খালেদা জিয়ার নামে সাজানো মিথ্যা দুর্নীতির মামলা সম্পর্কে বিদেশী কূটনীতিকদের হাতে যে সব তথ্য-প্রমান তুলে দিলো বিএনপি

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে হয়রাণীমূলক মিথ্যা ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত সাজানো দুর্নীতি মামলা সম্পর্কে ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও হাইকমিশনার এবং বিদেশি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানের প্রধানদের অবহিত করা হয়েছে। গত ৩০ জানুয়ারি চেয়ারপার্সনের গুলশান কার্যালয়ে তাদেরকে ব্রীফিং দেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। মামলায় খালেদা জিয়ার জড়িত না থাকা, অর্থ আত্মসাতের কোনো তথ্য প্রমাণ না পাওয়া, তার বিরুদ্ধে আদালতে উপস্থাপিত ফাইল ঘষামাজা ও স্বাক্ষর না থাকার প্রামান্য তথ্য উপাত্ত সম্বলিত লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করেন তিনি। দলের পক্ষ থেকে কূটনীতিকদের অবহিত করা হয় যে,নির্বাচনের জন্য বিএনপির প্রস্তুতি বাধাগ্রস্ত করতেই সরকার খালেদা জিয়াকে মিথ্যা মামলায় সাজা দেয়ার ষড়যন্ত্র করছে। এটি করা হলে নির্বাচনের গণতান্ত্রিক পরিবেশও পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কূটনৈতিকদের সামনে ইংরেজীতে লিখিত ব্রীফিংটি তুলে ধরেন বিএনপি মহাসচিব ,যা পুরোটা নিচে দেয়া হলো।

মহোদয়বৃন্দ,
আপনাদের অভিবাদন জানাচ্ছি। একই সাথে এই নতুন বছরে আপনাদের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করছি । আজকে আমরা বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে সম্মিলিত হয়েছি। আমরা উপনীত হয়েছি নির্বাচনের আগের সর্বশেষ বছরটির ঠিক সূচনার মুহূর্তটিতে। আজ আমি একটি সংকটের দিকে আপনাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে চাচ্ছি, যা বহুল প্রতীক্ষিত এই নির্বাচনের সম্ভাবণা ও ফলাফলকে ভীষণভাবে প্রভাবিত করবে। আর তা হচ্ছে – বেগম জিয়ার তথাকথিত দুর্নীতির মামলাগুলো অতি দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন করার জন্য সরকারের অব্যাহত চাপ। এ ব্যাপারে এতোটুকু বলাই যথেষ্ট যে – এই মামলাগুলো
(১) মিথ্যা, বানোয়াট এবং
(২) রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রনোদিত।
মামলাগুলোর মধ্যে দুইটি খুব আলোচিত। এর একটি হচ্ছে ২০০৮ সালের জিয়া অরফ্যানেজ ট্রাস্ট মামলা, যেটার রায় অতি আসন্ন – ফেব্রুয়ারির ৮ তারিখ। অন্যটি হল ২০১১ সালের জিয়া চ্যারিটেবল্ ট্রাস্ট মামলা।

