একজন ‘সামান্য মেজর’ – অসামান্য এক জীবন

শিবলী সোহায়েল

[]

সামান্য মোজা

…যা হোক — বসে আছি।হঠাৎ পাশের কক্ষ থেকে প্রেসিডেন্ট জিয়া এবং তাঁর স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কথোপকথনের একাংশ কানে এলো। সবাই জানেন, বিদেশে গেলে সচরাচর তারা কোনো কেনা-কাটা করতেন না। প্রয়োজন বোধে এক জোড়া মোজা সম্ভবত বেগম  জিয়া কিনেছিলেন। বললেন, ‘এক জোড়া মোজার দাম দেশী টাকায় এক শতেরও বেশি। এই দামে মোজা কেনা যায়? আমার আর কিছু কেনার নেই ভাগ্যিস।’ উত্তর এলো, ‘এ দামে আমাদের কেনার দরকারও নেই,  সামর্থ্যও নেই। গরিব দেশের নির্ধন প্রেসিডেন্ট। যখন দেশের মানুষের সঙ্গতি হবে, প্রেসিডেন্টেরও হবে।’  অপর দিকে সম্মতি সূচক নীরবতা।
 
উপরের কথাগুলো এসেছে ইনাম আহমেদ চৌধুরীর বর্ণনায় তার লেখা “ভাবনায় বাংলাদেশ” বইটিতে।এটা সম্ভবত ছিলো উনিশ’শ  আশি সালের কথা ইনাম আহমেদ চৌধুরী তখন লন্ডনে বাংলাদেশ দূতাবাসের অর্থনৈতিক সচিব হিসেবে কর্মরত  ছিলেন। সে সময় প্রেসিডেন্ট জিয়া ব্রিটিশ সরকারের আমন্ত্রণে সরকারি এক সফরে সস্ত্রীক গিয়েছিলেন সেখানে।
 
এভাবেই সাদামাটা জীবন যাপন করে এক ‘সামান্য মেজর’ তাঁর অসামান্য জীবনের ছাপ রেখে গিয়েছেন এদেশের  ইতিহাসের পাতায় পাতায়। ‘সামান্য মেজর’ কেন বলছি, সে কথায় একটুু পরে আসছি। তার আগে আরো দু’একটি ঘটনা এখানে উল্লেখ করবো।

সামান্য ঘড়ি  পরিবার

আওয়ামী লীগের মন্ত্রী চট্টগ্রামের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন তার ‘ফেলে আসা দিনগুলি’ বইয়ে জিয়াকে নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে লিখেছেন – “………অতীতের অনেক কথাই মনে পড়ছে। আপনার (জিয়া) সাথে আমার অনেক স্মৃতি আছে, অনেক মিল আছে। অাপনি যুদ্ধের সময় যে ঘড়িটা ব্যবহার করতেন রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার অধিকারী হয়েও সে ঘড়িটা হাতে আছে। ……তখন যুদ্ধ করা, হানাদারদের আঘাত করা, দেশের স্বাধীনতা অর্জন করা ছাড়া অন্য কোন ব্যাপার আমাদের মাথায় ছিল না। সেসময় ভাবীদের কি অবস্থা হবে, তারা কোথায় থাকবে, ভারতে চলে আসবে কিনা – এসব ব্যাপার নিয়ে যখন কথা বলছিলেন তখন আমি আপনার সামনে ছিলাম। আপনি তাদেরকে বলেছিলেন –‘তারা কোথায় থাকবে, কি করবে সে বিষয়ে ভাববার অবকাশ নেই। তাদেরকে তাদের মত করে সেভ থাকতে বলো। …”

উপরের এ উক্তির কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই, তবে সামান্য দু’টো বিষয়ের মধ্যে দুইটি অসামান্য শিক্ষা আছে।এক, তিনি জানতেন রাষ্ট্রপ্রধানের মর্যাদার সাথে বিলাসবহুল ঘড়ি বা পোশাক-পরিচ্ছেদের কোন সম্পর্ক নেই। আর দ্বিতীয়টি হল দেশের প্রয়োজনকে পরিবারের উপরে স্থান দেওয়া। মুখে বলতে পারলেও বাস্তবে সবাই এ কাজ পারেনা আর তাই এই ছোট ছোট সামান্য কাজগুলোই তাকে আরও অসামান্য করে তুলেছে।

