শোচনীয় অবস্থায় আওয়ামীলীগ!

  বদরুদ্দীন উমর 

 

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রোববার বিএনপির সমাবেশের একাংশ
সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে রোববার বিএনপির সমাবেশের একাংশ। ছবি: যুগান্তর

৩০ সেপ্টেম্বর বিএনপি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এক জনসমাবেশ করেছে। এই সমাবেশের রিপোর্টে দৈনিক যুগান্তর বলছে, ‘জনসভা রূপ নেয় জনসমুদ্রে’। অন্যদিকে প্রথম পৃষ্ঠাতেই প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী এই সমাবেশ প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘বিএনপির সমাবেশই প্রমাণ করেছে দলটি ক্রমেই সংকুচিত ও জনবিচ্ছিন্ন হচ্ছে। তাদের নেতিবাচক কর্মকাণ্ডের কারণেই দলটি জনসমর্থন হারিয়ে ফেলেছে’ (যুগান্তর, ০১.১০.২০১৮)।

জনসমাবেশের রিপোর্টে যুগান্তরে যা বলা হয়েছে তা হল, ‘সকাল ১০টার পর থেকেই ঢাকা মহানগর ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী-সমর্থকরা খণ্ড খণ্ড মিছিল নিয়ে সমাবেশে আসতে শুরু করে। বেলা ৩টার মধ্যেই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কানায় কানায় ভরে ওঠে। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে আয়োজিত জনসভা রূপ নেয় জনসমুদ্রে। উদ্যান পেরিয়ে ইঞ্জিনিয়ার্স ইন্সটিটিউশনের মূল ফটকের সামনের অংশ ও মৎস্যভবন থেকে শাহবাগ মোড় পর্যন্ত সড়কটিতেও তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না’ (যুগান্তর, ০১.১০.২০১৮)।

শুধু এই রিপোর্ট নয়, সমাবেশের যে ছবি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হয়েছে তার থেকেও এই রিপোর্টে বর্ণিত সমাবেশের অবস্থার সমর্থন পাওয়া যায়। কাজেই কেউ একজন বিএনপির সমর্থক না হলেও এই বাস্তব অবস্থাকে তার স্বীকার করতেই হবে যে, ৩০ সেপ্টেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভায় অগণিত লোকের সমাবেশ হয়েছিল। তাদের সমাবেশ দেখে এটা মোটেই প্রমাণিত হয় না যে, বিএনপি জনবিচ্ছিন্ন বা বিএনপির অবস্থা ২০১৪ সালের থেকে সংকুচিত হয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তাদের সাধারণ সম্পাদক এ কথাই বলছেন!

এ থেকে বোঝার কি অসুবিধা আছে, আওয়ামী লীগ নিজেই বাস্তবতা থেকে কতখানি বিচ্ছিন্ন? বোঝার কি অসুবিধা আছে যে, দেশের পরিস্থিতি অনুধাবনের সামান্যতম ক্ষমতাও তাদের এখন নেই?

বোঝার কোনো অসুবিধা নেই যে, তাদের এখন দিশেহারা অবস্থা। তাদের পায়ের তলা থেকে যে মাটি সরে যাচ্ছে বা ইতিমধ্যেই সরে গেছে এই উপলব্ধি তাদের একেবারেই নেই। এ অবস্থায় তাদের ভরসা শুধু নির্বাচন কমিশন ও পুলিশ। জনগণ বা ভোটাররা নয়, নির্বাচন কমিশন ও পুলিশের আওয়ামী লীগ সরকারের প্রতি আনুগত্যের হিসাব করেই তারা আগামী নির্বাচনে জয়ের স্বপ্ন দেখছে! এই স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে এবং আওয়ামী লীগের দুরবস্থা যতই প্রকট হচ্ছে, ততই বেশি করে সরকারি মহলের আবোলতাবোল কথাবার্তা শোনা যাচ্ছে। এসব কথা তাদের প্রতি জনসমর্থন বৃদ্ধি না করে জনগণের কাছে হাসির ও রঙ্গরসের খোরাক জোগাচ্ছে। এর পরিণতি যে তাদের জন্য ভালো হতে পারে না, এটা বলাই বাহুল্য।

২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনে সব স্তরের জনগণের প্রাণ ওষ্ঠাগত। ২০১৪ সালের অগ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরবর্তী এই পাঁচ বছরে অবস্থা অনেক খারাপ হয়েছে। এখন তাদের ক্ষমতার মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে। কিন্তু নির্বাচনের কাছাকাছি মুহূর্তে এসেও তারা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং সড়ক পরিবহন আইনের মতো গণতন্ত্র ও শ্রমিক বিরোধী আইন পাস করতে কোনো দ্বিধাবোধ করেনি। উপরন্তু ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মাধ্যমে তারা ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ছে এই আওয়াজ তুলে মহা-আনন্দে আছে। কিন্তু তাদের এসব গণবিরোধী কাজ এবং অসার কথাবার্তা জনগণের মধ্যে কী প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করছে এটা বোঝার মতো ক্ষমতা তাদের আর নেই। শুধু তাই নয়, তাদের অবস্থা এখন এমনই যে, তারা এসব বোঝাবুঝির পরোয়া পর্যন্ত করে না। যে কোনো ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের পক্ষে এর থেকে করুণ অবস্থা আর কী হতে পারে?

বিএনপির এই জনসমাবেশ ঠেকানোর জন্য সরকার এবং সরকারি দল ও তাদের জোটের শরিকরা সব রকম চেষ্টাই করেছে, তবে এবার জনগণের চাপে সমাবেশের অনুমতি না দিয়ে তারা পারেনি। তাদের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই সমাবেশ সম্পর্কে এক হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, তাদের ঢাকার প্রতিটি অলিগলিতে পর্যন্ত ঠেকানো হবে। কেন ঠেকানো হবে? যে কোনো দলই জনসভা, জনসমাবেশ ডাকতে পারে এবং ডাকার অধিকার তাদের আছে। কাজেই অন্য বিরোধী দল সমাবেশ ডাকলে তাদের লোকজনকে সমাবেশে আসতে বাধা দেয়া হবে কেন? এভাবে বাধা দেয়ার এখতিয়ার তারা কোথায় পেলেন?

তারা নিজেদের সুবিধামতো সব সময় যে সংবিধানের কথা বলেন, সেই সংবিধানের কোথায় এ কথা আছে যে সরকার ছাড়া বিরোধী দলগুলোর মিছিল, সমাবেশ ইত্যাদি করা বেআইনি? কোথায় আছে সরকার ও সরকারি দলের এখতিয়ার এক্ষেত্রে বাধা দেয়ার?

তারা যে ধরনের নির্বাচনই হোক, নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় বসেছেন; কিন্তু তার দ্বারা জনগণ কোনো ব্যক্তিকে বা কোনো দলকে রাজা বা রাজার দল বানাননি। নির্বাচনে জয়ের অর্থ সরকারি ক্ষমতা নিলামে ওঠা নয়। নির্বাচনে জয়ের অর্থ সম্পত্তি নিলামের মাধ্যমে হস্তগত করা নয়। এক কথায় সরকার কারও, কোনো দল বা ব্যক্তির সম্পত্তি নয়। সরকার গঠনের অর্থ দেশের শাসন কাজ একটা নির্দিষ্ট মেয়াদে পরিচালনার জন্য ক্ষমতাপ্রাপ্ত হওয়া। এর থেকে বেশি কিছু নয়। নির্বাচনের মাধ্যমে কেউ চিরস্থায়ী জমিদারি কেনে না। কিন্তু বর্তমানে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত সরকারি দলের হাবভাব, কথাবার্তা ও কাজকর্ম এমন যে মনে হয় নির্বাচনের মাধ্যমে নিলামে ওঠা জমিদারি তারা কিনে দেশের মালিক হয়েছেন।

