অবশেষে বোধেদয়- এটি কোনো ভোট হয়নি, আগের রাতে আ’লীগ ব্যালট বাক্স ভরে রেখেছে, নতুন নির্বাচন দরকার: রয়টার্সকে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সুষ্ঠু ছিল না, বরং নির্বাচনের আগে ব্যলটবাক্স পূর্ণ করা হয়েছিল, তাই নতুন করে নির্বাচন প্রয়োজন, এভাবেই পর্যবেক্ষণে যুক্ত হয়ে অনুতপ্ত হওয়ার কথা জানিয়েছেন সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন নামের একটি পর্যবেক্ষক সংস্থার প্রধান ও তাদের একজন বিদেশি স্বেচ্ছাসেবী। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও তারা সন্দেহ পোষণ করেন। গত ৩০ ডিসম্বের এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ বিজয় অর্জন করে টানা তৃতীয়বারের মতো সরকার গঠন করেছে।

যুক্তরাজ্যভিত্তিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের প্রধান বিচারপতি মোহাম্মদ আব্দুস সালাম বলেন, নির্বাচনের আগের রাতে আওয়ামী লীগের কর্মীরা ব্যালট বাক্স ভরে রেখেছেন এবং ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করেছেন। ভোটকেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার ও ভোটারদের কাছ থেকে নির্বাচনের এমন বিবরণ শোনার পর তার কাছে এখন মনে হচ্ছে, নতুন করে নির্বাচন হওয়ার দরকার।

সুপ্রিমকোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের সাবেক বিচারপতি ৭৫ বছর বয়সী আব্দুস সালাম বলেন, এখন আমি সবকিছু জানতে পেরেছি এবং বলতে দ্বিধা নেই, নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হয়নি। ফাউন্ডেশনের হয়ে কাজ করা এক কানাডীয় পর্যবেক্ষক বলেন, তার কাছে এখন মনে হচ্ছে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে অংশ না নিলেই বোধ হয় ভালো হতো।

নির্বাচন চলাকালীন অনিয়মনের জন্য ইতিমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের সমালোচনার মুখোমুখি হয়েছে বাংলাদেশ। পশ্চিমা দেশগুলোর বড় বড় ব্রান্ডের তৈরি পোশাকের গুরুত্বপূর্ণ রফতানিকারক হচ্ছে বাংলাদেশ। গার্মেন্ট পণ্য রফতানিতে চীনের পরেই দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দেশটি।

গত সপ্তাহে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে ৫০ আসনে জরিপ চালিয়ে ৪৭টিতেই অনিয়ম দেখতে পেয়েছে তারা। এতে বিশেষ করে জাল ভোট, জোর করে সিল মেরে ব্যালট বাক্স ভরা, ভোটকেন্দ্রে বিরোধী দলীয় এজেন্ট ও ভোটারদের ঢুকতে বাধা দেয়ার অভিযোগ রয়েছে।

বার্লিনভিত্তিক দুর্নীতিবিরোধী সংস্থাটি জানায়, তাদের জরিপ করা সব এলাকাগুলোতে নির্বাচনী প্রচারে কেবল ক্ষমতাসীন দলটিই সক্রিয় ছিল। কখনো কখনো স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও সরকারি সম্পদের সহায়তা নেয়া হয়েছে।

বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবের কথা বলে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের তদন্ত নাকোচ করে দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রাজনৈতিক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম সংস্থাটিকে বিরোধী দল বিএনপির ‘পতুল’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

আওয়ামী লীগ ও দলটির জোট সদস্যরা ৯৫ শতাংশ আসন নিশ্চিত করার পর বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জালিয়াতির অভিযোগ তুলে নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করেছে। তখন থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেন ভোট জালিয়াতি ও ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের তদন্তের দাবি জানিয়েছে আসছে।

নির্বাচনকে সামনে রেখে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অসন্তোষ প্রকাশ করে জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় সময়সীমার মধ্যে ভিসা ইস্যু না করায় ভোট পর্যবেক্ষণের পরিকল্পনা বাতিল করতে বাধ্য হয়েছে মার্কিন তহবিলের বেশকিছু পর্যবেক্ষক। ভিসা বিলম্বের অভিযোগ অস্বীকার করে বাংলাদেশ সরকার বলেছে, তারা যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেছে।

কানাডা, ভারত, নেপাল ও শ্রীলংকা থেকে পর্যবেক্ষক এনেছিল সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন। নির্বাচনের দিন ও তার পরে সুন্দর পরিভাষা ব্যবহার করে নির্বাচনের স্বচ্ছতার কথা বলেছে সংস্থাটি।

নির্বাচনের বিজয় ঘোষণার কয়েক ঘণ্টা পর নতুন বছরের প্রাক্কালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজের বাসভবনে একটি সাদা রঙের গদিতে বসে সাংবাদিক ও নির্বাচন পর্যবেক্ষকদের সামনে বক্তৃতা দেন।

তখন তিনি বলেন, নারী ও তরুণ প্রজন্মসহ সাধারণ মানুষ খুবই আগ্রহের সঙ্গে ভোট দিয়েছেন। আপনারা আমাদের দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসার মাধ্যমে গণতন্ত্র কীভাবে কাজ করে তা প্রদর্শনের একটা ভালো সুযোগ দিয়েছেন।

মাইক্রোফোন যখন কক্ষের ভেতর ঘুরছিল, অন্যদের সঙ্গে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের পর্যবেক্ষকরা নির্বাচনে বিজয়ের জন্য শেখ হাসিনাকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সৌদিভিত্তিক সংস্থা ইসলামিক কো-অপারেশনের পর্যবেক্ষকরাও তখন উপস্থিত ছিলেন। ফাউন্ডেশনের একজন প্রতিনিধি কানাডীয় নারী টানইয়া ফস্টার সবার আগে কথা বলেন। তিনি নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক ও সুষ্ঠু বলে উল্লেখ করেন। ফস্টার বলেন, আমি মনে করছি, বাংলাদেশে কানাডার মতোই নির্বাচন হয়েছে।

যদিও ফাউন্ডেশনের নামের প্রথমাংশ ও লোগো দেখতে দক্ষিণ এশিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিজিওনাল কো-অপারেশেনের (সার্ক) মতো, তবে এ দুটির মধ্যে কোনো সম্পর্ক নেই। সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের মহাসচিব আবেদ আলী রয়টার্সকে বলেন, সার্কের কাছে অনুমোদন পেতে তারা আবেদন করেছেন। দ্রুতই তারা অনুমোদন পাবেন বলে আশা করছেন।

সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা কমিটিতে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির দুজন সংসদ সদস্যও রয়েছেন। প্যানেলে বিএনপি আমলের এক মন্ত্রীরও নাম দেখা যায়। তবে এতে বর্তমান বিরোধীদলীয় কোনো সদস্য নেই। রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা আছে এমন পর্যবেক্ষক সংস্থাকে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সুযোগ দিতে বাংলাদেশের আইনে বারণ আছে।

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদ বলেন, আবেদ আলীর গ্রুপের সঙ্গে কোনো রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে তার জানা ছিল না। ফাউন্ডেশনের বোর্ড সদস্য হিসেবে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির সদস্যদের বিষয়ে জানতে চাইলে আবেদ আলী বলেন, তারা কেবল আমাদের মানবিক কার্যক্রমে সহায়তা করছেন। আমি পরিষ্কার করে বলতে চাই, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে আমাদের সংশ্লিষ্টতা নেই।

রাজধানী ঢাকার মিরপুরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে ভবনের নিচতলায় ধুলোয় ঢাকা দুটি কক্ষে ফাউন্ডেশনের মূল কার্যালয়। সংস্থাটির সভাপতি আব্দুল সালাম বলেন, তাদের পর্যবেক্ষকরা মাত্র কয়েকটি নির্বাচন কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছেন। কাজেই এতে নির্বাচন যে অবাধ ও সুষ্ঠু হয়েছে, তা পরিষ্কারভাবে মূল্যায়ন করা যায় না। তিনি বলেন, কয়েকজন প্রিসাইডিং অফিসার তাকে বলেছেন- ব্যালট বাক্স ভরতে তাদের বাধ্য করা হয়েছে। আব্দুস সালাম বলেন, আমি সত্য বলতে চাই। কোনো রাজনৈতিক স্বার্থ পেতে আমি এসব বলছি না।

কানাডার সাচকাচাওয়ান প্রাদেশিক সরকারের নীতি বিশ্লেষক টানইয়া ফস্টার বলেন, কানাডায় বসবাস করা বাংলাদেশিদের কাছ থেকে তিনি শুনতে পেয়েছেন যে সার্ক মানবাধিকার ফাউন্ডেশন বিদেশি পর্যবেক্ষক খুঁজছে। এটাকে একটা মজার অভিজ্ঞতা হিসেবে বিবেচনা করে আমি পর্যবেক্ষক হওয়ার যোগ্যতা জানতে চেয়েছি।

তিনি বলেন, আমি মানবাধিকার ফাউন্ডেশন ও নির্বাচন কমিশনে আবেদন করলাম। তারা আমাকে পরীক্ষা করল এবং একজন পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দিয়েছে। তার মেয়ে ক্লয় ফস্টারও পর্যবেক্ষক প্যানেলে ছিল। এর আগে কোনো জাতীয় নির্বাচনে তারা আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক হিসেবে কাজ করেননি। তবে ফাউন্ডেশনের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা ও সার্কের সঙ্গে যে এটির কোনো সম্পর্ক নেই, সে সম্পর্কে তিনি কিছু জানতেন না।

তিনি বলেন, এটাকে মহান কিছু মনে হয়নি আমার। খুব সাধাসিধা মনে হয়েছে। আমাদের প্রতিবেদন যে খুবই মূল্য বহন করছে- সে সম্পর্কে আমার ধারণা নেই। আমরা ৯টি ভোটকেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করেছি। সবগুলোই ঢাকায় ছিল।

খুবই বৈরী এলাকায় না যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা নির্বাচন কমিশনের নিরীক্ষা কিংবা প্রিসাইডিং অফিসার ও পোলিং এজেন্টদের অতীত পরীক্ষা করিনি। আবেদ আলী বলেন, ওই নারীর কানাডায় নির্বাচন পর্যবেক্ষণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। কোনো সংস্থার পক্ষেই সব নির্বাচন কেন্দ্র পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব না।

https://www.reuters.com/article/us-bangladesh-election-observers-exclusi-idUSKCN1PG0MA

Content Protection by DMCA.com

বিরোধীদের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলের কঠিন চাপের মুখে সরকার

বিরোধীদের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলের কঠিন চাপের মুখে সরকার৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপি হয়েছে বলে বিরোধীদের এমন অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে সরকার। আর এ কারণেই সরকারের ভেরতে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের পর দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি পৃথকভাবে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লিখিতভাবে ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়েছে।

পৃথক চিঠিতে তারা, নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার হরণের চিত্র তুলে ধরেছেন।

এছাড়া নির্বাচনের পর ৬ জানুয়ারি বিকেলে রাজধানীর হোটেল আমারি-তে বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। ওই বৈঠকে নির্বাচন সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন, অভিজ্ঞতা এবং অভিযোগের খুটিনাটি তুলে ধরেন নেতারা। ওই বৈঠকে পশ্চিমা কূটনীতিকরাও কোনো কোনো বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

কূটনীতিক সূত্রগুলো এমন পরিস্থিতিতে ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে নিজ নিজ দেশের সরকারকে বার্তা পাঠিয়েছে। তাতে নির্বাচনে অস্বচ্ছতা ও জনমতের প্রতিফলন হয়নি বলেই জানানো হয়েছে।

এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতার ঘটনায় হতাহত হওয়া, বলপ্রয়োগসহ আচরণবিধি লঙ্ঘণের অভিযোগ উত্থাপনের ফলে নির্বাচন ও তার ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ লঙ্ঘনের যে সব অভিযোগ গণমাধ্যমসূত্রে জানা গেছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে সংস্থাটি।

এক বিবৃতিতে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা ও বলপ্রয়োগসহ নির্বাচনী আচরণবিধির বহুমুখী লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগের কারণে নির্বাচন ও তার ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা শুরু থেকেই সব পক্ষের জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এসেছি। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা, হামলা ও নির্যাতনের সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। এমনকি নির্বাচনের আগের রাতে এবং নির্বাচনের দিনও এমন হয়রানি চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বড় আশংকার বিষয় হলো, এতে করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি দেশের জনগণের আস্থাহীনতা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ড. জামান বলেন, একটি জোটের পোলিং এজেন্টরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারার অভিযোগের বিষয়টি যেভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন তা একদিকে যেমন বিব্রতকর, অন্যদিকে তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে পেরেছে কিনা সে উদ্বেগ আরো ঘনীভূত করেছে।

ড. জামান বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ লঙ্ঘন করে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির নামে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজধানীতেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে যেভাবে সচিত্র প্রতিবেদন আকারে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে তাকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়াও ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার ভর্তি বাক্স নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, বহু ভোটার ভোট দেওয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া, প্রার্থীকে ভোট কেন্দ্রে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা ইত্যাদি ঘটনার প্রতিটির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে টিআইবি।

