রাজাকারের তালিকায় হতভম্ব আওয়ামী লীগ

স্বাধীনতার ৩৯ বছর পর একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত হয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। প্রায় একদশক ধরে সেই ট্রাইব্যুনালে বিচারকাজ চলছে। এ পর্যন্ত ৪০ টি মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। শুরু থেকেই স্বাধীনতাবিরোধীদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষের প্রধান আইনজীবী হিসেবে ট্রাইব্যুনালে আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন গোলাম আরিফ টিপু। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের ৪৮ বছর পর গত ১৫ ডিসেম্বর সরকার স্বাধীনতাবিরোধীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই তালিকায় গোলাম আরিফ টিপুর নাম এসেছে। অ্যাডভোকেট গোলাম আরিফ টিপু শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান কৌঁসুলিই নন, তিনি ছিলেন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের সংগঠক, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক বিষয় হচ্ছে, এমন একটি সময়ে রাজাকারের তালিকায় তার নাম এসেছে যার কয়েক মাস আগে সরকারের সবচেয়ে সম্মানসূচক একুশে পদকে ভূষিত হয়েছেন গোলাম আরিফ টিপু। শুধু তাই নয় আশ্চর্য্যজনকভাবে এই তালিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ফুফাতো ভাই আব্দুল হাই সেরনিয়াবাতের নাম রয়েছে। যিনি ৭৫ এর ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু পরিবারের সঙ্গে ঘাতকের হাতে নিহত শহীদ সেরনিয়াবাতের বাবা। অবাক করা বিষয় হচ্ছে স্বাধীনতাবিরোধীদের এই তালিকায় বঙ্গবন্ধুর স্বজনের নাম যেমন রয়েছে তেমনি তার মন্ত্রিসভার সদস্য, বন্ধু, ঘনিষ্ঠ সহচরের নামও রয়েছে। রাজাকারের এই তালিকায় মুক্তিযুদ্ধের অনেক সংগঠকের নাম যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে শহীদের বাবা এমনকি  স্ত্রীর নামও। এমনকি সারা জীবন যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন তাদের নামও এই তালিকায় এসেছে। এসেছে মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধার নামও। 
রাজাকারের এই তালিকা দেখে বিস্ময়ে হতবাক হয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। সারাদেশে ক্ষোভে ফেটে পড়েছেন তারা। অবেশেষে বিক্ষোভ আর প্রতিবাদের মুখে শেষ পর্যন্ত এই তালিকা স্থগিত করেছে সরকার। তবে এই তালিকা দেখে রীতিমতো হতভম্ব হয়েছেন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা। তালিকায় নাম দেখে বিস্মিত, মর্মাহত ও অপমানিত মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি করেছেন। তারা বলছেন, মন্ত্রণালয় সীমাহীন অযত্নে পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে অত্যন্ত অবহেলার সঙ্গে সবচেয়ে স্পর্শকাতরমূলক এ তালিকাটি প্রচার-প্রকাশ করেছে। 
যদিও  তালিকা প্রকাশের দিন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, এই তালিকায় যাতে নিরাপরাধ কেউ না আসে সে ব্যাপারে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় যথেষ্ট সচেতন রয়েছে। তারা কোনো তালিকা করেননি। একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক যারা নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে থাকা সেই পুরনো নথিটি মন্ত্রণালয় প্রকাশ করেছে মাত্র।
সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেছিলেন, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী দীর্ঘ নয় মাস তাদের স্থানীয় দোসর রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সহায়তায় বর্বরোচিত হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে। এ সময় তারা ৩০ লাখ বাঙালিকে হত্যা এবং দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি করেছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নথি পর্যালোচনা করে সেই সব স্বাধীনতাবিরোধীর মধ্যে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নাম প্রথম তালিকা প্রকাশ করা হল। তিনি বলেন, ‘একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই, আমরা কোনো তালিকা তৈরি করছি না। যারা একাত্তরে রাজাকার, আলবদর, আলশামস বা স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে পাকিস্তান সরকার কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন এবং যেসব পুরনো নথি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সংরক্ষিত ছিল সেটুকু প্রকাশ করছি। এরপরও যেসব দালিলিক প্রমাণ পাওয়া যাবে, তার ভিত্তিতেই নাম প্রকাশ করা হবে। কোনো তালিকা শতভাগ নিশ্চিত না হয়ে প্রকাশ করা হবে না। অন্যায়ভাবে কেউ তালিকাভুক্ত হবে না।’
