পুলিশে সুপারনিউমারী পদোন্নতি: ডিআইজি হাবিব ও এসপি প্রলয়ের দু’শ কোটি টাকা চাঁদাবাজির প্রজেক্ট!

বিশেষ প্রতিবেদক

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আগে বিভিন্ন সার্ভিস এবং বিভাগে পদোন্নতির ধুম পড়ে গেছে। সবাইকে খুশি করার উদ্দেশ্যে বেতন ভাতা পদোন্নতি সুযোগ সুবিধা দিয়ে দেয়া হচ্ছে দেদারছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আইন কানুন বিধির তোয়াক্কা করছে না সরকার। সুযোগ পেয়ে অতিউৎসাহিরাও দৌড়ঝাপ বাড়িয়ে দিয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় পুলিশ বিভাগে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতি বঞ্চিত প্রায় অর্ধসহস্র কর্মকর্তাকে একটি পদোন্নতি ধরিয়ে সান্তনা দিয়ে ক্ষোভ নিরসনের চেষ্টা চলছে। তবে এত বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ার মত কোনো শূন্য পদ নেই। তাই সুপারনিউমারী পদ তৈরী করে এ রাজনৈতিক পদোন্নতির চেষ্টা করে যাচ্ছে বিনাভোটের সরকার।

পুলিশ বিভাগের প্রস্তাবিত এ পদোন্নতির জন্য তালিকাভুক্ত হয়েছেন শ’পাঁচেক ক্যাডার কর্মকর্তা, যারা গত আ’লীগের দু’টার্মের সরকারে চিহ্নিত ছিলেন রেড মার্ক হিসাবে। এদের প্রমোশন নাই, ভালো পোস্টিং নাই এবং সুযোগসুবিধা বঞ্ছিত। নির্বাচনের সময় তারা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, এমন ধারণা করে হঠাৎ সান্তনা পদোন্নতির তোড়জোড় চালায় সরকারের একটি অংশ।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা জানান, পুলিশের ৪৯৫টি সুপার নিউমারারি পদ সৃষ্টির জন্য পুলিশ সদর দপ্তর থেকে একটি প্রস্তাব ৪ জুলাই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়। এর মধ্যে সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার থেকে এসপি, এসপি থেকে অতিরিক্ত ডিআইজি, এডিশনাল ডিআইজিকে পদোন্নতি দিয়ে উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব (পুলিশ) নূরুল ইসলামকে (সাবেক ছাত্রলীগ নেতা) প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়। এই প্রকৃয়ার মধ্যে হঠাৎই বাড়াবাড়ি শুরু করেন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের ডিআইজি (প্রশাসন) হাবিবুর রহমান। ১৭ বিসিএস পুলিশের কনিষ্ঠতম ডিআইজি হয়েও গোপালগঞ্জের অধিবাসী হাবিব ও আরও কিছু অফিসারের বাড়াবাড়িতে সিনিয়ররা অতিষ্ঠ। মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের কিছু অতি উৎসাহি দলবাজ অফিসারের সাথে জোট করে হাবিব এবং তার সাঙ্গাতরা অপ্রতিরোধ্য হয়ে ওঠে। পুলিশ বাহিনীকে আ’লীগের লাঠিয়াল বানানোর অন্যতম কারিগর হলেন এই ডিআইজি হাবিব। তার দৌড়ঝাপ ও চাপাচাপিতে গত ২২ সেপ্টেম্বর পুলিশে ৪৯৫টি সুপারনিউমারী পদে পদোন্নতি দেয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয় থেকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে প্রস্তাবনা চেয়ে পাঠায়। পুলিশ সদর দপ্তর থেকে প্রস্তাব পেয়ে তার ওপর মঞ্জুরি চেয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠায় জনপ্রশাসন ও অর্থ মন্ত্রণালয়ে। সুপারনিউমারি পদোন্নতির প্রস্তাবটি ওই দু’টি মন্ত্রণালয়ে যাচাই বাছাই হয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়।

অপ্রত্যাশিত পদোন্নতির খবর পুলিশ সদর দফতর থেকে কয়েকটি পত্রিকায় লিক করে দেয়া হয়। জানাজানি হলে দীর্ঘদিন ধরে বঞ্ঝিতরা, বিশেষ করে সিনিয়ররা আগ্রহী হয়ে খোঁজ খবর নিতে থাকে, এবং ৫/৭ ব্যাচ জুনিয়র ডিআইজি হাবিবকে তেল মারতে শুরু করে সিনিয়ররা। কিন্তু মহাধুরন্দর ডিআইজি প্রশাসন হাবিব ক্ষণে ক্ষণে কেবল মুচকি হাসে। তার সেই রহস্যময় হাসির মাজেজা তখন অনেকেই বুঝতে পারেনি।

