রাষ্ট্রপতি জিয়া এবং পার্টি ক্যাডার

এটি কোন মৌলিক নোট নয়, এমন কি দল কতৃক স্বীকৃত কোন পলিসিও নয়। বাংলাদেশের নিজস্ব রাজনীতি ও প্রশাসন সৃষ্টির মাধ্যমে বাংলাদেশীজম/ প্রো-বাংলাদেশ লাইফস্টাইল গড়ে তোলার ভাবনা থেকে তৈরী কিছু ধারণাপত্রের সমন্বয় মাত্র। এই চুড়ান্ত প্রস্তাবনাটি প্রেসিডেন্ট জিয়া কতৃক স্বীকৃতি প্রাপ্ত একটি দস্তাবেজ, যা ১৯৮০ সালের শেষ ভাগে প্রস্তুত করা হয়। আরো পরীক্ষা নিরীক্ষা সাপেক্ষে ১৯৮১ সালের শেষভাগে উন্মুক্ত দলীয় আলোচনার জন্য উপস্থাপনের কথা ছিল। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদত বরণের পর যা আর আলোর মুখ দেখেনি। গণতন্ত্র পুনঃ প্রতিষ্ঠার পথে প্রশাসনিক পুণর্বিন্যাসের লক্ষ্যে ১৯৯৩ সালের জুনে প্রস্তাবনাটি প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা’র জিয়ার ইচ্ছাতে রাজনৈতিক সচিব ড. এ কে এম ফিরোজ নুন সামনে নিয়ে আসেন। অসংখ্য চমৎকার উদ্যোগের মত এই প্রশাসনিক রাজনৈতিক ফিউফন ফিচারটিও আর আলোর মুখ দেখেনি।

সম্পূর্ণ ফিচারটিতে মার্ক্সবাদ ও ইসলামি ব্যবস্থার সুচিন্তিত পর্যায়গুলো সযতনে, সসম্মানে তুলে আনা হয়েছে। আমাদের বর্তমান রাজনীতির যে দেউলিয়াপনা তা একেবারেই উপেক্ষা না করে বরং অতিরিক্ত মনোযোগ আকর্ষনের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান দেওয়া হয়েছে। বিএনপি’র মত বহুত্ববাদী দলের আশু দূর্বলতা ও বিপর্যয়ের সম্ভাবনা সমূহ স্পষ্টাক্ষরে স্বীকার করে, মুক্তির সন্ধান দেয়া হয়েছে। তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক বিদ্যার অপূর্ব সমন্বয় দেখে আফসোসের মাত্রা হয়তো আরেকটু বৃদ্ধি পাবে ‘ইস আর পাঁচটা বছর যদি দল ও রাষ্ট্র পরিচালনার সুযোগ পেতেন দ্যা জিয়া টিম…
আমরা বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল ও দলীয় সরকার শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের মাধ্যমে এই সমাজ, অর্থনীতি ও রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে পাল্টাবো বলে দ্ব্যর্থহীন অঙ্গীকার করেছি।

  • আমরা অঙ্গীকার করেছি, আমরা আমাদের জনসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে উৎপাদন বৃদ্ধি করবো, বিদেশ নির্ভরশীলতা পরিহার করে স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ে তুলবো। মানুষ কর্তৃক মানুষের শোষণের মূলোৎপাটন, তথা শোষণহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা করবো এবং সুষম বণ্টন সুনিশ্চিত করবো। ঔপনিবেশিক প্রশাসন ঢেলে সাজিয়ে গণমুখী ও বিকেন্দ্রীকৃত প্রশাসন ব্যবস্থা চালু করবো এবং জনগণের নিজেদের হাতে নিজেদের শাসনভার অর্পণ করবো।
  • বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে আমাদের সংস্কৃতি, চিন্তাচেতনা ও মূল্যবোধকে পুনর্বিন্যস্ত করবো এবং মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের তাৎপর্যকে উর্ধে তুলে ধরবো, সকল প্রকার সাম্রাজ্যবাদ, আধিপত্যবাদ-উপনিবেশবাদকে প্রতিহত করে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে নিরংকুশ রাখবো। শুধু কাগুজে অঙ্গীকার করেই আমরা ক্ষান্ত হইনি। ইতোমধ্যেই আমরা এ লক্ষ্যে ব্যাপক কার্যক্রম শুরু করেছি।

    আমাদের নেতা ও পার্টি চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান এ প্রসঙ্গে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করেছেনঃ

শিথিল ও ভাসমান কর্মীদের দিয়ে এই শান্তিপূর্ণ বিপ্লব সাধন করা যাবেনা। শান্তিপূর্ণ বিপ্লব সাধনে চাই ক্যাডার। আমাদের ক্যাডার গড়ে তুলতে হবেক্যাডারেরাই হবে পার্টির হার্ডকোর বা শিলাকেন্দ্র। ধাপে ধাপে ক্যাডারদের হাতে ন্যস্ত হবে দলের সার্বিক নেতৃত্ব। আগামীতে পার্লামেন্টের সদস্য হবেন শুধুমাত্র ক্যাডারদেরই মধ্য থেকে। ক্যাডার ছাড়া আর কেউ ভবিষ্যতে মন্ত্রী হতে পারবে না।

কিন্তু, কি এই ক্যাডার? সাধারণ কর্মীর সঙ্গে কি পার্থক্য ক্যাডারের? কোত্থেকে কি ভাবে গড়ে উঠবে?

এবার সে প্রসঙ্গেরই আলোচনায় আসা যাক।

ক্যাডারের সংজ্ঞা ক্যাডার সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী নয়। আদর্শে উদ্বুদ্ধ এবং আদর্শের একনিষ্ঠ ও সমর্থক কর্মীই হল ক্যাডার। যে রাজনৈতিক দলের কোন সুনির্দিষ্ট আদর্শ নেই, সে রাজনৈতিক দলের কোন নেতা কর্মীই ক্যাডার পদবাচ্য নয়। আবার আদর্শভিত্তিক পার্টিরও সকল ক্যাডার কর্মী বটে; কিন্তু সকল কর্মীই ক্যাডার নয়। একজন সত্যিকার ক্যাডার বলা যাবে তাকেই-

১. যিনি পুরোপুরি আদর্শে উদ্বুদ্ধ।
২. যিনি সমকালীন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকেবহাল ও সজাগ।
৩. যিনি অবস্থিত জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে আদর্শকে বাস্তবে প্রয়োগের প্রক্রিয়া উপলব্ধি করেন।
৪. যিনি জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত এবং জনগণকে সংগঠিত ও পরিচালিত করতে সমর্থ।
৫. যার ব্যক্তিগত চরিত্র সমালোচনার উর্ধে।
৬. যিনি বিজ্ঞানের সত্য ও যুক্তি প্রাধান্য স্বীকার করেন; যিনি গোঁড়ামীমুক্ত অথচ সুশৃঙ্খল।
৭. সর্বোপরি যার ধ্যান, জ্ঞান ও ব্রত হল আদর্শ ও পার্টি এবং যার প্রথম ও প্রধান কাজ, পার্টির জন্যে কাজ।

অন্য কথায় একটি ক্যাডার বাহিনীর মধ্যে একটি সুসংগঠিত ও সুযোগ্য সেনাবাহিনীর সকল গুণাবলি থাকতে হবে এবং তার সঙ্গে যুক্ত থাকতে হবে আদর্শ উদ্বুদ্ধতা এবং যুক্তিবাদিতা। একটা সেনাবাহিনীর কাজ হল দেশ জাতির অস্তিত্ব রক্ষা করা, দেশ ও জাতির শক্রদের বিরুদ্ধে লড়াই করা। একটা ক্যাডার বাহিনীর এই দায়িত্বগুলি তো থাকেই, উপরন্তু থাকে আদর্শকে প্রতিষ্ঠিত করা এবং আদর্শের শক্রদের বিরুদ্ধে লড়াই করার দায়িত্ব। তবে সেনাবাহিনীর লড়াইয়ের কায়দা থেকে ক্যাডার বাহিনীর লড়াই কায়দা কিঞ্চিত ভিন্নতর।

সেনাবাহিনী, বিশেষত বনেদী ধরনের সেনাবাহিনী জনগণ থেকে আলাদা হয়ে ব্যারাকে অবস্থান করে; তবে যখন শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করে তখন জনগণ সরাসরি যুদ্ধের ময়দানে গিয়ে তাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করার সুযোগ পায় না।

কিন্তু ক্যাডার বাহিনীর সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক হচ্ছেঃ মাছের সঙ্গে পানির সম্পর্কের মতো। ক্যাডার জনগণের মধ্যেই বিচরণ করে, জনগণ হয় তাদের শক্তির ভিত্তি ও উৎস। জনগণকে সঙ্গে নিয়েই তারা দেশ, জাতি ও আদর্শের শক্রদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

সাধারণ রাজনৈতিক কর্মীরা জনগণের কাছে যান ওপর থেকে, নেতা হিসাবে। জনগনের একজন হিসাবে নয়; তারা জনগণের দৈনন্দিন জীবন জীবিকার সংগ্রামে প্রতাক্ষভ্যবে অংশগ্রহণ করেন না। কিন্তু একজন ক্যাডার হয় তার সম্পূর্ণ বিপরীত।

