তমা কোম্পানী এবং মীর্জা আজম: রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটতরাজের উপাখ্যান!

৫১৩ কোটি টাকার চাল-গমের গুদাম নির্মাণের কাজ ৯৬০ কোটি টাকায় পাচ্ছে তমা কনস্ট্রাকশন!
 
কে এই তমা কনস্ট্রাকশন?
 
মিডিয়া ঘাটলে যা পাওয়া যায়- যত দুর্ভোগ, তত উদাসীন ‘তমা কনস্ট্রাকশন’! ফ্লাইওভার বানাতে গিয়ে জনগনকে দুর্ভোগ দিয়ে লোকজন হত্যা করে রেকর্ড সৃষ্টি করেছে তমা কনস্ট্রাকশন!
একটু ট্রেক রেকর্ড দেখা যাক-
 
১) মনে কি আছে, ২০০০ সালে ঢাকার মিরপুর রোডের সায়েন্স ল্যাবরেটরির মোড়ে নির্মানাধীন পদচারী-সেতুর (ফুটওভার ব্রিজ) গার্ডার পড়ে মারা যান মাগুরা টেক্সটাইলসের একজন কর্মকর্তা সহ কয়েক জন। সেই ফুটব্রিজ নির্মানের কাজ করছিলো ‘তমা কনস্ট্রাকশন’! বিনা অভিজ্ঞতায় পর্যাপ্ত নিরাপদ ব্যবস্খা না নিয়ে ‘তমা কনস্ট্রাকশন’ দিনের পর দিন এধরনের ঝুকিপূর্ন কাজ করে গেছে।
 
২) তমা এরপরে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসে মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভারের সাবকন্টাক্টের নির্মাণ কাজ করতে গিয়ে। নির্মাণ শ্রমিকদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই তমা কনস্ট্রাকশন এখানে ৪/৫ বছর কাজ করে গেছে, যাতে মোট ৯ জন মানুষ নিহত হয়েছে। একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটলেও নেওয়া হয়নি পথচারী কিংবা কর্মীদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। টেন্ডার প্রকৃয়ায় খুব বড় অংকের অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে সুকৌশলে পছন্দের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ‘তমা কন্সট্রাকশন’কে কাজ পাইয়ে দেয়া হয়। যদিও তাদের আবেদনের যোগ্যতা নিয়ে তখনই প্রশ্ন ছিল। কারণ, তমা কন্সট্রাকশনের ইতিপূর্বে এ ধরনের বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা ছিল না। ফ্লাইওভার প্রকল্পটি অনুমোদন থেকে শুরু করে বাস্তবায়নের ধাপে ধাপে অনিয়ম ও দুর্নীতি করে গেছে তমা কনস্ট্রাকশন। প্রতিষ্ঠানটি ইচ্ছে করেই নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ করেনি। বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে সময় বাড়ানোর সঙ্গে তিন দফায় বাড়ানো হয়েছে নির্মাণ ব্যয়ও। মগবাজার ফ্লাইওভার প্রকল্পের বাজেট ছিল ৩৩৪ কোটি টাকা, যা শেষমেষ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২২৯ কোটি টাকা। অতিরিক্ত খরচ ৮৯৫ কোটি টাকা, যা পুরোটাই লুটপাট। লীগ সরকারের বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী আজম, এলজিআরডি প্রতিমন্ত্রী নানক ও মন্ত্রী ওবায়দুলের হরিলুটের কারনে মগবাজার ফ্লাইওভার বিশ্বের মধ্যে সবচেয়ে ব্যয়বহুল, যদিও উল্টা ডিজাইনে করায় এটি ঠিকমত ব্যবহার উপযোগি নয়, বরং ঝুকিপূর্ন।
 
৩) ৪০ কোটি টাকার ঢাবির হল ‘বিজয় একাত্তর’ ৫৯ কোটি টাকায় নির্মান করতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় খেলার মাঠের প্রায় চার বিঘা জমি দীর্ঘ ছয় বছর দখলে রেখে ব্যবসা করেছে তমা কন্সট্রাকশন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীরা একাধিকবার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। আদালত থেকেও মাঠটি দখলমুক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে; কিন্তু কোনো কিছুই কাজে আসেনি ক্ষমতার ব্যক্তিদের কাছে।
 
৪) রাজবাড়ী থেকে শুরু করে ভাঙ্গা পর্যন্ত রেললাইন তৈরী করার কাজটি পায় তমা কনস্ট্রাকশন। ফরিদপুর রেলষ্টেশনে গিয়ে দেখা যায় রেললাইনের মাঝে যে পাথর দেয়া হয়েছে তা অত্যন্ত নিম্নমানের এবং অনেক পাতলা করে ছিটিয়ে দেওয়ার ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই পাথরগুলো সরে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে গর্তের সৃষ্টি হয়েছে।
 
