সব কিছু ভেঙে পড়ে : এমনকি প্রিয় সেনাবাহিনীও

বিগত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে চলেছে শুদ্ধি অভিযান। এর ফলে বাড়ি গেছে শত শত অফিসার, কারাগারেও আছে অনেকে, এমনকি নিহতও হয়েছে কেউ কেউ। এদের বেশিরভাগের বিরুদ্ধে কল্পিত অভিযোগ- বিএনপি, জামায়াত, পাকি সংযোগ, যুদ্ধাপরাধী, সর্বশেষে ইসলামী জঙ্গি। বছর দুয়েক আগে অপ্রমানিত জঙ্গি অভিযোগে পুলিশের হাতে হাতকড়া অবস্থায় নিহত হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত মেজর জাহিদ। আসলে সেটা ছিল আটকের পরে ঠান্ডা মাথায় খুন। রাজনৈতিকভাবে বিরোধী শিবিরের ট্যাগ দিয়ে বহু অবসরপ্রাপ্ত সেনা অফিসার গ্রেফতার করা হয়েছে, বাড়ি ঘর জমি হারিয়েছেন। জামায়াত পরিবারের সদস্য হওয়ার কারনে ব্রিগেডিয়ার আমান আযমীকে দেড় বছর আগে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে সেনা গোয়েন্দা হেফাজতে গুম করে রাখা হয়েছে। সর্বশেষে তাদেরই হাতে গুম হয়েছেন সাবেক সেনা অফিসার কূটনীতিক ও দুটি দেশে রাষ্ট্রদূত অবসরপ্রাপ্ত ক্যাপ্টেন মারুফ জামান। জানা গেছে এসব ধরপাকড় গুম, হত্যা ও আটকের পিছনে কাজ করছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। এরা রাওয়া ক্লাব, গলফ ক্লাব, সেনা অফিসারদের যাওয়া আসা আছে এমন স্থানগুলোতে ওৎ পেতেনানা তথ্য পাচার করে অফিসারদের জীবন বিপদাপন্ন করে তুলেছে। এরকম একজন ইনফরমার হলো অবসরপ্রাপ্ত মেজর ইউসুফ।

সেনাবাহিনীর ২৮ লং কোর্সের অফিসার ইউসুফ রাজনীতি করার অভিপ্রায়ে সেনা চাকরি ছাড়ে। ১৯৯৩ সালে সেনাবাহিনীতে ভর্তি হওয়া এই ইউসুফ প্রধানমন্ত্রীর অফিস এবং ডিজিএফআইর খুব ঘনিষ্ট লোক। এত কনিষ্ট একজন অবসরপাপ্ত কর্মকর্তা হয়েও মেজর ইউসুফ যখন তখন যেতে পারেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অবঃ) তারিক সিদ্দিকের কাছে। তার আরও দুই ওস্তাদ হচ্ছে নবম পদাতিক ডিভিশিনের জিওসি মেজর জেনারেল আকবর হোসাইন, এবং র‌্যাবে খুন করতে করতে কুখ্যাত হয়ে ওঠা ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল আহসান। মেজর ইউসুফ নিজেকে আওয়ামী লীগের গোড়া সমর্থক হিসাবে পরিচয় দেয়। তার লেখা লেখিতে প্রচন্ড উগ্রবাদী। নিজেকে প্রগতিশীল হিসাবে উপস্থাপন করার জন্য শাহাবাগীদের সাথে দহরম মহরম গড়ে তোলে সে। নিজে তার ফেসবুক পেইজে নাস্তিক্যবাদী পোস্ট দিতে থাকে। ইসলাম ধর্ম, রসুল (সাঃ), কোরআন, আল্লাহ নিয়ে সারাক্ষণ যাচ্ছে তাই বানোয়াট সমালোচনা এবং নোংরা কথাবার্তা লিখে প্রচার করতে থাকে ইউসুফ। যদিও বাপ মা তার একটি ইসলামী নাম রেখেছে মোহাম্মদ ইউসুফ হোসেন। কিন্তু সে প্রগতিশীল সাজতে গিয়ে নাস্তিক গ্রুপের সংগে মিশে পুরোপুরি উগ্রবাদী নাস্তিকে পরিণত হয়েছে।

