খালেদা জিয়াকে জেলে নিয়ে উভয় সংকটে সরকার- না পারছে রাখতে, না পারছে ছাড়তে!

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাবাস লীগ সরকারের জন্য উভয়সংকটে পরিণত হয়েছে। সরকার এমন অবস্থায় পড়েছে যে, না পারছে তাঁকে আটকে রাখতে, না পারছে ছাড়তে। মুক্তি দিতে গেলে গণঅভ্যুত্থান হওয়ার আশংকা করছে গোয়েন্দারা। এমনকি নির্ধারিত মামলায় কোর্টে হাজির করার রিস্কটুকু নিতে চাচ্ছে না। সরকারী দল যেমনটা আশা করেছিল আগে, খালেদা জিয়াকে একের পর এক মামলার ফাঁদে আটকে কোর্টে লেফট রাইট করাবে, তা বুমেরাং হতে চলছে।

সরকারের একজন নীতি নির্ধারকের সাথে গতকাল বিকালে আলাপে জানা গেলো, খালেদা জিয়ার তিন সপ্তাহের কারাবাসে শাসক দলের চাইতে বিএনপির অর্জন বেশি। বিশেষ করে সরকারের আশা ছিল খালেদা জিয়াকে “এতিমের টাকা চোর” হিসাবে জনমনে ছি ছি উঠবে। কিন্তু খুব দ্রুতই তা উল্টোগতি নিয়েছে। জনগন বুঝতে পেরেছে এবং বলাবলি করছে, এতিমখানার টাকা ব্যাংকেই রয়েছে, তাহলে আত্মসাতের প্রশ্নই ওঠছে কেনো, অথচ খামাখা মামলা দিয়ে জেলে আটকে রেখেছে সরকার। এসব কথা এখন আও‘য়ামীলীগের সাধারন সমর্থকদের মুখেও বলাবলি হচ্ছে। ডাইহার্ড অনেককে বলতে শোনা গেছে, ‘শেখ হাসিনা এত বাড়াবাড়ি করছেন কেনো? দুর্দিন আসলে তো উনি চলে যাবেন ছেলের কাছে। তখন বিপদে পড়ব আমরা। আজ বেগম জিয়াকে যেভাবে হয়রানী করা হচ্ছে, এর চেয়ে অনেক বেশি খেসারত দিতে হতে পারে।’

আওয়ামীলীগের আরেক প্রেসিডিয়াম মেম্বার বলেন, আমরা পরামর্শ দিয়েছিলাম- খালেদা জিয়াকে জেলে না নিতে। রবিবার দিন সকালে নিম্ন আদালতে রায় দেয়ার সাথে সাথে সার্টিফাইড কপি দিয়ে জামিন নিয়ে যাতে উনি বাড়ি চলে যেতে পারেন। তাতে আমাদের লাভ হতো বেশি। রায়ও ঘোষণা হতো, আবার এখনকার এই চাপ আসতো না। কিন্তু তা শুনলেন না নেত্রী। কার কথায় যে এইসব উল্টাসিধা কাজ করেন উনি!”

তিনি আরও বলেন, মনে হচ্ছে বেগম জিয়ার ট্রাপে পড়ে গেছি আমরা। লক্ষ করুন, উনি পরিকল্পিতভাবে আয়োজন করে জেলে গিয়ে সরকারকে বিরাট বিপদে ফেলে দিয়েছেন কি না। গেলো অক্টোবরে খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ফেরত পর থেকে নতুনভাবে চলতে শুরু করেন। প্রথমেই নিয়মিত কোর্টে হাজিো দিতে থাকেন, আত্মপক্ষ সমর্থন করে লম্বা লম্বা পলিটিক্যাল বক্তব্য দিতে লাগলেন। এর আগে যেখানে বিচারকের বিরুদ্ধে নানান নালিশ করতেন উচ্চ আদালতে, সেখানে এবার দেখা গেলো উল্টো চিত্র! বিচারকের বহু সিদ্ধান্তের বিষয়ে এবারও চাইলে উচ্চ আদালতে যেতে পারতেন, অন্তত মাস ছ’য়েক ঝুলিয়ে দিতে পারতেন মামলাটি। অথচ সেদিকে না গিয়ে তিনি এমনভাবে কোর্ট কাচারি করতে লাগলেন, যে কারও মনে হতে পারে- তিনি বোধ হয় নিজেই চাইছিলেন মামলাটা দ্রুত ফয়সালা হোক! এরপরে রায়ের তারিখ ঘোষণার পর দু’সপ্তাহে একাধিক বার বিএনপি স্টান্ডিং কমিটির সভা করেছেন, ২০ দলীয় জোটের সভা, সহসভাপতিদের নিয়ে বৈঠক,  উপদেষ্টাদের নিয়ে বৈঠক, সর্বশেষে নির্বাহী কমিটির সভা করে এমনভাবে তৈরী হতে লাগলেন যেনো, উনি জেনে শুনেই জেলে যাচ্ছেন! উদার এতটা কনফিডেন্সের কারন াকি?