এছাড়া পরিবারের কথা যখন চলে এলো তখন তাঁর পরিবারের আরেকটি বিষয় উল্লেখ না করলেই নয়। দুই হাজার সতেরো সালের নভেম্বর মাসে উনার ছোট ভাই আহমেদ কামাল নীরবে চলে গেলেন নাফেরার দেশে। কোথাও তেমন কোন সাড়া শব্দ শুনতে পেলাম না। পারিবারিক বন্দনার যুগে যখন একজন রাষ্ট্র প্রধানের নাতিপুতিরাও রাষ্ট্রীয় খরচে নিরাপত্তা ও নানা সুযোগ সুবিধা ভোগ করে তখন একজন রাষ্ট্রপ্রধানের আপন ভাই ছিলেন এতোটাই অপরিচিত!

সামান্য খাবার

 

একজন রাষ্ট্রপ্রধান বিলাসবহুল জীবন যাপন করবে, তার সঙ্গে একসাথে খাবার খেয়ে এসে মানুষ সেই খাবারের গল্প করবে জীবনভর, এমনটাই আমরা সবসময় দেখে আসছি। কিন্তু নিচের দু’টো ঘটনা সম্পূর্ণ ভিন্ন রকম।

সাংবাদিক এ বি এম মূসার বর্ণনায় আমরা দেখতে পাই –
“একটু পরে জিয়া গোসল করে এলেন। আমরা চারজন খেতে বসলাম। খাবারের পরিমাণ ও রকম দেখে একটুখানি দুশ্চিন্তাও দেখা দিল। বুঝলাম জিয়া অত্যন্ত স্বল্পাহারী, আমার ভাগ্যেও অর্ধাহার। তিনি এককাপ স্যুপ, দু’তিন চামচ ভাত, দু’টুকরা মুরগির গোস্ত, এক চামচ সবজী নিলেন। তাঁর দেখাদেখি আকবর, দাউদ ও আমিও তাই নিলাম। জিয়া চেয়ে দেখলেন, কিছু বললেন না, তবে মনে হল একটুখানি মুচকি হাসলেন।”

বিশিষ্ট লেখিকা হেলেনা খানের বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারি –
“রোজার মাস।ময়মনসিংহ সার্কিট হাউসে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সাথে এফতারি করার দাওয়াতে স্বামীসহ আমি শরিক হই। শুধুমাত্র সামান্য কাঁচা ছোলা, আটার মোটা রুটি ও ঘি-বিহীন বুটের ডালসহ গরুর গোশত অতি সাধারণ আয়োজন! শুনেছিলাম প্রেসিডেন্ট সাহেব ব্যক্তিগত সব ব্যাপারেই স্বল্প ব্যয়ের পক্ষপাতী ছিলেন। তাঁর ইচ্ছাতেই সেদিনের ইফতারির ওই আয়োজন।”

এভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা হাজারো অসংখ্য ঘটনা আছে, যা একসাথে করলে একটি বই হতে পারে। পরিমিত জীবনের তথ্য ছাড়াও তাঁর সেনানায়ক হিসেবে ভূমিকা, মুক্তিযুদ্ধে অসম সাহসী পদক্ষেপ, রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে দেশ পূনর্গঠনের প্রচেষ্টা ও পরিকল্পনা, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রজ্ঞা যেকোনো রাজনৈতিক নেতা, সেনাপ্রধান এবং প্রেসিডেন্ট-প্রধানমন্ত্রীদের জন্য শিক্ষণীয় হওয়ার কথা।

কিন্তু দুঃখের বিষয় এসবই এখন সম্পূর্ণভাবে মুছে ফেলার জন্য পরিকল্পিত এবং সংগঠিত একপ্রচেষ্টা করা হচ্ছে বাংলাদেশে। তাঁর অসামান্য কাজগুলোকে অস্বীকার করে তাকে এখন তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করে বলা হচ্ছে, “সামান্য এক মেজর”!