মেজর ইউসুফের ফেসবুক পোস্ট ও কমেন্ট নিয়ে রাওয়া ক্লাবের টেবিলে আলোচনা হয়। সিনিয়র সদস্যরা ইউসুফকে এসব করতে নিষেধ করে। কিন্তু এর ফল হয় বিপরীত। ইউসুফ ঐসব সিনিয়রকে ডিজিএফআই দিয়ে নানাভাবে হুমকি দেয়- শাসায়। তাকে বোঝাতে গেলে সিনিয়রদেরকে সে গালিগালাজ করে, বাপের বয়সী অফিসারদেরকেও অপমান অপদস্ত করতে দ্বিধা করে না। অনেক সিনিয়ররা মনে করেন, সে অল্প বয়সে অনেক ক্ষমতাধরদের সাথে চলাফেরা করতে গিয়ে হয়ত নিজেকে সামাল দিতে পারছে না, তাই বাড়াবাড়ি করে ফেরছে। অতএব তাকে আরও বোঝানো হোক। কিন্তু তাকে কেউ বোঝাতে গেলেই ঐ সব সিনিয়রদেরকে সে রাজাকার যুদ্ধপরাধী ও সরকারের শত্রু ট্যাগ দিয়ে নিজে পোস্ট দেয়, এবং ডিজিএফআইর কাছে গোপনে কমপ্লেন করতে থাকে। নিকট অতীতে দেখা গেছে, আগেরদিন সন্ধ্যায় রাওয়া ক্লাবে যেসব অফিসাররা ইউসুফকে বোঝাতে চেষ্টা করেছে, পরের দিন ডিজি ডিজিএফআই মেজর জেনালের আকবর এবং এনএসআইর জিয়াউল আহসান তাদেরকে চা খাওয়ার কথা বলে ডেকে নিয়ে যেত। নানা বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে তারা হুমকি দিয়ে মুখ বন্ধ করে দেয়। রাওয়া ক্লাবে গল্ফ ক্লাবে বিভিন্ন সামাজিক গেট টুগেদারে পারিবারিক বা একান্ত আলাপে দেশ নিয়ে যে সব কথাবার্তা বলে থাকে, তার অনেকটাই রংচং মেখে ইউসুফ পাচার করে দেয় ডিজি ডিজিএফআইর কাছে। তার তৎপরতার কারনে বহু সিনিয়র অফিসারকে জামাত যুদ্ধাপরাধী ট্যাগ দিয়ে ধমক ও ওয়ার্নিং খেতে হয়েছে। রাওয়া ক্লাবের সকলেই এখন বুঝে গেছে- এসব ইউসুফের কাজ। সিনিয়র অফিসারদের অনেকের প্রশ্ন- মিলিটারি একাডেমীতে ইউসুফকে OLQ (Officers Like Quality) সাবজেক্টটি পড়ানো হয়েছিল কি না। বিশ্বজুড়ে সামরিক অফিসারদের জন্য OLQ একটি অবশ্য পাঠ্য বিষয়, যাতে পড়ানো হয় একজন সেনা অফিসারের ম্যানারস এন্ড এটিকেট, একজন সেনা অফিসার কি কি কাজ করতে পারে, আর কি করতে পারে না।

ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনের ডিফেন্স এটাশে ব্রিগেডিয়ার জে. এস. নন্দার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ট মেজর ইউসুফ। বিভিন্ন নৈশ পার্টিতে একসাথে খানা পিনাও করে থাকে। তাছাড়া সাংবাদিক শ্যামল দত্ত ও মুন্নী সাহাও ইউসুফের বেশ ঘনিষ্ট। তবে রাওয়া ক্লাবের আলোচনা থেকে যাদের ভারত বিরোধী মনে হয় তার, সে সব অফিসারদের সম্পর্কে ব্রিগেডিয়ার নন্দাকে সে রিপোর্ট করে। বাংলাদেশের স্বার্থ নিয়ে অফিসারদের কোনো একাডেমিক আলোচনাকেও রংচং দিয়ে ভারত বিরোধী ট্যাগ দিয়ে সে জানিয়ে দেয়।

জানা গেছে, এইরূপ কোনো আলোচনার সূত্রে ইউসুফের রিপোর্টের প্রেক্ষিতে ডিজিএফআই গুম করে বিএনপির নির্বাহী কমিাটির সদস্য সৈয়দ সাদাত আহমেদকে। সাদাতের পিতা বেশ প্রবীণ সেনা অফিসার- রিটায়ার্ড কর্নেল সাহাবুদ্দিন, যিনি পাকিস্তানের সেনাশাসক জেনারেল পারভেজ মোশাররফের কোর্সমেট। সে কারনে বাংলাদেশ আমলের অফিসাররা কর্নেল সাহাবুদ্দিনকে খুব সমীহ করে, পিতার মত চোখে দেখে। তবে পিতা কর্নেল সাহাবুদ্দিনের কারনেই সৈয়দ সাদাত আহমেদকে গুম করে ডিজিএফআই। ইউসুফ রিপোর্ট করে কর্নেল সাহাবুদ্দিন পাকিস্তানের কানেকশন – জামাত – যুদ্ধাপরাধী ইত্যাদি। অধিকাংশ সামরিক অফিসাররা জানেন, এসব কল্পিত অভিযোগ। মুলত কর্নেল সাহাবুদ্দিন একটু আউট স্পোকেন, মুরব্বী, আর এর জন্য খেসারত দিতে হয় তাকে। মেজর ইউসুফ তার নামে রিপোর্ট করায় এবং ছেলে সাদাতকে গুম করায়। অনেক উপরে কাকতি মিনতি করে ৪ মাস চেষ্টার পরে ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে পারেন কর্নেল সাহাবুদ্দিন।

