‘ঢাকার নির্বাচনে নাক গলালে নেপাল-মালদ্বীপের মতন আম-ছালা হারাতে পারে দিল্লি’

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতি নিয়ে একটি চমৎকার বিশ্লেষণ করেছেন ভারতের সনামধন্য সাংবাদিক ভরত ভূষণ। বিশ্লেষণ করতে গিয়ে তিনি বলেছেন,‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, এমন কোনো হস্তক্ষেপ করার মতো কাজ ভারত আবার করবে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালের মতো, আওয়ামী লীগের নেওয়া কৌশলকে সমর্থন দেওয়া ঠিক হবে না। প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে—কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না ভারতের। যদি কোনো পরামর্শ চাওয়া হয়, তবে ভারতের উচিত এমন পদক্ষেপ নেওয়া, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে এবং জনগণের ইচ্ছার মূল্যায়ন করবে।’

ঢাকার রাজনৈতিক বিষয়ে নয়াদিল্লির নাক গলানো উচিত হবে না বলেও মন্তব্য করেন এই খ্যাতিমান সাংবাদিক। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে ভারতের সংবাদমাধ্যম ডেকান ক্রনিকলে প্রকাশিত বিশ্লেষণধর্মী এক নিবন্ধে তিনি এ মন্তব্য করেন। বৃহস্পতিবার নিবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছে।

প্রকাশিত নিবন্ধে নয়াদিল্লির সাংবাদিক ভরত ভূষণ বলেন, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে ভারতের কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না। তিনি লিখেছেন, ‘সাধারণ নির্বাচনের বছরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে দুর্নীতির দায়ে সাজা দিয়েছেন আদালত। পাঁচ বছরের কারাদণ্ডের এই আদেশ যদি না বদলায়, তবে হয়তো খালেদা জিয়াকে ছাড়াই নির্বাচনে অংশ নিতে বাধ্য হবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। বাংলাদেশের বিষয়ে ভারত প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া না দেখানোর নীতি নিয়েছে। আর এ বিষয়টিকে দেখা হয়, শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি ভারতের সমর্থন হিসেবে।’

এর আগে হিন্দুস্থান টাইমসের অনলাইন সংস্করণে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী লিখেছিলেন, ভারতকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সমর্থন দিতে হবে, তবে তা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে পাশ কাটিয়ে নয়।

২০১৪ সালের সাধারণ নির্বাচনকে ‘একপেশে’ আখ্যা দিয়ে ভরত ভূষণ তার নিবন্ধে লিখেছেন, ‘ওই নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। কিন্তু ভারত তাতে অঘোষিত সমর্থন দিয়েছিল। সেই নির্বাচনে সংসদের প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়নি। কম ভোট পড়লেও কেবল ভারতের সমর্থনের কারনে টিকে যায় সে নির্বাচন।’

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩ আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগের সাংসদেরা। ওই নির্বাচনে ৪৩ শতাংশ ভোট পড়েছিল বলে দাবি করে নির্বাচন কমিশন। যদিও বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ নির্বাচনে মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে।

বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে যে অগ্রগতি হয়েছে, বিএনপির শাসনামলে তা হয়নি। এমন মন্তব্য করে ভরত ভূষণ আরও বলেন, ‘আসন্ন সাধারণ নির্বাচনে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে আওয়ামী লীগ যে কৌশল নিয়েছে, ভারত তাতে সমর্থন দিতে পারে। দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে উন্নতির ধারা বজায় রাখার আশাতেই এ অবস্থান নিতে পারে ভারত। কিন্তু এ কাজ করলে, নির্দিষ্ট দল বা নেতাকে সমর্থন দেওয়ার একই ভুল করবে ভারত। নেপাল ও মালদ্বীপে এই একই কাজ করে ফলাফল ভালো হয়নি।’

