“আইন তুমি কার”

 

জিয়া অরফানেজ টাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপাসন বেগম খালেদা জিয়া সহ অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ২ কোটি ১০ লাখ টাকা তারা আত্মসাৎ করেছেন। ১৯৯৩ সালে এতিমখানা নির্মানের নিমিত্ত ঐ টাকা এসেছিল কুয়েতের আমিরের কাছ থেকে অনুদান হিসাবে।

৯ জুন ১৯৯১ সৌদি কামির্শয়াল ব্যাংকের ডিডির মাধ্যমে ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার ( বাংলাদেশী মুদ্রায় কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ২১৬ টাকা) বাংলাদেশে এসেছিল, তখন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন বেগম খালেদা জিয়া। তারপর বগুড়ায় জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট এবং বাগেরহাটে জিয়া মেমরিয়াল গঠন  করা হয়। কুয়েতের আমিরের দেয়া ঐ অর্থ সমান দু’ভাগ করে ২ কোটি ৩৩  লাখ টাকা করে বাগেরহাট এবং বগুড়ার অরফানেজ ট্রাস্টে প্রদান করা হয়। এ বিষয়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া সহ মোট পাঁচ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়, যা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা হিসেবে বহুল আলোচিত।

গত কয়েক বছর ধরেই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলা নিয়ে চলছে বিস্তর। আলোচনা, সমালোচনা এবং এখনও চলছে হয়ত চলবে বহুদিন। তবে সাধারন মানুষের মনে এক ধরনের ধারনা জন্মেছে যে দুই কোটি টাকার কিছু বেশী অর্থ আত্মসাৎ মামলা চালাতে সরকারের কত কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে সেটাও ভাববার বিষয়।

কেউ কেউ উষ্মা প্রকাশ করে বলছে – একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দুই কোটি টাকার দুর্নীতি মামলা না করে যদি দুই হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি মামলা করা হত, তাহলে বর্তমান সময়ের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও লুটপাটের মহোৎসবের পরিপ্রেক্ষিতে সাধারন মানুষের কাছে কিছুটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হত। কেননা দুর্নীতির মহোৎসব আর লুটপাটের দরুন ব্যাংকিং সেক্টর আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে, শেয়ার মার্কেটে সর্বস্ব হারিয়ে ৩৩ লক্ষ বিনিয়োগকারী দেউলিয়া হয়ে পথে বসেছে।
ফারমার্স ব্যাংককে বাঁচানোর জন্য জলবায়ু ফান্ডের সরকারী টাকা দেয়া হয়েছে। এমন শত শত অর্থ কেলেঙ্কারিতে জর্জরিত বর্তমান সরকার, আর তাই সাধারন মানুষ মনে করে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে  মামালাটি রাজনৈতিক প্রভাবে দুষ্ট। সেই মামলার রায় হল ৮ ফেব্রুয়ারী ২০১৮ এবং সেই রায়ে খালেদা জিয়া কে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে।

রায় প্রকাশের অনেক আগে থেকেই প্রধানমন্ত্রীসহ সরকারের প্রায় সকল মন্ত্রী ও নেতারা বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে এতিমের অর্থ আত্মসাতের অপবাদ প্রচার সহ রায়কে প্রভাবিত করার লক্ষ্যে বিচারের রায় কি হবে সেই ব্যাপারে ক্রমাগত মন্তব্য করতে থাকেন, যা আদালত অবমাননার শামিল হলেও আইনি আদালত এই ব্যাপারে ছিল দারুণ নির্বাক।

বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সুত্র মাধ্যমে জানা যায় যে এই ২ কোটি দশ লাখ টাকা অর্থ আত্মসাৎ নয় বরং প্রতিষ্ঠিত একটি ব্যাংকে অরফানেজের নামে গচ্ছিত রয়েছে, যা সুদে আসলে বর্তমানে ৬ কোটি টাকার অধিক পরিমানে স্ফীত হয়ে আছে।

সরকার দাবী করেছে, কথিত আত্মসাৎকৃত টাকা সরকারী এতিম ফান্ডের এবং সেটা প্রমানের জন্য কোর্টে কিছু কাগজপত্র দাখিল করেছে সরকার পক্ষ। মুলতঃ এই টাকা আসে কুয়েতের আমিরের কাছ থেকে অনুদান হিসাবে। বাংলাদেশেস্থ কুয়েত দূতাবাস থেকে যে পত্র দেওয়া হয়েছে, তাতে বলা আছে কুয়েতের আমির জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে টাকাটা দিয়েছে ।

মামলা প্রমানের জন্য সরকারী পক্ষ থেকে দাবী করা হয় বিদেশ থেকে আসা রাষ্ট্রীয় এতিম তহবিলের টাকা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের মাধ্যমে আত্মসাৎ করেছিলেন বেগম জিয়া।
দুদকের আইনজীবী মোশাররফ হোসেন কাজলের দাবী, “এতিমদের দুই কোটি ১০ লাখ টাকারও বেশি অর্থের সম্পূর্ণটাই আত্মসাৎ করেছেন আসামিরা। এ কারণে দুর্নীতি দমন আইন ও দণ্ডবিধির অভিযোগগুলো প্রমাণ হয়েছে এবং তিনি এই ধারার সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করেন।”

