‘নির্বাচনের বাইরে রাখতে খালেদা জিয়ার সাজা-মামলা’ : যুক্তরাষ্ট্র

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়: যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন গ্রহণযোগ্য নয়: যুক্তরাষ্ট্রের মানবাধিকার রিপোর্ট

স্টেট ডিপার্টমেন্ট করসপন্ডেন্ট

৩০ ডিসেম্বরের ভোট কারচুপি আর একতরফা সংসদীয় নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসেছে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকার। নির্বাচনটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ ছিলােনা। নানান অনিয়ম, আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা, বিরোধী দলের এজেন্ট এবং ভোটারদের ভয়-ভীতির মতো ঘটনা ঘটেছে তাতে। হামলা- মামলার শিকার হয়েছেন বিরোধীদলের প্রার্থী ও সমর্থকরা।

বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত ২০১৮ সালের রিপোর্টে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে এমন মন্তব্য করা হয়েছে।

মানবাধিকার রিপোর্টে নির্বাচন ছাড়াও উঠে এসেছে বাংলাদেশের প্রধান বিরোধী দলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলকভাবে কারাবন্দি করে রাখা, গুম-খুন ও বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ড, বেআইনী গ্রেফতার, বিরোধী দলের উপর নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বাধা প্রদানসহ বিভিন্ন ইস্যু।

বার্ষিক রিপোর্টে সারসংক্ষেপের শুরুতেই বাংলাদেশর সদ্য অনুষ্ঠিত জাতীয় নির্বাচনের কারচুপির বিষয়টি নিয়ে কড়া সমালোচনা করে বলা হয়, “বাংলাদেশে সরকার ব্যবস্থা সংসদীয় পদ্ধতির হলেও ক্ষমতার সিংহভাগও প্রধানমন্ত্রীর নিয়ন্ত্রণে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত ডিসেম্বরের প্রশ্নবিদ্ধ এবং একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে টানা তৃতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করেছে। নির্বাচনটি অবাধ এবং নিরপেক্ষ ছিলােনা। নানান অনিয়ম, আগে থেকেই ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখা, বিরোধী দলের এজেন্ট এবং ভোটারদের ভয়-ভীতির মতো ঘটনা ঘটেছে তাতে।”

এতে বলা হয়, “প্রচারণার শুরু থেকে নির্বাচন পর্যন্ত নানান রকম হয়রানি, ভয়-ভীতি প্রদর্শন, বেআইনী গ্রেফতার এবং সহিংসতার বিশ্বাসযোগ্য তথ্য পাওয়া গেছে।আর এ পরিস্থিতিতে স্বাধীনভাবে সভা-সমাবেশ এবং প্রচারণা চালাতে পারেননি বিরোধী দলের প্রার্থী এবং তাদের কর্মী-সমর্থকরা। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা নির্বাচন পর্যবেক্ষণে আসতে বাঁধা প্রাপ্ত হয়েছেন। নির্ধারিত সময়ে পরিচয়পত্র ও ভিসা পাননি আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা।”

রিপোর্টে বলা হয়, “আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে কার্যত পুরোপুরি নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে সরকার।”

এতে বলা হয়, “আইনশৃঙ্খলাবাহিনীগুলোর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহারের বিস্তর তথ্য রয়েছে কিন্তু সরকার খুব কমই এসব ঘটনার বিষয়ে তদন্ত বা ন্যায়বিচার করে থাকে। তাদের দ্বারা হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটলেও এমনটিই দেখা যায়।”

জাতিসংঘে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশনে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠেছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “২১০৭ সালে বাংলাদেশের শান্তিরক্ষা মিশনের মাধ্যমে তিনটি যৌন হয়রানি এবং অপব্যবহারের অভিযোগ এনেছে জাতিসংঘ। অভিযোগের এ বিষয়টিতে তদন্ত চলমান আছে।”

মিথ্যা অভিযোগে বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীদের সরকার আটক করছে উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অপরাধে বাংলাদেশে বিরোধীদলের নেতা-কর্মীদের গ্রেফতার এবং বিচারের মতো ঘটনা ঘটছে। জাতীয় নিরাপত্তার ধোঁয়া তোলে তাদরকে মিথ্যা অভিযোগে আটক এবং বিচারের মুখোমুখি করা হয়।বছর জুড়ে প্রধান বিরোধীদল বিএনপির হাজার-হাজার নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়েছে।”

বিএনপি চেয়ারপারসন এবং বিরোধীদলীয় নেতা বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে চলমান মামলা এবং সাজাকে রাজনৈতিক চক্রান্ত উল্লেখ করে রিপোর্টে বলা হয়, “২০০৮ সালের কেয়ারটেকার সরকারের আমলে করা এক মামলায় ৮ ফেব্রুয়ারি সাবেক প্রধানমন্ত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির কারণ দেখিয়ে ৫ বছরের সাজা দিয়েছে আদালত। তাঁর এই সাজায় তথ্য-প্রমাণের ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করেন দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞরা। নির্বাচনী প্রক্রিয়া থেকে প্রধান বিরোধী দলীয় নেতাকে দূরে রাখতে এটাকে রাজনৈতিক নীল-নকশা বলে মনে করেন তারা।”