অনেকে মনে করেন নেতা ও ক্যাডার বুঝি আলাদা। যাঁরা নেতা তাদের ধারণা, যেহেতু তাঁরা নেতা সেহেতু তাদের ক্যাডারসুলভ গুণাবলি না থাকলে কিছুই যায় আসে না। নিজেদের ক্যাডারসুলভ গুণাবলি না থাকা সত্ত্বেও তারা আশা করেন- তাদের নেতৃত্বে একটা উদ্বুদ্ধ, আদর্শবান ও ত্যাগী ক্যাডার বাহিনী গড়ে উঠবে। যা কস্মিণকালেও সম্ভবপর নয়।

বস্তুত পার্টি এবং সরকারের নেতাদেরও ক্যাডার হতে হবে। শুধু ক্যাডার নয় – ক্যাডারদের মধ্যে যারা শ্রেষ্ঠ, তারাই হবেন সরকার ও পার্টির নেতা।

তাই ক্যাডার হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রথমেই শামিল হতে হবে নেতাদের। নতুবা যতো কাঠখড় পোড়ানো হোক না কেন, নিচের দিকে ক্যাডার কোনাদিনই গড়ে উঠবে না।

যে সমাজে বহু সামাজিক অবস্থান, বহু ধরনের স্বার্থ এবং বহু মতবাদ রয়েছে, সে সমাজে রেডিমেড ক্যাডার পাওয়াতো দূরের কথা, এক লক্ষ্য, এক স্বার্থ সম্পন্ন কর্মী পাওয়াও সম্ভব পর নয়। এ রকম সমাজে বিভিন্ন ধরনের মানুষ একটা গণসংগঠনে আসে বিভিন্ন কারণে। অনেক সময় স্বার্থ বা আবেগের বশে, অনেক সময় ক্ষোভের কারণে, অনেক সময় নেতার ক্যারিশমা দেখে।

এরূপ পরস্পর বিরোধী চরিত্র-স্বার্থ সম্পন্ন নেতাকর্মীদের ভেতর থেকে একচরিত্র সম্পন্ন ক্যাডার গড়তে প্রয়োজন নিরবিচ্ছিন্ন ও সঠিক প্রক্রিয়া। একটা আদর্শবান ও স্থির লক্ষ্য সম্পন্ন পার্টির ক্যডারদের চিন্তা চেতনা, লক্ষ্য ও কর্মপদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে না। মৌলিক বিষয়ে তাদের অবশ্যই হতে হবে একচরিত্র সম্পন্ন- এককেন্দ্রিক। ক্যাডার হল সেই কর্মী যে দুর্দিনে পালিয়ে যায় না, সুদিনে চরিত্র হারায় না, বরং সুদিনে দূর্দিনে সমভাবেই আদর্শের লড়াই চালিয়ে যায়।

  • ক্যাডার বাহিনীর প্রয়োজনীয়তাঃ
    ধরুন একটা বিরাট বাজারে হাজার হাজার লোক সমবেত হয়েছে৷ এখন সুসংগঠিত ও স্থির সঙ্কল্প পাঁচজন মানুষ যদি সিদ্ধান্ত নিয়ে বাজারটা ভেঙে দিতে সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তারা কি তা পারবে না? অবশ্যই পারবে। অসংগঠিত হাজার মানুষ সংগঠিত পাঁচ জন মানুষকে ঠেকাতে পারে না। ঠিক তেমনি লাখ লাখ ভাসমান সমর্থক ও বিভিন্ন ধর্মী কর্মী সংবলিত একটা আপাত বিরাট সংগঠনকেও একটা ক্ষুদ্র অথচ সুসংগঠিত শক্তি ইচ্ছা করলেই নাজেহাল, এমনকি পরাজিতও করে দিতে পারে।

ঘানার নজুমা, উগান্ডার ইদি আমিন, ইন্দেনেশিয়ার সুকর্নো, বাংলাদেশের শেখ মুজিব প্রমুখ যতক্ষণ ক্ষমতায় ছিলেন ততক্ষণ তাদের কর্মী সমর্থক মোসাহেবের কোনো ঘাটতিই ছিল না। জনসমাবেশ দেখে, কর্মীদের দাপট দেখে এবং মোসাহেবদের মিথ্যা হৃদয়গ্রাহী খোসামোদ শুনে তাদের মনে হতো যতদিন আকাশে চন্দ্রসূর্য আছে, ততদিন তাদের ক্ষমতার ইমারতে কেউই ফাটল ধরাতে পারবে না। কিন্তু হঠাৎ যেদিন ক্ষমতার মঞ্চ থেকে নিক্ষিপ্ত হলেন, সেদিন ঐ লাখ লাখ কর্মী সমর্থক মোসাহেবদের কোনো খোঁজই পাওয়া গেল না। যারা সেদিন নেতার জন্যে এক লহমাই জান দেয়ার অভিনয় করতো তারা সামান্য প্রতিরোধ গড়ার উদ্যোগ নিল না৷ বরং অনেকে নতুন শক্তিকে কূর্নিশ জানালো, তাদের সঙ্গেই আপোস করতে সচেষ্ট হল।

এরূপ নেতকর্মীরা অর্থে ক্যাডার নন। এরূপ নেতাকর্মীরা পার্টি যখন ক্ষমতায় থাকে তখন ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থবুদ্ধির দ্বারা পার্টির ক্ষতি করে, ভাবমূর্তি নষ্ট করে এবং পার্টির দুর্দিনে পালিয়ে যায়, এমনকি শক্রপক্ষেও যোগ দেয়।

অথচ এই নেতা ও কর্মীদের ধ্যান জ্ঞান ও ব্রত যদি আদর্শ ও পার্টি হত…অর্থাৎ তারা যদি বাস্তবিক ক্যাডার হতেন, তাহলে তারা ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে এমন কোন কাজ করতে পারতেন না, যা পার্টি ও নেতৃত্বের ভাবমূর্তি বিনষ্ট করে, পার্টিকে জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং দেশ ও জাতির ক্ষতি হয়।

সর্বোপরি, দূর্দিনে তাঁরা পালিয়ে যেতেন না বরং শত্রুর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতেন। যেকোনো মহৎ ও স্থায়ী তথা বিপ্লবী পরিবর্তনে ক্যাডার বাহিনী অপরিহার্য।

ইসলামের আদর্শে উদ্বুদ্ধ ক্যাডাররা একদিন আল্লাহর বাণীকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন সুদূর স্পেন থেকে চীন-ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত। আবু বকর, উমর বিন খাত্তাব, খালিদ বিন ওয়ালীদ থেকে শুরু করে সামান্য সৈনিক ও কর্মচারীটি পর্যন্ত ছিলেন ইসলামের ক্যাডার। এই ক্যাডারদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ক্যাডার ছিলেন স্বয়ং রসূলুল্পাহ (সঃ)। মূসা তরিকরা যেমনি। তেমনি নিজামুদ্দীন আঊলিয়রাও ছিলেন এই বাহিনীর অন্তর্গত। ব্যক্তিগত আরামকে হারাম করে তারা দেশে দেশে পৌঁছে দেন বাণী তৌহিদী, নিপীড়িত নিস্পেষিত জনগণকে দেখান মুক্তির সিরাতুল মূস্তাকিম।

আর এই ইসলামের অনুসারীদের মধ্যে বিশেষত নেতৃত্বের মধ্যে যখনই দেখা দিল স্বার্থবুদ্ধি, মতভিন্নতা ইন্দ্রিয়পরায়ণতা, কূপমন্ডুকতা ও অন্ধত্ব, তখনই অগ্রগতির ধারা হয়ে পড়লো বিঘ্নিত ও স্তিমিত।

অনুরূপভাবে মার্কসবাদী আদর্শে উদ্বুদ্ধ ক্যাডাররা একদিন ব্যাটলশীপ পোটেমকিনের বিদ্রোহ (১৯০৩) থেকে শুরু করে ১৯১৭ সালের বিপ্লব পর্যন্ত এমনকি বিপ্লবের পরেও প্রতিক্রিয়ার শক্তি ও কাঠামোকে নির্মূল করা পর্যন্ত নিঃস্বার্থ ও সাহসী লড়াই চালিয়ে গিয়ে রুশ সমাজকে পরিবর্তিত করে দেন। চীনের সমাজতান্ত্রিক ক্যাডাররা লং মার্চের নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে কোমরের বেল্টসিদ্ধ পানি খেয়ে চিয়াং কাইশেকের বাহিনী, দখলদার জাপানি বাহিনী প্রভৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করেন এবং কাজ, চরিত্র ও সাহস দিয়ে জনগণের হৃদয় জয় করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন ৷ কিন্তু পরবর্তীকালে যখন ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থবুদ্ধি, ব্যক্তিত্বের দ্বন্দ্ব, মতদ্বৈততা, বাজারী কোন্দল ইত্যাদি দেখা দিল, তখনই শুরু হল মার্কসবাদী আন্দোলনে ভাটা।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অগ্রগতি এবং ক্রমপরিবর্তনশীল দুনিয়ার সঙ্গে মেলাতে না পেরে অনেক প্রগতিশীল হয়ে পড়েন বিভ্রান্তির শিকার। একটি রাজনৈতিক সংগঠন, বিশেষত যে রাজনৈতিক সংগঠন সমাজে বিপ্লবী পরিবর্তন সাধন করতে চায় তাদেরকে …একদিকে জয় করতে হয় জনগণের হৃদয়, অন্যদিকে মোকাবিলা করতে হয় বিপ্লবের শত্রুদের।

