পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র কতটা ঝুঁকিপূর্ণ?

।।দেবাশীষ সরকার  মওদুদ রহমান।।

সংকটের ফাঁদে ফেলে সমাধানের নামে আজকাল এমন সব প্রকল্প করা হচ্ছে যেগুলো হতে যাচ্ছে ভবিষ্যতের বিষফোঁড়া। যানজট নিরসনের নাম করে বিশ্বে খরচের রেকর্ড সৃষ্টি করা ভুল নকশার ফ্লাইওভারগুলো জানান দিচ্ছে যে আমাদের প্রশ্ন না করার প্রবণতা, সবকিছু মাথা পেতে মেনে নেবার মানসিকতা ভবিষ্যতের ক্ষতির বোঝা দিনে দিনে ভারী করে তুলছে। ঠিক এমনিভাবে করে ফেলা হচ্ছে রূপপুর ২ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। সরকারী মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী ২০৪১ সালের মধ্যে স্থাপন করা হবে মোট ৭ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র। বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের নামে রেন্টাল, কুইক-রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রের টোটকা যে কাজে আসেনি তা সাম্প্রতিক বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির ঘটনা থেকে ভালভাবেই বোঝা যায়।

বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট যতটা না পুরনো, উৎপাদন মাধ্যম হিসেবে পারমাণবিক প্রযুক্তিকেন্দ্রিক পরিকল্পনা তার চেয়েও বেশী পুরনো যা শুরু হয়েছে গত শতাব্দীর ষাটের দশক থেকে।  এই দীর্ঘ সময়ে রাষ্ট্রকাঠামো পরিবর্তিত হয়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনের সাশ্রয়ী-পরিবেশবান্ধব নানা উপায় উদ্ভাবিত হয়েছে। কিন্তু পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে একগুঁয়েমি শেষ হয়নি। এ নিয়ে বাংলাদেশের সাথে রাশিয়ার ঋণচুক্তি হয়েছে, ভারতের সাথে হয়েছে যন্ত্রপাতি আমদানীর সমঝোতা। বলা হচ্ছে, ২০২৪ সালের মধ্যেই নাকি সম্পন্ন হবে রূপপুর কেন্দ্রের কাজ।

দুর্ঘটনার ইতিহাস বনাম উন্নত প্রযুক্তি
থ্রী মাইল আইল্যান্ড দুর্ঘটনা, চেরনোবিল দুর্ঘটনা, ফুকুশিমা দুর্ঘটনার মত একের পর এক অভিশপ্ত ঘটনায় সাধারণ মানুষ যখন আতংকগ্রস্ত তখন আমাদেরকে বোঝানো হচ্ছে- রূপপুরে নাকি বসানো হবে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি। বোয়িং বিমান এর উপর বিদ্ধস্ত হলেও নাকি এ কেন্দ্রের কোন ক্ষতি হবে না! কিন্তু প্রযুক্তি নিয়ে এই আস্ফালন, পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ব্যবসা প্রসারে নানান ধরণের ছলা-কলায় ভুলানোর প্রবণতা নতুন কিছু নয়। ষাটের দশকে এই রূপপুরেই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রিঅ্যাক্টরের চারপাশে নিরাপত্তা বলয় (containment building) ছাড়াই ৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র তৈরীর পরিকল্পনা প্রস্তাব জমা দিয়েছিল রাশিয়া। নিরাপত্তা ব্যুহের অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে তখনও দম্ভভরে জানিয়েছিল যে, তাদের রিঅ্যাক্টর ডিজাইনে নাকি কোন খুঁত নেই, তাই এর চারপাশে ব্যুহ তৈরীর প্রয়োজন নেই। অথচ এর কিছু কাল পরেই ১৯৮৬ সালে তাদের নিজেদের কেন্দ্রেই ঘটে চেরনোবিল দুর্ঘটনা যাতে নিরাপত্তা ব্যুহ না থাকার কারণে তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়ে তাৎক্ষণিকভাবে (Matin, 2012) ।   

যে চেরনোবিল দুর্ঘটনা চিকিৎসা বিজ্ঞানে চেরনোবিল এইডস, চেরনোবিল পা, চেরনোবিল হৃদপিন্ড, চেরনোবিল থাইরয়েড, চেরনোবিল স্মৃতিবিভ্রাট নামের নানান রোগের জন্ম দিল সে দুর্ঘটনায় আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)  এবং  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) কর্তৃক প্রণীত ‘দ্য চেরনোবিল ফোরাম’ রিপোর্টে মৃতের সংখ্যা দেখানো হয় মাত্র ৯ হাজার। পৃথিবীর ইতিহাসে এত বড় একটি দুর্ঘটনায় হতাহতের সংখ্যা এত ছোট! এর কারণ কী?