এতে বলা হয়, “তাঁকে (খালেদা জিয়াকে) জামিন দেয়ার ক্ষেত্রেও গড়িমসি করছে আদালত। এসমস্ত মামলায় যেকেউই দ্রুত জামিন পেয়ে থাকেন কিন্তু খালেদা জিয়ার ক্ষেত্রে তা একমাসের মতো সময় পিছিয়ে দেয়া হয়। মার্চের ১২ তারিখ যখনি হাইকোর্ট এ মামলায় জামিন দিলো তার পরপরই সুপ্রিম কোর্ট ২ মাসের জন্য স্থগিত করে দিলো। অভিযুক্ত হবার ঘটনায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় সরকার খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা বহাল রেখেছে।”

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যমতে খালেদা জিয়ার রায় দেয়ার সময়টাতে আট দিনের ব্যবধানে বিএনপির ১,৭৮৬ জনকে গ্রেফতার করা হয়।

বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির চরম অবনতির চিত্র তোলে ধরে রিপোর্ট বলা হয়, “সংবিধানে জীবনের নিরাপত্তা এবং ব্যক্তি স্বাধীনতার কথা উল্লেখ করা আছে। কিন্তু সরকার এবং তার এজেন্ট মানুষ বিচার বর্হিভূত হত্যাকান্ডের শিকার হচ্ছে তার অসংখ্য নজির রয়েছে।”

এতে বলা হয়, “বছর জুড়েই সন্ত্রাস দমনের নামে অভিযান চালিয়েছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনী। তাদের এই অভিযান, আটক সময় কিছু কিছু ক্ষেত্রে রহস্যজনক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।আইনশৃঙ্খলাবাহিনী এসব মৃত্যুকে দুই পক্ষের মধ্যে ক্রসফায়ারের ঘটনা বলে চালিয়ে দিয়েছে। সরকারও র‍্যাব, পুলিশ কিংবা অন্য বাহিনীর সঙ্গে সংগঠিত এসব ঘটনাকে বন্দুকযুদ্ধ, ক্রসফায়ার কিংবা পাল্টা হামলা বলে বৈধতা দেয়ার চেষ্টা করেছে।”

রিপোর্টে বলা হয়,“মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বরে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর হাতে ৪০০ এর বেশি লোক বন্ধুক যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে। অধিকারের তথ্যমতে জানুয়ারি থেকে অক্টোবের বন্দুক যুদ্ধে প্রাণ হারিয়েছে ৪১৫ জন।”

সরকারের মাদক বিরোধী অভিযানের সমালোচনা করে প্রতিবেদনে বলা হয়, “সরকারের মাদকবিরোধী অভিযানের সময়টাতে বিচারবর্হিভূত হত্যাকান্ডের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে। যা ছিলো গত বছরের তুলানয়ও বেশী।স্থানীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী মাদক বিরোধী অভিযানে ২৩০ জন নিহত হয় আর মে-জুন মাসে আটক করা হয় ১৭,০০০ জনকে। সরকারের এই কথিত মাদক বিরোধী অভিযানের সমালোচনায় সোচ্চার হয় মানবাধিকার সংগঠগুলো এবং সুশীল সমাজ। তারা উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন-অভিযানে বিচারবির্হভূত হত্যাকান্ড এবং গ্রেফতার হচ্ছে এবং নিরীহ মানুষ তার শিকার হচ্ছে। নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য সরকারের কৌশল বলেও এর সমালোচনা করেন।”

অধিকারের তথ্যমতে গত বছরের প্রথম ১০ মাসে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর কাস্টডিতে মারা গেছেন ৫৭ জন বন্দি।

গুমের ভয়াবহ চিত্র তোলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, “মানবাধিকার সংস্থাগুলো এবং গণমাধ্যমের তথ্যমতে গুম এবং অপহরণ এখনো অব্যাহত আছে। আর এর অধিকাংশই ঘটছে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্যদের দ্বারা। এসব বিষয়ে সরকারকে খুব কমই প্রতিরোধ কিংবা তদন্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে দেখা যায়।”

রিপোর্টে আরো বলা হয়, “বাংলাদেশ যুদ্ধাপরাধ ট্রাইবুনালে বিচারের মুখোমুখি হওয়া বিরোধীদলের ৩ নেতার সন্তানদের ২০১৬ সালে আটক করে সরকার। তাদের বিরুদ্ধে ছিলোনা কোনো অানুষ্ঠানিক অভিযোগ এবং আটকও হয়েছে তাও বলা হয়নি। আটকের সাত মাস পর হুম্মাম কাদের চৌধুরীকে মুক্তি দিলেও এখনো সন্ধান নেই মির আহমদ বিন কাশেম এবং আমান আজমীর। জোরপূর্বক গুম নিয়ে কাজ করা সংক্রান্ত জাতিসংঘের একটি ওয়ার্কিং কমিটি এ বিষয়ে সরকারকে অনুরোধ করলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।”

খ্যাতনামা আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার এবং নির্যাতনের কথা তোলে ধরে রিপোর্টে বলা হয়, “নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের সময় উসকানি মূলক বক্তব্য রাখার অভিযোগে ৫ আগস্ট আলোকচিত্রী শহীদুল আলমকে গ্রেফতার করা হয়। ৬ আগস্ট যখন তাকে আদালতে হাজির করা হয় তখন তিনি একা হাঁটতে অক্ষম ছিলেন এবং শরীরে আঘাতের চিহ্ন দেখা গেছে। আদালতে চীফ মেট্রোপলিট্রন ম‌্যাজিস্ট্রেটের কাছে সাক্ষ্য দেবার সময় শহীদুল বলেন- গ্রেফতারের রাতে তার চোখ বাঁধা হয়, মাথার উপর রাখা হয় ভারী ওজনের জিনিস এবং মুখে আঘাত করা হয়।”

/জাস্ট নিউজ

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.