“ম্যায় রাজা বনুঙা!”

শামসুল আলম
______________
নো! মিস্টার জেনারেল, আপনি এখন সত্য বলছেন না। আপনি একটা মিথ্যুক। রাজনীতিকদের দোষ দিয়ে আপনি এখন নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করতেছেন? কেনো? কিসের ভয় আপনার? আপনি সত্যি যদি কোনো মিলিটারী জেনারেল হয়ে থাকেন, তাহলে বাপের ব্যাটার মত সত্যটি বলতে পারতেন- “হ্যা, আমি রাজা হতে চেয়েছিলাম!”–“কিংস পার্টি গঠন করে করে বেসিক ডেমোক্রেসির মত ইনডাইরেক্ট নির্বাচন করে আমি প্রেসিডেন্ট হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু পারিনি।” তখন আপনার শিষ্য বারীর পরামর্শে আজহার আলী সরকার ‘দৈনিক আমাদের সময়’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, “রাষ্ট্রপতি হতে চান জেনারেল মইন!” একই কথা ব্রিগেডিয়ার বারীও বলেছিলেন বিএনপির কয়েকজন এমপিকে! দেশের তৎকালীন মিডিয়াতে এ সংক্রান্ত বহু প্রমান রয়ে গেছে।
 
বিষয়টি নিয়ে মহিউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর এবারের ঈদ বিশেষ সংখ্যায় ১/১১ শিরোনামে ২২ পৃষ্ঠার এক বিশেষ নিবন্ধ লিখেছেন, যার মধ্যে ঐ ঘটনার কুশীলবদের সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে। যার প্রেক্ষিতে এ লেখাটি লিখতে হলো।
 
জেনারেল সাহেব। এখন ইনিয়ে বিনিয়ে আপনি যতই বলুন না কেনো- তখন দেশের পরিস্থিতি খারাপ ছিল, হরতাল ধর্মঘট ছিল, রাস্তায় মারামারি ছিল, মানুষ কষ্টে ছিল, তাই আপনি দেশ উদ্ধারে এগিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু আপনি ঐ অঘটনের অন্তর্নিহিত সত্যটি প্রকাশ করছেন না। দেশের পরিস্থিতি খারাপ ছিল এটা সত্য, কিন্তু তাই বলে আপনি সেনাপ্রধান বা ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান ব্রিগেডিয়ার বারী রাষ্ট্রপতিকে চাপ দিয়ে জরুরী অবস্থা জারী করতে পারেন না! ওই কাজ করার কোনো ম্যান্ডেট বা উপযুক্ত ক্ষমতা আপনাদের ছিলনা। তদুপরি আপনারা তা করেছেন। ইলেকশন একপেশে হলেই তাতে ইন্টারফেয়ার করা সেনাবাহিনীর দায়িত্ব নয়। যদি তাই হতো, তবে ২০১৪ সালের ভুয়া নির্বাচন নিয়ে কেনো কথা বলছেন না, এই ভোটারবিহীন বয়কটের নির্বাচনের পর সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুইয়া তো জরুরী অবস্খা জারী করেননি। তার মানে দাড়ায়, আপনি এবং আপনার সাথীরা তখনকার রাজনৈতিক সংকটকে পুঁজি করে ক্ষমতা দখল করতে গিয়েছিলেন। আপনি এবং বারী দু’জনেই জানিয়েছেন, আপনারা অনেকদিন থেকে সলাপরামর্শ করছেন- জরুরী অবস্থা জারী করতে চান। জেনারেল মাসুদের সাথেও এ বিষয় নিয়ে পরামর্শ করেছেন। কিন্তু বারী ১১ জানুয়ারির আগেই ঘটনা ঘটাতে চাওয়ায় আপনি তাকে অপেক্ষা করতে বলেছেন- অর্থাৎ উপযুক্ত সময়ে ইন্টারফেয়ার করবেন! তার মানে, আপনারা ১/১১র জন্য পরিস্থিতি তৈরী করেছিলেন, অথবা সুযোগের অপব্যবহার করেছেন! উল্লেখ্য ওয়ান ইলেভেনের পরিবেশ সৃষ্টি করতে ১০ জানুয়ারী সকাল পৌনে দশটায় হঠাৎ তেজগাঁও, রোকেয়া স্মরণী এবং সাভারে বিভিন্ন গার্মেন্ট কারখানায় একযোগে আগুন দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করা হয়। ভস্মীভূত হয়ে যায় তেজগাঁওয়ের নাসসা গ্রুপ, পদ্মা ফ্যাক্টরী সহ অনেক গার্মেন্টেস। সেই আগুণ লাগানো অর্গানাইজ করা হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার বারীর পরিকল্পনায়। পুরোটাই ছিলো আপনাকে ক্ষমতায় আনার লক্ষ্যে পরিকল্পিতভাবে রাস্তাঘাট সহিংস করা, শিল্পে আগুণ দেয়া ও মানুষ মারার কৌশল!
 