৫) ১৮ হাজার ৩৪ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ে দোহাজারী-কক্সবাজার-গুনদুম সিঙ্গেল লাইন ডুয়েল গেজ রেলপথের নির্মাণকাজ পেয়েছে চীন ও বাংলাদেশের চার প্রতিষ্ঠান। অথচ এর আগের বিএনপি জোট সরকারের সময় নেয়া এই প্রজেক্ট ২০১০ সালে ব্যয় ধরা হয় ১,৮৫২ কোটি টাকা ছিল। এই মহাডাকাতির নির্মাণকাজের দায়িত্ব পাওয়া বাংলাদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি।
 
৬) এর আগে ‘তমা কনস্ট্রাকশনের নির্মাণাধীন খুলনার রেলস্টেশনের ছাদে ফাটল ধরেছিল। সেখানেও বেশ কয়েক বার নির্মাণ খরচ বাড়িয়েছিল কিন্তু কাজ যথাযথ ভাবে হয়নি। আটকে আছে খুলনার আধুনিক রেল স্টেশন, এ কারণে কাজ শেষ হতে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত সময় বর্ধিত হতে পারে।
 
৭) বাগেরহাট জেলার রামপালে প্রায় ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ে ‘খুলনা কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সংযোগ সড়ক নির্মাণ প্রকল্প’ গ্রহণ করা হয়েছে। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইউডি)-এর অধীনে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কম্পানি লিমিটেড।
 
৮) তিন শ’ ছাপ্পান্ন কোটি টাকা ব্যয়ে রাজধানীর উত্তরায় ফ্যাট নির্মাণের দায়িত্ব পেল তমা কনস্ট্রাকশন। কোম্পানিটি ৬৭২টি ফ্লাট নির্মাণ করবে। সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে এ প্রস্তাব অনুমোদন দেয়া হয়েছে।
 
৯) রেলের সবচেয়ে বড় প্রকল্প ২২শ ১৩ কোটি টাকা ব্যায়ে ভৈরব-টঙ্গী ৬৪ কিলোমিটার রুটে লুপ লাইনসহ ৮৬ কিলোমিটার নতুন রেল লাইন নির্মানের কাজ চায়না রেলওয়ে গ্রুপ লিমিটেডের সাথে কাজ করছে দেশীয় তমা কনস্ট্রাকশন।
 
১০) বাংলাদেশ রেলওয়ের কালুখালি-ভাটিয়াপাড়া রেলপথ পুনর্বাসন এবং কাশিয়ানি-গোপালগঞ্জ-টুঙ্গিপাড়ায় নতুন রেলপথ নির্মাণ শীর্ষক প্রকল্পের দুটি প্যাকেজের অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা। এর মধ্যে প্যাকেট ডব্লিউডি-৬ এ আওতায় গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে ব্রীজ নির্মাণ এবং আনুষঙ্গিক অন্যান্য কাজ করা হবে। এ কাজের ব্যয় ধরা হয়েছে ৭৭ কোটি ২৫ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এটি বাস্তবায়ন করবে তমা কনস্ট্রাকশন।
 
১১) রূপপুর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের জন্য আট’টি কোম্পানীর সাথে চুক্তি করা হয়েছে এবং শত শত কর্মী নিয়োগ করা হয়েছে। বাংলাদেশের অনেক প্রতিষ্ঠান রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প নির্মাণে গোল্ডেনবার্গ এর সহযোগি হবেন, তারমধ্যে আছে তমা কনস্ট্র্রাকশন।
 
১২) ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড় ও দিনাজপুরের রেলযোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির লক্ষে ডুয়েলগেজ রেললাইন নির্মাণের কাজ তিন বছরেও শেষ হয়নি। এজন্য নির্মাণকাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত দুই প্রতিষ্ঠানের গাফিলতিকেই দায়ী করছে রেল বিভাগ। সংশ্লিষ্টদের মতে, নির্মাণকাজে এ ধীরগতির কারণে একদিকে যাত্রীরা কাঙ্খিত সেবা থকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে ব্যবসায়ীদের মালপত্র পরিবহনে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। জানা যায়, রেল মন্ত্রণালয়ের আওতায় ঠাকুরগাঁওয়ের মিটারগেজ রেলপথকে আধুনিকায়ন ও ডুয়েলগেজে রূপান্তরিত করছে তমা কনস্ট্রাকশন।
 
১৩) ২৬৬ কোটি টাকায় ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক চার লেন প্রকল্পে রায়মণি থেকে ময়মনসিংহ পর্যন্ত ২৭ দশমিক ৩৩ কিলোমিটারের কাজ করছে তমা কনস্ট্রাকশন কোম্পানি।
 
১৪) বাংলা দৈনিকের প্রথম পৃষ্ঠার প্রথম শিরোনাম হচ্ছে, ‘মন্ত্রী মামলা ঠিকাদারের স্বার্থের বলি যাত্রীরা! ট্যাক্সিক্যাব উঠলেই ১০০ টাকা ভাড়া।’ এ সিন্ডিকেটে তমা কনস্ট্রাকশন ও আর্মি ওয়েলফেয়ার ট্রাস্ট নামের দুটি সংগঠনের সঙ্গে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা গোলাম আজম, যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের এক অতিরিক্ত সচিব ফরিদউদ্দিন চৌধুরী, ফরিদউদ্দিন চৌধুরীর বন্ধু, তমা কোম্পানির ম্যানেজিং ডাইরেক্টর আতাউর রহমান মানিকের নাম এসেছে। একদিকে সরকারের এতসব লম্ফঝম্প, অন্যদিকে এক আমলা,- এক অতিরিক্ত সচিব ফরিদউদ্দিন চৌধুরীর এমন বিপুল বিশাল ক্ষমতা, মিলাতে পারছি না যে!! জনপ্রতিনিধি হয়েও মির্জা গোলাম আজমের এমন গণবিরোধী আচার-আচরণ কথাবার্তা!!
 
