আপিলে খালেদা জিয়ার জামিন শুনানিতে যা বললেন আইনজীবীরা

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্টের দেয়া জামিন আদেশের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও রাষ্ট্রপক্ষের দায়ের করা লিভ টু আপিল ও একই সাথে হাটকোর্টের দেয়া জামিন স্থগিত করে আপিল বিভাগের দেয়া আদেশ প্রত্যাহার চেয়ে খালেদা জিয়ার অপর একটি আবেদনের শুনানী শেষ হয়েছে আজ।
শুনানী শেষে আপিল বিভাগ আগামীকাল সোমবার এ বিষয়ে আদেশের দিন ধার্য করেন।
প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নেতৃত্বে চার বিচারপতির আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে ওই আবেদনের ওপর শুনানি হয়। আপিল বেঞ্চের অন্য সদস্যরা হলেন- বিচারপতি মোহাম্মদ ইমান আলী, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার।
শুনানির শুরুতে দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান আদালতকে জানান, গত ১২ মার্চ হাইকোর্টে চারটি যুক্তিতে খালেদা জিয়াকে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। এ সময় তিনি হাইকোর্টের আদেশের অংশটুকু পড়ে শোনান। পরে তিনি বলেন, ‘লঘুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এ সময় মামলার রেফারেন্স হিসেবে ৪৬ ডিএলআর থেকে একটি রায়ের অংশ পড়ে শুনান। এতে বলা হয়, একটি মাদকদ্রব্য আইনে করা মামলায় এক ব্যক্তির দুই বছরের সাজা হয়েছিল। আপিল বিভাগে বিচারপতি শাহাবুদ্দীন আহমেদ জামিন দেন নাই। হাইকোর্টে আমরা এই যুক্তি দেখিয়েছিলাম। হাইকোর্ট গ্রহণ না করে সাংঘর্ষিক আদেশ দিয়েছেন।’

কেননা, হাইকোর্ট যে চারটি যুক্তিতে জামিন দিয়েছেন এর প্রথমটিতে হাইকোর্ট বলেছেন, খালেদা জিয়া জামিনের অপব্যবহার করেননি। এ প্রসঙ্গে দুদক আইনজীবী আদালতে বলেন, তিনি বিচারিক আদালতের অনুমতি না নিয়েই বিদেশে গেছেন। কাজেই হাইকোর্টের এই যুক্তি সঠিক নয়।
দ্বিতীয়ত, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা ও চিকিৎসা বিষয়ে খুরশীদ আলম খান বলেন, এখানে চিকিৎসকদের কোনো কাগজপত্র দেওয়া হয়নি। বিচারিক আদালত তাঁকে দণ্ডবিধির ৪০৯, ১০৯ ধারায় পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছেন। ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫-এর (২) ধারায় দুর্নীতির অপরাধ প্রমাণ হওয়ায়ও আদালত তাঁকে সাজা দেননি।
‘একই সুবিধা দুবার পেতে পারেন না’ উল্লেখ করে খুরশীদ আলম খান বলেন, তিনি বয়স্ক মহিলা এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ এ কারণে বিচারিক আদালত ১০ বছরের সাজা না দিয়ে পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া সমীচীন মনে করেছেন।
এ সময় আদালত বলেন, এটা কি বিচারিক আদালত গ্রহণ করেছেন?
জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, ‘হ্যাঁ, গ্রহণ করেছেন।’ পরে তিনি বলেন, ১০ বছরের সাজা না দিয়ে পাঁচ বছরের সাজা দেওয়া হয়েছে।
খুরশীদ আলম খান বলেন, এ মামলায় রায়ের আগে ও পরে দুই মাস ২৫ দিন ধরে খালেদা জিয়া কারাগারে আছেন। হাইকোর্টে উনাকে চার মাসের জামিন দিয়েছেন। এ সময়ের মধ্যে পেপারবুক প্রস্তুতের নির্দেশ দিয়েছেন। পেপারবুক প্রস্তুত হলে শুনানি হোক, সেই পর্যন্ত তিনি জেলে থাকুন। আপিল নিষ্পত্তি হলে তিনি আবার জামিন আবেদন চাইতে পারবেন।

তখন আদালত বলেন, ‘এই উপমহাদেশে জয়ললিতা, লালুপ্রসাদ যাদব কত দিন কারাগারে ছিলেন?’
জবাবে খুরশীদ আলম খান বলেন, জয়ললিতাকে দুর্নীতি মামলায় বিচারিক আদালত দোষী সাব্যস্ত করেছেন। সুপ্রিম কোর্টেও এ রায় বহাল ছিল। তাঁর সহযোগী শশীকলা নটরাজন এবং অন্য আরেকটি মামলায় লালুপ্রসাদ যাদব এখনো কারাগারে আছেন। কাজেই দুই মাস ২৫ দিনের মধ্যে জামিন পাবেন, এটা ঠিক হবে না।
এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, তিনি সারসংক্ষেপ বলতে চান। তিনি মামলার বিস্তারিত পড়া শুরু করলে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী তাতে আপত্তি তোলেন। তিনি বলেন, এখন তো আপিলের শুনানি হচ্ছে না। মামলার সারবত্তায় (মেরিট) যাওয়ার দরকার কী?
