কবে কি- একটি তাত্ত্বিক আলোচনা!

ফেসবুক থেকে

সেপ্টেম্বর মাসের ১২ তারিখ আজ। একজন নাগরিক হিসাকে সামনের দিকে তাকালে বাংলাদেশকে কেমন দেখতে পান? আগামী তিন মাস মারামারি কাটাকাটি রক্তারক্তিতে লিপ্ত একটি দেশ? নাকি শান্তি শান্তি আর শান্তি! আসলে আমরা কেউ জানি না- কি হতে যাচ্ছে! কেউ মনে করছেন এবার শান্তি আসবে, কেউবা আবার হতাশ- আর বুঝি হলোনা। আবার অনেকেই ভেবে আছেন, একটা কিছু নিশ্চয় হবে! কি হবে বা হতে পারে, আসুন একটু কল্পনা করা যাক!

প্রথম দৃশ্যঃ
ঐক্যজোট হয়ে গেছে। এখন কেবল অফিসিয়িাল ঘোষণা এবং মাঠে নামা বাকী। তাহলেই হাসিনা উৎখাত হবে এবং অতঃপর আমরা আসছি সরকারে! স্বপ্নটা একটু সহজ হয়ে গেলো না? এতদিন ধরে যে লুটেরা সরকার খেয়ে দেয়ে মোটা তাজা হয়েছে, তারা কি বসে থাকবে? নাকি প্রাণভয়ে পালাবে? জবাবটা এত সহজ নয়। দুটোর যেকোনো একটি হতে পারে, আর তা নির্ভর করবে পরিস্থিতির ওপর!

দৃশ্যপট দুইঃ
বিএনপি এবং ঐক্যজোটের অনেকের মনেই ধারণা হয়েছে, এখন তো রেডি হয়ে রইলাম, তারপর সুবিধামত নামব! আচ্ছা, কবে নামবেন? আরে বুঝলেন না, যেদিন নির্বাচনকালীন সরকার গঠন হবে- সেদিন! ভাই, ঐ নির্বাচনকালীন সরকার বস্তুটা কি? ওটা কি খায়, নাকি মাথায় দেয়? নির্বাচনকালীন সরকার বলতে সংবিধানে আসলে কিছু কি আছে? নেই। তাহলে হাসিনা কেনো বলছে? কি হবে ওই সরকারে? আরে ওটা হলো ভোজবাজি, মানে ফাত্রামি! এখনও হাসিনা সরকারে, ঐটা গঠন হলেও সে ই সরকারে থাকবে! তার পিছে ছাগল পাগল কারে নিলো, কি নিলো না, তাতে কি বা যায় আসে! তার যেসব পরিকল্পনা, কূটকৌশল, ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের প্লান করেছে, সবি সে বাস্তবায়ন করতে পারবে! তাহলে কি নির্বাচনকালীন সরকার হলে আমরা কোনো বেনিফিট পাবো না? এবসার্ড, কোনো কিছু চেঞ্জ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নাই। বর্তমান বিনাভোটের সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল দু’দিন আগে কি বলেছে, জানেন? ভাই, ‘আমরা তো দম দেয়া পুতুল মাত্র, আমাদের কোনো ক্ষমতা নাই্। ড্রাম-ফ্যাক্টরি থেকে যা হুকুম আসে, কেবল সেটাই আমরা বাস্তবায়ন করি মাত্র। আর ঐ ড্রাম ফ্যাক্টরি চলে উত্তরা বাতাসে। ওখান থেকে যে বাও আসে সেইমত হুকুম জারি হয়। আমরা শুধু তামিল করি মাত্র!’ কিছু কি বোঝা গেলো?