মামলাটির প্রারম্ভিক ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় ১৯৯১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পরে তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী লে. কর্নেল (অব.) মোস্তাফিজুর রহমানের ব্যক্তিগত উদ্যোগে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের নামে এতিমখানা তৈরীর জন্য কুয়েতের আমির ১২ লাখ ৫৫ হাজার মার্কিন ডলার অনুদান প্রেরণ করেন। উল্লেখ্য কুয়েত সহ মধ্যপ্রাচ্যের শাসকরা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়ার খুব ভক্ত ছিলেন, বেশিরভাগ রাষ্ট্রপ্রধানের সাথেই তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্ক ছিল। ১৯৯১ সালে সৌদি আরবের একটি ব্যাংক থেকে টাকাগুলো ডিডির মাধ্যমে পাঠানো হয়। ঐ ডিডি সোনালী ব্যাংক রমনা শাখায় ভাঙ্গিয়ে অর্ধেক টাকায় বাগেরহাটে এতিমখানা বানানো হয়। এখনও সেই এতিমখানা যথারীতি চালু আছে। এ বিষয়ে দুদক কোনো মামলা করেনি। বাকী অর্ধেক ২,৩৩,৩৩,৫০০/- টাকা বগুড়াতে এতিমখানা নির্মানের উদ্দেশ্যে অরফানেজ ট্রাস্টকে দেয়া হয়। এরমধ্যে লাখ তিনেক টাকায় এতিমখানার জন্য ৩ একর জমি কেনা হয় মাত্র, বাকী টাকা ব্যাংকে রেখে এখন ৬ কোটি টাকা এতিমখানার নামে ব্যাংকে গচ্ছিত আছে।  এখান থেকে আর কোনো টাকা খরচও হয়নি বা কোনো টাকা কেউ আত্মসাৎ করেনি।

মামলা প্রমানের জন্য সরকার পক্ষ প্রথম থেকেই বিভিন্ন অগ্রহনযোগ্য পন্থা ও কৌশলের আশ্রয় নেয়। প্রথমেই তাঁরা টাকার উৎস নিয়ে গন্ডগোল পাকায়। সরকার বলে, এটা সৌদি সরকার থেকে পাওয়া অনুদান,যা আদালতে মিথ্যা প্রমানিত হয়। আসলে টাকার উৎস হল কুয়েত।
এই টাকা সরকারী এতিম ফান্ডের- তা প্রমানের জন্য আইও হারুন অর রশিদ নিজের মত করে একটি ফাইল তৈরী করে কোর্টে দাখিল করে। সে দাবী করে ওটা “প্রধানমন্ত্রীর এতিমখানা তহবিলের” সরকারী টাকা ছিল। অথচ আদালতে জেরায় তদন্ত কর্মকর্তা স্বীকার করতে বাধ্য হয়, এই ফান্ডের বিষয়ে কোনো ফাইলপত্র না পাওয়ায় নিজেরা কপি পেস্ট ও ফটোকপিতে কাটা ছেঁড়া করে একটি ছায়ানথি বানিয়ে কোর্টে দাখিল করে। আসামী পক্ষের কৌসুলিরা যুক্তিতর্ক দিয়ে প্রমান করে দিয়েছেন যে, নথিটি পরে বানানো, এবং কাটা ছেড়া ও ঘষামাজা করা। এ সংক্রান্ত ব্যাংক কাগজ বা যেসব ছায়ানথির কথা বলা হয়েছে, তা বানোয়াট ও অসৎউদ্দেশ্যে তৈরী করা।

এখানে উল্লেখ করা যায়, ১৯৯১ সালের ২০ মার্চ বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের অধীনে। তখন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ছিলেন বিচারপতি সাহাবুদ্দিন আহমদ এবং রিলিফ ফান্ডটি ছিল রাষ্ট্রপতির নামে। সে অবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর নামে কোনো এতিম ফান্ড ছিল না। ঐ বছর আগস্ট মাসে সরকার পদ্ধতি পরিবর্তন হওয়ার পরে ১৯ সেপ্টেম্বর বেগম জিয়া ২য় বার শপথ গ্রহন করে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারের প্রধানমন্ত্রী হন। অথচ দুদক ভুয়া কাগজপত্রে তার আগেই জুন মাসে প্রধানমন্ত্রীর নামে এতিম ফান্ডের কাগজ ও ব্যাংকের বানোয়ট কাগজ/দস্তাবেজ প্রস্তুত করে জমা দেয়।

সরকার পক্ষ সাক্ষী হিসাবে মুখ্য সচিব কামাল সিদ্দিকীর পিএস সৈয়দ জগলুল পাশার নাম দেয়। দাবী করা হয়, সৈয়দ পাশা নাকি ঐ কথিত এতিম ফান্ডের ফাইল দেখভাল করতেন- যা সত্য নয়। ঘটনার সময় অর্থাৎ ১৯৯১ সালে সৈয়দ পাশা প্রধানমন্ত্রীর অফিসে চাকরিই করতেন না, ফাইল দেখার তো প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া ঐ সময় প্রধানমন্ত্রীর মুখ্যসচিবের পদটিও ছিল না। রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারে প্রধানমন্ত্রীর সচিবের একটি পদ ছিল বটে, সেটা যুগ্মসচিব/অতিরিক্ত সচিব পদমর্যাদার (কামাল সিদ্দিকী অতিরিক্ত সচিব থাকতে ওখানে পদায়িত হন)। আর জগলুল পাশা প্রধানমন্ত্রীর অফিসে আসেন ১২/০৯/১৯৯২ তারিখে, তাঁর মানে দাঁড়ায়- বানোয়াটভাবে দাবী করা ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের’কথিত নথি জগলুল পাশা দেখতেন–তা পরিপূর্নভাবে মিথ্যা।