সুবিধাবাদী, আয়েশী, অসার্বক্ষণিক ও ব্যক্তি স্বার্থবুদ্ধি সম্পন্ন নেতা-কর্মীরা কখনোই ঝুঁকি নেয় না, বরং অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। এজন্য প্রয়োজন আদর্শের সৈনিক ক্যাডারদের। ক্যাডারদের চরিত্র যত উন্নত হবে, প্রশিক্ষণ দিয়ে যতো তাদের দক্ষ করে তোলা যাবে, ততই তারা জনগণের সামনে সৎ দৃষ্টান্ত হিসাবে অবস্থান করবে। জনগণের মধ্যে আরও নিবিড় দক্ষতার সঙ্গে কাজ করতে সমর্থ হবেন। সমাজ ও জাতীয় ক্ষেত্রে বিপ্লবী পরিবর্তনে অধিকতর অবদান রাখতে পারবেন এবং আদর্শ ও জনগণের শত্রুদের মোকাবিলায় আরও বেশি পারঙ্গম হবেন।

কায়েমী স্বার্থবাদীদের স্বার্থ এবং আপামর জনগণের স্বার্থ সম্পূর্ণ স্ব-বিরোধী। উভয় পক্ষের স্বার্থ রক্ষা করা কোনমতেই এবং কারো পক্ষেই সম্ভবপর নয়। সুতরাং সমাজ প্রশাসন ও অর্থনীতির জঞ্জাল ও ভারসাম্যহীনতা দূর করতে হলে কায়েমী স্বার্থবাদীদের জায়গায় আদর্শে উদ্বুদ্ধ এবং সুদক্ষ নেতা-কর্মীদের অধিষ্ঠিত হতে হবে।

কিন্তু সংশ্লিষ্ট মতবাদ বা পার্টির নেতা-কর্মীরা যদি আদর্শে উদ্বুদ্ধ না হন, তাঁরা যদি সমাজ রাষ্ট্রর বিভিন্ন জটিলতা, সমস্যা ও সমাধান সম্পর্কে সুস্পষ্টরূপে অবগত না হন তাহলে তাঁরা কোনোক্রমে তাদের ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এমনকি তাঁদের ওপর দায়িত্ব দিলেও হয় তারা ব্যর্থ হবে নতুবা কায়েমী স্বার্থবাদীদের সঙ্গে এক কাতারে নিজের ও গোষ্ঠীর আখের গুছিয়ে নিতে সচেষ্ট হবে। আমাদের সামনে এমন নজিরের অভাব নেই। বস্তুত উদ্বুদ্ধ ও সুদক্ষ ক্যাডার ছাড়া শুধু লিখিত কর্মসূচি, মহৎ ঘোষণা বা কতিপয় ব্যক্তির পরম সদিচ্ছার দ্বারা পরিবর্তন সাধন সম্ভবপর নয়।

আমাদের মাননীয় পার্টি চেয়ারম্যান প্রায়ই বিজ্ঞান এবং টেকনোলজিকে বুঝার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন। এটা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। নেতৃত্ব ও ইতিহাস-সচেতন প্রতিটি ব্যক্তিই জানেন যে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হল সেই জিনিস যা মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করেছে, সভ্য ও র‍্যাশনাল করেছে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ক্রমবিকাশের ফলেই উৎপাদন ও বণ্টনের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে নিত্যনতুন উপাদান, ঘটেছে পরিমাণ ও গুণগত পরিবর্তন, প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হয়ে চলেছে সমাজ, দেশ ও পৃথিবী। এ ধারা চলছে, চিরকালই চলবে। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিকাশের ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য, লেনদেন, মুদ্রা, এমনকি সংস্কৃতি ও প্রতিরক্ষা পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রূপ ধারণ করেছে। এ যুগে পৃথিবীর ছোট বড় কোন দেশের পক্ষেই আইসোলেটেড হয়ে টিকে থাকা সম্ভবপর নয়৷ ঠিক তেমনি প্রতিটি দেশ ও সমাজ জীবনের উপাদান ও সমস্যাসমূহও একের সঙ্গে অন্যটি এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে গেছে যে কোন একটি সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন ভাবে সমাধান করা সম্ভবপর নয়৷ যেমন সমাজের রন্ধ্রে প্রবিষ্ট দূর্নীতিকে দূর করতে প্রথমেই জনগণের মাথাপিছু আয়ের সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের সংগতি বিধান করতে হবে। (নতুবা যতো কড়াকড়ি হোক তবুও দুর্নীতি থেকে যাবেই)।

এটা করার জন্যে জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি, স্বনির্ভরতা অর্জন ও বিদেশ নির্ভরশীলতা পরিহার অপরিহার্য। আবার উৎপাদনে বিপ্লবী পরিবর্তনে চাই সঠিক কর্মসূচি এবং সৎ ও দক্ষ নেতাকর্মী সম্পন্ন রাজনৈতিক পার্টি ও সরকার। আবার ধরুন একজন ব্যক্তি জীবন ধারণের জন্যে দুর্নীতি রত থাকবে অথচ তার মন-মানস-সংস্কৃতি নির্মল ও উচ্চমানের হবে এটা অসম্ভব। তাই রক্তক্ষয়ী হোক আর শান্তিপূর্ণ হোক, আজকের যুগে বিপ্লবের নেতা-কর্মীদের জ্যাক অব অল ট্রেড মাস্টার অব নান হলে চলবে না; ঠিক তেমনি জ্যাক অব নান ট্রেড, মাস্টার অব নান’ হলে একজন দক্ষ টেকনোক্রাট হওয়া যাবে, কিন্তু বিপ্লবী নেতৃত্ব দেয়া যাবে না৷ বিপ্লবে নেতৃত্ব দিতে চাই চরিত্র, আদর্শ ও সার্বিক ধারণা সম্পন্ন নেতা ও কর্মী, জ্যাক অব অল ট্রেডস অ্যান্ড মাস্টার অব এক কথায়, সৎ, দক্ষ ও সার্বিক ধারণাসম্পন্ন নেতা-কর্মীই হল ক্যাডার এবং ক্যাডার বাহিনীই হল বিপ্লবী পরিবর্তন ও নতুন সমাজ গড়ার ক্যাটালিস্ট, পরিচালন শক্তি বা গাইডিং ফ্যাক্টর এবং প্রিজারভার।
ক্যাডার গড়ার পূর্বশর্তঃ

কামনা করলেই ক্যাডার গড়ে ওঠে না। যে কোন পরিস্থিতিতেও ক্যাডার সৃষ্টি হয় না। ক্যাডার গড়ে তুলতে চাই সঠিক পরিবেশ এবং প্রক্রিয়া। ক্যাডার গড়ার পূর্ব জিজ্ঞাসা হলঃ

১) কিসের জন্যে ক্যাডার?
২) কোন পদ্ধতিতে, কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্যে ক্যাডার?

যেমন ধ্রুপদী সমাজতন্ত্র কায়েমে যে ধরনের ক্যাডার চাই, লিবারেল পুঁজিবাদ কায়েমে সে ধরনের ক্যাডারের কোন দরকার নেই।

আবার ধর্মরাষ্ট্র কায়েম করতে চাই ভিন্ন ধরনের ক্যাডার। অন্য দিকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠাতে যে ক্যাডার চাই, ফ্যাসিবাদ কায়েমে সেই ক্যাডার অপ্রয়োজনীয়।

আবার লক্ষ্য অর্জনের পথ কি হবে তার ওপরও নির্ভর করে ক্যাডারের স্বরূপ। যেমন, যারা মনে করেন সশস্ত্র লড়ায়ের মাধ্যমে রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করবেন বা বল প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তন করবেন তাঁদের ক্যাডার হবে একরকম। যাঁরা মনে করেন নিখাদ গণতন্ত্রের পথে পরম অহিংস কায়দায় লক্ষে পৌঁছবেন তাঁদের ক্যাডার হয় ভিন্ন।

আবার যাঁরা মনে করেনঃ
(ক) মূলত গণঅভ্যুত্থানের পথ অনুসরণ করবো অর্থাৎ কর্মী ও জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে সমাজ পরিবর্তনে বিপ্লব সাধন করবো।
(খ) কিন্তু রাজনীতি যেহেতু নামাবলি ক্রীড়ামাত্র নয় সেহেতু আদর্শ, দেশ ও জাতির শত্রুদের প্রয়োজনে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও রুখবা – তাদের ক্যাডার হবে ভিন্ন।

পার্টির ব্যাপারেও একই কথা। একেক লক্ষ্য ও একেক পথের জন্যে প্রয়োজন একেক ধরনের পার্টি।

বস্তুত কোন অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা কায়েমের জন্যে পার্টি ও ক্যাডার তা সুনির্দিষ্ট ও বিশদভাবে নির্ধারণ না করে ক্যাডার গড়তে চাইলে তা নিস্ফল হতে বাধ্য!