এর কারণ প্রধানত দুটি। প্রথমত, এই রিপোর্টে সংখ্যা কমিয়ে দেখানোর জন্য পৃথিবীব্যাপী গবেষণালব্ধ এবং বহুল প্রচারিত ৩০ হাজার প্রকাশনার মধ্যে বাছাই করা মাত্র ৩৫০ টি গবেষণা প্রবন্ধ অবলম্বন করা হয়েছে। দ্বিতীয়ত, WHO এবং IAEA, World Health Assembly এর ৩ নং আর্টিক্যাল অনুসারে একে অপরের স্বার্থ রক্ষা করে চলে। ৩ নং আর্টিক্যালের প্রথম প্যারায় বলা আছে, IAEA এবং WHO মনে করে যে পরস্পরের স্বার্থে তথ্য গোপনীয়তা প্রয়োজন (IAEA/WHO agreement (WHA 12.40))। যে সংস্থার কাজ হচ্ছে পরমাণু প্রকল্পের নিরাপত্তা দেখভাল করা সে সংস্থাই দুর্ঘটনা পরবর্তী বিভিন্ন গবেষণায় যাতে সঠিক তথ্য বের হয়ে আসতে না পারে সে জন্য নানান ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করে রেখেছে। এতে নিশ্চিত বোঝা যায় প্রকৃত ক্ষতির প্রকাশ পরমাণু বিদ্যুতের প্রসারকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে বিধায় IAEA’র স্বার্থে চেরনোবিল দুর্ঘটনার ক্ষতি কমিয়ে দেখানো হয়েছে এবং সেই চেষ্টা এখনও অব্যাহত আছে। অতএব রূপপুর প্রকল্পে জালিয়াত IAEA’র বিভিন্ন শর্ত এবং তদারকি যে নিতান্তই লোক দেখানো তাতে কোন সন্দেহ নেই।      

তাই স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত হিসাব কী?
এ প্রসঙ্গে ২০০০ সালে জাতিসংঘের তৎকালীন সেক্রেটারী জেনারেল কফি আনান জানিয়ে ছিলেন, “চেরনোবিল এমন একটি শব্দ যা আমরা আমাদের স্মৃতি থেকে মুছে ফেলতে চাই। কিন্তু এ ঘটনার শিকার ৭০ লক্ষেরও বেশী মানুষ কখনোই এটি ভুলতে পারবে না। প্রকৃত সংখ্যা কখনোই জানা যাবে না। কিন্তু ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৩০ লক্ষ শিশুর নিবিড় চিকিৎসার প্রয়োজন হবে। তাদের ভবিষ্যৎ জীবন বাধাগ্রস্ত হবে। অনেকেই অকাল মৃত্যু বরণ করবে।”

দুর্ঘটনার প্রকৃত চিত্র মিথ্যার চাদরে আড়াল করার প্রবণতা, নিষেধাজ্ঞা জারি করে সংবাদ প্রচারে বাধা দেয়া সহ নানান ভাবে রাশিয়া (তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন) চেষ্টা করেছে বিশ্ববাসীকে যতটা কম জানতে দেয়া যায়। এ কারণেই দুর্ঘটনার প্রথম দিনেই চেরনোবিল স্বাস্থ্যতথ্য জনসম্মুখে প্রকাশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় যা বহাল থাকে ১৯৮৯ সালের ২৩ শে মে পর্যন্ত। এই তিন বছরে অগণিত মানুষ লিউকোমিয়ায় মারা যায় যা কাউকে জানতে দেয়া হয়নি। দুর্ঘটনার আট বছরেও দূষণ প্রতিক্রিয়া নিয়ে সরকারীভাবে কোন বিবৃতি দেয়া হয়নি। অতএব রাশিয়ার উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের আশ্বাস, জ্বালানী সরবরাহের অঙ্গীকার, রাসায়নিক বর্জ্য নিয়ে যাবার আশ্বাস – এ সবই যে ব্যবসায়িক কূট কৌশলের অংশ তা বুঝতে আর বাকি নেই। অন্তত অতীত ইতিহাসের ঘটনা পরম্পরা তাই বলে। 

একটা উদাহরণ দিলেই রাশিয়ার তথ্য গোপনের জালিয়াতি আরো পরিষ্কার হবেঃ
চেরনোবিল দুর্ঘটনার পর তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের জনস্বাস্থ্য বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের ফার্স্ট মিনিষ্টার সিচেপিনের ১৯৮৬ সালের ২১ শে মে পাঠানো চিঠিতে এই বলে নির্দেশ দেয়া হয় যে, তেজস্ক্রিয়তায় অসুস্থ হয়ে যারা হাসপাতালে ভর্তি হবে, হাসপাতাল ত্যাগ করার সময় যদি প্রকট তেজস্ক্রিয়তার কোন লক্ষণ না থাকে তবে অসুস্থতার কারণ হিসেবে সাধারণ স্মৃতিবিভ্রাট (vegetovascular dystonia) লিপিবদ্ধ করতে হবে। এই নির্দেশের ফলে তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত অসংখ্য মানুষ হিসাবের বাইরেই থেকে যায়।   

১৯৮৬ থেকে ২০৫৬ সাল পর্যন্ত সময়কালের প্রজন্মকে বলা হয় চেরনোবিল প্রজন্ম যার উপর সরাসরি প্রভাব পড়বে বলে বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন। নিচে একটি ছকের মাধ্যমে এই চেরনোবিল প্রজন্মের কতজন শুধুমাত্র তেজস্ক্রিয়তাজনিত ক্যান্সারে মারা যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে  সেটির পরিসংখ্যান তুলে ধরা হল।   

