মাহমুদুর রহমান ও ‘বাঙালি মুসলমান’

মাহমুদুর রহমানকে ভালবাসেন এমন মানুষের অভাব নাই। তেমনি, তাঁকে ঘোরতর অপছন্দ করেন এমন লোকও আছেন। এর মধ্য দিয়ে একটি বিভক্ত ও বিভাজিত সমাজের ছবি আমাদের সামনে হাজির  হয় যারা স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের নাগরিক হিশাবে নিজেদের সামষ্টিক স্বার্থের জায়গা থেকে কোন রাজনৈতিক প্রশ্নে বাস্তবোচিত অবস্থান নিতে অক্ষম। সমাজ ও রাজনীতিতে সক্রিয় যে কোন ব্যক্তি সম্পর্কে সমাজে নানান মূল্যায়ন থাকতেই পারে। কিন্তু মাহমুদুর রহমান যেভাবে গুণ্ডামি, হামলা, মামলা এবং অবিশ্বাস্য অবিচারের মুখোমুখি হয়েছেন তার তুলনা নাই। কুষ্টিয়ার আদালতে তিনি প্রকাশ্যে ক্যামেরার সামনেই পুলিশের উপস্থিতিতে গুণ্ডামির শিকার হয়েছেন, মারাত্মক জখম নিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। এই ঘটনা, বলা বাহুল্য, ক্ষমতাসীনদের জন্য খুব আনন্দের বিষয় নয়, কিন্তু তারা ঘটনাটি ঘটতে দিয়েছে। ক্ষমতাসীন্দের দ্বারা গুণ্ডামি প্রশ্রয়ের আওয়াজ ফেইসবুকে মাহমুদুর রহমান বিরোধীদের সরব প্রপাগান্ডার মধ্যে শোনা গেলেও এটা পরাজিতের বিকৃত চিৎকার মাত্র। যার মধ্যে নীতি, যুক্তি বা আদর্শ নাই। বোঝা যাচ্ছে গণ জাগরণ মঞ্চ ও শাহবাগের করুণ পতন কিছু ব্যক্তির মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছে। তারা তাদের ব্যর্থতার প্রতিশোধ বিকৃত কায়দায় চরিতার্থ করতে চায়। এদেরকে চেনা দরকার আছে। রাষ্ট্র দিতে অক্ষম হোক, কিন্তু যে কোন নাগরিকের কিছু ন্যূনতম নাগরিক ও মানবিক অধিকার রয়েছে। কিন্তু ফেইসবুকে অনেকের মন্তব্য পড়ে দেখছি সেই অধিকার রাজনৈতিক আদর্শ হিশাবেও মাহমুদুর রহমানকে দিতে তারা রাজি না।

নানা কারনেই মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশে রাজনৈতিক তর্কবিতর্কের ক্ষেত্র। সেটা হতেই পারে। কিন্তু তথ্যভিত্তিক তর্কের চেয়েও তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ও প্রপাগাণ্ডাই বেশি। ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থের পক্ষে তাঁর একটা দৃঢ় অবস্থান আছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতি প্রকৃতি, আঞ্চলিক রাজনীতি এবং বৈশ্বিক ক্ষেত্রে সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে অনন্ত যুদ্ধের কালপর্বে বাংলাদেশে ইসলাম প্রশ্ন এবং মুসলমানদের স্বার্থ রাজনৈতিক লড়াই-সংগ্রামের কেন্দ্রে বাস্তব পরিস্থিতির কারনেই হাজির রয়েছে। হওয়াটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। ঐতিহাসিক কারণেই অনিবার্য। এর অন্যথা হবার কোন সুযোগই নাই। মাহমুদুর রহমান সেই অনিবার্যতারই অভিপ্রকাশ। তাঁর রাজনৈতিক পক্ষপাত, বিশেষত ইসলাম ও মুসলমানদের স্বার্থের প্রশ্নে অকুতোভয় অবস্থান, তাকে একাই এক রাজনৈতিক আইকনে পরিণত করেছে। ফলে তিনি তাঁর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিষোদ্গারের পাত্র হবেন এতে আর অবাক হবার কী আছে! সমস্যা হচ্ছে কুৎসা, নিন্দা ও প্রপাগান্ডা ছাড়া তার চিন্তা ও কর্মকাণ্ড নিয়ে কোন ফলপ্রসূ তর্ক বা বিরোধিতা দেখি নি। অন্তত আমার চোখে পড়ে নি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে মোটা দাগে দুটি মতাদর্শিক ধারা প্রকট। একদিকে রয়েছে ঘোরতর ইসলাম বিদ্বেষী জাতিবাদী ধারা, যারা নিজেদের সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ বলে দাবি করে। অন্যদিকে রয়েছে ইসলামপন্থি ধারা। জাতিবাদী সেকুলার ধারা মুলত পাশ্চাত্যপন্থী এবং উনিশ শতকে উচ্চবর্ণের হিন্দু কবি-সাহিত্যিক-সংস্কৃতিওয়ালাদের তৈয়ারি বাঙালিত্বকে ইসলামের বিপরীতে প্রতিস্থাপন করে। এটা মূলত দিল্লির প্রকল্প। সাতচল্লিশে ধর্মের ভিত্তিতে দেশ ভাগ হয়েছিল। একদিকে মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান কায়েম হয়েছিল, বিপরীতে গঠিত হয়েছিল হিন্দুদের জন্য ভারত রাষ্ট্র। ভারতে যে রাষ্ট্র গঠিত হয়েছিল তার ওপর সেকুলারিজমের জোব্বা পরানো হলেও আদতে তৈরি হয়েছিল একটি হিন্দু রাষ্ট্র। গবেষকদের ভাষায় Soft Hindu State। নরেন্দ্র মোদীর আমলে তা পরিপূর্ণ হিন্দুত্ববাদে রূপ লাভ করে চলেছে। অর্থাৎ পরিণত হচ্ছে Hard Hindu State-এ। এই পরিপ্রক্ষিতে বিচার করলে বাঙালিত্ব, বাঙালি জাতীয়তাবাদ কিম্বা নানান কিসিমের প্রগতি ও প্রগতিশীলতার ভড়ং মূলত হিন্দুত্ববাদী আগ্রাসনের বাংলাদেশী ধরণ মাত্র। বাংলাদেশের জনগণকে সাংস্কৃতিক-মতাদর্শিক ভাবে ‘ইসলামের অভিশাপ’ থেকে মুক্ত করবার ফন্দি বা আরও সহজ ভাষায় দিল্লির ইসলাম নির্মূল পরিকল্পনারই অংশ। আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক রাজনীতি এবং বিশেষ ভাবে বাঙালি মুসলমানের ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য সুস্পষ্ট ভাবে বুঝতে না পারার এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা অদৃশ্য থেকে যায়। ইতিহাস পাঠ ও পর্যালোচনার ক্ষেত্রে চরম অনাগ্রহের কারণে ইসলামপন্থি  ধারা এই ক্ষেত্রে সবিশেষ দুর্বল; তার আত্মপ্রকাশের ভঙ্গীও প্রায়শই সাম্প্রদায়িক ও পশ্চাতমুখি রূপ পরিগ্রহণ করে। ধর্মতত্ত্বে নিজেদের স্বেচ্ছাবন্দি রাখার কারণে পুঁজিতান্ত্রিক গোলকায়নের কালপর্বে দর্শন, সংস্কৃতি, সমাজ, ইতিহাস ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে ইসলামের সম্ভাব্য ইতিবাচক ভূমিকা রাখবার ক্ষেত্র তৈরির কাজে এতে কোন অগ্রগতি নাই। পরকালকন্দ্রিক চিন্তা ইহলৌকিক সমস্যার সমাধানেও অনাগ্রহী। ফলে রাজনীতির মোট দাগের দুই ধারার একটিও বাংলাদেশের  জনগণকে কোন বাস্তবোচিত পথ দেখাতে পারছে না।

