রাজনীতির মোড় ঘুরবে জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরে

জাতীয় সংসদ নির্বাচনপূর্ব রাজনীতির জন্য আগামী জুলাই, আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—এই তিন মাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্লেষকরা এই সময়কে রাজনীতির ‘টার্নিং পয়েন্ট’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। কারণ এই তিন মাসের মধ্যে আন্দোলন করে সরকারকে চাপে ফেলার চেষ্টা করবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। খালেদা জিয়াকেও তারা মুক্ত করার চেষ্টা করবে।

অন্যদিকে সরকার পাল্টা রাজনৈতিক কৌশল ব্যবহার করে এই চাপকে সামাল দিয়ে দৃশ্যমান করার চেষ্টা করবে প্রশাসনসহ সর্বত্র তার নিয়ন্ত্রণ। পাশাপাশি নানামুখী চাপ সৃষ্টি করে ‘দুর্বল’ বিএনপিকে নির্বাচনে নেওয়ার চেষ্টাও করবে সরকার। চেষ্টা করা হবে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের তুলনায় বেশিসংখ্যক দলকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করানোর।

৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৪০টি রাজনৈতিক দলের মধ্যে বিএনপিসহ ২৮টি দল অংশ নেয়নি। আওয়ামী লীগসহ ১২টি দল ওই নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিতে চাইছে। কিন্তু গত ১৫ মে অনুষ্ঠিত খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল ও পরিস্থিতি প্রশ্নে দলের মধ্যে কিছুটা নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। বিএনপি নেতারা বলছেন, আন্দোলন বা অন্য কোনোভাবে সরকারের ওপরে চাপ সৃষ্টি করতে না পারলে নির্বাচনে গিয়ে লাভ হবে না। ফলে নির্বাচনের আগে ‘নতুন পরিস্থিতি’ তৈরির চেষ্টা করবে বিএনপি।

এ ছাড়া নির্বাচনের আগে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, ভারতসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সমর্থন আদায়েরও চেষ্টা করবে বড় দুটি দল। পর্যবেক্ষক মহলের ধারণা, এই ইস্যুতে দুই দলের পক্ষ থেকেই দৃশ্যমান তৎপরতা রয়েছে, যা নির্বাচনের আগে আরো স্পষ্ট হবে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলেরই পৃথক প্রতিনিধিদল শিগগিরই ভারত সফরে যাবে।

এদিকে তৃতীয় ধারার উদার তথা বামপন্থী দলগুলোর অবস্থানও এই সময়ের মধ্যে স্পষ্ট হবে। নির্বাচনে যাওয়া না-যাওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করার পাশাপাশি বড় দুই দলের পক্ষে-বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ার বিষয়টিও এই সময়ে দৃশ্যমান করবে ওই দলগুলো।

উদারপন্থী দলগুলোর দৃশ্যমান তৎপরতা বিএনপির পক্ষে হলেও  সিপিবি-বাসদসহ বামপন্থী দলগুলোর নির্বাচনে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। যদিও ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে উদার ও বামপন্থী এই দলগুলো অংশ নেয়নি।

বিকল্পধারা, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্য—এই তিন দলের সমন্বয়ে যুক্তফ্রন্ট গঠিত হয়েছে গত বছরের ৪ ডিসেম্বর। গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেন গত কয়েক বছর ঐক্যপ্রক্রিয়া নিয়ে তৎপর থাকলেও সম্প্রতি যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীর মতে, তফসিল ঘোষণার আগে রাজনীতিতে জল ঘোলা সব নির্বাচনের আগেই হয়। এবার মনে হচ্ছে একটু বেশি হতে পারে। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, যুক্তফ্রন্ট সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পাশাপাশি সন্ত্রাস ও দুর্নীতি বন্ধ করতে চায়। বিএনপিও সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলন করছে। তবে একজোট হওয়ার বিষয়টি সময় বলে দেবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসনের ছেলে তারেক রহমান এর আগে ক্ষমতার বিকল্প কেন্দ্র করে সরকারের দুর্নাম করেছে। এ বিষয়গুলো নিয়ে বিএনপির মনোভাব বুঝেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের মতে, গণতন্ত্র রক্ষা ও সুষ্ঠু নির্বাচন আদায়ের স্বার্থে যা করার ওই তিন মাসের মধ্যেই করতে হবে। চার সপ্তাহের জন্য বিদেশে যাওয়ার আগের দিন গত ৯ মে বুধবার মতিঝিলের অফিসে কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে এরই মধ্যে একযোগে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তা ছাড়া গণফোরামসহ দেশের নাগরিক সমাজও সুষ্ঠু নির্বাচন চাইছে। বিএনপিও গণতন্ত্রের কথা বলছে এবং সুষ্ঠু নির্বাচন চাইছে। সুতরাং এক জায়গায় ঐক্যবদ্ধ হতেও পারি, যোগ করেন বিশিষ্ট এই আইনজীবী।

