আন্দোলন ধ্বংসের প্রেসক্রিপশনে যুবদল- ক্ষমতাসীনদের ছকেই বক্রপথে হাঁটছেন বিএনপির কিছু লোভী নেতা

নিরপেক্ষ সরকার ও খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য আন্দোলনের ছক এঁকেছে বিএনপি। দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি বাঁচা-মরার লড়াইয়ে রাস্তায় নামবে। আগেই দলটিতে কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। কমিটি গঠনের পর জেলায় জেলায় চলছে নেতাকর্মীদের পদত্যাগ, বিএনপি অফিসে তালা, যুবদল সভাপতির কুশপুত্তলিকা দাহ, অধিকাংশ জেলায় সভাপতিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে বিক্ষোভ মিছিল। দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ– প্রত্যেকটি কমিটিই হয়েছে লাখ লাখ টাকার বিনিময়ে। যারা স্থানীয় রাজনীতির সাথে জড়িত, অভিজ্ঞ, মেধাবী এবং আন্দোলন-সংগ্রামে ত্যাগীদের বাদ দিয়ে ব্যবসায়ী এবং ঢাকায় যাদের বসবাস, ঢাকার নেতাদের বাসায় যাদের পদচারণা এমন নেতাদেরই কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিএনপির সাংগঠনিক সূত্রের দাবি– এসব কমিটি দলীয় সিদ্ধান্তের আলোকে হয়নি, মূলত এমন কিছু ব্যক্তি যারা দলে থেকেও অন্যের প্রেসক্রিপশনে দল চালায় এসব তাদের ষড়যন্ত্র। যাতে নির্বাচনের আগ মুহূর্তে আন্দোলন নস্যাৎ হয়ে যায়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কমিটি গঠনের পর নীলফামারিতে সবার পদত্যাগ, ভোলা অফিসে তালা ও কুশপুত্তলিকা দাহ এবং শীর্ষ নেতাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা, গাজীপুরে আগুন, ফেনীতে অসন্তোষ, বাগেরহাটের কেউ জানেই না কখন কমিটি গঠন হয়েছে! মাদারীপুরে ডিগবাজি, শরীয়তপুরেও একই স্টাইল। বিএনপির ত্যাগী নেতাদের ভাষ্য– এ ধরনের কমিটি গঠন করে লাভ কী? যেখানেই কমিটি সেখানেই অসন্তোষ! সমন্বয়ের মাধ্যমে একটা কমিটিও নেই। আন্দোলনের আগ মুহূর্তে কমিটি গঠনের মাধ্যমে দলে অনৈক্য তৈরি ষড়যন্ত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এদিকে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ শেষ প্রায় দুবছর হলো। ভাঙা কোমর নিয়ে তারাও এখন জেলা কমিটি দেওয়ার প্রতিযোগিতায়।

এদিকে দেড় বছর পার হলেও এখনো ৫ জনের কমিটি দিয়েই যুবদল পরিচালিত হচ্ছে! বিএনপিপাড়ায় যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটি এখনো মেরুদ-হীন বলে জানা যায়। মাসের পর মাস, বছরের পর বছর পার হলেও হয় না জেলা কমিটি। প্রায় ১৫ বছরেও কমিটি নেই এমন জেলাও রয়েছে। কেন্দ্রীয় কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে যারা ব্যর্থ হয়েছে তারা এখন হঠাৎ করে নদীর স্রোতের মতো কমিটি দিয়ে যাচ্ছে। মাঠপর্যায়ে নেতাদের এ নিয়ে ভাবিয়ে তুলছে। বিএনপির নীতিনির্ধারক পর্যায়ের তিন নেতার সাথে এ নিয়ে কথা হয় আমার সংবাদের। তারা বলেন, এ কমিটি মূলত সরকারি দলের প্রেসক্রিপশনে হচ্ছে, যারা ত্যাগী, মাঠে রয়েছেন, রাজনৈতিক অভিজ্ঞ, তারা কেউ কমিটিতে স্থান পাচ্ছে না। একটা কমিটি গঠন হওয়ার আগে স্থানীয় শীর্ষ ও অভিজ্ঞ নেতাদের পরামর্শ নিতে হয়। কারো পরামর্শ ছাড়াই যুবদল সভাপতির একক ইচ্ছায় এসব কমিটি হচ্ছে। যাদের রাজপথে অভিজ্ঞতা নেই, এমন ব্যবসায়িক নেতাই নেতৃত্বে আসছে, বাদ পড়ছে মাঠের নির্যাতিত নেতারা। প্রতি কমিটিতে ৮ থেকে ৩০ লাখ টাকা নাড়াচাড়া হয় বলে তথ্য রয়েছে তাদের কাছে।

