জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় ভুয়া- জাল-জালিয়াতের কিছু নমুনা

‘মাননীয় আদালত, এই মামলার মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিলের টাকা আত্মসাৎ। কিন্তু কোনো টাকা তো খরচই হয়নি। সব টাকা ব্যাংকে আছে। সুদে-আসলে তা বেড়ে প্রায় তিন গুণ হয়েছে। তাহলে আত্মসাৎ হলো কীভাবে? হোয়াট ইজ আত্মসাৎ? আর আত্মসাৎ যদি না হয়, তাহলে মামলা কিসের?’
বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে পরিচালিত জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলাটি যে ভুয়া, জাল নথির ওপরে সাজানো তা ইতিমধ্যেই প্রমানিত হয়ে গেছে। মুলত: রাজনৈতিক হীন স্বার্থসিদ্ধি হাসিলের জন্য জোড়াতালি দিয়ে এই মামলা শেষ করে এখন ফরমায়েশী রায় ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকারের আজ্ঞাবহ আদালত। আদালতের আগেই রায় ঘোষণা দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সরকারের মন্ত্রী-নেতারা। বেগম জিয়াকে হয়রানি করতে এই মামলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সম্পুর্ন অবাস্তব ও মিথ্যার ওপর দিয়ে সরকারের অবৈধ ক্ষমতাবলে রায় পর্যন্ত ঠেলে আনা হয়েছে। সবাই ইতিমধ্যে অবগত আছেন যে, এই মামলাটি অসৎ উদ্দেশ্য প্রণোদিত, অসার। যে ২ কোটি ৩৩ লাখ টাকা নিয়ে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার সূত্রপাত, ওই টাকা ব্যাংকে গচ্ছিত আছে, তা এখন বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬ কোটি টাকারও বেশি। টাকা অত্মসাৎ করলে এই টাকা কিভাবে থাকে? মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের ৩২ জন সাক্ষীর কোনো সাক্ষীই বলেননি যে, টাকা আত্মসাৎ হয়েছে। কোনো সাক্ষীর জবানবন্দি দিয়ে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে আনা আত্মস্যাতের অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি দুদক। জাল-জালিয়াতে সাজানো মামলাটি আইনগত ও বাস্তবে যে কতটা মিথ্যা তার যৎসামান্য তথ্য তুলে ধরা হলো:

১. সরকার পক্ষ সুনির্দিষ্ট করে বলতে পারেনি, টাকা কোথা থেকে এসেছে। তারা বলছেন, টাকা এসেছে কুয়েত অথবা সৌদি আরব থেকে। বলা হয়েছে, টাকা এসেছে ইউনাইটেড সৌদি কমার্সিয়াল ব্যাংকের ডিডি’র মাধ্যমে। সরকার পক্ষ আদালতে আসল ডিডি উপস্থাপন না করে কেবলমাত্র ঘষামাজা ফটোকপি জমা দিয়েছে!

২. সরকার পক্ষের ১ এবং ৩১ নং সাক্ষীর বক্তব্য অনুসারে টাকা সরাসরি সোনালী ব্যাংকের রমনা শাখায় জমা হয়েছে। প্রশ্ন হলো- কোনো ব্যাংক একাউন্টে একটি ডিডি কি সরাসরি জমা দেয়া যায়?

৩. ঐ টাকা ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত অলস পড়ে ছিল (চার্য করা হয়েছে, টাকা কেন অলস পড়ে ছিল?)

৪. দুই কোটি ৩৩ লক্ষ ৩৩ হাজার ৩শ’ ৩৩ টাকা ৪০ পয়সা দেয়া হয়েছে জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্টকে এবং ২ কোটি ৩৩ লক্ষ ৩৩ হাজার ৩শ’ ৩৩ টাকা ৪০ পয়সা দেয়া হয়েছে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে।

৫. কোন চেক, ফরোয়ার্ডিং লেটার, রিকোয়েস্ট লেটার, ভাউচার, এপ্রুভাল কিংবা নোটশিটে বেগম খালেদা জিয়ার কোন স্বাক্ষর নেই বা অনুমোদন নেই। এমন কোন প্রমান রাষ্ট্রপক্ষ উপস্থাপন করতে পারেনি।