ড. জামান বলছেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তদন্ত করে এসব ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা নিরূপণ করা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা অপরিহার্য। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে আস্থার সংকটের প্রেক্ষিতে কমিশনের গৃহিত পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান থাকবে, এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিন।

যে অভূতপূর্ব নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্ট অভূতপূর্ব ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নতুন সরকার গঠিত হচ্ছে তার আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা, আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই তদন্ত অবশ্যকরণীয় বলে মন্তব্য করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক।

এতে বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলোও বিষয়টি বেশ শক্তভাবেই আমলে নিয়েছে। ফলে এর প্রভাবও কিছুটা দৃশ্যমান হয়েছে।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের কথাবার্তার সেটার কিছুটা প্রমাণ মিলছে। ১১ জানুয়ারী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশ স্বীকৃতি দিলেও ঐক্যফ্রন্ট নানা অজুহাত তুলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের চৌধুরী।

তিনি আরো বলেন, ঐক্যফ্রন্ট যতই ষড়যন্ত্র করুক তা জনগণ মেনে নেবে না।

ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের বিজয় এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র চলছে। কাজেই আমাদেরকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

এদিকে ভারত, রাশিয়া ও চীনসহ গুটি কয়েকটি রাষ্ট্র নবগঠিত সরকারকে অভিনন্দন জানালেও ইউরোপ-আমেরিকা বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।

যার ফলে বিপুল বিজয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও চরম অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। এ নিয়ে সরকারে চরম অস্বস্থি বিরাজ করছে। তবে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার তৎপরতা শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন যাচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। ২২ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ডেভিড হ্যালের সঙ্গে তার বৈঠক হবে।

সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রোহিঙ্গা ইস্যু, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মূলত এই আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটনে যাওয়ার আগে পররাষ্ট্র সচিব অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) সিনিয়র অফিসিয়াল মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার জন্য সৌদি আরব যাবেন।

সরকারের একজন কর্মকতা বলেন, ‘নতুন সরকার গঠন হয়ে গেছে এবং আমরা যুক্তরাষ্ট্রসহ সব অংশীদারদের সঙ্গে কথা বলবো।’গত ২ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে সফরের বিষয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্র সচিব।

এদিকে সহিংসতা আর ব্যাপক কারচুপির কারণে ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ্ট নয় কেউই। সরকার নিয়ন্ত্রিত এ নির্বাচনে দেশে এবং দেশের বাইরে সমালোচনা আর নিন্দার ঝড় বইছে। কারচুপির অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এবং সব পক্ষকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের তাগাদা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মুখে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার ব্যাপক প্রচার করলেও এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব।

সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ এবং কারচুপির সুষ্ঠু তদন্তের তাগাদা দিয়ে ইতিমধ্যে বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ।

বাংলাদেশ নির্বাচন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে কড়া বার্তা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

নির্বাচন নিয়ে সরকারকে ‘স্বাগত’ না জানিয়ে তারা বরং অনিয়ম, কারচুপি এবং সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করার আহবান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে গণতন্ত্রের সংকট সমাধানে সবপক্ষকে এক হয়ে পন্থা খুঁজে বের করার তাগাদাও উঠে এসেছে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার দেশ এবং সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব শক্ত ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন এবং অবস্থান তোলে ধরেছেন তাতে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে বেকায়দায় পড়তে পারেন শেখ হাসিনা সরকার। বুধবার যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম রয়টার্স তাদের এক প্রতিবদনে এমন অভিমত তোলে ধরেছে।

‘ওয়েস্টার্ণ পাওয়ার কলস ফর প্রোব ইনটু বাংলাদেশ ইলেকশন ইরেগুলারিটিস, ভায়োলেন্স’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব। যে নির্বাচনে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন জোট ৯০ শতাংশের বেশী আসনে জয়ী হয়েছে সে ভোটে সংগঠিত কারচুপির অভিযোগগুলো নিয়েও সবিস্তারে কথা বলেছে পশ্চিমাদেশগুলো।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব কড়া ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন তোলে ধরেছেন সেটি শেখ হাসিনার ভাবমূর্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাপক কারচুপি আর ভোটারদের আতংকিত করে নির্বাচন করা হয়েছে অভিযোগ এনে এর ফলাফল প্রত্যাখান করেছে শেখ হাসিনার বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল। তবে অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার ভাষ্যমতে ভোট ছিলো শান্তিপূর্ণ, আর তাতে উৎসব মুখর পরিবেশে অংশ নিয়েছেন তার সমর্থকরা।

দেশে চলমান পরিস্থিতির দিকে ইংগিত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবারের ঢাকার পরিস্থিতিটা ছিলো চুপচাপ। তবে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বলছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলার শিকার হচ্ছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগ এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদরে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছে, নির্বাচনের দিনে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছে, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াজুড়ে ছিলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ঘাটতি। এসকল প্রতিবন্ধকতার কারণেই নির্বাচনের প্রচার এবং ভোটদান প্রক্রিয়া কলুষিত হয়েছে।”

নির্বাচনে অনুষ্ঠিত কারচুপির অভিযোগসমূহের একটি যথার্থ তদন্ত করার আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিদেশে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও এ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে দেশটি জানিয়েছে, হয়রানি, ভীতিকর পরিস্থিতি এবং সহিংস কর্মকান্ডের জন্যই নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে বিরোধী দলের প্রার্থী এবং সমর্থকেরা স্বাধীনভাবে তাদের সভা-সমাবেশ করতে পারেনি, কোনো প্রচারণা চালাতে পারেনি। এঘটনাগুলোর স্বপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে, আর তাতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।

ভোটে বাধা দেবার বিষয়টিতে অসন্তোষ জানিয়ে দেশটি বলেছে, ভোটের দিনে সংগঠিত অনিয়মগুলোর কারণে অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। এ বিষয়টিতে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি।কারচুপির এসব বিষয় নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পশ্চিমা বিশ্বের এ ধরনের বক্তব্যে সরকারকে কিছুটা শঙ্কিতও করেছে বটে। কেননা, পশ্চিমাবিশ্বকে এড়িয়ে চলার মতো সক্ষমতা এখনো বাংলাদেশের হয়নি। তথা গ্লোবাল ভিলেজের যুগে বিশ্বের প্রভাবশালী একটা বড় অংশকে এড়িয়ে চলা কোনো দেশের জন্য শুভকর নয়। কেননা, শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদবিরোধী উদ্যোগে রয়েছে বাংলাদেশের।

ফলে এ মুহূর্তে পশ্চিমা বিশ্বের মান-অভিমান ও অভিযোগকে এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই সরকারের। ফলে নিয়ে সরকার অনেটাই অস্বস্থিতে ভুগছে।