সেকুলারিজম পাশ্চাত্যে নাগরিকতার ধারণা এবং আইনী সংজ্ঞা নির্মাণে যে ভূমিকা রাখে সে সম্পর্কে ইসলাম বিদ্বেষী জাতিবাদী এবং বাম প্রগতিশীল(?) ধারা যারপরনাই অজ্ঞ। রাষ্ট্রের চোখে সকলেই নাগরিক, সমাজে কে কী ধর্ম পালন করে, কে নাস্তিক কিম্বা কে আস্তিক সেইসব দেখা আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ নয়। ধর্ম বিশ্বাস কিম্বা আস্তিক/নাস্তিক নির্বিশেষে রাষ্ট্রের কাজ প্রতিটি নাগরিকের নাগরিক ও মানবিক অধিকার সমুন্নত রাখা এবং নিশ্চিত করা। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে ধর্ম প্রাইভেট ব্যাপার বটে, অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় পরিসরে ধর্ম বা ব্যাক্তির বিশ্বাস বিচার্য না। কিন্তু বিচার্য না হলেও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ হচ্ছে প্রতিটি নাগরিকের ধর্মীয় স্বাধীনতা এবং ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কাজ সমাজ থেকে ধর্মের উচ্ছেদ নয়, বরং নিশ্চিন্তে ধর্ম পালন এবং ধর্ম প্রচারের অধিকার নিশ্চিত করা। ধর্ম প্রচারের অধিকার চিন্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে যুক্ত। তাহলে বাংলাদেশে ধর্ম নিরপেক্ষতা কায়েমের একমাত্র এবং প্রধান কাজ ছিল স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক ন্যায় বিচার নিশ্চিত করবার জন্য একটি গণতান্ত্রিক গঠনতন্ত্র প্রণয়ন এবং গণতান্ত্রিক ‘রাষ্ট্র’ গঠন। কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাসম্পন্ন ‘রাষ্ট্র’ নিয়ে, অবশ্য একালে গুরুত্বপূর্ণ তর্ক জারি রয়েছে। সেই ক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি দরকার গণতান্ত্রিক ক্ষমতা, গণতান্ত্রিক শাসন পদ্ধতি ও যথোপযুক্ত সামাজিক ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ এমন এক বাস্তব পরিস্থিতি ও শর্ত তৈরি যাতে ইসলাম ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে এবং সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। সেই ভূমিকার বিচার করেই যেন বিভিন্ন ইসলামপন্থি ধারা পর্যালোচনার সামর্থ জনগণ অর্জন করতে সক্ষম হয়। কিন্তু এই কাণ্ডজ্ঞানটুকু দুটি ধারার একটিও প্রদর্শন করতে পারে নি।