এ সময় মন্ত্রী বলেন, আইনে একটা কথা আছে, ১০টা অপরাধী যদি বেঁচেও যায় তবুও যেন একজন নিরপরাধ ব্যক্তি শাস্তি না হয়। তাই আমরা চাই না কোনো নিরপরাধ ব্যক্তিকে এ কলঙ্কজনক তালিকায় নিয়ে আসতে। এ বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় সচেতন। আমি জাতিকে আশ্বস্ত করতে চাই অন্যায়ভাবে কেউ এ তালিকায় আসবে না। 
এমনকি এই তালিকা প্রকাশের আগে গণমাধ্যমকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারেও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী বলেছেন, এটি নতুন কোনো তালিকা নয়। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী রাজাকারদের তালিকা আগে থেকেই রয়েছে। রাজাকার হিসেবে যারা যারা ভাতা নিয়েছে, রাজাকার হিসেবে যাদের নামে অস্ত্র এসেছে, স্থানীয় প্রশাসনের কাছেও অনেক নাম রয়েছে, যারা রাজাকার হিসেবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তান বাহিনীকে সাহায্য-সহযোগিতা করেছে- সেসব নাম জোগাড় করেই এই তালিকা আগে থেকেই ছিল। বিবিসিকে দেয়া একটি সাক্ষাৎকারেও তিনি বলেছেন, রাজাকার বাহিনীর সদস্যদের তালিকা সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে ছিল, সেগুলো সংগ্রহ করে এখন তালিকা চূড়ান্ত করা হয়েছে।
নতুন কোন তালিকা হচ্ছে না। বরং রাজাকার বাহিনীর সদস্য হিসেবে যারা ভাতা নিয়েছেন বা যাদের নামে অস্ত্র এসেছে, তাদের নাম পরিচয় এবং ভূমিকাসহ রেকর্ড বা তালিকা সেই ৭১ সালেই জেলাসহ স্থানীয় প্রশাসন এবং পুলিশের গোয়েন্দা সংস্থার কাছে ছিল। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সেই রেকর্ড সংগ্রহ করে রাজাকারদের তালিকাটি করা হয়েছে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেছেন।
তিনি বলেন, “১৯৭১ সালে পাকিস্তান হানাদার বাহিনীর যারা সহযোগী ছিল, রাজাকার হিসেবে যাদের নামে অস্ত্র ইস্যু করেছিল পাকিস্তান বাহিনী। এছাড়া যারা ভাতা পেতো এবং রাজাকার হিসেবে তাদের পরিচয়পত্রও দিয়েছিল পাকিস্তান সরকার। সেই ব্যক্তিদের তালিকা সরকারের কাছে সংরক্ষিত যা আছে, তা আমরা প্রকাশ করবো। নতুনভাবে রাজাকারের কোন তালিকা আমরা প্রকাশ করছি না। ৭১ সালে যে তালিকা ছিল, সেটাই আমরা সংগ্রহ করেছি। তবে কিছু এলাকার তালিকা পাওয়া যায়নি। সেগুলো তারা ধ্বংস করেছিল। যেটুক পাওয়া গেছে, সেটাই আমরা অচিরেই প্রকাশ করতে যাচ্ছি।”
তবে বিতর্ক ওঠার পর রাজাকারের নামের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধার নাম আসার কারণ জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী দেশের শীর্ষ স্থানীয় একটি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, “প্রথমত এই ব্যাপারে আমি কিছুই জানি না। এর কারণ হলো এই তালিকাটি ১৯৭১ সালের করা। আমি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সংগ্রহ করেছি। একাত্তর সালে যা করা হয়েছে এর কোনো দাড়ি-কমাও আমি পরিবর্তন করি নাই।” 
তালিকা রাজাকারদের নয়, দালাল আইনে মামলার
এদিকে বিতর্ক ওঠার পর মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী দাবি করেছেন, তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে যে তালিকা পেয়েছেন, তাই ছেপেছেন, নিজেরা কোনো তালিকা করেননি। অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, ওটা রাজাকারের তালিকা নয়, দালাল আইনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিলো, সেই তালিকা। ১৮ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয় ১০ হাজার ৭৮৯ জনের যে তালিকা প্রকাশ করেছে তা রাজাকার, আলবদর, আলশামসের তালিকা নয়। দালাল আইনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছিল এটি তাদের নামের তালিকা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ১৯৭২ থেকে ১৯৭৩ সাল পর্যন্ত দালাল আইনে যাদের নামে মামলা হয় এটি তাদের নামের তালিকা। তার মতে, অনেকে শত্রুতাবশতও অনেকের বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। সেই নামগুলোও এ তালিকায় আছে। তারা দালাল আইনের আসামি। এর মধ্যে ৯৯৬ জনকে বিভিন্ন অভিযোগ থেকে খালাসও দেওয়া হয়েছে। আমরা খালাসপ্রাপ্তদের নামের তালিকাটিও নোট হিসেবে যুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়কে পাঠিয়েছিলাম। এখন দেখছি অনেক জায়গায় এ নিয়ে নানা ধরনের মন্তব্য, ভুলত্রুটি ধরা পড়ছে। 
দুই মন্ত্রীর পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, দায় কার? 
