নিজের টাকা ঘরে তোলার এই তো সময়

শামসুল আলম
গত তিন মাস ধরে প্রায় সকল মিডিয়ার খবর – দেশের ব্যাংকগুলোতে টাকা নাই। তারল্য সংকট! নগদ টাকার অভাবে বেশ কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংক গ্রাহকদের চেক ফিরিয়ে দিচ্ছে। গ্রাহকদের ভয়ে ফারমারস ব্যাংক সহ কয়েকটি প্রাইভেট ব্যাংকের কর্মকর্তারা পালিয়ে বেড়াচ্ছে। এ অবস্থায় বেসরকারী বাংক যখন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম, অনেক সমালোচনা উঠলে বাংলাদেশ ব্যাংককে পাশ কাটিয়ে অর্থমন্ত্রীর সাথে ম্যারাথন মিটিং করে প্রাইভেট ব্যাংকের মালিকরা। অতঃপর তারা সরকারকে রাজী করিয়ে ফেলে- তারল্য সংকট কমাতে সরকারী ফান্ডের অর্ধেক বেসরকারী ব্যাংকে দেয়া হবে, সিআরআর কমানো হয়েছে ১ পারসেন্ট। এরপর থেকে অনলাইনে ঝড় উঠলো- তবে কি জনগনের সম্পদ লুঠ করার পরে এবার রাষ্ট্রীয় বাজেট লুঠ করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে বেসরকারী ব্যাংকগুলোকে? এরপর দেখা গেলো, বেসরকারী ব্যাংকের মালিকদেরকে সপরিবারে গণভবনে ডেকে ডিনার করছেন বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রী! অবশ্য ব্যাংক মালিকরা লিখিতভাবে আবদার করেছে, অনিয়ম লুটপাটের খবর লেখালেখির বাইরে রাখতে হবে- যেনো ছড়াকার আবু সালেহর ‘ধরা যাবে না, ছোঁয়া যাবে না’র দেশ!
 
জানা গেছে, নতুন সিদ্ধান্তের ফলে ১০ থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা দেয়া হবে প্রাইভেট ব্যাংকে। এই টাকা দিয়ে ব্যাংকগুলো তাদের তারল্য বাড়াবে, সিআরআর কমানোর ফলে আইন কানুন না মেনে আরও বিপুল উৎসাহে নতুন করে ঋণ দিবে। তবে বুদ্ধিমান গ্রাহকরা নিশ্চয় এই সুযোগটি হাতছাড়া করবে না। ব্যাংকে টাকা আসার সাথে আগে আগে যারা পারেন নিজেদের আমানতের টাকা, এফডিআর ইত্যাদি সব তুলে নিবেন। হয়ত পরে আর এই সুযোগ হয়ত থাকবে না। এই একটি সংবাদের জন্য ভবিষ্যতে এই রিপোর্টকে হয়ত মনে রাখতে হবে।
 
আর প্রবাসী যারা বিদেশে কষ্টার্জিত টাকা দেশে পাঠাচ্ছেন, যারা একটু বেশি রেটের লোভে পড়ে প্রাইভেট ব্যাংকে রেমিটেন্স পাঠাচ্ছেন- তারা কি বুঝতে পারছে কত বড় রিস্ক নিচ্ছেন? এদের কষ্টের টাকা যেকোনো সময় আটকে যেতে পারে ঐ সব হায় হায় কোম্পানীর ব্যাংকে। কোরামিন দিয়ে চালানো হচ্ছে এ ব্যাংকগুলো। নিজের টাকার নিরাপত্তা চাইলে প্রাইভেট ব্যাংকে নিজের রেমিটেন্স না পাঠিয়ে সরকারী ব্যাংক বা আর্মির ব্যাংক ব্যবহার করা উচিত।
 
