“খালেদা জিয়াকে অচিরেই জামিনে বেরিয়ে আসবেন। এ ঘটনা সরকারের জন্যও উভয় সংকটে পরিণত হবে”

নির্বাচনের বছরে খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় দেশের রাজনীতিতে নতুন হিসাব যোগ হয়েছে। বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে, নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়া মুক্ত হলে ওই হিসাব হবে একরকম। আবার শেষ পর্যন্ত জামিনে তাঁর মুক্তি না ঘটলে পরিস্থিতি ভিন্ন রকম হতে পারে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, মুক্ত খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যাপারে দরকষাকষি এবং নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়াসহ সব ইস্যুতে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিএনপির জন্য খুব সহজ হবে। একইভাবে তাঁর অনুপস্থিতিতে প্রতিটি ইস্যুতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ দলটির জন্য অত্যন্ত কঠিন।

আইনি মারপ্যাঁচে খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটক রাখা গেলে নির্বাচনী বৈতরণী সরকার অতি সহজে পার হতে পারবে—এমন ধারণা করছেনে কেউ কেউ। অনেকের মতে, এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে নির্বাচনী মাঠ থাকবে সরকারি দলের নিয়ন্ত্রণে। আর ওই ঘটনার প্রভাব অন্যান্য রাজনৈতিক দলের মধ্যেও পড়বে। তারা তখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে না থেকে সরকারের দিকেই ঝুঁকবে, অর্থাৎ নির্বাচনে যাবে। কারণ খালেদা জিয়া নির্বাচনের মাঠে না থাকলে ওই সব দলের মধ্যে এক ধরনের আস্থার সংকট দেখা দেবে। তাদের কাছে তখন চাপ ও প্রলোভন আসবে। এমন পরিস্থিতিতে ৫ জানুয়ারির তুলনায় বেশিসংখ্যক দলের নির্বাচনে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। তাঁদের মতে, এর ফলে বিএনপির নির্বাচন বর্জনও তখন কার্যকর ফল বয়ে আনবে না।

সাবেক রাষ্ট্রপতি অধ্যাপক এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী মনে করেন, খালেদা জিয়ার কারাগারে থাকা-না থাকার বিষয়ে কিছু হিসাব-নিকাশ থাকলেও বিএনপি শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে যেতে পারে। কারণ না গেলে তাদের নিবন্ধন বাতিল হয়ে যাবে। খালেদা জিয়াকে কারাগারে রেখে সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে পারলে রাজনীতির মাঠের খেলা একতরফা হবে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি তা মনে করি না। কারণ বাংলাদেশের মানুষ সব সময় প্রতিবাদী। সব সময় তারা নরম বা শান্ত থাকে না। মানুষের বিদ্রোহ অন্য জিনিস। ভোটের মধ্যেও বিদ্রোহ থাকতে পারে।’ তিনি আরো বলেন, ‘ওয়েট অ্যান্ড সি।’

শত নাগরিক কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক এমাজউদ্দীন আহমদের মতে, খালেদা জিয়া কারাবন্দি থাকায় কিছু হিসাব-নিকাশ সামনে এলেও চূড়ান্তভাবে কী ঘটবে তা বলার সময় এখনো আসেনি। তবে এটুকু বলা যায়, তাঁকে আটকে রাখা হলে নির্বাচনপূর্ব রাজনীতিতে এ ঘটনা ভয়ংকর প্রভাব ফেলবে। তিনি বলেন, জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ার ফলে সরকার ভয় পাচ্ছে। তাই বিএনপি চেয়ারপারসনকে আটকে রেখে তারা নির্বাচন করে ফেলতে চায়। কিন্তু এতে খুব ভালো ফল সরকার পাবে বলে মনে হয় না। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘খালেদা জিয়াকে জোর করে আটকে রাখা হলে নির্বাচন হওয়ার সুযোগ কম। তখন পরিস্থিতি অন্যদিকে টার্ন নেবে।’

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী মনে করেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখা কোনোভাবেই সম্ভব হবে না। তিনি জামিনে বেরিয়ে আসবেন। ফলে তাঁর অনুপস্থিতি নিয়ে যেসব সমীকরণ মেলানো হচ্ছে তা সফল হওয়ার নয়। তাঁর মতে, বড়জোর আর এক সপ্তাহ জামিন নিয়ে হয়রানি করা হতে পারে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খালেদা জিয়াকে জেলে রাখা হলে নির্বাচনে বিএনপির আসন বেড়ে যাবে। এটি দেশের হাওয়া দেখে সরকার বুঝতে পেরেছে। ফলে সরকার তাঁকে আর আটকে রাখবে না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার মনে করেন, খালেদা জিয়াকে কারাগারে আটকে রাখা দুরূহ হবে। পাশাপাশি এ ঘটনা সরকারের জন্যও উভয় সংকটে পরিণত হবে। তাঁর মতে, জোর করে আটকে রাখতে চাইলে সে ক্ষেত্রে সরকারকে অযৌক্তিক পন্থা অবলম্বন করতে হবে এবং চক্ষুলজ্জা বিসর্জন দিতে হবে। আবার এর প্রতিক্রিয়া জনমনে ব্যাপকভাবে পড়বে। জনগণ আরো বেশি ক্ষুব্ধ হবে। সে ধরনের ঝুঁকি সরকার নেবে বলে মনে হয় না। খালেদা জিয়াকে আটকে রাখার মতো নিয়ন্ত্রণ এবং কর্তৃত্বই যদি প্রতিষ্ঠা করতে পারে, সেক্ষেত্রে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার সরকারের জন্য কঠিন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘হ্যাঁ, সেটি সরকার পারবে। ওই পরিস্থিতিতে একটি রাবার স্ট্যাম্প পদ্ধতির নির্বাচন করে তারা আবার ক্ষামতায় আসতে পারবে। কিন্তু এর পরিণতি শুভ হবে না।’

 

 

 

 

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.