প্রকাশিত রাজাকারের তালিকা নিয়ে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, তারা মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়কে রাজাকারের কোনো তালিকা দেননি। তাদের কাছে রাজাকারের কোনো তালিকা নেই। ১৯৭২ সালে দালাল আইনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেই তালিকাই মন্ত্রণালয় থেকে চাওয়ার পর ‘পেনড্রাইভে’ করে পাঠানো হয়েছে। গোপন এ তালিকা প্রকাশ করার বিষয়টি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়নি। এমনকি প্রকাশিত এ তালিকার পাতায় পাতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তার কোনো সইও নেই। সংবাদ সম্মেলনে ডাকা হয়নি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো কর্মকর্তাকে। এমন একটি তালিকা প্রকাশ করার পুরো দায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের বলে দাবি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় এ তালিকা প্রকাশের দায় নিলেও তালিকাটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে পেয়েছে বলে দাবি করছে। তারা বলছে, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে রাজাকারের তালিকা চাওয়ার পর তাদের এই তালিকা দেওয়া হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তালিকায় কার নাম যুক্ত করেছে বা বাদ দিয়েছে কি না, তা তাদের জানা নেই।
গত ১৫ ডিসেম্বর ‘একাত্তরের রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও স্বাধীনতাবিরোধী তালিকা প্রকাশ-প্রথম পর্ব’ শিরোনামে ১০ হাজার ৭৮৯ জনের নামের এই তালিকা প্রকাশ করে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। গত ২৮ এপ্রিল মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে মুক্তিযুদ্ধের সময় বেতন-ভাতা নেওয়া রাজাকারদের তালিকা জেলা প্রশাসন ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সংগ্রহের সুপারিশ করা হয়। পরে ২১ মে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দিয়ে তালিকা চাওয়া হয়। প্রথম চিঠিতে শুধু তালিকা সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হলেও গত ২৮ আগস্ট আবারও তালিকা পাঠানোর জন্য তাগিদ দিয়ে জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী সময়কালের রাজাকারদের তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে রয়েছে। মূলত জেলা প্রশাসনেই থাকে এগুলো। তবে ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত মাত্র ১১টি জেলা থেকে প্রতিবেদন আসে। এর মধ্যে চাঁদপুরে ৯ জন, মেহেরপুরে ১৬৯ জন, শরীয়তপুরে ৪৪ জন, বাগেরহাটে ১ জন ও নড়াইল থেকে ৫০ জন রাজাকারের তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। অন্য ছয়টি জেলা থেকে শূন্য প্রতিবেদন আসে। বাকি জেলা প্রশাসকেরা জানান, তাদের জেলার রেকর্ডরুমে রাজাকারদের নামের তালিকা তারা পাননি।
এদিকে মে মাসেই মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আধা সরকারি পত্র দিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে তালিকা চায়। মন্ত্রণালয় জননিরাপত্তা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও আইসিটি) আবু বকর ছিদ্দীককে এ বিষয়টি খোঁজ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। আবু বকর ছিদ্দীক গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমরা খোঁজ করে দালাল আইনের ৯০২টি নথির খোঁজ পাই, যেখানে ১০ হাজার ৭৮৫ জনের নাম উল্লেখ ছিল। সেখানে রয়েছে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের নামও। কোনো কোনো মামলায় ৪২১ জনের নামও রয়েছে। আমরা বিভাগ অনুযায়ী ভাগ করে পুরো তালিকাটি যোগ করে নিয়েছি নিজেদের সংগ্রহে রাখার জন্য। এরই মধ্যে মন্ত্রী মৌখিকভাবে টেলিফোনে তালিকাটি পাঠানোর নির্দেশ দেন। আমরা বলেছি আমাদের কাছে রাজাকারের তালিকা নেই। আছে দালাল আইনে যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেই তালিকা। তালিকায় যাদের নাম রয়েছে তাদের মধ্যে ৯৯৬ জন সাধারণ ক্ষমাও পেয়েছিলেন।
এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান একটি দৈনিককে দেয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ‘এ দায় মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের। আমরা তাদের যে তালিকা দিয়েছি, তা তারা প্রকাশ করবে বলেনি। সংবাদ সম্মেলন করবে, সেটাও জানায়নি। আর আমরা বলিনি, এটা রাজাকারের তালিকা। আমরা প্রথম থেকে দালাল আইনে করা মামলার তালিকার কথাই তাদের বলেছি। তাদের উচিত ছিল যাচাই-বাছাই করে এ ধরনের একটি স্পর্শকাতর তালিকা প্রকাশ করা।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় রাজাকারের লিস্ট করবে। আমাদের কাছে তারা চিঠি পাঠিয়েছিল, আমাদের কাছে যে সমস্ত তথ্য আছে সেগুলো যেন পাঠানো হয়। রাজাকারের লিস্ট তৈরি করা দুরূহ ব্যাপার। আমরা প্রাথমিকভাবে দালাল আইনে যাদের নামে মামলা হয়েছিল, সেই দালাল আইনের লিস্টটা পাঠিয়েছি। সেই লিস্টে আমরা মন্তব্য করে দিয়েছি, অনেকের নামের মামলা উইথড্র করা হয়েছিল। সেটা তালিকায় যথাযথভাবে আসেনি। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের রাজাকারের তালিকা আরও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা উচিত হবে।’
এ ধরনের বিতর্কিত তালিকা কেন প্রকাশ করলেন, জানতে চাইলে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সাংবাদিকদের বলেন, ‘স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পেনড্রাইভে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, সেটাই আমরা প্রকাশ করেছি। এ ক্ষেত্রে আমাদের কী দায় থাকতে পারে। আমরা তো রাজাকারের তালিকাই চেয়েছিলাম।’
ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও টিপুর আবেদন
রাজাকারের তালিকায় রাজশাহী বিভাগের ৮৯ নম্বরে (ক্রমিক নম্বর ৬০৬) রয়েছে গোলাম আরিফ টিপুসহ পাঁচজনের নাম। এই পাঁচজন এবং তাদের পরিবারের সদস্যরাও ছিলেন স্বাধীনতার পক্ষের মানুষ। আবার তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক অ্যাডভোকেট মহসিন আলীর নামও রয়েছে সেই তালিকায়।
তবে ব্যাপক প্রতিবাদ আর সমালোচনার মুখে রাজাকারের এই তালিকা স্থগিতের ঘোষণা আসার আগে ওই তালিকা থেকে নিজের নাম প্রত্যাহার চেয়ে মুক্তযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেছিলেন গোলাম আরিফ টিপু।  
এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে টিপু বলেন, “আমি একজন ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা। আমি  ৫২ এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৫৪ , ‘৬২, ‘৬৬, ‘৬৯, ‘৭০ এবং ঐতিহাসিক মহান মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণকারী। বর্তমান সরকার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় দায়িত্বটি পালনের জন্য যাচাই-বাছাই, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেই আমাকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর নিয়োগ করেছে। অথচ আমার নাম রাজাকারের তালিকায়! আমি সত্যিই হতবাক, মর্মাহত, বিস্মিত ও অপমানিত।” তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সীমাহীন অযতœ, পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করে অত্যন্ত অবহেলার সঙ্গে যে তালিকা প্রচার ও প্রকাশ করেছে, তা প্রমাণিত।
বরিশালে রাজাকারের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধা, শহীদের স্ত্রী 
মুক্তিযুদ্ধের সময় ৯ নম্বর সেক্টরে মেজর আবদুল জলিলের নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে সম্মুখসমরে ছিলেন অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী। তার বাবা সুধীর কুমার চক্রবর্তীকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে হত্যা করেছিল পাকিস্তানি বাহিনী।