৫ থেকে ১০ জানুয়ারী বাংলাদেশের ঘটনাবলীর খুব দ্রুত পরিবর্তন ঘটতে থাকে। ৫ জানুয়ারী মার্কিন রাষ্ট্রদূত বিউটেনিস সকল কূটনৈতিক শিষ্টাচার লংঘন করে সেনানিবাসে সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের পিএসও মেজর জেনারেল জাহাঙ্গীরের সাথে দেখা করেন। পরে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার চৌধুরী সেনানিবাসে আপনার সাথে সাক্ষাৎ করে ১/১১র বিষয়াদি চুড়ান্ত করেন। হাবিব ভিলাতে বিউটেনিসের সাথে আপনার বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনীতির ভাগ্য নির্ধারন করেন- আপনি সামরিক শাসন জারী করে রাষ্ট্রপতি হতে চাইলেও বিউটেনিস রাজী না থাকায় জরুরী অবস্থা নিয়েই খুশী থাকতে হয় আপনাকে!
 
চৌধুরী ফজলুল বারীর মত সেনা অফিসার, যাকে মেজর থেকে তুলে বিএনপি অকালে ব্রিগেডিয়ার বানায়, ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত ডিজির দায়িত্ব পালন করেও বারী যখন প্রকাশ্য সাক্ষাৎকারে মন্তব্যে “দেশের মানুষরে পাছায় লাত্থি দিয়া” জাতীয় শব্দ প্রয়োগ করেন, তখন ভাবনা হয়, এ কি কোনো সেনা অফিসার, নাকি রাস্তার মস্তান? জনগন ও রাজনীতিকদের নিয়ে এ জাতীয় অবমাননাকর শব্দ প্রয়োগ বড়ই আনপ্রফেশনাল এবং অসভ্যতা! ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবে গোয়েন্দা বিষয়সমুহ নিয়ে বারী অবহিত করবেন কেয়ারটেকার সরকারের প্রধান ড. ইয়াজউদ্দিনকে। ওটাই তার কাজ। অথচ তিনি সেটা না করে ডাইনে বামে দৌড়াদৌড়ি করেছিলেন, রাষ্ট্রের গোপন তথ্যাদি শেয়ার করেছেন আপনার ভাই টিপু সহ আরও বহু জনের কাছে। এমন কিছু ঘটনা আমারও জানা আছে। আপনার কাছে বার বার ছুটে গিয়ে ক্ষমতা দখলের ষড়যন্ত্র করছিলেন বারী! বারীর ভাষায়- “আমি বারে বারে ইনসিস্ট করলাম”, “মেকানিজম যা করার করা হইল”–তিনি নিজেই বলে দিচ্ছেন সবকিছু করা হয়েছে মোকানিজম করে! Who he was to insist? এসব কাজ মারাত্মক আনপ্রফেশনাল, কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রদ্রোহিতার সামিল।
 
