পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ারের বালখিল্যতার জেরে বাংলাদেশ যুক্তরাজ্যের কূটনৈতিক সংকটের আশংকা!

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের পাসপোর্ট জমা করা সংক্রান্তে ভুলে ভরা বৃটিশ হোম অফিসের কথিত চিঠি নিয়ে কূটনৈতিক অঙ্গনে রীতিমতো তোলপাড় চলছে। ঢাকা, লন্ডনসহ সর্বত্রই এখন  আলোচনায় হোম অফিসের চিঠি! চিঠিতে বাংলাদেশ হাই কমিশনের বদলে ‘বাংলাদেশি অ্যাম্বাসি, ৪টি পাসপোর্টকে ‘অ্যা পাসপোর্ট’ বলে উল্লেখ করা ইত্যাদি মোটা দাগে অন্তত অর্ধডজন ভুল রয়েছে।

ভুলের বিষয়ে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাই কমিশনের জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকরাও হতবাক। তারা এটাকে ‘আনইউজুয়্যাল’ বলছেন। তবে এ নিয়ে তারা সরাসরি কোনো বক্তব্য দিতে চাইছেন না। অহেতুক বিতর্কে জড়িয়ে যাওয়ার বিষয়েও আগাগোড়ায় সতর্ক বাংলাদেশি কূটনীতিকরা। চিঠির উৎস বা সত্যতা নিয়ে তারা মুখ না খুললেও এটি যেভাবে উপস্থাপিত হয়েছে এবং বিতর্ক তৈরি করেছে তা তাদের অনুমানের বাইরে ছিল বলে দাবি করেন দায়িত্বশীল এক  কূটনীতিক।

তার মতে, রাজনৈতিক নেতৃত্ব যেকোনো বিষয়ে কথা বলতে পারেন। এ বিষয়ে কোনো জিজ্ঞাসা থাকলে তারাই জবাব দেবেন। সেখানে হাই কমিশনের কিছুই বলার নেই। তবে যে চিঠিকে প্রতিমন্ত্রী সামনে এনেছেন তা পৌনে চার বছরের পুরনো। তাছাড়া চিঠি ও পাসপোর্ট সংরক্ষণের বিষয়টি একান্তই গোপনীয়। তা এভাবে প্রকাশ করা কতটা সমীচীন হয়েছে তা বিচার বিশ্লেষণের দাবি রাখে বলেও মনে করেন তিনি। চিঠির ভুলগুলোর বিষয়ে ওই কূটনীতিকের দাবি ‘কুড়িয়ে পাওয়া বা স্বেচ্ছায় হোম অফিসে জমা করা বাংলাদেশি পাসপোর্টগুলো হাই কমিশনে পাঠাতে বৃটিশ সরকার এমন গৎবাঁধা ফরমেটে চিঠি দিয়ে থাকে। তবে অতীতে পাওয়া কোনো চিঠিতে এত ভুল দেখা যায়নি বলেও দাবি করেন তিনি।

শুধু লন্ডনে থাকা ওই কূটনীতিকই নন, সেগুনবাগিচার একাধিক কর্মকর্তাকে গতকাল এ নিয়ে আলোচনা-উদ্বেগ ও হাস্যরস করতে দেখা গেছে। তাদের মতে, স্পর্শকাতর ইস্যুটি জনসমক্ষে প্রকাশের ঘটনা বৃটেনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। বৃটেন ঐতিহ্যগতভাবে মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল। সেগুনবাগিচা এবং লন্ডন মিশনের তরফে বহুবার তারেক রহমানের বৃটেনে অবস্থান ও বসবাসের বিষয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। কিন্তু এ নিয়ে কখনই বৃটিশ সরকার বা ঢাকায় থাকা দেশটির কূটনীতিকরা বাংলাদেশের কাছে কোনো তথ্য বিনিময় করেনি।

