আসছে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল!

সংগৃহীত

ঢাকা মহানগরীতে রাষ্ট্রীয় খুন গুম ও অত্যাচারের নির্দেশদাতা ও কালাকার ডিএমপির অবসরপ্রাপ্ত কমিশনার আছাদুজ্জামানকে নবগঠিতব্য ‘জাতীয় নিরাপত্তা সেল’ প্রধান নির্বাহী নিয়োগ করা হয়েছে ৩ বছরের জন্য চুক্তিতে! প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কোনো একটা কক্ষে আসাদকে বসার জন্য অফিস তৈরী করা হচ্ছে বলে সূত্রমতে জানা যায়। তবে তার যোগ দেয়ার সম্ভাবনা আছে আরও দিন দশেক পরে।

এর মধ্য দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তা সমুহ দেখভাল করার জন্য একটি নতুন সংস্থা গঠিত হল। কিন্তু কারা থাকবেন এতে? সরকারী সূত্র জানাচ্ছে- মন্ত্রিসভার সিনিয়র সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা, পুলিশ-র‌্যাবের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে এর ফোরাম পরিচালিত হবে। নিরাপত্তাবিষয়ক যেকোনো সিদ্ধান্ত স্বল্পতম সময়ের মধ্যে নেয়াসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ নানা বিষয়ে কাজ করার পাশাপাশি দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বহির্বিশ্বের সম্ভাব্য হুমকি মোকাবেলাসহ জঙ্গিবাদের মতো বিষয় নিয়েও কাজ করবে এটি।

ইতোমধ্যে জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠন সংক্রান্ত কিছু খবর ছড়ানো হয়েছে। দেখা গেছে, অতীতে প্রায় সকল সরকারের সময়েই জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল গঠনের চেষ্টা হয়: ১৯৮১ সালে, ১৯৮৫ সালে, ১৯৯৬ সালে, ২০০৭-৮ সালে, ২০১২ সালে নিরাপত্তা কাউন্সিল নিয়ে কথা ও কাজ হয়েছিল। তবে ১৯৮১ সালে বিচারপতি সাত্তারের সরকারের সময় সেনাপ্রধান জেনারেল এরশাদ পত্রিকায় স্টেটমেন্ট দিয়ে নিরাপত্তা কাউন্সিলের জন্য চাপ দিয়ে ৮২ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা গঠন করতে সক্ষম হন। রাষ্ট্রপতির নেতৃত্বে ঐ কাউন্সিলে কয়েকজন মন্ত্রী, তিনবাহিনী প্রধান, বেসামারিক বাহিনীগুলোর প্রধান ও গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এর সপ্তাহখানেক পরে ১১ই ফেব্রুয়ারি ১৯৮২ কয়েকজন জেনারেলকে বঙ্গভবনে পাঠান সেনাপতি এরশাদ, যারা রাষ্ট্রপতি সাত্তারকে পদত্যাগ করে সেনাবাহিনীর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে চাপ দেন। কিন্তু রাষ্ট্রপতি সে চাপ মোকাবেলা করেন কেবিনেট ভেঙে দিয়ে। কিন্তু ‍তাতেও বিপদ কাটেনি, ৪০ দিন পরে ২৪ মার্চ ১৯৮২ অস্ত্রের মুখে রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে সরিয়ে ক্ষমতা দখল করে এরশাদ।

নিরাপত্তা কাউন্সলের এই ইতিহাসটা বোধ হয় বর্তমান বিনাভোটের অবৈধ মিডনাইট সরকারের মনে আছে। তাই জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিল না করে বানাচ্ছে ‘সেল’। সেলের সিইও (প্রধান নির্বাহী) করা হয়েছে আসাদুজ্জামানকে। তার আন্ডারের কমিটি, তাতে আবার মন্ত্রিরা থাকবে সদস্য, গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানরাও থাকবে – আসলে পুরটাই জগাখিচুড়ী।

প্রস্তাবিত এই কমিটি ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে পুলিশ র‌্যাব আনসার ডিজিএফআই, এসবি, এনএসআই প্রধানদের নিয়ে একটি ইনফরমাল ফোরাম আছে, বিশেষ প্রয়োজনে যেমন হরতাল অবরোধ বা বড় কোনো নিরাপত্তা সংক্রান্ত পরিস্থিতিতে যেখানে সভা বসে আলাপ আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তাহলে ’আসাদুজ্জামান সেলের কাজটা কি? শেষ পর্যন্ত দেখা যাবে, আসাদু পিএম অফিসের একটা লিয়াঁজো অফিসারে পরিণত হয়েছে, যার কাজ হবে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ, বিরোধী দল দমন, এবং গুম খুনের সেন্ট্রাল বডি। আর সে চালাবে ডিএমপি কমিশনার স্টাইলে। অর্থাৎ পুলিশী রাষ্ট্রের আরেকটা কোতায়াল।

বাংলাদেশে ছাড়াও প্রতিবেশী দেশ এমনকি উন্নত দেশগুলিতে নিরাপত্তা কাউন্সিল আছে, সেই হাইপাওয়ার কমিটি জাতীয় পর্যায়ে অনেক বড় বড় ডিসিশন নিয়ে থাকে। যেমন ভারতে
ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলে (এনএসসি) দেশের প্রেসিডেন্টের সভাপতিত্বে প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, প্রতিরক্ষাবিষয়ক সংসদীয় কমিটির প্রধান, তিন বাহিনীর প্রধান, সীমান্ত ও উপকূলরক্ষী বাহিনীগুলোর প্রধান, পুলিশপ্রধান ও জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর প্রধানরা থকেন, সঙ্কটকালে সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান, সাবেক বাহিনীপ্রধানদেরও প্রয়োজনে এতে সম্পৃক্ত করা হয়ে থাকে। এর সাথে যুক্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা পরিষদ, যেখানে সারা দেশের প্রতিষ্ঠিত, নিরাপত্তাবিষয়ক গবেষকেরা সম্পৃক্ত থাকে। ১৫ দিন পরপর একবার এই কাউন্সিলের সভা অনুষ্ঠিত হয়।

তাহলে বাংলাদেশে এটা কি বানালো? সেনাবাহিনী ক্ষমতা নিয়ে যাবে এই ভয়ে তিন বাহিনীকে অন্তর্ভুক্ত করলো না। অথচ জাতীয় নিরাপত্তা তিন বাহিনী ছাড়া অসম্ভব। নাকি আসাদুজ্জামানের কমান্ড মিলিটারী বাহিনীগুলো শুনবে? মিলিটারীকে ডরমেন্ট রেখে পুলিশ-র‌্যাবকে দিয়ে জাতীয় নিরাপত্তার নামে যা করছে, তা একটি হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হবে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে হেয় প্রতিপন্ন করাই এর মূল উদ্দেশ্য।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.