খালেদা জিয়ার সিলেট সফর: লাখ লাখ মানুষের জনজোয়ার

দেশের জনপ্রিয় নেত্রী বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। আজ ঢাকা থেকে সড়ক পথে সিলেট সফরে যাওয়ার সময় পুলিশি হয়রানি, গণ-গ্রেফতার ও লাঠিচার্জ উপেক্ষা করে দলীয় নেতাকর্মীসহ লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতি তারই বহিপ্রকাশ। এমনটাই দাবি- বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের।

তারা বলছেন, ঢাকা থেকে আজ সকালে সড়ক পথে সিলেটে হযরত শাহজালাল (র.) ও শাহপরাণ (র.) এর মাজার জিয়ারত করতে রওয়ানা হন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। পূর্ব নির্ধারিত এ সফরের খবরে সকাল থেকেই ঢাকা থেকে সিলেট পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে জড়ো হতে থাকেন হাজার হাজার নেতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষ। তারা খালেদা জিয়াকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি এক নজর দেখতে ভিড় করেন। কিন্তু পুলিশ বিভিন্ন স্থানে তাদের বাধা দেয়, লাঠিচার্জ করে। সেই সাথে চলে গণ-গ্রেফতার।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী ও হবিগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে সারা দিনে দুই শতাধিক বিএনপি নেতাকর্মীকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। এছাড়া, নরসিংদীতে নৌকার স্লোগান দিয়ে খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে বাধা দেয় ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন।
জানা গেছে, এ সব উপেক্ষা করে মহাসড়কের দু’পাশে জনতার ঢল নামে। বিশেষ করে খালেদা জিয়ার গাড়িবহর সিলেট এলাকায় পৌঁছলে বিএনপির নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর সমর্থকদের উপছেপড়া ভিড় লক্ষ্য করা যায় মহাসড়কের দু’পাশে। এ সময় তাদের হাতে খালেদা জিয়া, শহীদ রাষ্ট্রপতি ও বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমান, তারেক রহমান ও নিখোঁজ নেতা ইলিয়াস আলীর ছবিসম্বলিত প্লেকার্ড শোভা পায়।

খালেদা জিয়া দুপুরের পর সিলেট সার্কিট হাউজে পৌঁছান। সেখানে দুপুরের খাবারবিরতি ও নামাজ শেষে বিকেলে হযরত শাহজালাল (র.) এর মাজারে যান। সেখানে মাগরিবের নামাজ আদায় শেষে মাজার জিয়ারত ও দোয়া-মোনাজাত করেন তিনি। পরে সেখান থেকে বের হয়ে বেগম জিয়া যান হযরত শাহপরাণ (র.) এর মাজারে। মাজার জিয়ারত শেষে বিএনপি চেয়ারপারসন ফিরেন সিলেট সার্কিট হাউজে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা বলছেন, বিএনপি চেয়ারপারসন সিলেটে পৌঁছার পর পুরো নগরীতে মানুষের ঢল নামে। সিলেট সার্কিট হাউজ থেকে শুরু করে শাহজালাল (র.) ও শাহপরাণ (র.) এর মাজারে দলীয় নেত্রীকে ঘিরে লাখো মানুষ উপস্থিত হন। সেই সাথে দলীয় নেতাকর্মীসহ উপস্থিত জনতা খালেদা জিয়া, তারেক রহামন ও শহীদ জিয়াউর রহমানের নামে বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকেন। যা দেখে আশপাশের মানুষও অবাক হয়ে যান বলে প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে।

স্থানীয় দলীয় নেতারা বলছেন, এটা খালেদা জিয়ার কোনো রাজনৈতিক সফর নয়। তিনি মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে সিলেটে এসেছেন। আর নেত্রীকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি তাকে দেখতেই মূলত মানুষের ঢল নেমেছে সিলেটে। জনতার এই ঢল- বিএনপি ও খালেদা জিয়ার প্রতি সিলেটবাসীসহ দেশের মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ।

আজ রাত ৯টা ৫০ মিনিটে সিলেট সার্কিট হাউস ছেড়ে ঢাকার পথে যাত্রা শুরু করেন বিএনপি চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া।

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বাদী হেলাল রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত!

দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বাদী পুলিশের সার্জেন্ট হেলাল রহস্যজনক সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। রবিবার রাতে ফেনীর রামপুরে এ ঘটনায় ঘটে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, রবিবার নিজে গাড়ি চালিয়ে চট্টগ্রামের কর্মস্থলে যাচ্ছিলেন তিনি। পথে অন্যত্র থেকে আসা একটি গাড়ি তার গাড়িকে লক্ষ্য করে পেছন থেকে সজোরে ধাক্কা দেয়। এতে তার গাড়ি উল্টে যায়। এ সময় তাকে উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়া হলে মারা যান তিনি।
জানা যায়, দশ ট্রাক অস্ত্র মামলার বাদী হওয়ার পর থেকেই সার্জেন্ট হেলাল ও তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে মানসিকভাবে নিযার্তন করা হচ্ছিল। তাকে হত্যার হুমকিও আসতো বিভিন্ন সময়।
হাইওয়ে পুলিশ জানায়, এটি একটি সড়ক দুর্ঘটনা। ফেনী জেলা ট্রাফিক পুলিশের ইন্সপেক্টর মীর গোলাম ফারুক জানান, হেলাল উদ্দিন ভুঁইয়া তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চান্দিনা থেকে রবিবার নিজে প্রাইভেট কার (চট্ট-মেট্রো-গ-১১-৫১৪১) চালিয়ে চট্টগ্রামে কর্মস্থলের উদ্দেশে যাচ্ছিলেন। রামপুর এলাকায় পৌঁছার পর তার গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে একটি গাছের সাথে সজোরে ধাক্কা লেগে ছিটকে গিয়ে আরো একটি গাছের সাথে ধাক্কা লাগে। এতে প্রাইভেট কারের সামনের অংশ দুমড়ে মুচড়ে যায় এবং তিনি গুরুতর আহত হন। সোমবার ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে তার মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়। গাড়িটি উদ্ধার করা হয়েছে।

পরিবার জানায়, এটি সড়ক দুর্ঘটনা নয়, পরিকল্পিত হত্যা হতে পারে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে তার পরিবার।

 

বাংলাদেশ পুলিশের ১৯৯৫ ব্যাচের সার্জেন্ট হেলাল আলোচিত ১০ ট্রাক অস্ত্র উদ্ধারের সময় চট্টগ্রামের বন্দর থানার কয়লার ডিপো পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ ছিলেন।

/ইত্তেফাক

নিউ ইয়র্কে ১৬ মিলিয়ন ডলারে মার্কেট কিনলেন খাদ্যমন্ত্রী কামরুল!

সময় শেষ। বাক্স পেটরা গোছাচ্ছে লীগ মন্ত্রী নেতারা। সামনে অনিশ্চিত ভবিষ্যত চিন্তা করে লুটেরা মন্ত্রী এমপিরা অনেকেই বিদেশে টাকা ইনভেস্ট করছে। শেখ হাসিনার খাদ্যমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলামের পালানোর প্রস্তুতি চুড়ান্ত প্রায়। সম্প্রতি আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটির জ্যাকসন হাইটসে ১৬ মিলিয়ন ডলারে ৭টি দোকান কিনে ফেলেছেন কামরুল। এতে নিজের নামে সামান্য অংশ রেখেছেন, মূল ক্রেতার নাম হিসাবে আছে ভাতিজি শাহানারা খান ও ফজলুর রহমান খান। তাদের ঠিকানা ২২৪৩, ২৮ স্টৃট, এস্টোরিয়া, নিউইয়র্ক ১১১০৫। এই বাড়িটিও বছর দুয়েক আগে ২.৭ মিলিয়ন ডলারে কিনেন এডভোকেট কামরুল।

বাঙালি অধ্যুসিত জ্যাকসন হাইটসের ৩৭ এভিনিউর ওপরে ৭৪ থেকে ৭৫ নম্বর সড়কের মধ্যবর্তী এই ৭টি দোকানের মালিক ছিলেন Chui Yee. এখানে রয়েছে মেঘনা গ্রোসারি, মেজবান রেস্টুরেন্ট, আফগান রেস্টুরেন্ট, কবির বেকারীর মত লাভজনক ব্যবসা। দোকানগুলির মালিক ১৩ মিলিয়ন ডলারে তার প্রোপার্টি অন্যত্র বিক্রি চুড়ান্ত করে ফেলেছিলেন। হঠাৎ এডভোকেট কামরুল তার এজেন্ট দিয়ে ৩ মিলিয়ন ডলার বেশি হাকিয়ে কিনে নেন ঐ প্রোপার্টি, তাও নগদে। অবাক হয়ে চুই মন্তব্য করেন- বাঙালি এত ধনী!

“বেগম জিয়ার চিকিৎসা অবহেলা এবং হত্যার ষড়যন্ত্র”

গত দু’দিন ধরে খবরে প্রকাশ- দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ৫জুন মাইল্ড স্ট্রোক করে মাথা ঘুরে পড়ে গিয়েছিলেন কারাগারে। গতকাল কয়েকজন ডাক্তার দেখে এসে বলেছেন, উনার সম্ভবত মাইল্ড স্ট্রোক হয়েছিল! কয়েক মিনিট অজ্ঞানও ছিলেন!

মাইল্ড স্ট্রোকের খবর প্রকাশ হওয়ার পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান কামাল বলছে, বেগম জিয়ার ’পড়ে যাওয়ার খবর’ কারা কতৃপক্ষ জানেন না! একথা তো ‘রীতিমত ভয়ঙ্কর’!! অন্যদিকে ওবায়দুল কাদের পরীক্ষা নীরিক্ষা ছাড়াই বলে দিলো- মাইল্ড স্ট্রোক হয়নি! খালেদা জিয়াকে কারাগারে রাখা হয়েছে, অথচ কারা কতৃপক্ষই জানে না তাঁর পড়ে যাওয়ার খবর! তাহলে কে জানে? উনার ভালো মন্দ দেথা শুনা করার দায়িত্ব জেল কতৃপক্ষের। অন্য কারও নয়। এখন তারা যদি বলে- আমরা কিছু জানি না, তবে মারাত্মক চিন্তার বিষয়। তবে তো চিন্তা হয়- এটা কি ধীরে ধীরে বড় ঘটনা ঘটানোর আলামত? এভাবে যেতে যেতে একদিন হয়ত তারা প্রকাশ করবে – “ব্রেইন স্ট্রোক করে তিনি মারা গেছেন” (আল্লাহ তেমনটা না করুন)! এটা পরিস্কার করে বুঝঝতে হবে, খালেদা জিয়াকে হত্যার উদ্দেশ্যেই এই ষড়যন্ত্র তৈরী করেছে অবৈধ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা! আর এজন্য উনাকে চিকিৎসা না দিয়ে অযত্ন অবেহেলা করে একটার পর একটা ঘটনা ঘটানো হচ্ছে, যাতে করে বড় ঘটনা ঘটে গেলে তখন বলতে পারে- উনি তো আগে থেকেই অসুস্থ ছিলেন! এজন্য জনগনের ‘মাইন্ড সেট’ তৈরী করছে অবৈধ সরকার!

এখনকার খবর হলো, পরীক্ষা নিরীক্ষা করতে রবিবার বেগম জিয়াকে পিজি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হবে, যদিও ম্যাডাম পিজিতে যেতে চান না। তার কারন পিজির ডাক্তাররা বেশিরভাগই আ’লীগের দলীয় ডাক্তার- তারা উল্টাপাল্টা ডায়াগনোসিস করে ভুল চিকিৎসা দিয়ে বা বিষ প্রয়োগ করে উনাকে দ্রুত মেরে ফেলতে পারে। তাই বেগম জিয়া চান, উনি আগে যেখানে চিকিৎসা করাতেন, সেই ইউনাইটেড হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে।

তিন বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বাংলাদেশের সবচেয়ে পাওয়াফুল পলিটিশিয়ান। এই বেগম জিয়ার জন্যই হাসিনা কোনো ইলেকশনে জিততে পারবে না, কোনো নির্বাচনে যাওয়ার সাহস নাই লীগের। তাই উনাকে দুনিয়া থেকে সরিয়ে দিতে পারলে হাসিনার পথের কাঁটা দূর হয়ে যায়। আগে থেকেই লেখালেখি হচ্ছিলো, পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারলে ম্যাডামকে জেলে নিবে হাসিনা! কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই ফাঁদেই পা দিলো বিএনপি! দলকে চুড়ান্ত ঠান্ডা করে ‘শান্তিপূর্ন কর্মসুচির বড়ি গিলিয়ে’ আইনী প্রকৃয়ায় মামলা খরিজ করানোর ফরমুলা বাস্তবায়ন করেছে! অথচ ইনার মামলা এবং রায় হলো রাজনৈতিক! রাজনীতির ময়দান সচল থাকলে খালেদা জিয়াকে জেলে নেয়ার ক্ষমতা হাসিনার ছিল না। ২০১৫ সালে তো ৩টা ওয়ারেন্ট ইস্যু করেও হাসিনা পুলিশ পাঠানোর সাহস করেনি। দুর্ভাগ্যবশত, দালাল ও টাকা খেয়ে যারা ধান্দা করে, বিএনপিতে তাদের কথাই বেশি চলে! খালেদা জিয়াকে নিয়ে শেখ হাসিনা ও ভারতের খুব নোংরা চক্রান্ত করছে। বিএনপির কিছু নেতারা এই চক্রান্ত ধরতে পারছে না, বরং নিজেদের সামান্য একটু সুযোগ সুবিধা বা টাকার লোভে এই কুটিল ষড়যন্ত্রে যুক্ত হয়ে আছেন নিরবে- এরা হাই কমান্ডকে কুবুদ্ধি দিয়ে বেগম জিয়া ও দলকে আজকের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। এরা এখন হয়ত বুঝতে পারছে না- খালেদা জিয়া কি সম্পদ। জাতিকে একত্র করার ক্ষমতা এই নেত্রীরই কেবল আছে। উনি না থাকলে দেশের যে কি অবস্থা হবে সেটা এখন হয় অনুমান করতে পারছে না। তখন ঐসব দালাল নেতাদেরকে রাস্তায় পিটিয়ে মারবে- কুত্তার মত!