ব্যাংকগুলির অবস্খা এরকম কি করে হলো?
সাবেক ডেপুটি গভর্নর ইব্রাহিম খালেদ সংক্ষেপে বলেছেন, কোনো ব্যাংকের কাছে ১০০ টাকার আমানত থাকলে তা থেকে ৮৫ টাকা ঋণ দিতে পারে। কিন্তু দুর্নীতি করে ১২৫ টাকা পর্যন্ত লোন দিয়ে বসে আছে। ব্যাংকের এই মালিকরা এখন যত কান্নাকাটি করুক না কেনো, আসলে জনগনের টাকা লুট করেছে, তাদেরকে জেলে পাঠানো উচিত। আর এসব ঋণ যে রাজনৈতিক চাপ ও উচ্চমাত্রার দুর্নীতির ফলে দেয়া হয়েছে তা বলাই বাহুল্য। এগুলো কোনোদিন আদায় হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যংকের দুর্বল নিয়ন্ত্রন ও অকার্যকর মনিটরিং ব্যবস্থা এবং দুর্নীতিপরায়ন শাসন ব্যবস্থার কুফলে রাজনৈতিক চাপে ব্যাংকগুলোর সর্বনাশ করা হয়েছে।
 
সরকারী ব্যাংক বানিয়ে প্রথমেই হাজার হাজার কোটি টাকা ঋণ তুলে নেয় উদ্যোক্তরা। লুটপাটে সুবিধা দেয়ার জন্য বর্তমান সরকার একই পরিবার থেকে ২ জনের স্থলে চার জনকে পরিচালক হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে, যার ফলে সবাই মিলেমিশে বড় বড় অংকের লুটপাটে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এদের নেয়া টাকা আর ফেরত আসছে না। ফলে বাড়ছে মন্দ ঋণের পরিমাণ। কেবল নিজ ব্যাংক থেকেই নয়, বেসরকারি খাতের প্রায় সব ক’টি ব্যাংকের পরিচালকরা একে অপরের সঙ্গে ভাগাভাগি করে ঋণ দেয়া-নেয়া করেন। এর মধ্যে ন্যাশনাল ব্যাংক ৬ হাজার ৪০০ কোটি টাকা, এক্সিম ব্যাংক ৪ হাজার ৫৬৯ কোটি টাকা, ব্যাংক এশিয়া ৩ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা, ঢাকা ব্যাংক ৩ হাজার ৭২২ কোটি টাকা, এবি ব্যাংক ৩ হাজার ৫৩৬ কোটি টাকা, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক ৩ হাজার ১৫৫ কোটি টাকা, ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংক ৩ হাজার ৬৬ কোটি টাকা, যমুনা ৩ হাজার ১৬ কোটি টাকা, প্রাইম ব্যাংক ২ হাজার ৯৭৬ কোটি টাকা, ব্র্যাক ব্যাংক ২ হাজার ৯৩০ কোটি টাকা, পূবালী ব্যাংক ২ হাজার ৭৯৭ কোটি টাকা, ডাচ-বাংলা ব্যাংক ২ হাজার ৩৫৭ কোটি টাকা, ট্রাস্ট ব্যাংক ২ হাজার ৩০৩ কোটি টাকা, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক ১ হাজার ৫০৭ কোটি টাকা,এনসিসি ব্যাংক ২ হাজার ১৩৯ কোটি টাকা, সাউথইস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা, ওয়ান ব্যাংক ১ হাজার ৮২৭ কোটি টাকা, প্রিমিয়ার ব্যাংক ১ হাজার ৭৮৭ কোটি টাকা, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক ১ হাজার ৭৪৫ কোটি টাকা, মার্কেন্টাইল ব্যাংক ১ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা এবং আইএফআইসি ব্যাংকের ১ হাজার ৪০২ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য। হিসাবে দেখা গেছে, গত জুন পর্যন্ত প্রায় ৯৩,৪৫০ কোটি টাকাই নিয়েছেন ব্যাংক পরিচালকরা, যা মোট ঋণের প্রায় ১৫ শতাংশ।
 
