সেনাবাহিনীর প্রভাব ব্যবহার করে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ-হারিসকে মুক্ত করেন জেনারেল আজিজ!

২০০২ সালের জানুয়ারি মাসের এক বিকেল। ফারুক ভাই তার জুনিয়র সহকর্মীকে ডেকে কফি খেতে খেতে গল্প শুরু করলেন। এরা পূর্ব পরিচিতি হওয়ায় প্রায়ই সুখ দুঃখের আলাপ সালাপ করেন, যা সার্ভিসের নর্মসের বাইরে চলে যায়। ফারুক ভাই বললেন- দেখো, তুমি তো আমার সম্পর্কে জানো, এই দলটার জন্য কত কিছু করলাম, কিন্তু দুঃখের কথা কি বলবো- নিজের কাজটাই করতে পারছি না। ইলেকশনের আগে ইনারা কত কথা বললেন, এখন আর আমাকে চিনতেই চায় না!

কেনো, কি হয়েছে, ফারুক ভাই?

তুমি তো জানোই, আমরা চাইলে আইনের মধ্যে থেকেই অনেকের জন্য অনেক কিছু করতে পারি। এবারের ইলেকশনে আমার ডিউটি ছিল বিএনপি মহাসচিব মান্নান ভুইয়ার এলাকায়। ট্রুপস নিয়ে ঘাটি গাড়লাম নরসিংদিতে। প্রথমেই সাক্ষাৎ করি আওয়ামীলীগ ক্যান্ডিডেটের সাথে, এতে সবাই ধারণা করে- খুব প্রফেশনাল অফিসার, এবং আ’লীগের অনুগত! তাকে আশ্বস্ত করলাম- শান্তিপূর্ন ভোট হবে, কোনো কারচুপি কাটাকাটি সন্ত্রাসীকান্ড হবে না।

এরপরে দেখা করলাম বিএনপির হাইপাওয়ার ক্যান্ডিডেট আব্দুল মান্নান ভুইয়ার সাথে। তাকে বললাম, স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আমি একদম ভালো ইলেকশন করে দেব। আপনার জন্য সাধ্যমত সবই করবো। আমি তো আপনাদেরই লোক, স্টুডেন্ট লাইফে আপনাদের ছাত্র সংগঠন করেছি। আপনি নিশ্চিত বিজয়ী হবেন। এলাকায় কোনো সন্ত্রাসীর যায়গা হবে না, আওয়ামীলীগের নাম গন্ধও থাকবে না। তিনি বললেন, কর্নেল সাহেব ধন্যবাদ, সেনাবাহিনী তো আমাদের প্রাইড, আপনারা আইনমত কাজ করলেই হবে।

পরে আরও দেখা হয়েছে, ইলেকশন নিকটবর্তী হলে একদিন সুবিধামত সময়ে ভুঁইয়া সাহেবকে বললাম, ‘স্যার, ইলেকশনে আপনার বিজয় সুনিশ্চিত, এবং আপনারা সরকারও গঠন করবেন। তবে আমার একটা বিষয় আছে- আপনাকে একটু দেখতে হবে। ছোট ভাই জোসেফ জেলে আছে, আমার মায়ের খুব আশা ওকে বাইরে আনার। আর হারিস পলাতক আছে, ও একটু ফ্রি চলাফেরা করতে চায়। আমি আশ্বাস দিচ্ছি, স্যার, ওরা আর কোনো উল্টা পাল্টা কিছু করবে না। আসলে এমপি মকবুলের উৎপাতে আমার ভাইগুলার জীবন ধংস হয়ে গেছে, লীগের গত আমলে আমার একভাই টিপুকে গুলি করে হত্যা করেছে হাজী মকবুলের ছেলে। আর এমপি মকবুল আমার বাকী দু’ভাইকে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সব শুনে মান্না ভুইয়া বললেন, ‘দেখেন কর্নেল সাহেব, এখন আমি এর কোনো খোঁজ খবর নিতে পারব না। তাছাড়া এখন ইলেকশন নিয়ে ব্যস্ত। আগে সরকারে আসি, তারপরে খোঁজ নিয়ে করে দেয়ার চেষ্টা করবো। আপনি টেনশন করবেন না।’

ইলেকশন হয়ে গেলো, সরকার গঠন করলেন মান্নান ভুইয়া সাহেবরা, কিন্তু আমি আর উনার সাথে দেখা করতে পারিনা। প্রটোকল, নরমসের বাধা! অনেক কষ্টে সৃষ্টে হেয়ার রোডের বাসায় উনার সাথে দেখা করলাম, তিনি অবশ্য চিনলেন। কেমন আছেন, খোশ খবর করে চা বিস্কুট খাইয়ে বিদায় করে দেয় আর কি। আমি মোটামুটি জোর করেই ভাইদের কথা তুললাম। তিনি বললেন, ‘দেখুন আমি তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নই, তাও আপনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমি বলে দিব। আপনি ওখানে যোগাযোগ করবেন।’ কিন্তু উনার কথায় তেমন কোনো আন্তরিকতা ছিল না।