বলাবাহুল্য, ধর্ম বিদ্বেষী বাংলাদেশের সেকুলারিজম বরং উল্টাটা করেছে। তারা সেকুলারিজমের সঙ্গে জাতিবাদ ও হিটলার-মুসোলিনির সমাজতন্ত্রের মিশেল ঘটিয়ে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েম করেছে। আধুনিক গণতন্ত্রের লিবারেল বা উদারনৈতিক বৈশিষ্ট্য বলি, কিম্বা বলি প্রগতিশীল রাজনীতির দিক থেকে গণতন্ত্রর ইতিবাচক ভূমিকার কথা — কোন কিছুই এই ইসলাম বিদ্বেষী ধারার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। এই দিকটি না বুঝলে কেন মাহমুদুর রহমানকে প্রকট ইসলামপন্থী হতে হয় সেই বাস্তবতা আমরা বুঝব না। ইসলাম ও মুসলমানদের সুনির্দিষ্ট স্বার্থের কথা বলা ছাড়া দিল্লি ও পরাশক্তির সমর্থনপুষ্ট ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থা মোকাবিলা যারপরনাই কঠিন এই কঠিন বাস্তবতার কিছুই আমরা অনুধাবন করতে পারব না।

মাহমুদুর রহমান হঠাৎ বাংলাদেশে হাওয়া থেকে গজান নি। তিনি জাতিবাদী, ইসলাম বিদ্বেষী ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী ও ফ্যাসিস্ট শক্তির বিরুদ্ধে গণ প্রতিরোধেরই অনিবার্য ফল। ঐতিহাসিক ও মতাদর্শিক দিক থেকে বিচার করলে তিনি সবচেয়ে নির্ভীক এবং দৃঢ় প্রতিরোধের সম্মুখ ফ্রন্টের সৈনিক। তাঁর বিরোধীরা যাই বলুক, বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠির কাছে তিনি তাদের আশা আকাঙ্ক্ষার আইকন। তাঁর কাছে তাদের প্রত্যাশা বেড়েছে বৈ কমে নি। কুষ্টিয়ার গুণ্ডামি তাঁর এই ভাবমূর্তিকে আরও প্রতিষ্ঠিত করলো।

আমি বরাবরই এর আগে আমার বহু লেখায় বলেছি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানেই সেকুলার বা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র। সেই ক্ষেত্রে আলাদা করে সেকুলারিজমকে রাষ্ট্রের নীতি হিশাবে গ্রহণ করবার প্রয়োজন পড়ে না। গণতন্ত্র কায়েমের লড়াই বাদ দিয়ে বাড়তি সেকুলারিজম বা ধর্ম নিরপেক্ষতার দাবি বাংলাদেশের বাস্তবতায় স্রেফ ইসলাম নির্মূলের দাবি ছাড়া অন্য কিছুই না। জনগন একে প্রতিহত করবেই। সেটা মাহমুদুর রহমানের নেতৃত্বে হোক, কিম্বা হোক অন্য কারো ঝাণ্ডার নীচে। এটাই বাংলাদেশের বাস্তবতা।

নাস্তিক্যবাদীরা মাহমুদুর রহমানকে অপছন্দ করে। শেখ হাসিনার পিটুনি খেয়ে এদের অঙ্কের দেশ হকে পালানোর দুঃখ বুঝি। যার জন্য চুরি করি সে বলে চোর! – অনেকটা সেই পুরানা গীত আর কী! কিন্তু একে তামাশা হিশাবে নেওয়া ঠিক হবে না। চিন্তার ইতিহাসে নাস্তিকতার ইতিবাচক ভূমিকা আছে। নাস্তিক্যবাদের ইতিবাচক দার্শনিক মর্ম হচ্ছে অতীন্দ্রিয় ঈশ্বরের বিপরীতে রক্তমাংসের মানুষের মহিমা প্রতিষ্ঠা। তরুণ মার্কস বলেছিলেন মানুষের মহিমা কায়েম করবার জন্য ঘোরাপথে হেঁটে আসার দরকার পড়ে না। অর্থাৎ খামাখা আল্লার অস্তিত্বের বিরোধিতা করা অনাবশ্যক একটি কাজ। বরং বালখিল্য নাস্তিকতা এবং ফালতু পরাবিদ্যার চর্চা ত্যাগ করে যে ইহলৌকিক জীবনের সমস্যা মানুষকে অতিন্দ্রিয় আশ্রয়ে বাধ্য করে, সেই ইহলৌকিক সমস্যার সমাধান করাই কমিউনিস্টদের কাজ। অথচ এটা জানা থাকার পরেও বাংলাদেশে কমিউনিস্ট নামধারী নাস্তিক – অর্থাৎ ধর্ম বিদ্বেষি চরম প্রতিক্রিয়াশীল ধারার মোকাবিলা জনগণকে করতে হচ্ছে। জনগণের বন্ধু না হয়ে তারা জনগণের দুষমণের ভূমিকা পালন করে। এই প্রকার বালখিল্য নাস্তিক ও ধর্ম বিদ্বেষীরা নিজেদের আবার ‘মুক্তমনা’ বলে দাবিও করে। বদ্ধ বুদ্ধি ও প্রতিবন্ধিতা হাস্যরসের সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু সত্যকার অর্থে নাস্তিক্যবাদের দার্শনিক তর্কবিতর্কের ধারে কাছেও তারা পৌঁছাতে পারে না। বলে রাখছি, কারণ নাস্তিকতা গুরুত্বপূর্ণ দার্শনিক ধারা; বাংলাদেশের বদ্ধ উন্মাদ ও চরম উস্কানিমূলক অশ্লীল ও গণবিরোধী লেখালিখির সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নাই। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিরা চরম বিকৃত, উস্কানিমূলক এবং দাঙ্গাবাজ নাস্তিক ও নাস্তিক্যবাদের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হবার এটাই প্রধান কারণ। বাংলাদেশের ইসলামপন্থিদের নাস্তিক্যবাদ বিরোধিতাকে বাংলাদেশের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়েই বুঝতে হবে। মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক আমার দেশ-এর ভূমিকা বুঝতে হলে এই বাস্তবতাকেও পরিষ্কার মনে রাখতে হবে।

বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময় মাহমুদ রহমান বিনিয়োগ বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং বেগম খালেদা জিয়ার জ্বালানি উপদেষ্টা ছিলেন। আওয়ামি ঘরানার লোকজন তাঁকে নিছক দলীয় কারনেই অপছন্দ করে। পরাশক্তির প্রশ্রয়ে গড়ে ওঠা সুশীল সমাজের যে রাজনৈতিক ধারা তিনি তার বিরোধী। ফলে সুশীল সমাজের কাছেও তিনি গ্রহণযোগ্য নন। তিনি সাংবাদিকতায় প্রবেশের পর সংবাদপত্রের জগতে দৈনিক আমার দেশ ভিন্ন কন্ঠস্বর ও সাহসী বক্তব্য নিয়ে খুবই দ্রুত জনগণের ইচ্ছা, আকাংক্ষা ও আশার প্রতিফলন ঘটাতে পেরেছিল। দৈনিক আমার দেশ প্রথাগত সাংবাদিকতার নতুন চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছিল। পত্রিকাটির জনপ্রিয়তাও প্রথাগত সাংবাদিকতার ভীতির কারণ হয়ে উঠেছিল। তাই সংবাদপত্র জগতের প্রভাবশালী অংশের কাছে মাহমুদুর রহমান অপ্রিয় হয়ে উঠেছিলেন। প্রভাবশালী অংশ বাংলাদেশ অপরিচিত কেউ নয়। বিশেষত ভূমি দস্যু, কালো টাকার মালিক ও বহুজাতিক কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা খুবই প্রকাশ্য এবং পরিচিত। সাংবাদিকতার মানদণ্ড নিয়ে তারা অনেকে মাহমুদুর রহমানের সমালোচনা করে থাকেন, কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে তাদের যে খ্যাতি ও প্রতিভা সেই দিকগুলো মনে রাখলে তাদের আপত্তি পাগলের প্রলাপ মনে হয়।

সাংবাদিকতার মানদণ্ড নিয়ে জাতীয় ক্ষেত্রে তর্কবিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু খেয়াল করলেই আমরা বুঝব তাঁর বিরুদ্ধে আপত্তির জায়গা দুইটা। একটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের স্কাইপ কেলেংকারি ফাঁস করে দিয়ে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচারকে দৈনিক আমার দেশ প্রশ্নাত্মক করে তুলেছিল। কিন্তু সেটা নতুন কিছু ছিল না। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের বিচারের স্টান্ডার্ড নিয়ে আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেই তর্ক জারি ছিল, এখনও জারি রয়েছে। আন্তর্জাতিক আশংকা যে সত্য মাহমুদুর রহমান সেটাই শুধু দেখিয়ে দিয়েছিলেন। এছাড়া সামগ্রিক ভাবে বিচার ব্যবস্থার গভীর অসুখ তিনি দৈনিক আমার দেশের বিভিন্ন প্রতিবেদনে ধরিয়ে দিয়ে প্রমাণ করেছিলেন বাংলাদেশে স্বাধীন বিচার ব্যবস্থা অনুপস্থিত কারন রাষ্ট্রের নির্বাহী অঙ্গের হস্তক্ষেপ থেকে বিচার বিভাগ মুক্ত নয়।

তাঁর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ হচ্ছে থাবা বাবার লেখা প্রকাশ করে দিয়ে তিনি গণজাগরণ মঞ্চ এবং শাহবাগের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক মর্ম উদাম করে ছেড়েছিলেন। যাদের বিরুদ্ধে একাত্তরের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশের জনগণ তাদের বিচার চেয়েছে। অথচ গণজাগরণ মঞ্চ ও শাহবাগ যে কোন মূল্যে অভিযুক্তদের ফাঁসি দেবার যে রাজনীতি সামনে এনেছে তা তারুণ্যের সজ্ঞান, সচেতন ও গণসংহতিমূলক রাজনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপরায়ন নয়। যে বিচার অতীতের ভার থেকে আমামদের মুক্ত করতে পারত তা আদৌ করেছে কিনা তা শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও বিতর্কিত। বাংলাদেশ অতীতের ভার থেকে মুক্ত হয় নি। বরং আগামি দিনে নতুন জবাবদিহিতার ক্ষেত্র তৈরির অনিবার্যতাই তৈরি করে রেখেছে। হিংসা ও প্রতিহিংসার বিষাক্ত বীজই মূলত রোপন করে দিয়ে গিয়েছে। তার পরিণতি কী দাঁড়াবে আমরা এখনও জানি না।