পটভূমি:
জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটি ২০০৮ সালের ৩ জুলাই দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দায়ের করে। আঠারো বছর পর। এই বিশাল সময় নেওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে তা চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। মামলাটি ঢাকা বকশীবাজারে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালত -৫ এ পরিচালিত হচ্ছে। নিম্ন আদালত প্রাঙ্গণ থেকে বেশ দূরে একটি জায়গায় হওয়াতে এখানে আদালত প্রাঙ্গনের সাধারণ সুযোগসুবিধাগুলা নেই। অথচ সংবিধানের ৩৫(৩) ধারা অনুযায়ী জনসমক্ষে বিচার একজন নাগরিকের মৌলিক অধিকার। তারপরও এই মামলার কার্যক্রম গোপনেই চলছে। বাস্তবে এই আদালত জনসাধারণ আর আইনজীবীদের প্রবেশাধিকারবিহীন একটি অস্থায়ী হলরুম। এহেন পরিস্থিতি আর সামগ্রিক পরিবেশ স্বচ্ছ এবং নিরপেক্ষ বিচারের জন্য সহায়ক নয়। তাই এটা বদ্ধঘরে মুলত একটি ‘ক্যামেরা ট্রায়াল।’ ২০০৯ সালে বিডিআর (বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স) বিদ্রোহে যেসব বিদ্রোহী জড়িত ছিল তাদের বিচারের জন্য আদালত গঠন করে টিনের ছাদ আচ্ছাদিত এই কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছিল। সেই বিচারে কয়েক হাজার অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং শত শত সাক্ষী ছিল। একটি সংবেদনশীল মামলা, যার সাথে জাতীয় ওতপ্রোত নিরাপত্তা জড়িত, যেখানে একটি বিশাল সংখ্যক অভিযুক্ত সৈন্য আর তার সাথে অসংখ্য সাক্ষীদের প্রশ্নটি থাকছে, তার জন্য এই আদালতটি উপযুক্ত ছিল। কিন্তু আলোচ্য মামলাটির মত সাধারণ বিচারকার্যের জন্য এই আদালত মোটেও উপযুক্ত নয়।
দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার বিষয়বস্তু হচ্ছে – ১৯৯১ সালের জুন মাসে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন বেগম খালেদা জিয়া, তার ছেলে তারেক রহমান আরও চারজনসহ প্রায় সোয়া দুই কোটি টাকা আত্মসাৎ করা । এই ২ কোটি ২৪ লক্ষ টাকা (৬২৭,৫০০ মার্কিন ডলার) কুয়েতের আমিরের পক্ষ থেকে একটি বিদেশী ব্যাংকের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের পরিবারের সদস্যদের দ্বারা স্থাপিত ট্রাস্টে আসে। টাকাটা এতিমদের জন্য দান করা হয়। প্রকৃত ঘটনা: বেগম খালেদা জিয়ার স্বামী জিয়াউর রহমান যখন রাষ্ট্রপতি এবং এই অঞ্চলের সর্বাধিক জনপ্রিয় নেতা ছিলেন, তখন তিনি বিভিন্ন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন। তার নিকটতম বন্ধুদের একজন ছিলেন কুয়েতের আমির। ১৯৮১ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিজয়ী হয়েপ্রধানমন্ত্রী হন। কুয়েতের আমির রাষ্ট্রপতি জিয়ার স্মরণে মহৎ কিছু করার ব্যাপারে ইচ্ছা পোষণ করতেন। সেই সময়ে মুস্তাফিজুর রহমানে (তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী) কুয়েতে গেলে তার কাছেও তিনি তার ইচ্ছা ব্যক্ত করেন। পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় যে কুয়েতের আমির এতিমদের কল্যাণে বাংলাদেশে একটি তহবিল দান করবেন। মুস্তাফিজুর রহমানের উদ্যোগে অনুদান প্রাপ্তির জন্য সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় একটি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়। পরবর্তীকালে কুয়েতের আমির ১.২৫৫ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা) দান করেন। ১৯৯১ সালের জুন মাসে ইউনাইটেড সৌদি কমার্শিয়াল ব্যাংকের মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকে ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’-এর নামে এই টাকা আসে। প্রধানমন্ত্রী হিসাবে তার ব্যক্তিগত ক্ষমতার আওতায় এই টাকা প্রেরণ করা হয়েছিল (খালেদা জিয়ার পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল)। প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য কোনও কাগজপত্রের স্বাক্ষর করেননি, তিনি এই ট্রাস্টের সদস্যও ছিলেন না এবং এই লেনদেনের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্কও ছিল না।

সংসদীয় পদ্ধতি চালু হওয়ার পরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কাছে মাত্র দুটি সরকারি তহবিল আছে –
(১) প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল এবং
(২) প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ তহবিল
এছাড়া প্রধানমন্ত্রীর নামে অন্য কোন তহবিল নেই। কোনোকালে এতিমদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কোনো তহবিল ছিলও না। এখনো নেই। ১৯৯৩ সালের সেপ্টেম্বরে ট্রাস্ট দুটি নিবন্ধন করা হয়। প্রথমটি ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’, যার অথর বা সেটেলার (ট্রাস্ট সৃষ্টিকারী) হন তারেক রহমান ও তার ভাই আরাফাত রহমান। ‘জিয়া মেমোরিয়াল অরফানেজ’ নামে দ্বিতীয় ট্রাস্টটির সেটেলার হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মুস্তাফিজুর রহমান। প্রথম ট্রাস্টটি ছিল জিয়াউর রহমানের জন্মস্থান বগুড়ায় এবং দ্বিতীয়টি ছিল মুস্তাফিজুর রহমানের নিজ জেলা বাগেরহাটে। কুয়েতের আমির কর্তৃক প্রেরিত অর্থ দুইভাগে বিভক্ত করে দুই ট্রাস্টে ২.৩৩ কোটি টাকা (২,৩৩,৩৩,৫০০ টাকা) ট্রান্সফার করা হয়। মামলার আলোচ্য তহবিল খরচ করা হয়নি, যা সুদসহ বর্তমানে ৬ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে।