এই কথিত দুর্নীতি মামলার অনুসন্ধানকারী, বাদী, আইও, এবং সাক্ষী একই ব্যক্তি- হারুন অর রশিদ। তার চাকরি শুরু হয় দুর্নীতি দমন ব্যুরোতে ১৯৭৯ সালে এসিস্টেন্ট পদে, সেটি কোনো অনুমোদিত পদ ছিল না। পরে ১৯৮৫ সালে অ্যাসিসটেন্ট ইন্সপেক্টর এবং ১৯৯২ সালে ইন্সপেক্টর পদে পদোন্নতি পান হারুন। বিএনপির আমলে ২০০৫ সালে দুদক গঠন করার পরে হারুনকে আত্মীকরণ না করায় চাকরি চলে যায়। মামলা করে হারুন হেরে যায়, পরে আপিলে থাকা অবস্থায় ফখরুদ্দীন সরকারের আমলে রহস্যজনক কারনে আপিল তুলে নিয়ে দুদক চেয়ারম্যান লেঃজেঃ হাসান মসহুদকে ধরে সে উপসহকারী পরিচালক পদে চাকরি জোটান। নিয়োগের মাত্র দুইদিন পর এই মামলার অনুসন্ধানের দায়িত্ব দেওয়া হয় হারুনকে। হারুনের আগে দুদকের আরেক অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা নূর আহমেদ ২০০৮ সালের ১১ জুন ‘অনুসন্ধানে কিছু পাওয়া যায়নি’ মর্মে রিপোর্ট জমা দেন।
মোটকথা, ২০০৫ সালে খালেদা জিয়ার শাসনামলে চাকরিচ্যুত হওয়ার কারনে হারুন বিএনপির ওপর ক্ষিপ্ত ছিলেন,আর তাঁকে ব্যবহার করেই আওয়ামীলীগ সরকার এই বানোয়াট মামলার যত কারুকাজ করেছে বলে বিজ্ঞ আইনবিদ সহ সাধারন জনগণের মনে একটি বাস্তব ধারনার জন্ম হয়েছে।

হারুন অর রশিদ আদালতে দেয়া জবানবন্দিতে দাবী করেন, ১৯৯১-১৯৯৬ সালে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে বেগম জিয়া নাকি ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ নামে চলতি হিসাব খুলেন যা বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও প্রমান দ্বারা সমর্থিত নয়। সোনালী ব্যাংক লিমিটেড, রমনা করপোরেট শাখার হিসাব নম্বর ৫৪১৬ খোলার ফরমে খালেদা জিয়ার কোনো স্বাক্ষর নাই অথবা অনুদানের অর্ধেক টাকা বাগেরহাটে জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট কিংবা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে টাকা বিলি বণ্টনের ক্ষেত্রে বা কোনো চেকে, এমনকি কোনো ফাইলেও খালেদা জিয়ার স্বাক্ষর নাই। ঐ ফান্ডের বাগেরহাট অংশের সেটেলার ছিলেন মরহুম মোস্তাফিজুর রহমান, এবং বগুড়ার অংশের জন্য তারেক রহমান। এসবের মধ্যে প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কোনো সই স্বাক্ষর বা অফিসিয়াল সম্পর্ক  নাই।

‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’-এই নামে কোনো রাষ্ট্রীয় তহবিলের অস্তিত্বও কখনই ছিল না এখনও নাই। জিয়া এতিমখানার জন্য কুয়েতের আমীর থেকে পাওয়া ঐ টাকার অর্ধেক গেছে বাগেরহাটে জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টের এতিমখানা নির্মানে। এই অংশ নিয়ে কোনো মামলা নাই, অভিযোগ নাই তা দুদক পরিস্কারভাবেই বলছে। তার মানে এটা পরিস্কার যে, পুরো অনুদানের টাকা কোনো সরকারী অর্থ ছিল না। যদি সেটা থাকতো, তাহলে বাগেরহাট নিয়েও মামলা হতো। তা কিন্তু হয়নি। আর বগুড়ার অংশের টাকা এখনও ব্যাংকে পড়ে আছে, ২ কোটি টাকায় ৬ কোটি টাকা হয়ে। কাজেই এই  মামলার কোনো উপাদান নাই। নিশ্চিতভাবেই এই মামলায় বেগম খালেদা জিয়া বেকসুর খালাস পাওয়ার কথা ছিল। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের সাথে খালেদা জিয়ার কোনো ব্যক্তিগত কোনো সম্পর্ক নাই। কোথাও কোনো সই সাক্ষর কিছু নাই। তারপরও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন জনসভায় এবং সাংবাদিক সম্মেলন করে বহু আগে থেকে বিরামহীন ভাবে বলে যাচ্ছেন- এতিমের টাকা মেরে খেয়েছেন খালেদা জিয়া! তাঁর মন্ত্রীরা রায়ের আগেই বলে দেয়- খালেদা জিয়ার জেল হবে। দুদকের কৌসুলি মোশারফ কাজল দাবী করেছেন – খালেদা জিয়ার যাবজ্জীবন কারাদন্ড দিতে হবে! এতে প্রতীয়মান হয় যে বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পাঁচ বছরের কারাদন্ডের শাস্তির রায়টি ছিল সম্পুর্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে প্রণোদিত। তিনবারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াকে কারাদন্ড দেয়ার মাধ্যমে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে সরকার চিৎকার চেঁচামেচি করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে, অথচ তাঁদের দলীয় মন্ত্রী মায়া ১৩ বছরের সাজা মাথায় নিয়ে এখনও মন্ত্রিত্ব করে যাচ্ছেন!