আর এ অস্বস্থি আরো বাড়িয়ে দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের গঠনমূলক রাজনীতি, বক্তব্য ও বিবৃতি। এবারের নির্বাচনের আগে-পরের ঐক্যফ্রন্টের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। তারা অন্যদের উস্কে দেয়া কোনো সহিংস পথে না গিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে।

৬ জানুয়ারি বিকেলে রাজধানীর হোটেল আমারি-তে বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর কূটনীতিকদের সাথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এই বৈঠকে নির্বাচন সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন, অভিজ্ঞতা এবং অভিযোগের খুটিনাটি তুলে ধরা হয়েছে।

ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আমরা তাদের কাছে নির্বাচনের কিছু ডকুমেন্ট দিয়েছে যে নির্বাচনের আগের দিন ও পরের দিন কী হয়েছে। সেই সঙ্গে ডকুমেন্ট অনুসারে আমরা তাদের একটা পেনড্রাইভ দিয়েছি, যাতে তারা দেখতে পারেন নির্বাচনের আগের এবং পরের দিন কী হয়েছিল।

কামাল হোসেন বৈঠকের ব্যাপারেে আরো বলেন, ‘যারা এসেছিল তারা বন্ধুরাষ্ট্রের। তারা আমাদের বন্ধু, জনগণের বন্ধু এবং সরকারেরও বন্ধু। আমরা নির্বাচনের অনিয়মের বিষয়গুলো তাদের কাছে তুলে ধরেছি। তারা এ নিয়ে কোনো বিতর্ক করেনি। আমরা যা দেখেছি, তারাও তাই দেখেছে। তারা আমাদের কথা শুনেছেন এবং বলেছেন—গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাক তারাও সেটা চান। তারাও চান এদেশের মানুষ স্বস্তিতে, শান্তিতে থাক।’

একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালো হয়নি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের এমন অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা। যা হবার হয়ে গেছে, এখন একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক। সরকারকে চাপ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে বোঝাক তারা’।

বিরোধীদের এসব অভিযোগ আর পশ্চিমাবিশ্বের ভূমিকাসহ সবমিলেই সরকারের এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে সরকারের কূটনীতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পশ্চিমাবিশ্বের প্রভাবশালী টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারটিও ভাবছে।

অবশ্য নির্বাচনের পরের দিন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ বিষয়ে বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভোটে কোনো কারচুপি হয়নি। কেউই যদি প্রমাণ করতে পারে কারচুপি হয়েছে। তাহলে পুনরায় ভোট হতে তো আমাদের আপত্তি নেই।’

