নির্বাচনের কাঠামোই ভেঙে দিল কমিশন!

দেশের রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাঠামো ভেঙে পড়েছে- এমনটি উল্লেখ করে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেছেন, ‘ভঙ্গুর রাজনীতির কারণেই নির্বাচনী ব্যবস্থা দিনদিন অকার্যকর হচ্ছে।’

স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘদিন গবেষণার পাশাপাশি ড. তোফায়েল আহমেদ অধ্যাপনা করছেন বেসরকারি নর্থসাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ে। লিখছেন সরকার, রাজনীতির নানা প্রসঙ্গ নিয়েও। জাগো নিউজ’র সঙ্গে একান্ত সাক্ষাৎকারে তিনি স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার নির্বাচন ও কাঠামোর পরিবর্তনে জোর দেন। দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের আজ থাকছে প্রথমটি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সায়েম সাবু।

আমরা সবাই নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ত থাকছি। নির্বাচন করেই পাগল হয়ে যাচ্ছি। অথচ নির্বাচনের পর কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যানরা কী করছেন, তার কোনো খবর রাখি না

জাগো নিউজ : নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন। স্থানীয় সরকারের এ নির্বাচনগুলো কীভাবে পর্যবেক্ষণ করছেন?

ড. তোফায়েল আহমেদ : নির্বাচন মানেই রাজনীতি। রাজনৈতিক দলগুলোর গতিপ্রকৃতি এবং তাদের সাংগঠনিক অবস্থা সাধারণত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়। দেশে এখন রাজনীতি আছে, এটি বলার সুযোগ নেই। আমরা সবাই এখন নির্বাচন নিয়ে চিন্তিত। নির্বাচন অবশ্যই রাজনীতির একটি চূড়ান্ত রূপায়ণ। বলা যায়, রাজনীতির সর্বশেষ ধাপ হচ্ছে নির্বাচন।

জাগো নিউজ : নির্বাচন হচ্ছে, রাজনীতিও আছে। ‘দেশে এখন রাজনীতি আছে, এটি বলার সুযোগ নেই’ বলছেন কেন?

ড. তোফায়েল আহমেদ : জনসাধারণ বা নিজ দলের সমর্থকদের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের যে কাঠামো, তা তো ভেঙে পড়েছে। আবার বিরোধী দলে বা জোটে যারা আছেন, তারা তো কোনো কর্মকাণ্ডই পালন করতে পারছেন না। মামলা হচ্ছে, জেল হচ্ছে- এটি হয়তো আদালতের বিষয়। কিন্তু তারা যে মাঠপর্যায়ে কোনো কর্মসূচি পালন করবে, তা তো পারছে না।

ঘরে মিটিং করলেও বলা হচ্ছে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত তো নিষিদ্ধ কোনো দল নয়। অথচ তাদের ঘরের মধ্যেও কোনো আলোচনা করতে দিচ্ছে না সরকার।

জাগো নিউজ : খুলনা ও গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে কী দেখলেন?

ড. তোফায়েল আহমেদ : সেখানে কী নির্বাচন হলো, তা সবারই জানা। নির্বাচনে স্থানীয় প্রশাসন সরকার দলের হয়ে কাজ করছে। নির্বাচন কমিশন হচ্ছে একটি নির্বাচনের রেফারি। নির্বাচন কমিশনের অধীনে থেকে স্থানীয় প্রশাসনের কাজ করার কথা। কিন্তু এটি নির্বাচন কমিশন জানে কিনা- তা নিয়ে এখন সন্দেহ আছে। অন্তত খুলনা ও গাজীপুরের নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে সেটাই প্রমাণ হয়েছে।

জাগো নিউজ : এর দায় সরকার নাকি নির্বাচন কমিশনের?

ড. তোফায়েল আহমেদ : আমি এ জন্য মূলত নির্বাচন কমিশনকেই দায়ী করব। নির্বাচনী কাঠামোই ভেঙে দিলো কমিশন। সরকার দলকে আপনি অভিযোগ করতেই পারেন। কিন্তু তারা তো বলবে, নির্বাচন কমিশনকে যথেষ্ট ক্ষমতা দেয়া আছে। তারা ব্যবস্থা না নিলে সরকারের কী করার আছে?

জাগো নিউজ : কিন্তু নির্বাচন কমিশন তো সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে এবং এটি সরকারগুলোর ধারাবাহিকতায় হয়ে আসছে।

ড. তোফায়েল আহমেদ : সেটা ভিন্ন আলোচনা। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের তো কিছু একটা করার আছে। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত নির্বাচনের একটি ধারা তৈরি হয়ে এসেছিল। এই সময়ের সবকটি নির্বাচন যে ত্রুটিমুক্ত, তা বলা যাবে না। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতি, নির্বাচন, গণতন্ত্র যে ভালোর দিকে যাচ্ছিল, তা ধরে নিতেই পারি। ২০০৮ সালের পর থেকে চিত্র পাল্টে যায়।

জাগো নিউজ : ২০০৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের পরপরই যেসব স্থানীয় সরকার নির্বাচন হলো, তা নিয়ে কিন্তু এত অভিযোগ ছিল না।

