গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে : তারেক রহমান

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি তারেক রহমান বলেছেন, এই স্বাধীনতা দিবসে আমাদেরকে আবারো একটি মুক্তিযুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। এ যুদ্ধ রুদ্ধ গণতন্ত্র মুক্ত করার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ দেশে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপার্সনকে কারামুক্ত করার যুদ্ধ। এ যুদ্ধ মানুষের বাক ও ব্যক্তি স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার যুদ্ধ।  এ যুদ্ধ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা বিধান এবং ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠার যুদ্ধ। সোমবার পূর্ব লন্ডনের দ্য রয়্যাল রিজেন্সি অডিটরিয়ামে যুক্তরাজ্য বিএনপি আয়োজিত স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, গণতন্ত্রের মুক্তির জন্য খালেদা জিয়ার মুক্তির বিকল্প নেই। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন সংগ্রামের মধ্য দিয়েই দেশনেত্রীকে মুক্ত করতে হবে।গণতন্ত্রকে মুক্ত করতে হবে।

তারেক রহমান দলের নেতাকর্মীদের সতর্ক করে দিয়ে বিএনপি চেয়ারপার্সনের একটি নির্দেশের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, কারো কোনো উস্কানি কিংবা প্রলোভনে না পড়ে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন চূড়ান্ত সফলতার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এগিয়ে যাওয়ার পথে আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি জনগণের সমর্থন আর নিজেদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য ও বিশ্বাস।

তারেক রহমান বলেন, এখন থেকে ৪৭ বছর আগে ১৯৭১ সালে শহীদ জিয়ার ডাকে যারা মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল- তাদের মধ্যে অনেকেই হয়তো রাজনীতি করতেন না, তারা কোনো রাজনৈতিক দলের লোকও ছিলো না। তাদের সকলের লক্ষ্যই ছিল দেশকে স্বাধীন করা। তারা স্বাধীন করেছিলেন এ জন্য যে দেশে গণতন্ত্র থাকবে, দেশে আইনের শাসন থাকবে, ভয়-ভীতির উর্ধে থেকে বিচার বিভাগ স্বাধীন থাকবে। তারা এমন একটি দেশ জনগণকে উপহার দেয়ার জন্যই যুদ্ধ করেছিলেন।

তিনি বলেন, যারা আপনারা এই দেশ স্বাধীন করেছেন- তাদের অনেকেই হয়তো দেশ-বিদেশে বসে এই বক্তব্য শুনছেন। যেই অঙ্গীকার নিয়ে আপনারা এই দেশ স্বাধীন করেছিলেন তার একটিও কি বর্তমানে বিরাজ করছে? তার একটিও কিন্তু এই স্বৈরাচার সরকারের আমলে বিরাজ করছে না।

সরকারের স্বৈরতন্ত্রের তকমা পাবার প্রতিবেদনের কথা উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ১৯৭১ সালের ২৬ শে মার্চ দেশ স্বাধীনের জন্য যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল এ দেশের মানুষ। ঠিক ৪৭ বছর পর ২০১৮ সালের এই মার্চ মাসেই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল স্বৈরাচার সরকার হিসেবে। যা আমরা বিগত ১০ বছর যাবত বলে আসছি তা এখন আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

সভায় তারেক রহমান বলেন, বিশ্বের অনেক দেশেই কখনো কখনো অন্ধকার এবং বর্বর শাসন-শোষণে পতিত হয়। আবার এমন অন্ধকার সময় থেকে দেশ ও জনগণকে মুক্ত করতে সাহসী নেতৃত্বও থাকে। আমাদের রয়েছে এমন সাহসী নেতৃত্ব। তিনি হচ্ছেন বেগম খালেদা জিয়া।  ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কিংবা দেশ যখনি সংকটে পড়েছে তিনি সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। ব্যক্তিগত সুখ স্বাচ্ছন্দ নয়, সব সময়ই তাঁর কাছে প্রাধান্য পেয়েছে দেশ ও জনগণের কল্যাণ। তাই বর্তমান স্বৈরাচারী সরকার দেশের গনতান্ত্রিক শক্তির ঐক্যের প্রতীক বেগম খালেদা জিয়াকে রাজনৈতিক ময়দানে মোকাবেলা করতে না পেরে তাঁকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলায় কারারুদ্ধ করে রেখেছে।

তারেক রহমান বলেন, গণতন্ত্র এখন কারারুদ্ধ। কারারুদ্ধ জনগণের স্বার্থের পক্ষে সাহসী কণ্ঠস্বর। গণতন্ত্র এবং খালেদা জিয়া এখন সমার্থক। তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়া তবে স্বৈরাচারী সরকারের সঙ্গে আপোষ করেনি। দেশে বিদেশে সবাই দেখছে, বর্তমান অবৈধ সরকার আদালতকে প্রভাবিত করে কুটকৌশলের আশ্রয় নিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে টালবাহানা করছে। বিরোধী দল ও মতের মানুষের ব্যাপারে নিম্ন আদালত কিংবা উচ্চ আদালতের ভূমিকার কারণে আদালতের প্রতি দেশবাসীর শ্রদ্ধা ও আস্থায় প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।

তারেক রহমান বলেন, বিএনপির বিশ্বাস জনগণের শক্তিতে।  তিনি বলেন,  এ যাবৎকালে দেশ যতবার সংকটে পড়েছে, প্রতিবারই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে বিএনপিই অগ্রণী ভূমিকা রেখেছে। দেশের জনগণ বিএনপির উপরই আস্থা রেখেছে।  তাই জনগণের নিরাপত্তা বিধানে, দেশের কল্যাণে বিএনপিকে কৌশলী পদক্ষেপে এগিয়ে যেতে হবে।  তিনি বলেন, এ অবৈধ সরকার সারাদেশে শুধুমাত্র বিএনপির-ই ১৮ থেকে ২০ লাখ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭০ হাজারেরও বেশি মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।