[২]

“সামান্য এক মেজর”- কথাটি আজকাল প্রায়শ শুনতে পাওয়া যায়। এ মন্তব্য কি শুধুই তাকে ছোট করার জন্য? নাকি এর গভীরে আরো অন্য কোন উদ্দেশ্য রয়েছে? কথাটি আমি প্রথম শুনি দুই হাজার দুই অথবা তিন সালের দিকে, সিডনীতে অনুষ্ঠিত এক সম্মাণনা প্রদান অনুষ্ঠানে সেখানে এক বক্তা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক ভাবে হঠাৎ করে চিৎকার করেই বলে উঠেন, “কোন এক সামান্য মেজর বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন এটা মেনে নেওয়া সম্ভব নয়!” আমি মনে মনে ভাবলাম, উনি কি বলতে চাইছেন যে আরব থেকে “উঁচা-লম্বা ফর্সা” কোন শায়খ অথবা ভারতের রাজবংশের কেউ স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে উনার জন্য মেনে নেওয়া সহজ হতো? সামান্য মেজরের অসামান্য কাজ মেনে নিতে কি খুব কষ্ট হচ্ছে?

প্রথম দিকে আমি ভেবেছিলাম এটা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করার একটা কৌশল মাত্র। কিন্তু কিছুদিন বিষয়টি একটু মনযোগ দিয়ে লক্ষ করে দেখালাম এর সাথে আরো কিছু যুক্ত আছে। শুধু তাঁকে খাটো করাই হচ্ছে না, বরং মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অসামান্য ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে ধীরে ধীরে বিতর্কিত করে তোলার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। আর কাজটা জোরালো ভাবে শুরু হয়েছে দুই হাজার নয় সালের পর থেকে যদিও এর পরিকল্পনা হয়েছিলো উনিশ‘শ একাশি সালের মে মাসের দিকে মতিয়ূর রহমান রেন্টুর “আমার ফাঁসি চাই” বই থেকে জানা যায়, জিয়াউর রহমান বেঁচে থাকতে পরিকল্পনাটা ছিলো এরকম যে- প্রচার করতে হবে “এই জিয়া স্বাধীনতার ঘোষক জিয়া নয়।” সেই পরিকল্পনারই ধারাবাহিকতায় আজকে তাকে পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই এর গুপ্তচরও বলা হচ্ছে। কিন্তু কেন? শুধুই কি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা? না, তা নয়। দৃশ্যপটের ভেতরে আরও যে গভীর ষড়যন্ত্র আছে তা আমাদেরকে বুঝতে হবে।

মুক্তিযুদ্ধের সময় অথবা যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরপরই যদি তাঁর ভূমিকা নিয়ে কোন প্রশ্ন উঠতো তাহলে তা ভিন্ন বিষয় ছিলো। কিন্তু দেখা যাচ্ছে সেসময় কোন বিতর্ক তো দুরের কথা বরং স্বাধীনতা যুদ্ধে তাঁর বীরত্বপূর্ণ ভূমিকাকে মূল্যায়ন করে সেসময় তাকে ‘বীর উত্তম’ উপাধি দেওয়া হয়। এ নিয়ে খুব বেশী তর্কের দরকার পড়েনা। মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের বক্তব্য থেকেই এটা পরিস্কার হয়ে যায়। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ সালে তাজউদ্দীন আহমদ তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন –

“… চট্টগ্রাম ও নোয়াখালী অঞ্চলের সমর পরিচালনার ভার পড়েছে মেজর জিয়াউর রহমানের ওপর। নৌ, স্থল ও বিমান বাহিনীর আক্রমণের মুখে চট্টগ্রাম শহরে যে প্রতিরোধব্যুহ গড়ে উঠেছে এবং আমাদের মুক্তিবাহিনী ও বীর চট্টলার ভাই-বোনেরা যে সাহসিকতার সাথে শত্রুর মোকাবেলা করেছেন, স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই প্রতিরোধ স্ট্যালিনগ্রাদের পাশে স্থান পাবে এই সাহসিকতাপূর্ণ প্রতিরোধের জন্য চট্টগ্রাম আজও শত্রুর কবল-মুক্ত রয়েছে। চট্টগ্রাম শহরের কিছু অংশ ছাড়া চট্টগ্রাম ও সম্পূর্ণ নোয়াখালী জেলাকে “মুক্ত এলাকা” বলে ঘোষণা করা হয়েছে।”