গত ৪ মাস ধরে বেগম জিয়া কারাগারে, অথচ উনার কারামুক্তির কোনো আন্দোলন বা কর্মসূচি কিছুই নাই। যেনো এসব স্বাভাবিক বলে মেনে নিয়েছে সবাই! বিএনপির নেতা কর্মীরা এত বেশী ধার্মিক হয়ে গেছেন যে, রোজার উছিলায় কোনো কর্মসূচি করতে পারছেন না! বেগম জিয়া যেখানে ৩৯ টাকার ইফতার খান, নির্লজ্জ নেতারা সেখানে টেবিল ভর্তি ইফতার নিয়ে পত্রিকা ও ফেসবুকে ছবি প্রকাশ করে, অনেকে দন্ত বিকশিত হাসিও হাসে! এদেরও উচিত ছিল নিজেরাও ৩৯ টাকার ইফতার করে রোজার মধ্যেও কারামুক্তির আন্দোলন করা।

শেষ কথা- বেগম জিয়ার বিরুদ্ধে মামলা, রায়, জেল সবই রাজনৈতিক। আন্দোলন না করলে মুক্তিও মিলবে না, উপযুক্ত চিকিৎসাও হবে না। তখন হয়ত জানাজায় যেতে হবে! ইতোমধ্যে ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী হুশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন- খালেদা জিয়ার কিছু হলে দায় সরকারের।

এক অডিও ক্লিপেই ‘বন্দুকযুদ্ধের’ রহস্য ফাঁস: গার্ডিয়ান প্রতিবেদন

বাংলাদেশের চলমান বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যার ব্যাপারে সরগরম হয়ে উঠছে একের পর এক দেশী বিদেশী মিডিয়া। এবার এই তালিকায় যুক্ত হলো বৃটিশ জনপ্রিয় পত্রিকা গার্ডিয়ান। কক্সবাজারের পৌর কাউন্সিলর একরামকে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার একটি অডিও রিপোর্ট নিয়ে তারা গতকাল ৬ জুন একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে। “Audio clip ‘captures Bangladeshi police killing drugs suspect’ Death of Akramul Haque raises fresh fears over extrajudicial killings in drugs crackdown” শিরোনামের এই রিপোর্টে বলা হয় সম্প্রতি একটি টেলিফোনিক কথোপকথোন ফাঁস হয়েছে যা বাংলাদেশ সরকারের চলমান মাদক বিরোধী অভিযানকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

কক্সবাজারের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক গত ২৭মে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় বলে জানায় র‌্যাব। বাংলাদেশের এই এলিট ফোর্সটি একরামকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে উল্লেখ করে এবং তার কাছ থেকে দুটি অস্ত্র এবং কয়েক হাজার পিস ইয়াবাও উদ্ধার করা হয়েছে।

এই ঘটনার ৪ দিন পর নিহত একরামের স্ত্রী আয়েশা কক্সবাজার প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ঘটনার দিন রাতে তার স্বামীর সাথে মোবাইল কথোপকথোনের মোট ৪টি ক্লিপ ফাঁস করেন যাতে বোঝা যায় বাস্তব ঘটনা র‌্যাবের ইতোপূর্বের দাবীর তুলনায় পুরোপুরি আলাদা।

প্রথম তিনটি ক্লিপে নিহত একরাম তার মেয়েকে জানান, তাকে একটু জরুরী কাজে স্থানীয় এক সরকারী কর্মকর্তার কাছে যেতে হচ্ছে। ‘আমি গাড়িতে আছি, এখন বেশী কথা বলতে পারবোনা।’ এটাই ছিল মেয়েকে বাবার শেষ কথা।

শেষ কলটি একরামকে দিয়েছিলেন আয়েশা নিজেই। কিন্তু এবার কিছু লোকজনের এলোমেলো কথাই কেবল শোনা যায়। এর মধ্যে একরামের কন্ঠ একবার শোনা যায়, তিনি বলছিলেন, ‘আমি এগুলোর সাথে জড়িত নই।’ এর পরপরই গুলির শব্দ। তারপর একটা মানুষের গোঙ্গানি, এরপর আবার একটা গুলি। আয়েশা আর তার মেয়েরা গুলির শব্দ শুনেই ফোনের অপর প্রান্তে চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করে দেন।

আয়েশা ও তার মেয়েরা যখন ফোনে চিৎকার করছিল তখন অপরপ্রান্তে তারা পুলিশের গাড়ির সাইরেন শুনতে পাচ্ছিলো। একজন বলে উঠে, বুলেটগুলো নিয়ে নাও। আরেকজন প্রশ্ন করে লাশের হাত দুটোকে কি বাঁধা হয়েছে?

আয়েশা সংবাদ সম্মেলনে এই ক্লিপটি সাংবাদিকদেরকে শোনান এবং দাবী করেন তার স্বামীকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করা হয়েছে। আয়েশার এই সংবাদ সম্মেলন এবং অডিও ক্লিপটি পরের দিন বাংলাদেশের প্রধানতম ইংরেজী জাতীয় দৈনিক ডেইলী স্টারের প্রথম পাতায় ফলাও করে ছাপা হয়। এর পর থেকে ১৮ ঘন্টা এই পত্রিকাটির অনলাইন ওয়েবসাইটটা বন্ধ করে রাখে বাংলাদেশ কর্তৃপক্ষ।

এরপরই আবার এই মাদক বিরোধী অভিযানে বন্দুকযুদ্ধের নামে মানুষ হত্যার বিষয়টি সামনে চলে আসে। মাত্র ৩ সপ্তাহে এই অভিযানে এই পর্যন্ত ১৩১ জন মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। পুলিশ অবশ্য এইসব হত্যাকেই বন্দুকযুদ্ধ হিসেবে দাবী করে এবং নিহতের কাছে অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে বলেও জানায়।

তবে বাংলাদেশের বিরোধী দল বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য একেএম ওয়াহিদুজ্জামান অভিযোগ করেন কথিত এই মাদক বিরোধী অভিযানে এই পর্যন্ত তাদের দলের ১৫ জন নেতাকর্মীকে মাদক ব্যবসায়ী সাজিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, এত বড় অভিযানে দুই একটা ভুল হওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়। দেশটির মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রেজাউল হক অবশ্য এই সকল হত্যাকান্ডের বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। আর ইউরোপীয় ইউনিয়ন সকল কথিত বন্দুকযুদ্ধের ঘটনার তদন্ত দাবী করেছে।

এই বিষয়ে র‌্যাবের মতামত জানার জন্য বেশ কয়েকবার তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলেও সংস্থাটির পক্ষ থেকে কোন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

মাথানষ্টের পুত্র যখন উন্মাদ- তখন বিভিন্ন সংজ্ঞা যেমন হয়?

– একেএম ওয়াহিদুজ্জামান

পরীক্ষায় আসতে পারে- নীচের কথাটি কোন বাংলাদেশি রাজনীতিবিদ বলেছে?
“যখন কোন অপরাধী সাধারণত মাদকের প্রভাবে নিজেকে নিজে গুলি করে আত্মহত্যা করে (কখনো কখনো আত্মহত্যার আগে নিজের হাতগুলোতে নিজেই হ্যান্ডকাফ বেঁধে নেয়) তাকে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বলে”।

Which Bangladesh politician said this: “An Extra-judicial Killing is when a criminal, often under the influence of drugs, shoots himself, (sometimes having handcuffed himself first)”?

সজিব ওয়াজেদ জয়ের অভিধান অনুসারে- বাংলাদেশে ‘গুম’ এর ঘটনাগুলো হচ্ছে, “বিচার ও দায়িত্ব এড়ানোর জন্য অপরাধীদের তৈরী করা কল্প-কাহিনী!”

According to Sajeeb Wazed Joy, “enforced disappearances” in Bangladesh are “fictitious attempts by accused criminals to avoid prosecution and accountability.”

বাংলাদেশের বিনাভোটের প্রধানমন্ত্রীর পুত্রের অভিধানে থাকা এমন সব আরো অভিনব সব সংজ্ঞা উপভোগ করুন:
————————————————————————————–

Sajeeb Wazed Joy’s dictionary of new political terms
–  

Sajeeb Wazed Joy, the son of Bangladesh’s prime minister has recently published not onebut two extraordinary articles which not only denies that the country’s law enforcement authorities are involved in enforced disappearances – the picking up, secretly detaining and often killing of men in Bangladesh – but also that the police investigate every single one of these disappearances and found no evidence of state involvement.

In fact, not only is there overwhelming eye-witness evidence that law enforcement and intelligence agencies including Rapid Action Battallion, the Detective Branch of the Police and DGFI are involved in picking these men up (over 400 since the government came to power) and that in some of these cases, but also new evidence that the prime minister herself – Sajeeb’s mother – has personally authorised some disappearances including that of one person whose whereabouts, 20 months after his pick-up, remains unknown. Moreover, far from the investigating disappearances, the Bangladesh police don’t even allow most families to report them. To read a response to Joy’s articles see here.

In his articles, Joy defines “enforced disappearances” as

“fictitious attempts by accused criminals to avoid prosecution and accountability.”

Bangladesh Politico has now got its hands on a few pages from Joy’s new dictionary of Bangladesh political terminology – and we can for the first time publish some more definitions.

  • Awami League – the only legitimate political party in Bangladesh;
  • Caretaker government – a mechanism of ensuring more fair elections in Bangladesh which had to be stopped as it risked allowing the election of a party other than the Awami League;
  • Corruption – thievery, larceny and kleptocracy solely conducted by the opposition Bangladesh Nationalist Party and other parties that support it;
  • Democracy – When elections results in the victory of a party led by Sheikh Hasina;
  • Election Commission – a group of trustworthy and incorruptible administrators who say and do exactly what the Awami League asks it to say and do;
  • Extra-judicial killing – when a criminal, often under the influence of drugs, shoots himself, (sometimes having handcuffed himself first);
  • Freedom of Speech – freedom to speak about the greatness of the Awami League, its current leader and her family members;
  • Freedom of Assembly – a freedom that prevents members of the opposition parties from congregating and speaking against the Awami League;
  • International Crimes Tribunal – a process which complies with all standards of a fair trial, other than the ones that could allow the accused to properly defend themselves;
  • ISIS – a group that exists in every country other than Bangladesh;
  • Police investigation – an inquiry which results in a finding that a crime was committed by a leader, activist, member or supporter of the Bangladesh Nationalist Party and other opposition parties and concludes that no member of the governing party was involved;
  • Terrorism – any activity conducted primarily by the opposition political parties.

সেনাবাহিনীর প্রভাব ব্যবহার করে শীর্ষ সন্ত্রাসী জোসেফ-হারিসকে মুক্ত করেন জেনারেল আজিজ!

২০০২ সালের জানুয়ারি মাসের এক বিকেল। ফারুক ভাই তার জুনিয়র সহকর্মীকে ডেকে কফি খেতে খেতে গল্প শুরু করলেন। এরা পূর্ব পরিচিতি হওয়ায় প্রায়ই সুখ দুঃখের আলাপ সালাপ করেন, যা সার্ভিসের নর্মসের বাইরে চলে যায়। ফারুক ভাই বললেন- দেখো, তুমি তো আমার সম্পর্কে জানো, এই দলটার জন্য কত কিছু করলাম, কিন্তু দুঃখের কথা কি বলবো- নিজের কাজটাই করতে পারছি না। ইলেকশনের আগে ইনারা কত কথা বললেন, এখন আর আমাকে চিনতেই চায় না!

কেনো, কি হয়েছে, ফারুক ভাই?

তুমি তো জানোই, আমরা চাইলে আইনের মধ্যে থেকেই অনেকের জন্য অনেক কিছু করতে পারি। এবারের ইলেকশনে আমার ডিউটি ছিল বিএনপি মহাসচিব মান্নান ভুইয়ার এলাকায়। ট্রুপস নিয়ে ঘাটি গাড়লাম নরসিংদিতে। প্রথমেই সাক্ষাৎ করি আওয়ামীলীগ ক্যান্ডিডেটের সাথে, এতে সবাই ধারণা করে- খুব প্রফেশনাল অফিসার, এবং আ’লীগের অনুগত! তাকে আশ্বস্ত করলাম- শান্তিপূর্ন ভোট হবে, কোনো কারচুপি কাটাকাটি সন্ত্রাসীকান্ড হবে না।

এরপরে দেখা করলাম বিএনপির হাইপাওয়ার ক্যান্ডিডেট আব্দুল মান্নান ভুইয়ার সাথে। তাকে বললাম, স্যার, আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, আমি একদম ভালো ইলেকশন করে দেব। আপনার জন্য সাধ্যমত সবই করবো। আমি তো আপনাদেরই লোক, স্টুডেন্ট লাইফে আপনাদের ছাত্র সংগঠন করেছি। আপনি নিশ্চিত বিজয়ী হবেন। এলাকায় কোনো সন্ত্রাসীর যায়গা হবে না, আওয়ামীলীগের নাম গন্ধও থাকবে না। তিনি বললেন, কর্নেল সাহেব ধন্যবাদ, সেনাবাহিনী তো আমাদের প্রাইড, আপনারা আইনমত কাজ করলেই হবে।

পরে আরও দেখা হয়েছে, ইলেকশন নিকটবর্তী হলে একদিন সুবিধামত সময়ে ভুঁইয়া সাহেবকে বললাম, ‘স্যার, ইলেকশনে আপনার বিজয় সুনিশ্চিত, এবং আপনারা সরকারও গঠন করবেন। তবে আমার একটা বিষয় আছে- আপনাকে একটু দেখতে হবে। ছোট ভাই জোসেফ জেলে আছে, আমার মায়ের খুব আশা ওকে বাইরে আনার। আর হারিস পলাতক আছে, ও একটু ফ্রি চলাফেরা করতে চায়। আমি আশ্বাস দিচ্ছি, স্যার, ওরা আর কোনো উল্টা পাল্টা কিছু করবে না। আসলে এমপি মকবুলের উৎপাতে আমার ভাইগুলার জীবন ধংস হয়ে গেছে, লীগের গত আমলে আমার একভাই টিপুকে গুলি করে হত্যা করেছে হাজী মকবুলের ছেলে। আর এমপি মকবুল আমার বাকী দু’ভাইকে শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় ঢুকিয়ে দিয়েছে। সব শুনে মান্না ভুইয়া বললেন, ‘দেখেন কর্নেল সাহেব, এখন আমি এর কোনো খোঁজ খবর নিতে পারব না। তাছাড়া এখন ইলেকশন নিয়ে ব্যস্ত। আগে সরকারে আসি, তারপরে খোঁজ নিয়ে করে দেয়ার চেষ্টা করবো। আপনি টেনশন করবেন না।’

ইলেকশন হয়ে গেলো, সরকার গঠন করলেন মান্নান ভুইয়া সাহেবরা, কিন্তু আমি আর উনার সাথে দেখা করতে পারিনা। প্রটোকল, নরমসের বাধা! অনেক কষ্টে সৃষ্টে হেয়ার রোডের বাসায় উনার সাথে দেখা করলাম, তিনি অবশ্য চিনলেন। কেমন আছেন, খোশ খবর করে চা বিস্কুট খাইয়ে বিদায় করে দেয় আর কি। আমি মোটামুটি জোর করেই ভাইদের কথা তুললাম। তিনি বললেন, ‘দেখুন আমি তো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী নই, তাও আপনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আমি বলে দিব। আপনি ওখানে যোগাযোগ করবেন।’ কিন্তু উনার কথায় তেমন কোনো আন্তরিকতা ছিল না।

‘চলো তোমাকে নিয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীর বাসায় যাই, সহকর্মীকে বললেন ফারুক ভাই। দু’দিন পরে দু’জনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে গেলেন। কথা হলো। কিন্তু মান্নান ভুইয়া কিছু বলে দিয়েছেন, এমন কোনো আভাস ইঙ্গিত পাওয়া গেলো না। উল্টো শীর্ষ সন্ত্রাসী হারিস জোসেফের জন্য কিছু করার সুযোগ এই সরকারের নাই, বলে বিদায় করে দিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। সরকারের দুই মন্ত্রী থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ফারুক তার কোর্সমেটদের সাথেও বিষয়টা শেয়ার করেন। তাদের থেকে ধীরে ধীরে সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ে জানাজানি হয়।

এই ‘ফারুক ভাই’ হলেন লেঃ কর্নেল আজিজ আহমেদ, বর্তমানে লেফটেনেন্ট জেনারেল, সেনাবাহিনীর কোয়ার্টার মাস্টার জেনারেল (কিউএমজি) পদে কর্মরত। ২০০৯ সালে পিলখানা ম্যাসাকারের পরে মেজর জেনারেল আজিজকে নবগঠিত বিজিবির মহাপরিচালক পদে নিয়োগ দেন শেখ হাসিনা। পদের ব্যবহার করে আজিজ আহমেদ পুরোনো ভোল পাল্টে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার সাংঘাতিক আস্থাভাজন হতে আত্মনিয়োগ করেন। বিশেষ করে, ২০১৪ সালের ভোটারবিহীন নির্বাচনের সময় জেনারেল আজিজ ব্যক্তিগতভাবে উৎসাহী হয়ে নিজ ফোর্স বিজিবিকে ব্যবহার করে বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে ‘জিরো টলারেন্স’ ঘোষণা করেন, এবং ব্যাপক ধরপাকড় এবং খুনখারাবি করান। মেজর জেনারেল আজিজের কাজে খুশি হয়ে শেখ হাসিনা তাকে আস্থায় নেন, একাধিক সেশনে একান্ত আলাপ করেন। শেখ হাসিনা তার দুর্বল সরকারের জন্য আজিজকে অপরিহার্য মনে করেন। পলে লেফটেনেন্ট জেনারেল পদোন্নতি দিয়ে সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে এনে কোয়ার্কটার মাস্টার জেনারেল পদে বসান। সার্ভিস ছাড়াও ফারুক ভাইকে নিরাশ করেননি শেখ হাসিনা। তার অনুরোধমত, ২০১৫ সালে সুপ্রিম কোর্ট দিয়ে জোসেফের মৃত্যুদন্ড কমিয়ে যাবজ্জীবন কারাদন্ড করে দেন। নামে কারাগার হলেও জোসেফ গত দু’বছর পিজি এবং ঢাকা মেডিকেলে ভিআইপি কেবিনে সর্বোচ্চ সুযোগ সুবিধা দিয়ে প্রায় ফ্রি করে রাখার ব্যবস্থা করেন। অবশেষে গত সপ্তাহে রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় বের জোসেফকে মুক্তি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দেন। আর হারিসকে বহু আগেই বাইরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। নিজের পদ এবং সেনাবাহিনীর প্রভাব ব্যবহার করে জেনারেল আজিজ তার ভাই শীর্ষসন্ত্রাসী জোসেফকে কারামুক্ত করবেন এমন আশংকা প্রকাশ করে আগে থেকেই লেখালেখি চলছিল দেশের বিভিন্ন  মিডিয়া এবং সামাজিক মাধ্যমে। সেই আশংকার বাস্তবায়ন হলো অবশেষে!

বিমানবাহিনীর সাবেক কর্মকর্তা ওয়াদুদ আহমেদের পাঁচ পুত্রের মধ্যে সবার ছোট তোফায়েল আহমেদ জোসেফ তার বড় ভাই হারিস আহমেদের হাত ধরে রাজনীতির মাঠে পদার্পণ করেন। বড় ভাই জেনারেল আজিজ আহমদ ফারুক। নব্বইয়ের দশকে জাতীয় পার্টি ছেড়ে হারিস যোগ দিয়েছিলেন যুবলীগে। তৎকালীন ৪৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলরও হয়েছিলেন তিনি। জোসেফ তার বড় ভাইয়ের ক্যাডার বাহিনীর প্রধানের দায়িত্বপালন করেন। এরপর থেকে মোহাম্মদপুর-হাজারীবাগসহ আশপাশের এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেন জোসেফ। যোগ দেন সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আলোচিত সেভেন স্টার গ্রুপে। পুরো রাজধানী তখন সেভেন স্টার গ্রুপ ও ফাইভ স্টার গ্রুপ নামে দু’টি বাহিনী নিয়ন্ত্রণ করত। টক্কর লাগে এমপি হাজী মকবুলের সাথে। গোলাগুলিতে নিহত হয়  হারিসের বড়ভাই টিপু। মোহাম্মদপুর থানা আওয়ামী লীগের সদ্য বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক মিজানের বড়ভাই মোস্তফাকে হত্যা করে ১৯৯৭ সালে গ্রেফতার হয় জোসেফ। ২০০৪ সালে জোসেফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ঢাকার জজ আদালত।  হাই কোর্ট ওই রায় বহাল রাখে। জোসেফ ২০ বছর আগে যখন গ্রেপ্তার হয়েছিলেন, তার নামে তখন ঢাকার বিভিন্ন থানায় চাঁদাবাজি, খুন, অবৈধ অস্ত্র বহনের অভিযোগে অন্তত ১১টি মামলা ছিল। এভাবেই শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় নাম উঠে আসে জোসেফের।

চলতি মাসে সেনাপ্রধান নিয়োগের সিস্টেমে জেনারেল আজিজ শেখ হাসিনার অন্যতম ক্যান্ডিডেট হলেও শুভাকাঙ্খিরা পরামর্শ দিয়েছেন, আজিজকে সেনাপ্রধান করে সুবিধা হবে না, কেননা জেনারেল আজিজ সেনাবাহিনীতে সবচেয়ে আনপপুলার লোক। বিশেষ করে, জোড়া শীর্ষসন্ত্রাসীর জেষ্ঠ্য সহোদরকে সেনাবাহিনী প্রধান করা হলে জনমনে দারুণ বিরুপ মনোভাব হবে, তাছাড়া সেনাবাহিনীর সদস্যরা অনেকেই এই নিয়োগ মানতেও চাইবে না। আজিজ ইতোমধ্যে তার চাহিদা সব আদায় করে নিয়েছে। এরপরে তিনি যেকোনো অঘটন ঘটাতে পারেন নিশ্চিন্তে, তাঁর সেই অভ্যাস আছে।

 

একরাম হত্যা বদির হজযাত্রা জোসেফের মুক্তি ও খালেদা জিয়ার আটকে থাকা

মাদকের গডফাদার হিসেবে গোয়েন্দাদের তালিকার এক নম্বরে থাকা সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আব্দুর রহমান বদি ওমরাহ পালনের নামে দেশ ছেড়েছেন। এদিকে ‘নিরপরাধ’ কাউন্সিলর মো. একরামুল হককে গুলি করে হত্যার অভিযোগ উঠেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে। একই সময়ে শীর্ষ সন্ত্রাসী ও খুনের দায়ে প্রথমে ফাঁসি ও পরে যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত তোফায়েল আহমেদ জোসেফ রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে বিদেশে গেছেন। কিন্তু রাজনৈতিক মামলায় শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানোয় জেলখানায় আটকে আছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ৮ জুন তার কারাবাসের ৪ মাস পূর্ণ হচ্ছে। এ নিয়ে দেশের রাজনীতিতে বেশ তোলপাড় সৃষ্টি করেছে। নির্বাচনের বছর হওয়ায় এসব ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন বিশ্লেষকরা। পাশাপাশি মাদক নির্মূলের প্রশ্নে দেশবাসীর মত থাকলেও চলমান অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে একরাম ‘হত্যা’র পর বিষয়টি ব্যাপকভাবে সমালোচিত হচ্ছে। নিহতের পরিবারের সংবাদ সম্মেলন ও হত্যা সংশ্লিষ্ট অডিও প্রকাশের পর কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে নিরপরাধ ব্যক্তিদের হত্যার বিষয়টি ফের আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। বিষয়টিতে দেশবাসীর মধ্যে ক্ষোভও বিরাজ করছে। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে।

কাউন্সিলর একরাম হত্যা
কক্সবাজারের টেকনাফ পৌরসভার তিন বারের নির্বাচিত কাউন্সিলর মো. একরামুল হক। উপজেলা যুবলীগের সাবেক সভাপতিও তিনি। তাকে বাসা থেকে র‌্যাবের পরিচয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা ডেকে নেওয়ার পর ২৬ মে রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হত্যার অভিযোগ মিলেছে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তিনি একজন মাদক কারবারি। তবে তাকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যার অভিযোগ করেছেন তার স্ত্রী আয়েশা বেগম। অভিযোগের পক্ষে নিহত একরামের স্ত্রী এ নিয়ে কথোপকথনের অডিও প্রকাশ করে দিয়েছেন। পরে সারা দেশে সমালোচনার ঝড় উঠে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, অডিও তিনিও শুনেছেন। পুরো ঘটনা ম্যাজিস্ট্রেট তদন্ত করবেন। অভিযোগ প্রমাণিত হলে এর সঙ্গে জড়িতদের ছাড় দেওয়া হবে না। এদিকে র‌্যাব বলেছে, প্রকাশ হওয়া অডিও খতিয়ে দেখছে বাহিনীটির সদর দফতর।

একরামের পরিবার যা বলছেন
বন্দুকযুদ্ধে নয় বরং বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে পরিকল্পিতভাবে কাউন্সিলর একরামকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তার স্ত্রী আয়েশা বেগম। গত ৩১ মে কক্সবাজারে সংবাদ সম্মেলনে বাবা হত্যার বিচার চেয়ে চিৎকার করে কেঁদেছে একরামের দুই মেয়ে নাহিয়ান হক (১১) ও তাহিয়া হক (১৩)। ঘটনার সময়কার ফোনকলের অডিও সাংবাদিকদের শুনিয়েছেন একরামের স্ত্রী আয়েশা বেগম। সেই অডিওতে শোনা যাচ্ছে যে, একরামুল হকের নিহত হওয়ার ঘটনার সময় এবং তার আগমুহূর্তে ঘটনাস্থলে মোবাইল ফোনে তিনবার কল এসেছিল। শেষ ফোন কলটি রিসিভ হলেও ঘটনাস্থল থেকে ফোনটিতে কেউ উত্তর দিচ্ছে না। প্রথমে আয়েশার কিছুটা কথা আছে। কিন্তু পরে ঘটনাস্থল থেকে একটা ভয়াবহ পরিবেশের চিত্র পাওয়া যায় এই অডিওতে। একরামুল হকের স্ত্রী আয়শা বেগম বলেছেন, ঘটনার আগমুহূর্তে তার দুই মেয়ে প্রথমে একরামুল হকের মোবাইল ফোনে কল করে তার সাথে অল্প সময় কথা বলেছিল। এই কথোপকথনে পরিস্থিতি গুরুতর মনে হওয়ায় সাথে সাথে আয়শা বেগম নিজে ফোন করেন। তার ফোন কলটি রিসিভ করা হয়। কিন্তু অপর প্রান্ত থেকে কোনো জবাব পাননি। তিনি গুলি এবং ঘটনাস্থলের সব শব্দ শুনতে পেয়েছেন।

আয়েশা বলেন, ‘আমার মেয়ে কথা বলেছিল ওর আব্বুর সাথে। তারপর মেয়ে বললো, আম্মু; আব্বু কান্না কান্না গলায় কথা বলছে। তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে ফোন দিলাম। সেখানে আমার হাসবেন্ড বলতেছে, লোকটি নাজিরপাড়ার লোক হবে, আমি না। তারপর র‌্যাব একজন বলতেছে, এটাতো এটা না। আরেকজন র‌্যাব বলতেছে, আপনারা এটা। তারপরে শ্যুট করে দিছে একজন। তারপরে বলছে, ওনাকে শেষ করেছি। এখন বাইকে শ্যুট করো। তখন গাড়িতে শ্যুট করে দিছে ওনারা।’

আয়শা অভিযোগ করেছেন, তার স্বামীকে র‌্যাবের স্থানীয় দু’জন কর্মকর্তা ডেকে নিয়ে হত্যা করেছে। স্ত্রী আয়েশার দাবি, একরাম মাদক ব্যবসার মতো ঘৃণিত পেশার সঙ্গে কখনো জড়িত ছিলেন না। বরং ইয়াবাসহ সব ধরনের মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন তিনি।

আয়েশা বলেন, ‘গত ২৬ মে রাত সাড়ে ৯টার দিকে টেকনাফে দায়িত্বরত সরকারি গোয়েন্দা সংস্থার এক কর্মকর্তা জমি কেনার কথা বলে একরামকে ডেকে নিয়ে যান। কিন্তু রাত ১১টার পরও বাড়ি ফিরে না আসায় স্বামীর মোবাইল নম্বরে কয়েকবার ফোন দিই। প্রতিবারই আমাদের সঙ্গে কেঁদে কেঁদে কথা বলেছেন আমার স্বামী একরাম।’ চোখের পানি মুছতে মুছতে আয়েশা বলেন, ‘সবশেষ রাত ১১টা ৩২ মিনিটে তিনি ফোন রিসিভ করলেও কথা বলেননি। ওই সময় মোবাইলের অপর প্রান্তের সব কথা আমরা শুনতে পেরেছি। আমরা শুনছিলাম কত নির্মম পরিস্থিতি তিনি পার করেছেন। কী নির্দয়ভাবে তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। আমার স্বামীর আর্তনাদ এখনো আমার কানে বাজছে।’ এ সময় মাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ওঠে একরামের দুই কিশোরী মেয়ে। চিৎকার দিয়ে বলেন, ‘আমার আব্বুকে হত্যা করা হয়েছে। আব্বুকে হত্যার বিচার চাই। আব্বু ছাড়া কে আমাদের স্কুলে নিয়ে যাবে। আমরা কাকে আব্বু বলে ডাকবো।’ এ সময় অসহায় মেয়ে দুটির কান্নায় সংবাদ সম্মেলনের পরিবেশ ভারি হয়ে যায়। প্রায় ১৫ মিনিট বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন উপস্থিত সবাই। আয়েশা বেগম সাংবাদিকদের বলেন, আমরা মাদক নির্মূল অভিযানকে সমর্থন করি। কিন্তু এ অভিযানে যেন আমার স্বামীর মতো নিরাপরাধ কেউ নির্মম হত্যার শিকার না হয়। কোনো নারী যেন অকালে স্বামীহারা না হয়। কোনো সন্তান যেন পিতৃহারা না হয়। মাদক ব্যবসায়ীরা অপকৌশলে মাদকবিরোধী অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে নিরীহ মানুষকে হত্যা করছে দাবি করে আয়েশা বলেন, আমার স্বামীর নাম একরামুল হক। তার পিতার নাম আব্দুস সত্তার। টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী পাড়া এলাকার বাসিন্দা। কিন্তু র‌্যাবের পাঠানো বিবৃতিতে যার কথা বলা হয়েছে তিনি একরামুল হক, পিতা মোজাহের মিয়া প্রকাশ আব্দুস সত্তার। সদর ইউনিয়নের নাজিরপাড়া তার ঠিকানা। নাম ও ঠিকানা ভুল করে উদ্দেশ্যমূলক ও রহস্যজনকভাবে আমার স্বামীকে হত্যা করা হয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে স্বামী হত্যার বিচার চাই আমি।

তবে র‌্যাবের মুখপাত্র কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান জানিয়েছেন, র‌্যাব সদর দফতর এই অডিও খতিয়ে দেখছে।

স্থানীয়রা বলছেন, একরামুল হক তিন বারের নির্বাচিত একজন কাউন্সিল। তিনি প্রতিদিন মোটরসাইকেলে করে মেয়েদের স্কুলে দিয়ে আসতেন আবার আনতেন। তার বসবাসের ঘরটিও পরিপাটি নয়। একতলা ভবন করার জন্য অনেক আগে কাজ শুরু করলেও অর্থের অভাবে তা আর শেষ করা সম্ভব হয়নি। তিনি যদি মাদক ব্যবসায়ী হবেন, তাহলে তার পরিবারে অর্থনৈতিক টানাপড়েন থাকার কথা নয়।

তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমার জানামতে, তার তিনটি- মাদক অধিদপ্তর থেকে যে লিস্ট বানিয়েছে, সেটার ভেতরে তার নাম আছে। সেটাও আমি দেখেছি। আরও একটি সংস্থার লিস্টে তার নাম ছিল। এ সবগুলো নিয়ে তদন্ত হবে। তারপর বলতে পারবো যে, কে দোষী?’

কক্সবাজারের পৌর মেয়র এবং সেখানকার আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুর রহমান চৌধুরী এই হত্যাকা-ের বিচার চেয়ে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি খোলা চিঠি পাঠিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তারা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত চান। এ ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে মাদকবিরোধী পুরো অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করা হচ্ছে।

প্রসঙ্গত, গত ২৬ মে র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে কাউন্সিলর একরাম নিহত হন। এ সময় ১০ হাজার পিস ইয়াবা, একটি পিস্তল, একটি ওয়ান শ্যুটারগান, ৬ রাউন্ড গুলি, ৫ রাউন্ড গুলির খোসা এবং একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করার দাবি করে র‌্যাব।

‘গডফাদার’ এমপি বদির হজযাত্রা
মাদকবিরোধী অভিযানে যখন তাকে গ্রেফতার করা না করা নিয়ে তুমুল বিতর্ক চলছিল তার মাঝেই ওমরাহ পালনের নাম করে দেশ ছেড়েছেন ইয়াবার গডফাদার হিসেবে গোয়েন্দাদের তালিকার শীর্ষে থাকা সরকার দলীয় কক্সবাজারের এমপি আব্দুর রহমান বদি। ৩১ মে মধ্যরাতে একটি বেসরকারি বিমানে হযরত শাহাজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বদি দেশ ছাড়েন। তার সঙ্গে মেয়ে, মেয়ের জামাই, বন্ধু আকতার কামাল ও মৌলানা নূরীও গেছেন সৌদি আরবে। মাদক বিরোধী অভিযান চলাকালে এমপি বদির হঠাৎ সৌদি আরবে গমনকে ভিন্নভাবে দেখা হচ্ছে। ‘বন্দুকযুদ্ধ’ থেকে বাঁচতেই বদি ওমরাহর কথা বলে দেশ ছেড়ে যে পালিয়েছেন এটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে সরকার তাকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কীভাবে দিলো তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে ব্যাপকভাবে।

দেশ ছাড়ার আগে এমপি বদি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘অভিযানের ভয়ে দেশ ছাড়ার তথ্যটি সম্পূর্ণ অসত্য। নিয়ম অনুযায়ী দেশ ছাড়তে যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়েছি।’ ওমরাহ পালন শেষ ১৭ জুন দেশে ফিরবেন বলেও জানিয়েছেন তিনি।

সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারী হওয়া সত্ত্বেও সরকার দলীয় সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদি কী করে ওমরাহ পালনের নামে সৌদি আরব চলে গেলেন তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আনোয়ার হোসেন। মাদকের ‘গডফাদারদের’ ছাড় দেয়া হচ্ছে অভিযোগ করে চলমান অভিযান সফল হওয়া নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন তিনি।

এদিকে ‘বদি যে মাদক ব্যবসার গডফাদার তার প্রমাণ কী?’ -এমন প্রশ্ন তুলেছেন ওবায়দুল কাদের। ‘মাদক ব্যবসার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংসদ সদস্য আবদুর রহমান বদিও ছাড় পাবে না’ বলেও জানিয়েছেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও সেতুমন্ত্রী।

বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদক বিরোধী অভিযানের নামে কথিত বন্দুকযুদ্ধে যাদের হত্যা করা হচ্ছে তাদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে কি প্রমাণ আছে? গোয়েন্দাদের তালিকায় থাকা সন্দেহভাজন মাদক কারবারিরা যেখানে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হচ্ছেন, সেই তালিকার এক নম্বরে থাকা গডফাদার বদিকে ধরতে কেন প্রমাণ চাওয়া হচ্ছে? শুধু অভিযোগের কারণে যদি এমপি বদিকে ধরা না যায় তবে একই অভিযোগের ভিত্তিতে এমনকি তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তিদেরকেও কথিত বন্দুকযুদ্ধের নামে গুলি করে হত্যা করা নিয়ে সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক। তাছাড়া, কেউ অপরাধী হলে প্রচলিত আইনের মাধ্যমে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা না করে বিনাবিচারে হত্যা নিয়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্ন তুলেছে মানবাধিকার কমিশন। কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক এক বিবৃতিতে মাদক বিরোধী অভিযানে বিনাবিচারে বন্দুকযুদ্ধের নামে সাধারণ মানুষ যাতে হত্যার শিকার না হয়, সেদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্টদের সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।

খুনের সাজাপ্রাপ্ত আসামিকে ক্ষমা
যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তোফায়েল আহমেদ ওরফে জোসেফ রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পাওয়ার পর তা নিয়ে সামাজিক নেটওয়ার্কসহ বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, রাষ্ট্রপতি তার সাংবিধানিক ক্ষমতা বা এখতিয়ারবলে ক্ষমা করেছেন। আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের টানা এই দুই মেয়াদে ২০ জনের বেশি মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় ছাড়া পেয়েছেন। রাষ্ট্রপতির এই এখতিয়ার কীভাবে প্রয়োগ করা হয়, আর প্রয়োগের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনা কতটা থাকে? এসব প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকদের অনেকে। হত্যা মামলায় জোসেফের বিচারিক আদালতে মৃত্যুদ- হয়েছিল ২০০৪ সালে। ২০১৫ সালে গিয়ে উচ্চতর আদালত তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়। সেই সাজা ক্ষমা করার জন্য তার মা রাষ্ট্রপতির কাছে আবেদন করেছিলেন ২০১৬ সালে। শেষ পর্যন্ত সাজাপ্রাপ্ত এই আসামি রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় মুক্তি পেয়ে মালয়েশিয়া চলে গেছেন।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, নিয়মনীতি মেনেই তাকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। ‘সে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে। ক্ষমা প্রার্থনা করলে তাকে তার যে শাস্তি ভোগের মেয়াদ প্রায় ২০ বছরের অধিক হয়ে গেছে। এবং তার যাবজ্জীবন ছিল। অর্থদ- ঠিক রেখে মহামান্য রাষ্ট্রপতি এক বছর কয়েকমাস দুই বছরের কাছাকাছি সময় তাকে মওকুফ করেছেন। তার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়ার পারমিশন দিয়েছেন।’

