শেরপুর, নোয়াখালী, যশোরে বিএনপি গুম-খুন করে হাত পাকিয়ে এখন নারায়ণগঞ্জে এসপি হয়েছেন আনিসুর!

গত তিন মাস ধরে নারায়নগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় বেড়ে গেছে বিচার বহির্ভুত হত্যা ও গায়েবী মামলার ঘটনা। ২০১৪ সালে র‌্যাবের হাতে চ্যাঞ্চল্যকর সেভেন মার্ডারের পরে নানাবিধ চেষ্টায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সহণীয় ছিল। হঠাৎ করে গত ১৫ অক্টোবর রবিবার ভোররাতে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজার ও রূপগঞ্জে ৫টি অজ্ঞাতনামা লাশ পাওয়া যায়। এই হত্যকান্ড সম্পর্কে তেমন কোনো ক্লু অদ্যাবধি হানা যায়নি, যদিও জানা গেছে, হতভাগ্য মানুষগুলি বিভিন্ন স্থান থেকে গোয়েন্দা পুলিশের হাতে গুম হয়েছিলেন। পুলিশের বিভিন্ন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসপি আনিসুর রহমান যোগ দেয়ার পর থেকেই নারায়ণগঞ্জে লাশ পড়া ও গায়েবী মামলার হচ্ছে। পুলিশ সূত্র জানায়, এসপি আনিসুর যেসব জেলায় কাজ করেছেন যশোর, নোয়াখালী, শেরপুর সর্বত্রই একই ঘটনা ঘটিয়েছেন। এটা তার স্টাইল!

এসপি আনিসুর রহমানের বাড়ী গোপালগঞ্জ জেলায়। ২০০১ সালে আ’লীগ সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার দু’মাস আগে ২০তম বিসিএস পুলিশ ক্যাডারে যোগ দেন আনিসুর। তবে পুলিশ একাডেমি সারদায় প্রশিক্ষণকালে শৃঙ্খলা ভঙ্গের কারণে চাকুরিচ্যুতি ঘটে তার। অনেক দেন দরবার করে ২০০৭ সালে চাকুরি ফেরত পেয়ে প্রথম যোগদান করেন শেরপুর জেলায়। আওয়ামীলীগের প্রেসিডিয়াম মেম্বার ও বর্তমান কৃষিমন্ত্রী নিঃসন্তান মতিয়া চৌধুরিকে আনিসুর মা ডেকে তার সন্তান হন! আনিসুর তার পূর্বের বিবাহিত স্ত্রী ও দু’সন্তান রেখে পূনরায় বিয়ে করেন আওয়ামীলীগ নেএী ফাতেমা তুজ্জহুরাকে, পরে ২০১৪ সালে যিনি শেরপুরের মহিলা সংসদ সদস্য পদে নিয়োগ লাভ করেন। এরপর থেকে আনিসুর পরিণত হন এমপির স্বামীতে- বেড়ে যায় আনিসুরের দাপট।

