উন্নয়নশীল দেশের তকমা সমাচার..

শামসুল আলম।।

বাংলাদেশের মিডিয়ার খবর – গতকাল বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ (Developing Nation) হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছে! আমরা গত ৪০ বছর ধরে বইপত্রে লিখে আসছি বাংলাদেশ একটি উন্নয়নশীল দেশ (developing country); অনলাইন ঘটলেই বহু পাওয়া যাবে। তাহলে আমরা কি ভুল জানতাম? আসলে ঘটনাটি একটু ভিন্ন। দীর্ঘ পথ পরিক্রমায় বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশের পথে যাত্রা করেছে কেবল। আরও তিন বছর পরে মূল্যায়ন হবে বাংলাদেশ উন্নয়নশীল দেশ হলো কি না। অথচ দেশের বিনা-ভোটের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজই বলে ফেললেন- “বাংলাদেশ এখন উন্নয়নশীল দেশের মর্যাদা নিয়ে চলবে!” উনি ৩ বছর ওয়েট করতে পারবেন না, এখনি তকমা লাগিয়ে ঘুরবেন!!! যেনো ওঠ ছেমড়ি তোর বিয়া!

খবরে বলা হচ্ছে, সিডিপির মানদণ্ডে উন্নয়নশীল দেশে উন্নীত হতে মাথাপিছু আয় হতে হবে কমপক্ষে ১২শ ৩০ ডলার, আর বাংলাদেশের হয়েছে ১২শ ৭১ ডলার; মানবসম্পদ সূচকে প্রয়োজন ৬৬ বা এর বেশি, বাংলাদেশ সেখানে অর্জন করেছে ৭২ দশমিক ৯; এছাড়া অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা সূচকে হতে হবে ৩২ বা এর কম, সেখানে বাংলাদেশের আছে ২৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

এসব খবর পড়ে বাংলাদেশের মানুষ জানতে চাইতে পারে–মাথাপিছু আয়ের এই হিসাবটা কিভাবে করা হয়েছে। এর মধ্যে……… শেয়ার মার্কেট থেকে মারা ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা, কিংবা ১৫ কোটি টাকা কিলোর রাস্তা ১৮৩ কোটি টাকায় করে যে ১২গুণ বেশি টাকা পকেটে ঢুকলো, বা দেশের অর্ধেক ব্যাংক দেউলিয়া করে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটে নিয়েছে সরকারের লোকেরা, বা দুই দশকের শাসনে যে ৬ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে, বা বেসিক ব্যাংক থেকে ৩০০০ কোটি টাকা লুট, জনতা ব্যাংক থেকে ৫৪০০ কোটি টাকা সরোনো, হলমার্ক দিয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টার ৪০০০ কোটি টাকা লুট, ফার্মার্স ব্যাংক লুট, ডেসটিনি খাতে লুট ৫০০০ কোটি টাকা, বিসমিল্লাহ গ্রুপ জালিয়াতি করে ১২০০ কোটি টাকা লোপাট, বাংলাদেশ ব্যাংকের ৭’শ কোটি টাকা রিজার্ভ ‍চুরি, দোহাজারী-গুনদুম রেলপথ নির্মাণে ১,৮৫২ কোটি টাকার কাজ ১৮ হাজার কোটি টাকায় করে লুটপাট, বিশ্বের সবচেয়ে ব্যয়বহুল ফ্লাইওভার করে লুটপাট, ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মানে ১০ হাজার কোটি টাকার কাজ ৬০ হাজার কোটি টাকা বানিয়ে লুটপাট, ৩০ হাজার কোটি টাকার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ১ লাখ ১৩ হাজার করে লুটপাট, এবং অনলাইন জুড়ে প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের ৯৭ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থপাচারের যে হিসাব- এসব কি এই সিডিপির মাথাপিছু আয়ের হিসাবে ঢেকানো হয়েছে? না ঢুকিয়ে থাকলে এগুলো অন্তর্ভুক্ত করুন। সরাসরি উন্নত দেশের তকমা পেয়ে যেতে পারেন।

আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা এ উপলক্ষে তাঁর পিতার স্বপ্নের কথা স্মরণ করেছেন, ২০০১ সালের নির্বাচনে তারা হেরে যাওয়ায় দেশ পিছিয়ে যাওয়ার কথা বলেছেন। তবে উন্নয়নের ধারাবাহিকতার কথাও বলেছেন। আমরা এ প্রসঙ্গে স্মরণ করতে চাই কিভাবে তলা বিহীন ঝুড়ির দেশ এগিয়ে গেলো গত চার দশক ধরে। কেবল একটি খাতের কথাই তুলে ধরা যাক – শিক্ষা খাত:

মানুষের মনে আছে, স্বাধীনতার পরে দেশের প্রায় ৮০ ভাগ জনগেষ্ঠি যখন অশিক্ষিত, তখন রাষ্ট্রপতি শহীদ জিয়া এদেশের অক্ষরজ্ঞানহীন প্রবীণ ও শিশুদের জন্য সারাদেশে গণশিক্ষা ও বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা করেছিলেন। পাড়ায় পাড়ায় বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র তৈরী হয়েছিলো। এসএসসি পরীক্ষায় ৫০ নম্বরের একটি বিষয় ছিলো, যাতে পাশ করতে হলে একজন ছাত্রকে ৩ জন নিরক্ষরকে স্বাক্ষর করা শিখাতে হতো। এর ফলে দেশে স্বাক্ষর লোকের সংখ্যা ২৩% থেকে ৩৩%এ উন্নীত হয়। ১৯৯১ সালে ক্ষমতায় এসে বেগম খালেদা জিয়া তারই ধারাবাহিকতায় শিক্ষাকে ১ নম্বর অগ্রাধিকার হিসাবে গুরুত্ব দিয়ে কাজ শুরু করলেন। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগ সৃষ্টি করলেন, ঐ বিভাগের কর্মকান্ড মনিটর করার জন্য প্রধানমন্ত্রী নিজের অধীনে রাখলেন। বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা, উপানূষ্ঠ‍ানিক শিক্ষা কার্যক্রমের অধীনে দেশে হাজার হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ করলেন, নতুন স্কুল নির্মান করলেন, ১০০% শিক্ষার্থী ধরে রাখার জন্য বিশেষ প্রকল্প, প্রমোট প্রকল্পের অধীনে বিশেষ উদ্যোগ নিলেন। হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করলেন প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে। ১৯৯৫ সাল নাগাদ ৯২% শিশু ভর্তি নিশ্চিত হয়, যার মধ্যে ছেলে শিশু ৯৪.৫%, মেয়ে শিশু ৮৯.৬% এবং শিক্ষিতের হার দাড়ায় ৪৭.৫%।

বিএনপি ২য় বার সরকারে এসে ২০০৩-২০০৬ কেবল একটি প্রকল্পের অধীনেই ৩৫ হাজার প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ করে, প্রাথমিক শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা করে সরকারের সর্বোচ্চ মহল থেকে শিক্ষার প্রসার ঘটানোর ব্যক্তিগত উদ্যোগ, শিক্ষার গুণগত মানবৃদ্ধি, শিক্ষকদের ট্রেনিং ও শিক্ষালয়ের আধুনিকায়ন, বিনা বেতনে মেয়েদের ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত শিক্ষা, উপবৃত্তি কার্যক্রম, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচি, নতুন মেডিকেল কলেজ ও সাধারন শিক্ষার স্কুল-কলেজ নির্মান, উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রামে এশিয়ান উইমেন ইউনিভার্সিটিসহ বেসরকারী পর্যায়ে কয়েক ডজন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে শিক্ষা ক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়া যে অবদান রেখেছেন, তা যে কোনো সরকার এমনকি যুগকে ছাড়িয়ে গেছে। এসকল কাজের কৃতিত্বের জন্য খালেদা জিয়ার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সর্বোচ্চ পদক পাওয়ার কথা বহু আগেই।

কেবল হাজার হাজার শিক্ষক নিয়োগই করেনি, ২০০৪ সালে PEDP-2 প্রকল্পে ১২হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০ হাজার স্কুলের উন্নয়ন করা হয় ২০০৪-০৭ অর্থবছরে। জাতিসংঘের MDG (মিলেনিয়াম ডেভলপমেন্ট গোল)এর আওতায় ‘সবার জন্য শিক্ষা’ বাস্তবায়নের লক্ষে যে বিশাল কর্মকান্ড সম্পদিত হয়, তার ফলে জীবনমান সূচকই কেবল বাড়েনি, সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছিলো বাংলাদেশ সরকারের “মেয়েদের বিনামূল্যে শিক্ষা”, “উপবৃত্তি” ও “শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর” কথা। আফ্রিকার কয়েকটি দেশ এ সকল প্রোগাম অনুকরন করে। শিক্ষাক্ষেত্রে বেগম খালেদা জিয়ার যুগান্তকারী উদ্যোগ- মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি, বিনামূল্যে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়ার সুযোগদান, শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচীর ফলে বাংলাদেশ আজকে নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে দূর হওয়ার দ্বারপ্রান্তে (২০০৭ সালে +৭ শিক্ষিতের হার ৬১.৩%)। শিক্ষাক্ষেত্রে খালেদা জিয়ার অসামান্য অবদানের জন্য জাতিসংঘ মহাসচিব, ইউনেস্কোসহ আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে খালেদা জিয়ার সরকারের প্রশংসা করা হয়েছিলো। UNESCOর বর্তমান রিপোর্টের উধৃতি, “Female literacy rate for the first time surpassed male literacy rate, which may be considered as the impact of several gender sensitive programmes undertaken by the government and other agencies.” এরই ধারাবাহিকতায় ২০১০ সালে বাংলাদেশ লাভ করে mdg পদক। ঐপদকের জন্য ২০০৭ সালের ডাটা মূলায়ন করা হয়, সেটা বিএনপির ২০০১-০৬ সালে অর্জন। বস্তুত, ঐ পদকের জন্য কৃতিত্বের একক দাবীদার তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। এগুলো কি সামাজিক খাতে উন্নয়ন নয়? এগুলোর ধারাবাহিকতাই দেশকে নিয়ে গেছে উন্নতির দিকে।