‘চলো তোমাকে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাসায় যাই, সহকর্মীকে বললেন ফারুক ভাই। দু’দিন পরে দু’জনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে গেলেন। কথা হলো। কিন্তু মান্নান ভুইয়া কিছু বলে দিয়েছেন, এমন কোনো আভাস ইঙ্গিত পাওয়া গেলো না। উল্টো শীর্ষ সন্ত্রাসী হারিস জোসেফের জন্য কিছু করার সুযোগ এই সরকারের নাই, বলে বিদায় করে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারের দুই মন্ত্রী থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফারুক তার কোর্সমেটদের সাথেও বিষয়টা শেয়ার করেন। তাদের থেকে ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে জানাজানি হয়।

এই ‘ফারুক ভাই’ হলেন লেঃ কর্নেল আজিজ আহমেদ, বর্তমানে লেফটেনেন্ট জেনারেল, সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) পদে কর্মরত। ২০০৯ সালে পিলখানা ম্যাসাকারের পরে মেজর জেনারেল আজিজকে নবগঠিত বিজিবির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেন শেখ হাসিনা। পদের ব্যবহার করে আজিজ আহমেদ পুরোনো ভোল পাল্টে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সাংঘাতিক আস্থাভাজন হতে আত্মনিয়োগ করেন। বিশেষ করে, ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের সময় জেনারেল আজিজ ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহী হয়ে নিজ ফোর্স বিজিবিকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেন, এবং ব্যাপক ধরপাকড় এবং খুনখারাবি করান। মেজর জেনারেল আজিজের কাজে খুশি হয়ে শেখ হাসিনা তাকে আস্থায় নেন, একাধিক সেশনে একান্ত আলাপ করেন। শেখ হাসিনা তার দুর্বল সরকারের জন্য আজিজকে অপরিহার্য মনে করেন। পলে লেফটেনেন্ট জেনারেল পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে এনে কোয়ার্কটার মাস্টার জেনারেল পদে বসান। সার্ভিস ছাড়াও ফারুক ভাইকে নিরাশ করেননি শেখ হাসিনা। তার অনুরোধমত, ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে জোসেফের মৃত্যুদন্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড করে দেন। নামে কারাগার হলেও জোসেফ গত দু’বছর পিজি এবং ঢাকা মেডিকেলে ভিআইপি কেবিনে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দিয়ে প্রায় ফ্রি করে রাখার ব্যবস্থা করেন। অবশেষে গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় বের জোসেফকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেন। আর হারিসকে বহু আগেই বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। নিজের পদ এবং সেনাবাহিনীর প্রভাব ব্যবহার করে জেনারেল আজিজ তার ভাই শীর্ষসন্ত্রাসী জোসেফকে কারামুক্ত করবেন এমন আশংকা প্রকাশ করে আগে থেকেই লেখালেখি চলছিল দেশের বিভিন্ন  মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে। সেই আশংকার বাস্তবায়ন হলো অবশেষে!

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ওয়াদুদ আহমেদের পাঁচ পুত্রের মধ্যে সবার ছোট তোফায়েল আহমেদ জোসেফ তার বড় ভাই হারিস আহমেদের হাত ধরে রাজনীতির মাঠে পদার্পণ করেন। বড় ভাই জেনারেল আজিজ আহমদ ফারুক। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় পার্টি ছেড়ে হারিস যোগ দিয়েছিলেন যুবলীগে। তৎকালীন ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও হয়েছিলেন তিনি। জোসেফ তার বড় ভাইয়ের ক্যাডার বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বপালন করেন। এরপর থেকে মোহাম্মদপুর-হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন জোসেফ। যোগ দেন সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপে। পুরো রাজধানী তখন সেভেন স্টার গ্রুপ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ নামে দু’টি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত। টক্কর লাগে এমপি হাজী মকবুলের সাথে। গোলাগুলিতে নিহত হয়  হারিসের বড়ভাই টিপু। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মিজানের বড়ভাই মোস্তফাকে হত্যা করে ১৯৯৭ সালে গ্রেফতার হয় জোসেফ। ২০০৪ সালে জোসেফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ঢাকার জজ আদালত।  হাই কোর্ট ওই রায় বহাল রাখে। জোসেফ ২০ বছর আগে যখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তার নামে তখন ঢাকার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, খুন, অবৈধ অস্ত্র বহনের অভিযোগে অন্তত ১১টি মামলা ছিল। এভাবেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম উঠে আসে জোসেফের।

চলতি মাসে সেনাপ্রধান নিয়োগের সিস্টেমে জেনারেল আজিজ শেখ হাসিনার অন্যতম ক্যান্ডিডেট হলেও শুভাকাঙ্খিরা পরামর্শ দিয়েছেন, আজিজকে সেনাপ্রধান করে সুবিধা হবে না, কেননা জেনারেল আজিজ সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে আনপপুলার লোক। বিশেষ করে, জোড়া শীর্ষসন্ত্রাসীর জেষ্ঠ্য সহোদরকে সেনাবাহিনী প্রধান করা হলে জনমনে দারুণ বিরুপ মনোভাব হবে, তাছাড়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনেকেই এই নিয়োগ মানতেও চাইবে না। আজিজ ইতোমধ্যে তার চাহিদা সব আদায় করে নিয়েছে। এরপরে তিনি যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারেন নিশ্চিন্তে, তাঁর সেই অভ্যাস আছে।

 

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.