সরকারে নেই আর সরকার!

বিশেষ প্রতিবেদক
দিন যতই যাচ্ছে, ৫ জানুয়ারির বিনাভোটের সরকারে অস্থিরতা তত বাড়ছে। বিশেষ করে বিচারপতি সিনহা ইস্যুতে সরকারের ন্যাক্কারজনক কর্মকান্ড, এবং অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রহস্যজনক নিরবতা ও ঘর থেকে বের না হওয়া, এমনকি মাসখানেক ধরে একই চাদর জড়িয়ে সীমিত চলাফেরায় নানা দুর্ভাবনা ও জটিলতার মধ্যে পড়েছে সরকার ও সরকারী দল। বিচারবিভাগ কেন্দ্রিক বিপদ থেকে সরকারকে বাঁচাতে এগিয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল আকবর হোসাইন। তিন মাস ধরে চলমান তার নানা অবৈধ ও রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতায় এমনকি প্রধান বিচারপতিক মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সই আদায় করে বিদেশে পাঠিয়ে দেয়ার ঘটনা জানাজানি হলে সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা ও কমান্ড চরমভাবে ভূলুন্ঠিত হয়। মাঠ কমান্ডারদের চাপে বাধ্য হয়ে মেজর জেনারেল আকবরের রাশ টেনে ধরেছেন সেনাপ্রধান জেনারেল বেলাল।

সেনাবাহিনীর ১৩ লং কোর্সের অফিসার আকবর হোসাইন তার আরেক বাচমেট মেজর জেনারেল ওয়াকার উজ জামানকে সাথে নিয়ে (হাসিনার ফুফা জেনারেল মোস্তাফিজের মেয়ে জামাই হলো ওয়াকার) কক্সবাজরের রামু সেনানিবাসে যান অক্টোবরের মাঝামাঝি। সেখানে ১০ম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল মাকসুদ তাদের ব্যাচমেট। বেড়ানোর কথা বলে তিন ব্যাচমেট একত্র হয়ে রামুতে দেশের রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ে নানা কথাবার্তা হয়। রামু থেকে ঘুরে এসে জেনারেল আকবর বৈঠক করেন এনটিএমসি প্রধান ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল আহসানের সাথে। এনটিএমসিতে বসে ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল দেশের গুরুত্বপূর্ন সব টেলিফোন ও অনলাইন যোগাযোগে আড়ি পেতে থাকে, এবং সরকারকে সরবরাহ করে থাকে। এর আগে জিয়া র‌্যাবে ছিলেন ৭ বছর, যেখানে বিরোধী দলের বহু নেতাকর্মী গুম ও খুনে তার সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ আছে। জনদুর্নামের মুখে সেখান থেকে সরিয়ে তাকে প্রথমে ডিজিএফআইতে, পরে এনএসআইতে দেয়া হয়, এবং সর্বশেষে বসানো হয় বর্তমান পদে। জিয়ার অফিস ক্যাপসিটিতে রাজনৈতিক সংক্রান্ড কর্মকান্ড পারমিট না করলেও এখানে বসেই সে কুচক্রি আকবরদের সাথে ঘনিষ্টভাবে কাজ করছে, এবং রাজনৈতিক উস্কানিমূলক কর্মকান্ড চালাচ্ছে।

ব্রিগেডিয়ার জিয়ার সাথে পরামর্শ করার পরে বনানীতে সি ব্লকে ১১ নম্বর রোডের ৯৮ নম্বর বাড়ির নির্দিষ্ট স্থানে মিলিত হয় মেজর জেনারেল আকবর, মেজর জেনারেল ওয়াকার, ব্রিগেডিয়ার শায়েখ, ব্রিগেডিয়ার জিয়া, অবসরপ্রাপ্ত মেজর খন্দকার হাফিজ সহ সার্ভিং এবং রিটায়র্ড অফিসাররা। এখানে দেশের রাজনীতি ও আগামী নির্বাচন নিয়ে গুরুত্বপূর্ন আলোচনা হয়। আগামী ইলেকশনের ফলাফল অা’লীগের কব্জায় নিতে বিভিন্ন খুটিনাটি ও নানা ফন্দি তৈরী করা হয়। আলোচনায় বলা হয়, যেকোনো ভাবে তারা আগামী ১৪ মাস এ সরকারকে টেনে নিয়ে যাবে। তারা মনে করে- we are the government. এক পর্যায়ে বর্তমান সরকারের প্রতি বৈরি (অর্থাৎ বিএনপি-মনা) ১৩৩ জন সামরিক অফিসারকে ঠান্ডা করতে ভয়ভতি, ডিসিপ্লিন, চাকরিচ্যুতি, আটক, গুম সহ নানা পদ্ধতি নিয়ে আলোচনা করা হয়। তখন এক রিটায়ার্ড কর্নেল (১০ লংয়ের) বলেন, তোমরা এত বাড়াবাড়ি করছ কেনো? খেয়াল করো পাকিস্তানের দিকে, কি হইছে সেখানে। স্মরণ করো, জেনারেল লতিফ বা আশরাফ বহুত যন্ত্রণা ভোগ করতে হয়েছিল। এরশাদের অপকর্মের দায় জেনারেল লফিতকে নিতে হইছে- সিভিলিয়ান রগরানি খাইছে প্রচুর। তখন জুনিয়ার এক রিটায়ার্ড মেজর খন্দকার আবদুল হাফিজ (২৬ লং) লাফ দিয়ে উঠে বলে- স্যার, বাংলাদেশ পাকিস্তান না, এখানকার মানুষজন অনেক অনেক সহজ সরল। তাদেরকে একটু বুঝ দিলেই হয়ে যায়। বেগম জিয়াকে ঠান্ডা করতে হবে যেকোনো ভাবেই। বেশি তেড়িবেড়ি করলে বেনজিরের মত বোম মেরে তাকে উড়িয়ে দেয়া হবে! আমি এসএসএফে কাজ করেছি, দুই নেত্রীর সাথে ডিউটি করেছি, তাদের ভিতরকার অবস্থা আমি জানি। এটা কোনো ব্যাপারই না। উল্লেখ্য, এই অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ বর্তমানে টাঙ্গাইল আ’লীগ নেতা, হাকাম ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান, এবং হাজার কোটি টাকার ব্যবসা নিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র, টেলিযোগাযোগ, সোলার পাওয়ার, কনস্ট্রাকশন, গ্যাস, কয়লা, সিকিউরিটি আইটেম, এমনকি মিলিটারীতে ট্যাংকও নাকি সাপ্লাই দিচ্ছে সে।