ডিজিএফআইর ভারপ্রাপ্ত প্রধান হয়ে বারী ঘনঘন আপনার কাছে গিয়ে ফুসুর ফাসুর করতো কেনো? ওটা ছিল ষড়যন্ত্র! কোনো অবস্খাতেই তিনি ঐসব করতে পারেন না। প্রধান উপদেষ্টার কাছে দেশের অবস্থা রিপোর্ট করার বদলে তিনি আপনার কাছে কেনো ফন্দি আঁটতে যেতেন কেনো? সেনাপ্রধান তো তার বস ছিল না। ১১ জানুয়ারি দুপুরে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিনের সভাপতিত্বে বঙ্গভবনে আইন শৃঙ্খলার মিটিংয়ে বারী যোগ দিতে গেলেন, অথচ তার পকেটে ছিল জরুরী অবস্থার কাগজ! এরপরে কি আর বলার কোনো দরকার আছে যে- “আমরা করি নাই, যা করার ইয়াজউদ্দিন করছে”? কত বড় বেইমান ও মোনাফিক হলে এসব করা সম্ভব- কল্পনা করা যায়! ঐসময় আপনার অফিস থেকে আপনি ফোন করে বারীকে বলেন- “আমি আসতেছি, তুমি থাইকো!”
 
সেদিন বঙ্গভবনে আপনার কোনো এপয়েন্টমেন্ট ছিল না, অথচ এমএসপি মেজর জেনারেল আমিনুল করিমের সঙ্গে লাইন করে বঙ্গভবনের গেট থেকে পিজিআর সরিয়ে দিয়ে আপনি এবং আপনার বাহিনী অনুপ্রবেশ (invade) করিয়েছিলেন। পিজিআর প্রধান ব্রিগেডিয়ার আবু সোয়াহেল যখন আপনাকে বঙ্গভবনের গেটে আটকে দেয়, তখনই তাকে পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে আপনি কর্নেল এমদাদকে নির্দেশ দিয়ে পিজিআর সরিয়ে ভেতরে ঢোকেন, সেই এমদাদকেও পরে বিডিআরে পাঠিয়ে পিলখানায় হত্যা করা হয়!
 
যাই হোক, বঙ্গভবন নিয়ে ষড়যন্ত্রটা ছিল খুব পরিস্কার। আপনারা যখন রাষ্ট্রপতিকে আটকে ফেললেন, তখন আপনিসহ তিনজন সশস্ত্র অবস্থায় ছিলেন। তারপরে রাষ্ট্রপতিকে চাপ দিয়ে জরুরী অবস্খার কাগজে সই করালেন আপনি! রাষ্ট্রপতির কক্ষে সশস্ত্র অবস্থায় যাওয়ার এখতিয়ার কি ছিল আপনাদের? মোটকথা, আপনারা রাষ্ট্রপতিকে ভয় দেখিয়েছিলেন। কথাবার্তার এক পর্যায়ে ব্রিগেডিয়ার বারী পকেট থেকে বের করেছিল প্রধান উপদেষ্টার পদত্যাগপত্র, জরুরী অবস্খা জারীর আদেশ, রুলস, ও রাষ্ট্রপতির ভাষণের ড্রাফট। এর মানে যা দাড়ায়, ক্ষমতা দখলের সকল প্রস্তুতি নিয়েই বঙ্গভবনে অনুপ্রবেশ করেছিলেন আপনারা! আপনার উদ্দেশ্য ছিল ক্ষমতা দখল করা, এবং সেজন্য মার্শাল জারী করতে না পেরে জরুরী অবস্থা দিয়েই ধরপাকড়, নির্যাতন, সহায় সম্পদ ভাঙচুর করে জনমনে ত্রাস সৃষ্টি আপনি ডি-ফ্যাক্টো সামরিক রুলার হয়ে বসলেন। প্রথমেই আপনার বাহিনী দুর্নীতি উচ্ছেদের নামে রাজনীতিবিদদের ধরপাকড় শুরু করে। সারাদেশে চলে অবৈধ হাট-বাজার আর বস্তি উচ্ছেদ অভিযান। অন্যদিকে তাদের টার্গেট ছিল দেশের সকল অঞ্চলের সব শ্রেণীর ব্যবসায়ী। তাদের শিকার হন রাজধানী ও মফস্বলের উঁচু ও নিচু পর্যায়ের সব রাজনৈতিক নেতাকর্মী। আর ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী- ভেঙে ফেলা হয় যুগ যুগ ধরে চলে আসা গ্রামগঞ্জের হাট-বাজার। উচ্ছেদ করা হয় শহরের ফুটপাতের হকারদের। উপড়ে ফেলা হয় বহু বস্তি ও উপশহর। কর্মহীন, গৃহহীন হয়ে পড়ে লাখ লাখ মানুষ। অসহায় হয়ে যায় অসংখ্য পরিবার। দ্রব্যমূল্য বাড়তে থাকে হু হু করে। সাধারণমানের চালের কেজি ৪০ টাকা পর্যন্ত ওঠে। মনে কি পড়ে সেসব?
 
