বাংলাদেশে আবার আসছে ‘ওয়ান ইলেভেন’

চন্দন নন্দী, কলকাতা, আগস্ট ১১, ২০১৮

সাউথ এশিয়ান মনিটর
——————————————————–
পুরো প্রতিবেদনটি নিচে দেয়া হলো –
“কঠোর অবস্থানে হাসিনা, বাংলাদেশে ২০০৭ সালের পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা; কী করবে বিএনপি?”
 
অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগের নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম – একটি নিজস্ব প্রাক-নির্বাচনী জরিপ প্রতিবেদনে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করার প্রেক্ষাপটে এবং ‘সড়ক দুর্ঘটনার’ প্রতিবাদ সামাল দিতে দেরি করে ফেলায় সরকার যে বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তাতে করে বাংলাদেশে ২০০৭ সালের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। সেসময় রাজনীতিকে ‘স্থিতিশীল’ করতে চূড়ান্ত ভূমিকা পালন করেছিল সেনাবাহিনী।
 
সামরিক বাহিনী বল প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখল করবে, এমন কথা বলা হচ্ছে না। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে মেজর বা জেনারেলরা ট্যাঙ্ক বের করে সরকার উৎখাত করবে, এমন দিনও শেষ হয়ে গেছে। ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে নির্ধারিত পার্লামেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য ২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হওয়ার পরও বিখ্যাত দুই বেগম প্রচণ্ড শক্তিতে একে অপরের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ে অবতীর্ণ হন। ফলে যে রাজনৈতিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয় তার অবসান ঘটাতে ২০০৭ সালে সেনাবাহিনীকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছিল। ওই সময় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে সহিংস রাজনৈতিক সঙ্ঘাত এড়াতে সেনাবাহিনীর অধীনে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। সেনাবাহিনী নিশ্চয়তা দানকারীর ভূমিকায় থাকার ফলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২০০৮ সাল শেষ হওয়ার আগেই জাতীয় সংসদ নির্বাচন আয়োজন করতে সক্ষম হয়। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে।
 
আজ আওয়ামী লীগ, অন্তত লীগের অংশবিশেষ, একগুঁয়ে মনোভাব নিয়ে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের পরিবেশ সৃষ্টি, রাষ্ট্রীয় ও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দমনমূলক ব্যবস্থা বন্ধ করাসহ অন্যদের স্থান দিতে পুরোপুরি অস্বীকার করায় আবারো কি নির্বাচন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করার সময় এসেছে? পরিস্থিতি কি ২০০৭ সালের মতো সেনাবাহিনীকে সামনে আসতে বাধ্য ও/বা অনুপ্রাণিত করবে? নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, আরো কিছু প্রয়োজনীয় বিবেচনাও – নির্বাচন স্থগিত করার পক্ষে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র ও ব্রিটেনের অবস্থানের যৌক্তিকতা ভালোভাবেই তুলে ধরবে – যা নির্বাচনকে সহিংসতা, ভীতি প্রদর্শন ও অসদাচরণ থেকে বিরত রাখতে ‘স্বাভাবিক অবস্থা’ ফিরিয়ে আনা বা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য দরকার পড়বে।
 
সাউথ এশিয়ান মনিটর’র সাথে আলাপকালে বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার দেব মুখার্জি স্বীকার করেছেন যে শেখ হাসিনা সরকার ‘ভুল করেছে’ এবং এই সরকার যা করছে তা ঢাকার রাজপথে বিক্ষোভ অবসানে গৃহীত পন্থা এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন ফটোগ্রাফার ও অ্যাক্টিভিস্ট শহিদুল আলমকে স্বেচ্ছাচারী কায়দায় গ্রেফতার করার মাধ্যমে প্রকট হয়েছে, এটা ‘খুবই অন্যায় ও বোকামি।’ অবশ্য দেব মুখার্জি আস্থার সাথে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাচন আয়োজন করবে। কারণ এই সরকার জানে যে তা করা না হলে তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নিন্দার মুখে পড়তে হবে।’ দেব মুখার্জি যদিও বলেছেন, নির্বাচন হবে, তবে তা কখন হবে সে ব্যাপারে তিনি নিশ্চিত নন। ‘আগামী দিনগুলোতে অরাজনৈতিক সেনাবাহিনী কোন ভূমিকা পালন করবে, তা অনুমান করা কঠিন,’ বলেছেন তিনি।
 