প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘আমরা মামলাটি একটু ভালো করে শুনি। আপনারাই বলেছেন, আমরা গতদিন শুনি নাই। আমরা আপনাদের কথা পরে শুনব।’
এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এটা হলো একটা সারসংক্ষেপ। বিচারিক আদালতের রায়ে একজন সাক্ষীর মাধ্যমে প্রমাণ হয়েছে, এতিমখানার টাকা উত্তোলনে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে খালেদা জিয়ার অনুমোদন ছিল। এর মধ্যে তারেক রহমান ও তাঁর ভাগ্নে মুমিনুর রহমান চার লাখ টাকা তুলে নিয়েছেন। তাঁরা কীভাবে এই টাকা তুলে নিলেন?’ এ সময় আদালত বলেন, এটা কি ব্যক্তি নামে ছিল?
অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘হ্যাঁ, এটা ব্যক্তি নামে ছিল। এফডিআর করা নিয়ে একটা মামলাও হয়। কীভাবে বিদেশ থেকে টাকা এলো, কীভাবে এফডিআর হলো? তাঁরা জমি কেনার জন্য টাকা দিয়েছিলেন, কিন্তু যখন জমি পাচ্ছিল না তখন তাঁরা জমির জন্য চাপ না দিয়ে টাকা ফেরত চেয়েছেন।’
এ সময় আদালত জানতে চান, মামলাটি কখন হয়েছিল? জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ২০০৯ সালে হয়। এ সময় অ্যাটর্নি জেনারেল মামলার ধারাবাহিক ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, বিচার বিলম্বিত করতে তাঁরা এমন কোনো পথ নেই যে অবলম্বন করেননি। এ মামলা যেন বাস্তবে না আসে সেজন্য তাঁরা বেশ কয়েকবার উচ্চ আদালতে বিভিন্ন অজুহাতে আসেন। এটা সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগেও গড়ায়। এ হলো তাদের আচরণ। মামলার নথি থেকে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর অজ্ঞাতে টাকা এসেছে বা তোলার বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না এটা ঠিক না।
হাইকোর্টের চারটি যুক্তির পাল্টা যুক্তি উপস্থাপন করে সরকারের প্রধান আইনজীবী বলেন, খালেদা জিয়াকে স্বল্প মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে। আর আপিল শুনানি হবে না এটা অযৌক্তিক। আমাদের এই কোর্টে বিডিআর মামলা ১৫২ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে। আমরা হাজার হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক তৈরি করেছি।
খালেদা জিয়া জামিনের অপব্যবহার করেননি এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এখন তিনি (খালেদা জিয়া) দণ্ডিত। এটা এখন বিচারাধীন বিষয়। একই যুক্তি এখানে প্রযোজ্য হবে না।
খালেদা জিয়া শারীরিকভাবে অসুস্থ এ যুক্তির জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, খালেদা জিয়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী। একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এবং বয়স্ক নারী। এ বিবেচনায় তাঁকে দশ বছরের সাজা না দিয়ে পাঁচ বছরের সাজা দিয়েছেন বিচারিক আদালত। একজন আসামিকে কতবার এই সুবিধা দেওয়া হবে। এখানে ফৌজদারী কাযবিধির ৪৯৭ ধারা প্রযোজ্য হবে। ৪২৬ ধারা নয়। তিনি বলেন, রাষ্ট্রীয় অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় দয়া এবং বার বার অনুকম্পা দেখানো ঠিক হবে না। কোনো রাষ্ট্রেই এটা দেখানো হয়নি। এরপর তিনি পাকিস্তানে কী হয়েছে এর নজির দেখান। তিনি আরও বলেন, আমাদের দেশে সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের সাড়ে তিন বছর জনতা টাওয়ার মামলায় সাজা হয়েছিল। উনি জেলও খেটেছেন।
এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, লালুপ্রসাদের সঙ্গে কি এ ঘটনার মিল আছে?