সুতরাং পার্টি বা ক্যাডার গড়তে তিনটি জিনিস সুস্পষ্ট এবং বিশদভাবে নির্ধারণ করতে হবেঃ

১) অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজ ও প্রশাসনের ক্ষেত্রে আমরা কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে চাই। অর্থাৎ শিল্প, বাণিজ্য, স্থানীয় ও বৈদেশিক, সার্ভিসেস, কৃষি, আমদানি, রফতানি, অন্যান্য সম্পদের ব্যবহার, মুদ্রা ও ব্যাংকিং, আয় বৈষম্য, জনশক্তি ও কর্মসংস্থান ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্য কি তা নির্ধারণ করতে হবে৷
নির্ধারণ করতে হবে দীর্ঘদিন চলে আসা প্রশাসন পার্লামেন্টসহ বিভিন্ন গণনির্বাচিত প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, বর্তমান আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে সমাজের যে স্বাভাবিক নেতৃত্ব ইত্যাদির কাঠামোর ক্ষেত্রে আমরা কোন কোন লক্ষ্য অর্জন করতে চাচ্ছি তা স্পষ্টকরণ।

২) এসব লক্ষ্য অর্জনে আমাদের পথ, পদ্ধতি ও ধাপসমূহ কি হবে ?

৩) এই পথে এই লক্ষ্য অর্জনের জন্যে কি কি সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন বলে আমরা বিবেচনা করি।

এই তিনটি বিষয় সুস্পষ্টরূপে নির্ধারণ করা ছাড়া পার্টি বা ক্যাডার গড়ার ইচ্ছা গন্তব্যস্থল লাইন-পয়েন্ট জংশন ইত্যাদি সম্পর্কে কিছু না জেনে রেলপাড়ি চালিয়ে দেয়ার ইচ্ছার মতো। এই তিনটি বিষয় নির্ধারণ করা ছাড়া সত্যিকার পার্টি ও ক্যাডার গড়া কেনোক্রমে সম্ভব নয় !

ক্যাডার গড়ার পদ্ধতিঃ

  • স্বতঃস্ফূর্ত বা আপনা আপনি ক্যাডার গড়ে ওঠে না। এর জন্য চাই সুষ্ঠু প্রক্রিয়া ৷ যেমনঃ
  • প্রথমত, কোন পথে কোন কাঠামোর দ্বারা কোন লক্ষ্য অর্জন করতে চাওয়া হচ্ছে, তা নির্ধারণ করতে হবে।
  • দ্বিতীয়ত, উক্ত বিষয়ে ব্যাপক পুস্তক পুস্তিকা ও অন্যান্য ডকুমেন্ট প্রস্তুত করতে হবে। নেতা-কর্মীদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিতে হবে, পাঠাভ্যাস গড়তে হবে।
  • তৃতীয়ত, লব্ধ জ্ঞান হাতে কলমে কাজে লাগাতে প্রত্যেক নেতা-কর্মীর ওপর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব থাকতে হবে।প্রত্যেক নেতা-কর্মী যাতে বাস্তব কাজে যান, কাজ থেকে শিক্ষা নেন এবং সে শিক্ষাকে পুনরায় কাজে প্রয়োগ করেন তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
  • চতুর্থত, পার্টির সকল পর্যায়ে সমালোচনা-আলোচনার পথ উন্মুক্ত করে দিতে হবে। তার সাথে সমালোচনার নামে চরিত্রহনন ও কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করতে হবে।
  • পঞ্চমত, নেতৃত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করে দিতে হবে। অর্থাৎ যাঁরা আদর্শ সবচেয়ে বেশি বুঝেন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি উপলব্ধি করেন এবং এই পরিস্থিতিতে আদর্শের প্রয়োগ-পদ্ধতি সর্বাধিক অনুধাবন করেন তারাই যেন পার্টি ও সরকারের নেতৃত্বে আসেন তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
  • ষষ্ঠত, পার্টি ও সরকারের নেতাদের মধ্যে ব্যক্তিগত জীবনে দুর্নীতিবাজ ও দুশ্চরিত্র কেউ না থাকেন তার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।
  • সপ্তমত, পার্টি ও সরকারের অভ্যন্তরে কেউ যদি ভিন্ন আদর্শ ও লক্ষ্য অর্জনের জন্যে কিংবা ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থ হাসিলের জন্যে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে গ্রুপিং করেন, তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এমন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে যাতে গ্রুপবাজরা সংগঠনের মধ্যে কোন সুবিধা করতে না পারে এবং,
  • অষ্টমত, পার্টিকে সরকার পরিচালনার ক্ষমতাসম্পন্ন ও পার্টি কর্মকর্তাদের দায়িত্বসম্পন্ন করতে হবে।

মোট কথা, সুনির্দিষ্ট লক্ষের ভিত্তিতে ব্যাপক প্রশিক্ষণ ও জ্ঞানার্জন, এই জ্ঞানকে জনগণর মধ্যে গিয়ে হাতে-কলমে কাজে লাগানো এবং কলুষ ও ব্যক্তিগত স্বার্থ বৃদ্ধি প্রতিরোধের মাধ্যমে ক্যাডার গড়ে ওঠে।

তিন ব্যক্তি কোনোদিন ক্যাডার হবে না:

ক. চক্রান্তবাজ: ওয়ানস এ কনস্পিরেটর, অলওয়েজ এ কন্সপিরেটার। যে ব্যক্তির পূর্ব ইতিহাস চক্রান্ত ও বিশ্বাসভঙ্গের, সে চিরকালই তাই করবে।

খ. দুর্নীতিবাজ: দুর্নীতিবাজ ব্যক্তি তার দূর্নীতিলব্ধ সুখ-সুবিধা সম্পদ প্রতিপত্তি রক্ষাকে স্থান দেবে সকলের ওপরে। এবং

গ. কাপুরুষ: কাপুরুষ কোনোদিনই ঝুঁকি নিতে রাজি হয় না। চরম প্রয়োজনের মুহূর্তে পালিয়ে যাবে। ব্যক্তিগত জীবনে চরিত্রহীন এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তিদেরও ক্যাডার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। সর্বোপরি দুর্নীতিবাজ, কলুষসম্পন্ন এবং আদর্শের ব্যাপারে দুর্বল ব্যক্তিরা যতদিন পার্টি ও সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে বিশেষত উচ্চ পর্যায়ে বহাল থাকবে ততদিন সত্যিকার ক্যাডার গড়ে উঠবে না।

আমাদের পরিস্থিতিতে ক্যাডারের গুরুত্ব আমরা ঘোষণা করেছি, আমরা শান্তিপূর্ণ বিপ্লব সাধন করবো। শান্তিপূর্ণ হলেও আমাদের বিপ্লবের লক্ষ্য এই সমাজ, অর্থনীতি ও প্রশাসনে আমূল পরিবর্তন। এই বিপ্লবের কথা আমাদের রাজনৈতিক স্টান্ট নয়। আমরা ইতোমধ্যে আমাদের বিপ্লবী লক্ষ্যসমূহ নির্ধারণ করেছি, আমরা কোন পথে লক্ষ্যসমূহ অর্জন করবো সেটা সূস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছি এবং এজন্য যে সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো প্রয়োজন তারও রূপরেখা প্রদান করেছি।

আমাদের লক্ষ্যসমূহ পার্টির ঘোষণাপত্র ও কর্মসূচিতে স্পষ্টরূপে বিধৃত। আমাদের নেতা চেয়ারম্যান জিয়ার বিভিন্ন বক্তব্য থেকে এগুলি আরও দ্ব্যর্থহীন ও শাণিত হয়ে উঠেছে। আমাদের মূল লক্ষ্যসমূহ মোটামুটি নিম্নরূপঃ

১) আমরা আমাদের জনসম্পদ ও প্রাকৃতিক সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের মাধ্যমে কৃষি, শিল্প ও সার্ভিস এই ৩ সেক্টরেই সর্বোচ্চ উৎপাদন মাত্রা অর্জন করতে চাই, অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে স্বয়ং সম্পূর্ণতা অর্জন করতে চাই, বিদেশের ওপর অর্থনৈতিক নির্ভরশীলতা সম্পূর্ণ পরিহার করতে চাই এবং এভাবে স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব নিরঙ্কুশ ও অর্থবহ করে তুলতে চাই;

২) আমরা আমাদের মোট সম্পদের সুষম বন্টন সুনিশ্চিত করতে চাই যাতে পর্যায়ক্রমে মানুষে মানুষে বিরাট ব্যবধান কমে আসে, দরিদ্র ও নিপীড়িত জনগণের অবস্থার সার্বিক উন্নয়ন ঘটে, প্রতিটি মানুষের খাদ্য-বস্ত্র-শিক্ষা চিকিৎসা-বাসস্থান সুনিশ্চিত হয় এবং সর্বোপরি মানুষ কর্তৃক মানুষকে শোষণের অবসান ঘটে।

৩) আমরা ঔপনিবেশিক প্রশাসন ব্যবস্থার স্থলে এমন প্রশাসন ব্যবস্থা কায়েম করতে চাই, যে প্রশাসনের সদস্যরা জনগণের মালিক মোক্তার না হয়ে জনগণের প্রকৃত সেবক হবে। আমরা সর্বস্তরে, বিশেষত নিম্নতম স্তরে (গ্রাম স্তরে) জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে প্রকৃত ক্ষমতা ও দায়িত্ব দিতে চাই এবং এভাবে প্রতিটি মানুষের কাছে গণতন্ত্রকে অর্থবহ করে তুলতে চাই।

8) বৈদেশিক নীতির ক্ষেত্রে আমরা স্বাধীন বৈদেশিক নীতি অনুসরণের প্রক্রিয়াকে বহাল রাখতে চাই। আমরা সকল প্রকার সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদ ও আধিপত্যবাদ এবং তাদের সেবাদাসদের বিরুদ্ধে তীব্রতম প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চাই। আমরা দেশে দেশে নির্যাতিত ও মুক্তিকামী জনগণের সপক্ষে বলিষ্ঠ ভূমিকা নেওয়ার নীতি অব্যাহত রাখতে চাই।

