গৃহবিবাদ থেকে রাষ্ট্রবিবাদে জড়িয়ে পড়েছে শেখ ডাইনেস্টি। বাদপড়া বৃদ্ধরা রেহানাকে নিয়ে ক্ষমতা দখলে আগাচ্ছে । ভারত তৈল সংযোগ দিচ্ছে তাতে । ডাঃ ইকবাল এবং তারিক সিদ্দিকের সাথে যৌন কেলেঙ্কারীর ভিডিও নিয়ে মোকাবেলার জন্য রেডি হাসিনা!

Content Protection by DMCA.com

বিশেষ প্রতিবেদন।।

কথা ছিল, ২০১৮ সালের নির্বাচনের পরে রেহানাকে সাইড দিবে হাসিনা। অনেক তো হলো। কিন্তু রেহানা এবং ভারতের সব লোক বাদ দেয়ার পরে রেহানা বুঝে গেছে হাসিনা তাকে ব্লাফ দিয়েছে। যে কেবিনেট সাজিয়েছে, তা শুধু জয়ের ভবিষ্যতে ল্যান্ডিয়ের জন্য। এতে ভারত আউট হয়েছে, সাথে রেহানা ও তার ছেলে ববিরও কপাল পুড়েছে। যতই মাথা নষ্ট হোক না কেনো, বাবা জয়ের জন্য ক্ষেত্র তৈরি করেছে চার বারের ক্ষমতায় থাকা বড় বোন হাসিনা। প্রয়োজনে বোধে রাজাকারদের পুত্রবধু পুতুল বসবে!

রেহানার সাইডে থাকায় দীর্ঘ তিন বারের মত কেবিনেট থেকে বাদ পড়লো কাজিন শেখ সেলিম। এরপরে আর কোনো ভরসা নাই। তাই সেলিম, আমু, তোফায়েলরা সবাই রেহানাকে নিয়ে সামনে দিকে আগানোর পরিকল্পনা চুড়ান্ত করেছে। ভারতের সাথে কথাবার্তা হয়েছে। তাদের সামনে এর চেয়ে আর কোনো ভালো বিকল্প নাই।

বাইরে যতই দৃশ্যমান গলাগলির নাটক হোক না কেনো, শীঘ্রই হাসিনাকে দলীয়ভাবে চ্যালেঞ্জ করতে যাচ্ছে রেহানা। ভোট কারচুপির দুর্নামের পরে সারা বিশ্বে যখন অবস্থা নাজুক, চীন কানেকশনে ভারত বৈরী- এখনই উপযুক্ত সময় হিট করার। নইলে পরে আর হবে না। এভাবে গৃহবিবাদ থেকে রাষ্ট্র বিবাদে জড়িয়ে পড়েছে শেখ ডাইনেস্টি। হাসিনাও কম যান না। তিনিও খোঁজখবর রাখছেন চারদিকে। মাল মশলা নিয়ে তৈরি হয়ে আছেন। গত ২২ বছর ধরে রেহানার স্বামী শফিক সিদ্দিক প্যারালাইজ্ড হয়ে বসবাস করেন বনানী ১৫ নম্বর রোডে। এই সময়ে রেহানার পুকিপুকি খেলার পার্টনার হলো ডা. ইকবাল, আবুল হোসেন, এবং আপন দেওর তারিক সিদ্দিক। তাদের রঙ্গলীলার বেশ কয়েকটি ভিডিও ক্লিপ ও সচিত্র রেকর্ড নিয়ে বড়’পা তৈরি হয়ে আছেন। সাথে আছে লন্ডনের শত বাড়ি, বিলিয়ন পাউন্ডের ব্যাংক ব্যালেন্স, চাঁদাবাজির হাজার হাজার ডকুমেন্ট। ঝামেলা বাধালেই ফাঁস করে দিয়ে পাবলিক নুইসেন্সের সম্মুখীন করা হবে রেহানাকে।

খবরের সূত্র শফিক সিদ্দিকী।

Content Protection by DMCA.com

আ’লীগকে নির্বাচনের খর্চা ৫০০০ কোটি টাকা দিয়েছে চীন । ক্ষুব্ধ ভারত । মার্কিনীদের সাথে একাট্টা । আসছে জাতীয় সরকার।

Content Protection by DMCA.com

বাংলাদেশে আবার জাতীয় সরকার  নিয়ে কাজ শুরু হয়েছে। এবার নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এবং ভারত।

জানা গেছে, ৩০ ডিসেম্বরে নির্বাচনে ভারতের উপর নির্ভর করতে পারেনি হাসিনা। তাই চীনের দ্বারস্থ হয়ে তাদের কাছে নির্বাচনের খর্চা বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার ফান্ড এনেছে এবং এই টাকা দিয়েই পুলিশ ও গুরুত্বপূর্ণ লোকদের মাথা কিনে নির্বাচন পার করেছে হাসিনা। তবে বিপদ অন্যখানে- এমন ভাবে সব সিট ও ভোট কেটে নেয়া হয়েছে, যা দেশে বিদেশে কারও কাছে বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না। আর তাই দেশে বিদেশে কথা উঠেছে আরেকটি নির্বাচন করতে হবে, যা হবে সুষ্ঠু।

নির্বাচনের আগে থেকেই আওয়ামীলীগের বেশ কয়েকটি প্রতিনিধি দল ভারত ঘুরে এসেও ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোদির নিশ্চয়তা হাসিল করতে পারেনি। এমনকি নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার মাস খানেক আগে শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের কথা থাকলেও মোদির ক্লিয়ারেন্স না পাওয়ায় শেখ হাসিনা সফর বাতিল করেন। এর বিপরীতে সৌদি আরবে সফরের মধ্যে চীনের সাথে গুরুত্বপূর্ন আলোচনা ও সমঝোতা সেরে ফেলেন হাসিনা। বিষয়টি ভারতের জানা থাকলেও তারা ততটা বিপদ মনে করে নি তখন।

তবে বিপদের বহিঃপ্রকাশ ঘটে বাংলাদেশের নির্বাচনের দিন রাতে, অর্থাৎ ৩০ ডিসেম্বর। ভোট ডাকাতি ও কারচুপির প্রতিবাদে প্রায় সকল বিরোধী দলের নির্বাচন বয়কটের মুখে ফলাফল ঘোষণা হতে থাকলে দিল্লি থেকে নরেন্দ্র মোদি ফোন করে শেখ হাসিনাকে বিজয়ের জন্য অভিনন্দন জানান। এর তিন ঘন্টা পরে চীনের প্রধানমন্ত্রী এবং প্রেসিডেন্ট উভয়ে শেখ হাসিনার কাছে অভিনন্দন বার্তা পাঠান। এরপরে সোমবার সকালেই নৌকা, ফুল, এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের পত্র নিয়ে গণভবনে পৌছে যান চীনের রাষ্ট্রদূত! ভারত এই প্রথম লক্ষ করে- এ যে রীতিমত বাড়বাড়ি। সন্দিগ্ন হয়ে ওঠেন ভারতীয় হাইকমিশনার হর্বষর্ধন শ্রিংলা।

পরবর্তী ৩/৪ দিনে সরকার গঠনের প্রকৃয়া চলতে থাকে। ভারতীয় হাইকমিশনার আ’লীগের বিভিন্ন কর্নারে যোগাযোগ করে হতাশা বাড়তে থাকে। ৬ জানুয়ারী নতুন কেবিনেট ঘোষণা করা হলে নয়াদিল্লি আকাশ থেকে জমিনে নয়, সোজা ভূতলে পড়ে! পুরোনো কেবিনেটের ৩৬ জন সদস্য আউট। ডজনখানেক সিনিয়র মন্ত্রী বাদ পড়ে, এতকাল যাদের মাধ্যমে দিল্লির স্বার্থ উদ্ধার হতো, এদের কেউ নাই। হাইকমিশনার শ্রিংলার কাছে অনেকেই ধর্ণা দেন। কিন্তু তিনি আ’লীগের হাইকমান্ডে যোগাযোগ করে প্রচন্ড ধাক্কা খান। তাকে বলা হয়েছে চুপ থাকতে। কে মন্ত্রী হবেন, কি হবেন না, তা আ’লীগের নিজস্ব বিষয়;  এবং শেখ হাসিনা নিজেই দেখছেন। এ নিয়ে কোনো দেশের পরামর্শের দরকার নাই। প্রমাদ গুনেন শ্রিংলা!