নিবন্ধে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করেন ভরত ভূষণ। তিনি লিখেছেন, ১৯৯১ সালের ঘটনার প্রায় ১৭ বছর পর মামলা হয়। খালেদা জিয়াকে নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করতেই নির্বাচনের আগে আগে বিচার ত্বরান্বিত করা হয়। ২০০৭ সালে ক্ষমতায় আসা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই মামলা করা হয়েছিল। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো আদালতে নিষ্পত্তি হয়। সব মামলা থেকেই মুক্ত হন তিনি। যদিও খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে থাকা মামলাগুলো চলতে থাকে, যোগ হয় আরও নতুন মামলা।

বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে এখন ৩৪ মামলা বিচারাধীন রয়েছে। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় তাঁর পাঁচ বছরের জেল ও জরিমানা হয়েছে। বর্তমানে এখন তিনি নাজিমউদ্দিন রোডের পুরোনো কেন্দ্রীয় কারাগারে সাজা ভোগ করছেন। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার বিচারকাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ মামলাটি বর্তমানে যুক্তিতর্ক উপস্থাপন পর্যায়ে রয়েছে।

বিএনপি আসন্ন সাধারণ নির্বাচন বর্জন করবে না বলে মনে করেন ভরত ভূষণ। এই ভারতীয় সাংবাদিক লিখেছেন, ‘এখনো পর্যন্ত পরিস্থিতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য সুবিধাজনক বলে মনে হচ্ছে। প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তার গ্রহণযোগ্যতা অনেক বেশি। শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশ অভাবিত উন্নতি করেছে। দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধারাবাহিকভাবে ৭ শতাংশের বেশি আছে। বেড়েছে আয় ও ব্যয়ের মাত্রা। বার্ষিক গড় প্রবৃদ্ধিতেও দক্ষিণ এশিয়ায় শ্রেষ্ঠ অবস্থানে আছে বাংলাদেশ।’

তবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে ফলাফল অনিশ্চিত হতে পারে বলে মনে করেন ভরত ভূষণ। তিনি বলেন, ‘নিরাপত্তা বাহিনীগুলোর ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়ে যাওয়া, গণমাধ্যমের ওপর সরকারের কড়াকড়ি, সুশীল সমাজ ও বাক্‌স্বাধীনতার প্রতি হুমকি, অনেক নাগরিকের গুম হওয়া—এসব ঘটনা জনগণের মধ্যে বিরক্তির উদ্রেক করছে। সুতরাং সুষ্ঠু নির্বাচনের ফলাফলে অনিশ্চয়তা থাকতে পারে।’

ভরত ভূষণ বলেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর ভারত বেজায় খুশি। তিনি আরও বলেন, ভারত এই সরকারকে আবার ক্ষমতায় দেখতে চাইতেই পারে। বিএনপি এর আগে ভারতের স্বার্থের বিরুদ্ধে যাওয়ায় এবং বিএনপি-জামায়াত জোটের বিরুদ্ধে পাকিস্তান-সংশ্লিষ্টতার সন্দেহ থাকাই এর কারণ। তার মতে, ‘বাংলাদেশের অনেক মানুষ বিশ্বাস করে যে ভারত চায় খুঁড়িয়ে চলা বিএনপি যেন নির্বাচনে অংশ নেয়। এতে করে আরও বেশি বৈধতা নিয়ে ক্ষমতায় ফিরতে পারবেন শেখ হাসিনা।’

নিবন্ধের শেষে বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত সরকারের করণীয় নিয়ে লিখেছেন ভরত ভূষণ। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়, এমন কোনো হস্তক্ষেপ করার মতো কাজ ভারত আবার করবে বলে মনে হয় না। ২০১৪ সালের মতো, আওয়ামী লীগের নেওয়া কৌশলকে সমর্থন দেওয়া ঠিক হবে না। প্রকাশ্যে বা অপ্রকাশ্যে—কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করা উচিত হবে না ভারতের। যদি কোনো পরামর্শ চাওয়া হয়, তবে ভারতের উচিত এমন পদক্ষেপ নেওয়া, যা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করবে এবং জনগণের ইচ্ছার মূল্যায়ন করবে।’

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.