জেনারেল মইন। আপনি এখন বাটে পড়ে দাবী করছেন, জাতিসংঘ মহাসচিব নাকি আপনাকে ‘ড্রাফট চিঠি’ পঠিয়ে শান্তিরক্ষী বাহিনী থেকে বাংলাদেশের সৈনিকদের বাদ দেওয়ার হুমকি দিয়েছিলেন? কিন্তু জেনারেল সাহেব, ওই ড্রাফট পত্রের গল্পটি যে স্রেফ আপনার বানোয়াট, তা স্বীকার করতে দ্বিধা কেনো? জাতিসংঘ আপনাকে ‘ড্রাফট পত্র’ পাঠাতে যাবে কেনো? চাইলে তারা ফরমাল চিঠিই পাঠাতে পারতেন। আর ইউ টকিং লাইক এন ইডিয়েট? জাতিসংঘের তৎকালীন ঢাকাস্থ প্রতিনিধি রেনাটা ২০১০ সালে সাক্ষাৎকার দিয়ে পরিষ্কার বলেছেন, ঐরূপ কোনো চিঠি জাতিসংঘ থেকে পাঠায়নি। তাছাড়া সাবেক আইজিপি খোদাবক্স জাতিসংঘের কর্মকর্তার সাথে পরে কনফার্ম হয়েছেন, জাতিসংঘ ঐরূপ কোনো চিঠি পাঠায়নি। অর্থাৎ আপনি জাতিসংঘের নামে বানোয়াট চিঠির গল্প বলে রাষ্ট্রপতি ইয়াউদ্দিনকে বিভ্রান্ত করেছিলেন, মিষ্টার মইন। স্বীকার করুন।
 
জেনারেল সাহেব, এখন আপনি যতই বলছেন- আমরা কিছু করিনি, রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন সব করেছেন, আসলে তা সত্যি নয়। এসএসএফের সহায়তায় রাষ্ট্রপতিকে তখন প্রায় বন্দী করে রেখেছিলেন আপনারা, এটা রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্টজনরা আমাকে বলেছেন। ঐ অবস্থায় রাষ্ট্রপতির উপর জোর প্রয়োগ করে জরুরী অবস্থার কাগজে সই নিয়ে সকল দন্ডমুন্ডের কর্তা হয়ে বসেছিলেন আপনি! সেদিন বিনা রক্তপাতে বঙ্গভবন দখল করতে আপনার নেতৃত্বে কয়েক’শ সেনাকর্মকর্তা ভিতরে এবং বাইরে অবস্থান নিয়েছিল। বঙ্গভবনের ভেতরে ও বাইরে এ সময় যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করছিল। এমনকি রাষ্ট্রপতির বেডরুমের বাইরেও স্বয়ংক্রিয় রাইফেল নিয়ে সেনা কর্মকর্তা দন্ডায়মান ছিল। আপনার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাসুদ সাভার সেনানিবাস হতে শত শত সৈন্য নিয়ে ট্যাংক সহ ভারী অস্ত্র সহ হাজির হন বঙ্গভবনে। ট্যাংকবাহিনীর উপস্থিতির আগ পর্যন্ত আপনার কথামত সাক্ষর করতে রাজী হননি রাষ্ট্রপতি। তিনি যখন দেখলেন- জেনারেল মাসুদও আপনার সাথে হাত মিলিয়েছে, তখন বয়োবৃদ্ধ রাষ্ট্রপতি নিরুপায় হয়ে আপনার নির্দেশমত কাগজপত্রে সাক্ষর করেন! এ প্রসঙ্গে আপনার লেখা নিজের উক্তি, “আমার বুঝতে কষ্ট হচ্ছিলো না, আমি যা করতে যাচ্ছি তাতে ভয়ঙ্কর ঝুঁকি বিদ্যমান। কিন্তু দেশ ও সেনাবাহিনীর প্রশ্নে আমি সেই ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত হয়ে উঠলাম।”—-“কিন্তু আমি তখন দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ, পরিস্থিতি যাই হোক, যতো ঝুঁকিপূর্ণ হোক, আমি আমার চেষ্টা করবো।” এ সময় রাষ্ট্রপতি তাঁর স্ত্রীর সাথে কথা বলতে চাইলেও আপনি সে অনুমতি দেননি। কেননা আপনি জানতেন বার বার ব্যর্থ হবার পরে এবারে ব্যর্থ হলে নির্ঘাত মৃত্যু। মনে কি পড়ে- ২০০৭ সালের ২ এপ্রিল হোটেল শেরাটনে রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে কে যেনো ঘোষণা করেছিল- ‘অউন ব্রান্ড ডেমোক্রেসি’ চালু করব? সেটাই কি আপনি? দেশে কেমন গণতন্ত্র থাকবে- সেটা ঠিক করার আপনি কে ছিলেন?
 