কিন্তু এই মুক্তিযোদ্ধা ও তার মাকে ‘একাত্তরের রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস ও স্বাধীনতাবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে রাজাকারের তালিকায়। মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বাধীনতাবিরোধীদের যে তালিকা প্রকাশ করেছে তাতে তপন চক্রবর্তী ও তার মা উষা রানী চক্রবর্তীর নাম রয়েছে। সরকারি গেজেটভুক্ত, নিয়মিত সম্মানী পাওয়া একজন মুক্তিযোদ্ধা ও মুক্তিযুদ্ধে শহীদের স্ত্রীর নাম স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায় দেখে ব্যাপক ক্ষুব্ধ হয়েছেন বরিশালবাসী। বরিশালের মুক্তিযোদ্ধা সংসদের নেতারা এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বলেছেন, এর মধ্য দিয়ে বিজয় দিবসের প্রাক্কালে ‘শুধু মুক্তিযোদ্ধাকে নয়, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অপমান’ করা হয়েছে।
 পেশায় আইনজীবী তপন কুমার চক্রবর্তীর মেয়ে মনীষা বরিশাল সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনে বাসদের হয়ে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রতিপক্ষ বলেই রাজনৈতিক কারণে এই তালিকায় তার বাবা ও দাদীর নাম রাখা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন মনীষা।
তিনি বলেন, “মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয় যাকে মুক্তিযোদ্ধা স্বীকৃতি দিয়েছে, তাকেই আবার রাজাকার আখ্যা দিয়ে তালিকা প্রকাশ করেছে- এটি লজ্জাজনক ও সম্পূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।” 
রাজাকারের তালিকায় বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই!
বঙ্গবন্ধুর স্বজন ও পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট কালরাতে ঘাতকের হাতে নিহত শহীদ সেরনিয়াবাতের বাবা, বঙ্গবন্ধুর ফুফাত ভাই আব্দুল হাই সেরনিয়াবাতের নাম রয়েছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায়। অথচ ১৯৭১ সালে বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় মুক্তিযোদ্ধাদের সংগঠিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন আব্দুল হাই সেরনিয়াবাত। 
রাজাকারের তালিকার বরিশাল অংশে ৫৮ নম্বর সিরিয়ালে নাম রয়েছে আবদুল হাই সেরনিয়াবাতের। আবদুল হাই সেরনিয়াবাত বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি সাবেক কৃষিমন্ত্রী প্রয়াত আবদুর রব সেরনিয়াবাতের একমাত্র বড় ভাই। আবদুর রব সেরনিয়াবাত মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন এবং মুজিবনগরে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার পরিচালনায় ভূমিকা রাখেন।
১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মন্ত্রিসভার সদস্য হিসেবে তিনি ভূমিপ্রশাসন, ভূমি সংস্কার এবং বন্যা নিয়ন্ত্রণ, পানি সম্পদ ও বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করেন। আবদুর রব সেরনিয়াবাত ১৯৭৩ সালে বরিশাল থেকে জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন।
মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ দেয়া, অস্ত্র দেয়া, খাদ্য সরবরাহসহ বহু কাজে প্রত্যক্ষভাবে সহযোগিতা করেন আব্দুল হাই সেরনিয়াবাত। এ ছাড়া মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে দাপ্তরিক বিভিন্ন কাজ সম্পাদনের দায়িত্ব ছিল তার ওপর। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান রাখা এই মানুষটির নাম রাজাকারের তালিকায় প্রকাশিত হওয়ায় বিস্মিত তার সন্তান ও স্বজনরা। তারা এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ ও হতবাক। 
আব্দুল হাই সেরনিয়াবাতের ছেলে ভাতাপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা আমান সেরনিয়াবাত ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, তার নির্দেশে আমরা ৪ ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম। যুদ্ধের সময় বাবা বাড়ি থাকতে পারেননি। মাঝে মধ্যে গোপনে এসে দেখা করে যেতেন।
৪৮ বছর পর আজ সেই ইতিহাস উল্টে গেছে। বাবার নাম রাজাকারের তালিকায় প্রকাশ করা হয়েছে। এ ঘটনার আমরা নিন্দা জানানোর ভাষা হারিয়ে ফেলেছি। বঙ্গবন্ধুর আদর্শের অনুসারী শহীদ সেরনিয়াবাতের ভাতিজা আবুল হাসানাত আবদুল্লাহ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় বৃহত্তর বরিশাল অঞ্চলে মুজিব বাহিনীর প্রধান ছিলেন। বরিশালের যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা প্রয়াত মিহির লাল দত্ত ও তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ জিতেন্দ্র লাল দত্তের নামও এসেছে তালিকায়। রাজাকারের তালিকায় বাবা ও দাদার নাম আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মিহির লাল দত্তের ছেলে শুভব্রত দত্ত। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা একজন ভাষাসৈনিক এবং যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদা ও এক কাকা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। আমার বাবা ও শহীদ দাদার নাম কীভাবে রাজাকারের তালিকায় এসেছে, সেটা আমার বোধগম্য নয়।’