আমরা উপরিউক্ত লক্ষ্যসমূহ অর্জন করার জন্যে নিম্নলিখিত সুস্পষ্ট পথসমূহ বা রোডস টু ডেস্টিনেশনের কথা উল্লেখ করেছি;

(১) শান্তিপূর্ণ বিপ্লবঃ অর্থাৎ জনগঃণর ওপর বন্দুকের জোরে চাপিয়ে দিয়ে নয় বরং ব্যাপক জনগণকে উদ্বুদ্ধ করে এবং জনগণকে সঙ্গে নিয়ে আমরা সমাজ, অর্থনীতি, প্রশাসন ও যাবতীয় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রে আমূল পরিবর্তন সাধন করতে চাই এবং

(২) বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ ও উৎপাদনের রাজনীতিঃ অর্থাৎ আমরা অন্ধের মতো কোন পূর্বনির্ধারিত্ত মতবাদের দাসতৃ করতে চাই না। আমরা ডগমাতে বিশ্বাসী নই; ভিন্ন দেশে ভিন্ন সময়ে ভিন্ন পরিবেশে সংগঠিত কোন প্রক্রিয়া যা কর্মকাণ্ডকে আমাদের জনগণের ওপর চাপিয়ে দিতে চাই না। আমরা চাই আমাদের রাজনীতি গড়ে উঠবে আমাদের দেশের মানুষ, সম্পদ, সমস্যা, সম্ভাবনা, ঐতিহ্য এবং ভৌগোলিক ঐতিহাসিক- নৃতাত্তিক- সাংস্কৃতিক- ধর্মীয় ও মুক্তিযুদ্ধের বৈশিষ্ট্যর ওপর ভিত্তিতে।

অনুরূপভাবে আমরা আমাদের নির্ধারিত লক্ষ্য সমূহ অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠন ও প্রতিষ্ঠানের রূপরেখাও প্রদান করেছি। সংগঠনগুলি প্রধানত নিম্নরূপঃ

ক) আদর্শভিত্তিক মনোলিথিক পার্টি।
খ) পার্টির নেতৃত্বাধীনে সমাজের বিভিন্ন অংশ ও পেশার ভিত্তিতে বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন।

শান্তিপূর্ণ বিপ্লব সাধনের জন্যে আমাদের মৌল প্রতিষ্ঠানসমূহ হবে মোটামুটি নিম্নরূপঃ

পার্টির নিয়ন্ত্রণাধীন সরকার

  • সকল পর্যায়ে জনগণের নির্বাচিত সরকার, বিশেষত গ্রাম পর্যায়ে ব্যাপক দায়িত্ব ও ক্ষমতা সম্পন্ন গ্রাম সরকার।
  • সার্বিক/ব্যক্তিগত সমবায়, ব্যক্তিমুখী ও স্বার্থপর উৎপাদন ব্যবস্থা পাল্টে উৎপাদনের ক্ষেত্রে যুগান্তর সৃষ্টি করা।
  • গ্রাম/শহর প্রতিরক্ষা দল সহ উৎপাদনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত গণ মিলিশিয়া এবং বুর্জোয়া ঔপনিবেশিক প্রশাসনের স্থলে গণমুখী প্রশাসন ব্যবস্থা।

সুতরাং এ বিষয়ে তিলমাত্র সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, আমাদের লক্ষ্য, পথ ও তার জন্য প্রয়োজনীয় সংগঠন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সুনির্ধারিত ও সুসমম্বিত। আজ শুধু যেটা প্রয়োজন সেটা হল এগুলিকে আরও বিশদ করে জনগণের কাছে আরও বোধগম্য করে তোলা।

আমরা শুধু এগুলি নির্ধারণ করেই ক্ষান্ত হচ্ছিনা; আমরা ইতোমধ্যে এর ভিত্তিতে ব্যাপক কার্যক্রম আরম্ভ করেছি। যেমন, আমরা স্বনির্ভর গ্রাম সরকার গঠনের কাজ সম্পূর্ণ করতে চলেছি, সকল পর্যায়ে সার্বিক সমবায়ের উদ্যোগ নিয়েছি, গ্রাম ও পৌর প্রতিরক্ষা দল গঠন করেছি -যার সদস্য সংখ্যা ইতিমেধ্য ৩৫ লাখ মহিলাসহ এক কোটি ছাড়িয়ে গিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী-সামাজিক সমারিক আধিপত্যবাদী ও নয়া উপনিবেশবাদী শক্তি ও তাদের এজেন্টদের কবল থেকে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষা করার লক্ষে এবং বাংলাদেশকে বিদেশীদের চিরায়ত বাজার হিসাবে ব্যবহার করতে না দেয়ার উদ্দেশ্যে উৎপাদন দ্বিগুণ করণ ও সকল ক্ষেত্রে স্বনির্ভরতা অর্জনে কাজ করছি। মহিলাদের সম্পর্কে সামন্তবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অবসান ঘটিয়ে মহিলাদের সম্মানজনক ও সমমর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে উন্নীত করে চলেছি এবং ঘৃণ্য যৌতুক প্রথার মূলোৎপাটনের উদ্যোগ নিয়েছি।

বিরোধী দল, উপদলসমূহের শত প্ররোচনার মুখেও জনগণের সংগঠন ও মতামত প্রকাশের স্বাধীনতাকে তথা গণতন্ত্রকে রক্ষা করার জন্য লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি।

শিল্প উৎপাদন ও শিল্প বিনিয়োগ ক্ষেত্রে বিপ্লব সাধনে ব্রতী হয়েছি। ধর্মান্ধতার ভিত ভেঙে পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কবল থেকে দেশকে রক্ষা করার বাস্তবসম্মত কর্মসূচি গ্রহণ করেছি। পাঁচ বছরের মধ্যে সমগ্র জনগণকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে মুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছি এবং উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সুষম বণ্টন সুনিশ্চিত ও নিপীড়িত জনগণের ভাগ্য

উন্নয়নের জন্য একের পর প্রকল্প গ্রহণ করে চলেছি ৷ তাছাড়া জমির আইল…যা একদিকে খন্ডবিখন্ড ও আধুনিক চাষাবাদের অনুপযোপী করে তোলে অন্যদিকে মানুষের মন, মানস, চিন্তা, চেতনা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে খণ্ডিত, বিচ্ছিন্ন ও সংকীর্ণ করে তোলে। সেই অইল তুলে দেয়া ও কৃষি ও ভূমি সংস্কারের কার্যক্রম গ্রহণ করেতে চলেছি, হাত দিয়েছি আমাদের ভূগর্ভস্থ সম্পদ উত্তোলন, ব্যাপক খাল ও নদী খনন, বনায়ন ইত্যাদি কর্মসূচিতে। মাত্র কয়েক বছরের মধ্যে আমরা আমাদের সুযোগ্য পার্টি চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে এই যে বিপুল কার্যক্রম গ্রহণ করেছি – তা এর পূর্ববর্তী কোন দল বা সরকার কল্পনাই করতে পারেনি।

এমনিতেই এই কাজগুলি বিপুল বিরাট। তার ওপর এ সমস্ত কার্যক্রম কায়েমী স্বার্থবাদী মহল, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, নয়া উপনিবেশবাদী, আধিপত্যবাদী শক্তি ও তাদের দেশীয় এজেন্টদের স্বার্থের ভিত্তিমূলে আঘাত হানতে চলেছে৷

তাই আমাদের এই বিপ্লবী কার্যক্রমকে বানচাল করতে তারা প্রাণপণ চেষ্টা করবে সে আর বিচিত্র কি! বুলিসর্বম্ব ও বিদেশী মদদপুষ্ট বিভিন্ন নেতা ও দল উপদল আজ বুঝতে পারছে যে এ সমস্ত কার্যক্রম সাফল্য মণ্ডিত হলে তারা জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। শেষ হয়ে যাবে তাদের রাজনৈতিক লীলা খেলা। তাই তারা এবং তাদের বিদেশী মুরুব্বিরা সুযোগ পেলেই আমাদের ওপর আঘাত হানতে চেষ্টা করবে। একদিকে এই বিশাল কার্যক্রমকে সাফল্যমণ্ডিত করা এবং অন্যদিকে এই শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের শত্রুদের প্রতিহত করার জন্য চাই চরিত্রবান, উপলব্ধি ও এক চরিত্রসম্পন্ন নেতা বা কর্মীদের নিয়ে গঠিত এককেন্দ্রীক সুসংহত পার্টি। বিভিন্ন চরিত্র ও মতবাদের নেতা। কর্মীদের জটলা দিয়ে একাজ সম্পন্ন হওয়া সম্ভবপর নয়।