যুবসমাজের হাতে সর্বনাশা ইয়াবা তুলে দিয়ে এখনও দাঁত কেলিয়ে হেসে প্রধানমন্ত্রীর সাথে সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে নিজের সগৌরবে অস্তিত্বের জানান দিচ্ছেন আওয়ামী ভোটহীন সাংসদ বদি।  আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সম্প্রতি বদির এলাকায় গিয়ে ঘোষণা দেন- “এই অঞ্চলে বদির কোন বিকল্প নেই। কথা সত্য, আপাদমস্তক একজন রাজনীতিবিদ কাদের সাহেব বুঝতে পেরেছেন- ইয়াবা নেশায় আক্রান্ত যুবকদের কাছে এমপি বদি কতটা জনপ্রিয়। ভোটের রাজনীতিতে সেইসব তরুন যুবাদের ভোট হারানো চলবে না।

শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে তেত্রিশ লক্ষ লোক পথে বসেছে, সব হারিয়ে কেউ কেউ জীবনের সব স্বপ্নকে জলাঞ্জলী দিয়ে বেছে নিয়েছে আত্মহননের পথ। শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারীর তদন্ত হয়েছে কিন্তু স্বয়ং অর্থমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে তাঁর অসহায়ত্ব প্রকাশ করে বলেছেন তিনি এই কেলেঙ্কারীর খলনায়কদের নাম প্রকাশ করতে সাহস পাচ্ছেন না। অন্যদিকে শেয়ার কেলেঙ্কারীর মূল হোতা ‘দরবেশ’ সালমান শেখ হাসিনার শিল্প বিষয়ক উপদেষ্টা, আরেক শেয়ার লুটেরা লোটাস কামালকে বানিয়েছেন পরিকল্পনামন্ত্রী। পদ্মাসেতুর দুর্নীতির সাথে জড়িত শেখ হাসিনার উপদেষ্টা ডঃ মশিউর রহমান শেয়ার বাজারে বিনিয়োগকারীদেরকে ‘ফটকা কারবারী’ বলে এখনও বহাল তবিয়তে!
প্রয়াত রেলমন্ত্রী সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ৭০ লাখ টাকার বস্তার ‘কালো বিড়াল’ যেন তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে আপনা আপনি সাদা হয়ে গেছে।
কমিশন খাওয়ার বিনিময়ে মন্দ ঋণ প্রদান করে ফারমার্স ব্যাংকে ধস নামিয়ে এখনও ভিআইপির বেশে ঘুরে বেড়াচ্ছেন মহীউদ্দীন খান আলমগীর। ১৯৯৬ সালে জনতার মঞ্চ বানিয়ে সরকারী প্রশাসনে যে দুষ্ট ক্ষতের সৃষ্টি করেছেন এই ম খা আলমগীর তাঁর ঘা থেকে এখন কেবল দুর্গন্ধই ছড়াচ্ছে। আমরা সরকারী কর্মকর্তার পরিবর্তে এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পাচ্ছি জনতা মঞ্চের গায়েন টাইপের কিছু আজ্ঞাবাহককে।
একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারী কর্মকর্তা হয়ে আলমগীর সাহেব ছাত্রলীগের সাবেক সেক্রেটারি কালা মাগুর‌খ্যাত সিদ্দিকী নাজমুলকে বগলদাবা করে ফারমারস ব্যাংক করেছেন। অবশ্য মখা সাহেবের আপন ভাগিনা আওয়ামী ঐতিহাসিক মুনতাছির মামুনও ফার্মাস ব্যাংক হজম করার প্রকৃয়ায় যুক্ত থেকে ইতিহাসে ঠাই করে নিয়েছেন। মখা আলমগীর বা মুনতাছির সাহেব ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করার মত মূলধন কোথায় পেলেন, সেই প্রশ্ন বা বিচার কি কেউ করেছে?
খালেদা জিয়ার ২ কোটি টাকার বানোয়াট মামলার বিচার হল, একজন চতুর্থ শ্রেনীর কর্মচারীর সন্তান ছাত্রলীগ নেতা সিদ্দিকী নাজমুল আলম কী করে একটি ব্যাংকের উদ্যোক্তা হওয়ার মতো অর্থের মালিক হলেন, বা মহীউদ্দীন খান আলমগীরগংয়ের এত অর্থের উৎস কি- এই ব্যাপারে কোনো প্রশ্ন বা বিচার চাওয়ার মত কোনো আইন আছে কি?

