মুঘল বাদশাহ আওরঙ্গজেব এবং প্রাসাদ ষড়যন্ত্র

ঢাকায় তো প্রাসাদ ষড়যন্ত্র চলছে, আসুন একটু মুঘল ইতিহাসের মহাপ্রাসাদ ষড়যন্ত্র পড়া যাক।
মনে পড়ে যায়, দিল্লির ষষ্ঠ বাদশাহ মহানুভব সম্রাট আলমগীরের (আওরঙ্গজেব) কথা, তিনি ক্ষমতার জন্য এবং টিকে থাকতে যে পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলেন, তাতে অনেক শিক্ষা আছে।
তাজমহল খ্যাত সম্রাট শাহজাহানের চার পুত্র ছিল: দারা শিকো, শাহ সুজা, আওরঙ্গজেব, এবং মুরাদ বাকশ। তাদেরকে চারটি এলাকার সুবাদার বানিয়েছিলেন শাহ জাহান। সম্রাট সর্বদা তার জ্যেষ্ঠ্য পুত্র দারাশিকোকে অধিক প্রাধান্য দিতেন। অপর তিন ভ্রাতা এতে ক্ষুব্ধ ছিলেন এবং নিজেদের মধ্যে দারার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছিলেন। মুঘল সাম্রাজ্যে এমন কোন নিয়ম ছিল না যে, সম্রাটের মৃত্যু বা অসুস্থ হলে তার জ্যেষ্ঠ পুত্র সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবেন। সাধারণত সিংহাসনের দাবিদারদের মধ্যে যুদ্ধ এবং কৌশলে সিংহাসনচ্যূত করে ক্ষমতা দখল ইত্যাদি ঘটনার মধ্য দিয়ে মুঘল সাম্রাজ্যের ক্ষমতার পালা বদল ঘটত। মূলত সামরিক শক্তির বলেই বিষয়টি নিষ্পত্তি হত।

শাহজাহানের চার পুত্রই শাসক হিসাবে যোগ্য ছিলেন। কিন্তু মূল ক্ষমতার দ্বন্দ্ব শুধুমাত্র বড়পুত্র দারাশিকো এবং তৃতীয়পুত্র আওরঙ্গজেবের মধ্যে সীমিত ছিল। দারাশিকোর চেয়ে যুদ্ধকৌশল এবং বুদ্ধিমত্তায় আওরঙ্গজেবের এগিয়ে ছিলেন। তাছাড়া ক্ষমতার পেছনের অনেক রাজকর্মচারী এবং অন্যান্য প্রভাবশালীরা এই দুইজনের পেছনে বিভক্ত হয়ে ছিল। আদর্শগত দিক দিয়েও তাদের মধ্যে যথেষ্ট মতপার্থক্য ছিল। দারাশিকো ছিলেন সম্রাট আকবরের মত ধর্মনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাসী, অন্যদিকে অপরদিকে আওরঙ্গজেব ছিলেন কোরআনে হাফিজ ও কট্টর সুন্নি মুসলিম।

১৬৫৭ খ্রিষ্টাব্দের সেপ্টেম্বরে সম্রাট শাহজাহান অসুস্থ হয়ে পড়েন। এসময় তার কাছে ছিলেন এলাহাবাদ ও লাহোরের সুবাহদার জ্যেষ্ঠপুত্র দারা শিকোহ। শাহজাহান দারাশিকোকে পরবর্তি সম্রাট হিসাবে ঘোষণা করলে ভাইদের সাথে কলহ শুরু হয়। শাহ সুজা ছিলেন বাংলার সুবাহদার, আওরঙ্গজেব ছিলেন দাক্ষিণাত্যের সুবাহদার এবং গুজরাটের সুবাহদার মুরাদ নিজ নিজ প্রদেশের স্বাধীন শাসক হিসাবে ঘোষণা করে মুঘল সাম্রাজ্যের রাজধানী আগ্রা দখলের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হন। ফলে কেন্দ্রের সাথে যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে ওঠে। ১৬৫৮ সালের ফেব্রুয়ারি মাস থেকে জুন মাস অবধি চার রাজপুত্রের মধ্যে অনেকগুলো যুদ্ধ সংঘটিত হয়।