/আরটিএনএন

Content Protection by DMCA.com

চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নতুন মেরুকরণ ও বাংলাদেশ

১১ জানুয়ারী, ২০১৯

মাসুম খলিলী:
দক্ষিণ এশিয়ায় পরাশক্তিগুলোর প্রভাব-প্রতিযোগিতা নতুন অবয়ব নিতে শুরু করেছে। এ অঞ্চলে এক দশক আগে পরাশক্তিগুলোর যে মেরুকরণ দেখা গিয়েছিল, তা এখন বেশখানিকটা পাল্টে যেতে শুরু করেছে। এ পরিবর্তনে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্নায়ুযুদ্ধকালে সোভিয়েত-মার্কিন ক্ষমতা বিস্তারের প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎশক্তি ভারত ছিল সোভিয়েত বলয়ে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সময়কালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে থাকা জওয়াহেরলাল নেহরুর সাথে ব্রিটিশ শাসকদের ভালো সম্পর্ক থাকলেও তার আদর্শগত ভাবনা-চিন্তায় সমাজতন্ত্রের প্রভাব দৃশ্যমান ছিল। ব্রিটিশ-সোভিয়েত যৌথ প্রভাবে তিনি স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রিক মূলনীতি ও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের সমন্বয় আনতে চেয়েছেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় উদ্যোগগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে মুক্তভাবে শিল্প বিকাশের সুযোগ দেন।
লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সংক্ষিপ্ত সময়ের পর নেহরু-তনয়া ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাবার অনুসৃত নীতিই এগিয়ে নিয়ে যান। বাবা-মেয়ের দুই আমলেই দৃশ্যমান নীতি হিসেবে ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিলেও কার্যক্ষেত্রে সোভিয়েত বলয়ে অবস্থান নেয়। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান অবধি ভারতের সরকারনির্বিশেষে এ নীতি অনুসৃত হতে থাকে। স্নায়ুদ্বন্দ্বের অবসানে সোভিয়েতের পরিবর্তে রুশ অধ্যায় শুরু হলে দিল্লি একধরনের ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করতে শুরু করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের পথে পা বাড়ায়। নরসিমা রাও, অটল বিহারি বাজপেয়ি এবং মনমোহন সিংয়ের চার মেয়াদে ধীর গতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থান ও পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনমুখী হতে শুরু করে।
নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় কৌশলগত নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এ পরিবর্তনে আমেরিকামুখী নীতি-কৌশলের পরিবর্তন ধীরমাত্রার বদলে দ্রুতগতির মাত্রা নেয়। প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা চুক্তিসহ অনেকগুলো কৌশলগত সহায়তা চুক্তি হয় দিল্লি-ওয়াশিংটনের মধ্যে। নরেন্দ্র মোদি এ সহযোগিতার মাধ্যমে ভারতকে মহাশক্তি তথা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও পরমাণু প্রযুক্তি রফতানিকারক দেশের পর্যায়ে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখায়। বাস্তবে এর কোনোটাই অর্জিত হয়নি। কিন্তু এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে প্রতিরক্ষাসামগ্রী আমদানি এবং ভারত মহাসাগরে মার্কিন মিত্র জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সাথে যৌথ মহড়া ও প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগে চীনের সাথে বৈরিতা বৃদ্ধি পায় দিল্লির।
এর ফলে এক দিকে ডোকলাম সঙ্কটের মতো সীমান্ত সঙ্ঘাত বৃদ্ধি পায়; অন্য দিকে পাকিস্তানের সাথে চীনের যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ জোরদার হয়। রাশিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তৈরি হয় ইসলামাবাদের। এই মেরুকরণ দিল্লির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তোলে। ভারতের অনেক নীতিনির্ধারক ভারসাম্য নীতি গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কৌশলগত চিন্তাবিদ পরাগ খান্না ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ‘ভারত কখনোই যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো পরাশক্তি হবে না।’ কিন্তু তিনি এটাও বলেন যে, ‘এ দেশটি বিশ্বব্যবস্থার দিক বদলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এশিয়াতে তো বটেই। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন সবাই যদি ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চায় এ কারণে যে ভারসাম্য রক্ষায় ভারত ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে বড় ধরনের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না জড়িয়েও ভারত সবার সাথেই বন্ধুত্ব রাখতে পারবে।’
শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি আবার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নতুন করে এস ৪০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রয় ও নিরাপত্তা খাতে বিভিন্ন চুক্তি হয় দিল্লি-মস্কোর মধ্যে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে রুশ-চীন লাইনে দিল্লির অবস্থান আগে থেকেই এর একটি ভিত সৃষ্টি করে।
ভারতের সাউথ ব্লকে নীতিনির্ধারণ পর্যায়েও এর মধ্যে পরিবর্তন আসে। পররাষ্ট্র সচিব পদে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এস জয়শঙ্করের স্থলাভিষিক্ত হন চীনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বিজয় কেশব গোখলে। জয়শঙ্করের অগ্রাধিকার যেখানে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা, সেখানে গোখলের অগ্রাধিকার হয় চীনের সাথে বৈরিতার জায়গাগুলো এক পাশে সরিয়ে রেখে যেখানে সম্ভব সেখানে ভারত-চীন সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ১০ দিন আগে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক সুবির নন্দী লিখেছিলেন, ‘গোখলের কৌশল ৩০ ডিসেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে কিছুটা পরীক্ষার মুখে পড়বে। মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা দুই জায়গাতেই ভারতের বন্ধুরা নৈতিকভাবে একটা শক্ত অবস্থানে ছিল। তারা যাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন তাদের অবস্থান ছিল দৃশ্যত গণতন্ত্রের বিপক্ষে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এবং সফল গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে এসব ব্যক্তির সমর্থন দেয়া ভারতের জন্য সহজ ছিল। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভেস্তে গেছে। কারণ ভারত যে উচ্চ নৈতিক অবস্থান কামনা করে, সেটা এখানে নেই। পশ্চিমা দেশগুলো হাসিনার বিরুদ্ধে দেশকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার অভিযোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে এটা বোঝাতে ভারতের বেগ পেতে হচ্ছে যে, হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে সেটা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ভালো হবে।’
সুবির নন্দী বাংলাদেশে গোখলের নীতির যে পরীক্ষার কথা বলেছিলেন, সেটির সফল বাস্তবায়ন এর মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশে। এখানে পাশ্চাত্যের দেশগুলো যেখানে মুক্ত, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকর অভিযাত্রা চেয়েছে, সেখানে ভারত চীনের সাথে মিলে এমন এক নির্বাচন করতে শেখ হাসিনার ক্ষমতাসীন সরকারকে সমর্থন করেছেÑ যার সাথে উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের নির্বাচনকে তুলনা করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। মনে হয়, এখানে দিল্লি-বেইজিং সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এ অঞ্চলে আমেরিকান প্রভাবকে গভীর হতে না দেয়া।
অথচ ২০০৭-০৮ সালে ভারতের প্রভাবকে বাংলাদেশে সর্বব্যাপী করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। এবার ওয়াশিংটন মনে করেছিল, এখানে একটি মুক্ত, উদার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দিল্লির সহযোগিতা পাওয়া যাবে; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এর উল্টোটাই হয়েছে।
খোগলের যে নীতির কথা বলা হচ্ছে, ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভদ্রকুমার সেটি গ্রহণের পক্ষে অনেক দিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘জি২০ সম্মেলনের ফাঁকে আরেকটি ত্রিদেশীয় বৈঠক হয়েছে, যেখানে একত্র হয়েছিল রাশিয়া, চীন ও ভারত। কার্যত, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ত্রিদেশীয় এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ইউরেশিয়ান প্রচেষ্টা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন; যেখানে ভারত ও চীনের সাথে আরআইসি (রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চায়না) ফর্মেটকে নেতৃত্বের পর্যায়ে উন্নীত করা হবে। পুতিন যে নিয়মিত আরআইসি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন, সেখানে চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নকে উৎসাহিত করার জন্য রাশিয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’
ভদ্রকুমার বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে আরআইসির মধ্যে আরো গতিশীলতা নিয়ে আসা এখন রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির অংশ। বেইজিং ও দিল্লির সাথে আলোচনার পর মস্কো প্রস্তাবটি নিয়ে সতর্কভাবে বিবেচনা করতে পারে। আরআইসি ফর্মেট শুরু যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-ভারত ফর্মেটের বিপরীতে একটা ভারসাম্যই তৈরি করছে না; বরং ব্রিকস ও এসসিও’কেও শক্তিশালী করবে। এটা ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে দৃঢ় করবে।’
এর আগে রাশিয়া, চীন ও ভারতের একত্র হওয়ার ধারণাটি ১৯৯৭ সালে প্রথম তুলেছিলেন রাশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরলোকগত ইভজেনি প্রিমাকভ; কিন্তু ভারত ও চীন তখন সাড়া দেয়নি। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণের বিষয়টি অধিক গুরুত্ব লাভ করে।
বাংলাদেশকেন্দ্রিক চীন-রাশিয়া-ভারত মেরুকরণটি এখানে থেমে থাকবে বলেও মনে হয় না। এর পরবর্তী প্রভাব দেখা যেতে পারে আফগানিস্তানে। এর মধ্যে সেখানে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তালেবান ইস্যুতে একটি বোঝাপড়ার ব্যাপারে পাকিস্তানের সাথে একধরনের সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে ওয়াশিংটনের।
বেইজিংয়ের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ব্যাপারে চীন বরাবরই সাধারণ এশীয় অবস্থান নেয়ার কথা বলত। এ অঞ্চলে যাতে আমেরিকান প্রভাব বাড়তে না পারে, সে জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলত। এই অবস্থানের বিপরীতে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক বাড়াবাড়ি রকমের পর্যায়ে উপনীত হওয়ার ফলে ডোকলাম সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে বেইজিং এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যাতে ভারত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
এখন গোখলে তত্ত্বের প্রভাবে দিল্লি সম্ভবত ওয়াশিংটনের প্রভাব থেকে বেশখানিকটা বের হয়ে আসতে চাইছে। এর ফলে চীন-ভারত-রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার কার্যক্রম বেড়ে যাবে। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক কিছুটা হলেও বাড়বে। চীনের অর্থ ও বিনিয়োগপ্রবাহ কমতে থাকবে।
বাংলাদেশে চীন-ভারতের যে প্রীতিভাব তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও পড়তে পারে। এরপর শ্রীলঙ্কায় এখন যে সিরিসেনা-রাজাপাকসে-বিক্রমাসিংহে যুদ্ধংদেহী অবস্থা চলছে, তার অবসানেও গোখলে তত্ত্ব কাজ করতে পারে। এটি নেপালেও ভারত-চীনের মধ্যে সহাবস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে রোহিঙ্গা ইস্যুতেও। পশ্চিমা দেশগুলো এই মেরুকরণকে কিভাবে নেয়, সেটিই হলো দেখার বিষয়।
তবে এই বাস্তবতাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশে ভারত ও চীনের স্বার্থ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূরক নয়। ফলে নির্বাচনে জয়ের জন্য শেখ হাসিনা প্রথম দু’টি অভিনন্দন বার্তা ভারত ও চীনের কাছ থেকে পেলেও আগামীতে তা অব্যাহত না-ও থাকতে পারে। এমন কথাও এখন শোনা যাচ্ছে যে, শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভা থেকে পুরনো যাদের ছেঁটে ফেলেছেন তাদের বেশির ভাগই দিল্লির ঘনিষ্ঠ। ফলে নতুন সরকারে ভারতের চেয়ে চীনা প্রভাব বেশখানিকটা বাড়তে পারে। দিল্লির বিশ্লেষক ভরত ভূষণের লেখায়ও সেটির প্রকাশ পাওয়া যায়।
ভরত ভূষণের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে ভারত ও চীন উভয়ে স্বাগত জানালেও তাদের স্বার্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীন প্রথমত চায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ও দ্বিতীয়ত ভারতের মোকাবেলায় কৌশলগত পা রাখার জায়গা। ক্ষমতাসীন দলের প্রখ্যাত পরিবারগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতিতে হানা দিয়ে চীন তার কৌশলগত লক্ষ্য হাসিল করতে চায়। আওয়ামী লীগ সরকার চীনকে বেশ কয়েকটি প্রবেশপথ দিয়েছে। বাংলাদেশ হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অবিভাজ্য অংশ। ছয়টি বিআরআই করিডোরের (চারটি স্থল ও দু’টি সামুদ্রিক) মধ্যে বাংলাদেশ কুনমিং থেকে কলকাতা (মিয়ানমারের কিয়াকফু বন্দর থেকে চট্টগ্রাম হয়ে) পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ সাগরপথের অবিভাজ্য অংশ।
তিনি আরো লিখেছেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও এটি চীনকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের সুযোগ দেবে। ৮৫ শতাংশ চীনা মালিকানায় থাকা কিয়াকফু বন্দরটি হবে একটি জ্বালানি হাব। এর ফলে চীন অরক্ষিত মালাক্কা প্রণালীর ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে পারবে। এই প্রণালী দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৮০ শতাংশ তেল আমদানি করে থাকে চীন। কিয়াকফু বন্দরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা তেল জমা করা হবে। সৌদি আরব এখানে একটি শোধনাগার বানাবে, কাতার বানাবে একটি গ্যাস পরিশোধন প্লান্ট। এখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে চীনে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। কক্সবাজারের কাছে থাকা সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরটির কাজ এখন বন্ধ আছে। চীন তার ভূ-কৌশলগত, ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূ-জ্বালানি স্বার্থ এবং সেই সাথে পদ্মা সেতু, চট্টগ্রাম মহাসড়ক প্রকল্প ও ১৩৫০০ মেগাওয়াট মহেশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় প্রকল্পে তার বিনিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য ঢাকায় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা চায়। মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় আসার পর ১.৫ বিলিয়ন ডলারের ইস্ট-ওয়েস্ট রেলওয়ে প্রকল্প বাতিল করার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ে ভীত চীন।’
ভারতীয় বিশ্লেষক মনে করছেন, বাংলাদেশে চীনের প্রবেশে ভারতের সম্মতি থাকলেও এখানে চীনা উপস্থিতি সময়ের পরিক্রমায় সম্প্রসারিত হবে এবং ভারত তাতে ভেটো দিতে পারবে না। চীনা সম্প্রসারণ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের ভূমিকা কোণঠাসা করে ফেলবে।
সব কিছু পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশকেন্দ্রিক মহা খেলা এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে ঘনীভূত হতে শুরু করেছে বলেই মনে হচ্ছে। এই মহা খেলা শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে কী গতিপথ নেয় তা বলা মুশকিল। এই খেলায় শক্তিধরদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনিভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পৃক্ততাও রয়েছে। অল্প কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সম্পৃক্ত হতে পাশ্চাত্যের কোম্পানিগুলোকে বেশি দেখা যেত। কয়েক দিন আগে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম এ এলাকার ব্লক ইজারা পাওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। চীনও তার আগ্রহের কথা জানিয়েছে ঢাকাকে। কৌশলগত খেলার পরিণাম অনেক সময় বেশ ভয়ঙ্করও হয়ে দাঁড়ায়। তেমন একটি অবস্থা এ অঞ্চলে না আসুক, সেটিই সবার প্রত্যাশা।
[email protected]