২০০৮ সালে মামলাটি শুরু করার জন্য দুর্নীতি দমন কমিশন কমিশনের একজন সহকারী পরিচালককে অনুসন্ধানের জন্য নিযুক্ত করে। তিনি একই বছরের জুন মাসের ১১ তারিখে একটি রিপোর্ট জমা দিয়ে বলেন যে, এই বিষয়ে বেগম খালেদা জিয়া কোনভাবে জড়িত ছিলেন না। চার দিনের মধ্যে কমিশন সরকারের নির্দেশে অনুসন্ধানের ভার কমিশনের অন্য কর্মকর্তা হারুন উর রশিদের উপর অর্পণ করে। তিনি অধঃস্তন সারির কর্মকর্তা (উপসহকারী পরিচালক) ছিলেন, যিনি আগে দুর্নীতি এবং অযোগ্যতার অভিযোগে তার চাকরি হারিয়েছিলেন। দায়িত্ব পাবার মাত্র দশ দিনের মধ্যে ২৫ জুন তার দাখিল করা তদন্তের রিপোর্টে তথাকথিত আত্মসাতে খালেদা জিয়ার জড়িত থাকার প্রমাণ খুঁজে পান! তারপরে আনুষ্ঠানিক তদন্তের জন্য একটি মামলা দায়ের করা হয়। এক বছরেরও বেশি সময় পর ২০০৯ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের নির্দেশে মামলার চার্জশিট জমা দেওয়া হয়। এতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী  বেগম খালেদা জিয়া ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ২,৩৩,৩৩,৫০০ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ আনা হয়। এই অভিযোগের অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হারুন উর রশিদকে আবার তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে স্বার্থের সংঘাতের (conflict of interest) কারণে এই ধরনের তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ অন্যায়। স্পষ্টতই তার নিয়োগ ছিল উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ভীষণভাবে ভুল।
উভয় ট্রাস্টই ১৮৮২ সালের ট্রাস্ট অ্যাক্টের অধীনে ব্যক্তিগত পারিবারিক ট্রাস্ট । অন্য কথায়, এগুলো হচ্ছে বেসরকারী তহবিল, সরকারী তহবিল নয়। যদি ট্রাস্টের কোনো নিয়ম লঙ্ঘনও হতো, তাহলে একই আইনের ধারা ২৩-এর অধীনে পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে। ধারা ২৩ কোনও অনিয়ম, কার্যকলাপ বা বিরোধ নিষ্পত্তির সাথে সংশ্লিষ্ট। আসল প্রশ্ন হলো, কেন এই ট্রাস্টটাকে পাবলিক এন্টিটি দাবি করে দুর্নীতি দমন কমিশন এই মামলা দায়ের করেছে?

মামলার কার্যবিবরণী:
প্রসিকিউশন স্বীকার করেছে যে এই বিষয়ের মূল ফাইলটি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অফিসে পাওয়া যায়নি। তাই এই মামলার চার্জশীটটি তাদেরই স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, কিছু বানোয়াট কাগজপত্রের উপর ভিত্তি করে দায়ের করা হয়। এমন কিছু জাল নোটপত্রও এতে পাওয়া যায়, যেগুলাতে কারও স্বাক্ষর নেই। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পরিবর্তে রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের প্যাডে লেখা কিছু ডক্যুমেন্ট উপস্থাপন করা হয়, যদিও ১৯৯১ সালে দেশটিতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার পদ্ধতি বিলুপ্ত হয়ে যায়। দলিল-দস্তাবেজগুলির অনেকাংশ ছিল অস্পষ্ট, এবং অনেক কাটাকাটি আর ঘষামাজার কারণে দুর্বোধ্য। এমন কাগজপত্র আইনের অধীনে গ্রহণযোগ্য নয়, এমনকি সাক্ষ্য আইনের ৬৩ ধারা অনুযায়ী আনুষঙ্গিক তথ্য-প্রমাণ হিসেবেও না। এই কাগজগুলি স্পষ্টতই নকল এবং শুধু বেগম খালেদা জিয়াকে অভিযুক্ত করার জন্য এই কাগজপত্রগুলিতে জালিয়াতি করে আদালতের সাথে প্রতারণা করা হয়েছে। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশের মত আমাদের দেশেও জালিয়াতি একটি মামলার পুরো কার্যধারাকেই কলুষিত করে (REPORTED IN SCOB (20150 (AD) PAGE 1,63 DLR (HCD) PAGE 370 AND 65 D.LR (HCD) PAGE 584)।