ড. ইউনুসকে চীফ এডভাইজার বানাতে চেয়েছিলেন আপনি এবং আপনার জেনারেলরা, তিনি রাজী নয় হওয়ায়ে পরে ফখরুদ্দিনকে বানিয়েছিলেন কোন্ সাংবিধানিক ক্ষমতায়? আপনাদের সে ক্ষমতা দিয়েছিল কে? সংবিধান, নাকি জনগন? কেউ দেয়নি, অথচ ঐ অপকর্ম করে আপনারা সংবিধান লংঘন করেছিলেন। কারন সংবিধান অনুসারে- কোনো বিশিষ্ট ব্যক্তিকে চীফ এডভাইজার করতে হলে রাষ্ট্রপতিকে অবশ্যই প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের সাথে পরামর্শ করার বাধ্যবাধকতা ছিল। সেটা কি করা হয়েছিল? না। প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দল বলতে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দল অর্থাৎ বিএনপি, আওয়ামীলীগ, জামায়াত, জাপা ইত্যাদি। তাদের সাথে রাষ্ট্রপতি অফিসিয়াল পরামর্শ ছাড়া কেবল আপনাদের কথায় ফখরুদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা নিয়োগ করতে পারেন না। অথচ সে কান্ডটাই হয়েছে! আপনি এবং বারী বলছেন, আপনারা এডভাইজার ঠিক করেছেন, কারও কারও নাম উঠেছে, আবার বাদও দিয়েছিলেন আপনারাই! কি ক্ষমতা!!! আপনাদিগকে এসব করার ক্ষমতা কে দিয়েছিল? মোটকথা ফখরুদ্দিনকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়েছিলেন আপনারা কয়েকজন জেনারেল। আপনাদের সেই অধিকার ও ক্ষমতা সংবিধান দেয়নি। তাই ফখরুদ্দিনের নিয়োগ এবং তার সকল কর্মকান্ড অসাংবিধানিক। একদিন না একদিন এটা অবৈধ ঘোষণা করবে উচ্চ আদালত। সময় আসলে এনিয়ে আমিই রীট করতে চাই। দেখা গেছে, জরুরী সরকারের সময়ে বিদেশ থেকে আগত মন্ত্রী এবং বিশিষ্টজনরা প্রধান উপদেষ্টার সাথে সাক্ষাতের পাশাপাশি আপনার সাথেও সাক্ষাৎ করতে বাধ্য হতো! মিস্টার জেনারেল, বলুন তো- এদেরকে আপনার কাছে কেনো পাঠাতো ফরেন অফিস? কারন, আপনি তখন ডিফ্যাক্টো রাষ্ট্রপতি হয়ে দেশ চালাচ্ছিলেন, এটাই সত্য। ফখরুদ্দিন এবং তার উপদেষ্টারা আপনার হুকুমে চলত। উপদেষ্টা পরিষদের মিটিংয়ে হঠাৎ ঢুকে আপনি এটা সেটা নির্দেশও দিতেন। এসব কি সেনাপ্রধানের কাজের মধ্যে পড়ে? জরুরী অবস্থা হলেও সেনাপ্রধান তা করতে পারেন না। অথচ আপনি ঐসব কান্ড করেছিলেন!!
 