টাকার বিনিময়ে এসব কমিটি অনুমোদনে রয়েছে তারেক জিয়ার একজন উপদেষ্টাও। এছাড়াও দুজন স্থায়ী কমিটির সদস্য, দুজন ভাইস-চেয়ারম্যানও সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ রয়েছে। ইতোমধ্যে যারা দল ধ্বংসের ষড়যন্ত্র করছে তাদের একটি তালিকা করছে একটি গোষ্ঠী। বেগম খালেদা জিয়া বেরিয়ে এলেই তথ্য প্রমাণের ভিত্তিতে এই তালিকা খালেদার হাতে তুলে দেয়া হবে। দলের শীর্ষ এক নেতার মন্তব্য– এখন কমিটি গঠন মানে প্রতিটি নেতার নামে ডজনে ডজনে মামলা। আন্দোলন শুরু হওয়ার আগেই মামলার ভয়ে ওইসব নেতার কাউকেই তখন খুঁজে পাওয়া যাবে না। ক্ষমতাসীনদের ছকেই বক্রপথে হাঁটছেন বিএনপির কিছু লোভী নেতা।

কারা হাঁটছেন বক্রপথে? আমার সংবাদের অনুসন্ধানে উঠে আসে সেই গল্পও। গত ১২ জুন রাজধানীর উত্তরার একটি বাসা থেকে যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুলতান সালাহ উদ্দিন টুকুকে আটক করে পুলিশ। যুবদলের একটি সূত্র আমার সংবাদকে নিশ্চিত করেছে, সেদিন সেই বাসায় বৈঠকের কথা বলেই টুকুকে ডেকে নেয়া হয়। সেই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন যুবদলের সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব, সিনিয়র সহ-সভাপতি মোর্ত্তাজুল করিম বাদরু, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন ও সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন হাসানও। সেই বৈঠকে উপস্থিত থাকা দুজনের সাথে কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তারা বলেন, মূলত নির্বাচন ও আন্দোলনকে কেন্দ্র করে সারা দেশের কমিটি নিয়ে আলোচনা হয় সেই বৈঠকে। নির্বাচনের আগে আন্দোলনে যুবদল নেতাদের ভূমিকা কী হবে সেই আলোকে রোডম্যাপ তৈরির পরামর্শ আসে। তবে হুট করে কমিটি ঘোষণার পক্ষে ছিলেন না টুকু ভাই। এ মুহূর্তে কমিটি ঘোষণা করলে দলে বিশৃঙ্খলা তৈরি হবে– এমন মতই দিয়েছিলেন তিনি। দলে প্রকৃতপক্ষে যারা ত্যাগী, মাঠে আন্দোলন সংগ্রামে বিগত সময়ে যাদের সরব উপস্থিতি ছিলো সব কিছু যাছাই বাছাইয়ের মাধ্যমেই কমিটির পক্ষে ছিলেন টুকু ভাই। ওই বৈঠকে দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নাম ব্যবহার করে কমিটির পক্ষেই জোর দাবী তুলেন নীরব। এক পর্যায়ে কমিটি দেয়া, না দেয়া নিয়ে তাদের মাঝে মন-মালিন্য দেখা দেয়।