খালেদা জিয়ার ২ কোটি টাকার বিচার হল, কিন্তু রাখাল বালক থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হয়ে উঠা ড. আতিউর রহমানের দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ৮০০ কোটি টাকা রিজার্ভ চুরির বিচারের ক্ষেত্রে কি কোন আইন নেই?

শেখ হাসিনার নিয়োগ করা জনতা ব্যাংকের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবুল বারাকাত একাই ৫৩০০ কোটি টাকা হাপিস করে জনতা ব্যাংকটি রুগ্ন করে ফেলেছেন এমন বয়ান দিয়েছে- রাবিশ মন্ত্রী খ্যাত আবুল মাল! অবশ্য বারাকাত সাহেব নিজে সতীত্ব বিসর্জন দিলেও অন্য সব দূরাচারদের অপকর্মের কথা ফাঁস করে দিয়েছেন- ব্যাংকিং খাত ভয়াববহ বিপর্যয়ে আছে- ঠিকমত হিসাব করলে দেশের অর্ধেক সংখ্যক ব্যাংক দেউলিয়া হয়ে গেছে!!! এ এক ভয়াবহ  দুর্যোগের পূর্বভাস। অথচ বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এখনও দেখা যায় বারাকাত সহ ব্যাংক লুটেরা সাহেবদের হাস্যজ্বল সরব উপস্থিতি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেখে জাতির প্রশ্ন- এই বাংক লুটেরাদের বিচার করার মত কি কোন আইন দেশে নেই!

সাম্প্রাতিক ঘটা বেসিক ব্যাংক, সোনালী ব্যাংকের ৭ বা ৮ হাজার কোটি টাকার বিচার নিয়ে চলছে টালবাহানা, নাম কা ওয়াস্তে তদন্ত হচ্ছে ধীরগতিতে, তদন্ত কর্মকর্তারা অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন অতীব মোলায়েম সুরে। শেয়ারবাজারের ১ লক্ষ ৬৪ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের তদন্ত রিপোর্ট অনুযায়ী অভিযুক্তদের বিচার কেন হচ্ছেনা? এছাড়াও ডেস্টিনি, হলমার্ক সহ বহু আর্থিক কেলেংকারির বিচারের কোন খোঁজ নেই কিন্তু খালেদা জিয়াকে পলিটেক্যালি মডারেটেড বিচারের মাধ্যমে সাজা দেয়াটা খুবই জরুরী বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রশ্নগুলো আজ জনমনে উত্থাপিত হবার মুল কারন হলো, খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে করা মামলার গতিধারা, মোটিভ, কাটা ছেঁড়া ও ঘষামাজা দলিল দস্তাবেজ, এবং অর্থ আত্মসাতের মিথ্যা অভিযোগের মাধ্যমে (সেই ২ কোটি ১০ লক্ষ টাকা সুদে মুলে বর্তমানে ৬ কোটি টাকার অধিক হয়েছে এবং তা ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে) বিচারকার্য পরিচালনার কারনে।