খালেদা জিয়া জেলে যাওয়ার আগে সরকার যেমনটা ভেবেছিল, বিএনপি ভেঙ্গে যাবে, সেটা তো হয়ই নি, বরং উল্টো ঘটনা ঘটছে। দলের নেতাকর্মীরা আরও ঐক্যবদ্ধ হয়েছে, উজ্জীবিত আছে। হরতাল ভাঙচুরে না গিয়ে বিএনপি শান্তিপূর্ন আন্দোলন চালু রাখায় তা জনগন থেকে অধিক সমর্থন লাভ করছে। সর্বোপরি, বেগম জিয়াকে কারান্তরীণ করার ঘটনার মাধ্যমে সরকার তারেক রহমানকে বিএনপির দলীয় প্রধান হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করে দিয়েছে। আর বেগম জিয়ার চাইতে তারেক রহমান যে আ’লীগের জন্য অধিক বিপজ্জনক, তা আওয়ামীলীগের কর্মীমাত্রই জানে। যেখানে এতদিন ধরে সরকার ও তাদের মুরব্বীরা তারেক রহমানকে বিতর্কিত করে যাচ্ছে, জঙ্গিবাদ ও দুর্নীতির দোসর হিসাবে প্রচার করে আসছিলো, এখন সেখানে বিএনপির মত বৃহদ রাজনৈতিক দলে তাঁর নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হয়ে গেলো!

যে সকল উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে বেগম জিয়াকে জেলে নেয়া হলো, সরকার তার কোনোটা হাসিল করতে পারেনি, উল্টো এখন খালেদা জিয়ার ওপরে জুলুম করার কারণে তাঁর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাওয়ায় সরকারের কপালে ভাঁজ। তাঁর মুক্তির বিষয়ে ব্যাপক সংখ্যক নাগরিকদের আগ্রহ বাড়ছে- এমন গোয়েন্দা রিপোর্টের পরে সরকার নড়ে চড়ে বসেছে। খালেদা জিয়ার মুক্তি পাওয়ার দিনে ঢাকার রাস্তায় জনস্রোত নামতে পারে, এমনকি সরকার বিরোধিরা দেশের অন্যত্র কন্ট্রোল নেয়ার আশংকাও রয়েছে। এসব আশংকার কারনেই গত ২২ তারিখে হাইকোর্টে ইনায়েতুর রহিম এবং শহীদুল ইসলামের বেঞ্চ জামিন দিতে দিতে আবার রোববার পর্যন্ত ঠেকিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু রোববারও তাকে জামিন ও মুক্তি দিতে সাহস করেনি। অবশেষে দলীয় বিচারক ইনায়েতুর রহিমকে দিয়ে নজিরবিহীন এক সিদ্ধান্ত বের করে- নিম্ন আদালতের নথি আসা অবধি জামিন আটকে রাখা! সুপ্রিমকোর্টের শতবর্ষের ইতিহাসেও এমন ঘটনা ঘটেনি, ফলে সরকার এবং হাইকোর্ট আরেক দফা নিন্দার মুখে পড়লো। এখন কেবল বিএনপি নয়, ভিন্ন দল এবং সাধারন মানুষজনও বলাবলি করছে, খালেদা জিয়াকে আটকে রাখতে নোংরা খেলা খেলছে সরকার।