গণস্বাস্থ্যের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর মতে, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর এই তিন মাসে দেশের রাজনীতিতে অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে যাবে। তিনি বলেন, শেষ পর্যন্ত নির্বাচন হবে কি না এবং খালেদা জিয়া মুক্ত হবেন কি না এটি বোঝা যাবে ওই তিন মাসের মধ্যে। তা ছাড়া উদারপন্থী দলগুলোর ভূমিকা এবং সরকার একতরফা নাকি অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন করতে চায়, এটিও ওই তিন মাসের মধ্যে নিষ্পত্তি হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সরকার খালেদা জিয়াকে মুক্তি না দিয়ে দুর্বল বিএনপিকে নির্বাচনে নিয়ে যওয়ার চেষ্টা করতে পারে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সফল হতে পারবে না। বরং সরকারই নির্বাচন থেকে সরে আসে কি না সেটাও দেখার বিষয়।

জাতীয় পার্টির কো-চেয়ারম্যান গোলাম মোহম্মদ কাদের মনে করেন, বাংলাদেশে নির্বাচনের আগের পরিস্থিতি ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রবিন্দুর সঙ্গে তুলনা করা যায়। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে ঘূর্ণিঝড়ের বেগও তত বাড়তে থাকবে। তাঁর মতে, প্রধান দুই প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যেহেতু দুই মেরুতে অবস্থান করছে এবং তাদের মধ্যে সমঝোতার পরিস্থিতি তৈরি না হওয়ায় তফসিলের আগে উত্তেজনা বাড়বে।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে রাজনৈতিক মেরুকরণও স্পষ্ট হবে। এক দল সরকারের পক্ষে এবং সরকারের পরিবর্তন চাওয়া অংশ সরকারের বিপক্ষে অবস্থান নেবে।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাও মনে করেন, তফসিল ঘোষণার আগে রাজনীতি কোন দিকে যায় তা স্পষ্ট হবে। তবে তিনি বলেন, সবার আগে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠায় সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এর বিকল্প নেই।

আগামী অক্টোবর মাসে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আর সংবিধান অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলনরত বিএনপি এ কারণে আগামী ঈদুল ফিতরের পরই আন্দোলনে নামার পরিকল্পনা করছে। দলটির নেতারা মনে করছেন, যা করার তফসিল ঘোষণার আগেই করতে হবে। খালেদা জিয়ার মুক্তি ও সংসদ ভেঙে দেওয়ার দাবিসহ নির্দলীয় নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে অনড় রয়েছে দলটি।

নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো বলছে, ওই ইস্যুতে, বিশেষ করে অংশগ্রহণমূলক সুষ্ঠু নির্বাচনের দাবিতে যুগপৎ আন্দোলনের চেষ্টায় উদারপন্থী দলগুলোকে কাছে টানার চেষ্টাও করছে বিএনপি। এ বিষয়ে বেশ কিছু অগ্রগতিও হয়েছে। খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের নির্দেশনায় বেশ কিছুদিন ধরে উদারপন্থী দলগুলোর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা করছেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এ ছাড়া ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীও নেপথ্যে ভূমিকা পালন করছেন। সর্বশেষ গত ৯ মে বুধবার রাতে বিকল্পধারার সভাপতি অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় যুক্তফ্রন্টের তিন দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ড. কামাল হোসেন। তিনি বেশ কিছু ইস্যুতে বি. চৌধুরী তথা যুক্তফ্রন্টের সঙ্গে কাজ করার অঙ্গীকার করে একটি যৌথ ইশতেহারে স্বাক্ষর করেন। ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। এ সময় বিএনপির সঙ্গে ঐক্য নিয়ে আলোচনা উঠলে বি. চৌধুরী যথারীতি তারেকের প্রসঙ্গ তোলেন। এ সময় ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, তারেকের কথা বলে ঐক্য এখন আর থামিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। প্রয়োজনে তারেক রহমান পাঁচ বছরে সরকারে অংশীদার হবেন না, এমন কথাও বলেন তিনি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিএনপির সঙ্গে ঐক্য বা জোট গঠনের ব্যাপারে প্রকাশ্যে না হলেও আড়ালে কথা তুলছেন ড. কামাল হোসেনও। তবে সরকারের বিরুদ্ধে অত্যন্ত সরব থাকায় এ প্রশ্নে তাঁর ভূমিকা ততটা জোরালো নয়। কামাল হোসেনের মনোভাব হলো, খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে ঐক্য করা যায়; কিন্তু তারেক রহমানকে মেনে নেওয়া কঠিন। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি আবার এ-ও মনে করেন, এ মুহূর্তে তারেকের কথা সামনে আনা হলে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন দুর্বল হয়ে পড়বে।

জানতে চাইলে ড. কামাল হোসেন এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে রাজি হননি। কালের কণ্ঠকে তিনি বলেন, বিএনপির সঙ্গে ঐক্য পরের চিন্তা; কিন্তু আগে সরকারকে সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে হবে। গণতন্ত্র ফিরিয়ে না আনতে পারলে দেশে প্রতিষ্ঠান বলতে আর কিছুই থাকবে না।

আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য কাজী জাফরুল্লাহ অবশ্য মনে করেন, রাজনীতিতে এখনই গুরুত্বপূর্ণ সময় যাচ্ছে। তিনি চলতি মে মাস থেকে আগামী ১৫ ডিসেম্বর এই সাত মাস সময়কেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন। তাঁর মতে, ১৫ ডিসেম্বরের পরে ২৭ বা ২৮ ডিসেম্বর নির্বাচন হবে।

কিন্তু জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর বিএনপি আন্দোলনের চেষ্টা করবে—এমন বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের এই নেতা বলেন, ওই সময় পর্যন্ত হয়তো টানবে না, যা হওয়ার ১৫ মে থেকে ৩০ জুনের মধ্যেই হবে। তিনি বলেন, ‘অংশগ্রহণমূলক বা বিএনপি অংশ নেবে কি না, কাদের সঙ্গে আমাদের জোট হবে, তা আগামী ছয় সপ্তাহের মধ্যেই বোঝা যাবে। পাশাপাশি আমরা কিভাবে এগিয়ে যাব তা-ও নিষ্পত্তি হবে এই সময়ের মধ্যে’, যোগ করেন তিনি। কাজী জাফরুল্লাহ আরো বলেন, বিএনপির আন্দোলন রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করা হবে।

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে অবশ্যই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন শুরু হবে এবং এ ইস্যুতে আমরা মহাজোটের বাইরে থাকা দলগুলোরও সমর্থন পাব বলে আশা করি। কারণ তারাও সুষ্ঠু নির্বাচন ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের পক্ষে।’ তিনি বলেন, ‘আগামী কয়েক মাস দেশের রাজনীতির জন্য অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমরা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বেই নির্বাচনে যেতে চাই। সুতরাং তাঁকে কারাগারে রেখে এবং একতরফা আরেকটি নির্বাচন এ দেশে হতে দেওয়া হবে না।’

/কালের কন্ঠ

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.