রাওয়া ক্লাবের সুত্র জানায়, কূটনীতিক রাষ্ট্রদূত মারুফ জামানকেও গুম করা হয় মেজর ইউসুফের রিপোর্টের ভিত্তিতে।

২৬ লং কোর্সের মেজর হাফিজের মালিকানাধীন বনানীতে সি ব্লকের ১১ নম্বর রোডের ৯৮ নম্বর বাড়িতে অবস্থিত আওয়ামী মিলিটারি অফিসারদের গুপ্ত সভার নিয়মিত সদস্য মেজর ইউসুফ। এখানেই নিয়মিতভাবে মিলিত হয় মেজর জেনারেল তারিক সিদ্দিক, মেজর জেনারেল আকবর, মেজর জেনারেল ওয়াকার, ব্রিগেডিয়ার শায়েখ, ব্রিগেডিয়ার জিয়া, অবসরপ্রাপ্ত মেজর খন্দকার হাফিজ, মেজর ইউসুফ সহ আওয়ামীপন্থী সার্ভিং এবং রিটায়ার্ড অফিসাররা। এখান থেকে ঠিক হয় কোন কোন রাজনীতিক, সিভিল, মিলিটারীকে তুলে আনতে হবে, গুম করতে হবে। দেশের রাজনীতি কোনে দিকে যাবে ও আগামী নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়েরে বিভিন্ন খুটিনাটি ও নানা ফন্দি তৈরী করা হয়। এখানকার মিটিংয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়- বর্তমান সরকারের প্রতি বৈরি ১৩৩ জন সামরিক অফিসারকে সাইজ করতে হবে। গত অক্টোবরের মিটিংয়ে রিটায়ার্ড মেজর খন্দকার আবদুল হাফিজ বিএনপি প্রধান বেগম জিয়াকে বেনজির ভুট্টোর মত বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়ার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।

রিটায়ার্ড মেজর ইউসুফ কথায় কথায় প্রধানমন্ত্রীর দফতরের রেফারেন্স দেয়। শেখ হাসিনাও নাকি তার কথা শোনে, এমন কথা সে প্রায়শই বলে থাকে। ইউসুফ তার পোস্টে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধদের খেতাব কেড়ে নেয়ার দুঃসাহস দেখায়। অথচ পিলখানায় ৫৭ সেনা অফিসার হত্যার বিষয় নিয়ে কথা উঠলে সে নিশ্চুপ হয়ে যায়। বরং এই নিয়ে যারা দুঃখ বা হতাশা প্রকাশ করে, তাদেরকে ভিন্নমতাবলম্বী হিসাবে রিপোর্ট করে। এই হচ্ছে তার সেনাবাহিনীর প্রতি তার দরদের নমুনা। একটা কথা প্রচলিত আছে, ‘a soldier is a soldier, even after death’. কিন্তু ইউসুফের কর্মকান্ড দেখে তা মনে হয় না, সে সেনা অফিসার ছিল বা তার কোনো ফেলো ফিলিংস আছে। ইউসুফের রোল মডেল হলো- ১৮ ঘন্টা মাতাল জেনারেল আকবর, সিরিয়াল কিলার ব্রিগেডিয়ার জিয়া, সাথী হলো মেজর হাফিজ। হাফিজ-ইউসুফ সন্ধ্যার পরে প্রায়ই মাতাল অবস্খায় থাকে, কখনও উন্মত্ত হয়ে অনেকের সাথে খারাপ ব্যবহার করে থাকে।

রিটায়ার্ড মেজর ইউসুফ উল্টাসিধা গোয়েন্দা রিপোর্ট করে কেবল অফিসারদের ক্ষতি করছে না, সামরিক গোয়েন্দা সংস্থাকেও ভুলপথে চালিত করছে। তাছাড়া রাষ্ট্রীয় গোপন তথ্যাদি পাচার করছে পরদেশের কাছে। শ্যামল দত্ত এবং মুন্নী সাহার কাছে সেনাবাহিনীর ক্লাসিফাইড ইনফরমেশন শেয়ার করে সেনাবাহিনীকে অরক্ষিত করে দিচ্ছে। এসকল কাজ পরিস্কার রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধ। এত জুনিয়ার এক অফিসার প্রতিনিয়ত এভাবে বেআদবী করছে, সবাইকে টেররাইজ করে যাচ্ছে তাকে নিয়ে সেনা অফিসাররা সদস্যরা ভীষন অতিষ্ট। রীতিমত শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

Facebook Comments
Content Protection by DMCA.com

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.