ছকঃ চেরনোবিল দুর্ঘটনায় তেজস্ক্রিয়তা জনিত ক্যান্সারে চেরনোবিল প্রজন্মের সাম্ভাব্য মৃত্যু (Malko, 2007)

তেজস্ক্রিয়তার প্রতিক্রিয়া প্রাথমিক পর্যায়ের তুলনায় কখনো কখনো বাতাস-পানি বা পরিযায়ী প্রানী বাহিত হয়ে সেকেন্ডারী পর্যায়ের সংক্রমণে আরও তীব্র হয়ে ওঠে। একারণেই বিকলাঙ্গতা, মানসিক অপরিপক্কতা, বয়োবৃদ্ধি সহ মারাত্মক সব উপসর্গ প্রজন্মান্তরে ছড়াতে থাকে। এই প্রতিক্রিয়া দেখা যায় সমগ্র জীবজগতে। প্রকৃতিতে এর পরিবর্তন কৃষির মাধ্যমে ফুটে ওঠে তীব্রভাবে। অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয়তার কারণে বেলারুশে ২৬৫,০০০ হেক্টর, ইউক্রেনে ১৩০,০০০ হেক্টর এবং রাশিয়ায় ১৭,০০০ হেক্টর কৃষিজমি ইতোমধ্যেই চাষাবাদের অনুপযুক্ত বলে ঘোষণা দেয়া হয়েছে (Aleksakhin et al., 2006) ।

অনেকেই ভাবতে পারেন যে, সদ্য ঘটে যাওয়া ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির আপাত স্বল্প ক্ষতি উল্লেখ না করে আশির দশকে ঘটা চেরনোবিল দুর্ঘটনার ভয়াবহ পরিণতির কথা তুলে ধরে পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে ভয় ধরানোই বোধহয় এ আলোচনার মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন।

অন্যান্য দুর্ঘটনার মত তাৎক্ষণিক মৃতদেহ গণনা করে পারমাণবিক দুর্ঘটনার প্রকটতা পরিমাপ করা যায় না। জাতীয়, অর্থনৈতিক, সামাজিক নানান দিকে এর প্রভাব ফুটে ওঠে ধীরে ধীরে। যেমন, ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির পর জাপানের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় তহুকো’র উৎপাদিত খাদ্যদ্রব্যের ৭০-৮০ ভাগ বাজার চলে যায় চীন এবং দক্ষিণ কোরিয়ার দখলে। এমনকি তেজস্ক্রিয়তার কারণে দুর্ঘটনা অঞ্চলের ৩০০ কিলোমিটার দূরবর্তী কায়াসু কোম্পানীর উৎপাদিত দ্রব্যের বিক্রি কমে যায় দুই-তৃতীয়াংশ। ফুকুশিমা দুর্ঘটনার দুই বছর পর ২০১৩ এর জুন মাসে ওই অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানিতে উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় পদার্থ পাওয়া যায়। এ ব্যাপারে জাপানের প্রখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী মিশিও কাকু জানান, ফুকুশিমা দুর্ঘটনা পরবর্তী ব্যবস্থাপনা বাস্তবায়নেই লাগবে অন্তত ৫০ থেকে ১০০ বছর। তাই ফুকুশিমা ট্র্যাজেডির প্রকৃত ক্ষতির ন্যূনতম ধারণা পেতেও আমাদের অপেক্ষা করতে হবে আরও কয়েক দশক।  জাপান সরকার ইতোমধ্যেই ফুকুশিমা পারমাণবিক চুল্লী সম্পূর্ণ তেজস্ক্রিয়তা প্রভাব মুক্ত করতে ১৮৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা ১৫ লক্ষ কোটি টাকার প্রয়োজন হবে বলে জানিয়েছে। (রয়টার্স, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৬)।  

তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তিই শেষ কথা?
সকলের শঙ্কা দূর করতে ফলাও করে প্রচার হচ্ছে যে, রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্রে ব্যবহার করা হবে অতি আধুনিক ‘থার্ড জেনারেশন প্লাস’ (জেন-থ্রি) ঘরানার প্রযুক্তি। প্রযুক্তি পণ্য ব্যবসায়ীদের এই স্লোগানটি বাংলাদেশ সরকারও এমনভাবে আপন করে নিয়েছে তাতে মনে হচ্ছে যে, ‘জেন-থ্রি প্লাস’ হচ্ছে সব মুশকিলের সমাধান! সিগারেটের বাজার প্রসারের দায়িত্ব কোন বিজ্ঞাপনী সংস্থা পেলে যে রংচঙা প্রচার হয় বাংলাদেশে পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রেও সেই ধরণের প্রচার শুরু হয়েছে। তাই বুদ্ধিহীন প্রচারে রয়ে যাওয়া ফাঁকগুলো তাদের রঙ্গিন চশমায় ধরা পড়ছে না।  