শাহবাগ মূলত প্রকট ফ্যাসিজমের উত্থানপর্ব একথা দৈনিক আমার দেশ স্পষ্ট করেই বলেছিল। এর পেছনে দিল্লির প্রকাশ্য সমর্থন ছিল। দিল্লির হিন্দুত্ববাদী প্রকল্প – বিশেষত উপমহাদেশ থেকে ইসলাম নির্মূলের হিন্দুত্ববাদী অভিযানের অংশ হিশাবেই শাহবাগ হাজির হয়েছিল। ঠিক, দৈনিক আমার দেশ শাহবাগকে ধসিয়ে দিয়েছে। এই একটি অসম্ভব ঘটনার জন্য দৈনিক আমার দেশ বাংলাদেশের ইতিহাসে জ্বল জ্বল করতে থাকবে। মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে কারা ক্ষিপ্ত  তাদের জনগণ খুব ভাল ভাবেই চেনে এবং জানে। এই কথা বলার অর্থ এই নয় যে যারা গণজাগরণ মঞ্চে অংশ গ্রহণ করেছিলেন তারা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের বিচার চেয়ে কোন ভুল করেছিলেন, কিম্বা একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও চেতনার যে আহ্বানে তাঁরা ছুটে গিয়েছিলেন তাদের আবেগে ও আকাঙ্ক্ষায় কোন দোষ বা খাদ ছিল। কিন্তু আবেগ যখন আমাদের অন্ধ করে ফেলে তখন আমরা অন্যের হাতে জিম্মি হয়ে যাই। ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং ইতিহাসের বড় পরিসরে বাংলাদেশ নিয়ে ভাবতে না পারার অক্ষমতা শাহবাগের উদ্যমকে করুণ পরিণতির গহ্বরে নিক্ষেপ করেছে। এই নির্মম সত্য অনেকে এখনও মানতে রাজি না থাকতে পারেন, কিন্তু ইতিহাসের চাকা কারো জন্য অপেক্ষা করে না। এখন দেখছি, যত দোষ নন্দ ঘোষ হিশাবে মাহমুদুর রহমানের ঘাড়ে চাপিয়ে অনেকে নিজেদের বীরত্ব জাহির করতে চাইছেন। যাদের মাহমুদুর রহমান একাই তাসের ঘরের মতো উড়িয়ে দিলেন তাদের কথাবার্তা হাসির খোরাক হতে পারে; এখন তারা গুণ্ডামি করে তাদের মনের ঝাল মেটাতে চাইছেন বটে, সেটা আর যাই হোক গুণ্ডামিই বটে। বরং গণ জাগরণ মঞ্চ ও শাহবাগের উদ্যমের নির্মোহ পর্যালোচনার মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ এগিয়ে যেতে সক্ষম হবে। এখন মাহমুদুর রহমানকে গালি দিয়ে অর্বাচিন জোকার হবার কোন অর্থ হয় না।

আমি বারবার আমার বিভিন্ন লেখায় বলেছি একাত্তর হচ্ছে বিশ্বে নতুন এক রাজনৈতিক জনগোষ্ঠির আবির্ভাব মুহূর্ত। আমরা রক্ত দিয়ে তা অর্জন করেছি। এই মুহূর্ত ও তার অর্জনের সাংস্কৃতিক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক তাৎপর্য আমাদের উপলব্ধি করতে হবে, বুঝতে হবে। বর্তমান আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে সেটাও যথেষ্ট নয়। বুঝতে হবে তার ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্যের জায়গা থেকে। কারণ রাষ্ট্র ও সীমান্ত আজ আছে কাল নাও থাকতে পারে। বোঝাবুঝির এই ক্ষেত্রটিতে আম্মদের ঘাটতি আছে অনেক। এই সকল বাস্তবতা মনে রাখলে মাহমুদুর রহমানের বিরুদ্ধে যে সকল অভিযোগ প্রতিপক্ষরা তোলে ও প্রপাগান্ডা চালায় তাতে অবাক হবার কিছু নাই। ইসলাম ও মুসলমান প্রশ্নে তিনি দৃঢ় ও অবিচল, এটা অবশ্যই সত্য। তিনি ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী ও নাস্তিক্যবাদীদের দুষমণ। সেটা তো দিনের আলোর মতোই পরিষ্কার। এই ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিস্ট রাষ্ট্র ব্যবস্থার তিনি উৎখাত চান, এ ব্যাপারে বিন্দু মাত্র সন্দেহ নাই। কিন্তু প্রত্যকটির জন্য তার প্রতিপক্ষরা যতোই তার বিরোধিতা করছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস দমন নিপীড়ন জেল জুলুম ও অব্যাহত গুণ্ডামি দিয়ে তাকে প্রতিহত করার চেষ্টা করছে, ততোই তিনি অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠছেন। কুষ্টিয়ায় আদালত প্রাঙ্গনে যে ঘটনা ক্ষমতাসীনরা ঘটালো তাদের তাদের পরাজয়ের ঘন্টাই বেজে উঠেছে। শেষাবধি মাহমুদুর রহমানই জিতে যাচ্ছেন।

সকল লিবারেল ও বৈচারিক নীতি লংঘন করে তাঁকে আদালত অবমাননার জন্য যখন কারাদণ্ড দেওয়া হোল, তখন মত প্রকাশের স্বাধীনতার ধ্বজাধারীদের ব্যর্থতা আমরা দেখেছি। বিক্ষুব্ধ হবার কোন আইনগত অবস্থান মামলাকারির না থাকা সত্ত্বেও (Status Operandi) তার বিরুদ্ধে বহু মামলা হয়েছে। অথচ আদালতের এই মামলা নেবারই কথা না। কিন্তু শুধু মাহমুদুর রহমানের ক্ষেত্রেই নয়, সামগ্রিক ভাবে অবিশ্বাস্য বৈচারিক স্বেচ্ছাচার জনগণ দেখছে। মানবাধিকার আর লিবারেল আদর্শের বস্তাপচা বুলি আওড়ানো পরাশক্তির প্রশ্রয়েই এইসব ঘটেছে। এর মধ্য দিয়েই বাংলাদেশ বদলে যাচ্ছে, বাংলাদেশের জনগণের আত্মানুসন্ধানের লড়াই ক্রমে ক্রমে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সেই ক্ষেত্রে মাহমুদুর রহমান এবং দৈনিক আমার দেশ-এর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। আগামি দিনে সেটা আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে, এ ব্যাপারে কোন সন্দেহ নাই।

