বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত কি তার কৌশল বদল করেছে?

দু’হাজার তেরো সালের ডিসেম্বর মাস। ঢাকায় এক সফরে এলেন ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং। তিনি দেখা করলেন জাতীয় পার্টির নেতা এইচ এম এরশাদের সাথে, বলা হয় – তিনি তাকে অনুরোধ করেছিলেন পরের বছর ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে অংশ নেবার জন্য। এই সফর তখন ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

কারণ তার আগে জেনারেল এইচ এম এরশাদের জাতীয় পার্টি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেয় এবং বাংলাদেশে এক নাটকীয় পরিস্থিতি তৈরি হয় – যার ফলে সংশয় দেখা দেয় ৫ই জানুয়ারির নির্বাচনে নিয়ে।

নির্বাচনের অংশ নেবার জন্য সুজাতা সিং এরশাদকে অনুরোধ করলেও তিনি তখন রাজি ছিলেন না। তবে সরকারের চাপে পড়ে এরশাদ শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলেন।

সেই নির্বাচনের এক মাস আগে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের ঢাকা সফরকে তখন অনেকেই বিবেচনা করেছিলেন বাংলাদেশের নির্বাচনের উপর ভারতের প্রকাশ্য হস্তক্ষেপের এক দৃষ্টান্ত হিসেবে ।

তবে ২০১৮ সালের নির্বাচন নিয়ে সেই ভারতই এবার খুব একটা মনোযোগ দিচ্ছে না বলে দেশটির বিভিন্ন পর্যায়ের পর্যবেক্ষকরা বলছেন।

২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারত প্রকাশ্যে যেভাবে পক্ষ নিয়েছিল সেটি এবার দেখা যাচ্ছে না।

যদিও এবারের নির্বাচনে এরই মধ্যে সবগুলো রাজনৈতিক দল অংশ নিচ্ছে। ফলে পরিস্থিতিও বদলেছে।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারতের নিস্পৃহ ভাব দেখানোর বিষয়টি হয়তো তাদের কৌশলে কোন পরিবর্তন হতে পারে।

২০১৪ সালের ৫ই জানুয়ারির মতো প্রকাশ্যে সমর্থন দেখানোর চাইতে আড়ালে কলকাঠি পরিচালনা করাটাই ভারতের জন্য ভালো হতে পারে। এমটাই বলছেন বাংলাদেশে কেউ-কেউ।

বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে ভারত উদাসীন থাকবে, এমনটা মনে করার কোন কারণ নেই বলে মনে করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতির অধ্যাপক আব্দুল লতিফ মাসুম।

অধ্যাপক মাসুম বলেন, “আমি মনে করি বিজেপি সরকার দৃশ্যত নিঃস্পৃহ ভাব দেখালেও তারা ভেতরে-ভেতরে ভারতমুখি একটি সরকার চাইবে। সেক্ষেত্রে তারা তাদের জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী আওয়ামী লীগকে দেখতে চাইবে এটা খুবই স্বাভাবিক।”

শুধু ২০১৪ সালের নির্বাচন নয়, ২০০১ সালের নির্বাচনেও ভারতের ভূমিকা ছিল বলে অভিযোগ তুলেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছিলেন, ২০০১ সালে ভারতের কাছে গ্যাস বিক্রির প্রতিজ্ঞা করে বিএনপি ক্ষমতায় এসেছিল।

তবে বিশ্লেষকদের অনেকই মনে করছেন, এবারের নির্বাচনে ভারতের ভূমিকা থাকুক কিংবা না থাকুক – তার চেয়েও বড় কথা হলো: বিএনপি তার দলের স্বার্থেই নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

কারণ, ২০১৪ সালে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের জন্য বিএনপির যে মূল দাবি ছিল, সে দাবি তারা এবারো তুলেছিল। কিন্তু সেটি পূরণ না হলেও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। তবে একই সাথে গত বেশ কয়েক বছর ধরে দলটি ভারতের বিভিন্ন পর্যায়ে যোগাযোগের চেষ্টাও করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ মনে করেন, ভারতের আগ্রহের চাইতে বরং বেশি কাজ করেছে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমীকরণ।

মি: আহমেদ বলেন, বাংলাদেশে কোন সরকার ক্ষমতায় থাকবে সেক্ষেত্রে ভারতের ইচ্ছার প্রতিফলনই যে সব সময় হবে তা নয়। তিনি বলেন, অতীতে বাংলাদেশে এমন অনেক সরকার ক্ষমতায় এসেছে – যাদের ভারত চায়নি।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.