১৫) দুই লাখ এক হাজার টন চাল-গম রাখতে স্টিলের গুদাম নির্মাণে ৫১৩ কোটি ৮৫ লাখ টাকা লাগার কথা। আর এভাবেই অনুমোদন হওয়া সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাবনার প্রকিউরমেন্ট প্ল্যানে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু প্যাকেজ-৩ এ উল্লেখ করা আশুগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও মধুপুরের তিনটি সাইলো নির্মাণে লাগছে ৯৬০ কোটি টাকা। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন সাইলো নির্মাণের এ কাজটি পেতে যাচ্ছে তমা কনস্ট্রাকশন অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেড (টিসিসিএল)!
 
শত শত সরকারী নির্মানকাজের সাথে জড়িত তমা গ্রুপের চেয়্যারম্যান হিসেবে নোয়াখালী জেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি আতাউর রহমান ভূঁইয়া মানিক নামক একটা লোককে সামনে রাখা হলেও বিনা বিনিয়োগে এর মূল মালিক জেএমবির প্রতিষ্ঠাতা শায়খ আবদুর রহমানের আদরের শালা মির্জা আজম, যিনি শেখ হাসিনার পাট বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী। তার সাথে আছে বাংলাদেশের প্রথম ‘গানপাউডারে বাস পোড়ানো’ আবিস্কারক জাহাঙ্গীর কবির নানক। দু’বছর আগে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সভায় তমা কনস্ট্রাকশনের থলের বিড়াল বেরিয়ে আসেে। বলা হচ্ছে ফ্লাইওভার বাবদ লুটে নেয়া রাষ্ট্রীয় টাকার অংশ তমা কনস্ট্রাকশন ছাত্রলীগকে দিচ্ছে। যার বদৌলতে শত অপকর্ম স্বত্বেও ছাত্রলীগের পাহারায় নানান যায়গায় ব্যবসা করে যাচ্ছে তমা কোম্পানী, এমনকি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে। যদিও অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দর্পকরে বলেন– আমরা ব্যবসা করতে আসিনি, কিন্তু ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার গঠনের পর মির্জা আজম কাকরাইলে তমা কনস্ট্রাকশনের কার্যালয়ে নিয়মিত বসতেন। এর পরপরই রেলওয়ে ও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের অনেকগুলো বড় ঠিকাদারি কাজ পেতে থাকে তমা কনস্ট্রাকশন। তমা কোম্পানীর নানা অপকর্ম, সময়মত কাজ না করে তিন চার গুণ খরচ বাগানো, নিম্নমানের কাজ করে রাষ্ট্রীয় সম্পদের ক্ষতিসাধন করা, অনিরাপদ কর্মপরিবেশে বহু মানুষ হত্যাকারী ঠিকাদার হয়েও হাজার হাজার কোটি টাকার সরকারী কাজ বাগিয়ে নিচ্ছে।
 
মির্জা আজম এখন হাজার কোটি টাকার মালিক। এত টাকা হাতে যে কর্মীরা হাত বাড়ালে ১০/২০ লাখ টাকা ছুড়ে দেয়া তার অভ্যাসে দাড়িয়েছে। কয়েক কোটি টাকা খরচ করে নিজের ভাই মির্জা কবীরকে বিনাভোটে পৌরসভা চেয়ারম্যান বানিয়েছেন। মায়ের চল্লিশায় খাওয়ানো বাবদ খরচ করেছেন ৪ কোটি টাকা। পুরো জামালপুর জেলার সকল কন্ট্রাকটরী করেন মির্জা আজম। জামালপুর শহরে ৫০ কোটি টাকায় নিজের বাড়ি নির্মান করেছেন আজম। স্ত্রী এবং স্বজনদের হাজার বিঘার ওপরে জমি করেছেন মেলান্দহে। কিনেছেন নিউইয়র্ক, কানাডা, লন্ডনে একাধিক বাড়ি, শ্রীমঙ্গলে নানকের সাথে হাজার একরের টিএস্টেট। আজম এখন জামালপুরের অঘোষিত ‘রাজা’।
 

বিভিন্ন সেক্টরে ভিন্ন ভিন্ন নামে আছে তমা কোম্পানী এবং আজমরা, যারা লুটপাট করে রাষ্ট্রীয় অর্থ। আর ধংস হচ্ছে দেশ!

/ফেসবুক

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.