Content Protection by DMCA.com

মন্ত্রিত্ব টিকলেও সাধারণ সম্পাদকের পদ হারাচ্ছেন কাদের!

Content Protection by DMCA.com

মন্ত্রি-বঞ্চিতদের মুখ বন্ধ করতেই দুদক লাগিয়ে দিয়েছে পিছে!

Content Protection by DMCA.com

নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি পশ্চিমাবিশ্ব, কারচুপির অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্তে তাগাদা

নির্বাচনের ফলাফল মেনে নেয়নি পশ্চিমাবিশ্ব, কারচুপির অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত চায়সহিংসতা আর ব্যাপক কারচুপির কারণে বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সন্তুষ্ট নয় কেউই। সরকার নিয়ন্ত্রিত এ নির্বাচনে দেশে এবং দেশের বাইরে সমালোচনা আর নিন্দার ঝড় বইছে। কারচুপির অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এবং সব পক্ষকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের তাগাদা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে সরকার ঢাকঢোল পিটালেও এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব।

সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ এবং কারচুপির সুষ্ঠু তদন্তের তাগাদা দিয়ে ইতিমধ্যে বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ।

বাংলাদেশ নির্বাচন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে মঙ্গলবার কড়া বার্তা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন। নির্বাচন নিয়ে সরকারকে ‘স্বাগত’ না জানিয় তারা বরং অনিয়ম, কারচুপি এবং সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করার আহবান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে গণতন্ত্রের সংকট সমাধানে সবপক্ষকে এক হয়ে পন্থা খুঁজে বের করার তাগাদাও উঠে এসেছে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার দেশ এবং সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব শক্ত ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন এবং অবস্থান তোলে ধরেছেন তাতে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে বেকায়দায় পড়তে পারেন শেখ হাসিনা। বুধবার যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম রয়টার্স তাদের এক প্রতিবদনে এমন অভিমত তোলে ধরেছে।