এনটিসি ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল আহসান বলে ওঠেন, প্রথমে তারা পুলিশ, র‌্যাব, বিজিবি ফেস করুক। তারা ফেল করলেই না আর্মির প্রশ্ন। লাগলে থার্ড/ ফোর্থ পার্টিকে ক্ষমতায় বসাবো ২/১ বছরের জন্য, তারপরে আবার আমরা বসবো। কিন্তু বিএনপিকে কিছুতেই ক্ষমতায় আসতে দেয়া যাবে না।

জেনারেল আকবর বলেন, প্রয়োজনে সহায়ক সরকার বানিয়ে বিএনপিকে নির্বাচনে আনা হবে। ইলেকশন শুরু হওয়ার পরে নমিনেশন প্রত্যাহারের সময় ১৫৪ জন বিএনপি প্রার্থীকে ছুতানাতা দিয়ে অযোগ্য ঘোষণা করা হবে। এটা সিইসিকে চাপ দিয়ে করানো হবে। সে রাজী না হলে দরকারমত সিনহার মত সিইসির মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে এটা করানো হবে। ইতিমধ্যে সিইসির অপকর্মের বহু রেকর্ড রেডি করা হয়েছে। জেনারেল আকবর আরও বলে, আমি জানি কি করে এগুলারে দিয়ে কাজ করাতে হয়। ৫ জানুয়ারির আগে এরশাদও ঐ রকম ত্যাড়াবেকা করেছিল। কিন্তু এক থাপ্পড় খেয়ে যখন উল্টো পরে যায়, এরপরে সব সোজা। সিনহা বাবুও যথেষ্ট পেইন দিয়েছিল। কিন্তু লোডেড গান মাথায় ধরার বাপ বাপ করে সব সই করে দেয়। লাগলে আবারও তাই করবো। অবশ্য জেনারেল আকবরের অপকর্মের বহু রেকর্ড দাদাদের কাছেও আছে। গত ডিসেম্বরে কোলকাতায় আকবরকে জয়া আহসানের সাথে গলাগলি করে গ্রান্ড হোটেল থেকে বের হতে দেখা যায়।

আকবর বাহিনীর এসব তৎরতার খবর হাসিনার নলেজে আছে। তবে, তিনি আকবরদের এমনতরো বাড়াবাড়ি নিয়ে অনুমোদন বা হা না কিছুই বলতে পারছেন না। দু’এক যায়গায় বলেছে, আকবররা ফেল মারলে পরিণতি মারাত্মক হবে। প্রধানমন্ত্রী দেশে না থাকলে বা দেশে অস্থিরতা থাকলে জিওসিরা স্টেশন ত্যাগ করতে পারেন না। আর জরুরী কারনে করলেও সাথে সাথে লোকেশন এবং কন্টাক্ট পয়েন্ট জানাতে হয় সেনাপ্রধানকে। কিন্তু আকবরগং রামুতে গিয়ে সেটা অনুসরন করেনি। এসব বিষয় এবং গোয়েন্দা রিপোর্ট অবহিত হয়ে সেনাপ্রধান জেনারেল বেলাল নির্দেশ দিয়ে মেঃ জেনারেল আকবরকে ঢাকায় ক্লোজ করেন। ঢাকা থেকে সাভারে গিয়ে অফিস করে চলে আসে আকবর। তার সাথে গোয়েন্দা সংস্থার লোকজন। তবে আকবর এমন ন্যাক্কারজনকভাবে কমান্ড হারিয়েছে যে, আগামী কাল যদি কোনো ক্যাপ্টেনকে বলা হয়, যাও আকবরের একটা ঠ্যাং কেটে নিয়ে আসো, তোমার কিস্সু হবে না। তবে সে তাই করবে।

বর্তমানে দেশে একদিকে যখন চলছে রাজনীতিহীনতা, খুনখারাবি, অরাজকতা, তখন সরকারের ভেতরে আসল সরকার কে, তা নিয়ে জনগন বিভ্রান্ত। কখনও ঢাকা পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান দাবী করেন- ‘সরকার আমরা আনছি, এবং টিকায়া রাখছি, আমরাই সরকার’। এদের সাথে একই মত পোষন করেন র‌্যাবের ডিজি বেনজির, ডিএমপির কাউন্টার টেররিজমের মনিরুলের মত বেশ কিছু পুলিশ অফিসার। আবার সচিবালয়ের কিছু সচিব ও কর্মকর্তারা দাবী করেন- এ সরকার তাদের দয়ার দান। এখন জেনারেল আকবর ওয়াকাররাও দাবী করে সরকারের মালিকানা। এতে জনগন বড় কনফিউজড- সরকারের ভিতরে আসল সরকার কে?

Facebook Comments

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.