ইতিহাসের পাতা খুলবেন, নাকি তাকিয়ে তাকিয়ে কেবল শোক দিবসের নামে ন্যাকামি দেখবেন?

আজ ১৫ আগস্ট। বাংলাদেশের প্রবীণ রাজনৈতিক দল আওয়ামীলীগের জাতীয় শোক দিবস। ১৯৭৫ সালের এইদিনে সেনাবাহিনীর একাংশের সফল অপারেশনে সপরিবারে নিহত হন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ও বাকশাল চেয়ারম্যান শেখ মুজিবুর রহমান। আসলে মৃত্যুকালে তিনি আওয়ামীলীগের কেউ ছিলেন না। কেননা তার সাত মাস আগেই তিনি নিষিদ্ধ করেছিলেন বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ নামক দলটি!

এই দিনের বদৌলতে আগস্ট মাস এলেই যেমন ‘শোকের মাস শোকের মাস. বলে দেশের মানুষকে জোর করে কাঁদানোর অপচেষ্টা হয়, সাথে সাথে মানুষের বিয়ে সাদী জন্মদিন আনন্দ ফুর্তি সবকিছু বন্ধ হয়ে যায়। একই সাথে রেডিও টেলিভিশন কাঁপানো শুরু করে দেয় একশ্রেণীর বক্তা, যাদের অনেকের ইতিহাস বড়ই বিপরীত রকমের। কিন্তু সাধারন মানুষ ভেবে পায় না কোনটা ঠিক- ৭৫ সালে তাদের অবস্থা, নাকি এখনকার হাল! এমনসব ব্যক্তিবর্গকে এখন গ্লিাসারিন কান্নায় বুক ভাসাতে দেখা যায়, যারা সেইদিনে শেখ মুজিবকে হত্যার পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল, কেউ আবার ঘটনার পরে সুর্যসন্তানদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামীলীগকে দেখা যায়, ঐসব নব্য দরদীদের প্রতি পরিবর্তিত আচরণ। বর্তমান বিনাভোটের সরকারের আইনমন্ত্রী আনিসুল হক দু’দিন স্বগোতোক্তি করেন- আওয়ামীলীগের একটি অংশই শেখ মুজিবকে হত্যা করেছিল।

তাহলে ১৫ আগস্ট কি শোকের দিন, নাকি কারও কারও আখের গুছানোর দিন? আসুন কয়েক ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক:

হাসানুল হক ইনু:
৭২-৭৫ পিরিয়ডে শেখ মুজিবের দুঃশাসনের সময় হাসানুল হক ইনু ছিলেন জাসদের কিলিং সংগঠন গণবাহিনীর পলিটিক্যাল কমিশনার, যাদের কাজ ছিল সারা দেশে মানুষ হত্যা করে ত্রাস সৃষ্টি করা। জাসদের মুল লক্ষ্য ছিল পুজিবাদীদের হঠিয়ে অস্ত্রের মুখে ক্ষমতা দখল করা। মুজিবের আজীবনের ক্ষমতার স্বপ্ন পূরণের লক্ষে রক্ষী বাহিনী নামিয়ে হত্যা নির্যাতনের মাধ্যমে বিরোধী মত দমনে প্রবৃত্ত হলে তাদের প্রতিহত করতে অবসরপ্রাপ্ত লে.কর্নেল তাহের ও ইনুর সমন্বয়ে গড়ে তোলে জাসদের সামরিক শাখা গণবাহিনী। এই গণবাহিনীর কাজ ছিল শেখ মুজিবের লোকদের শ্রেণীশত্রু আখ্যায়িত করে তাদের হত্যা করা। জাসদের সেই গণবাহিনী ইনুর জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার এখনো এক আতঙ্কের নাম। ১৯৭২ সাল থেকে শুরু করে শেখ হাসিনার মন্ত্রী হওয়ার আগ পর্যন্ত ইনু কোনোদিন শেখ মুজিবকে ‘বঙ্গবন্ধু’ বলে সম্বোধন করেনি। শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর ইনু ট্যাঙ্কের উপর চড়ে ঢাকা শহরে উল্লাস করে বেড়িয়েছিল, একথা সকলেই জানে। মুজিব হত্যার পরে ইনু একটি বিদেশি মিডিয়াকে ইংরেজিতে সাক্ষাতকার দিয়ে শেখ মুজিবকে একজন খুনী এবং স্বৈরাচার হিসাবে আখ্যা দেন। ১৫ আগস্টে শেখ মুজিবের হত্যার পরে ইনু কর্নেল তাহেরকে নিয়ে যান রেডিওতে, যেখানে খোন্দকার মোশতাকের সাথে সিরিজ বৈঠক করেন। তারা অভ্যুত্থানের প্রতি পূর্ন সমর্থন জানান। সম্প্রতি আওয়ামীলীগের একাধিক নেতা প্রকাশ্যে বলেছেন, ইনুরাই দেশজুড়ে হত্যাকান্ড ও তান্ডব চালিয়ে মুজিব হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। অথচ সেই ইনু গত দু’টার্ম ধরে শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার গুরুত্বপূর্ন মন্ত্রী হয়ে ’বঙ্গবন্ধু’ জপতে জপতে মুখে তুবড়ি ছোটান! মন্ত্রী হওয়ার জন্য তার একমাত্র্র যোগ্যতা- প্রতিদিন সকাল বেলা উঠে বিএনপি, শহীদ জিয়া ও খালেদা জিয়াকে গালাগালি করা, আর তাতেই খুশি শেখ হাসিনা!