কিন্তু আমরা বাংলাদেশী, জাতীয়তাবাদী দলের নেতাকর্মীদের অধিকাংশই এসেছি বিভিন্ন দল, উপদল, মতবাদ ও ঘরানা থেকে। উগ্র বামপন্থী, উগ্র ডানপন্থী, মধ্যপন্থী, ধর্মসর্বস্ব, উদার দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন, স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী, স্বাধীনতা যুদ্ধ না পছন্দ ধারা থেকে আমরা এখানে এসেছি আমাদের অবিসংবাদিত নেতা চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান ও তার আদর্শের প্রতি আস্থাশীল হয়ে। রাজনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, বিভিন্ন ধারা থেকে আগত নেতা কর্মীদের নিয়ে রাজনৈতিক দল তৈরি করা হলে, এরূপ দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে তাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ঐতিহ্য, ধ্যানধারণা, প্রক্রিয়া, মেজাজ, প্রবণতা ইত্যাদি অনেক সময় পর্যন্ত থেকে যায়। এমতাবস্থায়, কাসলিডেশন ও একচরিত্র সম্পন্ন ক্যাডার গড়ার প্রক্রিয়া খুব সঠিক ও জোরদার না হলে সংশ্লিষ্ট দলে গ্রুপ বা উপদলের সৃষ্টি হয় এবং দল একটি একক দল হওয়ার বদলে কতগুলি গ্রুপ বা উপদলের ফেডারেশনে পরিণত হয়। আমাদেরও এ ব্যাপারে সতর্ক হতে হবে।

তাছাড়া এ ধরনের সংগঠন বা মাস পার্টিতে দেশী ও বিদেশী কায়েমি স্বার্থবাদীদের এজেন্টদের অনুপ্রবেশ বিচিত্র নয়। একথাও মনে রাখা দরকার যে একটা ক্ষমতাসীন দলে সকলেই আদর্শে উদ্বুদ্ধ হয়ে আসে না। কেউ কেউ আসে ব্যক্তিগত ফায়দা হাসিলের জন্য, ক্ষমতার লোভ চরিতার্থ করার জন্য, এমনকি সাবোট্যাজ করার জন্য।

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সময়ের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায়, যখন কোন রাজনৈতিক দল আকারগত দিক থাকে খুব বড়ো হয়ে যায় এবং বিভিন্ন চরিত্র মতবাদ ও ঘরানার লোকের সমাবেশ ঘটে তখন সকলকে এক চরিত্র সম্পন্ন করার জন্য অব্যাহত ও সুদৃঢ় প্রক্রিয়া না থাকলে নিম্নলিখিত প্রবণতাগুলি দেখা দিতে পারেঃ

১- স্ব স্ব গ্রুপ বজায় রাখা; সততা ও যোগ্যতার বদলে গ্রুপ বা লবির জোরে অন্যদের টেক্কা দিয়ে পার্টি বা সরকারে পজিশন পাওয়ার চেষ্টা করা।

২- পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রত্যক্ষ বা পরেক্ষেভাবে কাদা ছোড়াছুড়ি করা। একজনের আড়ালে তার বদনাম করা, হেয় প্রতিপন্ন করার চেষ্টা করা ও চরিত্রহনন করা।

৩- বিভিন্ন গ্রুপকে প্রশ্রয় দেয়া, এক গ্রুপকে দিয়ে অন্য গ্রুপকে ব্যালেল করার চেষ্টা করা এবং এভাবে স্ব স্ব পজিশন ঠিক বা স্থায়ী রাখার চেষ্টা করা।

৪- বাস্তব ভিত্তিক কাজ করার বদলে নেতা বা নেতাদের কাছাকাছি ঘোরাঘুরির মাধ্যমে দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করা। নেতাদের প্রিয়ভাজন হওয়ার উদ্দশ্যে সত্য গোপন করা। নিজেদের সম্পর্কে বাড়িয়ে বলা, অন্যের কাজকে নিজের কাজ বলে চালিয়ে দেয়া, ভুল তথ্য প্রদান ও মোসাহেবী করা ইত্যাদি।

৫- এই ভয়ে সর্বদাই ভিত থাকা যে, সত্য কথা বললে বা অন্যায়ের প্রতিবাদ করলে অন্যায়ের প্রতিকারতো হবেই না বরং প্রভাবশালীদের রোষানলে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত বা ভিক্টিমাইজড হতে হবে।

৬- সরকার বা পার্টির বিভিন্ন পদে অধিষ্ঠিত থাকলে যেনতেন প্রকারে পদ বা ক্ষমতা আঁকড়ে রাখা এবং যোগ্যতর ব্যক্তিদের যে কোনোভাবে ঠেকিয়ে রাখা। পদে বা ক্ষমতায় না থাকলে যে কোন মূল্যে পদ বা ক্ষমতা লাভের জন্য চেষ্টা তদ্বির চালিয়ে যাওয়া এবং সর্বদা ক্ষোভ, হতাশা ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের সম্পর্কে তাচ্ছিল্য প্রকাশ করা।

৭- আদর্শ, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি ইত্যাদিকে বিশদতাবে উপলব্ধি করার ওপর গুরুত্ব না দেয়া।

৮- একদিকে অন্যদের দায়িত্ব ও ক্ষমতা দিতে না চাওয়া, অন্যদিকে দায়িত্ব পালন বা অর্জন করার চেষ্টা না করা।

প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, একটি রাজনৈতিক পার্টির, বিশেষত ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক পার্টির শত কাজের মধ্যেও যারা কাজ খুঁজে পান না, শুধু দায়িত্ব বা অধিকার দেওয়া হল না বলে। আক্ষেপ করেন, তাদের কাধের উপর থেকে দায়িত্ব চাপিয়ে দেয়া হলেও তারা তা পালন করতে পারবেন কিনা সন্দেহ। এজন্যই বলা হয়ঃ

“যে ব্যক্তি অন্য কেউ দায়িত্ব দেবে বলে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকে, নিজে দায়িত্ব সৃষ্টি করে নিতে পারে না, সে আর যাইই হোক নেতা হওয়ার উপযুক্ত নয়।”

৯- রাজনীতি-অর্থনীতি-প্রশাসন-সংস্কৃতি ইত্যাদি একে অন্যের সঙ্গে ওৎপ্রোতভাবে গ্রথিত এবং একটি থেকে অন্যটিকে যে বিচ্ছিন্ন করা সম্ভবপর নয়, এ সত্য উপলব্ধি করা এবং সমস্যা সমূহকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখাঃ

১০- শত্রুকে খাটো করে দেখাঃ একথা বুঝতে না পারা শত্রুকে তার আসল আকৃতির চেয়ে বড় করে দেখলে ক্ষতি নেই। কেননা তাতে সতর্কতা ও প্রতিরোধের আয়োজনটা হয় বেশি; কিন্তু শত্রুকে খাটো করে দেখলেই বিপত্তি, কারণ তখনই দেখা দেয় শিথিলতা অসতর্কতা।

১১- নিজেদের সম্পর্কে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। একথা বিস্তৃত হওয়া যে পৃথিবীর বহু পরাক্রমশালী গোষ্ঠীকেও ক্ষমতা হারাতে হয়েছে অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের দরুনঃ

১২- ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ না করা এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন সময়ে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, নৈতিক বিচ্যুতি, দম্ভ, অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ইত্যাদির দরুন সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীর কি পরিণতি হয়েছে তা বিস্তৃত হওয়া।

আমাদেরকেও এরূপ প্রবণতা সমূহ সম্পর্কে অত্যন্ত সতর্ক হতে হবে। আরও মনে রাখতে হবে যে বিরোধী দলসমূহের মধ্যে ক্রটি-বিচূতি ভয়ানক আকারে দেখা দিলেও জনগণ বড়ো একটা ধার ধারে না।

কিন্তু সরকার, এমনকি ক্ষমতাসীন পার্টির সামান্য দোষ-ত্রুটিও জনগণের সামনে বড়ো হয়ে দেখা দেয়। এর কারণ হল এই যে ক্ষমতাসীন সরকার ও পার্টির কাছে জনগণের সরাসরি প্রত্যাশা থাকে, বিরোধী দলের কাছে তা থাকে না। তাছাড়া, সরকার ও ক্ষমতাসীন পার্টির দোষ-ত্রুটি যেভাবে জাতীয় অর্থনীতি, প্রশাসন, সামাজিক, কাঠামো, সংস্কৃতি-তথা দেশ ও জনগণের ক্ষতি করতে পারে, বিরোধী দলসমূহের বৃহত্তর দোষত্রুটিও তা করতে পারে না। সুতরাং “বিরোধী দলসমূহ খারাপ” এ প্রবণতামুক্ত না হলেও খুব একটা কিছু যায় আসে না; কিন্তু ক্ষমতাসীন দল ও পার্টির নেতা-কর্মীরা খারাপ প্রবণতা থেকে মুক্ত না হলে তা দেশ ও জাতির জন্য তো বটেই, তাদের নিজেদের জন্যও বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।

আমাদেরকে সকল প্রকার খারাপ প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়াই ঘোষণা করতে হবে। ইতিহাস এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির জ্ঞান অর্জন করতে হবে। উপলব্ধি করতে হবে সদা পরিবর্তনশীল, না দেখে বিশ্ব পরিস্থিতির সমস্যাবলিকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সমন্বিতভাবে দেখতে হবে। ক্ষুদ্র সমস্যা নিয়ে হৈচৈ করার বদলে মূল সমস্যা খুঁজে বের করতে হবে এবং সেখানেই সমাধানের প্রয়াস নিতে হবে। জনগণের মধ্যে আরও বেশি করে যেতে হবে এবং জনগণের কাজে প্রত্যেক নেতাকর্মীকেই হাতে কলমে অংশগ্রহণ করতে হবে। জনগণের কাছে শিখতে হবে, ভাষা বুঝতে হবে জনগণের। তাদের বোধশক্তি, চিন্তাচেতনা ও আশাআকাঙক্ষা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। ভাড়ামী, মোসাহেবী এবং কাজ না করে কাজের ভান ইত্যাদির মিথ্যাচারের বিরুদ্ধ রুখে দাঁড়াতে হবে। এদের সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে নেতৃত্বকে, সাবধান হতে হবে বদনামকারী ও কূটনামীকারীদের সম্পর্কে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস ত্যাগ করতে হবে এবং আমাদেরকে যে কোন মুহুর্তে বিরোধী দলের ভূমিকায় নামতে হতে পারে এবং সে পরিস্থিতিতেও আমাদেরকে রাজনীতি করে টিকে থাকতে হবে – এ কথা ভেবেই সংগঠন গড়তে হবে, নেতা ও ক্যাডার তৈরি করতে হবে।