বিএনপি’র স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের মতে, এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ কোন পথ বেছে নেবে তা স্পষ্ট না নয়। বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলটির অবস্থান কঠোর হতে থাকায় এবং নির্লজ্জতা প্রকট হওয়ায় একে ‘ঘনিষ্ঠভাবে প্রত্যক্ষ ও পর্যবেক্ষণ’ করা হচ্ছে। গয়েশ্বর রায় বলেন, ‘আমরা বুঝতে পারছি যে আওয়ামী লীগ আমাদের পার্টির জন্য এমন কঠোর অবস্থার সৃষ্টি করছে যেন আমরাও সমানতালে কঠোর হই এবং আমাদেরকে জাতীয় আন্দোলন শুরু করার দিকে ঠেলে দেয়া হচ্ছে।’ দলের নির্বাচনে অংশগ্রহণের ‘জোরালো পক্ষপাতী’ বিএনপির স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যে আমাদের কোর্টে বল ফেলতে চাচ্ছে তা আমার সহকর্মীরা ভালোভাবে জানেন।’ এটা নিয়ে ‘দলের নেতৃত্বের মধ্যে আলোচনা হয়েছে’ বলেও জানিয়েছেন তিনি।
 
আরো পড়ুন : সীমান্তের ওপারে: ঢাকায় বিক্ষোভে হামলার জন্য ছাত্রলীগ ক্যাডারদের দুষলো কলকাতার ছাত্র সমাজ
 
বাংলাদেশের একটি থিঙ্ক ট্যাঙ্কের প্রাক-নির্বাচনী জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ বিপর্যয়ের মুখে পড়বে এবং আসন সংখ্যা দুই অঙ্কের নিম্ন প্রান্তিকে নেমে যেতে পারে – এ কথা হাসিনা জানেন। এরপরও নিরাপদ সড়কের জন্য ঢাকার শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ-পরবর্তী ঘটনাবলীতে দলটির ‘ব্যাখ্যাহীন’ অবস্থান রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের হতবাক করেছে। এখানে উল্লেখ করা ঠিক হবে যে ওয়াশিংটন-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (আইআরআই) ২০১৭ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত এক জরিপে বলেছে, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সার্বিক সমর্থন রয়েছে ৬৬ ভাগ, যার মধ্যে ‘জোরালো সমর্থন’ (৪৫ শতাংশ) এবং ‘কোনোরকম সমর্থন’ (২১ শতাংশ)…’। অবশ্য এই জরিপ হয়েছিল সাম্প্রতিক শিক্ষার্থী বিক্ষোভের অনেক আগে।
 
ঢাকা-ভিত্তিক আরেক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রধানের বক্তব্য অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ নির্বাচনী তফসিলে অটল থাকবে নাকি অনির্দিষ্টকালের জন্য তা স্থগিত করবে, তা অক্টোবরের শুরুতেই পরিষ্কার হয়ে যাবে। এ থেকে পরিষ্কার ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, ক্ষমতাসীন দলটি তার রাজনৈতিক-নির্বাচনী কার্ডটি খেলবে ঈদ উৎসব শেষ হওয়ার পর। ওই থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রধান বলেন, বিএনপি জাতীয় আন্দোলন শুরু করতে পারে। যদিও দলটি জানে যে এ ধরনের দীর্ঘ মেয়াদি কর্মসূচি সফল করার মতো প্রয়োজনীয় শক্তি তার নেই। এ অবস্থায় আওয়ামী লীগকে তার নিজের ও বাংলাদেশের ভালোর জন্য বর্তমান অচলাবস্থা নিরসনের একটি পথ বের করতে হবে বলে জোর দিয়ে উল্লেখ করেন তিনি।
 
ঘরোয়া রাজনীতির আগ্রহী পর্যবেক্ষক, পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাবেক জেনারেল বলেন, আওয়ামী লীগের ‘জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার’ প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীন দলটি পরিস্থিতি সামাল দিতে দুটি পথ ধরতে পারে। প্রথমত, নির্দিষ্ট সময়ের জন্য নির্বাচন স্থগিত করতে পারে এবং আসন্ন নির্বাচনী পরাজয় এড়ানোর জন্য একটি নির্গমন পথ খুঁজে নিতে পারে। দ্বিতীয়ত, ‘জাতীয় ঐক্যের সরকার’ গঠনের জন্য নির্বাচন স্থগিত করা, ধরা যাক দুই বছরের জন্য। এটা ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে আওয়ামী লীগকে ঝকঝকে পরিষ্কার করে দেবে বলে মনে করেন ওই জেনারেল।
 
