অস্ট্রেলিয়ান সংসদে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা

গত ১৩ আগস্ট ২০১৮ তারিখ সোমবার অস্ট্রেলিয়ান সংসদের উচ্চকক্ষ সিনেটের অধিবেশন চলাকালে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন প্রসঙ্গে সংসদীয় অধিবেশনের নিয়মিত আলোচনা চলাকালে সিনেটর রিচার্ড ডি নাটালির একটি নিন্দা প্রস্তাব উত্থাপনের পেক্ষাপটে এ আলোচনা উঠে আসে। এ আলোচনায় বাংলাদেশের সাম্প্রতিক মানবাধিকার পরিস্থিতি এবং ভয়াবহ সরকারী জেল-জুলুমের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হয়।

সিনেটর ডি নাটালি তার বক্তব্যে বলেন, “বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে গত কয়েক মাসে একশরও বেশি মানুষ হত্যা করার বিভিন্ন খবর এবং প্রতিবেদন প্রসঙ্গে গ্রীনস অত্যন্ত শঙ্কিত। অস্ট্রেলিয়ান-বাংলাদেশী কমিউনিটির লোকজন তাদের ভীতির বিষয়টি সরাসরি আমাদের কাছে তুলে ধরেছে। তারা চায় যেন আমরা এ বিষয়টি আমাদের সংসদে উত্থাপন করি। এ বিষয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের আহবানটি আমরা এখানে পুনরায় তুলে ধরছি যেখানে তিনি বলেছেন বিচারবহির্ভূত হত্যা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে এবং এখনই বন্ধ করতে হবে। বাংলাদেশের আঞ্চলিক প্রতিবেশী হিসেবে, আমি আশা করবো আমাদের সরকার কিছুটা সাহস দেখাবে, যথাযথ বিচার প্রক্রিয়াকে উৎসাহিত করবে, রাজনৈতিক বন্দীদের দ্রুত মুক্তির জন্য আহবান জানাবে এবং এই অঞ্চলে চলমান মানবিক সংকটের সমাধানে বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করবে।”

এ প্রস্তাবে তার সাথে সমর্থনকারী হিসেবে এনএসডব্লিউ’র সিনেটর লী রিয়াননের নামও অন্তর্ভূক্ত ছিলো। এমতাবস্থায় লিবারেল নেতা এবং কুইনসল্যান্ডের সিনেটর জেমস ম্যাকগ্রাথ এ নিন্দা প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করার বিরোধিতা করেন সিনেটর ম্যাকগ্রাথ সংক্ষিপ্তভাবে বলেন, বিগত সময়ের অস্ট্রেলিয়ান সরকারসমুহ যে ধরণের দীর্ঘমেয়াদী দৃষ্টিভঙ্গী বজায় রেখে আসছে তার আলোকে এই ধরণের জটিল একটি বৈদেশিক নীতিসংক্রান্ত বিষয়ে ভোট প্রদান করা কিংবা মত প্রকাশ করা এখনই উচিত হবে না। তার আগে বিস্তারিত ও পুংখানুপুংখ আলোচনা এবং তদন্তের মাধ্যমে বিষয়টির গুরুত্ব এবং যথার্থতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

বিষয়টি অস্ট্রেলিয়ান সংসদের ওয়েবসাইটে আর্কাইভ নথিভুক্ত করা হয়। এতে দেখা যায়, এদিনের ৯২৭ নাম্বার সিরিয়ালের এ প্রস্তাবে বাংলাদেশে সরকারী বাহিনীর হাতে সাধারণ মানুষ হত্যা, বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রসঙ্গে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের বক্তব্য, সরকারী বাহিনীর হাতে হয়রানি এবং উগ্রপন্থীদের উত্থান বিষয়ক হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বক্তব্য এ তিনটি প্রসঙ্গ উল্লেখ করে অস্ট্রেলিয়ান পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তিনটি দাবী জানানো হয়- যেন তিনি বাংলাদেশ সরকারকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া অবলম্বন করে একটি সুষ্ঠ এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানে উৎসাহিত করেন, চলমান মানবাধিকার সংকট সমাধানে সহায়তা করেন এবং সকল রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে আহবান জানান।