কয়েকটি বড় লুটপাটের নজির-
১। ব্যাংকিং খাতের প্রথম ডাকাতি আবিস্কৃত হয় হলমার্ক কেলেঙ্কারীতে-এটা ছিল সরকারী ব্যাংকে সোনালী ব্যাংকে। এতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডাঃ মোদাচ্ছের আলী সশরীরে উপস্থিত হয়ে ৪ হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেন, যেটা অর্থমন্ত্রী মাল মুহিতের কাছে- ‘কিছুই না’। হলমার্কের মালিক এখন কারাগারে থাকলেও জেলের কর্মকর্তাদেরকে কয়েকটি পাজেরো গাড়ি উপঢৌকন দিয়ে সর্বোচ্চ সুবিধায় আছেন। সোনালী ব্যাংকের চট্রগ্রামের আগ্রাবাদ ও লালদীঘি শাখায় স্থানীয় একজন পরিচালকের যোগসূত্রে জালিয়াতি করে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা তুলে নিয়ে গেছে। ব্যাংকটির স্থানীয় কার্যালয়ে ১ হাজার ৬০০ কোটি টাকার ঋণ জালিয়াতিতেও পরিচালকদের হাত রয়েছে।
২। একে একে আরও বের হয় ৬ ব্যাংক থেকে ১২০০ কোটি টাকা হাতিয়ে বিসমিল্লাহ গ্রুপের হোতারা চম্পট।
৩। রাজনৈতিকভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবুল বারাকাত নিয়মনীতি না মেনে এ্যাননটেক্স গ্রুপের ইউনুছ বাদল নামে এক গাড়িচোরকে ঋণ দিয়েছে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা। ব্যাংকটির মোট মূলধন ২ হাজার ৯৭৯ কোটি টাকা। মূলধনের সর্বোচ্চ ২৫ শতাংশ পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার সুযোগ আছে। অর্থাৎ এক গ্রাহক ৭৫০ কোটি টাকার বেশি ঋণ পেতে পারেন না। অথচ দেওয়া হয়েছে মোট মূলধনের প্রায় দ্বিগুণ। এই একই ব্যাংক থেকে অনিয়মের মাধ্যমে অকাতরে ৩৩০০ কোটি টাকা ঋণ দেয়া হয়েছে ক্রিসেন্ট লেদার নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে, যে অর্থের বড় অংশই পাচার হয়েছে বলে আশঙ্কা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
৪। প্রধানমন্ত্রীর আত্মীয় বেসিক ব্যাংকের চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর যোগসাজশে হয়েছে নজিরবিহীন লুটপাট। ভুয়া, বেনামি বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানে ঋণ দিয়ে এই ব্যাংক থেকে আত্মসাৎ হয়েছে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা।
৫। ন্যাশনাল ব্যাংকের পরিচালক নিজেরা ৬’হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে, যা প্রকাশ করতে বারণ।
৬। চট্টগ্রামের এস আলম গ্রুপ কয়েকটি ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি তুলে নিয়েছে।
৭। পিছিয়ে নেই ইসলামী ব্যাংকও। নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে ইউনিল্যান্স টেক্সটাইলকে ৩৩০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে। অব্যাহতভাবে ঋণ দিয়ে গেলেও তা ফেরত দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। বারবার খেলাপি হলেও তা পুনঃতফসিল করে দেওয়া হয়েছে। এমনকি বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিলেও তা গোপন করে নতুন করে সুবিধা দেওয়া হয়েছে।
৮। রাষ্ট্রীয় শক্তির সাহায্যে বাংলাদেশের ব্যাংক রিজার্ভ লুটে ৭’শ কোটি টাকা চুরি হওয়ার পরেও একটা লোক আটক হয়না, বরং এর সাথে জড়িতরা এখনও ব্যাংকের ভিতরেই আছে! আর সেই চোরের সাগরেদ গভর্নর আতিউর কারাগারে না থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছে- গায়ে হাওয়া লাগিয়ে বিশ্বব্যাংকের সেমিনারে বক্তৃতা করে বেড়ায়!
 