এ কথা সবাই জানে যে, ২০১৪ সালের নির্বাচন করতে গিয়ে আওয়ামী লীগ প্রমাণ করেছে, কোনো সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক নির্বাচন অনুষ্ঠান তাদের দ্বারা সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনকে মুঠোর মধ্যে রেখে এবং পুলিশ প্রশাসনকে দলীয়ভাবে ব্যবহার করে তারা ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচন করেছিল।

এ কারণেই আগামী সাধারণ নির্বাচনে যাতে ২০১৪ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হতে পারে এজন্য বিরোধী দলগুলো এখন পুরোদমে মাঠে নেমেছে। এমনকি ২০১৪ সালে যারা করণীয় হিসেবে নিজেদের সামনে কিছুই দেখেনি, তারাও এখন ঐক্যবদ্ধ হয়ে জোট গঠন করছে এবং মহাজোট গঠন করার উদ্যোগ নিচ্ছে। এই প্রচেষ্টার প্রতি যে জনগণের ব্যাপক সমর্থন আছে সেটা নানাভাবেই দেখা যাচ্ছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন করে তারা সংবাদপত্র, টেলিভিশন ইত্যাদি প্রচারমাধ্যম থেকে নিয়ে বিরোধী দল ও ব্যক্তির কণ্ঠরোধের যে প্রচেষ্টা নিয়েছে এটা হল ডুবন্ত অবস্থায় খড়কুটো ধরার মতো ব্যাপার। কিন্তু খড়কুটো ধরে যে কারও পক্ষে রক্ষা পাওয়া সম্ভব নয় এটা জানা কথা। এর দ্বারা আওয়ামী লীগেরও শেষ রক্ষার সম্ভাবনা নেই।

জনগণ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে পুলিশি সন্ত্রাস, নির্বাচন কমিশন ব্যবহার ইত্যাদির মাধ্যমে কারচুপির চেষ্টা সর্বতোভাবে করলেও যে পরাজয় ঠেকানো যায় না এর একেবারে সাম্প্রতিক উদাহরণ হল মালদ্বীপের নির্বাচন। এই নির্বাচনে প্রেসিডেন্ট ইয়েমেনি সব রকম দুর্নীতি ও দমননীতির আশ্রয় গ্রহণ করলেও শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়েছেন। পরিপূর্ণ জনবিচ্ছিন্নতাই এর কারণ। এবং এই জনবিচ্ছিন্নতা হয়েছে দেশের সম্পদ অবাধে ও বেপরোয়াভাবে লুটপাট এবং তার প্রয়োজনে জনগণের ওপর চরম ফ্যাসিস্ট নির্যাতনের কারণে। এভাবে দুর্নীতি ও নির্যাতন চালিয়ে কিছুদিন ক্ষমতায় থাকা যায়; কিন্তু ক্ষমতা বেশিদিন ধরে রাখা যায় না।

ক্ষমতাসীন থাকা অবস্থায় বেপরোয়া দুর্নীতি ও নির্যাতন করলে তার ফলে শেষ পর্যন্ত শাসক দলের মাথা থেকে বুদ্ধি বিদায় নেয়। বাংলাদেশের শাসক দল এবং তাদের পদলেহী শরিকরা যেভাবে কথাবার্তা বলে আসছেন তার মধ্যে বুদ্ধি ও কাণ্ডজ্ঞানের পরিচয় আর পাওয়া যায় না। ৩০ সেপ্টেম্বর বিএনপির জনসমাবেশ সম্পর্কে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী যে মন্তব্য করেছেন, তার থেকে বোঝা যায় এটা বুদ্ধির কাজ নয়। দৃষ্টিশক্তির পরিচায়কও নয়। বুদ্ধি তাদের মাথা থেকে বিদায় নিয়েছে এবং দৃষ্টিশক্তি রহিত হয়েছে। এর পরিণামে যা হওয়ার তাই হবে।

০১.১০.২০১৮

বদরুদ্দীন উমর : সভাপতি, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল
/যুগান্তর

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.