কিছুক্ষণ পর সাদা পোষাকের লোকজন এসে সেই বৈঠকের পর টুকু ভাইকে নিয়ে যায়। বৈঠকে থাকা একজনের ধারণা, এটি দলের সভাপতি নীরবের কাজ হতে পারে। কমিটি নিয়ে বাণিজ্য চালাতে এবং আন্দোলনকে ধ্বংস করতে কারো প্রেসক্রিপসন নিয়ে এমন কাজ করেছেন নীরব! টুকু আটক হওয়ার পর দলের ভূমিকা কী হচ্ছে এ নিয়ে পরিবারের দুই সদস্যদের সাথে কথা বললে তারা জানান, দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পরিবারের লোকজনকে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নিয়েছেন, সিনিয়র যুগ্ন মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও খোঁজ নিয়েছেন। যুবদলের ভূমিকা কি হচ্ছে এ নিয়ে জানতে চাইলে তারা এ বিষয়ে মন্তব্য করতে নারাজ। এ বিষয়ে তার স্ত্রীও কোন গণমাধ্যমের সাথে কথা বলছেন না। এদিকে দলের সাধারণ সম্পাদক টুকু আটকের মাত্র ৭ ঘন্টার মাথায় ১৩ জুন দেশের ১৩ সাংগঠনিক জেলায় যুবদলের আংশিক (পূর্ণাঙ্গ) কমিটি অনুমোদন দেন সভাপতি সাইফুল আলম নীরব ও ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম নয়ন। এর মাধ্যমে নীরবের স্বেচ্ছাচারিতা প্রকাশ পায়। দলে নীরবের উপর সন্দেহের তীর আরো বাড়ে। যেখানে হওয়ার কথা ছিলো টুকুর মুক্তির আন্দোলন ও কর্মসূচী, সেখানে কমিটি গঠনের মাধ্যমে দলে চলছে উৎসব। এর কিছুদিন পর ঢাকা মহানগর উত্তরের ১৭টি থানার আংশিক ও পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয়। বিএনপিতে ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের বাদ দিয়ে ‘অর্থের বিনিময়ে’ঢাকা মহানগর উত্তরের কমিটি ঘোষণার প্রতিবাদে নয়াপল্টনে দলীয় কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করেছে কমিটিতে পদ না পাওয়া নেতাকর্মীরা। পদপ্রত্যাশীদের অভিযোগ বিএনপির ইতিহাসে মহানগর উত্তরে এটিই প্রথম ‘পকেট’কমিটি। দলের আরো একটি অনির্ভর সূত্রের মত, এ মুহূর্তে যেসব জেলায় ছাত্রদলের কমিটি গঠন হচ্ছে সেখানেও নীরব, দলের এক স্থায়ী কমিটি , একজন ভাইস চেয়ারম্যান ও তারেকের এক উপদেষ্টার ইন্ধন রয়েছে। যার মূল টার্গেটেই হলো সেপ্টেম্বর- অক্টোবরে বিএনপিতে আন্দোলনের যে ছক রয়েছে তা ধ্বংস করা। কমিটি গঠনের পর উঠে আসে সারা দেশে ক্ষোভের চিত্র। ভোলায় দীর্ঘ ১৪ বছর পর কেন্দ্র থেকে যুবদলের কমিটি ঘোষণার পর তা প্রত্যাখ্যান করে শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে জেলা বিএনপি অফিস ও জেলা যুবদল অফিসে তালা ঝুলিয়ে দেন নেতাকর্মীরা।একই সঙ্গে কেন্দ্রীয় যুবদল সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরব ও সহসভাপতি নুরুল ইসলাম নয়নের কুশপুত্তলিকা দাহ করেন। ভোলায় তাদের অবাঞ্ছিত ঘোষণা করা হয়। উল্লেখ্য, যুবদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাইফুল ইসলাম নীরবের বাড়ি এই ভোলায়।

