বিএনপির জনসভা জনসমুদ্র

মহাসমাবেশ থেকে চার দাবী-
– তফসিলের আগেই সরকারের পদত্যাগ,
– খালেদা জিয়ার মুক্তি,
– নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন,
– নির্বাচনে সেনা মোতায়েন

নয়াপল্টনে আয়োজিত বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর জনসভা জনসমুদ্রে পরিণত হলো। আশেপাশের সব এলাকা ছিল লাখ লাখ নেতা কর্মীর পদভারে প্রকম্পিত।
সমাবেশ থেকে বৃহত্তর ঐক্যের ডাক দিয়েছে বিএনপি। সমাবেশে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই ডাক দিয়ে বলেছেন, ‘এখন আর বিভেদ নয়, গণতন্ত্র রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। দেশ রক্ষায় বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। আমাদের বুকের ওপর যে দুঃশাসন চেপে বসেছে তাদেরকে পরাজিত করতে হবে।’ বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শনিবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনের সড়কে আয়োজিত জনসভায় সভাপতির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অবিলম্বে বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি চেয়ে তফসিল ঘোষণার আগেই শেখ হাসিনা সরকারের পদত্যাগ দাবি করেছে বিএনপি। শনিবার বিএনপির ৪০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নয়াপল্টন বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে আয়োজিত বিশাল জনসভায় দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এই দাবি জানান। সমাবেশে বিএনপি নেতৃবৃন্দ বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াসহ সকল রাজবন্দির মুক্তি দিতে হবে এবং তফসিল ঘোষণার আগেই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে। জাতীয় সংসদকে ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে এবং নির্বাচনের সময় সামরিক বাহিনীকে দায়িত্ব দিতে হবে।

সভা শুরুর আগেই সকাল থেকে দলের নেতাকর্মীরা নয়াপল্টন ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান নেয়। লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে পুরো এলাকা। সমাবেশ শুরুর আগে দুপুর ১২টার মধ্যেই সমাবেশ স্থল কানায় কানায় ভরপুর হয়ে যায়। ১২টার পর থেকে আশপাশের এলাকায় জড়ো হতে থাকেন নেতাকর্মীরা। দুপুরের আগেই ফকিরের পুল থেকে শুরু করে কাকরাইল পর্যন্ত লম্বা সড়কটি যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। সমাবেশ শুরুর আগেই নয়াপল্টনে জনতার ঢল নামে। এ সময় নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপির সমাবেশে নেতাকর্মীদের বিপুল উপস্থিতি সমাবেশের সীমানা পেরিয়ে যায়। বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সীমানা ছাড়িয়ে সমাবেশ ছড়িয়ে পড়ে আশেপাশের এলাকায়। নয়াপল্টনসহ আশপাশের অলিগলিতেও অবস্থান নেয় হাজার হাজার নেতা-কর্মী। এছাড়া পল্টন মোড় থেকে কাকরাইল মোড়, সেগুনবাগিচাসহ অলিগলি ভরে যায় নেতা-কর্মী সাধারণ মানুষের অংশগ্রহনে। বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ব্যানার হাতে হাজার হাজার নেতা-কর্মী-সমর্থকের মিছিলে মিছিলে সমাবেশ জনসমুদ্রে রূপ নেয়। নেতা-কর্মীরা ‘আমার নেত্রী, আমার মা, বন্দি থাকতে দেবো না’, ‘খালেদা জিয়াকে বন্দি রেখে নির্বাচন হতে দেয়া হবে না’ ইত্যাদি স্লোগান দিতে থাকে। কেউ কেউ ব্যান্ড বাজান, দলীয় সঙ্গীত গান। সকাল থেকেই মিছিলে মিছিলে সমাবেশে স্থলে যোগ দেয় হাজার হাজার নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষ। ঢাকার আশপাশের জেলা গাজীপুর, নরসিংদী, মানকিগঞ্জ, নারায়নগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জসহ বিভিন্নস্থান থেকে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতা-কর্মীরা জনসভায় যোগ দেন। :  বেলা আড়াইটার দিকে নয়াপল্টন ও তার আশেপাশের এলাকা ঘুরে দেখা যায়, কাকরাইল মোড় থেকে শান্তিনগর এলাকা, পুরানা পল্টন, ফকিরেরপুল মোড় থেকে মতিঝিল এলাকা,  দৈনিক বাংলা মোড়, বিজয়নগর এলাকা, সেগুনবাগিচা এলাকা, রাজারবাগ এলাকাতেও নেতাকর্মীদের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। সমাবেশ ঘিরে সতর্ক অবস্থানে ছিল আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
সমাবেশে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল বলেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে এ দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে, নিরপেক্ষ সরকার গঠন করতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, সেনা মোতায়েন করতে হবে। এ ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হবে না, জনগণ হতে দেবে না।

