উন্নয়নের মহাসড়কের পাশে ধর্ষিতা এই মৃতদেহের নাম বাংলাদেশ !

ওয়াহিদুজ্জামান

এই বাংলাদেশের অপর নাম বিউটি আক্তার। বয়স মাত্র ১৬। যার কথা ছিলো হেসে-খেলে বেড়ানোর, বাবার সাথে আহ্লাদ করার কিংবা স্কুলের সহপাঠীদের সাথে স্বাধীনতা দিবসের মিছিলে পতাকা হাতে অংশ নেবার, সে এখন শুয়ে আছে হাওরের পাশে; ধর্ষিতা, প্রাণহীন।

হবিগঞ্জ সদর উপজেলার ব্রাহ্মণডোরা গ্রামের সাঈদ মিয়ার মেয়ে বিউটিকে কিছুদিন আগে প্রথমবার ধর্ষণ করেছিল স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ মহিলা মেম্বারের ৩০ বছর বয়সী বিবাহিত ১ সন্তানের জনক এক যুব সংগঠনের নেতা। বুঝতেই পারছেন, ঐ মহিলা মেম্বার কোন দলের এবং ধর্ষক কোন যুব সংগঠনের হলে কোন পত্র পত্রিকা তাদের দলীয় পরিচয় প্রকাশের সাহস পায় না।

বিউটির বাবা প্রথমে থানায় মামলা করতে গিয়েছিলেন, থানা মামলা নেয়নি বরং পুলিশ গ্রাম্য শালিসের মাধ্যমে বিষয়টি মিটমাটের পরামর্শ দিয়েছিল। সাঈদ মিয়া হাল ছাড়েননি, তিনি কোর্টে গিয়ে ধর্ষকদের নাম উল্লেখ করে মামলা করেছিলেন। বলা বাহুল্য পুলিশ আসামীদের কাউকেই খুঁজে পায়নি, যদিও ধর্ষকরা বিউটির বাবাকে নিয়মিত হুমকি দিচ্ছিলো মামলা তুলে নেবার জন্য। বাধ্য হয়ে বিউটির বাবা তার মেয়েকে নানাবাড়ী পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। বিউটির নানাবাড়ীতে গিয়েও রাতের অন্ধকারে বিউটিকে তুলে এনে আবারো ধর্ষণের পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হত্যার পর তার লাশ ফেলে রেখে গেছে হাওরের পাশে।

পুলিশ এবার কী বলেছে শুনবেন? “কে বা কারা কেন হত্যা করেছে তা তদন্তের পরই জানা যাবে।” সংগত কারণেই পুলিশ এখনো বিউটিকে ধর্ষণের পর খুন করা প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাকে সনাক্ত করতে বা ধরতে পারেনি।

কোথাও কোন ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড কিংবা বিস্ফোরন না হবার পরও গত দুই মাসে বিরোধী রাজনৈতিক দলের প্রায় ১২ হাজার নেতাকর্মীকে পুলিশ গ্রেফতার করে সবাইকে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ এবং বিষ্ফোরক দ্রব্য রাখার দায়ে মামলা দায়ের করেছে, পাইকারী হারে রিমান্ডে নিয়েছে এবং রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন করে একজনকে খুন করে ফেলেছে।

কিন্তু কিছুদিন আগে ইডেন কলেজের কয়েক ছাত্রীকে শ্লীলতাহানী করার অভিযোগে হাতেনাতে গ্রেফতার করা অপরাধীদের ‘আদালত’ জেল গেটে জিজ্ঞাসাবাদ করার আদেশ দিয়েছে। দেশের পুলিশ এবং আদালত এখন সরকার এবং সরকার দলীয় লোকজনদের রক্ষার পাশাপাশি বিরোধীদলীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের দমনের জন্য তাদের পুরো সময় ব্যয় করছে, জনগণকে রক্ষায় জন্য সময় দেবার মত সময় তাদের কোথায়?

বিউটির এই ধর্ষিতা লাশের পাশে দাঁড়ানো নির্বাক জনগণের মতই বাংলাদেশের জনগণ নিজের দেশের মৃতদেহ দেখছে। এরই নাম স্বাধীনতা? এর জন্যই কী ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করেছিল আর লক্ষ লক্ষ মানুষ শহীদ হয়েছিল?

বিউটির লাশটা যেখানে পড়ে ছিল তার চারপাশে সবুজ ঘাস, আর বিউটির গায়ে লাল জামা। সবুজের বুকে লাল, যেন প্রিয় স্বদেশের প্রতিচ্ছবি! ধর্ষিতা বিউটি বিচার পায়নি, তাই তাকে পুনরায় ধর্ষণ করে মেরে ফেলা হয়েছে। স্বাধীনতার মাসে যখন উন্নয়নশীলতার উৎসব করছি আমরা তখন বিউটির এ ঘটনা বড্ড বেমানান।

 

 

Facebook Comments