খালেদা জিয়ার সরকার কেবল শিক্ষাখাতে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে জাতিকে শিক্ষিতই করেননি, শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়ন এবং নকলমুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা চালু করলেন। একথা সকলেই জানেন, স্বাধীনতার পর পর ১৯৭২-৭৩ সালের পাবলিক পরীক্ষায় লেখাপড়া ছাড়া শুধু অস্ত্র দেখিয়ে নকল করে ও বই দেখে লেখার কথা। ওই সময়ে যারা পাশ করেছে তারা জাতির মেধা ও মানের যে সর্বনাশ করেছে, তার খেসারত আজও জাতি দিচ্ছে। এখনও ৭৩ সালের পাশ ও ব্যাচ বললে মানুষ ভ্রু কুচকায়! ১৯৯৭ সালের পরে জাতি দেখলো পরীক্ষায় নকলের মহোৎসব এমনকি ২০০৯-১০ সালে সরকারী ব্যবস্থায় ১৫ নম্বর গ্রেস দিয়ে প্রাথমিক ও জুনিয়র পরীক্ষায় ফেল করা হাজার হাজার ছাত্রকে পাশ দেখিয়েছে। আর বর্তমান সরকারের সময় তো পরীক্ষার আগেই শতভাগ প্রশ্ন ফেসবুকে পাওয়া যায়। আ’লীগ সরকারে এলেই শিক্ষাব্যবস্থা কিভাবে ধংস করা হয়, তার প্রমান শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ নিজে।

অবশ্য বাংলাদেশের সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য শনিবার বলেছেন, উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের বাংলাদেশকে ২০২৪ সালের মধ্যে প্রধান ৫টি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে-
১. বৈদেশিক সাহায্য কমে যাবে, কাজেই রেমিটেন্সের ওপর চাপ বাড়বে,
২. তৈরি পোশাকখাতের উপর রফতানি আয় ঝুকিপূর্ন,
৩. বাংলাদেশে শ্রমের উৎপাদনশীলতা অনেক কম,
৪. যেহেতু অর্থায়ন কমে যাবে এবং নিজস্ব শক্তিতে এগুতে হবে,
৫. বৈদেশিক বিনিয়োগ আকৃষ্ট করার মত অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আবশ্যকতা।
যে দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার নাই, পাখির মত গুলি করে মানুষ মারে সরকারী বাহিনী, উচ্চ হারে দুর্নীতি- সে দেশে এগুলো অর্জন নিঃসন্দেহে বিরাট চ্যলেঞ্জ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, Committee for Development Policy (CDP) হচ্ছে জাতিসংঘের ইকোসেকের একটি পরামর্শক সংস্থা। বাংলাদেশ থেকে রেহমান সোবহান, ওয়াহিদ উদ্দিন মাহমুদ এর মেম্বার ছিলেন। সিডিপির ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে- “CDP is a subsidiary advisory body of the United Nations Economic and Social Council (ECOSOC). The CDP advises ECOSOC on a wide range of emerging economic, social and environmental issues that are relevant for the design and implementation of the United Nations Sustainable Development Agenda and for the strengthening of the international development co-operation.” এ থেকে পরিস্কার বোঝা যাচ্ছে সিডিপির কাজটা কি। তাদের কাজ ইকোসককে পরমামর্শ দেয়া, বিভিন্ন এম্বেসিতে গিয়ে সনদ বিতরন নয়। যদি সেত্যি সেটা তাদের কাজ হতো, তাহলে তা করা হতো জাতিসংঘের যেকেনো একটি কনফারেন্স হলে। শেখ মুজিবের জন্মদিনে বাংলাদেশ স্থায়ী মিশনের স্বল্প পরিসরে যে রুগ্ন আয়োজন দেখানো হলো, তা বলে দিচ্ছে উচ্চমুল্যে একটি শো-আপ অনুষ্ঠান মাত্র! যাস্ট এটি একটি রাজনীতি করার উপাদান সরবরাহ মাত্র, যার টার্গেট আর কিছু নয়, আগামী নির্বাচন। অতীতে দেশের মানুষকে এরকম ফেইক সাউথ-সাউথ প্রাইজ নাটক দেখেছে দেশের মানুষ। পরে যেটা বের হয়েছে ডলার খরচ করে ফাঁকিজুকি!

/newsorgan24

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.