দুই

তাহলে এটা আমাদের স্বীকার করতে হচ্ছে ডান বলি বা বাম বলি মাহমুদুর রহমান বাংলাদেশের প্রচলিত ও প্রথাগত লিবারেল, সেকুলার বা বাম রাজনীতির জন্য খুবই বড় সড় একটি সমস্যা। দিল্লির জন্য তো বটেই। এটা আরও বুঝব যদি মনে রাখি, শুধু লিবারেল, সেকুলার বা বামেরা নয়, দক্ষিণ এশিয়ায় সকল পরাশক্তি ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক অতি গুরুত্বপূর্ণ পলিটিকাল ক্যাটাগরিটিকে আজও বুঝে উঠতে পারে নি। এই সেই ঐতিহাসিক জনগোষ্ঠি যারা ভারতের সঙ্গে থাকে নি, আবার পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে লড়ে স্বাধীন ও সার্বভৌম রাজনৈতিক জনগোষ্ঠি হিশাবে বিশ্বে নিজের আবির্ভাব ঘটিয়েছে। এমনকি আহমদ ছফাও এর তাৎপর্য বোঝেন নি। উনিশ শতকী বাঙালি হিন্দুর ‘নবজাগরণ’ বা আধুনিক হিন্দুত্ববাদের সঙ্গে তিনি তুলনা করে বাঙালি মুসলমানকে হিন্দুর বিপরীতে স্রেফ একটি চেতনা বা আত্মপরিচয় গণ্য করেছেন। দুর্ভাগ্য যে এই চেতনাকে ছফা হীনমন্য গণ্য করেছেন। এর কারন কি?

এর কারণ ‘বাঙালি মুসলমান’ শব্দবন্ধটিকে রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক বর্গ বা ক্যাটাগরি হিশাবে বিচার ও বিবেচনা করার অক্ষমতা। ছফা ‘বাঙালি মুসলমান’-এর বিরোধী ছিলেন তা নয়। তিনি ধর্ম নির্বিশেষে সকল মানুষের কল্যাণে্র কথাই ভেবেছেন। কিন্তু ‘হিন্দু’, ‘মুসলমান’ ইত্যাদি যে স্রেফ শাশ্বত বা চিরায়ত আত্মপরিচয় নয়, বরং ইতিহাসের মধ্য দিয়ে তৈরি হওয়া ব্যাপারও বটে এই দিকটি বুঝতেন না। ধরে নেওয়া হয় যে বাঙালি, হিন্দু, মুসলমান ইত্যাদি পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন এক প্রকার সাম্প্রদায়িক কিম্বা জাতিবাদি চেতনা মাত্র; এমনই যে যেন এই চেতনা বা পরিচয় গড়ে ওঠার কোন নৈর্ব্যক্তিক ইতিহাস নাই। যেন, ব্যাপারটা স্রেফ নিজেকে হিন্দু, মুসলমান বা বাঙালি মনে করা বা না করার ব্যাপার। নিতান্তই মানসিক বা আচরণগত সমস্যা। সাম্প্রদায়িক চেতনা থেকে তৈয়ারি জিনিস। ভুলটা এখানে।

‘বাঙালি মুসলমান’ ধারণাটি তুলনামূলক ভাবে আরও জটিল। সাম্প্রদায়িক বা জাতিবাদী চেতনার উৎস ভাষা ও সংস্কৃতি হোক, কিম্বা হোক ধর্ম তাতে কিছুই আসে যায় না। দুইটাই নিজের পরিচয় ও উপলব্ধি প্রকাশ করবার চিহ্ন। সম্প্রদায় ও পরিচয়বোধ নিজেদের একটি বিশেষ সমাজে অন্তর্ভুক্ত গণ্য করাও বটে। সেই সমাজ অন্য অনেককে বাদ দেয়। আত্মপরিচয়ের রাজনীতির এটাই হোল বিপদের জায়গা। হতে পারে একটি জনগোষ্ঠি ধর্মের মধ্যে নিজের আত্মপরিচয় উপলব্ধি করে, ভাষা ও সংস্কৃতি সেই ক্ষেত্রে গৌণ। তেমনি এমন জনগোষ্ঠিও রয়েছে যাদের কাছে ভাষা ও সংস্কৃতি আগে, তার পর ধর্ম। কিন্তু সাম্প্রদায়িক কিম্বা ভাষিক আত্মপরিচয়কে এই তর্কগুলো ঐতিহাসিক ভাবে ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করে না।

‘বাঙালি মুসলমান’ ধারণাটিকে সম্প্রদায় বা ভাষিক পরিচয়ের প্রসঙ্গ ছাড়াও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি বোঝার জন্য অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ পলিটিকাল ক্যাটাগরি হিশাবে আমাদের ভাবতে শিখতে হবে। বাঙালি মুসলমানের ‘বাঙালিত্ব’ হিন্দু জাতিবাদী বাঙালির ‘বাঙালিত্ব’ না, অতএব বাঙালি জাতিবাদ দিয়ে একে বোঝা সম্ভব না। জার্মানরা নিজেদের একই জাতির অন্তর্হূক্ত গণ্য করে, তাই তারা বিভক্ত হবার পরেও আবাব্র একত্রিত হয়েছে। কোরিয়ানরা এক হতে চায়, কারন ত্র নিজেদ্র এক জাতি মনে করে। কিন্তু ভারতীয় বাঙালি বাঞালি মুসলমানের সঙ্গে এক রাষ্ট্র গঠন করতে চায় না। তারা নিজেদের বাঙালি নয়, ভারতীয় মনে করে।