শাহজাদা সুজা তার বাহিনী নিয়ে রাজধানী আগ্রার উদ্দেশে যাত্রা করেন, তবে বানারসের নিকট দারাশিকোর বাহিনীর সাথে যুদ্ধে পরাজিত হয়ে বাংলায় ফেরত আসেন সুজা। অন্যদিকে দাক্ষিণাত্য থেকে আওরঙ্গজেব এবং গুজরাট থেকে শাহজাদা মুরাদও একই ভাবে সসৈন্যে আগ্রা অভিমুখে যাত্রা করেন। আওরঙ্গজেব মুরাদের সঙ্গে জোট করেন এই চুক্তিতে যে, যুদ্ধে জিতলে তারা সমগ্র সাম্রাজ্য নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিবে। আওরঙ্গজেব এবং মুরাদের সম্মিলিত বাহিনী রাজধানী আগ্রার দিকে অগ্রসর হয়। মে মাসে সামুগর যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের কাছে দারাশিকো পরাজিত হন। সপরিবারে পারস্যে পালিয়ে যাওয়ার সময় বন্দী হন দারা।
আওরঙ্গজেব মুরাদের সঙ্গে করা চুক্তি বাতিল করে কৌশলে মুরাদকে গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দী করেন। ফ্রান্সের বাস্তিলের সমতূল্য এই গোয়ালিয়র দুর্গটি মোঘল পরিবারের রাজদ্রোহীদের বন্দী করে রাখতে ব্যবহার করা হতো। এক গুজরাটি উজিরকে বিষ প্রয়োগে হত্যার দায়ে শাহজাদা মুরাদকে প্রাণদণ্ড দেয়া হয়, এবং ৪ ডিসেম্বর ১৬৬১ তা কার্যকর করা হয়।
আরও পরে আওরঙ্গজেব ক্ষমতাসীন হলে সুজাকে বাংলা বিহার উড়িষ্যার সুবাহদার পদ দেয়ার প্রস্তাব করেছিলেন, কিন্তু সুজা তা প্রত্যাখ্যান করে নিজেকে বাংলার স্বাধীন নবাব হিসাবে ঘোষণা করে ধীরে ধীরে তার এলাকা বৃদ্ধি করতে শুরু করেন, ফলে আওরঙ্গজেব সুজার বিরুদ্ধে মীর জুমলার নেতৃত্বে সেনা অভিযান প্রেরণ করেন। খাজহুয়ার যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের বাহিনীর কাছে শাহ সুজা পরাজিত হয়ে বার্মার আরাকান অঞ্চলে পালিয়ে যান, এবং সেখানে স্থানীয় শাসকদের হাতে নিহত হন।

শাহজাদা আওরঙ্গজেব আগে থেকেই অসুস্থ সম্রাট শাহজাহানকে আগ্রার দূর্গে গৃহবন্দী করে রাখেন, কিন্তু তিনি কখনোই পিতার প্রতি দুর্ব্যবহার করেননি। কারাগারে কয়েকটি ছিদ্র দিয়ে তাকে তাজমহল দেখার সুযোগ দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে, শাহজাহানের সবচাইতে প্রিয় কন্যা জাহানারা আওরঙ্গজেবের দেয়া বেগম-এর মর্যাদা প্রত্যাখ্যান করেন, এবং বৃদ্ধ পিতার সাথে স্বেচ্ছায় সহ-বন্দীত্ব বরণ করেন। ১৬৬৬ সালে আগ্রা ফোর্টে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত শাহজাহান কন্যা জাহানারার তত্ত্বাবধানেই ছিলেন।

