ঢাকঢোল পিটিয়ে মন্ত্রীর ব্যক্তিগত স্টাফ আটক, এবং ইতিহাসে চর্চা

“সহনীয় মাত্রায় ঘুষ খান”- সুত্রের আবিস্কারক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের পার্সোানাল স্টাফ মোতালেব হোসেন ও উচ্চমান সহকারী নাসির উদ্দিনকে দুর্নীতির দায়ে গ্রেপ্তার দেখানোর পরে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। গ্রেফতারের আগে তাদেরকে গুম কায়দায় অপহরন করে র‌্যাব। পরে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করে দুর্নীতির দায়ে আটক দেখানো হয়। সরকারী সূত্রে খবর প্রকাশ করা হয় শিক্ষা প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্রে দুর্নীতির ঘাঁটি গেড়েছিলেন এই দুই সরকারী কর্মচারী। খোদ শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা হয়ে মন্ত্রীর দপ্তরে বসে তারা দিব্যি ঘুষের হাট বসিয়ে গড়েছেন অর্থ-বিত্তের পাহাড়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বলেছেন, সুস্পষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে তাদের ধরা হয়েছে।

সরকারী কর্মচারীদের দুর্নীতির জন্য মামলা মোকদমা আটক এগুলো রুটিন ব্যাপার। প্রশ্ন উঠছে, যেভাবে রাজনৈতিক কর্মীদের গুম করে র‌্যাব ডিজিএফআই সেভাবে কেনো এদের তুলে নিলো র‌্যাব। এর পেছনে কি কেনো কারন আছে। সঠিক কেউ বলতে পারবে না। তবে অতীতের একটা ঘটনা স্মরণ করা যেতে পারে।

১৯৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। কাক-ভোর থেকে পুলিশ ঘেরাও করে আছে রাজধানীর মিন্টো রোডস্থ মন্ত্রিপাড়ায় ৪০ নম্বর বাড়ি। এটি বিচারপতি সাত্তার সরকারের যুবমন্ত্রী আবুল কাশেমের সরকারী বাড়ি। মন্ত্রী বাড়িতে ছিলেন না, তারপরও ঘেরাও করে রেখেছে পুলিশ। আশে পাশের মন্ত্রী ও বিচারপতিদের সরকারি বাসভবনের ছাদ, গ্যারেজ, আঙিনায় ও সশস্ত্র পুলিশ। তারা গুলি চালাতে প্রস্তুত। শুধু নির্দেশের অপেক্ষা। হ্যান্ডমাইকে পুলিশের অনবরত ঘোষণা- ‘পুরো বাড়ি পুলিশ ঘিরে ফেলেছে। কোনোরকম চালাকি না করে সারেন্ডার করুন, নইলে পুলিশ ভিতরে ঢুকে পড়বে।’ কিন্তু কোনো সাড়া-শব্দ নেই। পুলিশ প্রস্তুতি নিল ভিতরে ঢোকার। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মতিনের নির্দেশে চলছে অপারেশন। পুরো ঘটনার নেতৃত্বে তৎকালীন ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার এ এফ এম মাহমুদ আল ফরিদ। সকাল ১০টা থেকে পুলিশের পদস্থ কর্মকর্তাদের ছোটাছুটি বেড়ে যায়। ওয়াকিটকিও তাদের ভীষণ ব্যস্ত। শীতের সকালেও দরদর করে ঘামছেন কর্মকর্তারা। একজন মন্ত্রীর বাসভবন ঘিরে কয়েকশ পুলিশের এই যুদ্ধংদেহী অবস্থানে গোটা শহরে তখন অজানা আতঙ্ক। মিন্টো রোডে সাধারণের যান চলাচল বন্ধ। আশপাশ এলাকায় উৎসুক জনতার ভিড়। দুপুরে একদল সশস্ত্র পুলিশ মন্ত্রীর বাসভবনের দিকে এগোতে থাকে। কিন্তু হঠাৎ মন্ত্রীর বাড়ির মূল ফটকের পকেট দরজা খুলে গেল। ভিতর থেকে বেরিয়ে আসছেন একজন! ধীর পায়ে। চাদর গায়ে, মুখ অর্ধেক ঢাকা। শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি। সুনসান নীরবতা। পুলিশের অস্ত্রের নল ঘুরে গেল লোকটির দিকে। পায়ে হেঁটে লোকটি পুলিশের একদম কাছাকাছি। পুলিশ সদস্যরা তাকে ঘিরে ফেলে। লোকটি দুই হাত উঁচু করে দাঁড়ালেন। পুলিশ তাকে জাপটে ধরে। লোকটির দুই হাত পেছন দিকে নিয়ে হাতকড়া পরিয়ে তাদের ভ্যানে তুলে। পুলিশ কর্মকর্তাদের মুখে তখন হাসি। ভ্যানটি চলতে শুরু করল। পুলিশের গাড়ির বহর ভ্যানকে অনুসরণ করল। উৎসুক জনতার উদ্দেশে হ্যান্ডমাইকে পুলিশ বলে, ‘আমাদের অভিযান শেষ। দেশের সবচেয়ে দুর্ধর্ষ অপরাধী এখন আমাদের কব্জায়।’ দুর্ধর্ষ সেই লোকটি ২২ খুনসহ অসংখ্য গুম ও ডাকাতি মামলার আসামি এমদাদুল হক ইমদু। ইমদু নামেই যিনি বেশি পরিচিত। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুর্ধর্ষ যে কজন অপরাধীর নাম বলা হয়ে থাকে, তাদের অন্যতম এই ইমদু। দেড় বছর পরে সামরিক আইন আদালতের বিচারে ফাঁসি হয়।