অন্যদিকে এই জনগোষ্ঠির ‘মুসলমানিত্ব’কে আবার ইরান তুরান আরবের মুসলমানিত্ব দিয়েও বোঝা যাবে না। এই অঞ্চলের জনগণের জাতপাত বিরোধী সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও ইনসাফের লড়াইয়ের ইতিহাস বাদ দিয়ে ‘বাঙালি মুসলমান’কে চেনা অসম্ভব। না চেনার আরও কারণ হচ্ছে বাংলাদেশের মুসলমানের ইতিহাস চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের বিরুদ্ধে কৃষকের ইতিহাসের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। এমন কৃষক যারা কখনই খণ্ডিত বাংলা চায় নি, দেশ বিভাগ চায় নি। কেন চাইবে? তাদের নেতা দুই দুইবার অখণ্ড বাংলার প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিভাবে অখণ্ড বাংলা ভাঙলো এবং কারা ভাঙলো সেই ইতিহাসের হদিস না নিলে বাঙ্গালি মুসলমান কী জিনিস, বোঝা যাবে না। হদিস নেওয়া তাহলে জরুরি হয়ে পড়েছে। দেখা যাচ্ছে শুধু চেতনা দিয়ে কিম্বা বাঙালি মুসলমানের ইতিহাস পর্যালোচনা করে আমরা এর মর্মোদ্ধার করতে পারবো না। এটি একটি রাজনৈতিক বর্গ। যার ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য গভীর ও সুদূর প্রাসারী। বাঙলি মুসলমানের ভূ-রাজনৈতিক তাৎপর্য সাম্প্রদায়িকতা কিম্বা সেকুলারদের ভূয়া ও মিথ্যা ইতিহাস দিয়েও বোঝা যাবে না।

ছোট ছোট কিছু তথ্যই নাহয় আপাতত মনে করা যাক। ‘শেরে বাংলা’ বা বাংলার বাঘ আবুল কাশেম ফজলুল হক, সারা বাংলার প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বর্তমানের খণ্ডিত বাংলার না। সারা জীবন কৃষক আর শ্রমিকের জন্য লড়েছেন। তিনি সারা বাংলার শিক্ষা মন্ত্রীও ছিলেন, ১৯৩৫ সালে কলকাতা মিউনিসিপ্যাল করপোরেশনের তিনি মেয়র নির্বাচিত হন। ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল এ. কে. ফজলুক হকের নেতৃত্বে গঠিত মন্ত্রী পরিষদ গভর্ণর এন্ডারসনের কাছে শপথ গ্রহণ করেন। বাংলার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেরে বাংলা প্রথম বার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তাঁর আমলেই দরিদ্র কৃষকের উপরে কর ধার্য না করে সারা বাংলায় প্রাথমিক শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। “বিনা ক্ষতিপূরণে জমিদারি প্রথা উচ্ছেদ”-এর পদক্ষেপ তিনি গ্রহণ করেন। ১৯৪১ সালের ১২ ডিসেম্বর আবুল কাশেম ফজলুল হক দ্বিতীয় বারের মত মন্ত্রী পরিষদ গঠন করেন। বাঙালি মুসলমানের এই ইতিহাস বাঙালি হিন্দুর ইতিহাসেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। যে হিন্দু এখন খণ্ডিত বাংলায় হিন্দির আগ্রাসনে নিজের ভাষা ও সংস্কৃতি ভুলে যেতে বসেছে সে যেমন এই ইতিহাস ভুলেছে, বাংলাদেশের বাঙালিও এই ইতিহাস মনে রাখে নি।

বাংলাদেশে হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির সেকুলার ভার্সান হিশাবে যে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদ’ দিল্লির আশ্রয়ে, প্রশ্রয়ে ও সমর্থনে পুষ্ট করা হয়েছে তার বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে ‘বাঙালি মুসলমান’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ক্যাটাগরি হিশাবে হাজির হতে শুরু করেছে। তার আবির্ভাব ঘটছে আমাদের চোখের সামনে। এটাও ইতিহাসেরই অনিবার্য পরিণতি। বাঙালি মুসলমান বাঙালি, অতএব বাঙালি ও বাংলাভাষীদের ইতিহাস বাদ দিয়ে একে স্রেফ ‘মুসলমান’দের লড়াই হিশাবে বোঝা যাবে না। কিন্তু বাঙালি মুসলমানকে স্রেফ এই রূপেই সাজাতে ও দেখাতে দিল্লি বিশেষ ভাবে আগ্রহী। একই ভাবে আগ্রহী অন্যান্য পরাশক্তিও। উপমহাদেশে এবং সারা বিশ্বে বাঙালি ও বাংলাভাষীদের স্বার্থের প্রশ্ন বাদ দিয়ে স্রেফ অনৈতিহসিক ধর্মতত্ত্ব কিম্বা নির্বিচার মুসলমান পরিচিতি বাঙালি মুসলমানের স্বার্থের অনুকুল নয়।

