সিরাজুল আনিসুল পিতা পুত্রের ঘুষ দুর্নীতি!

২০০১ সালের মে মাস। আ’লীগ সরকারের শেষ সময়। বাংলাদেশ বিমানের ম্যান্টেনেন্সের কাজ নতুন একটি কোম্পানীকে দেয়ার চেষ্টা করে বিমান কতৃপক্ষ। এতদিন এ কাজটা করত এয়ার ফ্রান্স কোম্পানী, যার স্থানীয় প্রতিনিধি ছিলেন কাজী তাজুল ইসলাম ফারুক। কাজ হারানোর মুখে তা ঠেকানোর উদ্দেশ্যে তাজুল ইসলাম ফারুক সেটার তদবীরের জন্য যায় শেখ মুজিব হত্যা মামলার প্রধান কৌসুলি এডভোকেট সিরাজুল হকের কাছে। সিরাজুল হক সাহেব ছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্টজন এবং আগরতলা মামলার ষড়যন্ত্র মামলার কৌশলী, আওয়ামীলীগের সাবেক প্রেসিডিয়াম মেম্বার, ৩রা নভেম্বর জেলহত্যা মামলা এবং বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার প্রধান কৌসুলী। ফলে সরকারের উপর তার প্রভাব ছিল সাংঘাতিক। কোনো মন্ত্রী সচিব তাঁর অনুরোধ ফেলতে পারবে না।
 
আওয়ামীলীগের তৎকালীন সরকারে সফল এক তদবীরবাজ পার্টির সাথে তাজুল ইসলাম ফারুক যান বনানী ২২ নম্বর রোডের এডভোকেট সিরাজুল হকের বাসায়। উদ্দেশ্য- সিরাজুল হককে দিয়ে বিমানের এমডি এয়ার কমোডর খসরুর কাছে তদবীর করা।
 
সেখানে গিয়ে ঘরে ঢুকতেই প্রথমে সাক্ষাৎ হয় সিরাজুল হকের পুত্র আনিসুল হকের সাথে। পরিচয় শেষে উদ্দেশ্য জানার পরে পিতাকে ডেকে দিলেন আনিসুল। কথাবার্তা শুনে সিরাজুল হক বললেন, আপনার তদবীর করে দিলে আমার কি লাভ? আমরা কাজ করে খাই। আমরা আইনজীবি মানুষ, টাকার বিনিময়ে কাজ করি, আমাকে কি দিবেন? তাজুল সাহেব একটু হতচকিত হয়ে যান। ছেলে আনিসুল হকে সামনে ইতস্তত করতে থাকেন। তার অবস্থা দেখে সিরাজুল হক সাহেব বললেন, লজ্জা পাওয়ার কিছু নাই, আমরা অভ্যস্ত। বললেন, আমাকে ১ মিলিয়ন ডলার দিতে পারবেন? ফারুক সাহেব হতাশ হয়ে পড়েন। বলেন, ১ মিলিয়ন ডলার আমার লাভও হবে না। অনেক কথাবার্তার পরে ঠিক হয় একাজের জন্য সিরাজুল হককে ৮ লাখ ডলার দেয়া হবে। চুক্তি সাইন হওয়ার সময় ২ লাখ, অর্ডার হলে ২ লাখ, প্রথম কাজের পেমেন্ট পাওয়ার পরে বাকী ৪ লাখ ডলার পেমেন্ট করতে হবে।

কে এই তাজুল ইসলাম ফারুক? ইনি সেই লোক, যিনি ২০০৭ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ঘুস নেয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিলেন। ওয়েস্টমন্ট পাওয়ার প্ল্যান্টের চেয়ারম্যান শিল্পপতি কাজী তাজুল ইসলাম ২০০৭ সালের ৯ এপ্রিল রাজধানীর তেজগাঁও থানায় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে তিন কোটি টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করেছিলেন। মামলার বিবরণে জানা যায়, বাঘাবাড়িতে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের জন্য ১৩ মার্চ ১৯৯৭ তারিখে ওয়েস্টমন্ট পাওয়ার কোম্পানী সরকারের সাথে একটি চুক্তি সম্পাদন করে। তখন শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী এবং বিদ্যুত মন্ত্রনালয়ের মন্ত্রীও। ১৯৯৮ সালে কোনো একদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত ষ্টাফ মানু মজুমদার তাজুল ইসলাম ফারুককে ফোন করে শেখ হাসিনার সাথে দেখা করতে বলেন, অন্যথায় তার পাওয়ার প্লান্ট নির্মানের চুক্তি বাতিল হয়ে যাবে। ৮ আগষ্ট ১৯৯৮ মানু মজুমদারের সাথে শেখ হাসিনার সরকারী বাসায় দেখা করেন তাজুল ইসলাম। সাক্ষাৎকালে শেখ হাসিনা তাকে বলেন, “বড় কাজের জন্য সবাই টোল দেয়। আপনি বড় কাজ পেয়েছেন। আপনি টোল দেননি কেনো? এ কারনে আপনার বাঘাবাড়ি প্লান্ট বাতিল হয়ে যাবে।” শেখ হাসিনা তাজুল ইসলামকে এই বলে হুশিয়ার করেন, ৩ কোটি টাকা টোল দিতে ব্যর্থ হলে তার কাজ বাতিল ছাড়াও জেলে যাওয়া লাগতে পারে। ৯ ডিসেম্বর ১৯৯৮ তার প্রকল্প বাতিলের জন্য পিডিবি থেকে উদ্যোগ নেন, ফলে বাধ্য হয়ে তাজুল ইসলাম ১২ ডিসেম্বর মানু মজুমদারের স্মরণাপন্ন হন। ঐ দিনই ৫০০ টাকা নোটের ৬০০ বান্ডেলে ৩ কোটি টাকা দুটি সুটকেসে ভরে প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে গিয়ে ঐ টাকা শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করেন তাজুল। মামলা দায়েরের পরে ২০০৭/৮ সালে এর বিচার চলছিল নিম্ন আদালতে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ হাসিনার জয়লাভের আভাস পেয়ে ৪ জানুয়ারি ২০০৯ তাজুল ইসলাম ফারুক মামলাটি প্রত্যাহরের আবেদন করেন। পিপির সুপারিশের প্রেক্ষিতে ম্যাজিষ্ট্রেট তানিয়া কামাল চুড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য তেজগাঁও থানাকে নির্দেশ দেয়। পরে মামলাটি প্রত্যাহার হয়। ৬ জানুয়ারী ২০০৯ আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় এলে রহস্যজনক কারনে তাজুল ইসলাম ফারুক তার ওয়েস্টমন্টের পদ হারান এবং তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারী হয়। কিন্তু এ করেও তাজুল ইসলাম রেহাই পাননি। ২০১৫ সালের ৩রা নভেম্বর হবিগঞ্জের নছরতপুর এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তাজুল ইসলামকে  ট্রাকচাপ দিয়ে হত্যা করা হয়। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলেন, ভবিষ্যতে ক্ষমতা হারানোর পরে তাজুল ইসলাম ফারুকের দায়ের করা দুর্নীতির মামলাটি আবার সচল হতে পারে। তাই বাদীকে কৌশলে সরিয়ে দেয়া হলো।

 

 
Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.