কারও ব্যক্তিগত তথ্য বিনিময় না করার বিষয়ে বৃটেনের সর্বজনীন যে নীতি রয়েছে সেটি তুলে ধরে তারেক রহমানের বিষয়ে কোনো তথ্য প্রকাশে বরাবরই অপারগতা দেখিয়েছেন তারা। গণমাধ্যমের তরফেও গত ৯ বছরে বহুবার এ নিয়ে সরাসরি প্রশ্ন বা জিজ্ঞাসা ছিল। বৃটেনের তরফে প্রায় অভিন্ন জবাবই দেয়া হয়েছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিশেষ করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী যেভাবে বিষয়টি তুলে এনেছেন তা রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবেই দেখছেন পেশাদার কূটনীতিকরা। তারেক রহমানের লিগ্যাল নোটিসের খবর চাউর হওয়ার প্রেক্ষিতে গত সোমবার বিকালে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম এমপি যখন তার বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন তখন মানবজমিনের তরফে পররাষ্ট্র সচিবসহ মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের কাছে এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। কিন্তু কেউই এ নিয়ে আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক কোনো তথ্য দেয়া এমনকি কথা বলতেও রাজি হননি। তারা পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর কাছে বিস্তারিত শোনার পরামর্শ দেন। প্রতিমন্ত্রী অবশ্য ততক্ষণে তার লন্ডনে দেয়ার বক্তব্যের স্বপক্ষে হোম অফিসের ওই চিঠি এবং তারেক রহমানের পুরনো পাসপোর্টের কয়েকটি পাতা প্রমাণ হিসাবে প্রকাশ করেন। সংবাদ সম্মেলনের আগেই এটি তার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে প্রকাশ করা হয়। সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী চিঠির উৎস নিয়ে যা বলেছেন তার মোদ্দাকথা হলো- বিএনপির তরফে তার বক্তব্য অসত্য বলার পর তিনি প্রমাণ হাতে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। ঢাকায় ফেরার পরপরই তিনি লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশন থেকে হোয়াটসআপ বা ইন্টারনেটের মাধ্যমে হোম অফিসের ওই চিঠি এবং তারেক রহমানের মেয়াদোত্তীর্ণ পাসপোর্টের পাতাগুলোর ছবি সংগ্রহ করেছেন। প্রতিমন্ত্রী সংগ্রহ করা সেই পাসপোর্টের অনেক পাতার ছবি শেয়ার করেছেন। যাতে তারেক রহমানের ব্যক্তিগত তথ্য, পাসপোর্ট ইস্যুর তারিখ, মেয়াদ, এমনকি তার পাসপোর্টের মেয়াদ বাড়ানো সংক্রান্ত পাতাও প্রতিমন্ত্রী শেয়ার করেছেন। কিন্তু তারেক রহমানের লন্ডন যাওয়ার সেই ভিসার পাতা শেয়ার করেননি। কনস্যুলার নিয়ে কাজ করা এক কূটনীতিক বলেন, তারেক রহমানের ওই পাসপোর্টেই সেই সময়কার ভিসা থাকার কথা। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে তারেক রহমানের বৃটেনে বসবাসের স্ট্যাটাস বিষয়ে সরকারের কাছে কি তথ্য রয়েছে তা জানার চেষ্টা করেছিলেন সাংবাদিকরা। প্রতিমন্ত্রী তা জানাতে চাননি বা পারেননি। তিনি সেই সময় তারেক রহমানের কাছেই তার স্ট্যাটাস বিষয়ে জানতে পরামর্শ দেন। অন্তত দু’বার তিনি তারেক রহমানের কাছে এ নিয়ে জিজ্ঞাসা করার কথা বলেন। তারেক রহমানের কথা, বক্তব্য, বিবৃতি বা সাক্ষাৎকার প্রকাশে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। প্রতিমন্ত্রী বিষয়টি জানার পরও সাংবাদিকদের তারেক রহমানের কাছে জানতে চাওয়ার তাগিদ দেন। এদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর ফেসবুক পেজে ওই চিঠি এবং পাসপোর্টের ছবিগুলো আর দেখা যাচ্ছে না। এটি তিনি নিজে সরিয়ে নিয়েছেন নাকি হ্যাক করে সরিয়ে ফেলা হয়েছে তা নিয়ে ধূম্রজাল তৈরি হয়েছে। ফেসবুক ওয়ালে থাকা তার অন্য তথ্যগুলো ঠিকঠাক আছে কি-না? সেটিও স্পষ্ট নয়। অবশ্য প্রতিমন্ত্রী গতকাল এ নিয়ে একটি স্ট্যাটাস দিয়েছেন। সেখানে তিনি লিখেছেন- ‘আমার ফেসবুকের ওপর অনেক অত্যাচার হয়েছে সারা রাত। হ্যাকিং। পোস্ট উধাও। বুঝতেই পারছেন এই বিনিয়োগ কারা করেছে।’

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.