ধীরে ধীরে দিল্লি বুঝতে পারে, শেখ হাসিনা বিক্রি হয়ে গেছে। চীন তাকে কিনে নিয়েছে অতি উচ্চমূল্যে। তবে ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। পরের দিন ৭ জানুয়ারী বঙ্গভবনে সরকারের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলেন হাইকমিশনার শ্রিংলা। অন্যদিকে বঙ্গভবনে সদলবলে উপস্থিত হন চীনা রাষ্ট্রদূত জ্যাং জু। শপথের পরেই তিনি দেখা করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে, এবং টেলিফোনে কথা বলিয়ে দেন চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াংয়ের সাথে। খবরে বলা হয়, চতুর্থবারের মতো ও টানা তৃতীয়বার দেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন চীনের প্রধানমন্ত্রী।

জানা গেছে, নির্বাচনের পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রথম বিদেশ সফরে যাবেন ভারতে নয়, যাবেন চীন।

সবকিছু পূর্নমূল্যায়ন করতে থাকে ভারত। হাইকমিশনার শ্রিংলা বিস্তারিত লিখে জানান তার হেডকোয়ার্টার্সে। কথা বলেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত সহ অন্যান্য বন্ধু রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের সাথে।

এরি মধ্যে নির্বাচন বর্জন করা দলগুলো অভিযোগের পাহাড় তৈরি করে তা জানাতে থাকে সর্বত্র। বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে আ’লীগের ভোট জালিয়তি ও কারচুপির খবর। জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য সহ সকল পশ্চিমা রাষ্ট্র বাংলাদেশের কারচুপিময় নির্বাচন নিয়ে একের পর এক আপত্তি তুলতে থাকে। বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত দাবী করে। বিব্রত হয় নতুন সরকার।

লক্ষনীয়, ৭ জানুয়ারি শেখ হাসিনার চতুর্থবারের মত প্রধানমন্ত্রীর শপথ নেয়ার পরে পরম মিত্র প্রতিবেশী ভারত থেকে কোনো অভিনন্দন বার্তা আসেনি। বরং এসেছে চীন এবং তাদের মিত্রদের থেকে। বিষয়টা একেবারেই হেলাফেলার মত নয়। বাংলাদেশ নিয়ে চীনের অগ্রসরতা দেখে ভারত বসে থাকবে না। তারা অবশ্যই তাদের নিজেদের নিরাপত্তায় যা প্রয়োজন, তাই করবে।

বাংলাদেশের স্বীকৃতিহীন কারচুপিময় নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমাদের নানাবিধ তৎপরতার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন মহলে হঠাৎ কথা উঠেছে- আচিরেই জাতীয় সরকার আসছে। আর তারা থাকবে ৩/৪ বছর। দেশের সবকিছু ঠিক করে নির্বাচন দিবে তারা।

Content Protection by DMCA.com

নির্বাচনের পরে সম্পর্কের নতুন ভারসাম্য

Content Protection by DMCA.com

Content Protection by DMCA.com

বিরোধীদের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলের কঠিন চাপের মুখে সরকার

Content Protection by DMCA.com
বিরোধীদের অভিযোগে আন্তর্জাতিক মহলের কঠিন চাপের মুখে সরকার৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপি হয়েছে বলে বিরোধীদের এমন অভিযোগে আন্তর্জাতিকভাবে বড় ধরনের চাপের মুখে রয়েছে সরকার। আর এ কারণেই সরকারের ভেরতে এক ধরনের অস্থিরতা কাজ করছে বলে জানা যাচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, নির্বাচনের পর দেশের প্রধান বিরোধী শক্তি ঐক্যফ্রন্ট ও বিএনপি পৃথকভাবে জাতিসংঘ, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ওআইসিসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাকে লিখিতভাবে ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়েছে।

পৃথক চিঠিতে তারা, নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে ব্যাপক অনিয়ম-কারচুপির মাধ্যমে সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার হরণের চিত্র তুলে ধরেছেন।

এছাড়া নির্বাচনের পর ৬ জানুয়ারি বিকেলে রাজধানীর হোটেল আমারি-তে বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। ওই বৈঠকে নির্বাচন সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন, অভিজ্ঞতা এবং অভিযোগের খুটিনাটি তুলে ধরেন নেতারা। ওই বৈঠকে পশ্চিমা কূটনীতিকরাও কোনো কোনো বিষয়ে একমত পোষণ করেন।

কূটনীতিক সূত্রগুলো এমন পরিস্থিতিতে ঢাকাস্থ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরাও ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক পরিস্থিতি জানিয়ে নিজ নিজ দেশের সরকারকে বার্তা পাঠিয়েছে। তাতে নির্বাচনে অস্বচ্ছতা ও জনমতের প্রতিফলন হয়নি বলেই জানানো হয়েছে।

এছাড়া একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহিংসতার ঘটনায় হতাহত হওয়া, বলপ্রয়োগসহ আচরণবিধি লঙ্ঘণের অভিযোগ উত্থাপনের ফলে নির্বাচন ও তার ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত হওয়ায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ লঙ্ঘনের যে সব অভিযোগ গণমাধ্যমসূত্রে জানা গেছে তার বিচার বিভাগীয় তদন্ত দাবি করেছে সংস্থাটি।

এক বিবৃতিতে টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সহিংসতা ও বলপ্রয়োগসহ নির্বাচনী আচরণবিধির বহুমুখী লঙ্ঘনের যেসব অভিযোগের কারণে নির্বাচন ও তার ফলাফল প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে, তার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের ওপর ভিত্তি করে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

তিনি বলেন, আমরা শুরু থেকেই সব পক্ষের জন্য সমান প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র নিশ্চিত করার দাবি জানিয়ে এসেছি। কিন্তু দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে একটি প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের প্রার্থী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলা, হামলা ও নির্যাতনের সংবাদ প্রচারিত হয়েছে, যা গণতন্ত্রের জন্য অশনিসংকেত। এমনকি নির্বাচনের আগের রাতে এবং নির্বাচনের দিনও এমন হয়রানি চলেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। সবচেয়ে বড় আশংকার বিষয় হলো, এতে করে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি দেশের জনগণের আস্থাহীনতা সৃষ্টির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

ড. জামান বলেন, একটি জোটের পোলিং এজেন্টরা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভোটকেন্দ্রে আসতে না পারার অভিযোগের বিষয়টি যেভাবে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এড়িয়ে যেতে চেয়েছেন তা একদিকে যেমন বিব্রতকর, অন্যদিকে তার নেতৃত্বাধীন নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক দায়িত্ব কার্যকরভাবে পালন করতে পেরেছে কিনা সে উদ্বেগ আরো ঘনীভূত করেছে।

ড. জামান বলেন, গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ লঙ্ঘন করে মধ্যাহ্ন ভোজের বিরতির নামে ভোট গ্রহণ বন্ধ রাখার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে খোদ রাজধানীতেই। জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে যেভাবে সচিত্র প্রতিবেদন আকারে এই খবর প্রকাশিত হয়েছে তাকে অপপ্রচার বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এছাড়াও ভোট গ্রহণ শুরু হওয়ার আগেই ব্যালট পেপার ভর্তি বাক্স নিয়ে বেরিয়ে যাওয়া, বহু ভোটার ভোট দেওয়ার আগেই ব্যালট পেপার শেষ হয়ে যাওয়া, প্রার্থীকে ভোট কেন্দ্রে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা ইত্যাদি ঘটনার প্রতিটির সুষ্ঠু তদন্ত হওয়া অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করে টিআইবি।

ড. জামান বলছেন, নির্বাচন কমিশন কর্তৃক তদন্ত করে এসব ক্ষেত্রে তাদের ব্যর্থতা নিরূপণ করা এবং তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা অপরিহার্য। অন্যদিকে নির্বাচন কমিশনকে নিয়ে আস্থার সংকটের প্রেক্ষিতে কমিশনের গৃহিত পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের প্রতি আমাদের জোরালো আহ্বান থাকবে, এসব অভিযোগ আমলে নিয়ে বিচার বিভাগীয় তদন্তের উদ্যোগ নিন।

যে অভূতপূর্ব নির্বাচনের মাধ্যমে সৃষ্ট অভূতপূর্ব ফলাফলের উপর ভিত্তি করে নতুন সরকার গঠিত হচ্ছে তার আত্মবিশ্বাস, মর্যাদা, আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা নিশ্চিত করার স্বার্থেই এই তদন্ত অবশ্যকরণীয় বলে মন্তব্য করেন টিআইবি’র নির্বাহী পরিচালক।

এতে বিশ্বের প্রভাবশালী সংস্থা ও রাষ্ট্রগুলোও বিষয়টি বেশ শক্তভাবেই আমলে নিয়েছে। ফলে এর প্রভাবও কিছুটা দৃশ্যমান হয়েছে।

সরকারের উচ্চ পর্যায়ের ব্যক্তিদের কথাবার্তার সেটার কিছুটা প্রমাণ মিলছে। ১১ জানুয়ারী একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশ স্বীকৃতি দিলেও ঐক্যফ্রন্ট নানা অজুহাত তুলে নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার অপচেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের চৌধুরী।

তিনি আরো বলেন, ঐক্যফ্রন্ট যতই ষড়যন্ত্র করুক তা জনগণ মেনে নেবে না।

ওবায়দুল কাদের বলেন, আমাদের বিজয় এবং নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য দেশে-বিদেশে ষড়যন্ত্র চলছে। কাজেই আমাদেরকে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

এদিকে ভারত, রাশিয়া ও চীনসহ গুটি কয়েকটি রাষ্ট্র নবগঠিত সরকারকে অভিনন্দন জানালেও ইউরোপ-আমেরিকা বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।

যার ফলে বিপুল বিজয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলেও চরম অস্বস্তিতে রয়েছে সরকার। এ নিয়ে সরকারে চরম অস্বস্থি বিরাজ করছে। তবে এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসতে সরকার তৎপরতা শুরু করেছে বলে জানা যাচ্ছে।

এরই অংশ হিসেবে রাজনৈতিক আলোচনার জন্য ওয়াশিংটন যাচ্ছেন পররাষ্ট্র সচিব এম শহীদুল হক। ২২ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের রাজনৈতিক বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি ডেভিড হ্যালের সঙ্গে তার বৈঠক হবে।

সাম্প্রতিক জাতীয় সংসদ নির্বাচন, রোহিঙ্গা ইস্যু, অর্থনৈতিক ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি নিয়ে মূলত এই আলোচনা হবে বলে জানা গেছে। ওয়াশিংটনে যাওয়ার আগে পররাষ্ট্র সচিব অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কনফারেন্সের (ওআইসি) সিনিয়র অফিসিয়াল মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার জন্য সৌদি আরব যাবেন।

সরকারের একজন কর্মকতা বলেন, ‘নতুন সরকার গঠন হয়ে গেছে এবং আমরা যুক্তরাষ্ট্রসহ সব অংশীদারদের সঙ্গে কথা বলবো।’গত ২ জানুয়ারি, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত আর্ল রবার্ট মিলারের সঙ্গে সফরের বিষয়ে আলোচনা করেন পররাষ্ট্র সচিব।

এদিকে সহিংসতা আর ব্যাপক কারচুপির কারণে ৩০ ডিসেম্বরের একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে সন্তোষ্ট নয় কেউই। সরকার নিয়ন্ত্রিত এ নির্বাচনে দেশে এবং দেশের বাইরে সমালোচনা আর নিন্দার ঝড় বইছে। কারচুপির অভিযোগের স্বচ্ছ তদন্ত এবং সব পক্ষকে নিয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের তাগাদা দেয়া হয়েছে সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষকে। নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে বলে মুখে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকার ব্যাপক প্রচার করলেও এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব।

সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনায় উদ্বেগ এবং কারচুপির সুষ্ঠু তদন্তের তাগাদা দিয়ে ইতিমধ্যে বিবৃতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাতিসংঘ।

বাংলাদেশ নির্বাচন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে কড়া বার্তা পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য এবং ইউরোপীয় ইউনিয়ন।

নির্বাচন নিয়ে সরকারকে ‘স্বাগত’ না জানিয়ে তারা বরং অনিয়ম, কারচুপি এবং সহিংসতার ঘটনাগুলো বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত করার আহবান জানিয়েছেন। একইসঙ্গে গণতন্ত্রের সংকট সমাধানে সবপক্ষকে এক হয়ে পন্থা খুঁজে বের করার তাগাদাও উঠে এসেছে বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়ন অংশীদার দেশ এবং সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব শক্ত ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন এবং অবস্থান তোলে ধরেছেন তাতে নিজের ভাবমূর্তি নিয়ে বেকায়দায় পড়তে পারেন শেখ হাসিনা সরকার। বুধবার যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী গণমাধ্যম রয়টার্স তাদের এক প্রতিবদনে এমন অভিমত তোলে ধরেছে।

‘ওয়েস্টার্ণ পাওয়ার কলস ফর প্রোব ইনটু বাংলাদেশ ইলেকশন ইরেগুলারিটিস, ভায়োলেন্স’ শিরোনামের এই প্রতিবেদনের শুরুতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ঘটে যাওয়া সহিংসতার ঘটনার নিন্দা জানিয়েছে পশ্চিমাবিশ্ব। যে নির্বাচনে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন জোট ৯০ শতাংশের বেশী আসনে জয়ী হয়েছে সে ভোটে সংগঠিত কারচুপির অভিযোগগুলো নিয়েও সবিস্তারে কথা বলেছে পশ্চিমাদেশগুলো।

নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমাবিশ্ব কড়া ভাষায় তাদের যে মূল্যায়ন তোলে ধরেছেন সেটি শেখ হাসিনার ভাবমূর্তির ক্ষতির কারণ হতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাপক কারচুপি আর ভোটারদের আতংকিত করে নির্বাচন করা হয়েছে অভিযোগ এনে এর ফলাফল প্রত্যাখান করেছে শেখ হাসিনার বিরোধী সকল রাজনৈতিক দল। তবে অনিয়ম হয়নি বলে দাবি করেছেন শেখ হাসিনা। তার ভাষ্যমতে ভোট ছিলো শান্তিপূর্ণ, আর তাতে উৎসব মুখর পরিবেশে অংশ নিয়েছেন তার সমর্থকরা।

দেশে চলমান পরিস্থিতির দিকে ইংগিত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, মঙ্গলবারের ঢাকার পরিস্থিতিটা ছিলো চুপচাপ। তবে প্রধান বিরোধীদল বিএনপি বলছে, দেশের বিভিন্ন জায়গায় আওয়ামী লীগের কর্মীদের হামলার শিকার হচ্ছেন বিএনপির নেতা-কর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগ এ অভিযোগ নাকচ করে দিয়েছে।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদরে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছে, নির্বাচনের দিনে ব্যাপক সহিংসতা ঘটেছে, পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াজুড়ে ছিলো লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের ঘাটতি। এসকল প্রতিবন্ধকতার কারণেই নির্বাচনের প্রচার এবং ভোটদান প্রক্রিয়া কলুষিত হয়েছে।”

নির্বাচনে অনুষ্ঠিত কারচুপির অভিযোগসমূহের একটি যথার্থ তদন্ত করার আহবান জানিয়েছে সংস্থাটি।

বিদেশে বাংলাদেশের সবচাইতে বড় বিনিয়োগকারী দেশ যুক্তরাষ্ট্রও এ নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। এক বিবৃতিতে দেশটি জানিয়েছে, হয়রানি, ভীতিকর পরিস্থিতি এবং সহিংস কর্মকান্ডের জন্যই নির্বাচন পূর্ববর্তী সময়ে বিরোধী দলের প্রার্থী এবং সমর্থকেরা স্বাধীনভাবে তাদের সভা-সমাবেশ করতে পারেনি, কোনো প্রচারণা চালাতে পারেনি। এঘটনাগুলোর স্বপক্ষে বিশ্বাসযোগ্য তথ্য রয়েছে, আর তাতে উদ্বিগ্ন যুক্তরাষ্ট্র।

ভোটে বাধা দেবার বিষয়টিতে অসন্তোষ জানিয়ে দেশটি বলেছে, ভোটের দিনে সংগঠিত অনিয়মগুলোর কারণে অনেক ভোটার ভোট দিতে পারেননি। এ বিষয়টিতে আমরা উদ্বেগ প্রকাশ করছি।কারচুপির এসব বিষয় নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