আনিসুর রহমান মহাজোট সরকারের প্রথম দিকে শেরপুর জেলা পুলিশে এ.এস.পি হেড কোয়ার্টার পদে যোগদান করেন। আ’লীগের রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক হওয়ায় এবং স্থানীয় আ’লীগ দলীয় মন্ত্রী মতিয়া চৌধুরিকে ‘মা’ ডেকে এই চার বছরে একই জেলায় থেকে তিনটি পদোন্নতি লাভ করেন- সিনিয়র এএসপি, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ও জেলা পুলিশের সর্বোচ্চ পদ পুলিশ সুপার। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তা হয়েও আনিসুর আ’লীগের দলীয় ক্যাডার হয়ে কাজ করেছেন বলে শেরপুরের সচেতন মহল মন্তব্য করেছেন। মতিয়া চৌধুরীর মত প্রভাবশালী মন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার করে খেয়াল খুশিমত যাচ্ছে তাই করেছেন আনিসুর। জমি সংক্রান্ত বিরোধ এবং শত্রুতার জের ধরে প্রতিপক্ষকে শায়েস্তা করতে সাধারণ মানুষকে জেএমবি সদস্য ও জামায়াত শিবির সদস্য বানিয়ে পুলিশ গ্রেফতার করেছে, নির্যাতন করে জেল হাজতে পাঠিয়েছে এসপি আনিসুরের নির্দেশে। এসব মিথ্যা মামলা ও হয়রানির শিকার পরিবারদের একমাত্র উপার্জনশীল ব্যক্তিরা জেল হাজতে থাকায় ঐসব পরিবারের সদস্যরা অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটিয়েছে, অনেক সংসার ধংস হয়ে গেছে। এদের মধ্যে বিত্তশালী কেউ কেউ গ্রেফতার হলে লাখ লাখ টাকা দিয়েও নিস্তার পায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসপি আনিসুর রহমানের রোষানলে পড়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে অনেকেই এলাকা থেকে গা ঢাকা দিয়েছে এবং এলাকা ছাড়া হয়েছেন। শুধু রাজনৈতিক দলের লোকদেরই নয়, এসপি আনিসুর সাংবাদিক নির্যাতন করতেও কম যাননি। সাংবাদিকদের গ্রুপিংয়ের জের ধরে বেশ কয়েকজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়েছেন। অপরাধী নয়, অথচ তাদের অপরাধী বানানো হয়েছে- এমন পরিবারের লোকজন আনিসুর রহমানকে অভিশাপ করতে শোনা গেছে। আনিসুর দম্ভোক্তির সুরে বলতেন, আমি বিএনপিসহ ১৮ দলীয় জোটের কোন হরতাল শেরপুরে সফল হতে দেইনি। এছাড়াও সভা সেমিনারে আওয়ামীলীগের রাজনৈতিক শ্লোগান ব্যবহার করে তিনি সবাইকে জানিয়ে বুঝিয়ে দিতেন তিনি প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তার চেয়েও তিনি দলীয় কর্মী। শেরপুরে জেলায় তার সময়কালে তারই নির্দেশে নিহত হয় অসংখ্য বিএনপি জামায়াতের নেতাকর্মী। বহুল আলোচিত পুলিশ সুপার গোপালী আনিসুর রহমানের শেরপুর থেকে  বদলি হওয়ায় শেরপুরের রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সাংবাদিক ও গণমানুষের মনে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফিরে আসে।

অতঃপর ২০১৩ সালের এপ্রিল মাসে বিএনপি জামায়াতকে নির্মুল করার লক্ষ্য নিয়ে যোগদান করেন নোয়াখালীতে। যোগদোনের পরে আনিসুরের পিরিয়ডে নোয়াখালীতে ঘটতে থাকে খুম গুম ও নির্যাতনের ঘটনা-
১) ১৪ ডিসেম্বর ২০১৩ কোম্পানীগঞ্জ থানায় বিএনপি-জামায়াতের মিছিলে এসপি অনিসুরের নির্দেশে তৎকালীন ওসি সাজিদুর রহমান (বর্তমানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নাসিরনগর থানার ওসি) এবং তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) শফিক (বর্তমানে কেএমপি খুলনা) ৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে। হতভাগ্যদের মধ্যে ছিল আবদুর নুর রাসেল, মাহমুদুল হক মিশু, আবদুস সাত্তার, মতিউর রহমান সজিব, আবদুল আজিজ রায়হান, সাইফুল ইসলাম।
২) ৩ ডিসেম্বর ২০১৩ সুধারাম থানার যুবদল কর্মী আবদুল সালামকে মিছিলে গুলি করে হত্যা করা হয়।
৩) সোনাইমুড়ি থানায় ক্রসফায়ারে হত্যা করা হয় বিএনপি কর্মী খোরশেদ আলমকে (১৩ ডিসেম্বর ২০১৩), পারভেজ আলমকে (২৩ অক্টোবর ২০১৩), প্রভাবশালী বিএনপি নেতা তৌহিদুল ইসলামকে (৩০ ডিসেম্বর ২০১৪), সাদেক হোসেন সাদ্দামকে (২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৪), শিবির কর্মী যোবায়েরকে (১৩ ডিসেম্বর ২০১৩) গুলি করে হত্যা করা হয়।
৪) এসপি অনিসুরের নির্দেশে চাটখিল থানায় তার অনুগত ওসি (তদন্ত) ইব্রাহীম ২০দলীয় জোটের মিছিলে গুলি করে দুই ছাএদল কর্মী ও শিবির কর্মীকে হত্যা করে।
এভাবে নোয়াখালী বিএনপি ও ২০ দলীয় জোটের অসংখ্য নেতাকর্মীকে গুলি করে হত্যা করা ও পঙ্গু করার নির্দেশদাতা ছিলেন এসপি আনিসুর। নোয়াখালী এবং যশোরে জেলার পোস্টিং থাকাকালে বিএনপি নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে ক্রস ফায়ারের ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের চাঁদা নিতেন।