আমাদেরকে আমাদের আদর্শ, কর্মসূচি, সংবিধান, বিভিন্ন সিদ্ধান্ত এবং নেতার প্রতি অনুগত হতে হবে। আড়ালে সমালোচনা, চরিত্রহনন ও গ্রুপিং এর সকল প্রয়াসকে দমিয়ে দিয়ে এক চরিত্র সম্পন্ন পার্টি গঠনে সর্বাত্মক উদ্যোগ নিতে হবে। বলা বাহুল্য, খারাপ প্রবণতা সমূহের বিরুদ্ধে লড়াই করার মধ্য দিয়েই গড়ে উঠতে পারে। সর্বোপরি মনে রাখতে হবে পার্টি হচ্ছে নদীর মতো। যে নদী যতো বেগবতী সে নদীতে জঞ্জাল জমে ততো কম। ঠিক তেমনি একটা পার্টির যদি ব্যাপক, প্রত্যক্ষ ও সার্বক্ষণিক প্রক্রিয়া না থাকে, নেতা-কর্মীরা যদি উদ্যোগী, কর্মঠ ও দুঃসাহসী না হন এবং তুলনামূলক কম দক্ষ নেতাকর্মীদের জায়গায় দক্ষতর নেতাকর্মীদের প্রতিষ্ঠা করার সার্বক্ষণিক প্রক্রিয়া না থাকে, তাহলে সে সংগঠনবদ্ধ হতে এবং কার্যকারিতা হারাতে বাধ্য।

আমাদের মাননীয় পার্টি চেয়ারম্যানের ভাষায়, ‘পার্টিতে ইনলেট ভালভ ও আউটলেট ভালভ থাকতে হবে; একপথ দিয়ে নিত্য নতুন নেতাকর্মীরা প্রবেশ করবে এবং অন্যপথে দুর্নীতিবাজ অযোগ্য-অথর্ব নেতাকর্মীরা বেরিয়ে যাবে।’

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলে দেখা যায় যে, কিছু সংখ্যক নেতাকর্মী মনে করেন অধ্যয়ন, আলোচনা, প্রশিক্ষণ এবং জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময় ইত্যাদির কোনই দরকার নেই। শুধু মাঠে কাজ করলেই নেতা ক্যাডার তৈরি হয়ে যায় এবং সব সমস্যার সমাধান হয়ে যায়। এ ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। আবার কেউ কেউ মনে করেন যে, জনগণের মধ্যে গিয়ে হাতে কলমে কাজ করাটা তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং লাইব্রেরি বা ঘরে বসে পুস্তকের পর পুস্তক অধ্যয়ন করলে, সভা সেমিনারে ভাষণ দিলে, অন্যদের উপদেশ দিয়ে বেড়ালে, যত্রতত্র অন্যদের সমালোচনা করলে এবং ক্লাবে যাওয়ার মতো পার্টি অফিসে বা নেতাদের সামনে হাজিরা দিলেই নেতা ক্যাডার হয়ে যাওয়া সম্ভবপর হবে। তাহলে বুঝতে হবে তারাও চূড়ান্ত বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছে।

বস্তুত নেতাকর্মীদের মধ্যে উভয় দিকেরই সুসমম্বয় ঘটাতে হবে। অধ্যয়ন – সেমিনার ওয়ার্কশপ প্রশিক্ষণ আলোচনা-সমালোচনা ইত্যাদিকে যথোপযুক্ত গুরুত্ব দিতে হবে। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে রাখতে হবে যে, সত্যিকার ক্যাডারের প্রশিক্ষণ এবং জীবন-দায়ী রস সঞ্চয়ের মূল জায়গাই হল জনগণের মধ্যে গিয়ে হাতে-কলমে কাজ ও খারাপ প্রবণতার বিরুদ্ধে আপসহীন লড়াই।
আমাদের প্রিয় নেতা পার্টি চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান বলেছেন,…..“শুধু কেতাবী বা অ্যাবস্ট্রাক্ট আদর্শ চলবে না। বাস্তব আদর্শের সঙ্গে সঙ্গে থাকতে হবে বাস্তব কর্মসূচি ও কার্যক্রম। বাস্তবিক প্রত্যক্ষ কর্মসূচি ও কার্যক্রম ব্যতিরেখে আদর্শ হবে ইউরোপীয় স্বপ্ন বিলাসের মতো, শো-কেসে সাজিয়ে রাখা নিষ্প্রাণ পুতুলের মতো।”

এবার একটু ইতিহাসের দিকে ফিরে তাকানো যাক-

এটা সকলেরই জানা, ১৯৭১ সালে ৯৩ হাজার সুপ্রশিক্ষিত পাকিস্তানি সৈন্য তাদের বিপুল ও সেফিসটিকেটেড অস্ত্রশস্ত্রসহ আত্মসমর্পণ করেছিল। এতো অধিকসংখ্যক সৈন্যের এভাবে আত্মসমর্পণ অস্বাভাবিক। তবু বাস্তবে এটিই ঘটেছিল। এর একটি কারণ ছিল এই যে তারা একটা জাতির বিরুদ্ধে লড়াই করছিল এবং নো ওয়ান ক্যান উইন এ ওয়ার এগেনস্ট এ নেশান (একটা জাতির বিরুদ্ধে লড়াই করে কেউই জিততে পারে না) কিন্তু তাদের পরাজয়ের আরও একটা কারণ ছিল। তা হলঃ

কোমরে-পকেটে কারেন্সী নোট আর সোনাদানা গুজে রেখে, ট্রেঞ্চের মধ্যে মদ আর মেয়ে মানুষের সমারোহ করে, আর যাই যা যাক, যুদ্ধ করা যায় না। অথচ হানাদার পাকিস্তানিরা তা-ই করতে চেয়ে ছিল।

এটাও সকলের জানা, ১৯৭৫ এ শেখ মুজিব যখন সপরিবারে নিহত হন, তখন বাকশাল, যুবলীগ, লালবাহিনী, গভর্নর, সেক্রেটারীদের বিরাট বহর, এমপি, মন্ত্রী ইত্যাদির কেউই তার সমর্থনে ক্ষীণতম প্রতিবাদও উচ্চারণ করতে সমর্থ হয়নি।

এর কারণই বা কি? কারণ হল একবার ব্যাঙ্ক-ব্যালেন্স হয়ে গেলে, শিল্প-ব্যবসা বাণিজ্য, ভালো চাকরি আয়ত্তে এলে, বাড়ি-গাড়ি আয়েশের স্বাদ একবার পেয়ে গেলে আর যাই-ই করা যাক, জীবন বাজি রেখে আন্দোলন গড়ে তোলা যায় না, দেয়া যায় না বিপ্লবী মিছিলের নেতৃত্ব।

অথচ এদেশের যে অগণিত তরুণ দেশ ও জাতির মুক্তির জন্য একদিন হাতে তুলে নিয়েছিল রাইফেল-কারবাইন আর মেশিনগান, জীবনবাজী রেখে লড়েছিল শক্রর সঙ্গে, সেই হাতেই সেদিন তারা ধরিয়ে দিয়েছিল মদের বোতল, ধরিয়ে দিয়েছিল লাইসেন্স আর পারমিটের কাগজ।

ইতিহাস সাক্ষী, এই অপকর্মের ঋণ তাদের রক্ত তারা জীবন দিয়েই শোধ করেছিল।

আমাদের এসব ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে মনে রাখতে হবে আমাদের কেউ যদি অর্থ সম্পদ বিলাস-ব্যসন এবং বিবিধ লোভলালসা ও নেশার শিকার হয়ে যাই, আমাদের কারুর মধ্যেও যদি ক্ষমতার মত্ততা দেখা দেয়, তাহলে আমাদের অংশের মধ্য থেকে ক্যাডার গড়ে তোলা সম্ভবপর হবে না। এটা আজ সর্বজন স্বীকৃত যে, আমাদের প্রিয় নেতা জিয়াউর রহমানের ব্যক্তিগত চরিত্র, দেশ প্রেম ও নিষ্ঠা সকল সমালোচনার উর্ধে। পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ে আরো অনেকেই আছে যাদের এক কথায় সৎ ও যোগ্য লোক বলে অভিহিত করা যায়।

কিন্তু আমাদের ভুললে চলবে না যে, এ ম্যান ইজ নোন বাই দি কম্পেনি হি কিপস- অর্থাৎ সহযোগীদের চরিত্র দিয়েই হয় যেকোন ব্যক্তির পরিচয়। তাই আজ আমাদের কেউ যদি দুনীতিবাজ দুশ্চরিত্র হই, ক্ষমতা লোলুপ শঠ মিথ্যা বাদী হই, তাহলে তাদের পাপ ও অপকীর্তির দায়ভার আমাদের নেতাসহ প্রতিটি ভালো লোককে বহন করতে হবে। দুর্নীতি, দুশ্চরিত্র ও ব্যক্তি স্বার্থ সর্বস্বতার ঐতিহাসিক পরিণতি থেকে আমাদের কেউই রক্ষা পাবো না। অন্যায়কারী ও অন্যায় সহ্যকারী উভয়েরই ভাগ্য হবে একই সূত্রে গাথা।