খালেদা জিয়াসহ কারাগারে থাকা বিএনপির নেতাকর্মীদের অবিলম্বে মুক্তির দাবি জানিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি নেত্রীর বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা বাতিল করতে হবে। তারেক রহমানের বিরুদ্ধে সব মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। ফখরুল বলেন, তারেক রহমানকে নিয়ে আবার ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তাঁকে সাজা দিতে চাইছে। রায়ের আগে আইনমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলে দিচ্ছেন, এ মামলায় তারেক রহমানের সাজা হবে। তাহলে কি আপনারা আগেই গণভবনে রায় লিখে রেখেছেন। মনে রাখবেন, কোনো ষড়যন্ত্রের রায় দেশের জণগন মেনে নিবে না।
তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সবসময় আতঙ্কে থাকে। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ মনে করে এই যে বিএনপি আইলো, এই যে তারেক রহমান আইলো।
আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারে সরকারের পরিকল্পনার প্রতিবাদ জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘সরকারের মধ্যে এখন বিএনপিভীতি কাজ করছে। এই ভীতি থেকে বাঁচার জন্য তারা ইভিএম নিয়ে আসছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, আজ আমাদের সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে, সব রাজনৈতিক দল, সংগঠনকে নিজ নিজ অবস্থান থেকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এ সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। জনগণের দাবি আদায় করতে হবে। অপশাসনকে পরাজিত করতে হবে। জাতিকে মুক্তি দিতে হবে।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে মহাসচিব বলেন, আমাদের আজ বুকে সাহস নিয়ে, বুকে বল নিয়ে ঘুরে দাঁড়াতে হবে। খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে। গণতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনতে হবে। তাই আমাদের ঘুরে দাঁড়াতে হবে। আজকের জনসমুদ্র প্রমাণ করেছে আজ বাংলাদেশ আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বুকের রক্ত দিতে হবে, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে, দেশকে মুক্ত করতে হবে। যারা দেশের জন্য, গণতন্ত্রের জন্য জীবন দিয়েছে, তাদের রক্ত ছুয়ে শপথ নিতে হবে আমরা দেশের গণতন্ত্রকে মুক্ত করব, খালেদা জিয়াকে মুক্ত করব।

জনসভায় প্রধান অতিথি ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। জনসভায় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ বাকশাল প্রতিষ্ঠা করে দেশে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি করেছিল। জিয়াউর রহমান রাজনৈতিক শূন্যতা দূর করতে বিএনপি গঠন করেছিলেন। আওয়ামী লীগ বাকশাল গঠন করে গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, জিয়াউর রহমান গণতন্ত্র ফিরিয়ে এনেছেন। তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ ১৯৭৪ সালে দেশে দুর্ভিক্ষ তৈরি করে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি বানিয়েছিল, আর জিয়াউর রহমান দেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে উন্নয়নশীল দেশে পরিণত করেছিলেন। সে জন্য আওয়ামী লীগ বিএনপিকে ভয় পায়, জিয়া পরিবারকে ভয় পায়। বিএনপির প্রবীণ নেতা মোশাররফ হোসেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উদ্দেশে বলেন, আপনারা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে অতীতের কথা ভুলে নিরপেক্ষ হয়ে যান। জনগণের পক্ষে অবস্থান নিন। কোনো একটি দলের হয়ে কাজ করবেন না।

সমাবেশে উপস্থিত ছিলেন- দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস-চেয়ারম্যান রুহুল আলম চৌধুরী, আলতাব হোসেন চৌধুরী, জয়নুল আবদিন, বেগম সেলিমা রহমান, শামসুজ্জামান দুদু, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা আমান উল্লাহ আমান, আব্দুস সালাম, হাবিবুর রহমান হাবিব, তৈয়মুর আলম খন্দকার, ফরহাদ হালীম ডোনার, সিনিয়র যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, যুগ্ম-মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দীন খোকন, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল, খায়রুল কবির খোকন, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানী, বিএনপির সমাজকল্যাণ বিষয়ক সম্পাদক কামরুজ্জামান রতন, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক অ্যাড. মাসুদ আহমেদ তালুকদার, প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক এবি এম মোশাররফ হোসেন, ক্রীড়া বিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম, সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল আউয়াল খান, সহ-যুব বিষয়ক সম্পাদক মীর নেওয়াজ আলী নেওয়াজ, তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সহ-সম্পাদক আমিরুজ্জামান খান শিমুল, নির্বাহী কমিটির সদস্য নাজিম উদ্দীন আলম, আবু নাসের মোহাম্মাদ রহমাতুল্লাহ, কামরুল ইসলাম সজল, মো: মতিন, ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি ডা: দেওয়ান মো: সালাউদ্দীন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কাজী আবুল বাশার, সহ-সভাপতি নবী উল্লাহ নবী, যুবদলের সভাপতি সাইফুল আলম নীরব, মহিলা দলের সভাপতি আফরোজা আব্বাস, সাধারণ সম্পাদক সুলতানা আহমেদ, সিনিয়র যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক হেলেন জেরীন খান, যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি মোর্তাজুল করিম বাদরু, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি শফিউল বারী বাবু, সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ভূইয়া জুয়েল, সহ-সভাপতি গোলাম সরোয়ার, মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি ইশতিয়াক আজিজ উলফাত, সাধারণ সম্পাদক সাদেক খান, শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সভাপতি এস এম জাহাঙ্গীর ও দক্ষিণের সভাপতি রফিকুল আলম মজনু প্রমুখ।

 

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.