এর আগে ২০১৬ সালে মৃত্যুদ-প্রাপ্ত একজন আসামিকে রাষ্ট্রপতি ক্ষমা করেছিলেন। এছাড়া ২০১১ সালে জাতীয় সংসদে একজন সংসদ সদস্যের প্রশ্নে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দিন খান আলমগীর একটি পরিসংখ্যান দিয়েছিলেন। তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ২১ জনের মৃত্যুদ- মওকুফ করা হয়েছে। এগুলোর ক্ষেত্রেও রাজনৈতিক বিবেচনার প্রশ্ন উঠেছিল। কয়েক বছর আগে এই ইস্যু নিয়ে হাইকোর্ট থেকে একটি রায়ও এসেছিল। তাতে বলা হয়, সাজা মওকুফের ক্ষেত্রে কারণ ব্যাখ্যা করা উচিত। এ ব্যাপারে একটি নীতিমালা তৈরির নির্দেশও ছিল সেই রায়ে। সেই নীতিমালা এখনো হয়নি বলে জানা গেছে। তবে আইন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সংবিধানেই রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা প্রয়োগের ব্যাপারে পরিষ্কার বলা আছে এবং সব নিয়ম মেনেই কারও সাজা মওকুফের সিদ্ধান্ত আসে।

সিনিয়র আইনজীবী শাহদ্বীন মালিক বলেছেন, ‘রাষ্ট্রপতির এই ক্ষমতা প্রয়োগের কারণ যেহেতু ব্যাখ্যা করা হয় না, সেখানে এই অস্বচ্ছতার কারণেই জনমনে সন্দেহ তৈরি হচ্ছে।’ জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক মিজানুর রহমান বলেছেন, ‘সাজা মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়ে নানান প্রশ্ন যে উঠে, সেটা নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। এই ক্ষমতাগুলো প্রয়োগ করার ক্ষেত্রেও কিন্তু এক ধরনের সুবিবেচনাপ্রসূত হতে হয়। সেটা যদি না হয়, তাহলে কিন্তু নৈতিকতার দিক থেকে সেগুলো দুর্বল হিসেবে চিহ্নিত হয়। সেটি আইনে শাসনের জন্য কোনো সুখ-বার্তা বহন করে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘সাধারণ জনগণের মধ্যেও নানান প্রশ্ন তৈরি করে যে, কেন ক্ষমা করা হলো? কার প্রভাবে ক্ষমা করা হলো? কোন স্বার্থে ক্ষমা করা হলো, ইত্যাদি ইত্যাদি। এই যে বাড়তি প্রশ্নগুলোর সম্মুখীন হতে হয়, এটি কিন্তু আইনের শাসনের জন্যে এবং বিচার বিভাগের জন্যে খুব একটা সুখকর ব্যাপার নয়।’

উল্লেখ্য, ১৯৯৬ সালে মোহাম্মদপুরের ব্যবসায়ী মোস্তাফিজুর রহমান হত্যা মামলার আসামি ছিলেন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তোফায়েল আহমেদ জোসেফ। নব্বইয়ের দশকে মোহাম্মদপুর এলাকায় ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন জোসেফ। তখন আরেক শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপে যোগ দেন তিনি। রাজধানীতে তখন ‘সেভেন স্টার’ গ্রুপ ও ‘ফাইভ স্টার’ গ্রুপ দাপিয়ে বেড়াত।

গত ২৭ মে তার সাজা মওকুফ করা হয়। ছাড়া পেয়েই গোপনে দেশ ছেড়েছেন তিনি। এর আগে ২০১৬ সালের জুন মাসে জোসেফের মা রেনুজা বেগম ছেলের সাজা মওকুফের জন্য আবেদন করেন। আইন মন্ত্রণালয় সাজা মওকুফের পক্ষে মতামত দেয়। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও ইতিবাচক মতামত পাঠানো হয়। এরপর প্রায় দুই বছর বিষয়টি নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা শোনা যায়নি। জোসেফ দেশ ছেড়ে চলে যাওয়ার পর তাকে ক্ষমা করার বিষয়টি জানাজানি হয়।

সূত্রমতে, কোনো জটিল রোগ ছাড়াই ২০১৫ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৭ সালের ৮ মে পর্যন্ত টানা ২০ মাস কারাগারে না থেকে হাসপাতালে ছিলেন জোসেফ।

রাজনৈতিক মামলায় খালেদা জিয়ার আটকে থাকা
দুর্নীতির একটি মামলায় ৫ বছরের দ- দিয়ে ৮ ফেব্রুয়ারি নির্জন কারাগারে পাঠানো হয় সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে। দেশের ইতিহাসে এটাই প্রথম- কোনো নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে জরুরি অবস্থা ছাড়া কারাগারে যেতে হয়েছে এবং জেলখানায় ঈদ করতে হচ্ছে।

আদালত সূত্রের তথ্যমতে, যে মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসনকে কারাগারে নেওয়া হয়েছিল, সেই মামলায় হাইকোর্ট, আপিল বিভাগ থেকে জামিন পেয়েছেন অনেক অগে। কিন্তু পরে রাজনৈতিক ৬টি মামলায় তাকে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়। এর মধ্যে কুমিল্লার দুটিতে হাইকোর্ট বিভাগ জামিন দিলেও আপিল বিভাগ সেই জামিন রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের প্রেক্ষিতে স্থগিত করেছেন। অপর ৪টি মামলায় এই রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত জামিন করানো সম্ভব হয়নি। ফলে ঈদের আগে বেগম জিয়ার আর মুক্তির সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে নির্জন কারাগারে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছে। বাম হাতসহ তার শরীরের একাংশ প্রায় অচল হয়ে গেছে বলে বিএনপি নেতা ও তার আইনজীবীরা জানিয়েছেন।

একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বয়বৃদ্ধ নারীকে রাজনৈতিক মামলায় এভাবে আটকে রাখায় হতাশ হয়েছেন তার শুভাকাক্সক্ষীরা। সেই সাথে ক্ষুব্ধও তারা। বিএনপি এখন আর আদালতের উপর নির্ভর না করে খালেদা জিয়ার মুক্তির জন্য কঠোর আন্দোলন দিয়ে রাজপথে নামার হুমকি দিচ্ছে। দলীয় সূত্র বলছে, ঈদুল ফিতরের পর বিএনপি রাজপথে নামবে। এ ক্ষেত্রে তারা আর সরকারকে কোনো ছাড় দিবেন না বলেও হুঁশিয়ারি দিয়েছেন দলের শীর্ষ নেতারা। সেই সাথে জাতীয় ঐক্য গড়ারও তোড়জোড় চলছে। সেটি সফল হলে গণতন্ত্র মুক্তির দাবিতে জাতীয় ঐক্য আন্দোলনের ব্যানারে রাজপথে দেখা যাবে আওয়ামী বিরোধী ঘরানার সব রাজনৈতিক দলকে। তবে সেই প্রচেষ্টা কতটা সফল হবে তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, সময়ই সব বলে দেবে।

নজর রাখছে জাতিসংঘ
জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ বিষয়ক দফতর ইউএনওডিসি এক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, তারা বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে। বাংলাদেশে মাদক বিরোধী অভিযানে বহু মৃত্যুর ঘটনায় গণমাধ্যম এবং সিভিল সোসাইটির তরফ থেকে বিভিন্ন অনুসন্ধানের জবাবে তারা এই বিবৃতি প্রকাশ করেছে বলে জানিয়েছে ইউএনওডিসি। সেই সাথে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম জিয়াকে কারাগারে আটকে রাখায় জাতিসংঘ মহাসচিবের ডেপুটি মুখপাত্র উদ্বেগের কথা পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর তারা সতর্ক দৃষ্টি রাখছে বলেও নিয়মিত এক ব্রিফিংয়ে বলা হয়েছে।

(সাপ্তাহিক শীর্ষকাগজে ০৪ জুন ২০১৮ প্রকাশিত)

আমারে মারবেন ক্যান, স্যার?

রবিউল রক্তশূন্য মুখে কাঁপতে কাঁপতে বলল, স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন? রবিউল যখন প্রশ্নটা করল তখন আমি সিগারেটে সর্বশেষ টান দিচ্ছি। প্রশ্ন শুনে সেকেন্ডের ভগ্নাংশের জন্য থামলাম। তারপর আবার লম্বা করে টান দিয়ে ঠোঁট গোল করে উপর দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে সিগারেট মাটিতে ফেলে বুট দিয়ে ঘষে আগুন নেভালাম। রবিউলের জবাব না দিয়েই বললাম, ফারুক! ওর চোখ বাঁধো।

রবিউল নামের মধ্যবয়সী লোকটা এবার চূড়ান্ত ভয় পেয়ে গেল। এতক্ষণ ধরে তার চোখে মুখে যে সামান্য আশা ছিল সেটা মুহুর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেছে। তার কপাল থেকে নিয়ে থুতনি পর্যন্ত পুরো মুখমন্ডল একটা নির্দিষ্ট ছন্দে কাঁপছে। ফারুক চোখ বাঁধার কাপড় খুঁজতে গাড়িতে চলে গেল। আমি বিরক্ত হলাম। গাড়ি থেকে নামার সময়েই জিনিষটা পকেটে করে নিয়ে আসা উচিত ছিল। ভালো ছিল গাড়িতেই চোখ বেঁধে রেখে দিতে পারলে। এসব কাজে দেরি করার কোনো মানে নেই। ঝামেলা যত দ্রুত সরানো যায় ততই মঙ্গল।

“স্যার আমারে কি মাইরা ফেলবেন?”- রবিউল দ্বিতীয়বারের মতো এই প্রশ্ন করলে আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, এত কথা কেন রে বাপ? উত্তর কিছুক্ষণের মধ্যে এমনিতেই পেয়ে যাবা। এখন আল্লাহ খোদার নাম নাও।

রবিউল এবার পুরোপুরি নিশ্চিত হয়ে গেল সে মারা যাচ্ছে। এক মুহুর্ত নিষ্প্রাণ চোখে তাকিয়ে তারপর অদ্ভূত এক কাজ করে ফেলল লোকটা। হাতে হ্যান্ডকাফ বাঁধা অবস্থায় ঝপ করে কাঁটা ফলের মতো আমার পায়ের নিচে পড়ে হাউমাউ করে বলল, স্যার আমারে মাইরেন না। আমি নির্দোষ স্যার! ও স্যার গো! আপনার দোহাই গো!

কে দোষী আর কে নির্দোষ সেটা ঈশ্বরের পরে যদি কেউ জানে তবে সেটা র‍্যাব-পুলিশ। এই লোকটা যে আপাতমস্তক ভালো মানুষ, সেই খবর তার স্ত্রীর অজানা থাকলেও আমাদের অজানা নয়। ভালো মানুষদের নাকি আয়ু কম থাকে, সেই ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি। যুগে যুগে ভালো মানুষদের এই পরিণতি ভোগ করতে হয়েছে। কে পরাঘাতে মরে নি? সক্রেটিস? কোপার্নিকাস? বান্না? এমনকি যিশু খ্রিষ্টকেও এভাবেই মরতে হয়েছে। যুগের নিয়মই এমন। সভ্যতার রীতি এটাই। আমি নিয়ম পাল্টানোর কেউ নই!
রবিউলকে টেনে হিঁচড়ে মাটি থেকে তোলা হলো। তার গায়ে এই বিস্তীর্ণ মাঠের কিছু ধুলো লেগে গেল। লোকটার কাঁপুনি ক্রমশই বাড়ছে। আমার জানামতে আগামীকাল জোছনা। এই পরিষ্কার আকাশে আজকের রাতটাকেই জোছনা রাত বলে মনে হচ্ছে। চাঁদের আলোয় রবিউলের চোখের কিনার ঘেষে নেমে পড়া অশ্রুর ধারা চিকচিক করছে। বিরাট আকাশের নিচে রাতের এই নির্জনতায় রবিউলকে মনে হচ্ছে সামান্য কীট পতঙ্গ, যার জন্ম হচ্ছে কেবলই মৃত্যুর জন্য!

রবিউল আরেকবার ঝুঁকে পড়ার সুযোগ নিতে গিয়ে ব্যর্থ হলো। এবার পেছন থেকে দুইজন তাকে শক্ত করে ধরে রেখেছে। পড়তে না পারলেও সে খানিকটা চিৎকার করে সেই একই কথা বলল, ‘স্যার আমারে মাইরেন না স্যার। আমি নির্দোষ স্যার। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। তাদের দেখার কেউ নাই স্যার। আমার বউ খুব অসুস্থ স্যার।’

আমি উল্টো ঘুরে পকেট থেকে সিগারেট বের করলাম। চারপাশে বাতাস, লাইটারে আগুন ধরাতে একটু সমস্যা হচ্ছে। কাজটাতে নতুন না আমি, তারপরও প্রতিবারই একটু হলে অস্বস্তি লাগে। সিগারেট তখন খুব কাজে দেয়। নিকোটিন রক্ত থেকে অনেকটাই উদ্বেগ কমিয়ে দেয়। যদিও এখানে উদ্বেগের মতো কিছুই নেই। লোকটা আহামরি কেউ না। ছোটখাটো ব্যবসায়ী। সরকারদলীয় এক নেতার টেন্ডারবাজীর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে এলাকায় হিরো হয়ে গেছে। স্থানীয় জনতার সহায়তায় নেতার ছেলেকে ধর্ষণ চেষ্টারত অবস্থায় ধরে গণধোলাইয়ের ব্যবস্থা করিয়েছে। তারপর নেতার পুত্রকে গ্রেফতারের জন্য করেছে থানা অবরোধ। লোকটার ভালো পজিশনে বেশ কিছু জমি আছে। নেতা ভদ্রলোক সেই জমি হজম করতে চাইছেন। বাংলাদেশের বাস্তব আইনে মৃত্যুর জন্য যথেষ্ট পরিমাণ দায় রবিউল জমা করে রেখেছে!

