উড়ে গেছে ‘এতিমের টাকা চুরি’র অভিযোগ: খালেদা জিয়ার কারাবাস ‘বঙ্গবন্ধুর’ উচ্চতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে- আশংকায় আ’লীগ!

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস দেড় মাস হতে চললো, ইতোমধ্যে জিয়া অরফানেজ মামলাটি আপিলে গেছে। অনেকে নাটক শেষে খালেদা জিয়ার জামিন হলেও কারামুক্তি মেলেনি। জামিন এবং কারামুক্তি নিয়ে নিম্ন এবং উচ্চ আদালতে সরকারের দৌড়াদৌড়ি এবং উচ্চ মাত্রার খবরদারি থাকলেও খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখা নিয়ে সরকারের স্বস্তির চেয়ে অস্থিরতা বাড়ছে।

এই অস্থিরতার কারণ হিসাবে সরকার ী দলের নেতারা জানাচ্ছেন, যেসকল উদ্দেশ্য নিয়ে খালেদা জিয়াকে কারাবন্দী করা হয়েছে, তার একটিও সফল হয়নি, বরং ঘটে গেছে উল্টো ঘটনা। এই কারাবাসে খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা বাড়ছে হু হু করে। সরকারী দলের নেতাদের মধ্যে বলাবলি হচ্ছে- খালেদা জিয়ার জনপ্রিয়তা যেভাবে বাড়ছে, তা ৭০এর বঙ্গবন্ধুকে ছাড়িয়ে যাবে। এটা কি কোনো স্যাবেটেজ নাকি?

সরকারের উদ্দেশ্য ছিল আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি প্রধান বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির দায়ে দন্ডিত অপরাধী হিসাবে দেশবাসীর কাছে প্রচার করা, বিশেষ করে ‘এতিমের টাকা চোর’ সাব্যস্ত করা। কিন্তু জিয়া অরফানেজ মামলার শেষে দেখা গেলো, কোনো টাকাই চুরি হয়নি, বরং টাকা ব্যাংকে আছে, যার বেড়ে তিন গুণ হয়েছে। ফলে সাধারন জনগনের কাছে অরফানেজ মামলার রায় গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। বরং তারা মনে করে খালেদা জিয়ার ওপরে জুলুম করা হয়েছে। তাই খালেদা জিয়ার প্রতি জনগনের সহানূভূতি এবং সমর্থন বাড়ছে। এখবর সরকারের কাছেও আছে। তাই প্রথম দিকে শেখ হাসিনা যেভাবে “এতিমের টাকা চোর” চিৎকারে  উচ্চকিত ছিল- তা থেমে গেছে। অন্যদিকে, খালেদা জিয়ার দুর্নীতি ভুলে গিয়ে জনগনের মধ্যে জোরেসোরে আলোচিত হচ্ছে- বর্তমান সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা দুর্নীতি ব্যাংক লুট ইত্যাদি।  কাদের সিদ্দিকীর ভাষায়, “দুই কোটি টাকা চুরির অভিযোগে জেলে দিলেন! আর আপনি দুই হাজার কোটি টাকা চুরি কইরা বুক ফুলাইয়া হাঁটতাছেন। দেশের মানুষ তাকে জেলে দেয়া পছন্দ করে নাই। পছন্দ করত যদি দুই হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার কোটি টাকার বিচার করা হতো।” অর্থাৎ এই মামলার উপলক্ষে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয়টি আলোচনার চলে এসেছে। এতে করে সরকারের লাভের বদলে ক্ষতি হয়েছে।

তাহলে সরকারের অর্জন কী? অনেকে বলছেন, বিষয়টি রহস্যজনক। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকার ভেবেছিল, খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির মামলায় সাজা দিয়ে কারাগারে রাখলে জনগণ বিএনপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। আওয়ামী লীগের পক্ষে মানুষের সমর্থন বাড়বে। বিএনপি ভেঙে যাবে। কিন্তু হয়েছে উল্টো। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, নির্যাতিত রাজবন্দী খালেদা জিয়ার প্রতিই জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন-সহানুভূতি বেড়েছে। যদিও সরকারি দল বুঝেও তা স্বীকার করতে চাচ্ছে না।
সরকারের নীতিনির্ধারকরা ভেবেছিলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে গেলে বিএনপি ও ২০ দলীয় জোট ভাঙা সহজ হবে। কিন্তু এ ব্যাপারে এখন পর্যন্ত আলামত নেই। ভাঙার পরিবর্তে বিএনপি আরো শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। বিগত দিনের আন্দোলনে যারা মাঠে নামেননি, খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর পর তারাও মাঠে নেমেছেন। পুলিশি নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, কিন্তু মাঠ ছেড়ে যাচ্ছেন না। বরং প্রত্যেকটা কর্মসূচিতে বিএনপি ও অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মীদের ঢল নামছে। যা সরকারের মাথাব্যথা বাড়িয়েই দিয়েছে।