সব সময় মনে রাখা দরকার বাংলাভাষীদের বিভক্ত রাখার ওপর উপমহাদেশে – বিশেষত এর পূর্বাঞ্চলে সকল পরাশক্তির আধিপত্য বহাল রাখতে পারা নির্ভর করে। দিল্লির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির আধিপত্য বহাল রাখার জন্য বৃহৎ বাংলার সকল নিপীড়িত জনগণের লড়াইকে স্রেফ মুসলমান কিম্বা হিন্দুর লড়াইয়ে পর্যবসিত করতে পারা যেমন জরুরি, একই ভাবে এই সাম্প্রদায়িক বিভক্তি মার্কিন, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন এবং চিনের আধিপত্য বজায় রাখার জন্যও সমান জরুরি। ইতিহাসের নির্মম প্রহসন যে একটি মফস্বলী রাজ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে যাবার ফলে পশ্চিম বাংলার হিন্দু এখনও তাদের খণ্ডিত ভূগোলকে বিশ্ব গণ্য করে। বাঙালি মুসলমানকে ঐতিহাসিক ও ভূ-রাজনৈতিক ভাবে বুঝতে না শিখলে বাঙালি হিন্দুর চিন্তা আরও সংকীর্ণতায় আকীর্ণ হবে এবং নিজেরা হিন্দুত্ববাদের অতিশয় প্রান্তসীমায় পর্যবসিত হয়ে ভাষা ও সংস্কৃতিহারা হয়ে হিন্দুত্ববাদী ভারতে বিলীন হবে। ‘বাঙালি মুসলমান’ শব্দটিকে ইতিহাস ও রাজনীতি বিশ্লেষণের বর্গ এবং গোলকায়িত বিশ্বে বাংলাভাষীদের ভূ-রাজনৈতিক কর্তব্য নির্ধারণের ক্যাটাগরি হিশাবে ভাবতে পারার ওপর সকল বাংলাভাষীর ভবিষ্যৎ নিহিত। একই সঙ্গে সকল নিপীড়িত ক্ষুদ্র ও বৃহৎ জাতি সত্তার ভবিষ্যতও এর সঙ্গে ক্রমশ জড়িত হয়ে পড়ছে।

মাহমুদুর রহমান এবং তার রাজনীতির মূল্যায়ন ‘বাঙালি মুসলমান’ নামক ভূ-রাজনৈতিক ক্যটাগরির ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার বিচারের সঙ্গে যুক্ত। ফলে যে রাজনীতি তিনি বহন করেন তাকে পর্যালোচনা, মূল্যায়ন ও অগ্রসর করে নেবার পথও কারো বিশেষ জানা নাই। ইতিহাস আমাদের দিয়ে অনেক কিছু করিয়ে নেয়, কিন্তু ইতিহাসকে আমাদের অধীনস্থ করবার নীতি ও কৌশল চর্চার পদ্ধতি ও পথ আলাদা। বাংলাদেশের জনগণকে নতুন ভাবে সেটা আবিষ্কার করতে হবে। ‘বাঙালি মুসলমান’ দক্ষিণ এশিয়ায় জন্য নতুন রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ। সে কারণে সকল পরাশক্তির জন্য ‘বাঙালি মুসলমান’ ভূ-রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিশাবেই হাজির হতে বাধ্য। কারণ প্রায় সতেরো কোটি বাঙালি মুসলমান হোসেনশাহের বাংলার স্মৃতি ধারণ করে, মার্কিন-ব্রিটিশ ও ভারতের সাজানো খণ্ডিত বাংলা না। কিম্বা ‘ভারত’ নামক কলোনিয়াল ইংরেজের টানা সীমানা ও মিথ দিয়ে তৈয়ারি মানচিত্রের মিথ্যা তাদের একাত্তর সালেই জানা হয়ে গিয়েছে। বাঙালি মুসলমান একাত্তরে পাকিস্তানবাদের কবর দিয়েছে, পাকিস্তানের মানচিত্রকে হাস্যকর প্রমাণ করে ছেড়েছে, ভারতীয় হিন্দুত্ববাদের পতন ও পরাজয়ের মধ্য দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের নতুন ঐক্য ও সংহতির শর্ত তৈরির জন্যই বাংলাদেশের আবির্ভাব ঘটেছে। সেটা বাংলাদেশের ষোল কোটি জনগণের নেতৃত্বেই ঘটবে। কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আর ফেলানিদের হত্যা করে ঝুলিয়ে রেখে কোন লাভ হবে না। এটা মাহমুদুর রহমানকেও বুঝতে হবে।

ইতিহাসের এই উপলব্ধির জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি মাহমুদুর রহমানকে সবসময় সমর্থন করেছি। রাজনৈতিক ক্যাটাগরি হিশাবে ‘বাঙালি মুসলমান’-এর পর্যালোচনা এবং সঠিক রাজনীতির দিক নির্দেশনা চিহ্নিত করবার দিক থেকে মাহমুদের রহমানের রাজনৈতিক ভূমিকা আছে এবং থাকবে। আমরা কেউ আদৌ বাঁচব কিনা জানি না। আমাদের মেরে ফেলাও হতে পারে। কিন্তু সেটা হবে খুবই তুচ্ছ ব্যাপার। কিন্তু শুধু ষোল কোটি বাংলাদেশের জনগণ নয়, পুরা উপমহাদেশের নিপীড়িত ও মজলুম জনগণের আত্মোপলব্ধি, ঐক্য ও সংহতির জন্য বাংলাদেশের জনগণকে লড়ে যেতে হবে।

২৪ জুলাই ২০১৮। ৯ শ্রাবণ ১৪২৫। শ্যামলী।

/চিন্তা ডট কম

 

 

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.