দুই মিনিট হয়ে গেছে। ফারুক আসতে এত দেরি করছে কেন? গুলি করেই কাজ শেষ না। আরো যন্ত্রযোগাড়ের ব্যবস্থা করতে হবে। হাত না চালিয়ে কাজ করলে কীভাবে হয়?

রবিউল ঘুরে ফিরে একই আর্তনাদ করেই যাচ্ছে। মুখ বেঁধে রাখলে ভালো হতো। সেটার অবশ্য খুব বেশি দরকার নেই। এই চিৎকার সৃষ্টিকর্তা ছাড়া কারো কানে পৌঁছাবে না, অবশ্য সৃষ্টিকর্তা যদি শুনতে ইচ্ছুক হোন তবেই। রবিউলের ভেতরেও বোধহয় একই বোধ জাগল। সে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো! ও আল্লাহ গো!

ডাকুক, বেশি করে ডাকুক। এসব বোকা মানুষগুলো ভাবে জগতে ঈশ্বরের একটাই সত্ত্বা। অথচ জগত অসংখ্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঈশ্বরে বিভক্ত। এই যে রবিউল নামের এই লোকটাকে আমি একটু পরে মারতে যাচ্ছি সেটা নিজের ইচ্ছায় নয়, আমাকে একজন ঈশ্বর আদেশ করেছেন। সেই ঈশ্বরকে আদেশ করেছেন হয়তো আরেকজন, আরেকজনকে আরেকজন, সেই আরেকজনকে অন্য আরেকজন। রবিউল নামের এই সামান্য কাপড় ব্যবসায়ীর ধারণাই নেই তাকে মারার জন্য কত নীরব আয়োজন ঘটে গেছে–কত বছর, কত যুগ আর শতাব্দি ধরে এই আয়োজন চলে আসছে। অথচ সে কেবল আমার দিকেই ঘৃণা নিয়ে তাকিয়ে আছে যেখানে আমার অপরাধটাই সর্বনিম্ন।

ফারুক কাপড় নিয়ে এসেছে। গাড়ির কাছে গিয়েই তার পেচ্ছাব চেপেছিল। সেই কাজ করতে গিয়ে একটু দেরি হয়েছে। এই পেচ্ছাব স্বাভাবিক না, শরীরে এঙজাইটি বেড়ে যাওয়ার কারণে এমন হয়েছে। ফারুকের মতো কালো কাপড়ের মানুষও যদি এঙজাইটিক হয়ে যায়, রবিউল নামের মানুষটার ভেতরে এখন কি হচ্ছে কে জানে!

ফারুক চোখ বেঁধে নিল। সর্বশেষ বারের মতো রবিউলের চোখের দিকে তাকালাম আমি। জোছনার আলোয় রবিউলের চোখ গড়িয়ে এখনো পানি পড়ছে। তার সাথে সমস্ত জগতের রাগ, ক্ষোভ, বিস্ময় এবং ঘৃণা।

রবিউলের সময় শেষ হয়ে এসেছে। শেষবারের মতোও সে চিৎকার করে বলল, ‘স্যার আমার দুইটা বাচ্চা মেয়ে আছে স্যার। ওরা আজকে কাঁঠাল খাইতে চাইছিল। বছরের প্রথম কাঁঠাল বাজারে উঠছে। ওরা কাঁঠালের আশায় সারা রাত বসে থাকবে স্যার। স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা মেয়ে আছে স্যার। আমার বউ অসুস্থ স্যার। তার ডায়বেটিস, প্রেশার। তারে ডাক্তারের কাছে নেয়ার কেউ নাই।’

আমি এসব কানে দিলাম না। অভ্যস্ত হাতে হোলস্টার থেকে পিস্তল বের করলাম। যেহেতু ব্যাপারটাকে ‘বন্দুক যুদ্ধ’ হিসেবে চালানো হবে সুতরাং বন্দুক দিয়ে গুলি করলে ভালো হতো। এতসব যন্ত্রণায় যাওয়ার দরকার নেই। এটা ইউরোপ আমেরিকা না যে গুলি ল্যাবে নিয়ে পরীক্ষা করা হবে। এটা বাংলাদেশ। এখানে একটা লাশের পেছনে এত সময় দেয়ার কিছু নেই। কেউ খুঁজতেই আসবে না।

আমি ট্রিগার টানলাম। “খট” করে একটা শব্দ হলো। এই শব্দ শুনেই রবিউল একেবারে চুপ হয়ে গেল। মানুষের বিশ্বাসের অনেক দেয়াল থাকে। সম্ভবত তার সর্বশেষ দেয়াল এখন ভাঙল। একটু আগেও হয়তো সে ভেবেছে কোনো না কোনো ভাবে সে বেঁচে যাবে। তার দুই বাচ্চাকে কাঁঠাল ভেঙে খাওয়াবে। পিস্তল টানার শব্দে সে বিশ্বাস টুঁটে গেছে। তাকে কালিমা পড়তে বলা উচিত। আমি বললাম না। একবার একজনকে বলেছিলাম। অর্ধ উন্মাদ লোকটা আমার মুখে থু থু দিয়ে বলেছিল “তোর কালিমা তুই পড়। তুইও মরবি একদিন!”

আসলেই কথাটা চমৎকার। সবারই তো মরতে হবে। হত্যা খুব বড় কোনো অপরাধ না। এটা পূর্বনির্ধারিত একটা বস্তু। আজকে আমি এই ক্রসফায়ার না করলে অন্য কেউ করত। আমাদের চারপাশের যে সকল ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঈশ্বর, তাদের কাজ কখনো আটকায় না। বরং যারা আটকায়, তাদেরকেই আটকিয়ে দেয়া হয়।

রবিউল বিড়বিড় করে বলল, স্যার আমারে ক্যান মারবেন?—এই প্রথমবারের মতো আমি কোনো প্রশ্নের উত্তরে বললাম, জন্মের অপরাধে। জন্মের অপরাধে সকলকেই মরতে হয়। তাছাড়া তুমি ঈশ্বরের দেশে বাস করো- ঈশ্বরবিরোধী কর্মকান্ড করেছো। ঈশ্বরের বিচারে তোমার শাস্তি হচ্ছে। এবার আসমানের ঈশ্বরের কাছে যাও। পরের বিচারটুকু তাঁর কাছে গিয়েই দিয়ো। তিনি যদি সত্যিই থেকে থাকেন তবে হয়তো এতদিন সব বিচার করবেন।

আমার এত জটিল কথা নেয়ার মতো অবস্থায় রবিউল যে নেই, সেটা আমিও জানি। তার ঠোঁট কাঁপছে। আমি স্থির হাতে পিস্তল উঁচিয়ে ধরলাম। চোখ বাঁধার কারণে রবিউল এই দৃশ্য দেখছে না, দেখলে গা মোচড়ামুচড়ি করত। মৃত্যুর প্রতি মানুষের সীমাহীন ভয়, জীবনের প্রতি সীমাহীন আশা। শেষ মুহুর্তেও মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। কেনো করে- কে জানে!

তিন ফুট দূর থেকে আমি রবিউলের বাম বুক তাক করলাম। আমার দলের বাকি তিন সদস্য চোখ বন্ধ করে ফেলেছে। আমি ট্রিগার চাপতে যাচ্ছি ঠিক এই মুহুর্তে রবিউল বলল, স্যার গো…..

আমি থেমে গেলাম।

রবিউল বলল, স্যারগো! আপনারও মেয়ে আছে গো স্যার!

আমার পাঁচ বছরের একটা মেয়ে আছে এটা এই লোকের জানার কথা না। লোকটা নিশ্চয়ই আন্দাজে বলে ফেলেছে। তবে আন্দাজ কিছুটা কাজ করেছে বলেই সে বাড়তি তিন সেকেন্ড সময় পেয়ে গেল। জীবনের শেষ সময়ে তিন সেকেন্ড সময়ও গুরুত্বপূর্ণ। কতটা দামী সেটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ।

আমি রবিউলের বুকে পরপর তিনটি গুলি করলাম।

:

মানুষের মধ্যে হাজার রকম তফাৎ। ধর্মে, বর্ণে, নামে, চেহারায়, কর্মে সব মানুষই আলাদা। মৃত্যু সব মানুষকেই এক করে ফেলে। গুলি করার পর সবার শরীর থেকে রক্ত বের হয়, কাঁটা ফলের মতো পড়ে যায়। সবাই শেষের দিকে এসে অপার্থিব গোঙানি দেয়। এখানে কোনো তফাৎ সৃষ্টি হয়না।

রবিউল মিনিট দুয়েক “মা গো” “পানি পানি” এবং “নাসিমা-ফাহিমা” বলে গোঙাচ্ছিল। একটু আগে সেটা স্থির হয়ে গেছে। নাসিমা-ফাহিমা বোধহয় তার দুই মেয়ের নাম। দুই মেয়ের জন্য আগামীকাল দিনটা ভীষণ যন্ত্রণায় যাবে। ৮ বছর আর ৬ বছরের দুই বাচ্চা হুট করেই আবিষ্কার করবে তাদের বাবা নেই। তাদের বাবা ছিল মাদক ব্যবসায়ী। তাদের বাড়ি পুলিশে আর মানুষে ভরে যাবে। দুইটা বাচ্চা হতবিহ্বল হয়ে তাদের মায়ের মুর্ছা যাওয়া দেখবে। আগামীকাল কবর খোড়া থেকে নিয়ে অশান্তি আর অনিশ্চিত প্রস্তুতির যে জীবন শুরু হবে সেটা আর কোনো দিন থামবে না।

প্রস্তুতি আমাদেরও নিতে হবে। লাশের পাশে কয়েকটা গুলির খোসা, কয়েশ পিস ইয়াবা রেখে দিতে হবে। একটা ভাঙাচোরা বন্দুক আছে, সেটা সেট করতে হবে জায়গামতো। লাশের পকেটে মোবাইল ফোনে কিছু রেকর্ড হলো কিনা দেখা দরকার। দূর থেকে কেউ ভিডিও টিডিও করে ফেললে সাময়িক সমস্যায় পড়ে যাব। একটু ঘুরে সেটাও নিশ্চিত করা উচিত। এদেশের মানুষের কল্পনাশক্তি নিম্নশ্রেণীর জীবের চেয়েও কম। এদের চোখের আড়ালে এক লাখ ক্রসফায়ার করলেও মস্তিষ্ক সেসব দৃশ্য কল্পনা করতে পারবে না। অথচ কোনো ভিডিওতে কারো চড় মারা দেখলেই মস্তিষ্কে আলোড়ন সৃষ্টি হয়ে যাবে। আলোড়ন সৃষ্টি হলেও তেমন কিছু হবে না। কিছুদিন আলোচনা হবে। এক সময় দলে দলে ভাগ হবে আলোচনাকারীরা। সামনে আসবে নতুন কোনো আলোড়ন। সেটা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাবে সবাই। তারপরও খুব যদি কিছু হয় তবে দেশে ঈশ্বরেরা আছেন। বাকিটুকু তারাই দেখবেন। তারপরও অডিও, ভিডিও থেকে সাবধান থাকা ভালো। সবকিছু শেষ হলে একটা মুখস্ত প্রেস ব্রিফিং দিতে হবে। সেখানে সবকিছু আগে থেকেই টাইপ করা আছে, শুধু এডিট করে রবিউলের নাম আর বয়স বসিয়ে দিলেই হয়।

আর দুই ঘন্টার মামলা। তারপর আমি নিশ্চিন্ত। শুধু আজকের জন্য না, আগামী অনেক দিনের জন্য। আসমানের ঈশ্বরই যে তার কাজে পুরষ্কৃত করেন তা না, মাটির ঈশ্বরেরাও তাদের কাজ করে দিলে পুরষ্কারের ব্যবস্থা করে দেন। আমার পুরষ্কার আছে। আসমানের ঈশ্বরের মতো এখানে সময়ক্ষেপণ নেই। এই পুরষ্কার হাতে আসবে খুব দ্রুত।

:
:

আমার স্ত্রী মিলি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, চা খাবে?

আমি পত্রিকা পড়ছিলাম। মুখ না তুলেই বললাম, দিতে পারো।

মিলি কিচেনের দিকে চলে গেল। আমি পত্রিকা ঘাটাঘাটি করছি। পঞ্চম পৃষ্ঠার সপ্তম কলামে গিয়ে কাঙ্খিত খবরটা খুঁজে গেলাম। “র‍্যাবের ক্রসফায়ারে মাদক ব্যবসায়ী নিহত!”

“গতকাল রাতে রাজধানীর কেরানীগঞ্জে র‍্যাবের সাথে বন্দুকযুদ্ধে রবিউল ইসলাম (৩৮) নামের এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছেন। নিহত রবিউল ডেমরা এলাকার আব্দুল মালিকের পুত্র। র‍্যাব জানায় গোপন খবরের ভিত্তিতে রবিউলকে নিয়ে মাদক উদ্ধারে বের হয় র‍্যাব। পথিমধ্যে রবিউলের সহযোগীরা র‍্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি ছুঁড়ে। র‍্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। এক পর্যায়ে পালানোর সময় রবিউল গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায়। র‍্যাব ঘটনাস্থল থেকে একটি বন্দুক, দুই রাউন্ড গুলি এবং চার’শ পিস ইয়াবা উদ্ধার করে। এ বিষয়ে কেরানীগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে!”

