ষোড়শ সংশোধনীর রায় সরকারের পক্ষে দিতে প্রধান বিচারপতি সিনহাকে চাপ দিয়েছিলেন শেখ হাসিনা: ক্ষমতার অপব্যবহার ও শপথ লংঘন!

সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর রায় নিজের পক্ষে নিতে ক্ষমতার অপব্যহার করেছিলেন শেখ হাসিনা। সদ্য প্রকশিত বিচারপতি সিনহার লিখিত পুস্তক “A Broken Dream Rule of Law Human Rights and Democracy’ এর ৪৩২ পাতা থেকে ৪৪২ পাতায় তা ্উল্লেখ করেছেন যার সংক্ষিপ্ত রূপ এমন-
১ জুলাই ২০১৭ রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার মোবাইল নম্বরে ফোন করে তাঁকে রাষ্ট্রপতির পক্ষ থেকে বঙ্গভবনে চায়ের দাওয়াত দেন। পরেরদিন আবার সামরিক সচিব আবারও খুদেবার্তা দিয়ে প্রধান বিচারপতিকে তা মনে করিয়ে দেন। সাধারনত প্রধান বিচারপতিকে এভাবে কোনো দাওয়াত করা সভ্যতা ও রেওয়াজ বহির্ভুত। বরং রেজিষ্ট্রার জেনারেলের মাধ্যমে দেয়া হয়। নির্ধারিত দিনে বঙ্গভবনে গেলে প্রধান বিচারপতিকে সামরিক সচিবের কক্ষে প্রায় ৪৫ মিনিট বসিয়ে রেখে শেষে রাষ্ট্রপতির কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে রাষ্ট্রপতির সাথে প্রধানমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী, এটর্নী জেনারেল উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংবিধানের ১৬তম সংশোধনীর আপীল নিয়ে কথা বলেন, এবং প্রধান বিচারপতিকে অনুরোধ করেন মামলার রায় সরকারের পক্ষে দিতে। বিচারপতি সিনহা তা দিতে অস্বীকার করেন, কেননা সংবিধানে ১১৬ অনুচ্ছেদ অনুসারে অধঃস্তন আদালতের প্রশাসন সুপ্রীম কোর্টের সঙ্গে পরামর্শ অনুযায়ী পরিচালনা করারর নির্দেশনা রয়েছে। এসব কথায় শেখ হাসিনা রেগে ওঠেন এবং বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে একগাদা অভিযোগ তুলে তাকে পদত্যাগ করতে বলেন। সিনহাও জানান, তিনি পদত্যাগ করবেন না, এবং শেষ দিন অবধি তিনি শপথের উপরে থাকবেন। প্রায় তিন ঘন্টা বৈঠক ব্যর্থতা ও হতাশা নিয়ে শেষ হয়। সরকার প্রধান ও অন্যান্যদের অসদ্ব্যবহারে বিচারপতি সিনহা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং প্রায় অচেতন অবস্থায় বাসায় ফিরেন। রাতে নির্ঘুম কাটান।

পরের দিন সকালে ৩ জুলাই ২০১৭, সংবিধানের ১৬তম সংশোধনী নিয়ে সরকারের আপীলের রায় ঘোষণা করার কথা। যদিও আপীল বিভাগের ৬ বিচারপতিই আগে ধারণা দিয়েছিলেন যে, তারা সবাই আপীল খারিজ করে দিবেন। তদুপরি সরকারের নানামুখি চেষ্টাতে বিচারপতি সিনহার মনে সন্দেহ হয় যে, বাকী বিচারপতিদেরকে সরকার তাদের পক্ষে নিয়ে থাকতে পারে। তাই কোর্ট বসার আগেই প্রধান বিচারপতি বাকী ৬ আপীল বিচারপতির সাথে ইনফরমাল বৈঠকে বসেন। আলোচনা করে দেখতে পান যে, সরকারের নানাবিধ গোপন তৎপরতার ফলে বিচারপতিদের মধ্যে বেশীরভাগ আপিল মঞ্জুর করার পক্ষে (অর্থাৎ সরকারের উদ্দেশ্য পূরণের) চলে গেছে। তাদের মধ্যে বিচারপতি ওয়াহহাব মিয়া, নাজমুন আরা সুলতানা এবং মীর্জা হায়দার আপীল নাকচের পক্ষে, অন্যদিকে বিচারপতি মাহমুদ হোসেন আপীল গ্রহনের পক্ষে, তার সাথে মীর্জা হায়দারও আছেন তার সাথে। অন্যদিকে বিচারপতি ইমান আলী দু’দিকে মাঝামাঝি অবস্থানে। তখন বিচারপতি সিনহা এক এক করে মীর্জা হায়দার, মাহমুদ হোসেন, এবং ইমান আলীকে নসিহত করতে লাগলেন- এই ষোড়শ সংশোধনী বহাল থাকলে দেশের বিচার বিভাগ পুরোটা চলে যাবে সরকারের অধীনে, ফলে বিচার ব্যবস্থা বলতে আর কিছু থাকবে না, এ নিয়ে বিচারপতিদের ভূমিকার স্মরণ করিয়ে দেন। একে একে এরা সবাই আপীল নাকচের পক্ষে চলে আসেন। সকাল সাড়ে দশটার পরে আপীল বিভাগের কোর্ট বসে। প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহা ষোড়শ সংশোধনী সংক্রান্ত আপীল বিভাগের রায় ঘোষনা করেন এক বাক্যে- “সর্বসম্মত ভাবে আপিল নাকচ করা হলো!” সেদিন ছিল সোমবার, কেবিনেট মিটিং ডে। ষোড়শ সংশোধনী নাকচ হওয়ার খবর পেয়ে শেখ হাসিনার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে!

তারপরে সেখান থেকে শুরু হয় যুদ্ধ, যাতে অস্ত্রের মুখে দেশত্যাগ ও পদত্যাগ করতে হয় বিচারপতি সিনহাকে। তবে নৈতিকভাবে পরাজয় ঘটে শেখ হাসিনার।

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.