২০০৮ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি আপনি ভারতে গেলেন পূর্নভাবে ক্ষমতায় বসার এজাজত আনতে- অর্থাৎ রাষ্ট্রপতি হতে। তাদের সমর্থন পেলেন না। উল্টো, তারা আপনাকে বললো- তাদের সমর্থনপুষ্ঠ দলের হাতে (অর্থাৎ আ’লীগের কাছে) ক্ষমতা হস্তান্তর করতে। ( এর ঠিক এক বছর পরে সেই ২৫ ফেব্রুয়ারি ঘটানো হয় পিলখানা ম্যাসাকার- এটা কি কাকতালীয়, নাকি সুপরিকল্পিত, তা ভেবে দেখা উচিত) এর বিনিময়ে আপনি লাভ করলেন সেইফ এক্সিটের নিশ্চয়তা। তারপরে যা হওয়ার তাই হলো- শেখ হাসিনার সাথে বসুন্ধকার সেইফ হাউজে বসে সবকিছু চুড়ান্ত হলো আপনার। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনের ফল আগেই তৈরী করা ছিল। হাসিনাকে দেয়া হলো এমন সংখ্যক সিট, যাতে প্রয়োজনমত সংবিধান সংশোধন করেও প্রতিবেশীর সকল চাহিদা পুরণ করতে পারেন। বিএনপিকে ৩০টির বেশি আসন দেয়া হবেনা- সেটা গোয়েন্দাসূত্র আমাকে জানিয়েছিল ঠিক চার দিন আগে। এভাবেই বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধংস করে দিয়ে হাসিনার কাছে আপনি ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন, আর ভারতের রাডারের মধ্যে বাংলাদেশটাকে ঢুকিয়ে দিলেন আপনি–যেটি পাওয়ার জন্য তারা তিন যুগ ধরে নানা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এভাবে আপনি মস্তবড় রাষ্ট্রদ্রোহ অপরাধ সংঘটন করলেন।
 
এতদিন চুপ ছিলাম, এখন কিছু সত্য প্রকাশ করি_____________
আমি সেই শামসুল আলম, যার ফোন পেয়ে ২০০৫ সালের মধ্য জুনের এক বিকেলে আপনি প্রধানমন্ত্রীর অফিসে ছুটে এসেছিলেন, অতঃপর প্রধানমন্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ করার পরে আপনাকে চীফ বানানো হলো, সেকথা আপনার বইতে উল্লেখ করেছেন। আমি বেসামরিক অফিসার হলেও আপনাদের ফৌজি খবরাদি যেভাবেই হোক আমার কানে চলে আসত। আমি হলফ করে বলতে পারি- ২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর পল্টনে লগি-বৈঠা দিয়ে পিটিয়ে জামায়াতের কর্মী হত্যার ঘটনার সাথে আপনাদের আগে থেকেই যোগসাজস ছিল। ওই রকম ঘটনা ঘটবে, তা আপনারা আগেই জানতেন, নইলে পরে কি করবেন তার পুর্বপ্রস্তুতি নিয়েছিলেন কেনো? তারও কয়েকমাস আগে থেকে বিএনপির মন্ত্রী-এমপি ও নেতাদের নাম ঠিকানা ছবি সহ তালিকা তৈরী করছিল গোয়েন্দা অফিসাররা- পরে জানা গেলো কাকে কাকে ধরা হবে সেই লিস্ট তৈরী করছিলেন। এমনকি বিএনপি সরকারের গুরুত্বপূর্ন ব্যক্তিদের ফোনে আড়ি পেতে তাদের অনিয়ম ও দুর্বল পয়েন্ট ধরে তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রোফাইল তৈরী করা হয়, যা দিয়ে পরবর্তীতে তাদেরকে হেনস্তা করা হয়, জেল দেয়া হয়! ঐ লিস্ট তৈরীর উপাদান (মন্ত্রি-এমপিদের হালনাগাদ ঠায় ঠিকানা ছবি) সংগ্রহ করতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আমার কাছে দু’দফা সেনা কর্মকর্তা পাঠানো হয়েছিল, যদিও সেটা তারা পায়নি।
 