এবার লক্ষ্য করা যাক বর্তমান সরকারের আমলে উল্লেখযোগ্য কিছু অর্থ লুটপাট ও কেলেংকারি এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে রুজুকৃত মামলাগুলোর দিকে যা বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কোয়াশ করা হয়েছেঃ
১) ২০১০-১১ সালে শেয়ার মার্কেট থেকে ১ লাখ ৬৪ হাজার কোটি টাকা লুট করে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারীকে পথে বসানো হয়েছে। এসব লুটপাটকারীদের বিচার তো হয়নি বরং কাউকে কাউকে মন্ত্রী বানিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে।
২) বেসিক ব্যাংক থেকে ৩০০০ কোটি টাকা লোপাট করে বাচ্চু শেখ! সেই বিচারের নামে চলছে টাল বাহানা এবং বিনম্র অনুসন্ধান নাটক।
৩) সরকারী দলের স্তাবক আবুল বারাকাত জনতা ব্যাংক থেকে ৫ হাজার ৫০৪ কোটি টাকা সরিয়েছে- অর্থমন্ত্রীর স্বীকারেক্তি।
৪) হলমার্ক কেলেঙ্কারিতে জড়িত শেখ হাসিনার উপদেষ্টা মোদাচ্ছের ৪০০০ কোটি টাকা লুট করার পরে অর্থমন্ত্রী বলেন- এটা এমন কোনো টাকাই না!
৫) ফার্মার্স ব্যাংক খেয়ে ফেলেছে মখা আলমগীর এবং মুনতাসির মামুনরা, যার মধ্যে পাবলিকের টাকা তো আছেই সেই সাথে রাষ্ট্রীয় জলবায়ু খাতের ৫০৮ কোটি টাকাও!
৬) ডেসটিনি খাতে লুট ৫০০০ কোটি টাকা, সর্বস্ব হারানো ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীরা আজ পথের ভিখেরি। ৭) বিসমিল্লাহ গ্রুপের জালিয়াতির মাধ্যমে ১২০০ কোটি টাকা লোপাটের সাথে সরকারী দলের লোকেরা জড়িত!
৮) বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮’শ কোটি টাকা রিজার্ভ ‍চুরির সাথে জড়িত খোদ সরকারের ঘনিষ্ঠ লোকজন,তাই দু’বছরেও কোনো মামলা হয়নি।
৯) অর্থনৈতিক লুটপাট বর্তমান সরকারের আমলে এমন মহামারী আকার ধারন করেছে যে সরকারী দলের অর্থনীতিবিদের ভাষ্য অনুযায়ীই দেশের অর্ধেক ব্যাংক এখন দেউলিয়া হয়ে গেছে। এসকল দুর্নীতি ও লুটপাটের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত সরকারী দলের নেতা মন্ত্রীরা যে কারনে কোনো একটি ঘটনার বিচার আজও হয়নি। ব্যাংক ছাড়াও রাষ্ট্রীয় খাতে দেশী বিভিন্ন প্রকল্পের মুল্য পাঁচ-দশগুণ বাড়িয়ে অর্থ লুটপাট করা হচ্ছে। অস্বাভাবিক প্রাক্কলন বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রীয় খাত থেকে টাকা বিদেশের ব্যাংকে পাচার করা হচ্ছে দেদারসে। সেইসব দুর্নীতির তথ্য সমুহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হলেও তাঁর কোনটারই বিচার আজ অবধি হয়নি।
সেই তথ্যউপাত্ত থেকে সাপ্তাহিক ঢাকার পাঠকদের জন্য কিছু চিত্র নিম্নে তুলে ধরা হলঃ
ক) দোহাজারী-গুনদুম রেলপথ নির্মাণে ১,৮৫২ কোটি টাকার প্রাক্কালন ব্যয় ধরা হলেও বর্তমানে তা কয়েক দফায় বেড়ে দাড়িয়েছে ১৮ হাজার ৩০৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রাক্কালন খরচের চেয়ে নির্মান খরচ বেড়েছে প্রায় ১০ গুণ।
খ) ভারত ও চীনে যেখানে মহাসড়ক নির্মানে খরচ কিলোমিটার প্রতি সাড়ে ১০ কোটি টাকা, ইউরোপে সর্বোচ্চে ২৯ কোটি টাকা, সেখানে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ছয়টি প্রকল্পের কিলোমিটার প্রতি খরচ করছে ৫৪ কোটি টাকা। এই খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের আয়োজন ইতিমধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা মহাসড়কের নির্মাণ ব্যয় কিলোমিটার প্রতি গিয়ে ঠেকেছে ১২২ কোটি ৭৭ লাখ টাকায়। তার মানে আমাদের দেশের নির্মান ব্যয় ইউরোপের খরচের ৫ গুণ বেশী।
গ) বিএনপির রেখে যাওয়া ৭৮৮ কোটি টাকার গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ী ফ্লাইওভারটি আ’লীগ নির্মাণে শেষ করেছে ২৪০০ কোটি টাকায়। অর্থাৎ কিলোমিটার প্রতি ব্যয় প্রায় ২১১ কোটি টাকা, যা সারা বিশ্বে সবচেয়ে ব্যয়বহুল!
ঘ) বৃটেনের ভুয়া কোম্পানী ডিপি রেলকে ৬০ হাজার কোটি টাকার ঢাকা-পায়রা রেলপথ নির্মানের কাজ দেয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৫০ হাজার কোটি টাকাই চুরি হবে বলে ধারনা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ঙ) যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র ৩০ হাজার কোটি টাকায় করা সম্ভব, তা করা হচ্ছে ১ লাখ ১৩ হাজার ৯২ কোটি টাকায়।
চ) পত্র পত্রিকা জুড়ে প্রধানমন্ত্রীর পুত্র তথা প্রযুক্তি উপদেষ্টার ৯৭ হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি ও অর্থপাচারের খবর বের হয়েছে, যেখানে কেবল বিদ্যুৎ এবং জ্বালানী খাতের দুর্নীতির পরিমান ৭৬,০০০ কোটি টাকা। ভিওআইপি খাত থেকে ৯৫০০ কোটি টাকার লুটপাটের খবর এসেছে বিভিন্ন গনমাধ্যমে আইজিডব্লিউ লাইসেন্স দেয়া থেকে সরকারেরর মন্ত্রী, নেতারা কমিশন নিয়েছে ৫৩০০ কোটি টাকা। আইসিএক্স লাইসেন্স দেয়া বাবদ হাতিয়ে নেয়া হয়েছে ২৩৮০ কোটি টাকা। এটুআই প্রজেক্ট থেকে দুর্নীতি হয়েছে ১১,৫৬০ কোটি টাকা।
ছ) পদ্মা সেতুর খরচ তিন গুণ বেড়ে ৩০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে ঠেকবে কেউ জানে না।
জ) এভাবে বড় বড় প্রকল্পের খরচ ৩ থেকে১০ গুণ বাড়িয়ে সাধারন জনগণকে উন্নয়নের গল্প শোনানো হচ্ছে। জিএফআই’র প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১০ বছরে বিদেশে পাচার হয়েছে ৫ লাখ ৩৩ হাজার কোটি টাকা। রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, ২০১৩ সালে পাচারের পরিমান ৯৬৬ কোটি ৬০ লাখ ডলার, ২০১২ সালে ৭২২ কোটি ৫০ লাখ ডলার, ২০১১ সালে পাচার হয় ৫৯২ কোটি ১০ লাখ ডলার, ২০১০ সালে ৫৪০ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এসব দুর্নীতি লুটপাটের কোনো মামলা নাই, বিচার হয় না।