খবর পড়ে বরাবরের মতোই আমার হাসি পেল। রবিউলকে ধরা থেকে নিয়ে গুলি করা এবং লাশ মর্গে পাঠানো পর্যন্ত আমাদের ব্যয় হয়েছে সর্বমোট ১১ ঘন্টা। সাংবাদিকরা এত আয়োজন করে করা একটা ঘটনাকে পঞ্চম পাতার সাত নাম্বার কলামে দেড় ইঞ্চির মধ্যেই শেষ করে ফেলেছে। তিলটা গুলি করতে আমার যতটা সময় লেগেছে এই খবর পড়তে লেগেছে তারচেয়েও কম। জীবনের দাম এখন কারো কাছেই বেশি না। না খুনীর কাছে, না সাংবাদিকের কাছে, না রাজার কাছে, না জনগণের কাছে। এককভাবে এই হত্যার দায় আমি কীভাবে নিই?

মিলি চা নিয়ে এসেছে। তার হাঁটার ভঙ্গি কেমন যেন সাপের মতো। আমাদের বিয়ের ৮ বছর হয়ে গেছে। মিলির শরীরে এই আট বছরে কয়েক কেজি মেদ জমেছে। কিন্তু শরীরটা এখনো সেই আগের মতোই আবেদনময়ী। শাড়ির ফাঁক গলে পেটের মধ্যে যে ভাঁজ দেখা যাচ্ছে সেটা এতটুকু দৃষ্টিকটু নয়।

– মিলি পাশে এসে বসতেই আমি তাকে জড়িয়ে ধরলাম।
– মিলি কপট রাগ দেখিয়ে বলল, এত আহ্লাদ করার দরকার নাই।
– আমি মিলির শরীরে চাপ দিয়ে বললাম, তাহলে কি করতে হবে?
– সংসারের খবর রাখতে হবে। বউয়ের খবর রাখতে হবে। প্রতিদিন দেরি করে বাসায় ফিরলে বউ অন্য পুরুষ ঘরে ঢোকাবে কিনা, সেটা নিয়ে ভাবতে হবে।

– আর?

– আর বাচ্চাটার খবর রাখা দরকার। ৫ বছরের একটা বাচ্চা, বাবা বাবা বলে ঘুমিয়ে পড়ে। তার জন্য না একটা খেলনা এরোপ্লেন আনার কথা, সেটা কই?

শান্তা দুইদিন আগে এরোপ্লেনের আবদার করেছিল। রবিউলের ব্যস্ততায় সেটা মনেই করতে পারিনি। আহারে, আমার মেয়েটা হয়তো এরোপ্লেনের কথা ভেবে ঘুমাতে পারেনি। এক মুহুর্তের জন্য রবিউলের দুইটা মেয়ের কথা মাথায় আসল। কি যেন নাম? নাসিমা- ফাহিমা। ওরা বাবার কাছে কাঁঠাল খাওয়ার জন্য আবদার করেছিল। বাচ্চা দুইটা কী এ জীবনে আর কোনোদিন কাঁঠাল মুখে দিতে পারবে? অবশ্য তাদের জীবনে ঘোর অন্ধকারের এখনো অনেক বাকি। তাদের জমি দখল হবে, ব্যবসা হাতছাড়া হবে। এক সময় বানের পানির কচুরিপানার মতোই তাদেরকে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো লাগবে। জীবন কতটা নিষ্ঠুর কতটা অন্ধকার তার পূর্ণ শিক্ষা এরা খুব দ্রুত পেয়ে যাবে।

মিলি বলল, কি ভাবছ?

আমি বললাম, কিছু না।

– কিছু তো অবশ্যই। আজকাল তুমি আমাকে অনেক কিছুই বলো না। কোথায় যে কি করে বেড়াচ্ছ কে জানে! মেয়ে টেয়ে নিয়ে হোটেলে উঠলে কিন্তু খবর আছে। স্রেফ খুন করব। খুন করে বিধবা হয়ে যাব।

আমি আরেকবারের জন্য রবিউলের বিধবা স্ত্রীর কথা ভাবলাম। মেয়েটার বয়স কত হবে? হয়তো মিলির বয়সীই হবে, কিংবা আরো কম। এই মেয়েটা আজীবন একা থাকবে, কত দীর্ঘ রজনী পার করতে হবে একা একা। মেয়েটার শরীর থেকে মিলির মতোই গন্ধ বেরুবে, সেই গন্ধে পঙ্গপালের মতো ছুটে আসবে পতঙ্গ। দুইটা বাচ্চা মেয়েকে সামলাতে গিয়ে সে নিজে দিশেহারা হয়ে যাবে। এক সময় হয়তো ভুলেই যাবে শরীর কী, মন কী, জীবন কী? রবিউল মাত্র তিনটা গুলিতে উদ্ধার পেয়ে গেছে। এই মেয়ে সারা জীবন বুলেটবিদ্ধ হবে। রবিউলের মতো আর্তনাদ করার অধিকারটুকু সে পাবে না।

মিলি ভীষণ আদুরে গলায় বলল, এ্যাই…

– আমি বললাম, বলো।

– চলো না, একবার ঘুরে আসি।

– কোথায়?

– অজানাতে…

– সেটা কী?

– যেখানে নদী এসে মিশে গেছে। হাহাহা।

– হেয়ালী করছ?

– হ্যাঁ করছি। সত্যিই ঘুরে আসি। কতদিন ঘুরি না।

– কোথায় যাবে বলবে তো।

– গ্রান্ড সুলতানে যাব। শ্রীমঙ্গল। চারপাশে সবুজ আর সবুজ। মাঝখানে তুমি আর আমি। সুন্দর হবে না?

– হ্যাঁ হবে।

– কবে যাবে?

– আগামী সপ্তাহে।

মিলি চিৎকার করে বলল, ও মা সত্যিই?

আমি বললাম, হ্যাঁ সত্যিই। রেডি হও।

মিলি আমাকে জড়িয়ে ধরে বুকে মাথা রেখে বলল, আমার দাবী মানার জন্য তুমি আমার কাছে পাওনাদার হয়ে গেলে। আজকে তোমার যাবতীয় ঋণ শোধ করা হবে।
তার ঠোঁটের কোণে বাকা হাসি। এই হাসির অর্থ আমি জানি। এটা তার বিখ্যাত নিষিদ্ধ হাসি, এটা তার বিখ্যাত বিশুদ্ধ হাসি। আমি তাকে তরল গলায় কিছু বলতে যাব তখনি শান্তা ঘরে ঢুকে বলল, আব্বু!

আমি বললাম, জ্বী মা!

– আমার হেলিকপ্টার কই?

– আছে। কালকেই পেয়ে যাবা।

– তুমি আজকে আননি কেন? আজকে যদি হেলিকপ্টারওয়ালা মারা যায়?

– মারা যাবে না। আর মারা গেলেও আমি ঠিকই নিয়ে আসব কালকে।

– মারা গেলে তখন কীভাবে পাবে? লোকটার তো কবর হয়ে যাবে।

আমি ঘড়ির দিতে তাকালাম। সন্ধ্যে সাতটা বাজে। হিসেব মতে আজকে রবিউলের লাশ তার বাড়িতে যাওয়ার কথা। দীর্ঘ আয়োজনের পর এতক্ষণে সম্ভবত তার কবর হয়ে গেছে। সে এখন আসল ঈশ্বরের মুখোমুখি। আসল ঈশ্বর কী তাকে তার প্রাপ্য পুরষ্কারটুকু দেবেন?

আমার ঈশ্বর অবশ্য আমার প্রাপ্যটা পৌঁছিয়ে দিয়েছেন। ব্যাংক একাউন্ট আরেকটু ভারী হয়ে গেছে। সেখান থেকে ক্ষুদ্র একটা অংশ দিয়ে হবে গ্রান্ড সুলতান ট্রিপ। সেখান থেকে ফিরব, ঈশ্বর থেকে চলে আসবে নতুন কোনো নির্দেশনা।

আসল আর স্থানীয় ঈশ্বরদের মধ্যে পার্থক্যটা চমৎকার। আসল ঈশ্বর আমাদের সৃষ্টি করেন, আর স্থানীয় ঈশ্বরদেরকে সৃষ্টি করি আমরাই। আসল ঈশ্বরের মতোই স্থানীয় ঈশ্বরদের নিজস্ব ভক্ত থাকে, ধর্ম থাকে। পার্থক্য হচ্ছে আসল ঈশ্বর আজন্ম আরাধনা করেও ভক্ত ঈশ্বর হতে পারে না, ঈশ্বরকে বদলাতে পারে না। তবে এখানে ঈশ্বর বদল আছে, চরম ভক্ত থেকে ছোটখাটো ঈশ্বরে পদোন্নতির সম্ভাবনা আছে। দুই ক্ষেত্রেই ঈশ্বর বড় বেশি একরোখা। নিজেদের তৈরি আইনে তারা “বিরোধ” পছন্দ করেন না।

আমি এত কঠিন চিন্তা করছি কেন? ইদানিং কি মাথায় বেশি চাপ পড়ছে? চাপ কমানোর জন্য তাড়াতাড়ি ট্যুরটা করে ফেলতে হবে।

শান্তা দৌঁড়ে এসে আমার কোলে চড়ে বসল। আমি তার কপালে লম্বা করে চুমু দিলাম। বাচ্চাটা আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।

আমি অনুভব করলাম সেই চিরন্তন বাণী “পৃথিবীতে খারাপ মানুষ আছে, কিন্তু কোনো খারাপ বাবা নেই।”

ঠিক তখুনি আমার কানে রবিউলের চিৎকার চলে আসল। “স্যার আমারে মাইরেন না। আমার দুইটা বাচ্চা আছে।”

রবিউল বড় বেশি যন্ত্রণা দিচ্ছে তো! এভাবে আগে কেউ দেয়নি।

:

:

আমরা শ্রীমঙ্গল যাচ্ছি।

মিলি বাইরে দূরে কোথাও ঘুরতে বের হলে ড্রাইভার নেয়া পছন্দ করে না। তার মতে এতে প্রাইভেসী নষ্ট হয়। সময়টুকু নিজেদের থাকে না। মিলির কারণেই তখন আমাকে ড্রাইভার হয়ে যেতে হয়।

আমি ড্রাইভার হিসেবে যথেষ্ট সাবধানী। এখন পর্যন্ত ছোটখোটো কোনো দুর্ঘটনাও ঘটাইনি। তারপরও স্ত্রী সন্তান সাথে থাকলে সামান্য চাপ অনুভব করি। এত দূরের পথে ড্রাইভারকে আনলেই বোধহয় ভালো ছিল।

আমরা ভৈরব ব্রীজ পার হয়ে গেলাম। ব্রীজের পাশ ঘেষে রেলসেতু। শান্তা মুগ্ধ হয়ে চারপাশ দেখছে। মেয়েটাকে নিয়ে বাইরে বের হওয়া হয় খুবই কম। এখন থেকে একটু অভ্যেস করিয়ে নিতে হবে। মেয়ের বয়সের তুলনায় ততটা বুদ্ধি হচ্ছে না। এই বয়সের বাবা মায়ের সঙ্গ তার অনেক বেশি দরকার।

গাড়িতে রবীন্দ্র সংগীত বেজে চলেছে, “ফাগুন হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে গান।” মিলি গানের তালে তালে মাথা দোলাচ্ছে। তাকে দেখে মনে হচ্ছে সে তার আনন্দ প্রকাশের ভাষা খুঁজে পাচ্ছে না। গাড়ি ছুটে চলেছে একই গতিতে। বহুদিন পর ড্রাইভ করে আমিও আরাম পাচ্ছি।

আমরা হবিগঞ্জে ঢুকে পড়লাম। আর কিছুদূর গেলেই প্রকৃতির অপরূপ রূপ চোখে পড়বে। তারপাশে ঘন সবুজ বন, চা বাগান। মাঝখান দিয়ে রাস্তা। মিলি আর শান্তা আগে কখনো এদিকে আসেনি। তারা ঠিক কতটা যে খুশি হবে ভেবেই আমি আনন্দ পাচ্ছি। তবে আমার আনন্দে সাময়িক ব্যাঘাত ঘটে গেল।

সামনে বড় রকমের জ্যাম। এই রাস্তায় জ্যাম হওয়ার কথা না। আমি গাড়ি থেকে মাথা বের করে একজনের সাথে কথা বলে জানতে পারলাম সামনে একটা ট্রাক এক্সিডেন্ট হয়েছে। ট্রাক আটকে সাময়িক একটা জ্যামের সৃষ্টি হয়েছে। একটু পরেই সেটা খুলে যাবে।

গাড়ি থেকে চাইলে বের হওয়া যায়। এই মুহুর্তে বের হতে ইচ্ছে করল না। আশেপাশে দাঁড়ানোর মতো ভালো জায়গা নেই। বরং গাড়ি থামিয়ে স্ত্রী কন্যার সাথে একটু গল্প করা যায়।

আমাদের গাড়ির দুইপাশে আরো দুইটা গাড়ি এসে থেমে গেল। সবার চোখে মুখে বিরক্তি। ট্রাক এক্সিডেন্টে কেউ মারা গেছে কিনা এ খবর কেউ নিচ্ছে না। সবারই মনোযোগ কখন জ্যাম ছাড়বে তার প্রতি। আমি পেছন ঘুরে শান্তাকে জিজ্ঞেস করলাম, মা মণি কেমন আছো?