দৃশ্যপট তিনঃ
তাহলে ইলেকশন শিডিউল ঘোষণা দিলে আমরা কি নামতে পারব? ওয়েল, ইট ডিপেন্ডস- আপনি কি করতে চান, কতটুকু প্রস্তুতি, ক’দিন সময় পাবেন, তার উপর নির্ভর করবে। আচ্ছা, শিডিউল ঘোষণা দিলে কয়দিন সময় পাওয়া যাবে? ইসি নাকি বলে দিয়েছে ২৭ ডিসেম্বর ইলেকশন! আরে নাহ্, ওটা ছিল একটা রাবিশ মাল বয়ান! তাহলে হিসাবটা কি? শুনুন তবে ____৫ জানুয়ারীর ভুয়া সংসদ বসেছিল ২৯ জানুয়ারী ২০১৪, সংখ্যা মোতাবেক ৫ বছর পরে আগামী বছর ২৮ জানুয়ারী শেষ হবে এর টার্ম। সংবিধান অনুসারে তার ৯০ দিন আগে ইলেকশন করতে হবে। এই নব্বই দিনের মধ্যে যেকোনো দিন ইলেকশন করা যাবে। এটা সিইসির এখতিয়ার। তাহলে ২৮ অক্টোবর থেকে ২৮ জানুয়ারী হলো টাইম ফ্রেম। এখন যদি বলা হয়, আজ শিডিউল ঘোষণা করলাম ৩০ অক্টোবর নির্বাচন, বা যদি বলা হয় ২০ জানুয়ারী নির্বাচন? হিসাবগত বা আইনগত কোনো সমস্যা নাই। ঐ ৯০ দিনের মধ্যে হলেই হলো। এখন বেসিক প্রশ্ন____শিডিউল ঘোষণার দিন থেকে ইলেকশন ডেট অবধি কয়দিন সময় পাওয়া যাবে? এটা ৩০/৩৫ দিন সময় লাগে। শিডিউল ঘোষণা করে বলা হয় ৫/৬ দিন পরে নমিনেশন পেপার তোলা যাবে, এরপরে ৭ দিনের মত সময় পাওয়া যাবে প্রত্যাহার বাছাই, তারপর ২ সপ্তাহের মধ্যে নির্বাচন। ব্যালট পেপার ছাপার উপর নির্ভর করে এটা ৩ সপ্তাহ লাগতেও পারে। মোটামুটি এই হলো হিসাব। তাহলে কি দাড়ালো? যদি ডিসেম্বরের শেষে ভোটের দিন ঠিক করা হয়, তবে নভেম্বরের মধ্যখানে বা শেষ সপ্তাহে শিডিউল ঘোষণা করবে। আর যদি জানুয়ারীর মাঝামাঝি ভোট হয়, তবে শিডিউল চলে যাবে ডিসেম্বরে! তাহলে সরকার তথা আম্লীগ কি চায়? তারা চায়, যত কম সময় দিয়ে নির্বাচনটা করা যায়। তাহলে ঐ অল্প সময়ে বিরোধী দল প্রার্থী দিবে, নাকি নিরপেক্ষ সরকার চাইবে, সিইসি বদল চাইবে- মাঠ গরম করবে? আর এদেশের একটা ট্রেন্ড হলো- নির্বাচন ঘোষণা হলে আর আন্দোলন হয় না (কেবল এর ব্যতিক্রম আ’লীগ, তারা ২০০৬-৭ সালে শিডিউল ঘোষণার পরেও আন্দোলন করে নির্বাচন বানচাল করেছিল!)

দৃশ্যপট চারঃ
বর্তমান অবস্থায় সরকার চাইবে- নির্বাচনের জন্য যত কম সময় দেয়া যায়, তাতে আন্দোলন সংগ্রামের রিস্ক কমে। তার মানে এখন যেভাবে বলা হচ্ছে, অক্টোবরে শিডিউল ঘোষণা করবে, আসলে হয়ত সেটা করবে না, খুব অল্প সময় দিয়ে কাজটা সেরে ফেলতে চাইবে। আরেকটি বিষয় আছে, সরকার চাইল- কোনো শিডিউলই দিব না, তাহলে আর আন্দোলন হবে না। বরং সময় নিয়ে ধরপাকড় করে জেলখানা ভরা যাবে! তাহলে কি করবে? নিজেরাই কয়েকটা বড় বোমাবাজির ঘটনা ঘটিয়ে অথবা একটা ঝড় হলো সিইসিকে বলবে – নির্বাচন পিছিয়ে দিন সংবিধানের ১২৩(৪) মোতাবেক। তাহলে সেটা এপ্রিলের ২৮ তারিখ পর্যন্ত পিছিয়ে দিতে পারবে। এভাবে প্রায় ৬ মাসের বেশি সময় পেয়ে গেলো। তখন আরাম আয়েশ করে ধরপাকড় থেকে মনে যত খায়েশ আছে সবই করলো!