পল্টন হত্যার পরের দিন ২৯ অক্টোবরেই আপনারা জরুরী অবস্থা জারী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। যেকোনো ভাবেই হোক, এ সংক্রান্ত সকল অর্ডারের ড্রাফট ডকুমেন্টগুলি কেবল আমার হাতে জমা করা ছিল। আমাকে বলা হলেও আমি সেগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে হ্যান্ডওভার করিনি, বরং কায়দা করে জরুরী অবস্থা ঘোষণা বন্ধ করতে সক্ষম হই। তদুপরি আপনাদের ষড়যন্ত্র চলতেই থাকে। দ্বিতীয় দফায় চিটাগাঙ পোর্টকে কেন্দ্র করে নভেম্বরের ১৭ তারিখে জরুরী অবস্থা জারীর চেষ্টা করা হয়। সে চেষ্টাও আমি একাই বন্ধ করেছিলাম। তৃতীয় দফায়, ডিসেম্বরের ১০ তারিখে আপনার নির্দেশে সারাদেশে সেনা মোতায়েন করা হয়, যদিও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রধান উপদেষ্টা রাষ্ট্রপতির অজ্ঞাতেই তা করা হয়। সেটি ছিল আপনার ফিল্ড প্রস্তুতি! তখন একজন জেনারেল মারফত খবর পেলাম- ২২ জানুয়ারির ইলেকশন বানচাল করা হবে, এবং ১২ জানুয়ারির মধ্যে মার্শাল’ল দিয়ে ক্ষমতা দখল করবেন আপনি; ম্যাডাম জিয়া সহ তাঁর ছেলেদের কারাগারে আটকে বিএনপির কন্ট্রোল নিবেন আপনি। এসব বিষয় ম্যাডামকে জানালেও তিনি ওভারলুক করেন, কারন বারী এবং তাঁর এক আত্মীয় উল্টা বুঝিয়েছিলেন।
 
১/১১ পরে ডিজিএফআই থেকে আমাকে বলা হয়েছিল মান্নান ভু্ঁইয়ার বাসায় যেতে, কিন্তু আমি তাতে রাজী হইনি। অতঃপর কিছুদিন পরে আপনাকে উৎখাতের একটি পরিকল্পনা একজন জেনারেল আমাকে অবহিত করেছিলেন, সে খবরটা আমি যথাস্থানে পৌছে দিয়েছিলাম। পরে সম্ভবত বিএনপির এক সিনিয়র নেতার বেইমানীর কারণে সে পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। ঐ ঘটনার পর থেকেই আমাকে খোঁজা শুরু করে আপনার মেজর সাহেবরা, বাসা রেইড দেয় তিন বার। আগেই টের পেয়ে আমি বাসা ছাড়লাম। কিন্তু আপনারা আর খুঁজে পেলেন না। পরে একজন গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানিয়েছিলেন, আমাকে ফিনিশ করার নির্দেশ ছিল। কিন্তু রাখে আল্লাহ, মারে কে! আলহামদুলিল্লাহ।
 
জেনারেল সাহেব। ১/১১ দ্বারা বাংলাদেশকে পরাধীন করে, পিলখানা ম্যাসাকার করে আর্মি শেষ করে দিয়ে আপনি বিদেশে পালিয়ে বেঁচে আছেন নির্জনে। তবে মিথ্যার ওপরে বেঁচে আছেন। এভাবে আর কদ্দিন? এই জীবনে তো আর দেশের মাটিতে পা রাখতে পারবেন না। আপনি বাংলাদেশের যে চুড়ান্ত ক্ষতি করেছেন, তার বিচারে আপনার সর্বোচ্চ শাস্তি পাওনা, ভাগ্যে থাকলে সে শাস্তি ভোগ করাও লাগতে পারে। আর যদি তা না হয়, তবে মৃত্যু হবে পাপিষ্ঠের মতন, তখন জনগন আপনার কবরে থু থু দিবে। যদি মানুষ হয়ে থাকেন, তবে সত্য কথা বলুন, কৃত অপরাধ স্বীকার করে জাতির কাছে ক্ষমা চান।

/ফেসবুক

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.