বিএনপির চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার নিজ জেলা ফেনীতে যুবদলের সদ্য ঘোষিত কমিটি নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মাঝে ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে। দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় নেতারা বাদ পড়ায় সমালোচনার মুখে পড়েছে বিএনপির ভ্যানগার্ড খ্যাত এ সহযোগি সংগঠন। কমিটি ঘোষণার পর মামলার আসামী হয়ে পদত্যাগ করেন ফেনী জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি আনোয়ার হোসেন। এ নিয়ে কেন্দ্রকে একটি চিঠিতে আনোয়ার উল্লেখ করেন, ‘সদ্য ঘোষিত জেলা যুবদলের সিনিয়র সহ-সভাপতি হিসেবে আমার নাম ঘোষনা করা হয়। অথচ আমি দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর যাবত কোন রাজনীতির সাথে সক্রিয় কিংবা নিষ্ক্রীয়ভাবে জড়িত নেই, আমি একজন ব্যবসায়ী। একটি মহল আমার নাম ব্যবহার করে আমাকে ব্ল্যাকমেইল করে নিজেদের স্বার্থ হাসিলের লক্ষ্যে জেলা যুবদলের সদ্য কেন্দ্র ঘোষিত কমিটিতে আমার নাম দেয়। অথচ পদ প্রত্যাশীদের মধ্যে কামরুল হাছান দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থেকে এখনো প্রায় ১৭ মামলার আসামী হয়ে ফেরারী জীবনযাপন করছেন।

এছাড়াও রয়েছেন হায়দার আলী রাসেল ৩২টি মামলার আসামী, জাহিদ হোসেন বাবলু দুই ডজন মামলার আসামী । তালিকায় রয়েছেন দেলোয়ার হোসেন ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন পাটোয়ারীও। এছাড়া বাগেরহাটে সাবেক ছাত্রদলের দুই নেতা হারুন আল রশিদকে সভাপতি ও মোল্লা সুজাউদ্দিন সুজনকে সাধারণ সম্পাদক করে পাঁচ সদস্যের নতুন কমিটি ঘোষণা করার পর পরই নতুন কমিটির জেষ্ঠ্য সহ-সভাপতি নাজমুল হুদা এবং সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম সাজ্জাদ হোসাইন কেন্দ্রকে চিঠি দিয়ে পদত্যাগ করেন। চিঠিতে পদত্যাগী নেতারা সদ্য ঘোষিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে দল বিচ্ছিন্ন, বিতর্কিত ও আওয়ামী লীগ ঘরানার বলে দাবি করেছেন। অবিলম্বে এই কমিটি বাতিল করা না হলে যুবদলের সকল সাংগঠনিক ইউনিটের নেতারা একযোগে পদত্যাগ করাসহ কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুমকি দিয়েছেন ওই পদত্যাগীরা।
অভিযোগ আছে , গাজীপুরেও যুবদলের পকেট কমিটি গঠন হয়েছে। এ নিয়ে ত্যাগি নেতারা ক্ষুব্ধ হয়ে দলীয় কার্যালয়ে পেট্রল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দেন। কমিটি ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিএনপি কার্যালয়ে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় নেতা মাহমুদুল হাসান রাজুর নেতৃত্বে আগুন দেন নেতাকর্মীরা। হাসান বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলনের অনুসারী। দলীয় কার্যালয়ে আগুন দেয়ায় পুড়ে গেছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, কারাবন্দি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ছবি।

এছাড়াও বিতর্কিত কমিটি গঠন হয়েছে মাদারীপুরে। ঘোষিত কমিটি ১ ঘণ্টার ব্যবধানে তা পরিবর্তন করা হয়। প্রথমে সরোয়ার হোসেনকে সভাপতি ও মোফাজ্জল হোসেন খান মোফাকে সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি ঘোষণা করা হয়। কিছুক্ষণের মধ্যে তা পরিবর্তন করে মোফাজ্জল হোসেন খান মোফাকে সভাপতি ও মো. ফারুক বেপারিকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। দলীয় নেতাকর্মীদের অভিযোগ, তারেক রহমানের নাম বিক্রি করে ঘোষিত কমিটি ঘন্টার মধ্যে পরিবর্তন করে দেন তারেকের ঘনিষ্ঠ বেলায়েত হোসেন। তিনি সাবেক ছাত্রদল নেতা ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা তালুকদার আনিসুর রহমান খোকন দ্বারা প্রভাবিত হয়েই মূলত এ কাজটি করেছেন। এ নিয়ে স্থানীয় নেতারা পল্টন নেতাদের সামনে এসে উচ্চস্বরে চেঁচামেচি করে করে এ ধরণের কমিটি গঠন বন্ধ করতে হুশিয়ারী দিয়ে যান।