পারমাণবিক বিদ্যুতের দুর্ঘটনার শঙ্কার কথা তুললেই যুক্তিতে জিততে কূপমণ্ডূকেরা বলে বসে যে, বাস, লঞ্চ, প্লেন এগুলিতেও তো দুর্ঘটনা ঘটে। কিন্তু যখন পাল্টা প্রশ্ন করা হয় যে, পারমাণবিক আপদ ছাড়া অন্য আরেকটা আপদের নাম বলুন যেখানে বিপদের নিশ্চিত শঙ্কা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ছড়ায়, তখন উনাদের মুখে রা সরে না। উনারা এটা বুঝেও চেপে যান যে, নিউক্লিয়ার বিপর্যয় ঘটলে সরাসরি এর সাথে সংযুক্ত মানুষেরই যে কেবল বিপদ হয় তা’না (যেমনটা হয় কয়লা খনির দুর্ঘটনার কিংবা প্লেন দুর্ঘটনার ক্ষেত্রে), বরং এর ফলে বিপদে পড়ে এরকম হাজার হাজার মানুষ যাদের নিউক্লিয়ার বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের সিদ্ধান্ত এবং সুবিধাভোগের সাথে কোন সম্পর্কই নেই।

জ্বালানী স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশে এটি আমদানী করার কথা বলা হলেও পারমাণবিক কেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও ভারত কিংবা পাকিস্তানের নড়বড়ে অবস্থার কথা আমাদের নীতিনির্ধারকেরা ভুলে থাকতে চাইছেন। ১৯৬৯ সালে পরমাণু বিদ্যুৎ ব্যবহারের যুগে প্রবেশ করে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ভারতে প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট ক্ষমতার পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে < http://www.world-nuclear.org>। অথচ কেবল এক যুগ আগে শুরু করা সৌর বিদ্যুতের বর্তমান সক্ষমতা ভারতে এখন ১২ হাজার মেগাওয়াট এবং ২০২২ সালের মধ্যে তা ১ লক্ষ মেগাওয়াটে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।  

পারমাণবিক বিদ্যুতের পূজারিরা এটাও ভুলে থাকতে চাইছেন যে, শুধুমাত্র উৎপাদন খরচ হিসেবে এটি সাশ্রয়ী হলেও বিশাল অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যয়, নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাগত ব্যয় আর ইনসুরেন্স খরচ মিলিয়ে এটি আর সাশ্রয়ী থাকে না। তাইতো এমআইটি (ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি) এবং ইউনিভার্সিটি অফ শিকাগো’র গবেষণাতেও পরমাণু বিদ্যুৎ সবচেয়ে খরুচে হিসেবে প্রমাণিত হয়েছে (Rahman et al., 2011)। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা হচ্ছে “পোস্ট ফুকুশিমা স্ট্যান্ডার্ড” অথাৎ ফুকুশিমা দুর্ঘটনা পরবর্তী মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হবে। কিন্তু কে না জানে যে রূপপুরে সামান্য কোন দুর্ঘটনা ঘটলেই বাজারে চলে আসবে “পোস্ট রূপপুর স্ট্যান্ডার্ড” প্রযুক্তি। দ্বিতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি যখন ফুকুশিমা ট্রাজেডি ঠেকাতে পারে না তখনই আরো আধুনিক তৃতীয় প্রজন্মের প্রযুক্তি বাজারে আসে আর ঠিক সে সময়ই ল্যাবরেটরীতে প্রস্তুত হতে থাকে চতুর্থ প্রজন্মের প্রযুক্তি। প্রযুক্তির আধুনিকায়নে এটি খুবই স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু আধুনিকায়নের এ সূত্র পারমাণবিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে খাটে না। কারণ পারমাণবিক দুর্ঘটনায় যে বিকিরত কণা ছড়ায় তা ঢুকে পড়ে আমাদের শরীরে, খাবারের মাধ্যমে এসে পড়ে আমাদের খাদ্যশৃংখলে, মাটি-পানি-বাতাসের মাধ্যমে ছড়াতে থাকে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে। জীনগত পরিবর্তন কিংবা ক্রমোজোমাল পরিবর্তনে এটি ধীরে ধীরে ভয়ংকর রূপ ধারণ করে। এর ক্রমবর্ধমান প্রকটতা সম্পর্কে আধুনিক বিজ্ঞান নিশ্চিত কিন্তু পরিণতি নিয়ে এখনও সন্দিহান। তাই যে পারমাণবিক ব্যবস্থার ত্রুটির পরিণতিই এখনও ধরা পড়েনি সে ব্যবস্থার প্রযুক্তিগত আধুনিকায়নের কথা বলে রূপপুর প্রকল্পের যথার্থতা প্রমাণের চেষ্টা নিতান্তই হীন উদ্দেশ্য প্রণোদিত।