‘ওয়েস্টার্ণ পাওয়ার কলস ফর প্রোব ইনটু বাংলাদেশ ইলেকশন ইরেগুলারিটিস, ভায়োলেন্স’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব। যে নির্বাচনে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন জোট ৯০ শতাংশের বেশী আসনে জয়ী হয়েছে সে ভোটে সংগঠিত কারচুপির অভিযোগগুলো নিয়েও সবিস্তারে কথা বলেছে পশ্চিমাদেশগুলো।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব কড়া ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন তোলে ধরেছেন সেটি শেখ হাসিনার ভাবমূর্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাপক কারচুপি আর ভোটারদের আতংকিত করে নির্বাচন করা হয়েছে অভিযোগ এনে এর ফলাফল প্রত্যাখান করেছে শেখ হাসিনার বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল। তবে অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার ভাষ্যমতে ভোট ছিলো শান্তিপূর্ণ, আর তাতে উৎসব মুখর পরিবেশে অংশ নিয়েছেন তার সমর্থকরা।

দেশে চলমান পরিস্থিতির দিকে ইংগিত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবারের ঢাকার পরিস্থিতিটা ছিলো চুপচাপ। তবে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বলছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলার শিকার হচ্ছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগ এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদরে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছে, নির্বাচনের দিনে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছে, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াজুড়ে ছিলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ঘাটতি। এসকল প্রতিবন্ধকতার কারণেই নির্বাচনের প্রচার এবং ভোটদান প্রক্রিয়া কলুষিত হয়েছে।

নির্বাচনে অনুষ্ঠিত কারচুপির অভিযোগসমূহের একটি যথার্থ তদন্ত করার আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিদেশে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও এ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে দেশটি জানিয়েছে, হয়রানি, ভীতিকর পরিস্থিতি এবং সহিংস কর্মকান্ডের জন্যই নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে বিরোধী দলের প্রার্থী এবং সমর্থকেরা স্বাধীনভাবে তাদের সভা-সমাবেশ করতে পারেনি, কোনো প্রচারণা চালাতে পারেনি। এঘটনাগুলোর স্বপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে, আর তাতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।

ভোটে বাধা দেবার বিষয়টিতে অসন্তোষ জানিয়ে দেশটি বলেছে, ভোটের দিনে সংগঠিত অনিয়মগুলোর কারণে অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। এ বিষয়টিতে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি। কারচুপির এসব বিষয় নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

Content Protection by DMCA.com

ইসিতে ঐক্যফ্রন্টের স্মারকলিপি: ‘নির্বাচনের নামে জাতির সঙ্গে তামাশা, দেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে’

ইসিতে ঐক্যফ্রন্টের স্মারকলিপি ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বলেছেন, ‘নির্বাচনের নামে জাতির সঙ্গে তামাশা করা হয়েছে। দেশকে অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।’

বৃহস্পতিবার বিকেলে নির্বাচন কমিশনে স্মারকলিপি প্রদান শেষে সাংবাদিকদের কাছে এসব কথা বলেন তিনি।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফল বাতিল করে অবিলম্বে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) স্মারকলিপি দিয়েছ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। ঐক্যফ্রন্টের মুখপাত্র বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নেতৃত্বে সাত সদস্যর একটি প্রতিনিধি দল বৃহস্পতিবার বিকেলে ইসিতে স্মারকলিপি জমা দেয়।

পরে মির্জা ফখরুল সাংবাদিকদের বলেন, ঐক্যফ্রন্টের জয়ীরা শপথ নেবেন কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমরা ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছি। শপথ নেওয়ার প্রশ্ন আসবে কেন?’

যেখানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন সেখানে কারচুপি হয়েছে কিনা—এমন প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সেগুলোতেও ডাকাতি হয়েছে, তবে তারা কুলিয়ে উঠতে পারেনি।’

পরে সাংবাদিকদের স্মারকলিপি পড়ে শোনান মির্জা ফখরুল। স্মারকলিপিতে তারা অভিযোগ করেছে, নির্বাচনের আগের রাতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাদের সহায়তার আওয়ামী লীগের কর্মী ও সন্ত্রাসী বাহিনী ৩০ থেকে ৬০ শতাংশ ভোট কেটে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে।

এর আগে দুপুরে রাজধানীর গুলশানে বিএনপির মহাসচিব সাংবাদিকদের বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদে যোগ দিচ্ছে না বিএনপি ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট।

সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তখন তিনি বলেন, ‘শপথ তো পার হয়ে গেছে, শপথ নেব কোথায়? প্রত্যাখ্যান করলে আবার শপথ থাকে নাকি? আমরা শপথ নিচ্ছি না।’ তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচনের নামে নিষ্ঠুর প্রতারণা ও প্রহসন করা হয়েছে। এ কারণে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি জানাচ্ছে।

 

Content Protection by DMCA.com

বাংলাদেশের অনিয়মের নির্বাচনে গণতন্ত্রের সর্বনাশ: আন্তর্জাতিক মিডিয়া

02 Jan, 2019

Content Protection by DMCA.com

বাংলাদেশের প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচনের অনিয়ম তদন্ত করতে জাতিসঙ্ঘ, যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউর আহবান

Content Protection by DMCA.com

এই বিজয় কলঙ্কিত: এএফপির প্রতিবেদন

 

৩১ ডিসেম্বর,২০১৮

এই বিজয় কলঙ্কিত: এএফপির প্রতিবেদনভূমিধস বিজয় পেয়ে চতুর্থ বারের মতো ক্ষমতা নিশ্চিত করলেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। অন্যদিকে মারাত্মক ভোট জালিয়াতি ও সংঘর্ষে কমপক্ষে ১৭ জন নিহত হওয়ার কারণে নির্বাচনকে প্রহসন এবং সাজানো বলে আখ্যায়িত করেছে বিরোধীরা।

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলাল উদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, জাতীয় সংসদের ৩০০ আসনের মধ্যে ২৮৮টিতে বিজয়ী হয়েছে শেখ হাসিনার ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও এর মিত্ররা। মাত্র ৬টি আসনে বিজয়ী হয়েছে প্রধান বিরোধী দল।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনপীড়ন চালিয়েছে সরকার। দলটি নির্বাচন কমিশনের প্রতি এ নির্বাচনের ফল বাতিল করার আহ্বান জানিয়েছে। ঐক্যফ্রন্টের প্রধান ড. কামাল হোসেন সাংবাদিকদের বলেছেন, যত দ্রুত সম্ভব একটি নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে আমরা একটি নতুন নির্বাচন দাবি করছি।