এর আগে মে মাসের সামুগর যুদ্ধে আওরঙ্গজেবের কাছে পরাজিত হয়ে শাহজাদা দারাশিকো বন্দী ছিলেন। ধর্ম ত্যাগের অভিযোগে দারাশিকোকে প্রাণদণ্ড দেয়া হয়। ১৬৫৯ সালের ৩০ আগস্ট দারার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। শাহজাহানের প্রিয়পাত্র ছিল জ্যেষ্ঠপুত্র দারাশিকো। দারার কর্তিত মস্তক সুন্দর করে পরতে পরতে মোড়ানো অবস্থায় পিতা শাহজাহানের নিকট পাঠানো হয়েছিল, যা দেখে বৃদ্ধ শাহজাহান মূর্ছিত হয়ে পড়েন কন্যা জাহানারার স্কন্ধে। তিন ভাইকে পদানত করার পরে শাহজাদা আওরঙ্গজেব ‘সম্রাট আলমগীর’ নাম ধারণ করে নিজেকে দিল্লীর সম্রাট ঘোষণা করেন। আরোহন করেন পিতার বানানো ময়ুর সিংহাসনে। ১৬৫৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ৪৯ বছর মুঘল সাম্রাজ্যের শাসক ছিলেন আওরঙ্গজেব। তিনি প্রায় সম্পূর্ণ ভারতীয় উপমহাদেশ শাসন করেন। আওরঙ্গজেব কোরআনে হাফিজ ছিলেন এবং সম্রাট হওয়ার সত্ত্বেও তিনি সাধারণ জীবন যাপন কাটাতেন। অন্যান্য শাসকদের ন্যায় তিনি রাজকোষকে নিজের সম্পদ মনে না করে প্রজাদের সম্পদ মনে করতেন। তিনি নিজ হাতে টুপি সেলাই করে এবং স্বহস্তে কুরআন শরীফ লিখে সংসার নির্বাহ করতেন। রাজ্যের সম্পদ স্পর্শও করতেন না। অন্যান্য বাদশাহদের মত মদ ও নারীতে মত্ত হননি। মুঘল সম্রাটদের মধ্যে তিনি সবেচেয়ে ন্যায়পরায়ন বাদশাহ হিসাবে পরিচিত ছিলেন আওরঙ্গজেব। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধের মাধ্যমে সাম্রাজ্যের সীমানা বহুদূর বিস্তার করেন; বিশেষ করে গোলকুন্ডা বিজয়ের পর মুঘল সাম্রাজ্যের আয়তন ৪ মিলিয়ন বর্গকিলোমিটারে উন্নীত হয়। বাদশাহ আলমগীর ১৫৮ মিলিয়ন প্রজাকে শাসন করতেন। তার সময় মুঘল সাম্রাজ্যের বাৎসরিক করের পরিমাণ ছিল ৪৫০ মিলিয়ন ডলার, যা তার সমসাময়িক ফ্রান্সের চতুর্দশ লুইয়ের বাৎসরিক করের চেয়ে ১০ গুণ বেশি ছিল। আলমগীরের শাসনামলে চীনকে ছাড়িয়ে পৃথিবীর সর্ববৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে গড়ে উঠেছিল ভারতবর্ষ, যার পরিমাণ ছিল ৯০ বিলিয়ন ডলার, যা সপ্তদশ শতকের সমগ্র পৃথিবীর জিডিপি-এর এক চতুর্থাংশ। শরিয়াহ আইন ফতোয়ায়ে আলমগীরী এবং ইসলামি অর্থনীতির জন্য বিখ্যাত হয়ে আছেন বাদশাহ আলগমগীর।
ক্ষমতার জন্য নিজ ভাইদের হত্যা করা এবং পিতাকে কারারুদ্ধ করার জন্য সম্রাট আওরঙ্গজেবের বিস্তর সমালোচনা থাকলেও মুঘল বাদশাহী দখলের লড়াইতে ঐরূপ নির্দয়তা ছাড়া উপায় ছিলনা বলে অনেক নিরপেক্ষ বিশ্লেষকদের মতামত। অন্যথা করলে আওরঙ্গজেবকেই মৃত্যুবরণ করতে হতো।

দক্ষিণাত্যে মারাঠাদের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় ১৭০৭ সালে যুদ্ধক্ষেত্রের সামরিক তাঁবুতে ৮৯ বছর বয়সে বাদশাহ আলমগীরের মৃত্যু হয়। মৃত্যুর আগে কোরআন কপি করা আয় থেকে আওরঙ্গজেবের সর্বশেষ উপার্যন ছিল ৮০৫ টাকা, যা থেকে ৪ টাকা আট আনা নিজের দাফন কাফনের জন্য রেখে বাকী অর্থ প্রজাদের মধ্যে দান করার উইল করে গিয়েছিলেন। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে খুলদাবাদে খুব সাদামাটা ভাবে সম্রাটকে সমাহিত করা হয়।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.