পরমাণু বিদ্যুৎ কি সস্তা?
বাণিজ্যিক উৎপাদনের শুরুর দিককার পর্যবেক্ষণ থেকে যে কোন প্রযুক্তির ভবিষ্যতের গতি প্রকৃতির একটা সাধারণ নির্দেশনা পাওয়া যায়। যেমন, বর্তমানে সবচেয়ে বেশী সংখ্যক পারমাণবিক চুল্লীর অধিকারী দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ১৯৬৬ সাল থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত ৭৫ টি চুল্লীর নির্মাণ কাজ আরম্ভ করা হয় যার প্রতিটির খরচ প্রকল্পের শুরুতে ধার্য করা খরচের চেয়ে গড়ে শেষ পর্যন্ত ৩০০ শতাংশ বেড়ে যায়। সেই ধারা যে এখনও অব্যাহত আছে তা বোঝা যায় ফ্রান্সের ফ্লামেনভিলে পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের দিকে তাকালে। ২০০৭ সালে নির্মাণ কাজ শুরু হওয়া ১,৫৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নির্মাণ কাজে প্রারম্ভিক ব্যায় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩.৩ বিলিয়ন ইউরো। ২০১২ সালের মধ্যেই প্রকল্প কাজ শেষ করার কথা থাকলেও নানা ধাপে খরচ বাড়িয়ে এখন বলা হচ্ছে এটি নির্মাণে খরচ হবে ১০.৫ বিলিয়ন ইউরো আর নির্মাণ কাজ শেষ হবে ২০১৮ সালে। অপরদিকে সৌর এবং বায়ু বিদ্যুতের ক্ষেত্রে ২০০৯ সাল থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে সকল প্রকার ভর্তুকি খরচ ব্যতীতই প্রতি  ইউনিটে দাম কমেছে যথাক্রমে ৮২% এবং ৬১% (LAZARD LCOE Analysis, 2015)। আর খরচের সেই অব্যাহত নিন্মগামী ধারাতেই ভারতে সৌর এবং বায়ু বিদ্যুৎ এখন সাড়ে তিন টাকারও কম মূল্যে উৎপাদিত হচ্ছে < http://www.mnre.gov.in/ >। প্রযুক্তি উন্নয়নের সাথে পাল্লা দিয়ে অন্যান্য বিদ্যুৎ উৎপাদনী মাধ্যমে খরচ কমছে আর পারমাণবিক বিদ্যুতের ক্ষেত্রে তা কেবলই বাড়ছে। তাইতো ‘ফিক্সড কস্ট’ মডেলের পরিবর্তে রাশিয়ার সাথে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ চুক্তি হয়েছে ‘কস্ট প্লাস’ মডেলে। এর ফলে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান খরচের অংক দফায় দফায় বাড়িয়ে নিতে পারবে।  ঠিক একই প্রক্রিয়ায় কাজ শুরুর আগেই রূপপুর প্রকল্পের কাজে প্রাক্কলিত ব্যয় ১ লক্ষ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ লক্ষ ১৮ হাজার কোটি টাকা হয়েছে । আবার রূপপুরে ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনে নৌপথ তৈরীতে ড্রেজিংয়ের জন্য অনুমোদন পেয়েছে ৯৫৬ কোটি টাকার প্রকল্প (ইত্তেফাক, ১ আগস্ট, ২০১৭)। এই অনিঃশেষ খরচের পারমাণবিক বিদ্যুৎ বড় আকারে যুক্ত করায় আসছে দিনগুলোতে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সিংহভাগ বরাদ্দের ঢল কোন দিকে যাবে তা বেশ ভালভাবেই বোঝা যাচ্ছে।

এরই মাঝে বিভিন্ন খাতের বাজেট বরাদ্দ নানান কায়দায় রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে এনে জড়ো করা হচ্ছে। উদারহরণস্বরূপ উল্লেখ করা যায় যে, ২০১৭-১৮ সালের বাজেটে পূর্ববর্তী বাজেটের তুলনায় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে ৫ গুণেরও বেশী বরাদ বৃদ্ধি করা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে এই বাজেট বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য তৈরী হয়নি। বরং প্রকৃত খরচ কম দেখাতে বিদ্যুৎ খাতে না দেখিয়ে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য এই বরাদ্দ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে (সর্বজনকথা, ৩য় বষ, ৪র্থ সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৩৮)।    

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্পে প্রাথমিকভাবে প্রাক্কলিত ১২.৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের মধ্যে ১১.৩৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রাশিয়া থেকে ঋণ নেয়া হচ্ছে। এই ঋণ পরিশোধ করার সময়কাল ২৮ বছর এবং ঋণের সুদ দিতে হবে ১.৭৫% +LIBOR রেট (লন্ডন ইন্টারব্যাংক অফারড রেট)। সর্বোচ্চ সুদের হার ৪%। অর্থাৎ যদি ধরেও নেই যে প্রাক্কলিত খরচ আর বাড়বে না, এরপরও এই ২,৪০০ মেগাওয়াটের বিদ্যুৎ কেন্দ্র করতে খরচ করতে হবে প্রায় দেড় লক্ষ কোটি টাকা। ডিকমিশনিং খরচ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনাগত খরচ বাদ দিয়েই প্রতি হাজার মেগাওয়াটে যে বিদ্যুৎ কেন্দ্রে খরচ হচ্ছে কমপক্ষে ৬০ হাজার কোটি টাকা, সেই বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উৎপাদিত বিদ্যুৎ কী করে সস্তা বলা যায়? উল্লেখ্য যে, প্রতি হাজার মেগাওয়াট এলএনজি ভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণে খরচ হয় প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা এবং সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করতে খরচ হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা।

পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র হতে উৎপাদিত বিদ্যুতের নিশ্চিত বাজারের নিরাপত্তা রাষ্ট্রকেই বহন করতে হয়। দীর্ঘ সময়ের জন্য নানা চুক্তিতে বাধা পড়ে যাওয়ায় এই বিদ্যুৎ অল্প সময়ের মধ্যেই গলার কাঁটা হিসেবে প্রমাণিত হলেও তা হতে সহজে মুক্তি পাওয়া যায় না। তখন নানা উপায়ে রাষ্ট্রীয় খরচে চলা শুরু করে এই বিদ্যুৎকেন্দ্র যা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ইউনিট প্রতি বিদ্যুতের মূল্য হিসাবের বাইরেই থেকে যায়। উদাহরণস্বরূপ যুক্তরাজ্যের কথা উল্লেখ করা যায়। ষাটের দশক থেকে ব্যবহার শুরু করে যুক্তরাজ্যে এখন প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার ১৫টি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন চুল্লী চালু আছে।  ৮টি পারমাণবিক চুল্লী পরিচালনা আর বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে ‘ব্রিটিশ এনার্জী’ ১৯৯৫ সালে নিবন্ধন লাভ করে। পরের বছরই এটিকে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়া হয়। মাত্র ৭ বছরের মাথায় এই কোম্পানী চরম আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়ে ব্রিটিশ সরকারের কাছে আর্থিক সহযোগীতা চায়। ২০০৪ সালে ব্রিটিশ সরকার কোম্পানীটিকে ৩ বিলিয়ন পাউন্ডের (২০১৭ এর দামস্তর অনুসারে প্রায় ৯ বিলিয়ন পাউন্ড বা প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকা) ‘বেইল আউট’ সুবিধা প্রদান করে এবং এর সমস্ত দেনা পরিশোধের দায়িত্ব নেয় (দ্য নিউইয়র্ক টাইমস, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৪)। অপরদিকে যুক্তরাজ্যের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর বর্জ্য পরিশোধন ও নিরাপত্তা সুরক্ষা প্রদান আয়োজন চলে ‘সেলাফিল্ড নিউক্লিয়ার কমপ্লেক্সে’। এই কেন্দ্রটি চালাতে বছরে ৩ বিলিয়ন পাউন্ড বা ৩৩ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়। বর্তমানে যুক্তরাজ্যে চালু থাকা পারমানবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর নিজ নিজ আয়ু শেষে নিরাপদ ও ঝুঁকিমুক্ত করতে কমপক্ষে ৭৩ বিলিয়ন পাউন্ড বা সাড়ে ৮ লক্ষ কোটি টাকা খরচ হবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে (http://www.i-sis.org.uk)। এই সকল খরচের ভার কোন কোম্পানী কিংবা ইন্সুরেন্স পলিসি বহন করে না। রাষ্ট্রের তহবিল হতে ব্যয় করা এই সকল খরচ যদি পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচের সাথে যুক্ত করে বিদ্যুৎ বিল নির্ধারণ করা হয় তবে এই বিদ্যুতের মূল্য নিশ্চিতভাবেই বেড়ে যাবে কয়েক গুণ। এক্ষেত্রে তাই চলতে থাকে নানান ধরণের অপ্রত্যক্ষ আয়োজন আর আইনের মারপ্যাঁচ। যেমন, ভারতে জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণের জন্য প্রণয়ন করা আইন (রাইট টু ইনফরমেশন) থাকলেও পারমাণবিক বিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট খাতে কী পরিমান ব্যয় করা হচ্ছে তা এই আইনের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে।

এ সকল কারণেই নীতি-নির্ধারণী মহল যখন রূপপুর প্রকল্পে রাশিয়ান প্রযুক্তি আমদানীর গর্বে খুশীতে আত্মহারা তখন পারমাণবিক বিদ্যুতের কদর্য রূপ, অথনৈতিক ক্ষতির বোঝা আর তথ্য গোপনের সংস্কৃতিতে আমাদের সামনে শুধুই আসন্ন সংকটের কালো ছায়া। অথচ পরমাণু প্রযুক্তি শিক্ষা, উন্নয়ন, গবেষণায় মনোযোগী হয়ে ভবিষ্যতের কৃষি, চিকিৎসা এমনকি বিদ্যুৎ খাতেও বাংলাদেশ পেতে পারতো শক্ত ভিত্তি।