 রাজাকারের তালিকায় বঙ্গবীর কাদেরের সহযোগী মুক্তিযোদ্ধার নাম
মুক্তিযুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই এবং ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর প্রতিবাদকারী হিসেবে আবদুল খালেক খসরুর সাহসের কথা বগুড়ার মুক্তিযোদ্ধাদের মুখে মুখে। বাংলাদেশ সরকারের গেজেটভুক্ত মুক্তিযোদ্ধা তিনি। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় প্রথম ধাপে রাজাকারের যে তালিকা প্রকাশ করেছে, সেখানে তার নাম আছে। এতে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধারা।
পাকিস্তান বিমানবাহিনীর প্যারা কমান্ডো ছিলেন খালেক। ১৯৭১ সালে শত্রুর হাত থেকে দেশকে রক্ষার জন্য চাকরি ছেড়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। দেশকে শত্রুমুক্ত করতে জীবনবাজি রেখে অংশ নেন নানা গেরিলা অপারেশনে। স্বাধীনতার পর শেখ ফজজুল হক মণির নেতৃত্বে গঠিত যুবলীগের বগুড়া শাখার নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যার প্রতিবাদে বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নেন তিনি। ওই বছরের ১২ অক্টোবর তিনি মারা যান। মুক্তিযুদ্ধে সাহসী অবদানের কারণে মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটে তার নাম আছে।
বগুড়ার আদমদীঘি উপজেলার রাজাকারদের নামের তালিকায় সাবেক সাংসদ ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক কছিম উদ্দীন আহম্মেদ, সাবেক এমএনএ মজিবর রহমান, সাবেক আওয়ামী লীগ নেতা মৃত ফরেজ উদ্দীন আহম্মেদ, আওয়ামী লীগ নেতা তাহের উদ্দীন সরদার, আওয়ামী লীগ নেতা মৃত মহসিন আলী মল্লিক, লাইব্রেরিয়ান মৃত হবিবর রহমান, আওয়ামী লীগ নেতা নজিবর রহমান, সান্তাহার কলেজ ছাত্র সংসদের সাবেক সহসভাপতি আবদুস শুকুরের নামও এসেছে রাজাকারের তালিকায়।
বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রীর নামও স্বাধীনতাবিরোধীদের তালিকায়!
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিসভার প্রতিমন্ত্রী শাহজাদা আবদুল মালেক খানের নাম এসেছে। তিনি বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরে গঠিত মন্ত্রিসভার বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী ছিলেন। সেইসাথে ছিলেন বৃহত্তর পটুয়াখালী জেলার বাকশালের গর্ভনর। প্রকাশিত এ তালিকায় ২১ নম্বর পৃষ্ঠায় ১৯৭২ সালের ১৯ জুলাই দায়েরকৃত মামলায় তার নাম আছে ৭৫ নম্বরে। মামলা নম্বর ৪৪। মালেক খানের বাড়ি বরগুনার বেতাগী উপজেলার কাউনিয়া গ্রামে। তার বাবার নাম আলী আবদুল্লাহ খান। রাজাকারের তালিকায় তার নাম আসায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন বরগুনা জেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার আবদুর রশিদ মিয়া। মালেক খান ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পাথরঘাটা বরগুনা আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ৭৩ সালে বঙ্গবন্ধুর মন্ত্রিপরিষদের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন মালেক খান।
তালিকায় আছেন বঙ্গবন্ধুর বন্ধুও
রাজশাহীতে রাজাকারদের তালিকায় এসেছে স্বাধীনতা যুদ্ধের সংগঠকদের নাম। বাদ যায়নি পাকহানাদার বাহিনীর হাতে শহীদ দুই সন্তানের বাবা ও খোদ বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সহচরও। আছে আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপির নামও। কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে পড়ার সময়ই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল রাজশাহীর স্বনামখ্যাত আইনজীবী আবদুস সালামের। বঙ্গবন্ধু ও আবদুস সালাম দু’জনই থাকতেন কলকাতার বেকার হোস্টেলে। তখনই ছাত্র মুজিবুর রহমানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়েছিলেন আবদুস সালাম। এরপর গড়ে উঠে গভীর বন্ধুত্ব। বঙ্গবন্ধু রাজশাহীতে গেলে ঘনিষ্ঠ বন্ধু সালামের বাড়িতেই উঠতেন।