সরকারের অনুগত অর্থনীতিকরাই বলছেন, দেশের প্রায় অর্ধেক ব্যাংক ভেতরে ভেতরে দেউলিয়া হয়ে আছে। ৯টি ব্যাংক মূলধন ভেঙে খেয়ে ফেলেছে। মিডিয়ার খবর ৮০ হাজার কোটি টাকা খেলাপি হয়ে আছে, আরও ৪০ হাজার কোটি টাকার কোনো খবর নাই। আসলে ফিগারটা আরও বিরাট। এক সূত্রমতে, ৭ লক্ষ কোটি টাকার ঋণ দেয়া আছে, যার প্রায় অনেকটাই মন্দ ঋণ। উচ্চ আদালতে রীট করে এদের বেশিরভাগকে খেলাপী দেখানো হয় না। অনেককে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ক্লাসিফিশেন করার সময়সীমা বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব ঋণ আর কখনই আদায় হবেনা। বাংলাদেশ ব্যাংকের সিবিআই বিভাগে এসবের হিসাব থাকলেও প্রকাশ করতে দেয়া হচ্ছে না। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে সৃষ্টির পর থেকে যত খেলাপি ঋণ হয়েছে, তার ৫৩ শতাংশই গভর্নর আতিউরের আমলে।
 
সাধারন মানুষের পকেট কেটে সে অর্থ দিয়ে অবৈধ সরকার ফুয়েলিং করে বেসরকারী ব্যাংকগুলো সচল রাখার যে চেষ্টা করা হচ্ছে, তা অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। বুদ্ধিমান গ্রাহকরা নিশ্চয় সময়ের সদ্বব্যহার করবেন। সুযোগ পাওয়া মাত্র নিজের সম্পদ তুলে হেফাজত করবেন। স্মরণ করা যায়, সন্দীপের মোস্তাফিজুর রহমানের বিসিআই ব্যাংকে আমানতকারীদের টাকা আর ফেরত দিতে পারেনি। বেসিক ব্যাংক, ফারমরাস ব্যাংক সেই পথেই হাটছে- এদের অন্তেষ্টিক্রিয়া কেবল বাকী। আরও আছে এই পথের পথিক।
 
প্রশ্ন হলো, এই যে ১০/২০ হাজার কোটি টাকা প্রাইভেট ব্যাংকে দেয়া হবে এগুলো আসবে কোত্থেকে? সরকারী কর্মকর্তা কর্মচারীদের প্রভিডেন্ট ফান্ড, পেনশন ফান্ডে, এবং বিভিন্ন সরকারী প্রেক্টের টাকা বেসরকারী ব্যাংকে দেয়া হচ্ছে। কিছুদিন পরে এ অর্থ আর ফেরত পাওয়া যাবে না। এরআগেই জলবায়ু খাতের ৫০৮ কোটি টাকা খেয়ে ফেলেছে মখা আলমগীরের ফারমারস ব্যাংক। বেসরকারী ব্যাংকে তারল্য বাড়াতে গিয়ে কিছুদিন পরে দেখা যাবে সরকারী কর্মচারীরা পেনশন গ্রাচুয়িটি পাচ্ছে না। তবে এখন এসব বরাদ্দ যারা করবেন, তারও ভবিষ্যতে দায় এড়াতে পারবেন না। এদিকে দেশী বিদেশী কোনো বিনিয়োগ নাই, রেমিটেন্স কমছে, আমদানী বাড়ছে রপ্তানী কমছে, অর্থনৈতিক ডাটার ভুতুরে ফিগার দিয়ে উন্নয়নশীল দেশের শো শা করলেও বাস্তবে অর্থনীতি চলছে কোরামিনের ওপর। কেবল বিদেশী রেমিটেন্স আসায় ব্যাংকগুলো এখনও চালু রয়েছে। প্রাইভেট ব্যাংকের মাধ্যমে বিদেশ থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দিলে এগুলো বন্ধ হয়ে যাবে। বেতন দিতে পারবে না, বাজেট দিতে পারবে না। রিজার্ভ ভেঙে কর্মচারীদের বেতন দিতে হবে, অথবা অর্ধেক বেতন ক্যাশে নাও বাকীটা বন্ডে! বিষয়গুলো গভীরভাবে ভেবে দেখা দরকার।

/বিডিটুডে

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.