৬. আলামত হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর দফতরের যে ক্যাশবুক উপস্থাপন করা হয়েছে, সেটি কোনো ক্যাশবুক বলে মনে হয় না; মুদি দোকানেও এরচেয়ে উন্নতমানের ক্যাশবুক থাকে। প্রধানমন্ত্রীর দফতরের একাউন্ট যেখানে প্রতি বছর অডিট করা হয়, সেখানে এমন ক্যাশবুক থাকা অসম্ভব একটা ব্যাপার। সেই ক্যাশবুকে একই চেক নম্বর দিয়ে একই পরিমান টাকার কথা একবার ১৯৯৩ সালের জানুয়ারী মাসে লেখা হয়েছে, আবার নভেম্বর মাসেও লেখা হয়েছে। কিন্তু সেই চেকটি আলামত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।

৭. দু্ইটি ট্রাস্টে সমান বণ্টনকৃত বরাদ্বের (২,৩৩,৩৩,৩৩৩.৪০ + ২,৩৩,৩৩,৩৩৩.৪০) মধ্যে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে কেবলমাত্র ‘জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ বগুড়ার বিরুদ্ধে। অথচ এই টাকার অর্ধেক দিয়ে একই ব্যক্তির নামে (শহীদ জিয়ার) নামে বাগেরহাটে প্রতিষ্ঠিত আরেকটি এতিমখানা ‘জিয়া মেমোরিয়াল ট্রাস্ট’ এর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আনা হয়নি। বাগেরহাটে দোষ না হলে বগুড়ায় কেনো অপরাধ হবে?

৮. জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট’ এর জন্য বরাদ্বকৃত মোট ২,৩৩,৩৩,৩৩৩.৪০ টাকার মধ্যে ২ কোটি ১০ লাখ টাকার উপর দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়েছে। ট্রাস্টের জন্য বরাদ্দ থেকে খরচ হওয়া ২২ লাখ ৬১ হাজার ৮৫৬ টাকা ২০ পয়সার উপর কোন দুর্নীতি/আত্মস্যাত বা সরকারী এতিম ফান্ডের টাকা বলে অভিযোগ আনা হয়নি। কেনো?

৯. আলোচ্য ২,১০,৭১,৬৪৩.৮০ টাকা ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এতিমখানা স্থাপনের জন্য এক খণ্ড জমি কেনার মূল্য বাবদ জনাব শরফুদ্দিন আহমেদকে প্রদান করা হয়েছিল। তাহলে দুর্নীতি কবে ঘটেছিল? ১৯৯৩ সালে? নাকি ২০০৬ সালে?

১০. দুর্নীতি যদি ১৯৯৩ সালে ঘটে থাকে, তাহলে পুরো টাকার উপর কেন দুর্নীতির অভিযোগ উঠলো না? আর দুর্নীতি যদি ২০০৬ সালের নভেম্বরে ঘটে থাকে, তাহলে তখন তো বেগম খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রীই ছিলেন না। সেই সময় সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন ড. কামাল সিদ্দিকী এবং তিনিই সোনালী ব্যাংকে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট একাউন্টের স্বাক্ষরদাতা (ঐ স্বাক্ষরটি আসলেই উনার কিনা, সেটাও যাচাই করা হয়নি- কেননা ২০০৬ সালের নভেম্বরে কামাল সিদ্দিকী মুখ্য সচিব ছিলেনও না)। বাংলাদেশের সংবিধানের ৬৬(৩) অনুচ্ছেদ এবং ফৌজদারী দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা অনুযায়ী ‘প্রধানমন্ত্রী’ সরকারী কর্মকর্তা হতে পারেন কিনা, সেটাও একটি প্রশ্ন।

১১. ২০০৬ সালে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে এফডিআর খোলা এবং এতিমখানা স্থাপনের জন্য এক খণ্ড জমি কেনার অগ্রীম মূল্য বাবদ জনাব শরফুদ্দিন আহমেদকে (নভেম্বর মাসে) ৫টি চেকের মাধ্যমে ২.৫ কোটি টাকা প্রদান করা হয়। প্রকৃতপক্ষে শরফুদ্দিন আহমেদকে ২ কোটি টাকার ফেসভ্যালুর ২টি এফডিআর প্রদান করা হয়, যা মেয়াদান্তে ২.৫ কোটি টাকা হবার কথা ছিল। জনাব শরফুদ্দিন আহমেদ মেয়াদ পুর্তির আগেই সেই এফডিআর ভাঙিয়ে ফেলার কারণে ক্ষতিপূরণ, আয়কর এবং মূল্য সংযোজন কর দেবার পর ২,১০,৭১,৬৪৩.৮০ টাকা হাতে পান। কিন্তু জমি না কেনার কারণে তিনি পুরো ২.৫ কোটি টাকাই জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টকে ফেরত প্রদান করেন। যে কারণে এই লেন-দেন এর ফলে ট্রাস্ট আর্থিকভাবে কোন ক্ষতির সম্মুখিন হয়নি।