একসময় ইমদু জাসদ করতো, পরে ৮০ সালে যুবমন্ত্রী আবুল কাসেমের হাত ধরে ইমদু যু্বদলে যোগদান করে। অন্তত তিনটি সরকারের সময়ে ইমদু সন্ত্রাসের সাথে জড়িত ছিল। ৮১ সালের এপ্রিল মাসে নাখালপাড়া ও কালিগঞ্জে দু’টি হত্যাকন্ডের সাথে ইমদু জড়িত থাকার অভিযোগ উঠলে প্রেসিডেন্ট জিয়ার নির্দেশে তখনই তাকে যুবদল থেকে বহিস্কার করেন যুবদল সভাপতি কাসেম।

তবে যুবমন্ত্রীর বাসা থেকে ইমদুকে আটকের ঘটনাটি ছিল নাটকীয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অধ্যাপক মতিনের সাথে যুবমন্ত্রী কাসেমের ছিল মনোমালিন্য। কাসেম ছিলেন জামালউদ্দিন-হাসানাত গ্রুপের, অন্যদিকে মতিন ছিলেন শাহ আজিজ গ্রুপের। মুলত সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করতেই যুবমন্ত্রী কাসেমের বাড়ি ঘেরাও করে ইমদুকে আটকের ঘটনা ঘটানো হয়। ইমদুর সাথে তখন পুলিশের উর্ধতন মহলে ভালো যোগাযোগ ছিল, সে কোথায় কখন যেতো সব তথ্য পুলিশের কাছে থাকত। তাকে আটক করতে চাইলে যেকোনো যায়গা থেকেই পুলিশ তা করতে পারত। কিন্তু মন্ত্রীর বাসায় ঢুকিয়ে ঘেরাও করে আটক করার পিছনে জড়িত ছিল সেনা গোয়েন্দা সংস্থা। যারা পরে এ বিষয়টিকে রং চং মেখে ফলাও করে পত্র পত্রিকায় প্রচারের ব্যবস্থা করে।

মূলত এই আটকের কারন ছিল বিচারপতি সাত্তারের সরকারের ভাবমুর্তি ক্ষুন্ন করা। এর কয়েকদিন আগেই পত্র পত্রপত্রিকায় একটি বানোয়াট খবর সাপ্লাই করে সেনাগোয়েন্দারা যাতে বলা হয় ১৬ জন মন্ত্রীর দুর্নীতির তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি সাত্তার, পরে যার কোনো ভিত্তি খুঁজে পাওয়া যায় নি।

বিচারপতি সাত্তার সরকারের বিরুদ্ধে এসব ফুলানো ফাঁপানো সাজানো দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের দুর্নামের উপর ভিত্তি করে মাস দু’য়েক পরেই (২৪ মার্চ) রাষ্ট্রপতি বিচারপতি সাত্তারকে বন্দুকের নলের মুখে অপসারন করে রাষ্ট্র ক্ষমতা দখল করেন সেনাপ্রধান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ।

উল্লেখ্য, ঐ একই অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী নাহিদ বলেছিলেন শুধু সরকারী কর্মকর্তারই নয়, মন্ত্রিরাও ঘুস খায়, এমনকি তিনি নিজেও! এর প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষামন্ত্রী নাহিদের পদত্যাগের দাবী ওঠে বর্তমান অবৈধ সংসদে। তার কয়েকদিন পরেই মন্ত্রির ব্যক্তিগত স্টাফ আটকের ঘটনা ঘটলো!

Facebook Comments