সরকারি মহলের একটা পরিকল্পনা ছিল, বিএনপি সহিংস আন্দোলনে গেলে সেই সুযোগে দলটিকে ঘায়েল করা যাবে। বারবার এমন উস্কানিও দিয়ে যাচ্ছে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। কিন্তু এ পর্যন্ত বিএনপি সরকারের পাতানো ফাঁদে পড়েনি, বরং শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে দলটির নেতাকর্মীরা। গত ২২ ফেব্রুয়ারি বিএনপিকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে মহসমাবেশ করতে দেয়া হবে বলে আগাম আশ্বাস দেয়া হলেও পরে সেই অনুমতি দেয়া হয়নি। এর প্রতিবাদে তারা যে কালো পতাকা প্রদর্শনের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করছে, তাতেও পুলিশী হামলা, জলকামান ও গণগ্রেফতার চলে। এতে বস্তুত সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা এবং অসহায়ত্ব ফুটে উঠেছে। উল্টো সরকারী দলের সাধারন সম্পাদক থেকে শুরু করে দায়িত্বশীলরা বিএনপিকে সহিংস হওয়ার জন্য নানাভাবে উস্কানি দিয়েও জ্বালাও পোড়াওয়ে নামাতে ব্যর্থ হয়েছে। এর বিপরীতে খুলনায় ১৪৪ ধারা জারী করেও জনসভা করা থেকে বিএনপিকে থামানো যায়নি, চট্টগ্রামেও সভা হয়েছে গতকাল, যা বিএনপির সাংগঠনিক শক্তিমত্তার পরিচায়ক। এসব বিষয় সরকারকে ভাবিয়ে তুলেছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, খালেদা জিয়ার মত সর্বোচ্চ জনপ্রিয় নেত্রীকে জেলে পুরে এ পর্যন্ত ক্ষমতাসীনদের অর্জন ‘শূন্য’। বরং লাভবান হয়েছে বিএনপি-ই। এমন পরিস্থিতিতে সরকার দ্বিধাদ্বন্দ্বে পড়েছে।

খালেদা জিয়ার কারামু্ক্তি নিয়ে যতই জটিলতা সৃষ্টি করা হোক না কেনো, তার মুক্তি পেতে খুব বেশি সময় নিবে না, এটা বলাবলি হচ্ছে। এর বিপরীতে সরকারী পক্ষ নেমেছে ‘বিএনপি সারেন্ডার করছে’ এমন মিথ্যা প্রচারে। এসব গুজবে সাধারন মানুষ এখন সরকারকে নিয়ে হাসাহাসি করছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সরকার চায় বেগম জিয়ার জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি বন্ধ করতে। তা্ই তাঁকে ছেড়ে দেয়াই উত্তম। তবে এনিয়ে তাদের ভয়, খালেদা জিয়া কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে বেরিয়ে এলে জনস্রোত তৈরি হবে কিনা, আর সেটা গণবিপ্লবে রূপ নিতে পারে কি না? অপরদিকে বয়োবৃদ্ধ একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যুক্তিসংগত কারণ ছাড়া এভাবে দীর্ঘদিন জেলে রাখাটা দেশ বিদেশীরা ভালো চোখে দেখছেন না। বিষয়টি সরকারের জন্য আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে কি না? ডক্টর কামাল হোসেন, বি চৌধুরী, মইনুল হোসেন, আসম রব, কাদের সিদ্দিকীর মত রাজনীতিবিদরা প্রতিদিনই সতর্কতা জারী করছেন। ফলে দেশে পটপরিবর্তনের ভিন্ন কোনো প্রেক্ষাপট তৈরি হবে কিনা, যেটা অনেকে ইশারা ইঙ্গিতে বলছেন- তাও সরকারের মাথাব্যথার কারণ।

যদিও সরকারের-এমপি-মন্ত্রীরা বলে বেড়াচ্ছেন, কারো জন্য নির্বাচন থেমে থাকবে না, খালেদা জিয়ার বিষয়টি আদালতের। আদালতের মাধ্যমেই তাকে বেরিয়ে আসতে হবে। তার নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারা-না পারাও আদালতের বিষয়। কিন্তু তারপরও বন্দী খালেদা জিয়াকে সরকারের বড় ভয়। খালেদা জিয়াও যে বিনা পরিকল্পনায় জেলে গেছেন, তাও নয়। তবে কি বৃহদ কোনো পরিকল্পনা রয়েছে এর পিছনে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাদের কোনো প্লান আছে কি না। তবে দেশবাসীর ধারণা, সরকারই খালেদা জিয়াকে নির্বাচন থেকে দূরে রাখতে সব কৌশল চালিয়ে গেলেও এ চেষ্টা অচিরেই মুখ থুবড়ে পড়বে। বিশেষ করে প্রতিবেশি দেশ সহ বিদেশীরওি আরেকটি ৫ জানুয়ারি মার্কা নির্বাচন চায় না।

Facebook Comments