কুদানকুলাম কেলেঙ্কারি আর প্রযুক্তি ব্যবসার ধান্ধাবাজি
ভারতে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সর্বশেষ সংযোজন কুদানকুলামের ২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র। এটির নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০০২ সালে এবং দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে নির্মাণ কাজ চলার পর  দ্বিতীয় চুল্লী উদ্বোধনের মাধ্যমে প্রথম পর্যায়ের কাজ শেষ হয় ২০১৬ সালে।  এই সদ্য নির্মিত কুদানকুলাম পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণে যুক্ত ছিল রাশিয়ার কোম্পানী ‘অ্যাটোমোক্সপোর্ট’ যেটি এখন বাংলাদেশের রূপপুর পারমাণবিক কেন্দ্র নির্মাণের দায়িত্বে আছে। নিন্মমাণের যন্ত্রপাতি, উচ্চ ক্ষমতার কথা বলে নিন্ম ক্ষমতার যন্ত্রাংশ গছিয়ে দেয়া, নির্মাণ কাজ ছয় বছর দেরীতে শেষ করার মত কাজগুলো কুদানকুলামের ক্ষেত্রে এই রাশিয়ান কোম্পানী করে গেছে বিনা বাঁধায়। সেখানে ব্যবহার করা হয়েছে থার্ড জেনারেশন (জেন-৩) প্রযুক্তি। এই কেন্দ্র নিমাণ প্রক্রিয়ার প্রতিটি পর্যায়ে ছিল রাশিয়ান কোম্পানীর মারাত্নক সব ত্রুটি আর গাফিলতি।

>পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রে ৬০০ টন ওজন ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন পোলার ক্রেন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ যা ‘সেফটি গ্রেড ইক্যুপমেন্ট’ এর আওতাভুক্ত। চুল্লী দালানের অভ্যন্তরে অতি মাত্রায় তেজস্ক্রিয়তা সম্পন্ন সকল কিছু স্থাপন, অপসারণ করতে এই পোলার ক্রেন ব্যবহৃত হয়। কিন্তু নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান  অ্যাটোমোক্সপোর্ট কুদানকুলামে যে পোলার ক্রেন সরবরাহ করে তা পরীক্ষা করে দেখা যায় যে গায়ে লেখা ক্ষমতার (নেমপ্লেট ক্যাপাসিটি) চেয়ে সেটির ওজন ধারণ ক্ষমতা ২০% কম। (Padmanabhan et al,  2013)। এই জোচ্চুরি ধরা পড়ার পরও ঐ নিন্ম ক্ষমতার পোলার ক্রেনটিই সেখানে বসানো হয়।

>রিঅ্যাক্টর প্রেসার ভেসেল বা RPV এর অভ্যন্তরে তেজস্কিয় বিক্রিয়া সম্পন্ন হয় এবং তা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এটি পরিবর্তনযোগ্য নয় বিধায় এটির আয়ু দিয়েই পারমাণবিক চুল্লীর আয়ু নির্ধারিত হয়। এটির নীচের অংশ সহ গুরুত্বপূর্ণ সকল অংশ তাই ঝালাইবিহীনভাবে নির্মাণ করা হয় এবং কুদানকুলামের নির্মাণ চুক্তির ক্ষেত্রেও ঝালাইবিহীন  RPV সরবরাহের কথা ছিল। চুক্তিতে এটির দুর্ঘটনা ঘটার মাত্রা থাকার ছিল ১ কোটিতে একটি (Core damage frequency)।  কিন্তু ভারতের পরমাণু শক্তি সংস্থা অনুসন্ধান চালিয়ে দেখতে পায় যে RPV’র দুইটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে দুইটি ঝালাই রয়েছে যার ফলে কুদানকুলাম কেন্দ্রে এখন দুর্ঘটনার ঝুঁকি ১০০ গুণ বেড়ে গেছে। অবশ্য  পরমাণু শক্তি সংস্থার এই অনুসন্ধান প্রতিবেদন ৩ বছর গোপন রাখা হয়। (Padmanabhan et al,  2013)।  

>২০০৭ সালে প্রতিটি ৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের দুটি ট্রান্সফরমার রাশিয়া থেকে সরবরাহ করা হয় যা পরবর্তীতে ত্রুটিযুক্ত হিসেবে সনাক্ত করা হয়। এটির জটিল মেরামত কাজের দায়িত্ব ভারতের কোন কোম্পানী নিতে চায় নি। এর ফলে Larsen and Toubro ‘র সরণাপন্ন হতে হয়। কিন্তু এই বিষয়টি নিয়মিত বার্ষিক প্রতিবেদনে গোপন করে রাখা হয়।

>Ziopodolk, Informtekh and Atommash  এই তিন পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যন্ত্রাংশ সাপ্লাই দেয়া কোম্পানীর সিইও’ই দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত হয়ে জেলে গেছে। কুদানকুলামে যন্ত্রাংশ সাপ্লাই দেয়ার কাজেও এদের যুক্ততা ছিল। ২০০৩ থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত অ্যাটোমোক্সপোর্ট’এর প্রধান এবং কুদানকুলামে যন্ত্রাংশ সরবরাহের প্রধান ঠিকাদারী কোম্পানী OMZ এর সিইও’র দায়িত্ব পালনকারী কাহা বেন্ডুকিজ এক সাক্ষাৎকারে স্বীকার করে বলেন যে চীন, ভারত এবং ইরানের মত দেশগুলোতে যন্ত্রাংশ নির্বাচনের ক্ষেত্রে মানের চেয়ে দাম এবং রাজনীতি প্রাধান্য পায়।

মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারতে গত চল্লিশ বছরেরও বেশী সময় ধরে পারমাণবিক শক্তি বিষয়ক গবেষণা হচ্ছে। পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনে ভারতের নিজস্ব উদ্ভাবিত প্রযুক্তি রয়েছে। কারিগরী এবং প্রযুক্তি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে এই বিষয়ে বিস্তর চর্চা আছে। এর ফলে যে নিজস্ব জনবল গড়ে উঠেছে তার মাধ্যমে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠানের কাজের তদারকি, নির্মাণকাজের ত্রুটি এবং নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবহারের বিষয়গুলো সেখানে ধরে ফেলা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশ নিজস্ব জনবল তৈরী না করে, গবেষণা আর চর্চার পরিবেশ সৃষ্টি না করে বিদেশী কোম্পানীর কাঁধে যে লাভের আশায় সওয়ার হয়েছে তাতে শেষ পর্যন্ত নিশ্চিতভাবেই গুড়েবালি পড়বে।       

রূপপুরে ৭  মাত্রার কোন দুর্ঘটনা ঘটলে তাৎক্ষণিকভাবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে কমপক্ষে ৫০ লক্ষ মানুষ। এই ৫০ লক্ষ জন হয়তো শাসকগোষ্ঠীর কাছে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৩ ভাগ। তাই বৃহত্তর স্বার্থ রক্ষার ধোয়া তুলে ক্ষুদ্রতর এই ৩ ভাগের বলি দিতে নীতিনির্ধারকেরা হয়তো কুন্ঠা বোধ করবেন না। কিন্তু জীবনকে  যারা সংখ্যা দিয়ে বিচার করেন, প্রযুক্তিকে যারা অন্ধভাবে পূজা করেন তাদের অজ্ঞতার বলি হবে প্রাণ, ধ্বংস হবে সামাজিক আর অর্থনৈতিক অবকাঠামো- এটা মেনে নেয়া যায় না। 
————————————————————————-

দেবাশীষ সরকারঃ প্রকৌশলী, পারমাণবিক বিদ্যুৎ বিষয়ক গবেষক, হেলমহোলটজ জেন্ট্রুম ড্রেসডেন রসেন্ড্রফ, জার্মানি। ইমেইলঃ [email protected]

মওদুদ রহমানঃ প্রকৌশলী, জ্বালানি বিষয়ক গবেষক। ইমেইলঃ [email protected]

তথ্যসূত্রঃ

AP (2000). Worst effects of Chernobyl to come. Associated Press 25 April 2000 (//www.209.85.135.104/search?q=cache:EN91goYTe_gJ: 
www.scorched3d.co.uk/phpBB3/viewtopic.php%3Ff%3D12%26t%3D5256%26st%3D0%26sk%3Dt%26sd%3Da+Kofi+Annan+million+children+demanding+treatment+Chernobyl+2016&hl=ru&ct&equals;clnk&cd&equals;18&gl&equals;ru).

Aleksakhin, R. M., Bagdevich, I. M., Fesenko, S. V., Sanzheva, N. I., Ageets, V. Yu. & Kashparov, V.A. (2006). Role of protective measures in rehabilitation of contaminated territories. International Conference. Chernobyl 20 Years After: Strategy for Recovering and Sustainable Development of Affected Territories. April 19–21, 2006, Minsk, Belarus (Materials, Minsk): pp. 103–108. 

Alexey V. Y., Vassily B. N., Alexey V. N. (2009), Chernobyl: Consequences of the Catastrophe for People and the Environment

Khudoley V. V., Blokov I. P., Sadovnichik T. & Bysaro, S. (2006). Attempt to estimate the consequences of Chernobyl catastrophe for population living in the radiation-contaminated territories of Russia. In: Blokov, I. P. (Ed.), Consequences of the Chernobyl Accident: Estimation and Prognosis of Additional Mortality and Cancer Diseases (Center for Independent Environmental Assessment, Greenpeace-Russia, Moscow): pp. 3–19. 

RADNET (2008). Information about source points of anthropogenic radioactivity: A Freedom of Nuclear Information Resource. The Davidson Museum, Center for Biological Monitoring (//www.davistownmuseum.org/cbm/Rad12.html)

Rahman D., Riasad A., Sakhawat N. & Zubaer C. (2011). A Study On Nuclear Energy: Sustainable

Solution For Ensuring Energy Security Or Emerging Future Threat, International Journal on Current Research & Review, pp. 6-14. 

Malko, M. V. (2007). Assessment of Chernobyl medical consequences accident. In: Blokov, I., Sadownichik,T., Labunska, I. & Volkov, I. (Eds.), The Health Effects on the Human Victims of the Chernobyl Catastrophe (Greenpeace International, Amsterdam): pp. 194– 235.

Matin A. (2012), Rooppur & The Power Crisis

WHO (1959). Resolution World Health Assembly. Rez WHA 12–40, Art. 3, §1(//www.resosol.org/InfoNuc/IN_DI.OMS_AIEA.htm).

Letter of the USSR’s First Deputy Minister of Public Health O. Shchepin, May 21, 1986, # 02–6/83–6 to Ukrainian Ministry of Public Health (cit. by V. Boreiko, 1996, pp. 123–124).

Padmanabhan et al., Counterfeit/obsolete Equipment and Nuclear Safety issues of VVER-1000 Reactors at Kudankulam, India, 2013

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.