তারেক রহমান বলেন, বিশ্বের ইতিহাসে সকল স্বৈরাচারী সরকার নিজেদের দুর্নীতি-অপকর্ম-অরাজকতা-লুটপাট এবং অমানবিকতা থেকে জনগণের দৃষ্টি ভিন্নখাতে নিতে ‘উন্নয়নের’ জিগির তুলে। ক্ষমতা দখলকারী পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের শাসনকালেও গণতন্ত্র ছিলোনা, মানবাধিকার ছিলোনা।  জনগণের দৃষ্টি আড়াল করতে আইয়ুব খান সারাদেশে ঢাকঢোল পিটিয়ে পালন করেছিলেন ‘উন্নয়নের দশক’। ঠিক একইধারায় এখন চলছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আয়ুব খানের মতোই এখন স্বাধীন বাংলাদেশের বর্তমান গণতন্ত্র বিরোধী সরকার সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের দিয়ে আইয়ুব খানের মতো সারাদেশে উন্নয়নের মিছিল বের করে। তারেক রহমান প্রশ্ন করে বলেন, তাহলে পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের ভূত কাদের ঘাড়ে চেপেছে? রাজাকারের ভূত কাদের ঘাড়ে চেপেছে? যাদের ঘরে রাজাকার বেয়াই তারাই এখন আইয়ুব খানের উত্তরসূরী।

তিনি বলেন, দেশে এখন এমন কোনো সেক্টর নেই যেখানে বেপরোয়া দুর্নীতি হচ্ছেনা। নকল আর প্রশ্নপত্র ফাঁসে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের মুখে। তথাকথিত শিক্ষামন্ত্রী নিজেরাই নিজেদের চোর বলেন এমনকি সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খাওয়ার পরামর্শ দেন. তাহলে এদের কাছে আর কি আশা করা যায়।  ব্যাংকগুলো লুটপাটের শিকার হয়েছে। আন্তর্জাতিক গণমাধমে খবর বেরিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ ফান্ডের লুটেরারা এখনো নাকি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরেই রয়েছে। তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরের ছোট লুটেরারা জানে রিজার্ভ ফান্ড লুটের সঙ্গে কোন বড় লুটেরা জড়িত। বড় লুটেরাদের আশ্রয়ের কারণেই ছোট লুটেরারা এখনো বাংলাদেশ ব্যাংকের ভেতরে থাকার সাহস করছে।

তারেক রহমান বিশ্বব্যাংকের একটি রিপোর্ট তুলে ধরে ভোলেন, বিশ্বের যে কোনো দেশের চেয়ে বাংলাদেশে এক কিলোমিটার রাস্তা তৈরির খরচ বেশি। এর কারণ চুরি আর লুটপাট। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ সেক্টরে ভর্তুকি দেয়ার নামে হরিলুট চলছে। এখনো রাজধানীর মানুষই লোডশেডিং এর অভিশাপ থেকে মুক্তি পায়নি। অথচ বিদ্যুৎ সেক্টরের লুটেরাদের যাতে বিচার না হয় এই জন্য তারা আইন পাশ করেছে। আইন করে লুটপাটের বিচার রুদ্ধ করার এমন ঘটনা পৃথিবীর ইতিহাসে কোথাও নেই।

তিনি আরো বলেন, শেয়ার বাজার লুটের পর গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সরকার কেন প্রকাশ করেনি? কাকে বাঁচানোর জন্য ওই তদন্ত রিপোর্ট ধামাচাপা দিয়ে রাখা হয়েছে জনগণ জানতে চায়।

তিনি বলেন, এই সরকার এমন জনবিরোধী সরকার যে তাদের হাতে এমনকি মা বোনেরাও নিরাপদ নয়।  তারেক রহমান বলেন ৭ মার্চ রাজধানীর রাজপথে যেভাবে মা বোনদের লাঞ্চিত করা হয়েছে এমন দল দিয়ে দেশের কল্যাণ সাধন হতে পারেনা।

তিনি বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের চলমান আন্দোলনে কৌশলী পদক্ষেপে সতর্কভাবে এগিয়ে যেতে হবে যাতে অতীতের মতো আমাদের গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে অতীতের মতো কেউ প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ নিতে না পারে। সভায় সভাপতিত্ব করেন যুক্তরাজ্য বিএনপি’র সভাপতি এম এ মালিক। সাধারণ সম্পাদক কয়সর এম আহমেদের পরিচালনায় সভায় আরো উপস্থিত ছিলেন ঢাকা ও কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক ড. এম এ মালেক, বিএনপি’র আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক মাহিদুর রহমান, ব্যারিষ্টার নাসিরউদ্দিন আহমেদ অসীম এবং হুমায়ুন কবিরসহ অনেকে।

বক্তব্যের শুরুতেই তারেক রহমান স্বাধীনতার ঘোষক জিয়াউর রহমান, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিক আন্দোলনে বিভিন্ন সময়ে যারা নেতৃত্ব দিয়েছেন সেসব নেতৃবৃন্দ,  স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় যারা আত্মত্যাগ করেছেন সেইসব বীর এবং সর্বোপরি দেশে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সংগ্রামে যারা জীবন দিয়েছেন, যেসব ব্যক্তি ও পরিবারগুলো কষ্ট শিকার করেছেন কিংবা করছেন তাদেরকে শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.

%d bloggers like this: