খালেদা জিয়ার মুক্তি ও জামিন নিয়ে সরকার দোলাচালে: সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে? সরকার নাকি তৃতীয় পক্ষ?

জিয়া অরফানেজ মামলার বিতর্কিত রায়ে বিএনপি চেয়ারপারসনকে  কারান্তরীন করার পর থেকে নানাবিধ চাপে পড়ে হাসিনার অবৈধ সরকার একেক সময় একেক রকম আচরন করছে।

৮ ফেব্রুয়ারি নিম্ন আদালতের রায়ের পরে প্রায় ২ সপ্তাহ ক্ষেপণ করে রায়ের সার্টিফাইড কপি সরবরাহ করা হয়, এখানে সরকারের ইশারার অভিযোগ করে আসামী পক্ষ। হাইকোর্টে বিচারক ইনায়েতুর রহিম ও শহিদুল ইসলামের আদালতে আপিল ও জামিনের দরখাস্ত করলে ২৫ ফেব্রুয়ারি নিম্ন আদালতের নথি আসার জন্য অপেক্ষা করে জামিন দিতে বিলম্ব করে ২ সপ্তাহ। এটা অনাহুত ছিল। পরে ১২ মার্চ জামিন দিলেও সরকার পক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে সেটা আজ ৪ দিনের জন্য স্থগিত করেছে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন আপিল বিভাগ।

এর আগে গত ১৩ ফেব্রুয়ারি আইজি প্রিজন্স মিডিয়াকে জানান, কেবল অরফানেজ মামলায়ই নয়, ্ আরও তিনটি মামলায় বেগম খালেদা জিয়াকে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে। এ নিয়ে সমালোচনা শুরু হলে দু’দিন পরেই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল জানান, খালেদা জিয়াকে আর কোনো মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখানো হয়নি। পরেরদিন ১৬ ফেব্রুয়ারি আইনমন্ত্রি আনিসুল হকও ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সাংবাদিকদের পরিস্কার জানান- ‘খালেদা জিয়াকে আর কোনো মামলায় শ্যোন এরেস্ট দেখানো হয়নি। কোনো মামলা শ্যোন এরেস্ট দেখানো হবে না।’ অর্থাৎ দুই মন্ত্রীর কথায় পরিস্কার বোঝা গেছিলো, খালেদা জিয়ার কারাবন্দী করে তা থেকে কোনা ফায়দা তুলতে পারেনি সরকার, তাই যেকোনো প্রকৃয়ায় ছেড়ে দিতে পারলে বেঁচে যায়।

কিন্তু কথা ঠিক থাকেনি। সরকারের অবস্থান আবার নড়াচড় হতে থাকে। চৌদ্দগ্রামের বাস পোড়ানোর ঘটনায় খালেদা জিয়াকে হুকুমের আসামী করে বানোয়াট মামলাটি ইতিপূর্বে হাইকোর্টে স্থগিত ছিলো, অথচ দু’সপ্তাহ আগে গোপনে চেম্বার জজের কাছে গিয়ে এটর্নি জেনারেল সে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করে আনেন। এর পরেই কুমিল্লার একটি আদালত ঐ মামলায় বেগম জিয়াকে ২৮ মার্চ হাজির করানোর পরোয়ানা জারী করে, এবং সেটা ২ ঘন্টার মধ্যে নাজিমুদ্দিন রোডের এক্সট্রা-অর্ডিনারি জেলে পৌছে যায়! অর্থাৎ খালেদা জিয়া এখন এই মামলাতেও আটক। ঐ একই ২৮ মার্চ খালেদা জিয়াকে জিয়াকে চ্যারিটেবল মামলায় হাজির করানোর জন্য বকশিবাজরের বিশেষ কোর্ট PW ইস্যু করেছে। যদিও এই মামলার বিচার দু’মাসের জন্য মোটামুটি গতি হারিয়েছে আগেই।

এর মাঝখানে আজ ১৪ মার্চ আপিল বিভাগের পূর্নাঙ্গ বেঞ্চ রাষ্ট্রপক্ষ ও দুদকের আবেদনে সাড়া দিয়ে খালেদা জিয়ার জামিন চার দিনের জন্য স্থগিত করে রোববার নিয়মিত আপিল করার নির্দেশ দেন। আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্তে খালেদা জিয়ার আইনজীবিরা নাখোশ হন, এবং প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে  প্রতিবাদ মিছিল করেন।

আপিল বিভাগে এই সিদ্ধান্তটি  অনেকের কাছে স্বাভাবিক মনে হতে পারে, কিন্তু প্রয়োজনীয় ছিল না। সরকার পক্ষ এবং দুদক জামিনের বিরুদ্ধে আপিল করবে বলে যেভাবে স্ট্রংলি স্থগিতাদেশ চেয়েছে, তাতে কোর্টে সাড়া দিয়ে পূর্নাঙ্গ আপিলের নির্দেশ দিতেই পারে। তবে জামিন স্থগিত না করলেও এমন কোনো আহামরি কোনো ক্ষতি হতো না সরকার পক্ষের। খালেদা জিয়া তো আর বেরিয়ে যেতে পারছিলেন না, তবে কেনো চার দিনের জন্য জামিন স্থগিত করতে হলো? কি এমন চাপ ছিল এর পেছনে?

১) হতে পারে খালেদা জিয়ার উপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করে সমঝোতার জন্য চাপ বাড়ানো যে, আপোষ না করলে মুক্তি নাই!
২) সরকার উনাকে মুক্তি দিতে রাজী নয়। যেকোনোভাবে আটকে রেখে নির্বাচনী ফায়দা তুলতে চায়।
৩) তৃতীয় পক্ষের খেলা- যারা চায় উনাকে ভেতরে রেখেই অনাসৃষ্টি এবং তারপর হাসিনা সরকারের পতন ঘটানো।

প্রথম পয়েন্ট কাজ করবে না, এটা সহজেই বোধগম্য। খালেদা জিয়া আঁতাত করে ইলেকশনে আ’লীগকে ওয়াকওভার দেয়ার কোনো শর্তে রাজী হবেন না। দ্বিতীয় পয়েন্টও অবাস্তব। কেননা খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে নির্বাচন করার    আওয়ামীলীগের স্বপ্ন অলীক। বাকী রইল তৃতীয় পক্ষ। এটা নিয়ে বলা যায়, অনেকদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে, অনেক কিছুই আর সরকারের কন্ট্রোলে নাই, অন্য কোথাও থেকে চালাচ্ছে বোধ হয়! খালেদা জিয়ার জামিন নিয়ে এই খেলাটা তাদের হওয়ার সম্ভাবনা আছে। কেননা, সরকার কি খালেদা জিয়াকে কুমিল্লায় আদালতে হাজির করাতে নিতে পারবে? অসম্ভব। এর আগে লন্ডন থেকে ফেরার পরে ১২ নভেম্বর এই মামলায় জামিন নিতে কুমিল্লা যেতে চেয়েছিলেন বিএনপি প্রধান। কিন্তু সরকার তাতে বিপদের আলমত পেয়ে জানিয়ে দেয়- জামিন নিতে হবে না, দরকার হলে ঢাকায়  বদলী করবে কেস। তাহলে এখন সেই কুমিল্লাতে বেগম জিয়াকে পরোয়ানা ইস্যু করার অর্থ পরিস্কার- আউল লাগানো। কুমিল্লা বিএনপির বেল্ট, খালেদা জিয়াকে নেয়ার দিনে ২৮ তারিখে লোকে লোকারণ্য হয়ে যাবে ঐ এলাকা। এটা কি সরকার চাইবে? যে সরকার নাজিমুদ্দিন রোড থেকে খালেদা জিয়াকে কাশিমপুরে নেয়ার সাহস করে না, তার নিয়ে যাবে কুমিল্লায়? অসম্ভব।

কাজেই বিষয়টা পরিস্কার, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে সরকারের রাজনৈতিক ক্ষতি হচ্ছে জানার পরও কোনো অজ্ঞাত নির্দেশের কারনে জামিন নিয়ে টালবাহানা চলেছে, আপীল, জামিন স্থগিত ইত্যাদি নানা কিসসা কাহিনী তৈরী হচ্ছে।

মোটের উপর আরেকটি কথা, জানা গেছে- রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদের দিল্লি সফর ব্যর্থ হয়েছে, এবং বিনাভোটে ৫ জানুয়ারির মত পার হওয়ার কোনো বল ভরসা জোটাতে ব্যর্থ হয়েছে সরকার। সেই সাথে বিজেপির আমন্ত্রণে আওয়ামীলীগের ১৫/২০ জনের এটি গ্রুপের ভারত সফরে যাওয়ার আমন্ত্রন স্থগিত নয়, বরং বাতিল হয়েছে। কাজেই খালেদা জিয়ার কারাবাস এবং দেশের রাজনীতির কপালে কি আছে, দেখার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

 

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.