সিদ্ধান্তঃ আজ আমরা খালকাটা ও খাদ্য উৎপাদন দ্বিগুণ করা, গণশিক্ষা পরিবার পরিকল্পনা ও শিল্প বিপ্লব শুরু করেছি। আসুন আজ আমরা এই বিপ্লবের পাশাপাশি দেশ ও জাতির স্বার্থে, আমাদের আদর্শ উদ্দেশ্যকে সফল করার স্বার্থে, আমাদের ব্যক্তিগত ও সামগ্রিক অস্তিত্ব রক্ষার্থে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্যাডার বাহিনী গড়ে তোলার পবিত্র বিপ্লবেরও সূচনা করি।

আসুন আমরা শপথ করিঃ

  • আমরা সৎ চরিত্রবান ও আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ত হবো।
  • আমাদের সমগ্র রাজনীতিকে গভীর থকে গভীরতরভাবে উপলব্ধি করার জন্য সর্বাত্মক প্রয়াস চালিয়ে যাবো।
  • ব্যাপক, বিশেষত নিপীড়িত জনগণের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে প্রত্যক্ষ ভাবে অংশ গ্রহণ করবো।
  • নিজেরা অন্যায় করবো না এবং দলের ভেতরে বাইরে সকল অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবো।
  • সাম্রাজ্যবাদ, সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ, সংশোধনবাদ, আধিপত্যবাদ, নয়া উপনিবেশ বাদ ও তাদের স্থানীয় এজেন্টদের বিরুদ্ধে আপোসহীন লড়াই চালিয়ে যাবো। দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব যেকোন মূল্যে নিরংকুশ রাখবো।

পূর্বকথাঃ

আমাদের নেতা পার্টি চেয়ারম্যান জিয়াউর রহমান ঘোষণা করেছেন যে আগামীতে ক্যাডার ছাড়া কেউ নেতা, এমপি বা মন্ত্রী হতে পারবেন না। সুতরাং ‘ক্যাডার’ কি তা সকল কে বুঝতে হবে।

ক্যডারের সংজ্ঞা: সকল ক্যাডারই কর্মী। কিন্তু সকল কর্মীই ক্যাডার নয়। একজন ক্যাডারের মধ্যে অন্তত ৭টি গুণ থাকতে হবেইঃ

১) ক্যাডারের মধ্যে থাকতে হবে একজন সৈনিকের গুণাবলি এবং
২) সে সঙ্গে আদর্শ উদ্বুদ্ধতা এবং
৩) যুক্তিবাদিতা।
অনেকে মনে করেন নেতা ও ক্যাডার আলাদা। এ ধারণটো সম্পূর্ণ ভ্রান্ত। বস্তুতঃ
৪) শ্রেষ্ঠ ক্যাডারই হবেন সরকার ও পার্টির নেতা ৷
৫) একচরিত্র সম্পন্ন ক্যাডার গড়তে চাই ছেদহীন প্রক্রিয়া।
৬) ক্যাডার দুর্দিনে পালিয়ে যায় না।
৭) সুদিনে চরিত্র হারায় না।

ভাসমান লাখ নেতাকর্মীর চেয়ে মুষ্টিমেয় সুসংগঠিত ক্যাডার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ৷

ধর্ম প্রচার থাকে শুরু করে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পর্যন্ত বিশ্বের প্রতিটি বিপ্লবী ঘটনার মূলে ছিল ক্যাডার। ক্যাডারই বিপ্লবী পরিবর্তনের মূল পরিচালন শক্তি।

একটি সত্যিকারের পার্টি হচ্ছে ক্যাডার গড়ার পূর্বশর্ত। নেতৃত্ব বা ক্যাডার গড়তে হলে প্রথমেই তিনটি জিনিস ঠিক করতে হয়। কোন পথে, কোন কাঠামোয় কোন লক্ষ্য অর্জনের জন্য ক্যাডার গড়া হবে।

পদ্ধতিঃ আপনা আপনিই ক্যাডার গড়ে উঠে না। তার জন্য চাই প্রক্রিয়া। প্রসঙ্গত কিছু প্রক্রিয়ার কথা উল্লেখ করা যেতে পারে। তিন ব্যক্তি কখনো ক্যাডার হবে না- চক্রান্তকারী, দুর্নীতিবাজ ও কাপুরুষ। চরিত্রহীন ও নেশাগ্রস্থ দেরও ক্যাডার হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

আমাদের পরিস্থিতিতে শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের কথা কোন রাজনৈতিক ষ্টান্ট নয়। আমাদের মূল লক্ষ্য মোটামুটি চারটি। লক্ষ্য অর্জনের পথও সুনির্দিষ্ট। এর দুটি মৌল বৈশিষ্ট্য। এজন্যে আমরা মূলত দু’টি সাংগঠনিক ও পাচটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো সুনির্দিষ্ট করেছি ৷ শুধু নির্ধারণ নয় আমরা বাস্তব কাজও শুরু করেছি – এ সম্পর্কে প্রতিটি নেতাকর্মীর সুস্পষ্ট ও ব্যাপক ধারণা নিতে হবে। আমাদের এই বিপ্লবী কার্যক্রম সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদীদের ও তাদের স্থানীয় এজেন্টদের ভিত্তিমূলে আঘাত হানছে। তাই তারাও আমাদের ওপর প্রথম সুযোগেই আঘাত হানবে।

বিপ্লব সফল করতে হলে এবং বিপ্লবের শত্রুদের রুখতে হলে আমাদের ক্যাডার চাই-ই-চাই। কিন্তু আমরা এসেছি বিভিন্ন মতবাদ ও ঘরাণা থেকে। বিভিন্ন দেশের অভিজ্ঞতা থেকে দেখা যায় যে কোন দল যখন খুব বড় হয়ে যায় এবং তাতে বিভিন্ন ধরনের মানুষ – এমনকি শত্রু এজেন্টদের পর্যাপ্ত সমাবেশ ঘটে, তখন সংশ্লিষ্ট দল/ সরকারে অনেকগুলি মারাত্মক প্রবণতা দেখা দিতে পারে। তার মধ্যে ১২টি প্রবণতা সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য।আমাদেরও এরূপ প্রবণতা সম্পর্কে সতর্ক হতে হবে।

খারাপ প্রবণতার বিরুদ্ধে লড়ইয়ের মধ্য দিয়ে ক্যাডার গড়ে উঠবে ৷

বুঝতে হবে বিরোধী দলের বড় দোষের চাইতে সরকার ও সরকারি দলের কোন সামান্য ত্রুটিও জণগণের চোখে বেশি পড়ে। ক্ষুদ্র সমস্যা নিয়ে হৈচৈ না করে মূল সমস্যা খুঁজে বের করতে হবে।

জনগণের কাছে যেতেই হবে, জনগণের কাছ থেকে শিখতে হবে, জনগণের ভাষায় কথা বলতে হবে। ভাঁড় ও মোসাহেবদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হবে। যরা অন্যের বদনাম ও চরিত্র হনন করে তাদের রুখতে হবে। পার্টিকে নদীর মতো গতিশীল হতে হয়। এ ব্যাপারে মাননীয় পার্টি চেয়ারম্যানের বক্তাব্য উল্লেখ্যঃ

সর্বদা মনে রাখতে হবে, একদিকে অধ্যয়ন ও অন্যদিকে বাস্তব কাজের সমন্বয় ঘটনোই প্রকৃত শান্তিপূর্ণ বিপ্লব:

আমাদের বাস্তবতা থেকে আমাদের বুঝতেই হবেঃ
১. *১৯৭১-এ ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য কেন আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিল?
২. *কেন অগাষ্ট ১৯৭৫ ঘটনার প্রেক্ষিতে তেতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত একটি সামান্য মিছিল পর্যন্ত হয়নি।

বিশ্বের এরূপ ঘটনাবলি থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। আমাদের মহান নেতাদের চরিত্র সমালোচনার উর্ধে। আমাদের বিপুল সংখ্যক নেতা-কর্মীই সৎ। কিন্ত আমাদের মধ্যে যদি কেউ অসৎ দুর্নীতিবাজ, দুশ্চরিত্র বা চক্রান্তবাজ হলে তাদের কুকর্মের দায় প্রতিটি ভালো লোককেও বইতে হবে। কেননা অন্যায়কারী ও অন্যায় সহায্যকারী উভয়ে সমান দোষী।

সিদ্ধান্তঃ তাই আজ অন্তত আমাদের পাঁচটি শপথ নিতে হবে। অন্যান্য বিপ্লবী কাজের সঙ্গে সঙ্গে শুরু করতে হবে ক্যাডার গড়ার বিপ্লব। প্রশিক্ষিত ক্যাডাররা দল এবং দেশ ও জনগনকে টেকসই প্রবৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেবে।

সুত্রঃ
১) জিয়া কেন জনপ্রিয় ৩০২-৩১৯- একেএ ফিরোজ নুন
২) দৈনিক ইত্তেফাক
৩) নিউ ইয়র্ক টাইমস

/ফেসবুক: ওয়াসিম ইফতিখার

 

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.