আবদুস সালামের নাতি অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান বাবু জানান, দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধু রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে যতবার রাজশাহীতে এসেছেন, প্রটোকল পরিহার করে উঠতেন বন্ধু আবদুস সালামের সিপাহীপাড়ার বাড়িটিতে। ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে রাজশাহীতে আবদুস সালামের বাড়িতেই প্রথম অপারেশন চালায় পাকহানাদার বাহিনী। অ্যাডভোকেট সালাম তার আগেই সীমান্ত পথে ভারতে চলে যান। তাকে না পেয়ে তার দুই ছেলে কলেজছাত্র ওয়াসিমুজ্জামান ও সেলিমুজ্জামান এবং ভাগ্নিপতি নজমুল হকসহ পরিবারের পাঁচ সদস্যকে হত্যা করা হয়। অ্যাডভোকেট সালাম মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির অন্যতম প্রাণপুরুষ ছিলেন। সারা জীবন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ছিলেন। তিনি মারা গেছেন ২০০৬ সালের ২১ ডিসেম্বর। অথচ কারা কীভাবে রাজাকারের তালিকায় তার নাম জুড়ে দিল তদন্ত করা প্রয়োজন। একই তালিকায় নাম রয়েছে অ্যাডভোকেট মিয়া মোহাম্মদ মহসিনেরও। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদের পানিপিয়া মুক্তিযোদ্ধা প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন তিনি। ছিলেন রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও দুইবার নির্বাচিত সংসদ সদস্য। কিন্তু সরকারি তালিকায় তিনি এখন রাজাকার!
প্রধানমন্ত্রীর হক চাচাও রাজাকারের তালিকায় 
মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের তৎকালীন বরগুনা পাথরঘাটা থানার আহ্বায়ক মজিবুল হকের নামও রয়েছে রাজাকারের তালিকায়। আজীবন মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের রাজনীতিবীদ হিসেবে পরিচিত এই মানুষটি ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সহচর, ছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনারও শ্রদ্ধার পাত্র। ১৯৭১ সালে তৎকালীন বরগুনা মহকুমা মুক্তিযুদ্ধ সংগ্রাম পরিষদের সদস্য ছিলেন তিনি, ছিলেন পাথরঘাটা থানা কমিটির আহ্বায়ক। ১৯৭০ সালে পাথরঘাটা থানা আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতাকালীন সভাপতি নির্বাচিত হন মুজিবুল হক। ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ছিলেন এই দায়িত্বে। ১৯৮৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পাথরঘাটা-বামনা সংসদীয় আসন থেকে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাও করেন তিনি।
এমপি ফজলে করিমের বাবার নাম রাজাকারের তালিকায়
রাজাকারের তালিকায় নাম এসেছে চট্টগ্রামের রাউজানের বর্তমান সরকারদলীয় সংসদ সদস্য এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর পিতা একেএম ফজলুল কবির চৌধুরীর। প্রকাশিত তালিকায় ২০৩, ৫৯৫ ও ৬০৭ নম্বর ক্রমিকে তিন দফায় তার নাম রয়েছে।  ফজলে করিম চৌধুরী রাউজান আসন থেকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে টানা ৪ বার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন। 
সিরাজগঞ্জে মুক্তিযুদ্ধের সংগঠকও রাজাকারের তালিকায়
আওয়ামী লীগের নেতা সাবেক সাংসদ মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক পলাশডাঙ্গা যুব শিবিরের পরিচালক মরহুম মির্জা আবদুল লতিফের নাম ১৫ ডিসেম্বর প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় রয়েছে। এ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। মির্জা আবদুল লতিফ সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ার বংকিরহাট এলাকায় জন্ম গ্রহণ করেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলেও তিনি সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ থেকে সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করা অবস্থায় ২০০৭ সালে ৫ নভেম্বর মারা যান। 
