আন্দোলনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের নেত্রী খালেদা জিয়াকে মুক্ত করবো: চট্টগ্রামে ফখরুল

বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, সরকার দেশের জনগণ ও দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে ভয় পায় বলে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দিচ্ছে না। ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের নেত্রী বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করে আনবো। তাঁকে ছাড়া দেশে কোনো নির্বাচন হতে দেওয়া হবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে নগরীর নুর আহম্মদ সড়কে দলের চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি একথা বলেন। সভার শুরুতে নেপালের ত্রিভুবন বিমানবন্দরে ফ্লাইট বিএস২২১ বিধ্বস্ত হয়ে নিহতদের প্রতি শোক জানানো হয়। মহানগর, উত্তর ও দক্ষিণ জেলা বিএনপি যৌথভাবে এ জনসভার আয়োজন করে।
নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের সভাপতিত্বে জনসভায় বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদ, মির্জা আব্বাস, ড. মঈন খান, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান বরকত উল্লাহ বুলু, মোহাম্মদ শাহজাহান, মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন, গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী, চেয়ারপার্সনের উপদেষ্টা জয়নাল আবেদীন ফারুক, বেগম রোজি কবির, গোলাম আকবর খোন্দকার, এস এম ফজলুল হক, সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম, দক্ষিণ জেলা বিএনপির সভাপতি জাফরুল ইসলাম চৌধুরী, শ্রমিক দল নেতা এ এম নাজিম উদ্দিন, ডা. মহসিন জিল্লুর, আবদুল ওয়াদুদ ভূঁইয়া, নগর বিএনপির সহ সভাপতি আবু সুফিয়ান, ইদ্রিম মিয়া চেয়ারম্যান, উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সহ সভাপতি এম এ হালিম, চাকসু ভিপি নাজিম উদ্দিন, ডা. খুরশিদ জামিল চৌধুরী, ইঞ্জিনিয়ার বেলায়েত হোসেন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্কর-এর সঞ্চালনায় সভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আজ সমস্ত অধিকার কেড়ে নেয়া হয়েছে। কোনো সমাবেশ করতে দিচ্ছে না। অথচ আওয়ামীলীগ নেত্রী হেলিকপ্টার করে সারাদেশে নৌকার জন্য ভোট চাচ্ছেন। এক দেশে দুই আইন ও দুই নীতি। আওয়ামী লীগ জোর করে ক্ষমতায় বসেছে। কোনো নির্বাচনে জয়লাভ না করে আওয়ামীলীগ ক্ষমতা এসেছে। একটি পার্লামেন্ট গঠন করেছে, সেখানে জনগণের প্রতিনিধি নেই। সেই পার্লামেন্টে এদেশের মানুষকে কিভাবে নির্যাতন-নিপীড়ন করা যাবে, অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে-সেভাবে আইন তৈরি করা হচ্ছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, গণতন্ত্রের বছরে গণতন্ত্রকর্মীদের বিরুদ্ধে ৭৮ হাজার মামলা হয়েছে। তাতে বিএনপিসহ বিরোধীদলের ১১ লাখ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। সারাদেশে এখন খুন, গুম, মামলা আতঙ্ক। মা আজকে অস্থির কখন তার ছেলেকে তুলে নেয়, স্ত্রী অস্থির হয়ে থাকে কখন স্বামীকে তুলে নেয়, বোন অস্থির হয়ে থাকে কখন তার ভাইকে তুলে নিয়ে যাবে। এটা একদিন দুই দিনের নয়। গত কয়েক বছর ধরে আওয়ামীলীগ অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে এই অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে। আওয়ামী লীগ অবৈধভাবে ক্ষমতায় আসার পর থেকে স্বৈরাচারী নীতি শুরু করেছে। আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে।

তিনি বলেন, বেগম খালেদা জিয়া গৃহবধূ থেকে গণতন্ত্রকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ৩৫ বছর আন্দোলন-সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। আজ তাঁকে কারাগারের অন্ধকারে আটক করে রাখা হয়েছে। তবুও তিনি সাহস হারাননি। গণতন্ত্রের জন্য সুশৃঙ্খলভাবে এগিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। সাজানো মামলা দিয়ে তাঁকে আটক রাখা হয়েছে। দেশনেত্রী যদি জনগনের মাঝে আসতে পারে, নির্বাচনে অংশ নিতে পারে তাহলে আওয়ামী লীগের মসনদ উড়িয়ে যাবে- এই ভয়ে তাকে আটক রাখা হয়েছে।
মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী লীগ জনগণকে ভয় পায়। নির্বাচনকে ভয় পায়। তাই তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে ভোট দিতে পায়। এজন্য এদেশের মানুষের ওপর নির্যাতন শুরু করেছে। এদেশের মানুষকে ৭১ সালের মতো ঐক্যবদ্ধ হয়ে মাঠে নামতে হবে। একইভাবে গণতন্ত্র ও নিজেদের অধিকার ফিরিয়ে আনার জন্য ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।
তিনি বলেন, দেশের উদ্ভব পরিস্থিতির জন্য আমরা আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছিলাম। আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের কথা বলেছিলাম। কিন্তু সরকার তাতে সাড়া দেয়নি। উল্টো বিএনপিসহ বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন চালাচ্ছে।

মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে জনগণকে দমিয়ে রাখতে চায় সরকার। নির্যাতন করে বাংলাদেশের মানুষকে দমানো যাবে না। যতই নির্যাতন করা হবে, মানুষ ততই ঐক্যবদ্ধ হবে। অধিকার আদায়ের জন্য রাস্তায় এসে দাঁড়াবে। মানুষে অধিকার ও গণতন্ত্র লুট হয়ে গেছে উল্লেখ করে বিএনপির নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে বিএনপির মহাসচিব বলেন, জনগণকে সঙ্গে নিয়ে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করতে হবে।
ছাত্রদল-যুবদলসহ তরুণদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, তরুণরা এগিয়ে আসলে যেকোন বিজয় অর্জন করা যায়। শৃঙ্খলাবদ্ধ হয়ে আরও সুদৃঢ় ঐক্যবদ্ধ হয়ে গণতান্ত্রিক উপায়ে আন্দোলন করতে হবে। আমরা সংঘাত চাই না। শান্তি চাই। এভাবে মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে চাই।
এদেশের কেউ নিরাপদ নয়, স্কুল থেকে বাচ্চা তুলে নেয়া হয়। মহিলা নিরাপদ নয়। দেশের আওয়ামী দুঃসাশন চলছে।
তিনি বলেন, খনার বচন আছে, রাজার দোষে রাজ্য নষ্ট প্রজা কষ্ট পায়। এখন চালের দাম ৭০ টাকা। বিদ্যুতের দাম কতবার বাড়িয়েছে। কর্মসংস্থান নেই। তারপরও সরকার উন্নয়নের ডুগডুগি বাজায়। উন্নয়নে নাকি নহর পড়ে গেছে। উন্নয়ন হচ্ছে যে রাস্তা হাঁটা যায় না।
সেতুমন্ত্রীর মিথ্যা কথা বলে দাবি করে মীর্জা ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘কাল তিনি বলেছেন বিএনপি নাকি রাজনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে গেছে।’ বিএনপি যদি রাজনৈতিক দেউলিয়া হয়ে যায় তাহলে নির্বাচন দিতে এত ভয় কেন ? নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেন, তখন দেখা যাবে বিএনপির কি হয়েছে। দেউলিয়া হয়ে গেলে নেতাকর্মীদের ওপর এত মামলা কেন দেওয়া হচ্ছে।
পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আপনারা এদেশের মানুষ। এদেশের সন্তান। আমাদের ভাই, আপনজন। জনগণের দিকে তাকাবেন। জনগণকে প্রতিপক্ষ ভাববেন না।
সরকারকে অবৈধ সরকার দাবি করে তিনি আরও বলেন, ‘দাম্ভিকতা করে লাভ নেই। অহংকার করে লাভ নেই। মানুষের চোখের ভাষা বুঝুন। দয়া করে বিদায় হোন। নির্বাচন দিন।’
দ্রুত নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন দেওয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সকল দলকে নির্বাচনে আসার পরিবেশ তৈরি করুন, দেশে শান্তি ফিরিয়ে আনুন। সংঘাত পরিহার করুন।’
আন্দোলনের মধ্য দিয়ে খালেদা জিয়াকে মুক্তি করার আন্দোলনে শরিক হওয়ার জন্য নেতাকর্মীদের শপথ নেওয়া আহ্বান জানান তিনি।

সভায় বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, সরকার আদালতের ঘাড়ে বন্দুক রেখে বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি বিলম্বিত করতে চায়। আমাদের নেত্রী জেলে গিয়ে দেশ মাতায় পরিণত হয়েছেন। তাই আজ চট্টগ্রামের জনসভায় তাঁকে ‘দেশমাতা’ ঘোষণা করছি। আজ থেকে তিনি দেশমাতায় পরিচয় পাবেন।
বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যরিস্টার মওদুদ আহমেদ বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার মুক্তি এবং আগামী নির্বাচন এ দুইটি এখন আমাদের চ্যালেঞ্জ। এজন্য দেশের মানুষকে সাথে আমাদের আন্দোলন আরো বেগবান করতে হবে। দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে এ পরিবর্তন আনতে হবে।
সভায় মির্জা আব্বাস বলেন, চট্টগ্রামবাসী সমস্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আজকের এই জনসভা সফল করতে পেরেছে। সারাদেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে আনবো। সরকার দেশনেত্রীকে ভয় পায় বলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন দিচ্ছে না।
মঈন খান বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে বন্দী করে রাখায় দেশের মানুষ সোচ্চার হয়ে ওঠেছে। জালিম সরকারের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে বেগম খালেদা জিয়াকে মুক্ত করে নিয়ে আসবো।
সভায় বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, আজকের এই জনসভা হওয়ার কথা ছিল লালদিঘি মাঠে। কিন্তু সরকার অনুমতি দেয়নি। গতরাত ১১টায় পুলিশ লালদিঘির পরিবর্তে এখানে জনসভা করতে বলেছেন। অথচ লালদিঘিতে আওয়ামীলীগ গত ২ মাসে ২ থেকে তিনটি সমাবেশ করেছে। তাতে নিজেদের মধ্যে চেয়ার মারামারি, ভাংচুর ও হাঙ্গামা হয়েছে। তারপরও সমাবেশের অনুমতি পায় আওয়ামীলীগ। কিন্তু বিএনপি অনুমতি পায় না। এটাই হচ্ছে এই সরকারের গণতন্ত্রের নমুনা।
তিনি বলেন, কারাগারে গণতন্ত্রের মা বন্দী। দেশে আইনের শাসন নেই। মানবাধিকার লঙ্ঘন সর্বত্র। খুন, গুম হচ্ছে বিরোধীদলের নেতাকর্মীরা। সরকার স্বৈরতন্ত্র কায়দায় দেশ চালাচ্ছে। এ থেকে পরিত্রাণ পেতে দেশের মানুষকে সঙ্গে আন্দোলন গড়ে তুলছে বিএনপি।
সভাপতির বক্তব্যে ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, বেগম খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে এদেশে কোনো নির্বাচন হতে দেবে না দেশবাসী। আমাদের নেত্রী আমাদের মা, তাঁকে জেলে বন্দী থাকতে দেবো না। তাঁকে মুক্ত করতে চট্টগ্রাম থেকে আন্দোলন জোরদার করা হবে।
/পূর্বকোণ

Facebook Comments