- ‘কিছুই না’। হলমার্কের মালিক এখন কারাগারে থাকলেও জেলের কর্মকর্তাদেরকে কয়েকটি পাজেরো গাড়ি উপঢৌকন দিয়ে সর্বোচ্চ সুবিধায় আছেন। সোনালী ব্যাংকের চট্রগ্রামের আগ্রাবাদ ও লালদীঘি শাখায় স্থানীয় একজন পরিচালকের যোগসূত্রে জালিয়াতি করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে। ব্যাংকটির স্থানীয় কার্যালয়ে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতিতেও পরিচালকদের হাত রয়েছে।
২। একে একে আরও বের হয় ৬ ব্যাংক থেকে ১২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে বিসমিল্লাহ গ্রুপের হোতারা চম্পট।
৩। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবুল বারাকাত নিয়মনীতি না মেনে এ্যাননটেক্স গ্রুপের ইউনুছ বাদল নামে এক গাড়িচোরকে ঋণ দিয়েছে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। অর্থাৎ এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেতে পারেন না। অথচ দেওয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ। এই একই ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অকাতরে ৩৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে ক্রিসেন্ট লেদার নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে, যে অর্থের বড় অংশই পাচার হয়েছে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
৪। প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর যোগসাজশে হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। ভুয়া, বেনামি বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিয়ে এই ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।
৫। ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক নিজেরা ৬’হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা প্রকাশ করতে বারণ।
৬। চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছে।
৭। পিছিয়ে নেই ইসলামী ব্যাংকও। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইউনিল্যান্স টেক্সটাইলকে ৩৩০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। অব্যাহতভাবে ঋণ দিয়ে গেলেও তা ফেরত দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। বারবার খেলাপি হলেও তা পুনঃতফসিল করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা গোপন করে নতুন করে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
৮। রাষ্ট্রীয় শক্তির সাহায্যে বাংলাদেশের ব্যাংক রিজার্ভ লুটে ৭’শ কোটি টাকা চুরি হওয়ার পরেও একটা লোক আটক হয়না, বরং এর সাথে জড়িতরা এখনও ব্যাংকের ভিতরেই আছে! আর সেই চোরের সাগরেদ গভর্নর আতিউর কারাগারে না থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছে- গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বিশ্বব্যাংকের সেমিনারে বক্তৃতা করে বেড়ায়!
 
সরকারের অনুগত অর্থনীতিকরাই বলছেন, দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক ভেতরে ভেতরে দেউলিয়া হয়ে আছে। ৯টি ব্যাংক মূলধন ভেঙে খেয়ে ফেলেছে। মিডিয়ার খবর ৮০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে আছে, আরও ৪০ হাজার কোটি টাকার কোনো খবর নাই। আসলে ফিগারটা আরও বিরাট। এক সূত্রমতে, ৭ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ দেয়া আছে, যার প্রায় অনেকটাই মন্দ ঋণ। উচ্চ আদালতে রীট করে এদের বেশিরভাগকে খেলাপী দেখানো হয় না। অনেককে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ক্লাসিফিশেন করার সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব ঋণ আর কখনই আদায় হবেনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিবিআই বিভাগে এসবের হিসাব থাকলেও প্রকাশ করতে দেয়া হচ্ছে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সৃষ্টির পর থেকে যত খেলাপি ঋণ হয়েছে, তার ৫৩ শতাংশই গভর্নর আতিউরের আমলে।
 
সাধারন মানুষের পকেট কেটে সে অর্থ দিয়ে অবৈধ সরকার ফুয়েলিং করে বেসরকারী ব্যাংকগুলো সচল রাখার যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তা অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। বুদ্ধিমান গ্রাহকরা নিশ্চয় সময়ের সদ্বব্যহার করবেন। সুযোগ পাওয়া মাত্র নিজের সম্পদ তুলে হেফাজত করবেন। স্মরণ করা যায়, সন্দীপের মোস্তাফিজুর রহমানের বিসিআই ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকা আর ফেরত দিতে পারেনি। বেসিক ব্যাংক, ফারমরাস ব্যাংক সেই পথেই হাটছে- এদের অন্তেষ্টিক্রিয়া কেবল বাকী। আরও আছে এই পথের পথিক।
 
প্রশ্ন হলো, এই যে ১০/২০ হাজার কোটি টাকা প্রাইভেট ব্যাংকে দেয়া হবে এগুলো আসবে কোত্থেকে? সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ফান্ডে, এবং বিভিন্ন সরকারী প্রেক্টের টাকা বেসরকারী ব্যাংকে দেয়া হচ্ছে। কিছুদিন পরে এ অর্থ আর ফেরত পাওয়া যাবে না। এরআগেই জলবায়ু খাতের ৫০৮ কোটি টাকা খেয়ে ফেলেছে মখা আলমগীরের ফারমারস ব্যাংক। বেসরকারী ব্যাংকে তারল্য বাড়াতে গিয়ে কিছুদিন পরে দেখা যাবে সরকারী কর্মচারীরা পেনশন গ্রাচুয়িটি পাচ্ছে না। তবে এখন এসব বরাদ্দ যারা করবেন, তারও ভবিষ্যতে দায় এড়াতে পারবেন না। এদিকে দেশী বিদেশী কোনো বিনিয়োগ নাই, রেমিটেন্স কমছে, আমদানী বাড়ছে রপ্তানী কমছে, অর্থনৈতিক ডাটার ভুতুরে ফিগার দিয়ে উন্নয়নশীল দেশের শো শা করলেও বাস্তবে অর্থনীতি চলছে কোরামিনের ওপর। কেবল বিদেশী রেমিটেন্স আসায় ব্যাংকগুলো এখনও চালু রয়েছে। প্রাইভেট ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলে এগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। বেতন দিতে পারবে না, বাজেট দিতে পারবে না। রিজার্ভ ভেঙে কর্মচারীদের বেতন দিতে হবে, অথবা অর্ধেক বেতন ক্যাশে নাও বাকীটা বন্ডে! বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

/বিডিটুডে

« Older Entries