তালিকায় আওয়ামী লীগ বেশি: বিএনপি
বিএনপি’র সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, “প্রকাশিত রাজাকারের তালিকায় আওয়ামী লীগের চিহ্নিত নেতাকর্মীরাই সংখ্যায় বেশি। অন্যকে ফাঁসাতে গিয়ে এবার আওয়ামী লীগ নিজেরাই ফেঁসে গেছে।” তিনি বলেন, “এতে জনগণ অবাক হয়নি। কারণ মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আওয়ামী লীগের নেতারা মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন কি না এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।” রিজভী বলেন, “আওয়ামী লীগের থলের বেড়াল বের হতে শুরু হওয়ায় তা প্রত্যাহারের প্রশ্ন উঠেছে।”
প্রধানমন্ত্রী বললেন ‘পুরো বিষয়টি রহস্যজনক’
চারদিন ধরে তীব্র সমালোচনা ও বিক্ষোভের পর অবশেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ধমক’ খেয়ে ভুলে ভরা রাজাকাদের তালিকা আগামী ২৬ মার্চ পর্যন্ত স্থগিত করেছে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়। যাচাইবাছাই শেষে আগামী ২৬ মার্চ কিংবা আরো পরে রাজকারদের নতুন তালিকা প্রকাশ করা হবে। 
তালিকা স্থগিত ও ওয়েবসাইট থেকে সরিয়ে ফেলার পর  ১৮ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় গণভবনে আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, কীভাবে রাজাকারদের তালিকায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাম চলে এলো তা রহস্যজনক। তালিকা প্রকাশ করতে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয় গোলমাল করে ফেলেছে। এই তালিকাটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয়েছে। এটি খুব খারাপ কাজ হয়েছে। শেখ হাসিনা বলেন, এটি খুব কষ্টের বিষয়। যার পরিবারের সদস্যরা শহীদ হয়েছেন, যুদ্ধ করেছেন- তাদের যদি ‘রাজাকার’ শব্দটি শুনতে হয়, তাহলে খারাপ লাগারই কথা। আমি বলব যারা দুঃখ পেয়েছেন তারা শান্ত হোন। যারা মুক্তিযোদ্ধা তারা কোনোদিনও রাজাকারের তালিকায় থাকতে পারেন না। এটি হতে পারে না। আওয়ামী লীগ সভাপতি আরো বলেন, আমি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রীকে বলেছিলাম, তালিকাগুলো নিয়ে ভালোভাবে যাচাইবাছাই করতে হবে। এত তাড়াতাড়ি এটি প্রকাশ করার কথা নয়। তাও বিজয় দিবসের আগে। এত সুন্দর বিজয় দিবস উদযাপন করলাম, কিন্তু শহীদ পরিবার, মুক্তিযোদ্ধা পরিবার এতে কষ্ট পেয়েছেন। তালিকাটি সময় নিয়ে প্রকাশ করা দরকার ছিল। আসলে আমিও ব্যস্ত হয়ে পড়েছিলাম সবদিক সময়মতো খেয়াল রাখতে পারিনি।
তবে বিশ্লেষকরা মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রীকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তারা বলছেন, মন্ত্রিত্ব তো কোনো শিক্ষানবিস পদ নয়। ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণ করলে বিষয়টি কী দাঁড়ালো? এতো গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজ করা হয়েছে অত্যন্ত অযত্ন-অবহেলায়। দুটি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সামান্যতম কোনো সমন্বয় নেই। মাঠ পর্যায়ে কোনো অনুসন্ধান নেই। নেই কোনো গবেষণা। কোনো তথ্য সংগ্রহই করা হয়নি। যাচাই-বাছাই তো দূরের বিষয়। বলা হচ্ছে, স্থগিত করা রাজাকারের তালিকা ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসে প্রকাশ করা হতে পারে। এই তালিকা থেকে পরিচিত কিছু নাম বাদ দিলেই সুষ্ঠু রাজাকারের তালিকা হয়ে যাবে? বিষয়টি এতো সহজ!
বহু রাজাকার ঢুকে গেছে মুক্তিযোদ্ধার তালিকায়। রাজাকারের তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের। এর কারণ কী? অভাব কীসের? সক্ষমতা না আন্তরিকতার? কোনো সন্দেহ নেই মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকারের সঠিক-শুদ্ধ তালিকা করা সহজ বিষয় নয়। কিন্তু, তা এতোটা কঠিন নয় যে এমন তালগোল পাকিয়ে ফেলতে হবে। মুক্তিযোদ্ধা বা রাজাকারের তালিকা করার আগে রাজনৈতিক বিবেচনা সম্পূর্ণ পরিহার করে ‘নির্মোহ’ শব্দটি আত্মস্থ করতে হবে।
( সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজের সৌজন্যে প্রকাশিত)
 

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.