শান্তা বলল, ভালো আছি আব্বু। আর কতদূর?

আমি বললাম, এই তো চলে এসেছি। আর সামান্য দূর। তারপরেই পৌঁছে যাব।

শান্তা বলল, আমরা সেখানে গিয়ে অনেক মজা করব তাই না?

আমি বললাম, হ্যাঁ। অনেক মজা হবে।

মিলি আমাকে বলল, তুমি একটু হেঁটে গিয়ে দেখো না কি সমস্যা। এভাবে কতক্ষণ বসে থাকা যায়।

– একটু সময় বসলে খুব বেশি ক্ষতি নেই। অপেক্ষা করা ভালো। অপেক্ষা এক ধরণের পরীক্ষা।

মিলি চুপ হয়ে গেল। আমি চোখ বন্ধ করে বসে পড়লাম। রবিউলকে ক্রসফায়ার দেয়ার সপ্তাহখানেক হয়ে গেছে। সবকিছু পুরোপুরি শান্ত। আমার ক্রসফায়ার নিয়ে এখনো কোনো সমস্যা হয়নি অবশ্য। কারোরই সমস্যা হয়না। সমস্যা করে বসে কিছু অতি উৎসাহীরা। এরা ফটো তুলে, ভিক্টিমের আর্তনাদ ভিডিও করে মজা নেয়ার জন্য। কোনো না কোনো ভাবে এরা এক সময় ফেঁসে যায়। আমি এসব করিনা, আমার সমস্যাও নেই। তারপরও প্রতিবারই সামান্য খচখচানি কাজ করে কিছুদিন। আমার মনে রবিউল ইস্যু চিরতরে ভুলে যাবার সময় চলে এসেছে।

বেলা দুইটা বিশ বাজে।

জ্যাম লাগার বিশ মিনিটের মতো হয়ে গেছে। এখনো খোলার নাম নেই। একবার গাড়ি থেকে বের হয়ে খবর নেয়া উচিত। এই ভাবনা যখন এসেছে তখুনি একটা বিদঘুটে “ঝন ঝন ঝন” শব্দ আমার কানে আসল। ট্রেনের সিগন্যালের শব্দ! এর মানে ট্রেন আসছে। আমি এতক্ষণে খেয়াল করে দেখলাম আমাদের গাড়ি ট্রেন লাইনের উপর দাঁড়িয়ে আছে। এই জিনিষটা আগে কেনো লক্ষ্য করিনি?

আমি গাড়ির দরজা খুলতে গেলাম। পাশের গাড়ির আমার গাড়ির সাথে চেপে আছে। দরজা খোলা সম্ভব না। দুইপাশের গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয়ে বাইরে চলে গেছে। আমি দরজা খুলতে পারছি না। মুখ বের করে চিৎকার করলাম। আশেপাশে কেউ নেই। একটু দূরে কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। এদের চোখে মুখে ভীতি।

গাড়ি সরানোর কোনো উপায় নাই। সামনে পেছনে গাড়ি। আমার গাড়ি সরাসরি লাইনের উপর। পাশের দুই গাড়ির ড্রাইভার গাড়ি রেখে উধাও। কানের মধ্যে অনবরত “ঝনঝনঝন” আওয়াজ বেজেই চলেছে। আমি রক্তশূন্য মুখে মিলির দিকে তাকালাম। মিলি সমান আতংক নিয়ে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। খুব সহজ একটা ফাঁদে আমরা আটকা পড়ে গেছি।

সবকিছু কেমন জানি অপার্থিব মনে হলো আমার কাছে। প্রকৃতি এত অস্বাভাবিক আয়োজন করে রেখেছিল আমার জন্য? দুইপাশে দুইটা গাড়ি কখন এসে থামল ব্যাপারটা মাথাতেই নিইনি। এভাবে গাড়ি ট্রেনের লাইনে দাঁড় করিয়ে রেখেও মনে কোনো ভয় জাগেনি। অথচ এক মুহুর্তের ব্যবধানে প্রতিটা পশমে মৃত্যু ভয় চলে এসেছে।

আমি পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগলাম। তারপর গাড়ি স্টার্ট দিয়ে সজোরে সামনের গাড়িকে ধাক্কা দিলাম। কিছুই হলো না।

ট্রেন খুব কাছ থেকে হুইসেল দিল। মিলি শান্তাকে জড়িয়ে ধরে “ও আল্লাহ, ও আল্লাহ” করছে। এক পর্যায়ে সেও পাগলের মতো দরজা ধাক্কাতে লাগল এবং চিৎকার করে বলল “আমাদের বাঁচান। কে আছেন, বাঁচান প্লিজ।”

ট্রেনের শব্দ সরাসরি কানে আসছে। আমার হাতে আর কয়েক মুহুর্ত। আমি গ্লাসে সজোরে ঘুষি বসালাম। কোন কাজ হলো না। একটা পর্যায়ে আমার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিল আমি নিজেই আজকে রবিউল। মৃত্যুকে সামনে রেখে অযথাই আর্তনাদ করে যাচ্ছি। আমার ভীত আত্মা কল্পনা করল আমার সামনে রবিউল দাঁড়িয়ে আছে আর আমি তার কাছে প্রাণভিক্ষা চাইছি। এক সময় সত্যি সত্যিই আমি চিৎকার করে বললাম, আমারে ক্ষমা করে দেন ভাই। আমার স্ত্রী কন্যা মারা যাবে। তারা দোষ করেনি। ও আল্লাহ, ও আল্লাহ…..

মৃত্যু মুহুর্তে যে মানুষের মস্তিষ্ক দ্রুত কাজ করে সেটা আমি বুঝতে পারছি। আমার মস্তিষ্ক বলছে রবিউলের স্ত্রী কন্যাও দোষ করেনি। তারাও শাস্তি পাচ্ছে। একই নিয়মে হয়তো আমার স্ত্রী কন্যাও মারা যাবে। এতদিন পয়েন্ট ব্লাংক রেঞ্জ থেকে গুলি করে সেগুলোকে ক্রসফায়ার বলেছি। এবার জীবনে সত্যিকারের ক্রসফায়ারের মুখোমুখি হচ্ছি আমি। ঐ যে বিশাল ট্রেন এটাই হচ্ছে বুলেট। কোনো অদৃশ্য বিরাট শক্তি সমস্ত আয়োজন করে বুলেট ছুড়েছে। আমাদের দিকে ধেয়ে আসছে জান্তব গুলি।

মিলি পাগলের মতো দরজা ধাক্কা দিচ্ছে। শান্তা মিলিকে জড়িয়ে ধরে আছে। দৃশ্যটা দেখে আমার চোখ ফেটে গেল। সেই ফেটে যাওয়া চোখে ট্রেনটা চোখে পড়ল।

আর কয়েক সেকেন্ড!

আমি চোখ বন্ধ করলাম। কল্পনায় ধরে নিলাম ফারুক আমার চোখে কাপড় পরিয়ে দিচ্ছে। ট্রেন আরেকবার “পোওও” করল। সেটাকে আমার কাছে ট্রিগার টানার শব্দ মনে হলো। শান্তা শেষ সময়ে “আব্বু” বলে চিৎকার করছে। আমার কাছে মনে হচ্ছে এটা শান্তা না। এটা শান্তা-নাসিমা-ফাহিমার সমন্বিত কণ্ঠ। আমি বুঝতে পারছি প্রতিটা মানুষই কোনো না কোনো সময়ের রবিউল। শুধু সময়টুকুর জন্য অপেক্ষা করতে হয়।

ট্রেন একেবারে কাছে চলে এসেছে। প্রথমে আমার সামনের গাড়িকে ধাক্কা মারবে, তারপর আমাদেরকে। আগামীকালকে বনানীতে খোঁড়া হবে পাশাপাশি তিনটি কবর। রবিউলের কবরের পাশে কান্নার মতো মানুষ আছে, আমার কেউ থাকবে না।!

আমার খুব বেশি জানতে ইচ্ছে করছে, ক্রসফায়ারের শাস্তিটা কি কেবল আমার হবে? আমার ঈশ্বরেরা কি শাস্তি পাবে না???
ট্রেনের শব্দ এবার আমার কানের মধ্যে ঢুকে গেল।

/ফেসবুক/জয়নাল আবেদীন

১০ আওয়ামী দলকানা বুদ্ধিজীবির চোখে মাদক বিরোধী অভিযানে হত্যা ‘প্রত্যাশিত’ এবং ‘যৌক্তিক’!

১০ ‘বিশিষ্ট নাগরিক’ বিবৃতি দিয়ে জানাচ্ছে-

১/ “সারা দেশে যে মাদকবিরোধী অভিযান চলছে (বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা), তার ‘যৌক্তিকতা’ তারা অনুধাবন করে!”

২/ “সংগত কারণে সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থনও এই অভিযানে (বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুলি করে মেরে ফেলা) প্রত্যাশিত ছিল।”

৩/ “টেকনাফে নিহত পৌর কমিশনার একরামের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার পূর্ব অভিযোগের কথা জানা যায়নি।” (যেন পূর্ব অভিযোগ জানা থাকলে এই হত্যার ‘যৌক্তিকতা’ থাকতো! তাছাড়া, অন্ততপক্ষে দুইটি টিভি চ্যানেল কয়েক বছর আগেই নিহত একরামকে মাদক ব্যবসায়ী হিসেবে অভিযুক্ত করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।)

৪/ “তাঁর (একরামের) পরিবার সংবাদ সম্মেলন করে হত্যা-পূর্ব ফোনালাপ সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেছেন, যা কোনো ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র’ ও সমাজে অকল্পনীয়। এ রকম ‘একটি ঘটনাই’ সমগ্র ‘অভিযানকে প্রশ্নবিদ্ধ’ ও জনগণকে আতঙ্কিত করতে যথেষ্ট।” (তার মানে, এই ফোনালাপ প্রকাশ না পেলে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে বিনা বিচারে হত্যা করা ‘যৌক্তিক’ এবং ‘প্রত্যাশিত’ই থাকতো!)

গত ১৪ মে থেকে প্রতিদিন গড়ে ১০/১২জন করে মানুষকে বাড়ী থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে একইভাবে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে; একরামের আগেই খুন হয়েছে আরো ১২৩জন। তখন পর্যন্ত এই ‘বিশিষ্ট নাগরিক’দের কাছে বাংলাদেশ ‘গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ’ ছিল! এদের সমর্থিত সরকারের গত দশ বছরের শাসনামলে ৫’শতাধিক গুম আর ১৫ শতাধিক বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও এদের কাছে ‘যৌক্তিক’ এবং ‘প্রত্যাশিত’ই ছিলো!

অপ্রত্যাশিত ঘটনা হয়ে গেছে- একরাম হত্যার অডিও প্রকাশিত হয়ে যাওয়ায়!

এই বুড়ো শকুনগুলো এই কথা স্পষ্ট করে বলতে পারেনা যে, একরাম মাদক ব্যবসায়ী হলেও তাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী বিনা বিচারে হত্যা করতে পারে না; কাউকেই পারে না।

এই বুড়ো শকুনদের বিবেকের দেখা মেলে তাদের দৃষ্টিতে কোন ‘চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশিত’ হলে। তখন এরা মুরিদদের সাথে নিয়ে নিজেদের কানে ধরে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ করে। এদের মুরিদরা ‘এই জল্লাদের উল্লাসমঞ্চ আমার দেশ না’ লিখে চেতনামাখা স্ট্যাটাস দেয়। তারপর আরো হত্যা-গুমের ধারাবাহিক ঘটনা ঘটে, ছাত্রলীগের হাতে একের পর এক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের লাঞ্ছনার ঘটনা ঘটে, তখন আর এদের দেখা পাওয়া যায় না!

কাজেই এইসব সিজনাল এবং সিলেক্টিভ ঘটনার প্রতিবাদী ধান্দাবাজদের থেকে সতর্ক থাকুন। এরা-
যেভাবে এরা এক রেশমাকে উদ্ধারের নাটক দেখিয়ে রানা প্লাজায় ১২’শ নিহতের ঘটনাকে ধামাচাপা দিয়েছে আর রেশমাকে ফাইভস্টার হোটেলে চাকরি দিয়ে দেড় হাজার পঙ্গুকে পূনর্বাসিত না করার ও রানা প্লাজার ভিক্টিমদের জন্য আশা ১০৯ কোটি টাকা চুরির ঘটনা ধামাচাপা দিতে সাহায্য করেছে, যেভাবে এরা শ্যামল কান্তি ভক্তের ঘটনায় ‘কানে ধরা প্রতিবাদ’ করে ছাত্রলীগের হাতে দেশের শত শত শিক্ষক লঞ্ছনার ঘটনা ধামাচাপা দিয়েছে, ঠিক সেভাবেই এরা এক একরামের ঘটনার প্রতিবাদ করে দেড় হাজার বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনাকে ধামাচাপা দিতে এবং একরামের পরিবারতে গণভবনে নিয়ে ফটোসেশন করিয়ে সকল বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ভিক্টিমের পরিবারের বঞ্চনাকে ধামাচাপা দিতে চাইছে।

কুমিরের চোখে পানি দেখলে আবেগ প্রবণ হওয়া বোকামি।

/ফেসবুক/ একেএম ওয়াহিদুজ্জামান

রাজনৈতিক হত্যাকান্ডকে আড়াল করতে বাংলাদেশে মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ

« Older Entries