২০০৮ সালের নির্বাচন অবধি শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ১৫টি মামলা হয়েছিলো। এর মধ্যে ১৩ টি মামলায় মোট ১৪ হাজার ৮৬৩ কোটি ৯০ লাখ ৫১ হাজার ১৮৮ টাকার দুর্নীতি/অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়।
এ ছাড়া একটি ছিল খুনের মামলা, আরেকটি সেনানিবাসে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টার অভিযোগের মামলা। এর মধ্যে ৪টি মামলায় ১৩ কোটি ৯৯ লাখ ৬৫ হাজার ৫০০ টাকার ঘুষ গ্রহণ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৫টি মামলার ৬টি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আর হাইকোর্টের মাধ্যমে বাতিল করা হয় ৯টি মামলা।
২০১০ সালের ৩ মার্চ থেকে শুরু করে ৩০ মে পর্যন্ত মাত্র তিন মাসেই ৯টি দুর্নীতি মামলা বাতিল করে হাইকোটের দুটি বেঞ্চ। ঐ দুটি বেঞ্চের বিচারপতি ছিলেন মো. শামসুল হুদা, আবু বকর সিদ্দিকী, এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক, বোরহান উদ্দিন।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে যে সমস্ত দূর্নীতির মামলা প্রত্যাহার করে নেয়া হয় তার মধ্যে একটি হলো নাইকো দুর্নীতি মামলা,যাতে শেখ হাসিনার নামে ১৩ হাজার ৬৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতি/দুর্নীতির অভিযোগের মামলা তুলে নেয় হয়, অথচ একই অভিযোগে খালেদা জিয়ার নামে একটি মামলা এখন বিচারাধীন!
বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে দায়েরকৃত এবং ক্ষমতার পট পরিবর্তনের পর প্রত্যাহারকৃত মামলাগুলো ছিল নিম্নরূপঃ
১. বেপজায় পরামর্শক নিয়োগে ২ কোটি ১০ লাখ ১ হাজার ৬৮৮ টাকার দুর্নীতি মামলাটি ২০০২ সালের ২ জুলাই শেখ হাসিনাসহ তিনজনকে অভিযুক্ত করে চার্জশীট দাখিল করা হয়। পরে ৩০ মে ২০১০ মামলাটি বাতিল করে শেখ হাসিনার সরকার।
২. কোরিয়ান পুরাতন ফ্রিগেট ক্রয় করে ৪৪৭কোটি টাকা দুর্নীতির মামলাটি ১৮ মে ২০১০ এ বাতিল করা হয়।
৩. মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র অবৈধভাবে কাজ দিয়ে রাষ্ট্রের ১৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী রফিকুল ইসলাম ও সৈয়দ আবুল হোসেন সহ অন্যান্যদের নামে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ২২ এপ্রিল ২০১০ শেখ হাসিনার আবেদনের প্রেক্ষিতে মামলাটি বাতিল করা হয়।
৪. খুলনায় ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মানের অনুমতি দিয়ে ৩ কোটি টাকা ঘুষ নেয়ার মামলাটি ১৩ এপ্রিল ২০১০ বাতিল করা হয়। সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় দরদাতাকে কাজ দিয়ে তার কাছ থেকে তিন কোটি টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানায় মামলা করে দুদক।
৫. সামিট গ্রুপের আজিজ মোহাম্মদ খান ৮টি চেক/পে অর্ডারের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে ৩ কোটি টাকা প্রদান করে, যার দ্বারা ধানমন্ডিতে বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাষ্টের জন্য দোতলা বাড়ি সহ ১৯.১১ কাঠা জমি কেনা হয়। ২০০৮ সালের ১৮ মে অভিযোগ গঠনের পরে বিশেষ জজ আদালতে মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। পরবর্তীতে দেশে নির্বাচনের আবহ সৃষ্টি হলে মামলার গতি শ্লথ হয়ে যায়।
৬. ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে প্রায় ৭০০ কোটি টাকা দুর্নীতির মামলাটি ৯ মার্চ ২০১০ বাতিল করে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং বিচারপতি বোরহান উদ্দিন সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট ডিভিশন বেঞ্চ। ২০ আগষ্ট ২০০৮ শেখ হাসিনাসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। সেনানিয়ন্ত্রিত সরকারের সময়ে নূর আলী স্বীকার করেছিলেন, এই মিগ কেনা বাবদ তিনি ১২ মিলিয়ন ডলার কমিশন লাভ করেন, যার ভাগ সরকারের উচ্চ পর্যায়ের অনেকেই ভোগ করেন। এই মামলাটি উচ্চ আদালতের মাধ্যমে কোয়াশ করা হয়, যদিও এর আগে আপিলেট ডিভিশন এই মামলার কোয়াশমেন্ট পিটিশন নাকচ করে নিম্ন আদালতে চলার বৈধতা দেয়।
৭. প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা তিনটি মামলা ৪ মার্চ ২০১০ তারিখে অবৈধ ঘোষণা করে বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং বিচারপতি বোরহানউদ্দিনের হাইকোর্ট বেঞ্চ।
এরমধ্যে একটি বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণে ৫২ কোটি টাকা দুর্নীতি মামলা।
৮. নূর আলীর নিকট থেকে ৫ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ মামলাটি ১৩ জুন ২০০৭ সালে দায়ের করা হয়। ৮ জুন ১৯৯৭ থেকে ২০ মে ১৯৯৯ তারিখের মধ্যে ১২টি চেকের মাধ্যমে নুর আলী ৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুস প্রদান করেন শেখ হাসিনাকে।
৯. কাজী তাজুল ইসলাম ফারুকের নিকট থেকে ৩ কোটি টাকা ঘুষ গ্রহণ মামলাটি বাতিল করা হয় ৪ জানুয়ারী ২০০৯। ১০ এপ্রিল ২০০৭ এ দায়ের করা এই মামলায় বলা হয় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মানের জন্য ওয়েস্টমন্ট পাওয়ার কোম্পানীর চুক্তি বাতিল করার হুমকি দিয়ে ৩ কোটি টাকার ঘুষ আদায় করা হয়।
পত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয় ৮ আগষ্ট ১৯৯৮ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর সরকারী বাসভবনে গিয়ে দু’টি সুটকেসে ভরে ৫০০ টাকা নোটের ৬০০ বান্ডেলে ৩ কোটি টাকা শেখ হাসিনাকে হস্তান্তর করেন তাজুল ইসলাম ফারুক। ২০০৯ সালে কেবল মামলাটি বাতিল করা হয়নি, বরং বছর দুয়েক আগে তাজুল ইসলাম ফারুক রহস্যজনক গাড়িচাপায় মারা যান।
১০. টুঙ্গিপাড়ায় স্মৃতিসৌধ নির্মাণে ৪১.৮৪ কোটি টাকার দুর্নীতির মামলাটি ২০০৯ সালে আওয়ামীলীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রত্যাহার করার জন্য দুদককে সরকার চিঠি দেয়।