অস্ট্রেলিয়ান সংসদীয় প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক কার্যপ্রণালী অনুযায়ী এ প্রস্তাবের আলোচনা এদিনের জন্য এখানেই সমাপ্ত হলেও এটি একটি গুরুত্ববহ ঘটনা এবং এর সুদূরপ্রসারী ফলাফল রয়েছে। পার্লামেন্ট অফ অস্ট্রেলিয়ার সরকারী ওয়েবসাইটে এ বিষয়টি নথিভুক্ত হয়ে আছে এবং পরবর্তী যে কোন আলোচনায় এটি একটি রেফারেন্স পয়েন্ট হিসেবে কাজ করবে। এ ঘটনায় আরো পরিস্কার হয়ে পড়ে যে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে চলমান ফ্যাসিবাদী শাসন ও দমন-নিপীড়নের বিষয়গুলো ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রকাশ পেয়ে যাচ্ছে এবং তা বাংলাদেশের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ করছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারের ক্ষমতা দখল করে রাখার জন্য চালানো সকল অপকর্মের কারণে বাংলাদেশ বহিঃবিশ্বে এখন একটি মানবাধিকারহীন ও অগণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার দেশ হিসেবে কুখ্যাতি অর্জন করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের গুম-খুন এবং অন্যায় গ্রেফতারের ঘটনাগুলো বর্তমানে পুরো বিশ্বে সুবিদিত একটি বিষয়।

সিনেটর ডি নাটালি তাঁর বক্তব্যে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের যে রিপোর্টের কথা উল্লেখ করেছেন তার খোঁজ করতে গিয়ে ওএইচসিএইচআর বা অফিস অফ দ্য হাই কমিশনার, ইউনাইটেড নেশনস হিউম্যান রাইটসের ওয়েবসাইতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায় সেখানে সরাসরি ভাষায় উল্লেখিত আছে, হিউম্যান রাইটস কমিটি বাংলাদেশে পুলিশ এবং র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটেলিয়ান সদস্যদের দ্বারা সংঘটিত বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনার উচ্চহার এবং গুম করার খবর নিয়ে শংকিত। তারা মনে করে, রাষ্ট্রীয় বাহিনীগুলোর মাধ্যমে বাংলাদেশে অতিরিক্ত শক্তিপ্রয়োগের ঘটনা ঘটছে। এছাড়াও তাদের মতে, যথাযথ তদন্ত না হওয়াতে এবং অপরাধীদের জবাবদিহীতা না থাকাতে ভিকটিম পরিবারগুলো কোন তথ্য এবং সহায়তা পাচ্ছে না। উপরন্তু গুমের ঘটনাগুলোর কার্যকর সমাধানে কোন উপযুক্ত আইন নেই এবং গুমের ঘটনাগুলো সরকার অস্বীকার করে যাচ্ছে যা একটি আশংকার বিষয়। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিশনের এ রিপোর্ট সম্পর্কে খোঁজখবর করতে গিয়ে দেখা যায় আলজাযিরা সহ একাধিক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশের মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক পরিস্থিতি নিয়ে এহেন নেতিবাচক আলোচনা কেবলমাত্র অস্ট্রেলিয়াতেই নয়, বরং আমেরিকা সহ ইউরোপীয় ইউনিয়নের নানা দেশেই আনুষ্ঠানিকভাবে আরম্ভ হয়ে গিয়েছে। স্বৈরাচারী শাসনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে প্রিয় মাতৃভূমি সম্পর্কে বিশ্বজুড়ে সরকারী পর্যায়ে এধরণের নেতিবাচক আলোচনা যে কোন প্রবাসীকেই ব্যাথিত করছে। উপরন্তু অনেকে মনে করছেন, বাংলাদেশে যখন স্বাধীন মতপ্রকাশের সকল উপায় রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে এমন নিবর্তনমূলক পরিবেশের পরিবর্তন ঘটানোর জন্য এবং দেশে গণতান্ত্রিক অধিকারের পুনরুদ্ধারের জন্য আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগের প্রয়োজন। এ উদ্দেশ্যে তারা অস্ট্রেলিয়ান সিনেটর ডি নাটালির এ সাহসী এবং মানবদরদী উদ্যোগকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন এবং সমর্থন জ্ঞাপন করছেন।

/সুপ্রভাত সিডনি

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.