ভয়াবহ সহিংসতা ও তিক্ত বিরোধ এবারের নির্বাচনী প্রচারণাকে ব্যাহত করেছে। নির্বাচনের দিনেও তা অব্যাহত ছিল, যদিও কর্তৃপক্ষ সেনা, পুলিশ ও অন্যান্য নিরাপত্তা রক্ষাকারী বাহিনীর ৬ লাখ সদস্যকে মোতায়েন করেছিল সারাদেশে। পুলিশ বলেছে, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন ১৩ জন। পুলিশের গুলিতে নিহত হয়েছে তিন জন। বিরোধী সশস্ত্র কর্মীদের হাতে পুলিশের একজন সহায়ক সদস্য নিহত হয়েছেন বলে সরকারি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন।

এক দশক ক্ষমতায় থাকার সময়ে দক্ষিণ এশিয়ার এ দেশটিতে অর্থনীতি উন্নত করা ও মায়ানমারে সেনাবাহিনীর নৃশংসতা থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেয়ার কারণে প্রশংসিত ৭১ বছর বয়সী শেখ হাসিনা। কিন্তু তিনি কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছেন, তার প্রধান প্রতিপক্ষ ও বিএনপির প্রধান খালেদা জিয়াকে জেলে পাঠানোর মাধ্যমে বিরোধীদের ওপর দমনপীড়নের জন্য তার সমালোচনা করছেন সমালোচকরা। বিরোধীরা রবিবার অভিযোগ করেছে, শেখ হাসিনার দল ব্যালট দিয়ে বাক্স ভর্তি করেছে এবং নির্বাচনের ফল তাদের পক্ষে নেয়ার জন্য অসদুপায় অবলম্বন করেছে।

বিএনপির মুখপাত্র সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল সাংবাদিকদের বলেছেন, ৩০০ আসনের মধ্যে ২২১টিতে অনিয়ম হয়েছে। তিনি বলেন, ভোটকেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়া হয় নি ভোটারদের। বিশেষ করে নারী ভোটারদেরকে নৌকায় ভোট দিতে বাধ্য করা হয়েছে।

‘আমরাই আপনার ভোট দিয়ে দেবো’
বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের মুখপাত্র এসএম আসাদুজ্জামান বলেছেন, তারা অল্প কিছু অনিয়মের অভিযোগ পেয়েছেন এবং তা তদন্ত করা হচ্ছে। এসব অভিযোগের তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া দেন নি শেখ হাসিনা। তবে ভোটগ্রহণকালে তিনি বলেছেন, ভোট অবাধ ও সুষ্ঠু হবে।

রাজধানী ঢাকায় ভোট হয়েছে অনেক শান্তিপূর্ণ। এদিন নিরাপত্তা রক্ষীদের দেখা গেছে রাজপথে। তবে রাজধানীর বাইরের ভোটাররা ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ করেছেন। আতিয়ার রহমান নামের একজন ভোটার বলেছেন, নারায়ণগঞ্জে তাকে প্রহার করেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। তিনি বলেন, তাদেরকে বিরক্ত না করতে বলে আমাকে। তারা আরো বলে, আপনার পক্ষ হয়ে আমরা ভোট দিয়ে দেবো।

বিরোধীরা বলছে, ভোটারদের ভোটদান থেকে বিরত রাখতে অশান্ত পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছে এবং সারাদেশে প্রিজাইডিং অফিসাররা ধীর গতিতে ভোট নিয়েছেন।

৮ই নভেম্বর নির্বাচনের ঘোষণা দেয়া হয়। তারপর থেকে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সহিংসতায় রোববার পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২১। পুলিশ বলেছে, বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীরা একটি ভোটকেন্দ্রের বুথে জোর করে প্রবেশ করলে আত্মরক্ষার্থে তাদের দিকে গুলি চালায় তারা। এতে একজন নিহত হয়েছেন। এ ছাড়া ব্যালট বাক্স চুরি করার চেষ্টা করলে পুলিশ আরো একজনকে গুলি করেছে।

অবাধ ও সুষ্ঠু?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিরোধীদের যেভাবে ‘বধ’ করা হয়েছে তাতে শেখ হাসিনার এই বিজয় কলঙ্কিত হয়ে থাকবে। বিরোধীরা দাবি করেছে, নির্বাচনী প্রচারণাকালে তাদের ১৫ হাজারেরও নেতাকর্মীকে আটক করা হয়েছে। ফলে তাদের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণার শক্তিকে ভেঙে দেয়া হয়েছে।

বিরোধী দলীয় ১৭ জন প্রার্থীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বিভিন্ন অভিযোগে। তবে তারা বলছেন, এসব অভিযোগ বানানো। আদালত থেকে অযোগ্য ঘোষণা করা হয়েছে আরো ১৭ জনকে। বিরোধীরা বলে, যেখান থেকে এ রায় দেয়া হয়েছে তা সরকারের নিয়ন্ত্রণে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন বলছে, সরকারের দমনপীড়ন এক ভীতির পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এতে বিরোধী দলের সমর্থকরা ভোট দান থেকে বিরত থাকতে পারেন। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে নির্বাচন সুষ্ঠু করার জন্য আহ্বান জানিয়েছিল জাতিসংঘ।

বাংলাদেশে গত তিন দশক ধরে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে হাসিনা ও খালেদা জিয়ার মধ্যে। এ দু’নেত্রী এক সময় একজোট হয়েছিলেন। পরে তারা শত্রুতে পরিণত হন। ৩০ শে ডিসেম্বরের নির্বাচনে জয়ের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনা টানা তৃতীয়বার এবং মোট চার বার নির্বাচিত হলেন। তিনি

বাংলাদেশের প্রথম প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। ২০১৪ সালে অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না এমন অজুহাতে নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। এর মধ্য দিয়ে তাকে বড় বিজয় উপহার দেয় বিএনপি। তারপর থেকেই মিডিয়া বিরোধী কুখ্যাত ও কঠোরতর একটি আইনের মধ্য দিয়ে মত প্রকাশের স্বাধীনতার গলাটিপে ধরার জন্য তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে অধিকার বিষয়ক গ্রুপগুলো। তারা বলেছে, ভিন্ন মতাবলম্বীদের জোরপূর্বক গুম করা হয়েছে।

নিজেকে কর্তৃত্বপরায়ণ শাসক হিসেবে যে অভিযোগ আছে তা প্রত্যাখ্যান করেছেন শেখ হাসিনা। কিন্তু বিশ্লেষকরা বলেন, তার আশঙ্কা ছিল তরুণ ভোটাররা সমর্থন দেবে বিএনপিকে। এ বছর ঢাকার রাজপথে ছাত্র আন্দোলনে কঠোর হওয়ার কারণে তার সরকারের কড়া সমালোচনা রয়েছে।

Content Protection by DMCA.com
1 2 3 5