১২. আর্থিক লেনদেনে অনিয়মের মাধ্যমে দুর্নীতির ঘটনা যদি ১৯৯৩ সালে না ঘটে ২০০৬ সালে ঘটে থাকে, তাহলে সেটি ট্রাস্ট আইন কিংবা দণ্ডবিধির সংশ্লিস্ট ধারায় মামলা হবার কথা; দুর্নীতি দমন কমিশনের মাধ্যমে তাদের এখতিয়ার বহির্ভূতভাবে এই মামলা হবার কথা নয়।

১৩.এটা সর্বজনবিদিত যে ,১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাংলাদেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকারের পরিবর্তে সংসদীয় সরকার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। নতুন সরকার ব্যবস্থা অনুযায়ী বেগম খালেদা জিয়া ১৯৯১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সরকার প্রধান হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাহলে ‘প্রধানমন্ত্রীর অরফানেজ ট্রাস্ট’ এর মত অস্তিত্বহীন একাউন্ট, যেটি সরকার প্রধানের নামে খোলার দাবী করছেন প্রসিকিউশন, সে কিভাবে ৯/৬/১৯৯১ তারিখে খোলা সম্ভব? যারা নথি জালিয়াতি করেছেন, তারা কি ইতিহাস জানেন না?

১৪. সরকার পক্ষের ১৯ নং সাক্ষী জানিয়েছেন ১৯৯৩ সালের জানুয়ারী মাসের ৩১ তারিখে তিনি প্রধানমন্ত্রীর দফতরের হিসাব রক্ষক পদ থেকে ইস্তফা প্রদান করেন। সেই ক্ষেত্রে কথিত ক্যাশবুকে ১৯৯৩ সালের এপ্রিল, জুলাই এবং অক্টোবর মাসে তার লেখা এন্ট্রি পাওয়ার ঘটনা ব্যাখ্যার দাবি রাখে। যদিও এই সাক্ষী বলেছেন, তাকে তার ইস্তফা প্রদানের পর প্রধানমন্ত্রীর দফতর থেকে ডেকে এনে এই এন্ট্রি দেয়ানো হয়েছে। চাকুরিতে ইস্তফা প্রদানের পর অগ্রীম তারিখে কিভাবে লেজার এন্ট্রি দেয়া সম্ভব? এটা কতটুকু আইনসম্মত? আসলেই এই এন্ট্রিগুলো কবে দেয়া হয়েছে? ১৯৯৩ সালে? নাকি ২০০৮ সালে যখন তাকে ডাকা হয়েছিল তখন? কারণ ১৯৯৩ সালে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে কর্মরত হিসাব রক্ষক ‘প্রধানমন্ত্রীর এতিম তহবিল’ সংক্রান্ত কোন হিসাব দেখেন নাই বলে আদলতে জানিয়েছেন। ১৯৯৩ সালের এপ্রিল, জুলাই এবং অক্টোবরে যদি এন্ট্রি দেবার প্রয়োজনই হতো, তাহলে তো সেটি তখনকার কর্মরত হিসাব রক্ষক ২১ নং সাক্ষীকে দিয়েই করানোর কথা ছিল।

১৫. যে একমাত্র সাক্ষী একটি স্বাক্ষর দেখার দাবী করেছেন তিনি প্রমানই উপস্থাপন করতে পারেনি। তিনিই সেই ব্যক্তি, যিনি ইস্তফাদানকারী ১৯ নং সাক্ষীকে ইস্তফা প্রদানের পর ডেকে এনে আইন বহির্ভূতভাবে অগ্রীম তারিখে ক্যাশবুকে বিভিন্ন এন্ট্রি দেয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। মুলত: মিথ্যা মামলা সাজাতে গিয়ে পদে পদে মিথ্যায় ডুবে গেছে রাস্ট্রপক্ষ। দেশের মানুষের কাছে সব নীলনক্সা উন্মোচিত হয়ে পড়েছে। এখন সরকার মুখ লুকাবে কোথায়?

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.