পশ্চিমা বিশ্বের এ ধরনের বক্তব্যে সরকারকে কিছুটা শঙ্কিতও করেছে বটে। কেননা, পশ্চিমাবিশ্বকে এড়িয়ে চলার মতো সক্ষমতা এখনো বাংলাদেশের হয়নি। তথা গ্লোবাল ভিলেজের যুগে বিশ্বের প্রভাবশালী একটা বড় অংশকে এড়িয়ে চলা কোনো দেশের জন্য শুভকর নয়। কেননা, শুধু অর্থনৈতিক সম্পর্ক নয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গে সন্ত্রাসবাদবিরোধী উদ্যোগে রয়েছে বাংলাদেশের।

ফলে এ মুহূর্তে পশ্চিমা বিশ্বের মান-অভিমান ও অভিযোগকে এড়িয়ে চলার সুযোগ নেই সরকারের। ফলে নিয়ে সরকার অনেটাই অস্বস্থিতে ভুগছে।

আর এ অস্বস্থি আরো বাড়িয়ে দিয়ে ঐক্যফ্রন্টের গঠনমূলক রাজনীতি, বক্তব্য ও বিবৃতি। এবারের নির্বাচনের আগে-পরের ঐক্যফ্রন্টের ভূমিকা ছিল খুবই ইতিবাচক। তারা অন্যদের উস্কে দেয়া কোনো সহিংস পথে না গিয়ে শান্তিপূর্ণ উপায়ে বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছে।

৬ জানুয়ারি বিকেলে রাজধানীর হোটেল আমারি-তে বিদেশি কূটনীতিকদের সাথে বৈঠক করেন ঐক্যফ্রন্টের নেতারা। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের পর কূটনীতিকদের সাথে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের এটিই প্রথম আনুষ্ঠানিক বৈঠক। এই বৈঠকে নির্বাচন সম্পর্কে নিজেদের মূল্যায়ন, অভিজ্ঞতা এবং অভিযোগের খুটিনাটি তুলে ধরা হয়েছে।

ড. কামাল হোসেন বলেছেন, আমরা তাদের কাছে নির্বাচনের কিছু ডকুমেন্ট দিয়েছে যে নির্বাচনের আগের দিন ও পরের দিন কী হয়েছে। সেই সঙ্গে ডকুমেন্ট অনুসারে আমরা তাদের একটা পেনড্রাইভ দিয়েছি, যাতে তারা দেখতে পারেন নির্বাচনের আগের এবং পরের দিন কী হয়েছিল।

কামাল হোসেন বৈঠকের ব্যাপারেে আরো বলেন, ‘যারা এসেছিল তারা বন্ধুরাষ্ট্রের। তারা আমাদের বন্ধু, জনগণের বন্ধু এবং সরকারেরও বন্ধু। আমরা নির্বাচনের অনিয়মের বিষয়গুলো তাদের কাছে তুলে ধরেছি। তারা এ নিয়ে কোনো বিতর্ক করেনি। আমরা যা দেখেছি, তারাও তাই দেখেছে। তারা আমাদের কথা শুনেছেন এবং বলেছেন—গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাক তারাও সেটা চান। তারাও চান এদেশের মানুষ স্বস্তিতে, শান্তিতে থাক।’

একাদশ জাতীয় নির্বাচন নিয়ে ড. কামাল হোসেন বলেন, ‘একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ভালো হয়নি জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নেতাদের এমন অভিযোগের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেননি ঢাকায় নিযুক্ত বিদেশি কূটনীতিকরা। যা হবার হয়ে গেছে, এখন একটা সুষ্ঠু নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হোক। সরকারকে চাপ দিয়ে নয়, যুক্তি দিয়ে বোঝাক তারা’।

বিরোধীদের এসব অভিযোগ আর পশ্চিমাবিশ্বের ভূমিকাসহ সবমিলেই সরকারের এক ধরনের অস্বস্তি কাজ করছে। এ অবস্থা থেকে বের হতে সরকারের কূটনীতিক পর্যায়ে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। পশ্চিমাবিশ্বের প্রভাবশালী টেকহোল্ডারদের সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে সরকার নতুন কোনো উদ্যোগ গ্রহণের ব্যাপারটিও ভাবছে।

অবশ্য নির্বাচনের পরের দিন নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ বিষয়ে বিদেশি সাংবাদিক ও পর্যবেক্ষকদের এক প্রশ্নের জবাবে শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘ভোটে কোনো কারচুপি হয়নি। কেউই যদি প্রমাণ করতে পারে কারচুপি হয়েছে। তাহলে পুনরায় ভোট হতে তো আমাদের আপত্তি নেই।’

/আরটিএনএন

Content Protection by DMCA.com

‘সেনাবাহিনীর ব্যর্থ ভূমিকা জাতিসংঘ, সদস্য রাষ্ট্রে প্রশ্নবিদ্ধ’ : নির্বাচনের ফলাফল চুরি, সরকার অবৈধ: উইলিয়াম বি মাইলাম

Content Protection by DMCA.com

নির্বাচনের ফলাফল চুরি, সরকার অবৈধ: উইলিয়াম বি মাইলাম

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ইতিহাসের নিকৃষ্ট নির্বাচন হল বাংলাদেশের ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচন। আসল কথা হলো ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী ‘নির্বাচনের ফলাফল চুরি করেছে’, আর যারা নিজেদের সরকার দাবি করছে তারা ‘অবৈধ’।

বাংলাদেশে সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন, ভঙ্গুর গণতন্ত্র, শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন সরকারের ক্রমবর্ধমান স্বৈরাচারিতাসহ বিভিন্ন ইস্যু নিয়ে লেখা এক বিশেষ নিবন্ধে এমন অভিমত ব্যক্ত করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা উইলসন সেন্টারের সিনিয়র স্কলার, রাষ্ট্রদূত উইলিয়াম বি মাইলাম।

দ্য ফ্রাইডে টাইমস শুক্রবার তাঁর এ লেখাটি প্রকাশ করেছে। জাস্ট নিউজের সৌজণ্যে বাংলায় অনুবাদ করে লেখাটি প্রকাশ করা হলো-

নির্বাচনে সেনাবাহিনী তার নিরপেক্ষ এবং কার্যকর ভূমিকা পালনে ব্যর্থ হয়েছে বলে নিবন্ধে কড়া সমালোচনা করেছেন ঢাকায় নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রদূত মাইলাম। স্বৈরশাসনের বিপক্ষে এমন নিশ্চুপ থাকা এবং সদ্য সমাপ্ত ভোটে নূন্যতম কার্যকর ভূমিকা পালনে সেনাবাহিনীর যে ব্যর্থতা দেখা গেছে তাতে বিশ্ব শান্তি রক্ষা মিশনে বাহিনীর উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং প্রশ্নের তৈরি হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচনের ফলাফল চুরি করতে শেখ হাসিনা এবং তার দল আওয়ামী লীগ সব ধরনের নোংরা কৌশলের প্রয়োগ করেছেন উল্লেখ করে মাইলাম বলেন, “বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনোভাবেই সম্ভব না-২০১১ সাল থেকেই বিদেশি পর্যবেক্ষকরা এ ধারণা পোষণ করে আসছিলেন। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগও প্রকৃতপক্ষে তা প্রমাণসহ দেখিয়ে দিল। বিরোধীদলগুলোর উপর যতো রকমের সন্ত্রাস চালানো যায় তার সব কায়দা প্রয়োগ করেই ৩০ ডিসেম্বরের ভোট হয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙ্গার পর পৃথিবীর গণতান্ত্রিক ইতিহাসের নিকৃষ্ট নির্বাচন হল বাংলাদেশের সদ্য সমাপ্ত নির্বাচন। ভোট চুরির সব নোংরা কৌশল প্রয়োগ করে শেখ হাসিনা এবং তার দল ৯৭ দশমিক ৬৬ শতাংশ ফলাফল নিজের দলের জন্য ভাগিয়ে নিয়েছে। ”