পদোন্নতির জন্য কে কে বিবেচিত হচ্ছে, এসব খোঁজ খবর নিতে বঞ্চিতরা হেডকোয়র্টারে যোগাযোগ করতে থাকে। তাদের মাধ্যমে ডিআইজি হাবিব নিজেই খবর ছড়িয়ে দেয়- এডিশনাল ডিআইজি পদোন্নতির জন্য জনপ্রতি ৫ কোটি টাকা করে, এবং যারা ডিআইজি হবে তারা ১০ কোটি টাকা করে দিতে হবে। অনেকের সাথে আবার হাবিব তার ০১৭১৩৩৭৩০০৪ নম্বরের মোবাইল থেকে কথাও বলেন, ‘দেখলেন তো স্যার (সবাই তার সিনিয়র), প্রমোশন না পেলে ডিপার্টমেন্টে কেমন হিউমিলিয়েশন হয়, সমাজেও চলা যায় না! তাই এবার প্রমোশন নিয়ে সম্মান ঠিক করুন। তবে পদোন্নতি পেতে হলে তো খয় খর্চা আছে। এই সামান্য কয়টা টাকা তুলতে আপনাদের এক মাসও লাগবে না! তাছাড়া এই টাকা তো আর আমি নিব না। ইলেকশনের বছর- আপা (শেখ হাসিনা) ইলেকশনের জন্য খরচা চেয়েছেন, তাই! এবারের প্রমোশন থেকে আমি ২০০ কোটি টাকা দেয়ার কথা দিয়েছি। আমি নিশ্চয় বাপের জমি বেইচ্চা আপারে টাকা দিব না! টাকা দিলে বলেন, না দিলে হবে না!’

সিনিয়রদের কাছে টাকা চাওয়ার পরে ডিআইজি হাবিব তার চামচা ডিএমপি’র ডিসি প্রলয় জোয়ার্দারকে কাজ দেয় জুনিয়রদের সাইজ করতে। উল্লেখ্য, ২৪তম বিসিএস ব্যাচের শেষ ব্যক্তি প্রলয় কুমার জোয়ার্দার শেখ হাসিনার প্রটোকল অফিসারের পদ বাগিয়ে নিয়েছিল, যদিও তার চাকরিতে নানা গন্ডগোল আছে, এমনকি সে ব্যাসিক ট্রেনিংও শেষ করেনি, তাকে আবার পুলিশের ২৪ ব্যাচের সভাপতি করা হয়েছে! এ অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর অফিসের নাম ভাঙ্গিয়ে প্রলয় তার সিনিয়রদের ডিঙিয়ে এসপি পদে পদোন্নতি হাসিল করে নেয়, শেষে অতিরিক্ত ডিআইজির চলতি দায়িত্বও পালন করে অবৈধভাবে। যাই হোক, ডিআইজি হাবিব থেকে দায়িত্ব পেয়ে প্রলয় টার্গেটেড ২৪ ও ২৫ ব্যাচের পদোন্নতি প্রত্যাশীদের নিয়ে ইস্কাটনের পুলিশ অফিসার্স মেসের ৩ তলায় বসে ২০ অক্টোবর শনিবার। মিটিংয়ে প্রলয় তাদের কাছে জানতে চান, ‘তোমরা কি প্রমোশন চাও? সকলে যখন বলে- হ্যা, প্রলয় তখন শর্ত দেয়, ‘যারা এসপি হতে চাও প্রত্যেকে ১ কোটি করে টাকা দিবা। যারা যারা দিবা, তাদের দায়িত্ব আমি নিব। বাকীদের কথা আমি বলতে পারব না! তোমরা কনফার্ম করলে এক সপ্তাহের মধ্যে পদোন্নতি পাবা।’ এ নিয়ে অফিসারদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়। যাই হোক, ঐদিন সন্ধায় ২য় দফা বৈঠক বসে, এবং আরও কথাবার্তার পরে ঠিক হয় ২৩০ জনকে এসপি পদে পদোন্নতি দেয়া হবে, এবং এ জন্য প্রত্যেকে ৫০ লক্ষ টাকা করে দিবে।

DISCLAIMER: This is an investigative report by BD Politico Team. We reserve the right to protect our sources by law.

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.