১১. আজম জে চৌধুরীর নিকট থেকে ৮টি চেকে ৩ কোটি টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগের এই মামলাটি শেখ হাসিনার দুর্নীতির সবচেয়ে বড় দালিলিক প্রমান। এই মামলাটি ১৭ মে ২০০৯ সালে প্রত্যাহার করে নেয় সরকার। শেখ হাসিনা, শেখ সেলিম, ও শেখ রেহানার বিরুদ্ধে ১৩ জুন ২০০৭ তারিখে ইস্ট কোস্ট ট্রেডিং লিমিটেডের ম্যানেজিং ডিরেক্টর আজম জে চৌধুরী মামলা দায়ের করেন। ২৫ অক্টোবর ২০০৭ অভিযোগ গঠন হয় এবং শেখ রেহানাকে পলাতক ঘোষণা করে তার সকল সম্পত্তি এটাচ করা হয়। ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর “আমাদের সময়”পত্রিকা সংবাদ পরিবেশন করে, “৮টি চেকে ফেঁসে যাচ্ছেন হাসিনা, রেহানা ও সেলিম: সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে ১৪ বছর।” ২০০৭-২০০৮ সালে এ মামলাটির বিচার চলে বিশেষ জজ আদালতে, সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে মামলাটি রায় ঘোষনার কাছাকাছি পৌছে যায়।  এক পর্যায়ে বাদী আজম জে চৌধুরীকে চাপ দিয়ে মামলাটি প্রত্যাহার করা হয়। এ বিষয়ে শেখ সেলিম ১৬৪ ধারায় কোর্টে জবানবন্দি দিয়েছেন। শেখ সেলিমের অপরাধ স্বীকারের বক্তব্যটি ইউটিউবে পাওয়া যায়। http://www.youtube.com/watch?v=xlbN1b5POww

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সৎ হবেন, সেটাই সকল বাংলাদেশীর কামনা। কিন্তু সরাসরি ঘুষ নেয়ার মামলা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নামে- তাও আবার চেকের মাধ্যমে নেওয়া- এই মামলা যদি রাষ্ট্রীয় প্রভাব বিস্তার করে প্রত্যাহার করা হয়, তাহলে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রশ্ন ও সন্দেহ থেকেই যায়।
দলের জেলা সভাপতিকে হাইকোর্টে বিচারক নিয়োগ করে তারই কোর্টে ২ মাসের কম সময়ে ৫টি মামলা প্রত্যাহার করা কি নৈতিকতা সমর্থন করে?

রাজনীতিবিদদের মুখে প্রায়ই একটি কথা শোনা যায় – আইন তাঁর নিজস্ব গতিতে চলবে এবং কেউই আইনের উর্ধে নয়। কথাটি শুনতে বেশ চমৎকার লাগে কেননা, এটাই সকলের প্রত্যাশা। অপরাধী যেই হোক না কেনো, সে বিচারের উর্ধে থাকতে পারেনা, চাই সেটা বেগম জিয়া কিংবা শেখ হাসিনা হোক।
এক্ষেত্রে বেগম জিয়ার বিচার ও শাস্তি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ক্ল্যাসিক্যাল উদাহরন হতে পারতো, যদি এটা পলিট্যাকেলি মোটিভেটেড বিচারের মাধ্যমে না হত।
এরপরও যদি সরকার প্রধানসহ সরকারী দলের মন্ত্রী, এমপিরা ক্রমাগত চীৎকার করে বলতে থাকেন বেগম খালেদা জিয়ার কারাদন্ড আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, তখন সাধারণ জনগনের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে- “আইন তুমি কার” !!

/ ‘সাপ্তাহিক ঢাকা’য় প্রকাশিত।
theweeklydhaka

Facebook Comments