পুলিশের নিয়োগে ছাত্রলীগ ক্যাডারদের ছাড়া অন্য কাউকে চাকুরী দেননি এসপি অনিসুর। দুর্নীতিতে সে ছিল খুব বেপরোয়া। যশোরে চাকুরী করাকালীন ২০ দলীয় জোটের শতাধিক নেতা কর্মীদের গুম খুন ও হত্যা করেন আনিসুর। নিয়োগ এমন দলীয়করণ করেছেন যে, ছাত্রলীগ করলেও মাদ্রাসায় পড়ার কারণে অনেককে চাকুরি দেননি। উপরন্তু কনস্টেবল নিয়োগে তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা কমে হয়নি। এক কথায়, এসপি আনিসুর রহমান একজন পেশাদার খুনির কাজ করেছেন প্রতিটি স্টেশনে। কোনো ক্ষেত্রে এসপি আনিসুর তার নিজের কাছে থাকা অবৈধ অস্ত্র দিয়ে সরাসরি গুলি করে বা তার অনুগত অফিসার দিয়ে হত্যাকান্ড ঘটাতেন।

যশোরের একাধিক সাংবাদিক জানিয়েছেন, এসপি আনিসুর রহমানের অত্যাচারে যশোরের মানুষ ছিলেন অতিষ্ঠ। তার এক স্ত্রী জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনের এমপি, অপরদিকে তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জে। সব মিলিয়ে বৃহস্পতি সব সময় তুঙ্গে থাকে আনিসুরের। তিনি তার ইচ্ছে মত কাজ করেন। জেলার এমপিদেরও তিনি পাত্তা দিতেন না। কোনো আইন কানুনের ধার ধারতেন না, যাকে ইচ্ছা ধরা ছাড়া, ক্রসফায়ার করায় সে ছিল স্বেচ্ছাধীন। অনিসুরের সময়ে যশোরে পুলিশের সাথে জনগনের দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে সব চেয়ে বেশি। তিনি যশোর থেকে যাওয়ার পর এই এলাকার জনগন হাফ ছেড়ে বেঁচেছে। এই জেলার পুলিশ সদস্যরাও তার কারণে অতিষ্ঠ ছিলেন। পুলিশ সদস্যরা বিভিন্ন সময় এসপির বিষয়ে দুঃখের কথাগুলো স্থানীয় সাংবাদিকদের সাথে বলেছেন। যশোরে কর্মরত সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা নানা চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রদান করেন।

এ বছর সেপ্টেম্বরে এসপি আনিসুর রহমান নারায়ণগঞ্জে যোগদানের পর জেলায় বিরোধী দল তথা বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে গায়েবী মামলার সংখ্যা বেড়ে গেছে। বিভিন্ন যায়গায় পাওয়া যাচ্ছে লাশ! অন্যদিকে হঠাৎ আতংক বিরাজ করছে না’গঞ্জ জেলা পুলিশে। কেউ কেউ আবার এই জেলা থেকে নিজেই বদলী হয়ে যাওয়ার জোর চেষ্টা তদ্বীর চালাচ্ছেন। সম্প্রতি নতুন পুলিশ সুপার আনিসুর যোগদানের পরই শুরু হয়েছে এই অস্থিরতা। অথচ বিগদ এসপি মঈনুল হক পিপিএমের সময়ও নারায়ণগঞ্জ পুলিশ প্রশাসনের এমন অবস্থা ছিল না। কিন্তু কেন এই আতংক? এমন প্রশ্নে সহজে মুখ খুলছেন না পুলিশের উর্ধতন কর্মকর্তারাও। নাম প্রকাশ না করার শর্তে নারায়ণগঞ্জ জেলা থেকে বদলী হওয়া একজন পুলিশ অফিসার বলেন, এসপি আনিসুর রহমান এসেই অফিসারদের বদলী করার ব্যাপারে তোড়জোর শুরু করেন। বিভিন্ন থানা এলাকায় অফিসারদের বদলী করছেন অযথাই। বদলী ঠেকাতে তিনি টাকা দাবী করেন। যিনি টাকা দিতে পারেন তিনি থাকতে পারবেন এই জেলায়। পুলিশ কনস্টেবলদেরও যথারীতি এদিক সেদিক করছেন তিনি। কনস্টেবলরাও এ যাত্রায় রেহাই পাচ্ছে না। তাই অনেকের সাথে তিনিও এই জেলা ছেড়ে চলে গেছেন অন্য জেলায়। প্রধানমন্ত্রীর জেলার লোক হওয়ার কারণে এসপি অনিসুরের বিরুদ্ধে কেউ কোন কথা বলতে সাহস করছেন না। এসব কারণে ৭টি থানার চেইন-অব-কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে। পুলিশের এএসআই ও এসআই যারা এসপির কাছের জন হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন, তারা ইতিমধ্যে থানার ওসিদের কমান্ড মানছেন না। এই সমস্ত অফিসার সরাসরি এসপির দোহাই দিয়ে এই জেলায় চাকুরী করছেন। ফলে বলা চলে স্থবির হয়ে গেছে বিভিন্ন থানার কার্যক্রম।