জাতীয় নির্বাচনের ভোটের চিত্র তোলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়, “বিরোধীদলের প্রার্থীরা যেনো তাদের আসনগুলোতে কোনো রকমের প্রচার-প্রচারণা না চালায়, বাইরে না যায়, সে জন্য হুমকি আর ভয় দেখানো হয়েছিলো। মিথ্যা মামলায় অনেককে আটক করা হয়েছে। অনেকের নামে পূর্বেই আদালতে প্রহসনের মামলা দায়ের করা ছিলো। কিছু সংখ্যক মানুষকে গুম করা হয়েছে, নিহত হয়েছে ২ জন। নির্বাচনের বিরোধীদলের প্রাণশক্তি পোলিং এজেন্টদেরকে ভোট কেন্দ্রে না যাবার জন্য প্রাণনাশের হুমকি পর্যন্ত দেয়া হয়েছে। আর এ ভয়েই অনেকে ভোট কেন্দ্রে যাবার সাহস করেনি। ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি দেয়া হয়েছে ভোটারদেরকেও। গ্রামে মহিলা ভোটারদেরকে ভোট না দিতে ভয় দেখিয়েছে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা। আর যারা ভোট দিতে যাবার সাহস দেখিয়েছে তাদেরকে হুমকি দিয়ে কিংবা পুলিশ দিয়ে বাধা দেয়া হয়েছে। আর কেন্দ্রের ভিতরে আওয়ামী লীগের দলীয় লোকজন নিজেরাই ব্যালট বক্স ভর্তি করেছে। দ্য ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে দেখা গেছে ২৫ টি ভোট কেন্দ্রে তড়িত গতিতে ভোট গ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে, আর তাতে ভোটার টার্ন আউট ছিলো শতভাগ (যেটা বাস্তবিক পক্ষে বিরল)। ভোটের সবগুলোর ফল এসেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর পক্ষে। আমার এক বন্ধু জানিয়েছে- সে যে ভোট কেন্দ্রে গিয়েছিলো তার সবগুলো ভোট কাস্ট করা হয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষে।”

ভোটের ফল “অস্বাভাবিক” এবং এমনকি তা আওয়ামী সমর্থকরাও বিশ্বাস করবেনা মন্তব্য করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রবীণ এই কূটনীতিক লিখেছেন, “আওয়ামী লীগ সরকার কী ধরনের আতংক আর সহিংস পরিবেশ তৈরি করেছিলো তা লিখতে গেলে পুরো নিবন্ধেও শেষ করা যাবেনা। অস্বাভাবিক সংখ্যাগরিষ্ঠতার একটি ভোটের ফলাফল দেখাতে সব শক্তি ব্যয় করা হয়েছে। পুলিশকে এবং তাদের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগকে এ কাজে ব্যবহার করা হয়েছে। এ ছাত্রসংগঠনটিকে একনায়ক হিটলারের বাংলাদেশ ভার্সন অব “ফ্যাসিস্ট ব্রাউনশার্টস” বাহিনী বলা যায়। আমি যেটা বলি সেটা হলো-এরকম নির্বাচনের ফল বাংলাদেশের কোনো মানুষই বিশ্বাস করবেনা। এমনকি আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও না। অধিকাংশ আওয়ামী লীগের সমর্থকরাও এ ভোটের ফলকে অতিরঞ্জন মনে করে যদিও তারা মুখ ফুটে এ কথা বলার সাহস পাবেনা। অনেকেই কিছু জরিপ করে দেখিয়েছেন যে অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আওয়ামী লীগ জয় পেত। কিন্তু জনমত পুরোই ক্ষুব্ধ আর জরিপের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্ন থেকে যায়। কারণ বাংলাদেশের অনেক মানুষই নিজের রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ করতে ভয় পায়। এর ফলে সে চিহ্নিত হয়ে যাবে এমন আশংকায় থাকে। স্পষ্টত এভাবেই পুনর্নির্বাচিত হতে শেখ হাসিনা সব অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছে। কারচুপি করে বড় জয় দেখিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আসলে কি বুঝাতে চেয়েছেন সেটা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে এবং তা অস্পষ্ট। মিথ্যাকে আশ্রিত করে তিনি জয় দিয়ে দৃষ্টি কাড়তে চাচ্ছেন বলে মনে হচ্ছে। আর নতুন একটি নির্বাচন নিয়ে যে জোর দাবি উঠেছে সেদিকেও মনযোগ দেখা যাচ্ছেনা।”

তিনি লিখেছেন, “যারা নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করছিলেন তারা জানতেন, নির্বাচন কয়েক সপ্তাহ পূর্বে, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে এবং নির্বাচনের দিন আওয়ামী লীগ যে পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে তা ছিলো দল জেতানোর পরিকল্পনা। তাই পর্যবেক্ষকরা হতবাক হননি। এটাও প্রচলিত ছিলো যে, আওয়ামী লীগ কী করবে তা ছক করে রেখেছে। তবে সেনাবাহিনী নির্বাচনে কেমন ভূমিকা রাখবে সেটা নিয়ে কারো আগাম ধারণা ছিলোনা। আমার ধারণা, নির্ধারিত সময়েরও দুই সপ্তাহ পর মাঠে সেনাবাহিনী নামিয়েছে নির্বাচন কমিশন। আমাদের এখনো যাদের স্মৃতি উজ্জ্বল আছে তাদের মনে আছে অতীতে গণতন্ত্রের জন্য সেনাবাহিনীর ভূমিকা ছিলো আশাব্যাঞ্জক। ধারণা করেছিলাম তারা ভোটারদের ভোটাধিকার প্রয়োগ নিশ্চিত করবে এবং নির্ভুল গণনায় সহায়তা করবে।”

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে সেনাবাহিনীর ভূমিকায় হতাশা প্রকাশ করে মাইলাম লিখেছেন, “আমিসহ আমরা যারা সেনাবাহিনীকে নিয়ে আশা করেছিলাম এবারও ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটবে তারা গভীরভাবে হতাশ হয়েছি। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিতো দূরের কথা বরং তার কোনো আওয়াজও পর্যন্ত কানে বাজেনি। ১৯৯০ সাল থেকে স্বৈরশাসক হটিয়ে, ভোটে বাধা দেওয়া বন্ধ করে, ব্যালট ছিনতাই-ভোটচুরি বন্ধ করে যেভাবে ভোটারদের পাশে সেনাবাহিনী দাঁড়িয়েছিলো, যে বীরোচিত আসন তৈরি করে নিয়েছিলো তা থেকে স্পষ্টতই পিছু হটেছে। সেনাবাহিনী স্বৈরতান্ত্রিক শাসনের সঙ্গে নিজেদের জড়িয়ে নিয়েছে কী না সেটা নিয়ে সন্দেহ জেগেছে। যারা নিজ দেশে নির্বাচন পর্যবেক্ষণের সাধারণ কাজটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে পারেনা তারা কীভাবে অন্য দেশে শান্তি রক্ষায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করবে সেটা নিয়ে জাতিসংঘ এবং তার সদস্য দেশগুলোর মধ্যে একটা প্রশ্ন তৈরি হতেই পারে। এটা নিয়ে সমাধানের কথা ভাবতে হবে সদস্য দেশগুলোকে কারণ শান্তি মিশনের অংশ হিসেবেই বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে ভূমিকা পালনের দায়িত্ব দেখভাল করতে হয়। ”

২০১৪ সালের একতরফা নির্বাচনের প্রসঙ্গ তোলে মাইলাম বলেন, “আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু হবেনা অভিযোগ তোলে ২০১৪ সালের নির্বাচন বয়কট করেছিলো প্রধান বিরোধীদল বিএনপি। আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের সংবিধানের ধারাটি বাতিল করে দেয়। ১৯৯১ সাল থেকে এই সংবিধানের ধারা অনুসারেই প্রতি পাঁচ বছর অন্তর প্রধান দুটি দল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আসছিলো। শাসন যাই হোক ভোটাররা পালাবদল করে প্রতি নির্বাচনে তাদের ভোটাধিকারের সুযোগ পেয়েছিলো।”

তিনি বলেন, “কোনো বিরোধী দল ছাড়াই আওয়ামী লীগ ২০১৪ সালে একদলের শাসন কায়েম করে। এরপরই যুক্তি উঠে এ সরকার অবৈধ, নিরপেক্ষ কমিশনের অধীনে আরেকটি নতুন নির্বাচনের আয়োজন করা যেতে পারে। বিএনপি নির্বাচন বয়কট না করলে সরকার জয়ের কোনো সুযোগ পেতোনা এরকম কথাও শুনা যায়।”

বিরোধীপক্ষ দুর্বল করতে সরকার তার দমন অব্যাহত রেখেছে উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়, “২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত বিরোধীপক্ষ বিএনপিকে দুর্বল এবং প্রতিবাদের শক্তিহীন বানাতে আওয়ামী লীগ নিপীড়ন চালিয়ে যাচ্ছে। এখন যেটা দেখা যাচ্ছে সেটা হলো নির্বাচনে হারার পরও তার পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে হিমশিম খাচ্ছে বাংলাদেশের বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।”