মতিয়া চৌধুরী:
ইনুর মতই মতিয়া চোউধুরীও ছিল বামপন্থী ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী, যিনি শেখ মুজিব হত্যার ক্ষেত্র প্রস্তুতকারীদের অন্যতম। মতিয়া শেখ মুজিবের চামড়া দিয়ে ডুগডুগি বাজানোর ঘোষণা দিয়ে নাম কামিয়েছিলেন মতিয়া। কালের বিবর্তনে সেই মতিয়া এখন শেখ হাসিনার কৃষি মন্ত্রী এবং ১৫ আগস্ট নিয়ে শোক পালনকারীদের একজন!

কর্নেল তাহের:
জাসদের গণবাহিনীর প্রধান লে. কর্নেল (অব.) তাবু তাহের, যিনি ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের আগে থেকেই এর সাথে জড়িত ছিলেন। শেখ মুজিবকে হত্যার পরে রেডিওতে গিয়ে এবং পরে বঙ্গভবনে থেকে অভ্যুত্থানকারীদেরকে নানা পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেছিলেন, শেখ মুজিবের লাশ দাফন না করে সাগরে ফেলে দিতে। লেখক মহিউদ্দিন আহমেদ এ প্রসঙ্গে লিখেছেন, “তাহের আক্ষেপ করে নঈমকে বললেন, ওরা বড় রকমের একটা ভুল করেছে। শেখ মুজিবকে কবর দিতে অ্যালাও করা ঠিক হয়নি। এখন তো সেখানে মাজার হবে। উচিত ছিল লাশটা বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেয়া।” এখন মুজিব কন্যা সেই তাহেরকে নবরূপে মান মর্যাদা দেয়ার চেষ্টা করেছেন, কারন তাতে করে জিয়াউর রহমানকে গালিগালাজ করা যাবে, তাই!

আনোয়ার হোসেন:
কর্নেল তাহেরের বড় ভাই আনোয়ার হোসেন ১৯৭৫ সালে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের লেকচারার। অন্যদিকে তিনি ছিলেন জাসদের সামরিক সংগঠন বিপ্লবী গণবাহিনীর ঢাকা নগরের কমান্ডার, যার হাতে নিহত হয়েছে বহু মানুষ। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট শেখ মুজিবের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আগমন ঠেকাতে এই আনোয়ার হোসেনরা ব্যাপক বোমাবাজি করেছিল। সেই খুনি বোমাবাজ আনোয়ারকে শেখ হাসিনা বানায় জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর। আওয়ামীপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী প্রগতিশীল শিক্ষক সমাজ’ এক সংবাদ সম্মেলনে আনোয়ারকে অপসারণ করার দাবী জানিয়ে বলে, ‘বঙ্গবন্ধু সরকারকে উৎখাতের উন্মাদনায় মেতে উঠেছিলেন আনোয়ার। একই সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডের পর অধ্যাপক আনোয়ার ট্যাংকের ওপর দাঁড়িয়ে খুশিতে নেচেছিলেন।’

খালেদ মোশাররফ:
১৯৭৫ সালে অভ্যুত্থানের সময় ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ছিলেন সেনাবাহিনীর সিজিএস, যিনি ছিলেন আর্মির নাইট প্যারেড তথা ট্যাংক বের করার অনুমতি প্রদানের অথরিটি। কর্নেল ফারুক ছিলেন তারই ভাগিনা। ১৫ আগস্টের আগেও মেজর ফারুক বিভিন্ন সময়ে শেখ মুজিবকে হত্যা করার চেষ্টা করে ধরা পড়লে খালেদ মোশাররফ ভাগ্নেকে বাঁচিয়ে দেন, এর একটি চমৎকার বর্ণনা আছে মেজর নাসিরের বইতে। ১৫ আগস্ট রাতেও খালেদ মোশাররফের অনুমতিতেই ট্যাংক নিয়ে বের হয়েছিলেন ফারুক রশিদ ডালিমরা, এবং পরে ৩২ নম্বরে গিয়ে শেখ মুজিবকে হত্যা করে। মুজিব হত্যার আড়াই মাস পরে ৩ নভেম্বর ব্রিগেডিয়ার খালেদ মোশাররফ ক্যু করে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দী করে বঙ্গভবনে অবস্থানরত খোন্দকার মোশতাক, এবং (আওয়ামীলীগের ভাষায়) শেখ মুজিবের খুনিদের সাথে দেনদরবার করে নিজে সেনাপ্রধান হন। আপোষের অংশ হিসাবে মুজিব হতায় জড়িত অভ্যুত্থানকারী সকল সেনাঅফিসারকে নিরাপদে বিশেষ বিমানে করে বিদেশে পাঠিয়ে দেন খালেদ মোশাররফ। অবশ্য খালেদ মোশররফ তিন দিনের বেশী টিকতে পারেননি। সেই খালেদ মোশারফের নামে আ’লীগ এখন শিরনি দেয়!