সারাদেশে কমিটি নিয়ে বিএনপিতে বিভক্ত এবং এটি আগামী আন্দোলনে কোনো প্রভাব ফেলবে কিনা জানতে চাইলে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও যুবদলের সাবেক সভাপতি মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল আমার সংবাদকে বলেন, নিশ্চয়ই যারা কমিটি গুলো করছে তারা আমাদের চাইতে অভিজ্ঞ। আমি মনে করি কমিটি গুলো করা ঠিক হচ্ছে। এ কমিটির আলোকে আগামী নির্বাচনের আগে নেতাকর্মীদের এক তরফায় মামলার ঝুঁকি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আসলে এই সরকার বিএনপি নেতাকর্মীদের নির্যাতন করবে। তারা কমিটিতে থাকলেও মামলা হবে , না থাকলেও মামলা হবে। সরকারের নির্যাতন থেকে বিএনপি নেতাকর্মীরা বাঁচার কোনো উপায় নেই। কমিটি গঠন এটি দলে স্বাভাবিক বিষয়। দেড় বছরেও যুবদল কেন্দ্রে পূর্ণাঙ্গ কমিটি না করে হুট করে সারাদেশে কমিটি দিয়ে দিচ্ছে এটি কি আদর্শিক যুক্তির কাতারে পড়ে কিনা এমন প্রশ্নে আলাল বলেন, আসলে কেন্দ্র কমিটি অবিলম্বে পূর্ণাঙ্গ করা উচিৎ। আগে নিজেদের মেরুদন্ড শক্ত করা উচিৎ ছিলো। কমিটি ঘোষণার পর বেশ কিছু যায়গার প্রতিক্রিয়া শুনতে পেয়েছি, আসলে আমিতো সব কিছু নিয়ে মন্তব্য করতে পারি না।
যুবদলে কমিটি গঠনের পরপরই ফের আলোচনায় চলে আসে সভাপতিকে নিয়ে। কে এই নীরব? এ নিয়ে দলের নির্ভরযোগ্য সূত্রের সাথে কথা বলে অনুসন্ধানে জানা জানায়, নীরবের বেড়ে উঠা রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায়। আবার সেই একই এলাকা থেকে এখন ক্ষমতাসীন দলে রয়েছেন একজন শীর্ষ মন্ত্রী। তার সাথে নীরবের বহু দিন থেকে সখ্যতা। এ কারণে বিরোধী দলের নেতা হয়েও ক্ষমতাসীন দলের মর্যাদায় রয়েছেন তিনি। যার কারণে কখনো তাকে আইনী জটিলতায় পড়তে হয় না। প্রশাসনের বাধা কিংবা আইনী জটিলতায় পড়তে হয় না। শুধু তাই না, ওই মন্ত্রির প্রভাব নীরব দলেও খাটান। নিজের মতের বিরুদ্ধে গেলে ওই মন্ত্রীর সাহায্য যে কোন মুহূর্তে ব্যবস্থা নেয়ার ক্ষমতা রাখেন এই নীরব । এজন্য গত ১০ বছরেও নীরব রাজনীতিতে বড় পদ-পদবীতে থাকলেও কখন আটক হতে হয়নি তাকে। মামলার অজুহাতে রাজপথে বিগত সময়ে কোনো আন্দোলনেই দেখা মেলেনি নীরবকে। ঘরোয়া প্রোগ্রামেও কর্মীরা এই নেতার মুখ এখন দেখেন না। তাছাড়া সেই ১/১১-এর সময় থেকে দলে নীরবের ভূমিকা ছিলো প্রশ্নবিদ্ধ।তাহলে দলে সব সময় নীরবের পদ বড় থাকে কেন?