যোগ দিয়েই জেলার অফিসার ও কনস্টেবলদের গণহারে বদলীর আদেশ দেন এসপি আনিসুর। কিন্তু সেই আদেশের পর পুনরায় ঐ সমস্ত অফিসাররা আগের স্থানে বহাল রয়েছে, আবার কেউ কেউ জেলার পছন্দমত থানায়ও যোগদান করছেন। এর বিনিময় মূল্য হচ্ছে লাখ লাখ টাকা। ইতিমধ্যে এনিয়ে জেলা পুলিশ প্রশাসনে চলছে নানা ক্ষোভ। অনেকে এসপি আনিসুর রহমানের অধীনে নারায়ণগঞ্জে চাকুরী করতে অনীহা প্রকাশ করে জেলা ছাড়ছেন।

নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুলিশ সদস্যরা খুব আগ্রহ নিয়ে চাকুরী করার জন্য ছুটে আসলেও সম্প্রতি এই জেলায় নতুন পুলিশ সুপারের যোগদানের পরে এনিয়ে ভাটা পড়েছে। গোপালী পুলিশ সুপার আনিসুর রহমান যোগদানের পর থেকে নারায়ণগঞ্জে ঐ বিশেষ জেলার অফিসারদের আনাগোনা বেড়ে গেছে। এসপি আনিসুর নিজে তার পূর্বের কর্মস্থল যশোর থেকে তাঁর পছন্দমতো পুলিশ সদস্যদের নারায়ণগঞ্জে বদলী করিয়ে আনছেন। আর তাদের দিয়েই জেলার কাজ করানোর চেষ্টা করছেন তিনি। জেলার উর্ধ্বতন এই পুলিশ অফিসারের ব্যাপারে অভিযোগ তোলার কেউ নেই। তাই নীরবে অনেকে নারায়ণগঞ্জ থেকে অন্যত্র বদলী হওয়ার চেষ্টা করছেন। আবার অনেকে ইতিমধ্যে চলেও গিয়েছেন।

নারায়ণগঞ্জের ইতোপূর্বেকার এসপি মঈনুল হক পিপিএম অন্যত্র বদলী হওয়ার পর জেলা ডিবি পুলিশের কার্যক্রম নেই বললেই চলে। এসপি আনিসুর রহমানের মন জয় করতে মোটা অংকের টাকা লাগে। যার কারণে অফিসাররা কাজ করতে অনেকটা হিমশিম খাচ্ছেন বলেও একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছেন। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি থানায় একাধিক সিভিল টিম করা হয়েছে। এসপি নিজে জেলা ডিবি পুলিশের প্যারালাল প্রতিটি থানায় গড়ে তুলেছেন নিজস্ব সিভিল টিম। এই টিমের সদস্যরা ওসিকে পাশ কাটিয়ে সরাসরি কথা বলেন এসপির সঙ্গে। এসপির নির্দেশনায় থানা গুলোতে অফিসাররা তাদের মতো কাজ করায় থানা গুলোতে চেইন অব কমান্ড ভেঙ্গে পড়েছে।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.