শেখ হাসিনা স্বৈরতন্ত্র আঁকড়ে ধরেছেন মন্তব্য করে সাবেক এই রাষ্ট্রদূত লিখেছেন, “একটি রাজনৈতিক সংকটের তৈরি হয়েছে। শেখ হাসিনা স্বৈরতন্ত্রকে আঁকড়ে ধরছেন। যদি কোনো কিছু, কোনো শক্তি জেগে উঠে বা মাথাচাড়া দিয়ে উঠে তাকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির মতো করে পুরোপুরি দমিয়ে দেয়া হবে। এমনকি দেশটি প্রধান বিরোধী দলগুলোর জোট ঐক্যফ্রন্টের প্রধান নেতাদের বিরুদ্ধে যদি একই পন্থা অবলম্বন করা হয় তাহলেও অবাক হবার কিছু নেই।”

গণতান্ত্রিক যেসব জোট নির্বাচনের এই কথিত হার দেখেছে তারা বিষয়টাকে কী ভাবে নিবে সে প্রসঙ্গে উইলসন সেন্টারের সিনিয়র এই স্কলার বলেন, “প্রথমত কিছু মৌলিক সত্য বিষয় তাদেরকে বিবেচনায় নিয়ে আসতে হবে।

প্রথম কথা- যেসকল প্রতিষ্ঠান সরকারের ভঙ্গুর নীতিসমূহকে ধারণ করে এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতির নূন্যতম মূল্যবোধ যেখানে অনুপস্থিত তাদের অধীনে সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন সম্ভব নয়।

দ্বিতীয় কথা- স্পষ্টতই যে সরকার নির্বাচনে চুরি করে জয়ী হয় তাদের নির্বাচিত বলে স্বীকৃতি দেয়া যাবেনা। তাদের বৈধ সরকার বলা যাবেনা। যারা শক্তি প্রয়োগ করে ক্ষমতা দখল করে তারা “সিভিল অভ্যুত্থান” সংগঠিত করে।

তৃতীয় কথা- যে সরকার সব শক্তি প্রয়োগ ক্ষমতা ছিনিয়ে নেয় এবং এটা নির্বাচন বলে দাবি করে তাকে “সেনা অভ্যুত্থানে” ক্ষমতাদখলকারী মনে করতে হবে।”

একাদশ জাতীয় নির্বাচনে ভোট চুরি হয়েছে উল্লেখ করে মাইলাম আরো বলেন, “ভোট চুরির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের মানুষের মনের অবস্থাটা কেমন তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিও ক্লিপের উদাহরণ টেনেই বুঝিয়ে দেয়া যাবে। ভিডিও ক্লিপে দেখা যায়, একটি ক্লাসরুমে পাঠ নিতে বসে আছে ১০-১১ বছর বয়সী প্রায় ২০ জনের মতো শিক্ষার্থী। ক্লাসে এসে শিক্ষক ব্ল্যাক বোর্ডে লিখলেন ২+২=৫ এবং সব ছাত্রকে নির্দেশ দিলেন এটাই সত্য, মানতে হবে। একজন শিক্ষার্থী দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানালো এবং বললো না, এটা সত্য নয়। আমরা সবাই জানি ২+২=৪। অবশেষে প্রতিবাদ করায় ছাত্রটিকে শাস্তি দেয়া হয় এবং হত্যা করা হয়। তারপর শিক্ষক আবার পাঠে মন দিলেন এবং উচ্চ স্বরে পড়া শুরু করলেন ২+২=৫। শেষ দিকে দেখা যায় ভুল লেখা থেকে পেন্সিল একবার সরে আসে এবং হিসেবে ৫ এর বদলে শিক্ষার্থীরা সেটাকে ৪ লেখা শুরু করে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থার বার্তাটা তুলনা করা যায় ব্রিটিশ উপন্যাসিক এবং সাংবাদিক জর্জ ওরওয়েল এর সেই বার্তার সঙ্গে। বার্তাটা এমন- সরকার তার নিজের ইচ্ছেমতো করে কোনটা সত্য সে ঘোষণা দেয় কিন্তু দিন শেষে মানুষ সেটাকে আসলে মেনে নেয়না। তারা প্রকৃত সত্যের ছাঁকুনি দিয়েই সব কিছু বিচার করে। প্রকৃত সত্য কথা হলো নির্বাচনের ফলাফল (৩০ ডিসেম্বরের ভোট) চুরি করা হয়েছে। আর যারা নিজেকে সরকার দাবি করছে তারা অবৈধ।”

Content Protection by DMCA.com

ভোট হয়েছে ২৯ ডিসেম্বর রাতেই : অভিজ্ঞতার কথা জানালেন প্রার্থীরা

Content Protection by DMCA.com

Content Protection by DMCA.com

বিএনপির তৃণমূলে ‘না’

Content Protection by DMCA.com

Content Protection by DMCA.com

আন্দোলনে যেতে বিএনপিকে ‘তৃণমূলের চাপ’