স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর সাহসী ভূমিকার কথা সামরিক-বেসামরিক অসংখ্য মুক্তিযোদ্ধার স্মৃতিতেই উঠে এসেছে। এখান থেকেই স্পষ্ট হয়ে উঠে এক সামান্য মেজরের অসামান্য অবদানের কথা। তবে তাঁর বিরুদ্ধে প্রথম অপপ্রচার শুরু হয় স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির মাধ্যমে। একটু পেছন ফিরে এই বিতর্কের ভিত্তিটাও একটু দেখে নেই।

বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক এবং স্বাধীনতা সংগ্রামের সময় নবগঠিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দক্ষিণ চট্টগ্রাম জেলার জেলা প্রশাসক আবদুশ শাকুর তাঁর আত্মজীবনী “কাঁটাতে গোলাপও থাকে” বইতে উল্লেখ করেছেন – “…হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে টিকোজি থেকে পানি ঢেলে চা বানানোর নামে এটা সেটা নাড়াচাড়াই করতে থাকলাম আনমনে। এমনি সময় টেবিলের ‘এগারো ব্যান্ড স্যানিও রেডিও’তে আচমকা শ্রুত হল সেই ঐতিহাসিক ঘোষণাঃ “আমি মেজর জিয়া বলছি।” লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়ে দু’জনে প্রাণভরে কোলাকুলি করলাম, যেন পুনরুজ্জীবিত দুই মৃত সৈনিক।”

কর্নেল (অবঃ) কাজী-নুর-উজ্জামান তাঁর “একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধঃ একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা” গ্রন্থে লিখেছেন, “৭১-এ এপ্রিলের শেষ দিকে তাজউদ্দীনের সঙ্গে আমি মেজর জলিলের নয় নম্বর সেক্টর পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। যাত্রী আমরা দুজনই ছিলাম। …তাজউদ্দীন সাহেব আমাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ‘আপনি একজন অবসরপ্রাপ্ত মেজর হয়ে কেমন করে কখন মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করলেন?’ জবাবে আমি জিয়াউর রহমানের ঘোষণার কথা বলি। জিয়া কর্তৃক নিজেকে প্রেসিডেন্ট বলে পরিচয় দেওয়ার কথা উল্লেখ করি। আমার জবাবে তিনি নিরুত্তর ছিলেন এবং অন্য প্রসঙ্গে চলে যান। …জিয়াউর রহমানের ঘোষণা শুনেই আমি ও আমার মতো হাজার হাজার সেনা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীর সদস্য প্রেরণা পেয়েছিল। জিয়া ছিলেন ইষ্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অফিসার। তাঁর প্রেসিডেন্ট পদের দাবি করা আমাদের মনে প্রভাব ফেলেনি। তবে তাঁর স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ডাক আমাদের সকলকে অনুপ্রাণিত করেছিল।”

এ ব্যাপারে এমন আরও অসংখ্য তথ্য-প্রমাণ দেওয়া যেতে পারে। তবে বিষয়টি এমন না যে এই তথ্যগুলো তাদের কাছে নেই। এসব কিছু জানা থাকার পরেও তারা গোয়েবলসের নীতি অনুসরণ করে ধীরে ধীরে অপপ্রচার চালাচ্ছে। ঠিক যেভাবে উনিশশ পঁচাশি সাল থেকে অপপ্রচার আরম্ভ করে তারা মওলানা দেলোয়ার হোসেন সাইদীকে বাংলাদেশের দিয়েছে। এ অপপ্রচারকে কেবলমাত্র সাধারণ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা ভাবলে মারাত্মক ভুল হবে। এই অপপ্রচার শুধুমাত্র রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার উদ্দেশ্যে নয় এর পেছনে রয়েছে গভীর এক নীলনকশা, রয়েছে আমাদের জাতিস্বত্তাকে নিশ্চিহ্ন করার ষড়যন্ত্র। বাংলাদেশী জাতিস্বত্তার স্থপতি ও নির্মাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন ছিলেন এবং সবসময় সুকৌশলে তা প্রতিহত করেছিলেন। তাই আজ এই জাতির নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও সার্বভৌম স্বত্তাকে ভুলিয়ে দিতে হলে যে কোন ভাবেই হোক জিয়াউর রহমানের আদর্শকে মুছে ফেলতে হবে।