প্রসিকিউসনের ৩২ জন সাক্ষীর মধ্যে (তদন্ত কর্মকর্তা ব্যতীত) কেউই প্রমাণ দিতে পারেনি যে বেগম জিয়া ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের’ কোনো প্রক্রিয়ায় সাথে জড়িত।
(১) দান গ্রহণ
(২) কোন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা
(৩) ট্রাস্ট গঠন
(৪) অর্থ বিতরণ কোনোকিছুতেই খালেদা জিয়ার কোনো স্বাক্ষর নেই। সুতরাং, খালেদা জিয়াকে জড়িত করে এই মামলা কেবল একটি প্রতারণাপূর্ণ মামলাই নয়, এটি একটি সাক্ষ্যবিহীন বিচারের নামে প্রহসণ মাত্র। যে আইনের (দুর্নীতি দমন আইন ১৯৪৭-এর ৫ ধারায়) অধীনে বেগম জিয়া বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে, তা এই ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। দুর্নীতি দমন আইন ১৯৪৭ এর অনুচ্ছেদ ৫ অনুযায়ী অপরাধমূলক অভিপ্রায়ের প্রমাণ উপস্থাপন মামলা দায়ের করার পূর্বশর্ত, যা করতে প্রসিকিউসন সম্পূর্ণভাবে ব্যর্থ হয়েছে (REPORTED IN PLD 1964 DHAKA PAGE 330, 56 DLR PAGE 281, PLD 1961 SC PAGE 224, 55 DLR PAGE 596, 34 DLR PAGE 287 AND 24 DLR PAGE 151)। প্রসিকিউশন দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ -এর ধারা ২২ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন রুলস্ ২০০৯ এর ৮ এবং ১১ ধারার প্রবিধানগুলো লঙ্ঘন করে মামলাটি দায়ের করে এবং চার্জশিট উপস্থাপনের আগে অভিযুক্তকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেয়নি (REPORTED IN 63 DLR PAGE 425)।

সংক্ষেপে, বেগম খালেদা জিয়া এবং অন্যান্যদের বিরুদ্ধে নেওয়া পুরো আইনি প্রক্রিয়া আইনের চোখে বাতিল, অকার্যকর এবং অস্তিত্বহীন, নিম্নোক্ত ভিত্তিতে:
১। এটি আদালতের সাথে প্রতারণামূলক একটি মামলা।
২। এই মামলা দুর্নীতি দমন আইন ১৯৪৭ সালের ৫ ধারার আওতাভুক্ত না।
৩। এই মামলা দুর্নীতি দমন কমিশন আইন ২০০৪ এর ধারা ২২ এবং দুর্নীতি দমন কমিশন রুলস্ এর ধারা ৮ এবং ১১ লঙ্ঘন করে দায়ের করা।
৪। এটি একটি সাক্ষ্য-প্রমাণবিহীন মামলা। কেবলমাত্র তদন্ত কর্মকর্তা ছাড়া, যিনি ক্ষমতাসীনদের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন, আর কোনো সাক্ষীই চার্জশিটে বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে করা অভিযোগের সাথে তাকে জড়াতে পারেনি।
৫। এই ট্রাস্টগুলো ট্রাস্ট আইন ১৮৮২ সালের অধীনে নিবন্ধিত বেসরকারী পরিবারিক ট্রাস্ট। ট্রাস্টের নিজস্ব ব্যাপারে সরকারের হস্তক্ষেপের কোন সুযোগ নেই। যদি ট্রাস্ট পরিচালনায় কোনও বিরোধ উত্থাপিত হয়, তার প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা ট্রাস্ট আইন ১৮৮২ এর ২৩ ধারা অনুযায়ী হবে, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন ১৯৪৭ অনুযায়ী নয় ।

‘জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ সংক্রান্ত মামলার বিচারকার্যও শেষ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার অভিযোগ আগেরটির চেয়েও অনেক বেশি অযৌক্তিক। এই চ্যারিটেবল ট্রাস্টের ক্ষেত্রে, কোনও বিদেশী অনুদান জড়িত ছিল না, তহবিল স্থানীয়ভাবে উত্থাপিত হয়েছিল, যেখানে বেগম খালেদা জিয়া কোন ভূমিকাই পালন করতে পারতেন না। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে এটা বিরোধীদলকে বিশেষ করে বেগম খালেদা জিয়াকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য একটি সাজানো মামলা কারণ তিনিই প্রধানমন্ত্রী পদের মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। এটি আসন্ন জাতীয় নির্বাচন থেকে বেগম জিয়া এবং তার দলকে দূরে রাখার জন্য একটি রাজনৈতিক প্রতিহিংসা এবং অনিষ্টমূলক মামলা ।