Content Protection by DMCA.com

Content Protection by DMCA.com

চীন-ভারত-যুক্তরাষ্ট্র নতুন মেরুকরণ ও বাংলাদেশ

Content Protection by DMCA.com

১১ জানুয়ারী, ২০১৯

মাসুম খলিলী:
দক্ষিণ এশিয়ায় পরাশক্তিগুলোর প্রভাব-প্রতিযোগিতা নতুন অবয়ব নিতে শুরু করেছে। এ অঞ্চলে এক দশক আগে পরাশক্তিগুলোর যে মেরুকরণ দেখা গিয়েছিল, তা এখন বেশখানিকটা পাল্টে যেতে শুরু করেছে। এ পরিবর্তনে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ ও নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
স্নায়ুযুদ্ধকালে সোভিয়েত-মার্কিন ক্ষমতা বিস্তারের প্রতিযোগিতায় দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎশক্তি ভারত ছিল সোভিয়েত বলয়ে। ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের সময়কালে কংগ্রেসের নেতৃত্বে থাকা জওয়াহেরলাল নেহরুর সাথে ব্রিটিশ শাসকদের ভালো সম্পর্ক থাকলেও তার আদর্শগত ভাবনা-চিন্তায় সমাজতন্ত্রের প্রভাব দৃশ্যমান ছিল। ব্রিটিশ-সোভিয়েত যৌথ প্রভাবে তিনি স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্রিক মূলনীতি ও তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে গণতন্ত্র-সমাজতন্ত্রের সমন্বয় আনতে চেয়েছেন। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে বড় উদ্যোগগুলোর ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে মুক্তভাবে শিল্প বিকাশের সুযোগ দেন।
লালবাহাদুর শাস্ত্রীর সংক্ষিপ্ত সময়ের পর নেহরু-তনয়া ইন্দিরা গান্ধী প্রধানমন্ত্রী হয়ে বাবার অনুসৃত নীতিই এগিয়ে নিয়ে যান। বাবা-মেয়ের দুই আমলেই দৃশ্যমান নীতি হিসেবে ভারত জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনে নেতৃস্থানীয় ভূমিকা নিলেও কার্যক্ষেত্রে সোভিয়েত বলয়ে অবস্থান নেয়। স্নায়ুযুদ্ধের অবসান অবধি ভারতের সরকারনির্বিশেষে এ নীতি অনুসৃত হতে থাকে। স্নায়ুদ্বন্দ্বের অবসানে সোভিয়েতের পরিবর্তে রুশ অধ্যায় শুরু হলে দিল্লি একধরনের ভারসাম্যের নীতি অনুসরণ করতে শুরু করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্কোন্নয়নের পথে পা বাড়ায়। নরসিমা রাও, অটল বিহারি বাজপেয়ি এবং মনমোহন সিংয়ের চার মেয়াদে ধীর গতিতে ভারতের কৌশলগত অবস্থান ও পররাষ্ট্রনীতি ওয়াশিংটনমুখী হতে শুরু করে।
নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদির নেতৃত্বে বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ভারতীয় কৌশলগত নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন দেখা দেয়। এ পরিবর্তনে আমেরিকামুখী নীতি-কৌশলের পরিবর্তন ধীরমাত্রার বদলে দ্রুতগতির মাত্রা নেয়। প্রতিরক্ষায় সহযোগিতা চুক্তিসহ অনেকগুলো কৌশলগত সহায়তা চুক্তি হয় দিল্লি-ওয়াশিংটনের মধ্যে। নরেন্দ্র মোদি এ সহযোগিতার মাধ্যমে ভারতকে মহাশক্তি তথা জাতিসঙ্ঘ নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য ও পরমাণু প্রযুক্তি রফতানিকারক দেশের পর্যায়ে পৌঁছানোর স্বপ্ন দেখায়। বাস্তবে এর কোনোটাই অর্জিত হয়নি। কিন্তু এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে প্রতিরক্ষাসামগ্রী আমদানি এবং ভারত মহাসাগরে মার্কিন মিত্র জাপান-অস্ট্রেলিয়ার সাথে যৌথ মহড়া ও প্রতিরক্ষা জোট গঠনের উদ্যোগে চীনের সাথে বৈরিতা বৃদ্ধি পায় দিল্লির।
এর ফলে এক দিকে ডোকলাম সঙ্কটের মতো সীমান্ত সঙ্ঘাত বৃদ্ধি পায়; অন্য দিকে পাকিস্তানের সাথে চীনের যৌথ প্রতিরক্ষা উদ্যোগ জোরদার হয়। রাশিয়ার সাথে প্রতিরক্ষা সম্পর্ক তৈরি হয় ইসলামাবাদের। এই মেরুকরণ দিল্লির নীতিনির্ধারকদের ভাবিয়ে তোলে। ভারতের অনেক নীতিনির্ধারক ভারসাম্য নীতি গ্রহণের পক্ষে অবস্থান নেন। ভারতীয় বংশোদ্ভূত কৌশলগত চিন্তাবিদ পরাগ খান্না ভবিষ্যদ্বাণী করেন, ‘ভারত কখনোই যুক্তরাষ্ট্র বা চীনের মতো পরাশক্তি হবে না।’ কিন্তু তিনি এটাও বলেন যে, ‘এ দেশটি বিশ্বব্যবস্থার দিক বদলে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, এশিয়াতে তো বটেই। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন সবাই যদি ভারতের সাথে বন্ধুত্ব চায় এ কারণে যে ভারসাম্য রক্ষায় ভারত ভূমিকা রাখতে পারে, তাহলে বড় ধরনের কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না জড়িয়েও ভারত সবার সাথেই বন্ধুত্ব রাখতে পারবে।’
শেষ পর্যন্ত নরেন্দ্র মোদি আবার রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক জোরদার করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। নতুন করে এস ৪০০ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ক্রয় ও নিরাপত্তা খাতে বিভিন্ন চুক্তি হয় দিল্লি-মস্কোর মধ্যে। মিয়ানমারের রোহিঙ্গা ইস্যুতে রুশ-চীন লাইনে দিল্লির অবস্থান আগে থেকেই এর একটি ভিত সৃষ্টি করে।
ভারতের সাউথ ব্লকে নীতিনির্ধারণ পর্যায়েও এর মধ্যে পরিবর্তন আসে। পররাষ্ট্র সচিব পদে যুক্তরাষ্ট্রে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী এস জয়শঙ্করের স্থলাভিষিক্ত হন চীনে রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী বিজয় কেশব গোখলে। জয়শঙ্করের অগ্রাধিকার যেখানে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক জোরদার করা, সেখানে গোখলের অগ্রাধিকার হয় চীনের সাথে বৈরিতার জায়গাগুলো এক পাশে সরিয়ে রেখে যেখানে সম্ভব সেখানে ভারত-চীন সহযোগিতার সম্পর্ক সৃষ্টি করা।
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের ১০ দিন আগে ভারতীয় নিরাপত্তা বিশ্লেষক সুবির নন্দী লিখেছিলেন, ‘গোখলের কৌশল ৩০ ডিসেম্বরের পার্লামেন্ট নির্বাচনের সময় বাংলাদেশে কিছুটা পরীক্ষার মুখে পড়বে। মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কা দুই জায়গাতেই ভারতের বন্ধুরা নৈতিকভাবে একটা শক্ত অবস্থানে ছিল। তারা যাদের বিরুদ্ধে লড়ছিলেন তাদের অবস্থান ছিল দৃশ্যত গণতন্ত্রের বিপক্ষে। বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল এবং সফল গণতন্ত্রের দেশ হিসেবে এসব ব্যক্তির সমর্থন দেয়া ভারতের জন্য সহজ ছিল। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ভেস্তে গেছে। কারণ ভারত যে উচ্চ নৈতিক অবস্থান কামনা করে, সেটা এখানে নেই। পশ্চিমা দেশগুলো হাসিনার বিরুদ্ধে দেশকে একদলীয় রাষ্ট্রে পরিণত করার অভিযোগ করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় দেশগুলোকে এটা বোঝাতে ভারতের বেগ পেতে হচ্ছে যে, হাসিনা ক্ষমতায় থাকলে সেটা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য ভালো হবে।’
সুবির নন্দী বাংলাদেশে গোখলের নীতির যে পরীক্ষার কথা বলেছিলেন, সেটির সফল বাস্তবায়ন এর মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে বাংলাদেশে। এখানে পাশ্চাত্যের দেশগুলো যেখানে মুক্ত, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার কার্যকর অভিযাত্রা চেয়েছে, সেখানে ভারত চীনের সাথে মিলে এমন এক নির্বাচন করতে শেখ হাসিনার ক্ষমতাসীন সরকারকে সমর্থন করেছেÑ যার সাথে উত্তর কোরিয়ার মতো দেশের নির্বাচনকে তুলনা করেছে ওয়াশিংটন পোস্ট। মনে হয়, এখানে দিল্লি-বেইজিং সমঝোতার ভিত্তি হিসেবে কাজ করে এ অঞ্চলে আমেরিকান প্রভাবকে গভীর হতে না দেয়া।
অথচ ২০০৭-০৮ সালে ভারতের প্রভাবকে বাংলাদেশে সর্বব্যাপী করার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে যুক্তরাষ্ট্র সর্বাত্মক সহযোগিতা করেছে। এবার ওয়াশিংটন মনে করেছিল, এখানে একটি মুক্ত, উদার নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে দিল্লির সহযোগিতা পাওয়া যাবে; কিন্তু কার্যক্ষেত্রে এর উল্টোটাই হয়েছে।