এই ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত পাওয়া যায় উনিশশ সাতচল্লিশ সালের দেশভাগের পরপরই। সেসময় সেপ্টেম্বর মাসে বম্বেতে কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় কার্যকরী পরিষদের CWC) এক সভায় সাতচল্লিশের দেশ বিভাগ নিয়ে একটি রেজুলিউশন গ্রহণ করা হয়। সেই রেজুলুশনে বলা হয়, “We hereby decide to accept the present partition for the time being”। এখানে “ফর দি টাইম বিং” কথাটার মাধ্যমে আমাদের প্রতিবেশীরা মূলত তাদের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ পরিষ্কার করে দিয়েছিল। এবং এ সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্যের অংশ হিসেবেই তারা একে একে হায়দারাবাদ, সিকিম ও ও কাশ্মীরকে গিলে ফেলেছে।

আশার বিষয় হচ্ছে আমারা সিকিম নই, আমরা হায়দারাবাদ কিংবা কাশ্মীরও নই। সেই আদি যুগ থেকেই এ অঞ্চলের মানুষ স্বাধীনচেতা। এই অঞ্চলের মানুষ রুখে দাঁড়িয়েছিল মহাপরাক্রমশালী মহারাজ আশোকার বিরুদ্ধে। তারা ঢুকতে দেয়নি দখলদার যুদ্ধবাজ মানসিংহদেরকে। ইংরেজদের দুই’শ বছরের শাসনকাল কেটেছে এই অঞ্চলের তিতুমির, ফকির মজনু শাহ, নুরুলদিন, বাকের মোহাম্মদ জং এবং সুর্যসেনদের বিদ্রোহ-সংগ্রাম দমন করার চেষ্টায়। উর্দুভাষী পাকিস্তানও পারেনি আমাদের পদানত করতে। সুতরাং দিল্লীও পারবেনা। কারণ এই দেশে রয়েছে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের মতই সামান্য অনেক মানুষ যারা ফ্যাসিবাদের মুখে দাঁড়িয়ে শোষকের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে অসামান্য তীতিক্ষার সম্ভাবনা ও মহত্তম মুক্ত মানুষের সাহসকে ধারণ করে বলে উঠতে পারে, “উই রিভল্ট!”

তথ্যসূত্রঃ

১। ইনাম আহমেদ চৌধুরী, ভাবনায় বাংলাদেশ, হাসি প্রকাশনী, মে ২০০৯, পৃঃ ১৪৯।
২। ইঞ্জি: মোশাররফ হোসেন, ফেলে আসা দিনগুলি, তৃপ্তি প্রকাশ কুঠি, জুন ২০১১, পৃঃ ১৪৯-১৭২।
৩। এবিএম মূসা, জিয়ার দর্শন ও বাংলাদেশ, সম্পাদনাঃ  কাজী সিরাজ,  অ্যাডর্ন পাবলিকেশন,  ফেব্রুয়ারি ২০০৪, পৃঃ ১৯-২৫।
৪। হেলেনা খান, ঊষা থেকে গোধূলির স্মৃতি, মীরা প্রকাশন, মার্চ ২০০৯, পৃঃ ২৬০।
৫। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র হতে ১১ এপ্রিল ১৯৭১ তারিখে প্রচারিত প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদের ভাষণ।
৬। আবদুশ শাকুর, কাঁটাতে গোলাপও থাকে, ঐতিহ্য, ফেব্রুয়ারি ২০০৮, পৃঃ ১৭৫-১৭৭।
৭।  কর্নেল (অবঃ) কাজী-নুর-উজ্জামান, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধঃ একজন সেক্টর কমান্ডারের স্মৃতিকথা,  অবসর  প্রকাশনা সংস্থা, ফেব্রুয়ারী ২০০৯, পৃঃ ১৩-১৫।

*লেখক শিবলী সোহায়েল -শিক্ষক ও গবেষক, চার্লস ষ্টার্ট ইউনিভার্সিটি, অষ্ট্রেলিয়া।

 

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.