বাংলাদেশী নির্বাচনী পর্যবেক্ষকদের একটি অংশ, বিশেষভাবে যারা আগে সেনাসমর্থিত সরকারে কাজ করেছিলেন, মনে করেন, জাতীয় ঐক্যের সরকারের পক্ষে আমেরিকানদের থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ভারতীয়রা কী করবে তা পরিষ্কার নয়। অন্যদিকে বেইজিং একটি দলের বদলে অন্য কোনো দলকে এগিয়ে নিতে সরাসরি কোনো ভূমিকা পালন করবে না। তবে তারা চাইবে, নতুন সরকার গঠিত হওয়া মাত্র তার উপস্থিতি যেন অনুভূত হয়। অবশ্য বাংলাদেশী রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা মনে করেন, চীনাদের যেকোনো ধরনের অনুপ্রবেশ ঠেকাতে ভারতীয় ও আমেরিকানরা একযোগে কাজ করবে।
 
আরো পড়ুন: বাংলাদেশের বিক্ষোভ সরকারের গভীর নিরাপত্তাহীনতার দিকটি তুলে এনেছে
 
ঢাকায় নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাই কমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী বলেন, নির্বাচন থেকে সরে যাওয়ার কোনো সুযোগ না থাকলেও একমাত্র যে বিকল্প পথ হলো ২০০৭ সালের মতো কিছু একটা। অবশ্য এবার হতে পারে এক বছরের সংক্ষিপ্ত বিরতির মতো। এমনটা হতে পারে সম্পূর্ণ অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের আগে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য আওয়ামী লীগের ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ ঘটতে পারে।
 
২০০৭-২০০৮ মেয়াদে হাই কমিশনারের দায়িত্ব পালনকারী পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী স্বীকার করেন যে ঢাকার রাজপথের বিক্ষোভ দমনে আওয়ামী লীগ ‘নিশ্চিতভাবে রূঢ় আচরণ’ করলেও এবং দলটির মধ্যে অন্যান্য ঘাটতি থাকলেও ভারতের কাছে ‘বিকল্প আছে সামান্যই।’ কারণ (দিল্লির বিবেচনায়) বিএনপি এখনো রয়েছে ধূসর এলাকায়।’ ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্টের ইতোপূর্বে খালেদা জিয়ার লন্ডনভিত্তিক ছেলে তারেক রহমানের সঙ্গে ‘খাতির জমাতে’ চাওয়ার কথা স্মরণ করেন। তবে বলেন, তিনি সরে গেলে বিষয়টি চরমভাবে ব্যর্থ হয়।
 
গত প্রায় এক যুগ ধরে ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্ট বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নেতৃত্বের সাথে ‘আরো ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত’ হতে চেয়েছে। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী প্রধানের সাম্প্রতিক পাঁচ দিনের সফরকে ঢাকাভিত্তিক থিঙ্ক ট্যাঙ্ক প্রধান ‘শুভেচ্ছা সফর’ হিসেবে অভিহিত করলেও অন্য জ্ঞাত সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশী অতিথির সাথে ‘বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা’ হয়েছে। দেশব্যাপী আন্দোলনে বিএনপির ‘অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিবেশ’ ‘কোনো ধরনের বহিরাগত মদতের’ পথ সৃষ্টি করে কিনা তা ভারতীয় নিরাপত্তা এস্টাবলিশমেন্ট আগ্রহ নিয়ে লক্ষ্য করছে।
 
নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য বিএনপি প্রকাশ্যে আগে থেকে বলা ‘সবার জন্য সমান সুযোগ প্রস্তুতের’ দাবি তুলতে থাকবে। তবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য বলেন, তার দল যদি ওই দাবির প্রতি অটল থাকে, আর আওয়ামী লীগ যদি তার বর্তমান অবস্থান থেকে না নড়ে তবে আইন-শৃঙ্খলায় পুনঃপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অন্যান্য শক্তির হস্তক্ষেপ করার ‘সম্ভাবনা’ থাকবে। তিনি বলেন, এ ধরনের পরিস্থিতিতে বিএনপি হয়তো অখুশি হবে না।
Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.