খোগলের যে নীতির কথা বলা হচ্ছে, ভারতের সাবেক কূটনীতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষক ভদ্রকুমার সেটি গ্রহণের পক্ষে অনেক দিন ধরেই যুক্তি দিয়ে আসছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘জি২০ সম্মেলনের ফাঁকে আরেকটি ত্রিদেশীয় বৈঠক হয়েছে, যেখানে একত্র হয়েছিল রাশিয়া, চীন ও ভারত। কার্যত, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ত্রিদেশীয় এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ইউরেশিয়ান প্রচেষ্টা এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন; যেখানে ভারত ও চীনের সাথে আরআইসি (রাশিয়া-ইন্ডিয়া-চায়না) ফর্মেটকে নেতৃত্বের পর্যায়ে উন্নীত করা হবে। পুতিন যে নিয়মিত আরআইসি বৈঠকের প্রস্তাব দিয়েছেন, সেখানে চীন-ভারত সম্পর্কের উন্নয়নকে উৎসাহিত করার জন্য রাশিয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।’
ভদ্রকুমার বলেছেন, ‘বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতিতে আরআইসির মধ্যে আরো গতিশীলতা নিয়ে আসা এখন রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতির অংশ। বেইজিং ও দিল্লির সাথে আলোচনার পর মস্কো প্রস্তাবটি নিয়ে সতর্কভাবে বিবেচনা করতে পারে। আরআইসি ফর্মেট শুরু যুক্তরাষ্ট্র-জাপান-ভারত ফর্মেটের বিপরীতে একটা ভারসাম্যই তৈরি করছে না; বরং ব্রিকস ও এসসিও’কেও শক্তিশালী করবে। এটা ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনকে দৃঢ় করবে।’
এর আগে রাশিয়া, চীন ও ভারতের একত্র হওয়ার ধারণাটি ১৯৯৭ সালে প্রথম তুলেছিলেন রাশিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী পরলোকগত ইভজেনি প্রিমাকভ; কিন্তু ভারত ও চীন তখন সাড়া দেয়নি। তখনো যুক্তরাষ্ট্রের সাথে কৌশলগত সম্পর্ক নির্মাণের বিষয়টি অধিক গুরুত্ব লাভ করে।
বাংলাদেশকেন্দ্রিক চীন-রাশিয়া-ভারত মেরুকরণটি এখানে থেমে থাকবে বলেও মনে হয় না। এর পরবর্তী প্রভাব দেখা যেতে পারে আফগানিস্তানে। এর মধ্যে সেখানে ভারতের ভূমিকা নিয়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বিরূপ মন্তব্য করেছেন। তালেবান ইস্যুতে একটি বোঝাপড়ার ব্যাপারে পাকিস্তানের সাথে একধরনের সমঝোতা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে ওয়াশিংটনের।
বেইজিংয়ের সাথে ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ব্যাপারে চীন বরাবরই সাধারণ এশীয় অবস্থান নেয়ার কথা বলত। এ অঞ্চলে যাতে আমেরিকান প্রভাব বাড়তে না পারে, সে জন্য পারস্পরিক সহযোগিতার কথা বলত। এই অবস্থানের বিপরীতে আমেরিকার সাথে সম্পর্ক বাড়াবাড়ি রকমের পর্যায়ে উপনীত হওয়ার ফলে ডোকলাম সঙ্কটের সৃষ্টি হয়। পাকিস্তানের সাথে প্রতিরক্ষা অংশীদারিত্বকে বেইজিং এমন পর্যায়ে নিয়ে যায়, যাতে ভারত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।
এখন গোখলে তত্ত্বের প্রভাবে দিল্লি সম্ভবত ওয়াশিংটনের প্রভাব থেকে বেশখানিকটা বের হয়ে আসতে চাইছে। এর ফলে চীন-ভারত-রাশিয়ার যৌথ উদ্যোগে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক, এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার কার্যক্রম বেড়ে যাবে। অন্য দিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক কিছুটা হলেও বাড়বে। চীনের অর্থ ও বিনিয়োগপ্রবাহ কমতে থাকবে।
বাংলাদেশে চীন-ভারতের যে প্রীতিভাব তার প্রভাব দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশেও পড়তে পারে। এরপর শ্রীলঙ্কায় এখন যে সিরিসেনা-রাজাপাকসে-বিক্রমাসিংহে যুদ্ধংদেহী অবস্থা চলছে, তার অবসানেও গোখলে তত্ত্ব কাজ করতে পারে। এটি নেপালেও ভারত-চীনের মধ্যে সহাবস্থান সৃষ্টি করতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে রোহিঙ্গা ইস্যুতেও। পশ্চিমা দেশগুলো এই মেরুকরণকে কিভাবে নেয়, সেটিই হলো দেখার বিষয়।
তবে এই বাস্তবতাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বাংলাদেশে ভারত ও চীনের স্বার্থ বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পূরক নয়। ফলে নির্বাচনে জয়ের জন্য শেখ হাসিনা প্রথম দু’টি অভিনন্দন বার্তা ভারত ও চীনের কাছ থেকে পেলেও আগামীতে তা অব্যাহত না-ও থাকতে পারে। এমন কথাও এখন শোনা যাচ্ছে যে, শেখ হাসিনা তার মন্ত্রিসভা থেকে পুরনো যাদের ছেঁটে ফেলেছেন তাদের বেশির ভাগই দিল্লির ঘনিষ্ঠ। ফলে নতুন সরকারে ভারতের চেয়ে চীনা প্রভাব বেশখানিকটা বাড়তে পারে। দিল্লির বিশ্লেষক ভরত ভূষণের লেখায়ও সেটির প্রকাশ পাওয়া যায়।
ভরত ভূষণের মতে, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ধারাবাহিকতাকে ভারত ও চীন উভয়ে স্বাগত জানালেও তাদের স্বার্থ সম্পূর্ণ ভিন্ন। চীন প্রথমত চায় বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের ও দ্বিতীয়ত ভারতের মোকাবেলায় কৌশলগত পা রাখার জায়গা। ক্ষমতাসীন দলের প্রখ্যাত পরিবারগুলোর সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্কের মাধ্যমে স্থানীয় রাজনীতিতে হানা দিয়ে চীন তার কৌশলগত লক্ষ্য হাসিল করতে চায়। আওয়ামী লীগ সরকার চীনকে বেশ কয়েকটি প্রবেশপথ দিয়েছে। বাংলাদেশ হলো বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের (বিআরআই) অবিভাজ্য অংশ। ছয়টি বিআরআই করিডোরের (চারটি স্থল ও দু’টি সামুদ্রিক) মধ্যে বাংলাদেশ কুনমিং থেকে কলকাতা (মিয়ানমারের কিয়াকফু বন্দর থেকে চট্টগ্রাম হয়ে) পর্যন্ত বিস্তৃত গুরুত্বপূর্ণ সাগরপথের অবিভাজ্য অংশ।
তিনি আরো লিখেছেন, ‘ব্যবসা-বাণিজ্য ছাড়াও এটি চীনকে বঙ্গোপসাগর ও ভারত মহাসাগরে প্রবেশের সুযোগ দেবে। ৮৫ শতাংশ চীনা মালিকানায় থাকা কিয়াকফু বন্দরটি হবে একটি জ্বালানি হাব। এর ফলে চীন অরক্ষিত মালাক্কা প্রণালীর ওপর থেকে নির্ভরশীলতা কমাতে পারবে। এই প্রণালী দিয়েই মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৮০ শতাংশ তেল আমদানি করে থাকে চীন। কিয়াকফু বন্দরে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আনা তেল জমা করা হবে। সৌদি আরব এখানে একটি শোধনাগার বানাবে, কাতার বানাবে একটি গ্যাস পরিশোধন প্লান্ট। এখান থেকে পাইপ লাইনের মাধ্যমে চীনে গ্যাস সরবরাহ করা হবে। কক্সবাজারের কাছে থাকা সোনাদিয়া গভীর সমুদ্রবন্দরটির কাজ এখন বন্ধ আছে। চীন তার ভূ-কৌশলগত, ভূ-অর্থনৈতিক ও ভূ-জ্বালানি স্বার্থ এবং সেই সাথে পদ্মা সেতু, চট্টগ্রাম মহাসড়ক প্রকল্প ও ১৩৫০০ মেগাওয়াট মহেশখালী বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বড় বড় প্রকল্পে তার বিনিয়োগ নিশ্চিত করার জন্য ঢাকায় ক্ষমতার ধারাবাহিকতা চায়। মালয়েশিয়ায় মাহাথির মোহাম্মদ ক্ষমতায় আসার পর ১.৫ বিলিয়ন ডলারের ইস্ট-ওয়েস্ট রেলওয়ে প্রকল্প বাতিল করার মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি নিয়ে ভীত চীন।’
ভারতীয় বিশ্লেষক মনে করছেন, বাংলাদেশে চীনের প্রবেশে ভারতের সম্মতি থাকলেও এখানে চীনা উপস্থিতি সময়ের পরিক্রমায় সম্প্রসারিত হবে এবং ভারত তাতে ভেটো দিতে পারবে না। চীনা সম্প্রসারণ ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র উভয়ের ভূমিকা কোণঠাসা করে ফেলবে।
সব কিছু পর্যবেক্ষণে বাংলাদেশকেন্দ্রিক মহা খেলা এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে ঘনীভূত হতে শুরু করেছে বলেই মনে হচ্ছে। এই মহা খেলা শুরু হয়ে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে কী গতিপথ নেয় তা বলা মুশকিল। এই খেলায় শক্তিধরদের প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা যেমন রয়েছে, তেমনিভাবে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য সম্পৃক্ততাও রয়েছে। অল্প কয়েক বছর আগে পর্যন্ত বাংলাদেশের সমুদ্র এলাকায় তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে সম্পৃক্ত হতে পাশ্চাত্যের কোম্পানিগুলোকে বেশি দেখা যেত। কয়েক দিন আগে রাশিয়ার গ্যাজপ্রম এ এলাকার ব্লক ইজারা পাওয়ার আগ্রহের কথা জানিয়েছে। চীনও তার আগ্রহের কথা জানিয়েছে ঢাকাকে। কৌশলগত খেলার পরিণাম অনেক সময় বেশ ভয়ঙ্করও হয়ে দাঁড়ায়। তেমন একটি অবস্থা এ অঞ্চলে না আসুক, সেটিই সবার প্রত্যাশা।
mrkmmb@gmail.com

Content Protection by DMCA.com

৩০ ডিসেম্বর নির্বাচনের কারচুপি অবিশ্বাস্য, সংকট তৈরি না করে নির্বাচন দিন: ড. কামাল

Content Protection by DMCA.com

Content Protection by DMCA.com
« Older Entries