সব মিলিয়ে, খালেদা জিয়ার কারাবন্দী হওয়া সরকারের জন্য উভয় সংকটের বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে। আতঙ্কের মাত্রা এত তীব্র হয়েছে যে, খালেদা জিয়াকে কারাগার থেকে বাইরে আনতেই সরকারের বড় ভয়। সে কারনে গত ২৫ এবং ২৬ ফেব্রুয়ারি জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্টের মামলায় হাজির করতেও সাহস করেনি। ভিন্ন সূত্রের খবর বলছে, আগামী নির্বাচনে বিএনপির জন্য ৮০ সিট/ ১০০ সিট/ ১২০ সিট নিয়ে অপজিশন বসার নানা প্রস্তাব নিয়ে শেখ হাসিনা তার গোয়েন্দা প্রধানকে পাঠিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন। কারাবাসের সামনের দিনগুলোতেও এই প্রচেষ্টা চালানোর আভাস পাওয়া যাচ্ছে, তবে বেগম জিয়ার কাছে পর্যন্ত যাওয়ার সাহস করছে না।

খালেদা জিয়াকে ছাড়া নির্বাচন নয়- ২০ দলের পক্ষ থেকে এমন অবস্থান ঘোষণার পরে ঢাকায় বিদেশী কূটনৈতিকরা নড়ে চড়ে বসেছেন। খালেদা জিয়ার কারামুক্তির বিষয় নিয়ে ঢাকার প্রভাবশালী দেশের রাষ্ট্রদূতরা সরকারের সাথে আলাপ আলোচনা করে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে খালেদা জিয়া ইস্যুতে সরকার বেশ চাপে রয়েছে। অন্যদিকে, আওয়ামীলীগের প্রতি দিল্লির সমর্থনে কিছুটা ঘাটতি লক্ষ্য করে তা নিয়ে বোঝাতে দলীয় সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরকে পাঁচ দিনের সফরে ভারতে পাঠিয়ে তেমন সুবিধা হয়নি। কারন আওয়ামীলীগের চীনা সংযোগ নিয়ে ভারত নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। অবশেষে মার্চের ৩ তারিখে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদকে দিল্লি পাঠানো হচ্ছে।

খালেদা জিয়ার মুক্তির বিষয় নিয়ে আইনী লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথে শান্তিপূর্ন কর্মসুচি পালন করে যাচ্ছে বিএনপি। তবে শান্তিপূর্ন কর্মসূচিতেও সরকারী বাহিনী বলপ্রয়োগ এবং নৃশসংতা এত বেশি বেড়েছে যে, সুশীল সমাজ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলো সরকারের কড়া সমালোচনা করছে। এর পাশাপাশি সরকারের নানাবিধ বাড়াবাড়ির ফলে সুশীল সমাজ, বিভিন্ন গ্রুপ ও সংগঠন, মানবাধিকার সংগঠনগুলি সরকারের ওপর মুখিয়ে আছে। দলকানা ব্যতীত প্রায় সব মিডিয়াও ক্ষেপে আছে। সরকারের শেষ সময়ে সব সেক্টরেই ছ্যাড়াব্যাড়া লেগে গেছে! এত গোষ্ঠিকে ক্ষেপিয়েছে যে, কোনোটাই ক্লোজ করতে পারছে না।

সর্বোপরি, উত্তরপাড়া বলে কথিত ক্যান্টনমেন্টে অস্বাভাবিক মিটিং সিটিংয়ের খবরের দিকে ইংগিত করে সরকারী দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের জানালেন- সরকার পতনের পরিকল্পনা করছে বিরোধীরা।

সামগ্রিক অবস্থায়, শাসক দলের কোনো কোনো নেতার প্রশ্ন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানোর বুদ্ধিটা আসলে কার? এটা কি কোনো স্যাবোটেজ ছিল?

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.