রাজনৈতিক দৃশ্যপট:
এটা স্পষ্ট যে সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার (২০০৭-২০০৮) দুই প্রধানমন্ত্রীকে নাজেহাল করে তাদেরকে রাজনীতি থেকে উৎখাত করতে ‘মাইনাস টু’ ফর্মুলা বাস্তবায়নের জন্য এই সাজানো মিথ্যা মামলাটি দায়ের করে । এটা কখনও একটি দুর্নীতি বা ফৌজদারি মামলা ছিল না, সবসময়ই একটি রাজনৈতিক মামলা ছিল। সে সময় শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে পনেরোটি মামলা দায়ের করা হলেও বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয় মাত্র চারটি। পরবর্তীকালে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর তার নামে দায়েরকৃত সমস্ত মামলা বিভিন্ন আদালতে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে বাতিল করে নেন। সেখানে তিনি বলেন, এই মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। তবে শেখ হাসিনা বেগম জিয়ার নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলাগুলো বাতিলতো করেনই নাই ,উপরন্তু হাসিনার বর্তমান শাসনামলেই বেগম জিয়া বিরুদ্ধে মামলা চার থেকে ছত্রিশে এসে দাঁড়িয়েছে। বেগম জিয়ার দলের ৭৮ হাজার নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা প্রায় চার লক্ষ। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যটি একেবারেই স্পষ্ট। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই নীতিটিকে নির্যাতনের মাধ্যম হিসেবে অব্যাহত রেখেছিলেন কারণ এটি তার নিজের স্বার্থ এবং দীর্ঘমেয়াদী কৌশল –
(১) নির্বাচন থেকে তার রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে উৎখাত করার এবং
(২) একদলীয় শাসন বাস্তবায়নের হাতিয়ার। আজকে একটি ভীতিকর পরিস্থিতিতে দেশটা ছেয়ে আছে। ক্ষমতা জোর-জবরদখলের অনিশ্চয়তা এবং অচলাবস্থার মধ্যে আটকে গেছে দেশ, যেখানে উন্নয়ন ও মানবাধিকার বিধ্বংসী পরিণতির সম্মুখীন হচ্ছে। জনগণকে তাদের ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশকে একটি কর্তৃত্বপরায়ণ স্বৈর-শাসনের মধ্যে রাখা হয়েছে। জনগণের ম্যান্ডেট ছাড়া, সংসদে কোনও বিরোধীদল এবং কোনরকম জবাবদিহিতা ছাড়া মহাপরাক্রমশালী সরকারী দল রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক অনিয়ম এবং বাধাহীন দুর্নীতির ক্ষেত্র সৃষ্টি করেছে । এর ফলে মানবাধিকারের ব্যাপক লঙ্ঘন ঘটেছে, সংখ্যা বেড়েছে জোরপূর্বক অন্তর্ধানের, বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের এবং জেল হেফাজতে মৃত্যুর। বিরোধী পক্ষকে কোনও বিরোধিতা বা রাজনৈতিক অবস্থানের সুযোগই দেওয়া হচ্ছে না। মিথ্যা অভিযোগে নির্বিচারে গ্রেপ্তার করে অনেক রাজনৈতিক নেতাকে জেলে পাঠানো হচ্ছে । এখানেই শেষ নয়। বিচার বিভাগের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয়েছে, সংবিধানে প্রদত্ত ক্ষমতার বিভাজনের জন্য যা অপরিহার্য ছিল।
সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী (অপব্যবহার এবং অযৌক্তিকতার ভিত্তিতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারককে সরিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা সংসদকে প্রদান) বাতিল করার ফলশ্রুতিতে প্রধান বিচারপতির অপমানজনক বিতাড়ন, সর্বোচ্চ আদালত সুপ্রীম কোর্টের বিচারকদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলিতে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশনকে সংবিধানের ১৫ তম সংশোধনীর অনুযায়ী নির্বাচনকালীন সরকারের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী প্রধানমন্ত্রীর একটি রাবার স্ট্যাম্প বানানো হয়েছে। পূর্ণ কর্তৃত্ববাদী নিয়ন্ত্রণ স্থাপনের পথে একটা ভয়ঙ্কর উদ্যোগ হচ্ছে বিএনপির প্রধান ও অন্যান্য নেতাদের নির্বাচনে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখা। এই দৃষ্টিকোণ এবং রাজনৈতিক দৃশ্যপট থেকে দুর্নীতির মামলাগুলিকে বিবেচনা করা উচিত। ধৈর্য্য সহকারে এই বক্তব্য শোনার জন্য আমি আপনাদের ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

 

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.