চট্টগ্রামে ঐক্যফ্রন্টের মহাসমাবেশ মানুষের ঢল। ১০ দিনের মধ্যে দেশে পরিবর্তন : জনগনের সিদ্ধান্ত করলে অমান্য কঠোর শাস্তির হুশিয়ারী

যে শাস্তি পাবেন তা কল্পনাও করতে পারবেন না, ঐক্যফ্রন্টের চট্টগ্রাম মহা সমাবেশে সরকারকে কড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করলেন ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতা ড. কামাল হোসেন। তিনি বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন সবাই চায়। সাত দফা মেনে নিন। জনগণ হাত তুলে রায় দিয়েছে সুষ্ঠু নির্বাচনের পক্ষে। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত অমান্য বা উপেক্ষা করলে, যে শাস্তি আপনারা পাবেন তা কল্পনাও করতে পারবেন না।

শনিবার বিকালে চট্টগ্রামে আয়োজিত জনসভায় ড. কামাল বলেন,  দেশের মালিক ১৬ কোটি মানুষ। ভোট ছাড়া আপনারা কীভাবে ক্ষমতায় আছেন, তার জবাবদিহি করতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের ৭ দফা দাবির বিষয়ে গণরায় পেয়েছি। জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। জনগণ এক হলে সব সম্ভব। যেমনভাবে আমরা দেশ স্বাধীন করেছি। এই ৭ দফা আদায় না হলে ঐক্যফ্রন্ট ঘরে ফিরবে না। এটা গণমানুষের দাবি। আজ চট্টগ্রামে গণরায় পেয়েছি, সেদিন সিলেটে পেয়েছি, তারপর রাজশাহী ও ঢাকায় সমাবেশ করব।

সমাবেশে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘এই সরকার অন্যায় এবং অপরাধকে ভিত্তি করে দেশ পরিচালনা করছে। জনগণ তা আর মেনে নেবে না। দীর্ঘ ১০ বছর দেশের মানুষকে এই স্বৈরাচারী সরকার জিম্মি করে রেখেছে। সরকার জানে তাদের পায়ের নিচে মাটি নেই। তিনি বলেন, ‘সরকার নিজেরা নাশকতা-সহিংসতা করে। তারপর বিরোধীদলের ওপর দোষ দেয়। বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের বন্দী করে ক্ষমতায় থাকতে চায়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, জনগণকে জিম্মি করে কেউ ক্ষমতায় থাকতে পারেনি। বন্দুক, পিস্তল দেখিয়ে ক্ষমতায় টিকে থাকার স্বপ্ন পাকিস্তানিরাও দেখেনি। আমরা অন্যায়ের কাছে মাথানত করব না। সাত দফা দাবি আদায় করে তবেই ঘরে ফিরব। এই সরকারকে আমরা পরাজিত করব। এই জাতি মুক্তিযুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। তাদের হারানোর কিছু নেই।

জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে স্বৈরাচার সরকারকে সংলাপে বসতে বাধ্য করা হবে বলে মন্তব্য করেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ একটি স্বৈরতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল। তাদের অগণতান্ত্রিক আচরণের কারণে আইনের শাসন গণমাধ্যমের স্বাধীনতা আমরা হারিয়েছি। আমরা এই জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের মাধ্যমে সরকারকে সংলাপে বসতে বাধ্য করবো।আর সরকার সংলাপে না বসলে দেশে যে অরাজকতা হবে তার জন্য তারাই দায়ী থাকবে।

ঐক্যফ্রন্টের প্রধান সংবিধান প্রণেতা ড. কামাল হোসেন আরও বলেন, বাংলাদেশ কারও পৈত্রিক সম্পত্তি নয়। এদেশের মালিক ১৬ কোটি জনগণ। যারা ১৬ কোটি মানুষকে কষ্ট দেয়। আমি বেঁচে থাকলে তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে তাদের শাস্তি নিশ্চিত করব।  সরকার অসাংবিধানিক কর্মকান্ড করছে- এমন অভিযোগ এনে সরকারকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর হুঁশিয়ারি দিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘মিছিল সমাবেশ জনগণের সাংবিধানিক অধিকার। সরকার সে অধিকারে বাধা দিয়ে পদে পদে সংবিধান লঙ্ঘন করছে। সংবিধানে লেখা আছে দেশের মালিক জনগণ, সরকার সেবক। এখন সেবকরা মালিককে কষ্ট দিচ্ছে। লালদীঘিতে সমাবেশ হলে সবাই বসে কথা শুনতো। রাস্তার উপর সমাবেশে এসে একটানা ৪ ঘণ্টা দাঁড়িয়ে বক্তব্য শোনা কষ্টকর। যারা এ কষ্ট দিল তাদের বিচার জনতার আদালতে হবে। ঢাকায় গিয়ে সংবিধান লঙ্ঘনের দায়ে মামলা করব।
কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক ড. কামাল বলেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি চাওয়ার কী আছে? আর কত চাইব। মুক্তি চাইতে হবে কেন? মুক্তি দিতে হবে। যদি অবিলম্বে মুক্তি দেয়া না হয়- আর তার কিছু হয় তাহলে এর জন্য জবাব দিতে হবে। আমরা জবাব চাইব।

সরকারকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামানোর ঘোষণা দিয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক ও ঐক্যফ্রন্টের নেতা মাহমুদুর রহমান মান্না বলেছেন, সরকার ঐক্যের পথে বিভ্রান্তি ছড়াবে। আমরা অনেকগুলো দল এক হয়েছি। আমাদের লক্ষ্য একটাই- সরকারের পতন। তারা হঠাৎ তফসিল ঘোষণা করতে পারে। আমরা লড়াই করব এবং ভোটে জিতব। ভোটকেন্দ্রে, ভোটের মাঠে, রাজপথে ঐক্যবদ্ধ থাকব। জয় আমাদের হবেই।মান্না বলেন, সরকার বলছে ৭ দফা ১১ দফা মানবে না। আমরা বলছি, মানতে হবে। সরকার বলছে তারা পদত্যাগ করবে না, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেবে না। আমরা বলছি, দিতে হবে। তিনি আরও বলেন, আমাদের স্লোগান একটাই- গদি ছাড়ো, তুমি যাও। গদি না ছাড়লে কিভাবে ছাড়াতে হয়, সেটা আমাদের জানা আছে। এই ঐক্য ক্ষমতার ঐক্য নয়, জনতার ঐক্য। আমরা কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবি জানিয়েছি, আমাদের দাবি মানতে হবে।

সমাবেশে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, ‘শুধু ১০ দিন অপেক্ষা করেন, দেখেন কী হয়। এর মধ্যে দেশের পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে। দেশের সব বুদ্ধিজীবী ঐক্যফ্রন্টে যোগ দেবেন। বামপন্থী, আওয়ামীপন্থী সব বুদ্ধিজীবী আসবেন। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী নিজের ছায়া দেখে ভয় পাচ্ছেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, ভয় পাবেন না, ড. কামাল হোসেন আছেন, তিনি আপনাকে রক্ষা করবেন। কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার মইনুল আপনাকে আইনি সহায়তা দেবেন।’

জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট চট্টগ্রামের অন্যতম সমন্বয়ক চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা: শাহাদত হোসেনের সভাপতিত্বে জনসভায় গণফোরাম সভাপতি ড.কামাল হোসেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড.খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা আব্বাস, ড. আব্দুল মঈন খান, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জেএসডি) সভাপতি আ স ম আব্দুর রব, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা: জাফরুল্লাহ চৌধুরী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না, গণফোরামের সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মোহসিন মন্টু, কার্যকরী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী, জেএসডির সহ-সভাপতি তানিয়া রব, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মালেক রতন, বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মো:শাজাহান, মীর নাসির, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, জয়নুল আবদিন ফারুক, আবুল খায়ের ভূইয়া, গোলাম আকবর খন্দকার, সুকোমল বড়ুয়া ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতা সুলতান মোহাম্মদ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে বেলা ২টা থেকে সমাবেশ শুরু হওয়ার কথা থাকলেও দুপুরে দেড়টার পর কোরআন তেলাওয়াত ও গীতাপাঠের মধ্য দিয়ে সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। সমাবেশের কারণে কাজীর দেউড়ি নূর আহমদ সড়কে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশেকে কেন্দ্র করে সভাস্থলের আশপাশ ছেয়ে গেছে বিএনপি ও ছাত্রদল-যুবদলের কারাবন্দি নেতাদের মুক্তি চেয়ে ব্যানার পোস্টারে। মঞ্চের সামনে নাসিমন ভবনের সামনে মঞ্চে থেকে কাজীর দেউড়ি পর্যন্ত এলাকায় অবস্থান নিয়েছে বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা ঐক্যফ্রন্টের হাজার হাজার নেতাকর্মী।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.