এ নিয়ে অনুসন্ধ্যানে আরো জানা যায়, নীরব তেজগাঁও পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট থেকে যখন এসএসসি পাস করেন, এরপর তার আর কোনো পড়াশোনা হয়নি। নীরবের ঘনিষ্ঠজনদের মত, তেজগাঁও কলেজ ও আবুজর গিফারী কলেজেও ভর্তি হয়েছিলেন কিন্তু পাশ করেছেন কিনা সেই তথ্য তাদে কাছে নেই। এর পর থেকে রাজনীতির প্রভাব আর টাকা কামাই এক সাথে করেছেন তিনি। তখন থেকেই দলে অর্থনৈটিক প্রভাবটা সব চেয়ে বেশী। টাকার বিনিময়ে সব কিছু ম্যানেজ তারপক্ষে সম্ভব! তাছাড়া ১৯৮৮ সালে তেজগাঁও থানার সেক্রেটারি নির্বাচিত হন নীরব।ওই সময় স্থানীয় বিএনপি নেতা রুহুল আমীন জাহাঙ্গীর ওয়ার্ড কমিশনার নির্বাচন করে ফেল করেন। এই জাহাঙ্গীরকে গুরু মেনেই নীরবের পলিটিক্সে যাত্রা। অভিযোগ, সে সময় থেকে তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিজি প্রেস, সেন্ট্রাল প্রেস, গভঃ প্রিন্ট্রিং প্রেসের প্রায় ৫শকোটি টাকার কাজ এককভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করেন এই যুবনেতা। এ ছাড়া এই তিন প্রেসের কয়েক হাজার টন বাতিল কাগজ কোনো টেন্ডার ছাড়াই নিয়মিতভাবে নিতেন তিনি। ১৯৮৯ সালে নীরব শিষ্যত্ব নেন সে সময়কার ছাত্রদলের প্রখ্যাত ক্যাডার উজি সাবমেশিনগানখ্যাত কামরুজ্জামান রতনের। রতন তার সহায়তায় ১৯৯৪ সালে মহানগর ছাত্রদলের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ সময় তার উত্থান উল্কার মতো ছুটতে থাকে। ভিপি সোলায়মান, পলিটেকনিকের মিজান, কালা জাহাঙ্গীর, আচ্ছি বাবু, নাখালপাড়ার জব্বর মুন্না প্রমুখকে নিয়ে গড়ে উঠে তার বিশাল ক্যাডার বাহিনী। ২০০১ সালে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এলে তারেক রহমনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের চাচাতো ভাই পরিচয়ে পিডাব্লিউডি, সিএএমএমইউ, ফ্যাসিলিটিজ ডিপার্টমেন্টে যাবতীয় কাজ বাগিয়ে নেন।

একই সঙ্গে শিল্পাঞ্চলসহ সারা ঢাকা শহরে চলতে থাকে তার চাঁদাবাজি। চাঁদাবাজির অভিযোগে ২০০২ সালে অপারেশন ক্লিনহার্টে মহাখালী ডিওএইচএস থেকে আটক হন নীরব। কিন্তু গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের ফোনে এবং তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় চারদিনের মাথায় ছাড়া পান তিনি।দীর্ঘ সময়ে নেতৃত্বর নানা পালাবদল হলেও দলের হাজার হাজার নেতাকর্মী কারাগারে গেলেও প্রায় এক দশক আর এই নেতাকে কারাগারে যেতে হয়নি। যুবদলের যায়গা পেয়ে নীরবকে আর পেছনে তাকাতে হয়নি। নেতৃত্ব বিরোধী দলে তবুও ক্ষমতাসীনদের কোনো বাধায় তাকে পড়তে হয় না। এ নিয়ে নীরবকে গত বুধবার থেকে শুক্রবার রাত পর্যন্ত ফোনে চেষ্টা করেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। তার ব্যাক্তিগত ফোন নাম্বারটিও সংযোগ নেই। সিনিয়র বেশ কয়েকজন সাংবাদিকদের মত, টুকু আটক হওয়ার পর থেকে নীরব কোনো গণমাধ্যমকে মন্তব্য দিচ্ছেন না এবং তার ফোনেও সংযোগ মিলছে না।

 

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.