জবাবে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, সুপ্রিম কোর্টেও তাঁর জামিন খারিজ হয়েছিল। তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে অসুস্থ বলা হচ্ছে কিন্ত তিনি মিটিং করছেন, সমাবেশ করছেন, বিদেশ যাচ্ছেন সবকিছু করছেন। আজকে যদি জামিন দেওয়া হয় তাহলে আপিলের শুনানি অনিশ্চিত হয়ে যাবে।
এই পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, আপিল বিচারাধীন থাকাবস্থায় হাইকোর্ট জামিন দিতে পারেন, নাও দিতে পারে। তবে জামিন দেওয়াটাই স্বাভাবিক। লঘুদণ্ডের কারণে হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। জামিন না দেওয়ার নজির খুবই কম। সাধারণত দেখা যায়, আপিল বিভাগ হাইকোর্টের জামিনের ব্যপারে হস্তক্ষেপ করেননি। সীমিত ক্ষেত্রে আপিল বিভাগকে হস্তক্ষেপ করতে দেখা গেছে। যদি ন্যায়বিচার বিঘ্নিত হয়েছে সেক্ষেত্রে আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করতে পারেন। হাইকোর্ট হচ্ছে এ ধরনের মামলায় জামিন দেওয়া বা না দেওয়ার স্বাভাবিক কর্তৃপক্ষ।
এ পর্যায়ে আদালত বিরতিতে যান। বেলা সাড়ে ১১টায় ফের শুনানি হয়।
শুনানির শুরুতেই এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, ৪২৬ ধারায় মামলার সারবত্তা যাচাই করে হাইকোর্টের জন্য বাধ্যতামূলক নয়। হাইকোর্টে আবেদন আসবে, তারা এটা পুরোটাই দেখবে। তারপর তাঁরা জামিন দিবেন কি দিবেন না সেই সিদ্ধান্ত জানাবেন। আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করে না যদিনা এখানে বিচারের বিচ্যুতি না ঘটে।
এ সময় বিচারপতি ইমান আলী জানতে চান বিচারিক আদালত দণ্ড দিলে হাইকোর্ট কি দণ্ড দিতে পারে?
জবাবে এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, অনেক মামলায় হাইকোর্ট জামিন দিয়েছেন। শুধু আপিল বিভাগ এটাতে হস্তক্ষেপ করেন নাই। তিনি বলেন, মামলার কাগজপত্র তৈরি করা। রায়ের কোথাও বলা হয়নি খালেদা জিয়া অর্থ আত্মসাতে জড়িত। তাঁর (খালেদা জিয়া) স্বাক্ষর ছিল কোথাও বলা হয়নি। এটা পরিষ্কার যে, এ ধরনের জামিনের ক্ষেত্রে আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করে নাই।
এ জে মোহাম্মদ আলী বলেন, স্বল্পমেয়াদে সাজা একটি দিক, আপিল হচ্ছে আরেকটি দিক। সাজা যদি কমে তাহলে ভারসাম্যের উপর জোর দিতে হবে। লাখ লাখ সাধারণ মামলা ছেড়ে দিয়ে এটাকে সামনে আনা হচ্ছে। এটাকেই আগে শুনতে হবে। উনি (অ্যাটর্নি জেনারেল) অনেক বড় গল্প বললেন। আমি এটার জবাব দেওয়া সমীচিন মনে করি না। মামলাটি আদালতের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় চলুক। আমি মনে করি হাইকোর্টের জামিনের সিদ্ধান্ত সঠিক।
এ পর্যায়ে খালেদা জিয়ার আরেক আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এটা খালেদা জিয়ার মামলা তাই এ মামলার গুরুত্ব অনেক। তিনি না হলে আমরাও আসতাম না, সরকারও এত উৎসাহী হত না। হাইকোর্টের ক্ষমতা আছে জামিন দেওয়ার।
এ সময়ে এ জে মোহাম্মদ আলী আবার বলেন, দশ বছরের সাজার দু-একটি মামলা আছে যে গুলোতে জামিন মিলেছে কিন্ত আপিল বিভাগ হস্তক্ষেপ করেনি।
এ সময় খুরশীদ আলম খান পাকিস্তানের পারভেজ মোশারফ, জিম্বাবুয়ের রবার্ট মুগাবের মামলার নজির তুলে ধরেন।
এ সময় আদালত আদেশের জন্য সোমবার দিন ধায করেন। এ পর্যায়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, গত পরশু একটি রায়ে এতিমখানার জায়াগায় নির্মিত ১৮তলা একটি ভবন এতিমখানাকে বুঝিয়ে দিতে বলেছেন। অতএব, এ মামলাতেও এতিমদের টাকা উধাও হয়েছে।
এ সময় মাহবুব উদ্দিন খোকন অ্যাটর্নি জেনারেলকে উদ্দেশ করে বলেন, শেখ হাসিনার মামলায় সরকার বা দুদককে এভাবে আসতে দেখিনি। যতটানা এ মামলায় দেখেছি।
এ মামলায় খালেদা জিয়ার পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী এ জে মোহাম্মদ আলী, খন্দকার মাহবুব হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মাহবুবউদ্দিন খোকন, বদরুদ্দোজা বাদল
গত ১২ মার্চ খালেদা জিয়াকে চার মাসের জামিন দেন হাইকোর্ট। হাইকোর্টের দেওয়া চার মাসের জামিন স্থগিত চেয়ে পরের দিন রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদক আবেদন করে। পরে ১৪ মার্চ আপিল বিভাগ আজ পর্যন্ত জামিনের স্থগিতাদেশ দেন। পরদিন ১৫ মার্চ আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান জামিনের বিরুদ্ধে লিভ টু আপিল দায়ের করেন।
জামিনের স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের জন্য ওই দিন বিকেলেই খালেদা জিয়ার আইনজীবীরা চেম্বার আদালতে আবেদন করেন। কিন্তু আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ওই আবেদনের শুনানিও রোববার করা হবে মর্মে আদেশ দেন।
/শীর্ষনিউজ

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.