ড. তোফায়েল আহমেদ : হ্যাঁ, ওই সময়ের নির্বাচনগুলো খানিকটা প্রভাবমুক্ত ছিল বটে। ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনী হলেও স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় এত প্রভাব রাখেনি সরকারদলীয় সংগঠন। ওই সময় বিরোধীপক্ষও জিতেছে বেশ।

কিন্তু ২০১৪ সালের নির্বাচনের পরই পরিস্থিতি পাল্টে যায়। বিচ্ছিন্নভাবে একটি নির্বাচনকে ধরে আপনি মূল্যায়ন করতে পারবেন না। সামগ্রিক বিবেচনায় আপনাকে মূল্যায়ন করতে হবে।

জাগো নিউজ : তার মানে স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকে নির্ধারণ করার পরই …

ড. তোফায়েল আহমেদ : আমি তা মনে করি না। দলীয় প্রতীকে না হলেও আগে দলীয়ভাবে নির্বাচন হয়েছে। অনেকেই মনে করছেন, দলীয় প্রতীকে হওয়ার কারণে এমন হচ্ছে।

ড. তোফায়েল আহমেদ : আগে কোনো মেয়র বা চেয়ারম্যান দলীয় ব্যক্তি ছিলেন না। সবাই দলীয়ভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। এখন শুধু আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে হচ্ছেন।

এখনও মেম্বার বা কাউন্সিলররা দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হচ্ছেন না, তাই বলে কি তারা সবাই ভালো? আমি এটি মনে করি না। দোষ আসলে প্রতীকের নয়। দোষ হচ্ছে রাজনীতির।

রাজনৈতিক সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এখন সিটিতে নির্বাচন হচ্ছে মেয়রকে কেন্দ্র করে। কাউন্সিলররা হারিয়ে যাচ্ছেন।

জাগো নিউজ : আপনার পরামর্শ কী?

ড. তোফায়েল আহমেদ : স্থানীয় সরকারের প্রতিটি নির্বাচন হওয়া দরকার সংসদীয় পদ্ধতির মতো। লোকসংখ্যা অনুপাতে সদস্য বা কাউন্সিলর নির্ধারণ হয়। একটি ইউনিয়নে নয়জন সদস্যই হতে হবে- এর কোনো মানে নেই। বেশিও হতে পারে, কমও হতে পারে। একই অবস্থা উপজেলা, জেলা, সিটি কর্পোরেশনেও। তখন নির্বাচন নিয়ে এত উত্তেজনা থাকবে না। একটি নির্দিষ্ট কাঠামোতে থাকবে।

সদস্যরাই তাদের মধ্য থেকে চেয়ারম্যান তৈরি করবেন। অভিজ্ঞতাও থাকবে অন্য রকম। কিন্তু এখন যারা চেয়ারম্যান হচ্ছেন, তারা উপরিতলের সঙ্গে যোগাযোগ রাখেন। পাটাতনের খবর রাখেন না। যোগ্যতাও কম। এ কারণে এক ব্যক্তির কর্তৃত্ব এখন সব জায়গায়। যারা মেয়র হওয়ার ক্ষমতা রাখেন, কিন্তু হতে পারেননি; তারা মেয়রকে চাপে রাখতে পারতেন, সংসদীয় পদ্ধতিতে নির্বাচন হতো।

ড. তোফায়েল আহমেদ : না। সদস্য বা কাউন্সিলররা দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হচ্ছেন না। এ কারণে তারা কোনো ভূমিকা পালন করতে পারছেন না। মেয়র বা চেয়ারম্যান যে সিদ্ধান্ত নেবে, সেটাই এখন কার্যকর হয়।

কাউন্সিলর বা সদস্যদের হাতে সমান ক্ষমতা থাকলে জনগণের কল্যাণ নিয়ে কাজ হতো। আবার চাইলেই একজন মেয়র, চেয়ারম্যানকে বরখাস্ত করা যেত না, এখন যেমন হচ্ছে। একজনকে বরখাস্ত করলে সমমানের আরেকজন দায়িত্ব নিতে পারতেন।

এ পদ্ধতির সৌন্দর্য এখানেই। মেয়র পদ হারালেও তিনি কাউন্সিলর থেকে যেতেন। এভাবেই প্রাতিষ্ঠানিকতা মেলে। এখন তো এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠানে রূপ নিয়েছে।

জাগো নিউজ : আপনি একাডেমিক তথ্য দিয়ে কথা বলছেন। কিন্তু আমাদের নির্বাচনী বাস্তবতা তো অন্য কথা বলে?

ড. তোফায়েল আহমেদ : আমরা সবাই নির্বাচন নিয়েই ব্যস্ত থাকছি। নির্বাচন করেই পাগল হয়ে যাচ্ছি। অথচ নির্বাচনের পর কাউন্সিলর বা চেয়ারম্যানরা কী করছেন, তার কোনো খবর রাখি না। তারা আসলে কাজ করার ক্ষমতা রাখেন কিনা- তারও খবর রাখি না।

নির্বাচন নিয়ে অতি সচেতনতার কারণেই অন্য বিষয় আমরা আড়ালে রাখছি। একজন মেয়রপ্রার্থী যে খরচ করছেন, তা ওই সিটির বাজেটের সমান। এটি অবাক করার কথা। অথচ এটি নিয়ে কেউ কথা বলছি না।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.