দৃশ্যপট পাঁচঃ
আচ্ছা, টাইম যখন পাচ্ছিনা, তাহলে আন্দোলনই করলাম না। নির্বাচনেই গেলাম সবাই। তাহলে কি পারব? উত্তর হচ্ছে, সরকার তাদের লোকজন সব সেট করেছে নির্বাচন কর্মকর্তা থেকে পুলিশ, র্যাব, আনসার, বিজিবি, এমনকি মিলিটারীরর স্ট্রাইকিং ফোর্স। সাথে আছে ভোট-কাটার জন্য ভুয়া পুলিশ, ও ছাত্রলীগ যুবলীগ আওয়ামীলীগ! রিটার্নিং অফিসাররা সবই দলীয়, রেডি থাকবে সন্ধ্যা হলেই ফল পাঠানোর জন্য, সেটা ভোট হোক বা না হোক। কাটাকাটি হোক, নামকা ওয়াস্তে ভোট হোক, একটা ফল ঘোষণা করতে পারলেই হলো- তাহলে আর সরকার গঠন ঠেকায় কে? আগামী ৫ বছর করে, ২০২১ বা ৪১ বা শতবের্ষের খেপ!

দৃশ্যপট ছয়ঃ
তাহলে কি এই দুষ্টচক্র ভাঙা যাবে না? তা করতে হলে সব ভোটারদের যেতে হবে ভোটকেন্দ্রে। ভোট দিয়ে ঘেরাও করে রাখতে হবে কেন্দ্র। ফল ঘোষণা করাতে হবে ৪০ হাজার ভোটকেন্দ্রে মধ্যে বেশীরভাগে। তারপরে রিটার্নিং অফিসারকেও ঘেরাও করতে হবে- যাতে ভুয়া রেজাল্ট তারা কেন্দ্রে না পাঠাতে পারে। এছাড়াও ইলেকশন কমিশনকে ঘেরাও করে আটকে ফেলতে হবে- সঠিক ফলাফল প্রকাশ করতে বাধ্য করতে। এত কিছু কি সম্ভব? উত্তরটা নিশ্চয় জানা আছে সবার। তাহলে বিকল্প কি রইল?
বিকল্প হচ্ছে, শেখ হাসিনার বর্তমান সরকার ও নুরুল হুদার নির্বাচন কমিশনকে পদত্যাগে বাধ্য করা, এবং একটি নিরপেক্ষ সরকার ও নতুন কমিশন গঠন করে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড সৃষ্টি করে নির্বাচন অনুষ্ঠান করা। এটা কি আদৌ সম্ভব? নিশ্চয় সম্ভব। এছাড়া আরও অস্বাভাবিক ও অসাংবিধানিক বিকল্প আছে, তা নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নাই। অস্বাভাবিক কিছু সব সময়ই ঘটতে পারে। অতীতে এর বহু উদাহরন আছে।

দৃশ্যপট সাতঃ
তাহলে এখন উপায় কি? সরকার কবে সুযোগ দিবে, টাইম দিবে তারপরে মাঠে নামব? না, মোটেই তা নয়। নিজেদের পরিকল্পনা অনুযায়ী আন্দোলন সংগ্রাম শুরু করে দিতে হবে। তাতে মারামারি বা ক্যাজুয়াল্টি হতে পারে। আবার সব দল ও জোট একত্র হয়ে নামতে পারলে সরকারের পেটোয়া বাহিনী হামলা করতে সাহস পাবে না, বা লড়াইয়ে কুলাতে পারবে না। সেই সংগ্রাম সফল হবে। তবে হ্যা, এর মধ্যে কিছু সমস্যাও আছে, জোটের মাথা কেনাবেচা হতে পারে, স্যাবোটেজ হতে পারে, খুন গুম ধরপাকড় ভয়ভীতি ছড়াতে পারে। এসব কিছু হিসাব কিতাব করেই বিরোধী জোটগুলো সঠিক সময়ে তাদের কর্মসূচি ঠিক করবে। এরজন্য কোনো উপদেশের দরকার নাই। তারা এগুলা নিজেরাই জানে।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.