এইচটি ইমাম:
শেখ মুজিব হত্যার পরে তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ছিলেন হোসেন তৌফিক ইমাম। রাষ্ট্রপতি নিহত হবার পরে তার প্রথম দায়িত্ব ছিল নিহত মুজিবের লাশের দাফন কাফনের ব্যবস্থা করা। কিন্তু তিনি তা না করে লাশ সিড়ির নিচে ফেলেই বঙ্গভবনে যান মোশতাক ও তাঁর মন্ত্রিসভার শপথ পাঠ করাতে। সেই এইচটি ইমাম এখন মুজিব কন্যার প্রধান রাজনৈতিক উপদেষ্টা!

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু:
শেখ মুজিব নিহত হবার পরে ইত্তেফাকের সম্পাদক আনোয়ার হোসে মঞ্জু ‘ঐতিহাসিক নবযাত্রা’ শিরোণামে সম্পাদকীয়তে লিখেছিলেন, “দেশ ও জাতির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজন পূরণে গতকাল প্রত্যুষে প্রবীণ জননায়ক খন্দকার মোশতাক আহমেদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনী সরকারের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করিয়াছেন। পূর্ববতী সরকার ক্ষমতাচ্যুত হইয়াছেন এবং এক ভাবগম্ভীর অথচ অনাড়ম্বর অনুষ্ঠানে খন্দকার মোশতাক আহমদ রাষ্ট্রপতি হিসাবে শপথ গ্রহণ করিয়াছেন। মহামান্য রাষ্ট্রপতি ও তাহার নূতন সরকারের প্রতি স্থল, নৌ ও বিমানবাহিনীর অধিনায়কগণ তাহাদের বাহিনীর পক্ষ হইতে অবিচল আস্থা ও আনুগত্য ঘোষণা করিয়াছেন।  …..বাংলাদেশের সাড়ে সাত কোটি মানুষের সত্যিকারের আশা-আকাঙ্খা রূপায়নে খন্দকার মোশতাক আহমদের নেতৃত্বে দেশের সশস্ত্র বাহিনীকে যে আগাইয়া আসিতে হইয়াছে তাহারও কারণ ছিল পূর্ববর্তী শাসকচক্র সাংবিধানিক পথে ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্পূর্ন পথ রুদ্ধ করিয়া রাখিয়া সামরিক বাহিনীর হস্তক্ষেপ অনিবার্য করিয়া তুলিয়াছিল। বাংলাদেশের যে বীর জোয়ানরা দেশমাতৃকার মুক্তির জন্য সাড়ে সাত কোটি মানুষের কাঁধে কাঁধ মিলাইয়া একদিন লড়িয়াছে, রক্ত দিয়াছে, তারা দেশের এ ঘোর দুর্দিনে নিশ্চুপ বসিয়া থাকিতে পারে নাই। জাতির প্রতি, দেশের প্রতি, দেশের নির্যাতিত ও নিপীড়িত জনগণের প্রাতি তাহাদের দায়িত্ব পালন করিয়াছে অকুতোভয় সাহস লইয়া…। সেই আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ঘটনাচক্রে এখন শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার বন ও পরিবেশ মন্ত্রী, আগেও তাকে করেছিলেন যোগাযোগ মন্ত্রী।

মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ:
শেখ মুজিবের নিয়োগ করা অতিবিশ্বস্ত সেনা প্রধান মেজর জেনারেল সফিউল্লাহ গোয়েন্দা মারফত খবর পান শেখ মুজিবের বাড়িতে আক্রমনের খবর। ৩/৪ ঘন্টা সময় পেয়েও তিনি কোনো প্রকারের সাহায্যে এগিয়ে আসেননি। উল্টো ফোনে প্রেসিডেন্ট মুজিবকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পালিয়ে যেতে পরামর্শ দেন। তারপরেই মুজিব বের হয়ে আসেন, এবং নিহত হন। শেখ মুজিব হত্যার পরে পটপরিবর্তনের ফলশ্রুতিতে সেনাপ্রধানের পদ থেকে সফিউল্লাহকে সরতে হয় বটে, তবে মোশতাক সহ পরবর্তী সরকারের আমলে পুরোটা সময় বিদেশে রাষ্ট্রদূতের চাকরি করেন তিনি। সেই সফিউল্লাহকে মজিবকন্যা বানিয়েছেন সংসদ সদস্য এবং সংসদীয় কমিটির চেয়ারম্যান।

এভাবে কেঁচো খুড়তে গেলে সাপ বের হবার ভয়ে হাসিনা ইতিহাসের পাতা ওল্টাতে চান না। কিন্তু জনগন তো ইতিহাস পড়তে জানে। তারা শেখ হাসিনার পালিত এইসব নব্য স্তাবকদের ভাড়ামি শুনতে প্রস্তুত নয়।

 
 
Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.